📄 ঘোরতর যুদ্ধ শুরু
মল্লযুদ্ধ সমাপ্ত হইবার পর রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবায়ে কিরামকে জিহাদে উদ্বুদ্ধ করিয়া লড়াই শানিত ও জোরদার করার নির্দেশ দিলেন। সাহাবায়ে কিরাম বীরত্বের সহিত শত্রুদের উপর ঝাঁপাইয়া পড়িলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-কে নিজেদের মধ্যে দেখিয়া তাহারা আরও প্রেরণা লাভ করিতেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) নিজেও বীরত্বের সহিত যুদ্ধ করিতেছিলেন। তাঁহার সঙ্গে আবূ বাকর (রা)-ও। তাঁহারা আরীশে আল্লাহর দরবারে যেমন বিনয় সহকারে দু'আ করিতেছিলেন তেমনি প্রত্যক্ষ রণাঙ্গনেও আসিয়া যুদ্ধ করিতেছিলেন এবং মুসলমানদিগকে যুদ্ধের প্রতি অনুপ্রাণিত করিতেছিলেন। আলী (রা) বলেন, বদর যুদ্ধের দিন যখন প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হইল তখন রাসূলুল্লাহ (স) আমাদের আগে আগে ছিলেন। আমরা তাঁহার আড়ালে ছিলাম। সেই দিন তিনি সকলের চেয়ে প্রচণ্ডভাবে যুদ্ধ করিতেছিলেন। আমাদের কেহই তদপেক্ষা মুশরিকদের নিকটবর্তী ছিল না।
ইমাম আহমাদ (র)-এর বরাতে ইউসুফ সালিহী তাঁহার সুবুলুল হুদা গ্রন্থে ইহা ছাড়া আরও উল্লেখ করিয়াছেন যে, বদরের দিন আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর দ্বারা আত্মরক্ষা করিতেছিলেন। তিনি বলিতেছিলেন, سَيُهْزَمُ الْجَمْعُ وَيُولُونَ الدُّبْرُ "এই দল তো শীঘ্রই পরাজিত হইবে এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিবে" (৫৪ঃ ৪৫)। এক পর্যায়ে তিনি একমুষ্ঠি কঙ্করযুক্ত মাটি উঠাইয়া شاهت الوجوه (মুখমণ্ডল গুলি কদাকার হউক) বলিয়া ছুড়িয়া মারিলেন। ফলে এমন কোন কাফির অবশিষ্ট রহিল না যাহার চোখে, মুখে ও নাকে গিয়া উহা না পৌঁছিল। ফলে তাহারা চক্ষু মুছিতে লাগিল। আর এই সুযোগে মুসলিমগণ তাহাদের মস্তক দ্বিখণ্ডিত করিয়া ফেলিতে লাগিল। ইহার কথাই বলা হইয়াছে আল-কুরআনের এই আয়াতে : وَمَا رَمَيْتَ إِذْ رَمَيْتَ وَلَكِنَّ اللهَ رَمَى "এবং তুমি যখন নিক্ষেপ করিয়াছিলে তখন তুমি নিক্ষেপ কর নাই, আল্লাহ্ই নিক্ষেপ করিয়াছিলেন" (৮: ১৭)।
বিভিন্ন রিওয়ায়াত দ্বারা বুঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (স) কাফিরদের প্রতি কংকরই নিক্ষেপ করিয়াছিলেন। আবদুর রহমান ইব্ن যায়দ ইব্ন আসলাম-এর বর্ণনামতে, তিনি তিনটি কংকর লইয়া একটি শত্রুবাহিনীর ডাইনদিকে একটি বামদিকে এবং আর একটি তাহাদের সম্মুখভাগে নিক্ষেপ করিলেন এবং বলিলেনঃ شاهت الوجوه ইহার ফলে তাহারা পরাজিত হইল।
হাকীম ইব্ন হিযাম (রা), যিনি পরে মুসলমান হন, বলেন, বদরের দিন আমরা উভয় দল যখন মুখামুখী হইয়া যুদ্ধে লিপ্ত হইলাম তখন আমি তস্তরিতে পাথর পড়িলে যেইরূপ শব্দ হয় সেইরূপ একটি শব্দ শুনিতে পাইলাম যাহা আকাশ হইতে মাটিতে পড়িল। আর রাসুলুল্লাহ (স) একমুষ্টি মাটি উঠাইয়া নিক্ষেপ করিলেন, ফলে আমরা কাফিরগণ পরাজিত হইলাম।
নাওফাল ইব্ن মু'আবিয়া আদ-দীলী বলেন, আমরা বদর যুদ্ধে পরাজিত হইয়াছিলাম, কারণ আমরা আমাদের অন্তরে এবং আমাদের পিছনে তস্তরিতে পাথর পতনের ন্যায় একটি শব্দ শুনিতে পাইয়াছিলাম। ইহা আমাদের সবচেয়ে ভীতির কারণ হইয়াছিল।
