📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলিম বাহিনীর বিশেষ সংকেত

📄 যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলিম বাহিনীর বিশেষ সংকেত


যুদ্ধক্ষেত্রে পরস্পরকে চিনিবার জন্য রাসূলুল্লাহ (স) বিভিন্ন গোত্রের জন্য বিভিন্ন সংকেত নির্ধারণ করিয়া দেন। আবদুল্লাহ ইবনুষ যুবায়র (রা) সূত্রে বর্ণিত যে, বদর যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (স) মুহাজিরদের জন্য 'ইয়া বানী আবদির রাহমান', খাযরাজ গোত্রের জন্য 'ইয়া বানী আবদিল্লাহ' ও আওস গোত্রের জন্য 'ইয়া বানী উবায়দিল্লাহ' সংকেত নির্ধারণ করিয়া দেন। এক বর্ণনামতে মুসলমানদের সকলের সংকেত ছিল أمت يا منصور "হে সাহায্যপ্রাপ্ত ব্যক্তি! মারিয়া ফেল” (ইবন সাদ, তাবাকাত, ২খ., পৃ. ১৪)। যায়দ ইব্‌ন আলীর বর্ণনামতে ইহাই ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর সংকেত। ইব্‌ন হিশামের বর্ণনামতে বদর যুদ্ধের দিন সাহাবায়ে কিরামের সংকেত ছিল 'আহাদুন আহাদ'। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার ঘোড়ার নামকরণ করেন খায়লুল্লাহ তথা আল্লাহর ঘোড়া।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 শত্রুসৈন্যদেরকে ধরপাকড় এবং সা'দ ইব্‌ন মু'আয-এর অসন্তুষ্টি

📄 শত্রুসৈন্যদেরকে ধরপাকড় এবং সা'দ ইব্‌ন মু'আয-এর অসন্তুষ্টি


রাসূলুল্লাহ (স) যুদ্ধ শুরু করিবার নির্দেশ দেওয়ার পর এবং কাফিরদের প্রতি কংকর নিক্ষেপ করিবার পর কাফিরগণ পরাজিত হইতে শুরু করিল। রাসূলুল্লাহ (স) পুনরায় আরীশে প্রবেশ করিলেন। তাঁহার সঙ্গে ছিলেন আবূ বাকর (রা)। সা'দ ইব্‌ন মু'আয (রা) ও তাঁহার সঙ্গী আরও কিছু আনসার তরবারি সজ্জিত অবস্থায় আরীশের দরজায় দাঁড়াইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-কে প্রহরা দিতে লাগিলেন। শত্রুসৈন্যদের পুনরায় ফিরিয়া আসার আশঙ্কায় তাঁহারা এই ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়াছিলেন। মুসলিমগণ যখন ব্যাপক হারে শত্রুসেনাদের বন্দী করিতেছিলেন তখন রাসূলুল্লাহ (সা) সা'দ ইব্‌ন মুআয (রা)-এর মুখমণ্ডলে অসন্তুষ্টি ও বিরক্তির ভাব লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, আল্লাহ্র কসম, হে সাদ! মুসলিম বাহিনী যাহা করিতেছে মনে হয় উহা তুমি অপছন্দ করিতেছ। তিনি বলিলেন, হাঁ, আল্লাহর কসম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! মুশরিকদের বিরুদ্ধে এই প্রথম আল্লাহ তা'আলা যুদ্ধ সংঘটিত করিয়া দিয়াছেন। তাই মুশরিক সৈন্যগণকে বাঁচাইয়া রাখার পরিবর্তে হত্যা করিয়া ফেলাই আমার নিকট পছন্দনীয় ছিল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 শত্রুসেনাদের কতককে হত্যা করিতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিষেধাজ্ঞা

📄 শত্রুসেনাদের কতককে হত্যা করিতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিষেধাজ্ঞা


