📄 শত্রুসেনাদের কতককে হত্যা করিতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিষেধাজ্ঞা
শত্রু সেনাদের সকলেই যে স্বেচ্ছায় ও সোৎসাহে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হইয়াছিল তাহা নহে। সকলেই যে ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করিত তাহাও নহে। এমনও অনেক লোক ছিল যাহারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাসূলুল্লাহ (স) ও মুসলমান দিগকে সাহায্য-সহযোগিতা করিয়াছিল। পরিস্থিতির শিকার হইয়া বা নেতৃবৃন্দের চাপে পড়িয়া অনিচ্ছা সত্ত্বেও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিয়াছিল। রাসূলুল্লাহ (স) এইসব লোককে হত্যা করিতে নিষেধ করেন। ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (স) সেই দিন তাঁহার সাহাবীদিগকে বলিয়া ছিলেন, আমি জানি যে, বানু হাশিমের কিছু লোক এবং অন্যান্যদিগকে জোর-জবরদস্তিমূলক তাহাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ঘর হইতে বাহির করা হইয়াছে। আমাদের সহিত যুদ্ধ করিতে তাহাদের কোনও প্রয়োজন নাই। তাই তোমাদের কেহ বানু হাশিমের কোনও লোকের মুখামুখী হইলে তাহাকে হত্যা করিবে না। আর যে আবুল বাখতারী ইব্ন হিশাম ইবনুল হারিছ ইব্ন আসাদের সাক্ষাত পাইবে সে যেন তাহাকে হত্যা না করে। কারণ তাহাকে জোর করিয়া আনা হইয়াছে। আর যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর চাচা আব্বাস ইব্ন আবদিল মুত্তালিবের সাক্ষাত পাইবে সে যেন তাহাকে হত্যা না করে। কারণ তাহাকেও জোর করিয়া আনা হইয়াছে। তখন আবূ হুযায়ফা ইব্ন উতবা ইবন রাবী'আ বলিলেন, আমরা কি আমাদের পিতা, পুত্র ও ভ্রাতাদের হত্যা করিব, আর আব্বাসকে ছাড়িয়া দিব? আল্লাহ্র কসম! আমি যদি তাহার সাক্ষাত পাই তবে অবশ্যই তরবারি দ্বারা তাহাকে হত্যা করিব। এই কথা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পৌছিলে তিনি উমার (রা)-কে বলিলেন, হে আবূ হাফস! (উমার বলেন, এই প্রথম তিনি আমাকে উপনামে সম্বোধন করিলেন) রাসূলাল্লাহ্র চাচার চেহারা তরবারি দ্বারা আঘাত করা হইবে। উমার (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে অনুমতি দিন আমি তরবারি দ্বারা তাহার গর্দান উড়াইয়া দেই। আল্লাহ্র কসম! সে মুনাফিক হইয়া গিয়াছে। আবু হুযায়ফা (রা) বলিলেন, সেই দিন আমি যাহা বলিয়াছিলাম তাহার দরুন স্বস্তি লাভ করিতে পারি নাই। সর্বদা আমি শংকিত ছিলাম যে, আমার এই উক্তি কি আমাকে শাহাদাতের মর্যাদা হইতে ফিরাইয়া দেয়? অতঃপর তিনি ইয়ামামার যুদ্ধে শহীদ হন।
📄 আবুল বাখতারীকে হত্যার ঘটনা
