📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 যুদ্ধক্ষেত্র হইতে ইবলীসের পলায়ন ও আবূ জাহলের সান্ত্বনাবাণী

📄 যুদ্ধক্ষেত্র হইতে ইবলীসের পলায়ন ও আবূ জাহলের সান্ত্বনাবাণী


যুদ্ধক্ষেত্র হইতে ইবলীসের পলায়ন ও আবূ জাহলের সান্ত্বনাবাণী
কুরায়শগণ যুদ্ধের জন্য রওয়ানা হইলে ইবলীস পথিমধ্যে বাক্স গোত্রের নেতা সুরাকা ইবন মালিকের আকৃতি ধারণ করিয়া তাহাদের সঙ্গ লইয়াছিল এবং বিভিন্ন রকমের আশ্বাসবাণী শুনাইতেছিল। সে তাহাদিগকে বলিয়াছিল:
لا غَالِبَ لَكُمُ الْيَوْمَ مِنَ النَّاسِ وَإِنِّي جَارٌ لَكُمْ.
"আজ মানুষের মধ্যে কেহই তোমাদের উপর বিজয়ী হইবে না। আমি তোমাদের পার্শ্বেই থাকিব" (৮:৪৮)।
অতঃপর যুদ্ধক্ষেত্রে সে যখন ফেরেশতাদের ভূমিকা ও কাফিরদের প্রতি তাহাদের আক্রমণের ভয়ানক অবস্থা দেখিল তখন তাহার হস্ত ছিল এক মুশরিকের হাতে ধরা অবস্থায়। সে এক ঝট্কায় নিজের হাত ছাড়াইয়া লইয়া ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটিতে লাগিল। তখন সেই লোকটি এবং অন্যান্য মুশরিক সৈন্য তাহাকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিতে লাগিল, "কোথায় যাইতেছ হে সুরাকা। তুমি না বলিয়াছিলে, তুমি আমাদের পার্শ্বেই থাকিবে, আমাদের হইতে বিচ্ছিন্ন হইবে না!" তখন সে বলিল,
إِنِّي بَرِيقٌ مِّنْكُمْ إِنِّي أَرَى مَالَا تَرَوْنَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ وَاللَّهُ شَدِيدُ الْعِقَابِ.
"তোমাদের সহিত আমার কোনও সম্পর্ক রহিল না, তোমরা যাহা দেখিতে পাও না আমি উহা দেখিতেছি। আমি আল্লাহকে ভয় করি, আর আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর" (৮:৪৮)।
তখন আল-হারিছ ইব্‌ন হিশাম তাহাকে সুরাকা মনে করিয়া ধরিয়া ফেলিল। ইবলীস তখন হারিছের বুকে ঘুষি মারিলে সে মাটিতে পড়িয়া গেল। এই সুযোগে ইবলীস আর ডানে-বামে ও অগ্রে-পশ্চাতে ভ্রূক্ষেপ না করিয়া সোজা গিয়া সমুদ্রের মধ্যে পড়িল এবং উভয় হস্ত উত্তোলন করিয়া বলিতে লাগিল, হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমার প্রতি যে অঙ্গীকার করিয়াছিলে উহা পূরণ কর। হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট আমার প্রতি তোমার বিশেষ দৃষ্টি কামনা করিতেছি।" সে ভয় পাইতেছিল যে, যুদ্ধ বুঝি সম্প্রসারিত হইয়া তাহার নিকট পর্যন্ত গিয়া পৌঁছিবে।
আবূ জাহল সম্মুখে অগ্রসর হইয়া বলিল, ওহে লোকসকল! সুরাকা ইবন মালিকের অপদস্থ অবস্থা তোমাদিগকে যেন ঘাবড়াইয়া না দেয়। কারণ সে ছিল মুহাম্মাদের সহিত অঙ্গীকারাবদ্ধ। আর শায়ba, উতবা ও আল-ওয়ালীদের হত্যাও যেন তোমাদিগকে বিচলিত না করে। কারণ তাহারা বেশী তাড়াহুড়া করিয়াছিল। আল-লাত ও আল-উষ্যার কসম! মুহাম্মাদ ও তাহার সঙ্গীদিগকে রশি দ্বারা না বাঁধিয়া আমরা ফেরত যাইব না। তোমরা তাহাদিগকে জীবিত পাকড়াও কর, যাহাতে আমরা তাহাদেরকে তোমাদিগকে ত্যাগ করা ও লাত-'উয্যাক অবমাননা করা প্রভৃতি অপকর্মের প্রতিফল বুঝাইয়া দিতে পারি। এই সময় আবূ জাহল কবিতা আবৃত্তি করিতেছিল:
ما تنقم الحرب الشموس منى + بازل عامين حديث سنی لمثل هذا ولدتني أمي
"উজ্জ্বল আলোয় উদ্ভাসিত যুদ্ধক্ষেত্র, দুই বৎসর বয়স্ক নবীন উট আমার নিকট হইতে প্রতিশোধ গ্রহণ করিবে না। এই ধরনের কাজের জন্যই আমার মাতা আমাকে জন্মদান করিয়াছে”।
বর্ণিত আছে যে, কুরায়শগণ পরে সুরাকাকে মক্কায় দেখিয়া তাহাকে বলিয়াছিল, হে সুরাকা! তুমি যুদ্ধের কাতার ভঙ্গ করিয়াছ এবং আমাদের মধ্যে পরাজয়ের সূত্রপাত করিয়াছ। তিনি বলেন, আল্লাহ্র কসম! তোমাদের বিষয়ে শুরু হইতে পরাজিত হওয়া পর্যন্ত আমি কিছুই জানি না। আমি উপস্থিতও ছিলাম না, জানিও না কিছু। কিন্তু মুশরিকগণ উহা বিশ্বাস করিল না। অতঃপর এক সময় তাহারা ইসলাম গ্রহণ করিল এবং এই ব্যাপারে আল্লাহ যাহা অবতীর্ণ করিয়াছেন উহা শুনিল। তখন তাহারা জানিতে পারিল যে, ইবলীস তাহার আকৃতি ধারণ করিয়াছিল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলিম বাহিনীর বিশেষ সংকেত