শত্রু সেনাদের সকলেই যে স্বেচ্ছায় ও সোৎসাহে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হইয়াছিল তাহা নহে। সকলেই যে ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করিত তাহাও নহে। এমনও অনেক লোক ছিল যাহারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাসূলুল্লাহ (স) ও মুসলমান দিগকে সাহায্য-সহযোগিতা করিয়াছিল। পরিস্থিতির শিকার হইয়া বা নেতৃবৃন্দের চাপে পড়িয়া অনিচ্ছা সত্ত্বেও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিয়াছিল। রাসূলুল্লাহ (স) এইসব লোককে হত্যা করিতে নিষেধ করেন। ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (স) সেই দিন তাঁহার সাহাবীদিগকে বলিয়া ছিলেন, আমি জানি যে, বানু হাশিমের কিছু লোক এবং অন্যান্যদিগকে জোর-জবরদস্তিমূলক তাহাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ঘর হইতে বাহির করা হইয়াছে। আমাদের সহিত যুদ্ধ করিতে তাহাদের কোনও প্রয়োজন নাই। তাই তোমাদের কেহ বানু হাশিমের কোনও লোকের মুখামুখী হইলে তাহাকে হত্যা করিবে না। আর যে আবুল বাখতারী ইব্‌ন হিশাম ইবনুল হারিছ ইব্‌ন আসাদের সাক্ষাত পাইবে সে যেন তাহাকে হত্যা না করে। কারণ তাহাকে জোর করিয়া আনা হইয়াছে। আর যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর চাচা আব্বাস ইব্‌ন আবদিল মুত্তালিবের সাক্ষাত পাইবে সে যেন তাহাকে হত্যা না করে। কারণ তাহাকেও জোর করিয়া আনা হইয়াছে। তখন আবূ হুযায়ফা ইব্‌ন উতবা ইবন রাবী'আ বলিলেন, আমরা কি আমাদের পিতা, পুত্র ও ভ্রাতাদের হত্যা করিব, আর আব্বাসকে ছাড়িয়া দিব? আল্লাহ্র কসম! আমি যদি তাহার সাক্ষাত পাই তবে অবশ্যই তরবারি দ্বারা তাহাকে হত্যা করিব। এই কথা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পৌছিলে তিনি উমার (রা)-কে বলিলেন, হে আবূ হাফস! (উমার বলেন, এই প্রথম তিনি আমাকে উপনামে সম্বোধন করিলেন) রাসূলাল্লাহ্র চাচার চেহারা তরবারি দ্বারা আঘাত করা হইবে। উমার (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে অনুমতি দিন আমি তরবারি দ্বারা তাহার গর্দান উড়াইয়া দেই। আল্লাহ্র কসম! সে মুনাফিক হইয়া গিয়াছে। আবু হুযায়ফা (রা) বলিলেন, সেই দিন আমি যাহা বলিয়াছিলাম তাহার দরুন স্বস্তি লাভ করিতে পারি নাই। সর্বদা আমি শংকিত ছিলাম যে, আমার এই উক্তি কি আমাকে শাহাদাতের মর্যাদা হইতে ফিরাইয়া দেয়? অতঃপর তিনি ইয়ামামার যুদ্ধে শহীদ হন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আবুল বাখতারীকে হত্যার ঘটনা