আবুল বাখতারীকে রাসূলুল্লাহ (স) হত্যা করিতে নিষেধ করিয়াছিলেন। তাহার কিছু কারণ ইবন ইসহাক বর্ণনা করিয়াছেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আবুল বাখতারীকে হত্যা করিতে এইজন্য নিষেধ করেন যে, মক্কায় থাকিতে তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-কে কোনরূপ নির্যাতন করা হইতে বিরত থাকিতেন। তিনি তাঁহাকে কোনরূপ কষ্ট দিতেন না। তাহার পক্ষ হইতে এমন কোনও আচরণ প্রকাশ পায় নাই যাহা রাসূলুল্লাহ (স) অপছন্দ করেন। বানু হাশিম ও বানু মুত্তালিবকে বয়কট করিয়া যে পত্র প্রণয়ন করা হয় উহা ছিড়িয়া ফেলার উদ্যোগ গ্রহণকারীদের মধ্যে তিনি ছিলেন অগ্রগণ্য। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও আবুল বাখতারী নিহত হন। বলা যায় যে, এক রকম স্বেচ্ছায়ই তিনি নিহত হন।
তাহার হত্যার ঘটনার বিবরণ এই যে, আনসারদের মিত্র আল-মুজাযযির ইবন যিয়াদ আল-বালাবী যুদ্ধ ক্ষেত্রে আবুল বাখতারীর সাক্ষাত পাইয়া তাহাকে বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) তোমাকে হত্যা করিতে আমাদিগকে নিষেধ করিয়াছেন। আবুল বাخতারীর সহিত লায়ছ গোত্রের জুনাদা ইব্ন মুলায়হা নামে তাহার এক সঙ্গী ছিল, যে মক্কা হইতেই তাহার সহিত একসঙ্গে বাহির হইয়াছিল। আবুল বাখতারী বলিলেন, আর আমার সঙ্গীকে? মুজাযযির (রা) তাহাকে বলিলেন, না, আল্লাহর কসম! আমরা তোমার সঙ্গীকে ছাড়িব না। রাসুলুল্লাহ (স) কেবল তোমাকেই হত্যা না করার জন্য আমাদিগকে নির্দেশ দিয়াছেন। আবুল বাখতারী বলিলেন, না, আল্লাহ্র কসম! তাহা হইলে আমি ও সে একত্রে মৃত্যুবরণ করিব যাহাতে মক্কর মহিলাগণ আমার সম্পর্কে বলিতে না পারে যে, আমি জীবনের আশায় আমার সঙ্গীকে পরিত্যাগ করিয়াছি। আল-মুজাযযির-এর সহিত যুদ্ধে লিপ্ত হইবার সময় আবুল বাখতারী এই কবিতা আবৃত্তি করিয়াছিলেন:
لن يسلم ابن حرة زميله حتى يموت أو يرى سبيله. "স্বাধীন মহিলার পুত্র কখনও তাহার সঙ্গীকে (শত্রুর হাতে) সমর্পণ করে না, যতক্ষণ না সে মৃত্যুবরণ করে অথবা তাহার পথ দেখিয়া লয়।”
আর মুজাযযির (রা) আবুল বাখতারীকে হত্যা করার সময় এই কবিতা আবৃত্তি করেন:
اما جهلت أو نسيت نسبي + فاثبت النسبة اني من بلى الطاعنين برماح اليزني + والضاربين الكبش حتى ينحني بشر بيتم من ابوه البختري + او بشرن بمثلها منى بني انا الذى يقال اصلى من بلى + اطعن بالصعدة حتى تنثنى + وارزم للموت كارزام المرى واعبط القرن بعضب مشرفي فلا ترى مجذرا یفری فری
"তুমি কি আমার বংশ সম্পর্কে অজ্ঞ রহিয়াছ না ভুলিয়া গিয়াছ? তাহা হইলে সম্বন্ধটি ভাল করিয়া জানিয়া লও যে, আমি বালিয়্যি গোত্রের, যাহারা আল-ইয়াযানী বর্শা দ্বারা আঘাতকারী এবং যাহারা বকরীকে প্রহারকারী যতক্ষণ না উহা বাঁকা হইয়া যায়। আবুল বাখতারী যাহার পিতা, তাহাকে ইয়াতীম হওয়ার সুসংবাদ দাও অথবা আমার পক্ষ হইতে আমার পুত্রদিগকে অনুরূপ সুসংবাদ দাও। আমি সেই লোক যাহার গোড়া হইল বালিয়িয় বংশ। আমি বর্শা দ্বারা আঘাত করি উহা বাঁকা হওয়া পর্যন্ত। আমি আমার প্রতিদ্বন্দ্বীকে হত্যা করি ধারালো মাশরিফী তরবারি দ্বারা। আমি মৃত্যুর জন্য ক্রন্দন করি কষ্টের সহিত দোহনকৃত উষ্ট্রীর ক্রন্দনের ন্যায়। তাই তুমি মুজাযযিরকে কোনও অদ্ভুত রকমের কাজ করিতে দেখিবে না।"