📄 যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলিম বাহিনীর বিশেষ সংকেত


যুদ্ধক্ষেত্রে পরস্পরকে চিনিবার জন্য রাসূলুল্লাহ (স) বিভিন্ন গোত্রের জন্য বিভিন্ন সংকেত নির্ধারণ করিয়া দেন। আবদুল্লাহ ইবনুষ যুবায়র (রা) সূত্রে বর্ণিত যে, বদর যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (স) মুহাজিরদের জন্য 'ইয়া বানী আবদির রাহমান', খাযরাজ গোত্রের জন্য 'ইয়া বানী আবদিল্লাহ' ও আওস গোত্রের জন্য 'ইয়া বানী উবায়দিল্লাহ' সংকেত নির্ধারণ করিয়া দেন। এক বর্ণনামতে মুসলমানদের সকলের সংকেত ছিল أمت يا منصور "হে সাহায্যপ্রাপ্ত ব্যক্তি! মারিয়া ফেল” (ইবন সাদ, তাবাকাত, ২খ., পৃ. ১৪)। যায়দ ইব্‌ন আলীর বর্ণনামতে ইহাই ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর সংকেত। ইব্‌ন হিশামের বর্ণনামতে বদর যুদ্ধের দিন সাহাবায়ে কিরামের সংকেত ছিল 'আহাদুন আহাদ'। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার ঘোড়ার নামকরণ করেন খায়লুল্লাহ তথা আল্লাহর ঘোড়া।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 শত্রুসৈন্যদেরকে ধরপাকড় এবং সা'দ ইব্‌ন মু'আয-এর অসন্তুষ্টি