📄 আবুল বাখতারীকে হত্যার ঘটনা


আবুল বাখতারীকে রাসূলুল্লাহ (স) হত্যা করিতে নিষেধ করিয়াছিলেন। তাহার কিছু কারণ ইবন ইসহাক বর্ণনা করিয়াছেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আবুল বাখতারীকে হত্যা করিতে এইজন্য নিষেধ করেন যে, মক্কায় থাকিতে তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-কে কোনরূপ নির্যাতন করা হইতে বিরত থাকিতেন। তিনি তাঁহাকে কোনরূপ কষ্ট দিতেন না। তাহার পক্ষ হইতে এমন কোনও আচরণ প্রকাশ পায় নাই যাহা রাসূলুল্লাহ (স) অপছন্দ করেন। বানু হাশিম ও বানু মুত্তালিবকে বয়কট করিয়া যে পত্র প্রণয়ন করা হয় উহা ছিড়িয়া ফেলার উদ্যোগ গ্রহণকারীদের মধ্যে তিনি ছিলেন অগ্রগণ্য। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও আবুল বাখতারী নিহত হন। বলা যায় যে, এক রকম স্বেচ্ছায়ই তিনি নিহত হন।
তাহার হত্যার ঘটনার বিবরণ এই যে, আনসারদের মিত্র আল-মুজাযযির ইবন যিয়াদ আল-বালাবী যুদ্ধ ক্ষেত্রে আবুল বাখতারীর সাক্ষাত পাইয়া তাহাকে বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) তোমাকে হত্যা করিতে আমাদিগকে নিষেধ করিয়াছেন। আবুল বাخতারীর সহিত লায়ছ গোত্রের জুনাদা ইব্‌ন মুলায়হা নামে তাহার এক সঙ্গী ছিল, যে মক্কা হইতেই তাহার সহিত একসঙ্গে বাহির হইয়াছিল। আবুল বাখতারী বলিলেন, আর আমার সঙ্গীকে? মুজাযযির (রা) তাহাকে বলিলেন, না, আল্লাহর কসম! আমরা তোমার সঙ্গীকে ছাড়িব না। রাসুলুল্লাহ (স) কেবল তোমাকেই হত্যা না করার জন্য আমাদিগকে নির্দেশ দিয়াছেন। আবুল বাখতারী বলিলেন, না, আল্লাহ্র কসম! তাহা হইলে আমি ও সে একত্রে মৃত্যুবরণ করিব যাহাতে মক্কর মহিলাগণ আমার সম্পর্কে বলিতে না পারে যে, আমি জীবনের আশায় আমার সঙ্গীকে পরিত্যাগ করিয়াছি। আল-মুজাযযির-এর সহিত যুদ্ধে লিপ্ত হইবার সময় আবুল বাখতারী এই কবিতা আবৃত্তি করিয়াছিলেন:
لن يسلم ابن حرة زميله حتى يموت أو يرى سبيله. "স্বাধীন মহিলার পুত্র কখনও তাহার সঙ্গীকে (শত্রুর হাতে) সমর্পণ করে না, যতক্ষণ না সে মৃত্যুবরণ করে অথবা তাহার পথ দেখিয়া লয়।”
আর মুজাযযির (রা) আবুল বাখতারীকে হত্যা করার সময় এই কবিতা আবৃত্তি করেন:
اما جهلت أو نسيت نسبي + فاثبت النسبة اني من بلى الطاعنين برماح اليزني + والضاربين الكبش حتى ينحني بشر بيتم من ابوه البختري + او بشرن بمثلها منى بني انا الذى يقال اصلى من بلى + اطعن بالصعدة حتى تنثنى + وارزم للموت كارزام المرى واعبط القرن بعضب مشرفي فلا ترى مجذرا یفری فری
"তুমি কি আমার বংশ সম্পর্কে অজ্ঞ রহিয়াছ না ভুলিয়া গিয়াছ? তাহা হইলে সম্বন্ধটি ভাল করিয়া জানিয়া লও যে, আমি বালিয়্যি গোত্রের, যাহারা আল-ইয়াযানী বর্শা দ্বারা আঘাতকারী এবং যাহারা বকরীকে প্রহারকারী যতক্ষণ না উহা বাঁকা হইয়া যায়। আবুল বাখতারী যাহার পিতা, তাহাকে ইয়াতীম হওয়ার সুসংবাদ দাও অথবা আমার পক্ষ হইতে আমার পুত্রদিগকে অনুরূপ সুসংবাদ দাও। আমি সেই লোক যাহার গোড়া হইল বালিয়িয় বংশ। আমি বর্শা দ্বারা আঘাত করি উহা বাঁকা হওয়া পর্যন্ত। আমি আমার প্রতিদ্বন্দ্বীকে হত্যা করি ধারালো মাশরিফী তরবারি দ্বারা। আমি মৃত্যুর জন্য ক্রন্দন করি কষ্টের সহিত দোহনকৃত উষ্ট্রীর ক্রন্দনের ন্যায়। তাই তুমি মুজাযযিরকে কোনও অদ্ভুত রকমের কাজ করিতে দেখিবে না।"
অতঃপর মুজাযযির রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট গিয়া বলিলেন, সেই সত্তার কসম, যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করিয়াছেন! আমি তাহাকে বন্দী করিয়া আপনার নিকট লইয়া আসার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়াছি। কিন্তু সে আমার সহিত যুদ্ধ করা ব্যতীত আর কিছুতেই সম্মত হয় নাই। অবশেষে আমি তাহার সহিত যুদ্ধে লিপ্ত হইয়াছি। অতঃপর আমি তাহাকে হত্যা করিয়াছি।
কেহ কেহ বলেন যে, আবুল ইয়াসার (রা) তাহাকে হত্যা করিয়াছেন। তবে অধিকাংশ সীরাতবিদের মতে আল-মুজাযয্যির (রা)-ই তাহাকে হত্যা করেন। ইব্‌ন সায়্যিদিন নাস বলেন, নিঃসন্দেহে আবূ দাউদ আল-মাযিনী তাহাকে হত্যা করিয়াছেন। আবুল বাখতারীর তরবারি আবূ দাউদ আল-মাযিনী (রা)-এর পুত্রদের নিকট রক্ষিত ছিল, যাহা তাহার কোন এক পুত্র আবুল বাখতারীর পুত্রের নিকট বিক্রয় করেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00