অতঃপর মুজাযযির রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট গিয়া বলিলেন, সেই সত্তার কসম, যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করিয়াছেন! আমি তাহাকে বন্দী করিয়া আপনার নিকট লইয়া আসার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়াছি। কিন্তু সে আমার সহিত যুদ্ধ করা ব্যতীত আর কিছুতেই সম্মত হয় নাই। অবশেষে আমি তাহার সহিত যুদ্ধে লিপ্ত হইয়াছি। অতঃপর আমি তাহাকে হত্যা করিয়াছি।
কেহ কেহ বলেন যে, আবুল ইয়াসার (রা) তাহাকে হত্যা করিয়াছেন। তবে অধিকাংশ সীরাতবিদের মতে আল-মুজাযয্যির (রা)-ই তাহাকে হত্যা করেন। ইব্ন সায়্যিদিন নাস বলেন, নিঃসন্দেহে আবূ দাউদ আল-মাযিনী তাহাকে হত্যা করিয়াছেন। আবুল বাখতারীর তরবারি আবূ দাউদ আল-মাযিনী (রা)-এর পুত্রদের নিকট রক্ষিত ছিল, যাহা তাহার কোন এক পুত্র আবুল বাখতারীর পুত্রের নিকট বিক্রয় করেন।
📄 উমায়্যা ইব্ন খালাফকে হত্যার ঘটনা
উমায়্যা ইব্ন খালাফকে হত্যার ঘটনা
উমায়্যা ইব্ন খালাফ ছিল কুরায়শ নেতৃবৃন্দের অন্যতম। সে নও মুসলিমগণকে ভীষণভাবে নির্যাতন করিত। বিলাল (রা) ছিলেন তাহার ক্রীতদাস। ইসলাম গ্রহণের কারণে উমায়্যা ইব্ন খালাফ তাহাকে তপ্ত মরুভূমিতে চীৎ করিয়া শোয়াইয়া বুকের উপর ভারী পাথর চাপা দিয়া অমানুষিক নির্যাতন করে। বদর যুদ্ধের সময় বিলাল (রা) আনসার সাহাবীদের একদলসহ তাহাকে হত্যা করেন। তাহার নিহত হওয়ার বিবরণ দিয়াছেন আবদুর রাহমান ইব্ن আওফ (রা)। তিনি বলেন, উমায়্যা ইন্ন খালাফ মক্কায় থাকিতে আমার বন্ধু ছিল। আমার নাম ছিল আব্দ আমর। ইসলাম গ্রহণের পর আমার নাম রাখা হয় আবদুর রাহমান। মক্কায় থাকিতে সে একদিন আমার সহিত সাক্ষাত করিয়া বলিল, হে আব্দ আমর! তুমি কি তোমার মাতা-পিতার রাখা নাম পরিত্যাগ করিয়াছ? আমি বলিলাম, হাঁ। সে বলিল, আমি রাহমান কে তাহা চিনি না। তাই আমার ও তোমার মধ্যে এমন একটি কিছু ঠিক কর যাহা দ্বারা আমি তোমাকে ডাকিতে পারি। তুমি তো তোমার পূর্বের নামে ডাকিলে সাড়া দিবে না, আর আমিও এমন নামে ডাকিব না যাহাকে আমি চিনি না। সে যখন আমাকে হে আব্দ আমর বলিয়া ডাকিত, আমি তাহার ডাকে সাড়া দিতাম না। আমি তাহাকে বলিলাম, হে আবূ আলী! তোমার যাহা ইচ্ছা তাহাই একটা কিছু ঠিক করিয়া লও। সে বলিল, তাহা হইলে তুমি আবদুল ইলাহ। আমি বলিলাম, হাঁ। অতঃপর আমি যখন তাহার নিকট দিয়া যাইতাম তখন সে আমাকে ডাকিত, হে আবদুল ইলাহ! আমি ইহাতে সাড়া দিতাম এবং তাহার সহিত আলাপ-আলোচনা করিতাম।
এমনিভাবে বদর যুদ্ধের দিন আমি তাহার নিকট দিয়া যাইতেছিলাম। সে তাহার পুত্র আলীর হাত ধরিয়া দাঁড়াইয়াছিল। আমার সঙ্গে কয়েকটি লৌহবর্ম ছিল যাহা আমি শত্রুসেনাগণকে পরাস্ত করিয়া ছিনাইয়া লইয়াছিলাম। আমি উহা বহন করিয়া লইয়া যাইতেছিলাম। সে আমাকে দেখিয়া বলিল, হে আব্দ আমর! আমি ইহার উত্তর দিলাম না। অতঃপর সে ডাকিল, হে আবদুল ইলাহ! আমি বলিলাম, হাঁ। সে বলিল, তুমি কি আমার প্রতি মনোযোগ দিবে? আমি তো তোমার সহিত যে লৌহবর্ম আছে তাহা হইতে উত্তম। আমি বলিলাম, হাঁ, অবশ্যই আল্লাহ্র কসম!