📄 শত্রুসৈন্যদেরকে ধরপাকড় এবং সা'দ ইব্‌ন মু'আয-এর অসন্তুষ্টি


রাসূলুল্লাহ (স) যুদ্ধ শুরু করিবার নির্দেশ দেওয়ার পর এবং কাফিরদের প্রতি কংকর নিক্ষেপ করিবার পর কাফিরগণ পরাজিত হইতে শুরু করিল। রাসূলুল্লাহ (স) পুনরায় আরীশে প্রবেশ করিলেন। তাঁহার সঙ্গে ছিলেন আবূ বাকর (রা)। সা'দ ইব্‌ন মু'আয (রা) ও তাঁহার সঙ্গী আরও কিছু আনসার তরবারি সজ্জিত অবস্থায় আরীশের দরজায় দাঁড়াইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-কে প্রহরা দিতে লাগিলেন। শত্রুসৈন্যদের পুনরায় ফিরিয়া আসার আশঙ্কায় তাঁহারা এই ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়াছিলেন। মুসলিমগণ যখন ব্যাপক হারে শত্রুসেনাদের বন্দী করিতেছিলেন তখন রাসূলুল্লাহ (সা) সা'দ ইব্‌ন মুআয (রা)-এর মুখমণ্ডলে অসন্তুষ্টি ও বিরক্তির ভাব লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, আল্লাহ্র কসম, হে সাদ! মুসলিম বাহিনী যাহা করিতেছে মনে হয় উহা তুমি অপছন্দ করিতেছ। তিনি বলিলেন, হাঁ, আল্লাহর কসম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! মুশরিকদের বিরুদ্ধে এই প্রথম আল্লাহ তা'আলা যুদ্ধ সংঘটিত করিয়া দিয়াছেন। তাই মুশরিক সৈন্যগণকে বাঁচাইয়া রাখার পরিবর্তে হত্যা করিয়া ফেলাই আমার নিকট পছন্দনীয় ছিল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 শত্রুসেনাদের কতককে হত্যা করিতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিষেধাজ্ঞা

📄 শত্রুসেনাদের কতককে হত্যা করিতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিষেধাজ্ঞা


শত্রু সেনাদের সকলেই যে স্বেচ্ছায় ও সোৎসাহে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হইয়াছিল তাহা নহে। সকলেই যে ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করিত তাহাও নহে। এমনও অনেক লোক ছিল যাহারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাসূলুল্লাহ (স) ও মুসলমান দিগকে সাহায্য-সহযোগিতা করিয়াছিল। পরিস্থিতির শিকার হইয়া বা নেতৃবৃন্দের চাপে পড়িয়া অনিচ্ছা সত্ত্বেও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিয়াছিল। রাসূলুল্লাহ (স) এইসব লোককে হত্যা করিতে নিষেধ করেন। ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (স) সেই দিন তাঁহার সাহাবীদিগকে বলিয়া ছিলেন, আমি জানি যে, বানু হাশিমের কিছু লোক এবং অন্যান্যদিগকে জোর-জবরদস্তিমূলক তাহাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ঘর হইতে বাহির করা হইয়াছে। আমাদের সহিত যুদ্ধ করিতে তাহাদের কোনও প্রয়োজন নাই। তাই তোমাদের কেহ বানু হাশিমের কোনও লোকের মুখামুখী হইলে তাহাকে হত্যা করিবে না। আর যে আবুল বাখতারী ইব্‌ন হিশাম ইবনুল হারিছ ইব্‌ন আসাদের সাক্ষাত পাইবে সে যেন তাহাকে হত্যা না করে। কারণ তাহাকে জোর করিয়া আনা হইয়াছে। আর যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর চাচা আব্বাস ইব্‌ন আবদিল মুত্তালিবের সাক্ষাত পাইবে সে যেন তাহাকে হত্যা না করে। কারণ তাহাকেও জোর করিয়া আনা হইয়াছে। তখন আবূ হুযায়ফা ইব্‌ন উতবা ইবন রাবী'আ বলিলেন, আমরা কি আমাদের পিতা, পুত্র ও ভ্রাতাদের হত্যা করিব, আর আব্বাসকে ছাড়িয়া দিব? আল্লাহ্র কসম! আমি যদি তাহার সাক্ষাত পাই তবে অবশ্যই তরবারি দ্বারা তাহাকে হত্যা করিব। এই কথা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পৌছিলে তিনি উমার (রা)-কে বলিলেন, হে আবূ হাফস! (উমার বলেন, এই প্রথম তিনি আমাকে উপনামে সম্বোধন করিলেন) রাসূলাল্লাহ্র চাচার চেহারা তরবারি দ্বারা আঘাত করা হইবে। উমার (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে অনুমতি দিন আমি তরবারি দ্বারা তাহার গর্দান উড়াইয়া দেই। আল্লাহ্র কসম! সে মুনাফিক হইয়া গিয়াছে। আবু হুযায়ফা (রা) বলিলেন, সেই দিন আমি যাহা বলিয়াছিলাম তাহার দরুন স্বস্তি লাভ করিতে পারি নাই। সর্বদা আমি শংকিত ছিলাম যে, আমার এই উক্তি কি আমাকে শাহাদাতের মর্যাদা হইতে ফিরাইয়া দেয়? অতঃপর তিনি ইয়ামামার যুদ্ধে শহীদ হন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00