অতঃপর আমি আমার হাত হইতে বর্মগুলি ছুড়িয়া ফেলিলাম এবং তাহার ও তাহার পুত্রের হাত ধরিলাম। সে বলিতেছিল, আজিকার দিনের মত (ভয়াবহ দিন) আমি আর কখনও দেখি নাই। তোমাদের কি দুধের প্রয়োজন আছে? ইহা দ্বারা সে অধিক দুধেলা উস্ত্রী উপঢৌকনের দিকে ইঙ্গিত করে। অতঃপর আমি তাহাদের উভয়কে লইয়া চলিতে লাগিলাম। আমি উমায়্যা ও তাহার পুত্রের মধ্যখানে উভয়ের হাত ধরিয়া চলিতেছিলাম। উমায়্যা আমাকে বলিল, হে আবদুল ইলাহ! তোমাদের মধ্যে বুকে উট পাখির পালক দ্বারা সজ্জিত ব্যক্তিটি কে? আমি বলিলাম, তিনি হামযা ইব্ন আবদিল মুত্তালিব। সে বলিল, ঐ ব্যক্তি আমাদিগকে আজ চরম মার দিয়াছে।
আবদুর রাহমান (রা) বলেন, আল্লাহ্র কসম! আমি তাহাদিগকে লইয়া যাইতেছিলাম এমন সময় বিলাল (রা) হঠাৎ আমার সহিত তাহাকে দেখিয়া ফেলিল। সে মক্কায় থাকিতে ইসলাম গ্রহণের কারণে বিলালকে চরম নির্যাতন করিয়াছিল। বিলাল তাহাকে দেখিয়াই বলিয়া উঠিল, কাফিরদের নেতা উমায়্যা ইব্ন খালাফ! সে পরিত্রাণ পাইলে আমার রক্ষা নাই। অতঃপর তাহারা আমাদিগকে ঘিরিয়া ফেলিল। এমনকি তাহারা গোলাকার বৃত্তের ন্যায় করিয়া ফেলিল। আমি তাহার উপর হইতে আঘাত প্রতিহত করিয়াছিলাম। অতঃপর এক ব্যক্তি তরবারি বাহির করিয়া তাহার পুত্রের পায়ে আঘাত করিল। ফলে সে পড়িয়া গেল। ইহা দেখিয়া উমায়্যা এমন জোরে চীৎকার দিয়া উঠিল যাহা আমি ইতোপূর্বে আর কখনও শুনি নাই। আমি বলিলাম, এখন নিজে বাঁচো, তোমাকে বাঁচাইবার আর কোনও পথ নাই। আল্লাহর কসম! আমি তোমার কোনওই উপকার করিতে পারিব না। অতঃপর তাহারা উভয়কেই তরবারি দ্বারা টুকরা টুকরা করিয়া ফেলিল। পরবর্তী কালে আবদুর রাহমান ইব্ন আওফ (রা) বলিতেন, আল্লাহ বিলালের প্রতি রহম করুন। আমার বর্মগুলিও গেল এবং আমার বন্দীর কারণে আমাকে কষ্টও ভোগ করিতে হইল। এক বর্ণনামতে এই সময় আবদুর রাহমান ইব্ن আওফ (রা)-এর পায়ে তরবারির আঘাত লাগিয়াছিল। উহার প্রতিই তিনি ইঙ্গিত করিয়াছেন।
📄 আবূ জাকে হত্যার ঘটনা
এই যুদ্ধে কুরায়শদের শীর্ষ নেতা আবু জাহল ইব্ন হিশাম নির্মমভাবে নিহত হয়। ইমাম বুখারী (র) তাহার হত্যার যে বিবরণ প্রদান করিয়াছেন তাহা এইরূপঃ আবদুর রাহমান ইব্ন আওফ (রা) বলেন, বদর যুদ্ধের দিন সৈন্যদের লাইনে দাঁড়াইয়া আমি ডানে, বামে তাকাইয়া দেখিলাম, আমি আনসারদের অল্পবয়স্ক দুই যুবকের মধ্যখানে অবস্থিত। আমি মনে মনে কামনা করিলাম, আমি যদি ইহাদের তুলনায় দুইজন শক্তিশালী লোকের মধ্যখানে থাকিতাম। তাহাদের একজন আমাকে একটু খোঁচা দিয়া বলিল, 'চাচাজী। আপনি কি আবূ জাহলকে চিনেন? আমি বলিলাম, হাঁ। তাহাকে দিয়া তোমার কি প্রয়োজন হে ভ্রাতুষ্পুত্র? সে বলিল, আমি জানিতে পারিয়াছি যে, সে রাসূলুল্লাহ (স)-কে গালি দেয়। সেই সত্তার কসম যাঁহার হাতে আমার প্রাণ! আমি যদি তাহাকে দেখিতে পাই তবে আমাদের মধ্যে তাড়াহুড়াকারী ব্যক্তিটি মৃত্যুবরণ না করা পর্যন্ত তাহার হইতে পৃথক হইব না। ইহা শুনিয়া আমি স্তম্ভিত হইয়া গেলাম। অতঃপর অপরজনও আমাকে একটু খোঁচা দিয়া অনুরূপ কথা বলিল।
ইতোমধ্যে আমি আবূ জাহলকে দেখিলাম, সে লোকদের মধ্যে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। আমি বলিলাম, দেখ! তোমরা যাহার কথা জিজ্ঞাসা করিয়াছিলে ঐ সেই ব্যক্তি। অতঃপর তাহারা উভয়ে ছুটিয়া গিয়া দ্রুত তরবারি চালনা করিতে লাগিল।' বুখারীর অপর বর্ণনায় আছে, তাহারা বাজ পাখির ন্যায় দ্রুত গিয়া তাহার উপর ঝাঁপাইয়া পড়িল এবং তাহাকে হত্যা করিল। অতঃপর তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া এই সংবাদ দিল। তিনি বলিলেন, তোমাদের মধ্যে কে তাহাকে হত্যা করিয়াছে? উভয়ে বলিল, আমি তাহাকে হত্যা করিয়াছি। তিনি বলিলেন, তোমরা কি তোমাদের তরবারি মুছিয়া ফেলিয়াছ? তাহারা বলিল, না। অতঃপর তিনি তাহাদের উভয়ের তরবারির দিকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, তোমরা উভয়ে তাহাকে হত্যা করিয়াছ। তাহার পরিত্যক্ত সম্পদ মু'আয ইব্ন আমর ইবনুল জামূহ-এর। তাহাদের নাম ছিল মু'আয ইব্ন 'আফরা ও মু'আয ইব্ন 'আমর ইবনুল জামূহ (আল-বুখারী, আস-সাহীহ, কিতাবু ফারদিল খুমুস্, হাদীছ নং ৩১৪১; কিতাবুল মাগাযী, হাদীছ নং ৩৯৮৮)।
আবু জাহল নিহত হওয়া সম্পর্কে ইব্ন হিশামের বর্ণনা এইরূপঃ বদর যুদ্ধের দিন আবু জাহল সম্মুখে অগ্রসর হইতেছিল আর এই কবিতা আবৃত্তি করিতেছিল:
ما تنقم الحرب العوان منى + بازل عامين حديث سنی لمثل هذا ولدتني أمي
“প্রচণ্ড ও ভয়ঙ্কর যুদ্ধ; দুই বৎসর বয়স্ক নবীন উট আমার নিকট হইতে প্রতিশোধ গ্রহণ করিবে না। এই ধরনের কাজের জন্যই আমার মাতা আমাকে জন্ম দান করিয়াছে।”
যুদ্ধশেষে রাসূলুল্লাহ (স) নিহতদের মধ্যে আবূ জাহলকে খুঁজিবার নির্দেশ দিলেন। ইন্ন আব্বাস ও আবদুল্লাহ ইব্ন আবূ বাক্স (রা) সূত্রে বর্ণিত। তাহারা সালামা গোত্রের সদস্য মু'আয ইব্ন আমার ইবনুল জামূহ (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, আবু জাহল ছিল এমন এক বৃক্ষের ন্যায় যাহার নিকট পৌঁছা যায় না। আমি কাফিরদিগকে বলাবলি করিতে শুনিলাম যে, আবুল হাকামকে বাগে পাওয়া যায় না। ইহা শুনিয়া আমি তাহাকে হত্যা করার সংকল্প করিলাম, তাই আমি তাহার দিকে অগ্রসর হইলাম। অতঃপর সুযোগ পাইয়া আমি তাহাকে আক্রমণ করিলাম। আমি তাহাকে এমনভাবে আঘাত করিলাম যে, তাহার পা নলার মধ্যখান হইতে উড়িয়া গেল। আল্লাহ্র কসম! আমি উহার উদাহরণ এইভাবে দিলাম যে, খেজুরের আঁটি ভাঙ্গার যাতার নিচ হইতে আঁটি যেমন সটকাইয়া পড়ে তেমনি। তাহার পুত্র ইকরিমা আমাকে আমার কাঁধের নিচে আঘাত করিল। ইহাতে আমার হাত কাটিয়া আমার পার্শ্বদেশের চামড়ার সহিত ঝুলিতে লাগিল। প্রচণ্ড যুদ্ধের কারণে আমি সেদিকে ভ্রূক্ষেপ করিলাম না। উক্ত হাত পিছনে ঝুলাইয়া আমি যুদ্ধ করিতে লাগিলাম। ইহাতে যখন আমার বেশী কষ্ট হইতে লাগিল তখন আমি উক্ত ঝুলন্ত হাত পায়ের নিচে রাখিয়া সজোরে টান দিয়া বিচ্ছিন্ন করিয়া ফেলিলাম। ইবন ইসহাক বলেন, ইহার পর তিনি উছমান (রা)-এর কাল পর্যন্ত জীবিত ছিলেন।
অতঃপর আবূ জাহল আহত অবস্থায় পড়িয়া রহিল। তখন মু'আওবিয ইব্ন আফরা তাহার নিকট দিয়া যাইতেছিলেন। তিনি তাহাকে আঘাত করিয়া মুমূর্ষু অবস্থায় ফেলিয়া রাখিলেন। তখনও তাহার শ্বাস-প্রশ্বাস চলিতেছিল। মুআওবিষ পরে যুদ্ধ করিতে করিতে শহীদ হইলেন। অতঃপর যুদ্ধশেষে রাসূলুল্লাহ (স) আবূ জাহলকে খুঁজিবার নির্দেশ দিয়া বলিলেন, নিহতদের মধ্যে তাহাকে চিনিয়া বাহির করিতে কষ্ট হইলে তোমরা তাহার হাঁটুতে যখমের চিহ্ন দেখিবে। কারণ বালক বয়সে একদিন আমি ও সে আবদুল্লাহ ইব্ন জুদ'আনের বাড়িতে দাওয়াত খাইতে গিয়া বিবাদ করিয়াছিলাম। আমি ছিলাম তদপেক্ষা সামান্য বড়। অতঃপর আমি তাহাকে ধাক্কা দিলে সে পড়িয়া হাঁটুতে ভর করিল। সে এক হাঁটুতে এমন আঘাতপ্রাপ্ত হইল যাহার চিহ্ন এখনও পর্যন্ত তাহার হাঁটুতে রহিয়া গিয়াছে।
লোকজন তাহার সন্ধানে বাহির হইল। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) তাহাকে এমন অবস্থায় পাইলেন যে, তাহার শ্বাস শেষ পর্যায়ে। তিনি বলেন, আমি তাহাকে দেখিয়া চিনিতে পারিলাম। আমি তাহার ঘাড়ের উপর পা রাখিলাম। মক্কায় থাকিতে একবার সে আমাকে থাপ্পড় মারিয়া ব্যথা দিয়াছিল। আমি তাহাকে বলিলাম, আল্লাহ কি তোমাকে অপদস্থ করিয়াছেন, হে আল্লাহ্র দুশমন? সে বলিল, কিসের দ্বারা আমাকে অপদস্থ করিবেন? আমি কি এমন ব্যক্তির ব্যাপারে লজ্জাবোধ করিব যাহাকে তোমরা হত্যা করিয়াছ? (এক বর্ণনামতে যাহাকে তাহার কওম হত্যা করিয়াছে)? আমাকে বল, বিজয় কাহাদের হইয়াছে? আমি বলিলাম, আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের। অতঃপর সে ইবন মাসউদ (রা)-কে বলিল, তুমি তো বহু শক্ত স্থানে আরোহণ করিয়াছ হে বকরীর রাখাল! ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় থাকিতে বকরী চরাইতেন। তিনি বলেন, অতঃপর আমি তাহার মস্তক কর্তন করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট লইয়া আসলাম এবং বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ইহা আল্লাহ্র দুশমন আবূ জাহলের মস্তক। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, সেই আল্লাহ যিনি ব্যতীত আর কোনও ইলাহ নাই? তিনবার তিনি ইহা বলিলেন। ইহা ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর কসম। আমি বলিলাম, হাঁ, সেই আল্লাহ্র কসম, যিনি ব্যতীত আর কোনও ইলাহ নাই। অতঃপর আমি মস্তকটি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে ছুড়িয়া ফেলিলাম। তিনি আল্লাহ্র প্রশংসা করিলেন (ইবন হিশাম, আস-সীরা, ২খ., পৃ. ২৭৬-৮৮)। এক বর্ণনা মতে রাসূলুল্লাহ (স) তখন বলিলেন:
الحمد لله الذي صدق وعده ونصر عبده وهزم الاحزاب وحده.
"সকল প্রশংসা আল্লাহর যিনি স্বীয় অঙ্গীকার সত্যে রূপায়িত করিয়াছেন, স্বীয় বান্দাকে সাহায্য করিয়াছেন এবং অনেক শত্রুদলকে একাই পরাস্ত করিয়াছেন।"
তিনি বলিলেন, আমার সহিত চল, তাহাকে দেখাইয়া দিবে। আমরা চলিলাম। আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে তাহার লাশ দেখাইয়া দিলাম। তিনি বলিলেন, এই হইল বর্তমান উম্মতের ফিরআওন (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ২৪৬; ইব্ন কাছীর, প্রাগুক্ত, ৩খ., পৃ. ২৮৯)।
আ'মাশ (র) ইবন মাসউদ (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, বদর যুদ্ধের দিন আমি আবূ জাহলের নিকট পৌঁছিলাম। সে তখন ধরাশায়ী অবস্থায় ছিল। তাহার মাথায় ছিল লোহার শিরস্ত্রাণ এবং সঙ্গে ছিল উত্তম তরবারি। আর আমার সঙ্গে ছিল সাধারণ তরবারি। আমি তাহার মস্তকে আমার তরবারি দ্বারা খোঁচা দিতেছিলাম এবং স্মরণ করিতেছিলাম যে, মক্কায় থাকিতে সে এমনিভাবে আমার মস্তকে খোঁচা দিত, তাহার হাত দুর্বল হইয়া যাওয়া পর্যন্ত। অতঃপর আমি তাহার তরবারি লইলাম। সে মাথা উঠাইয়া বলিল, বিজয় কাহাদের হইয়াছে, আমাদের পক্ষে না বিপক্ষে? তুমি না মক্কায় আমাদের রাখাল ছিলে! তিনি বলেন, অতঃপর আমি তাহাকে হত্যা করিলাম এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া এই সংবাদ দিলাম (ইব্ন কাছীর, প্রাগুক্ত, ৩খ., পৃ. ২৮৮-৮৯)।
এক বর্ণনা হইতে জানা যায় যে, ফেরেশতাগণ তাহাকে আঘাত করিয়াছিল। আল-ওয়াকিদী বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, আল্লাহ আফরার পুত্রদ্বয়ের প্রতি রহমত বর্ষণ করুন। তাহারা এই উম্মতের ফিরআওন ও কাফিরদের মধ্যমণিকে হত্যায় শরীক ছিল। কেহ বলিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাহাকে হত্যায় আর কে তাহাদের শরীক ছিল? তিনি বলিলেন, ফেরেশতা ও ইবন মাসউদ (প্রাগুক্ত, পৃ. ২৮৯)।
মূসা ইব্ন উকবার বর্ণনামতে ইবন মাসউদ (রা) তাহাকে লৌহবর্মে আবৃত অবস্থায় পাইলেন। সে একদিকে পড়িয়াছিল, কোনরূপ নড়াচড়া করিতে পারিতেছিল না। তিনি ধারণা করিলেন যে, সে বুঝি আহত অবস্থায় পড়িয়া আছে। তিনি তরবারি দ্বারা খোঁচা মারিলেন কিন্তু সে অসাড় অবস্থায় পড়িয়াই রহিল, কোনওরূপ নড়াচড়া করিল না। অতঃপর তিনি তাহার কাঁধের নিচ হইতে শিরস্ত্রাণ খুলিয়া ফেলিয়া তরবারি দ্বারা আঘাত করিলেন। ইহাতে তাহার মস্তক তাঁহার সম্মুখে লুটাইয়া পড়িল। তিনি সজোরে টানিয়া তাহার লৌহবর্ম খুলিয়া ফেলিলেন। অতঃপর তাহার দিকে তাঁকাইয়া দেখিলেন তাহার শরীরে কোন যখম নাই। তিনি তাহার ঘাড়ে কালো দাগ এবং তাহার উভয় হাত ও কাঁধে চাবুকের চিহ্ন দেখিতে পাইলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া এই সংবাদ দিলে তিনি বলিলেন, উহা ফেরেশতাদের আঘাত ('উষুনুল আছার, ১খ., পৃ. ৩০৫; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৪খ., পৃ. ৫১)।
বায়হাকী আবু ইসহাক সূত্রে বর্ণনা করেন যে, আবূ জাহলের মৃত্যুসংবাদ শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) সিজদাবনত হইলেন। অপর এক বর্ণনায় তিনি আবদুল্লাহ ইব্ন আবী আওফা সূত্রে বর্ণনা করেন যে, বিজয়ের সংবাদ এবং আবূ জাহলের মস্তক আনয়নের সংবাদ পাইয়া রাসূলুল্লাহ (স) দুই রাক'আত সালাত আদায় করেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ২৮৯)।
এক রিওয়ায়াত হইতে জানা যায় যে, আবু জাহলকে কিয়ামত পর্যন্ত বদর প্রান্তরে শাস্তি দেওয়া হইবে। ইব্ন আবিদ দুনয়া শা'বী সূত্রে বর্ণনা করেন যে, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া বলিল, আমি বদর প্রান্তর দিয়া গমন করিতেছিলাম। তখন দেখিলাম, এক লোক মাটির অভ্যন্তর হইতে বাহির হইতেছে এবং অন্য এক লোক তাহাকে চাবুক মারিতেছে। ইহাতে সে মাটির ভিতর অদৃশ্য হইয়া যাইতেছে। অতঃপর পুনরায় সে মাটির ভিতর হইতে বাহির হইতেছে এবং পুনরায় তাহার সহিত অনুরূপ আচরণ করা হইতেছে। কয়েকবারই এইরূপ করা হইল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, সে হইল আবু জাহল। কিয়ামত পর্যন্ত তাহাকে ঐরূপ শাস্তি দেওয়া হইবে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ২৮৯-৯০; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৪খ., পৃ. ৫২).