অতঃপর অল্প সময়ের মধ্যেই যুদ্ধের গতি পাল্টাইয়া গেল। মুসলমানদের বিজয় সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হইয়া উঠিল। বিশিষ্ট কুরায়শ নেতাগণ নিহত হইল। অবশেষে মুসলমানগণ শত্রু সৈন্যদিগকে ব্যাপকভাবে বন্দী করিতে শুরু করিল। অধিকাংশ কাফিরই রণক্ষেত্র হইতে পলায়ন করিয়া প্রাণ রক্ষা করিল। এই যুদ্ধে ৭০জন কাফির নিহত এবং ৭০জন বন্দী হয়। আর মুসলমানদের পক্ষে ১৪জন শাহাদাত লাভ করেন, তন্মধ্যে ৬ জন মুহাজির এবং ৮জন আনসার।
📄 যুদ্ধক্ষেত্র হইতে ইবলীসের পলায়ন ও আবূ জাহলের সান্ত্বনাবাণী
যুদ্ধক্ষেত্র হইতে ইবলীসের পলায়ন ও আবূ জাহলের সান্ত্বনাবাণী
কুরায়শগণ যুদ্ধের জন্য রওয়ানা হইলে ইবলীস পথিমধ্যে বাক্স গোত্রের নেতা সুরাকা ইবন মালিকের আকৃতি ধারণ করিয়া তাহাদের সঙ্গ লইয়াছিল এবং বিভিন্ন রকমের আশ্বাসবাণী শুনাইতেছিল। সে তাহাদিগকে বলিয়াছিল:
لا غَالِبَ لَكُمُ الْيَوْمَ مِنَ النَّاسِ وَإِنِّي جَارٌ لَكُمْ.
"আজ মানুষের মধ্যে কেহই তোমাদের উপর বিজয়ী হইবে না। আমি তোমাদের পার্শ্বেই থাকিব" (৮:৪৮)।
অতঃপর যুদ্ধক্ষেত্রে সে যখন ফেরেশতাদের ভূমিকা ও কাফিরদের প্রতি তাহাদের আক্রমণের ভয়ানক অবস্থা দেখিল তখন তাহার হস্ত ছিল এক মুশরিকের হাতে ধরা অবস্থায়। সে এক ঝট্কায় নিজের হাত ছাড়াইয়া লইয়া ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটিতে লাগিল। তখন সেই লোকটি এবং অন্যান্য মুশরিক সৈন্য তাহাকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিতে লাগিল, "কোথায় যাইতেছ হে সুরাকা। তুমি না বলিয়াছিলে, তুমি আমাদের পার্শ্বেই থাকিবে, আমাদের হইতে বিচ্ছিন্ন হইবে না!" তখন সে বলিল,
إِنِّي بَرِيقٌ مِّنْكُمْ إِنِّي أَرَى مَالَا تَرَوْنَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ وَاللَّهُ شَدِيدُ الْعِقَابِ.
"তোমাদের সহিত আমার কোনও সম্পর্ক রহিল না, তোমরা যাহা দেখিতে পাও না আমি উহা দেখিতেছি। আমি আল্লাহকে ভয় করি, আর আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর" (৮:৪৮)।
তখন আল-হারিছ ইব্ন হিশাম তাহাকে সুরাকা মনে করিয়া ধরিয়া ফেলিল। ইবলীস তখন হারিছের বুকে ঘুষি মারিলে সে মাটিতে পড়িয়া গেল। এই সুযোগে ইবলীস আর ডানে-বামে ও অগ্রে-পশ্চাতে ভ্রূক্ষেপ না করিয়া সোজা গিয়া সমুদ্রের মধ্যে পড়িল এবং উভয় হস্ত উত্তোলন করিয়া বলিতে লাগিল, হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমার প্রতি যে অঙ্গীকার করিয়াছিলে উহা পূরণ কর। হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট আমার প্রতি তোমার বিশেষ দৃষ্টি কামনা করিতেছি।" সে ভয় পাইতেছিল যে, যুদ্ধ বুঝি সম্প্রসারিত হইয়া তাহার নিকট পর্যন্ত গিয়া পৌঁছিবে।
আবূ জাহল সম্মুখে অগ্রসর হইয়া বলিল, ওহে লোকসকল! সুরাকা ইবন মালিকের অপদস্থ অবস্থা তোমাদিগকে যেন ঘাবড়াইয়া না দেয়। কারণ সে ছিল মুহাম্মাদের সহিত অঙ্গীকারাবদ্ধ। আর শায়ba, উতবা ও আল-ওয়ালীদের হত্যাও যেন তোমাদিগকে বিচলিত না করে। কারণ তাহারা বেশী তাড়াহুড়া করিয়াছিল। আল-লাত ও আল-উষ্যার কসম! মুহাম্মাদ ও তাহার সঙ্গীদিগকে রশি দ্বারা না বাঁধিয়া আমরা ফেরত যাইব না। তোমরা তাহাদিগকে জীবিত পাকড়াও কর, যাহাতে আমরা তাহাদেরকে তোমাদিগকে ত্যাগ করা ও লাত-'উয্যাক অবমাননা করা প্রভৃতি অপকর্মের প্রতিফল বুঝাইয়া দিতে পারি। এই সময় আবূ জাহল কবিতা আবৃত্তি করিতেছিল:
ما تنقم الحرب الشموس منى + بازل عامين حديث سنی لمثل هذا ولدتني أمي
"উজ্জ্বল আলোয় উদ্ভাসিত যুদ্ধক্ষেত্র, দুই বৎসর বয়স্ক নবীন উট আমার নিকট হইতে প্রতিশোধ গ্রহণ করিবে না। এই ধরনের কাজের জন্যই আমার মাতা আমাকে জন্মদান করিয়াছে”।
বর্ণিত আছে যে, কুরায়শগণ পরে সুরাকাকে মক্কায় দেখিয়া তাহাকে বলিয়াছিল, হে সুরাকা! তুমি যুদ্ধের কাতার ভঙ্গ করিয়াছ এবং আমাদের মধ্যে পরাজয়ের সূত্রপাত করিয়াছ। তিনি বলেন, আল্লাহ্র কসম! তোমাদের বিষয়ে শুরু হইতে পরাজিত হওয়া পর্যন্ত আমি কিছুই জানি না। আমি উপস্থিতও ছিলাম না, জানিও না কিছু। কিন্তু মুশরিকগণ উহা বিশ্বাস করিল না। অতঃপর এক সময় তাহারা ইসলাম গ্রহণ করিল এবং এই ব্যাপারে আল্লাহ যাহা অবতীর্ণ করিয়াছেন উহা শুনিল। তখন তাহারা জানিতে পারিল যে, ইবলীস তাহার আকৃতি ধারণ করিয়াছিল।
📄 যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলিম বাহিনীর বিশেষ সংকেত
যুদ্ধক্ষেত্রে পরস্পরকে চিনিবার জন্য রাসূলুল্লাহ (স) বিভিন্ন গোত্রের জন্য বিভিন্ন সংকেত নির্ধারণ করিয়া দেন। আবদুল্লাহ ইবনুষ যুবায়র (রা) সূত্রে বর্ণিত যে, বদর যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (স) মুহাজিরদের জন্য 'ইয়া বানী আবদির রাহমান', খাযরাজ গোত্রের জন্য 'ইয়া বানী আবদিল্লাহ' ও আওস গোত্রের জন্য 'ইয়া বানী উবায়দিল্লাহ' সংকেত নির্ধারণ করিয়া দেন। এক বর্ণনামতে মুসলমানদের সকলের সংকেত ছিল أمت يا منصور "হে সাহায্যপ্রাপ্ত ব্যক্তি! মারিয়া ফেল” (ইবন সাদ, তাবাকাত, ২খ., পৃ. ১৪)। যায়দ ইব্ন আলীর বর্ণনামতে ইহাই ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর সংকেত। ইব্ন হিশামের বর্ণনামতে বদর যুদ্ধের দিন সাহাবায়ে কিরামের সংকেত ছিল 'আহাদুন আহাদ'। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার ঘোড়ার নামকরণ করেন খায়লুল্লাহ তথা আল্লাহর ঘোড়া।
📄 শত্রুসৈন্যদেরকে ধরপাকড় এবং সা'দ ইব্ন মু'আয-এর অসন্তুষ্টি
রাসূলুল্লাহ (স) যুদ্ধ শুরু করিবার নির্দেশ দেওয়ার পর এবং কাফিরদের প্রতি কংকর নিক্ষেপ করিবার পর কাফিরগণ পরাজিত হইতে শুরু করিল। রাসূলুল্লাহ (স) পুনরায় আরীশে প্রবেশ করিলেন। তাঁহার সঙ্গে ছিলেন আবূ বাকর (রা)। সা'দ ইব্ন মু'আয (রা) ও তাঁহার সঙ্গী আরও কিছু আনসার তরবারি সজ্জিত অবস্থায় আরীশের দরজায় দাঁড়াইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-কে প্রহরা দিতে লাগিলেন। শত্রুসৈন্যদের পুনরায় ফিরিয়া আসার আশঙ্কায় তাঁহারা এই ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়াছিলেন। মুসলিমগণ যখন ব্যাপক হারে শত্রুসেনাদের বন্দী করিতেছিলেন তখন রাসূলুল্লাহ (সা) সা'দ ইব্ন মুআয (রা)-এর মুখমণ্ডলে অসন্তুষ্টি ও বিরক্তির ভাব লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, আল্লাহ্র কসম, হে সাদ! মুসলিম বাহিনী যাহা করিতেছে মনে হয় উহা তুমি অপছন্দ করিতেছ। তিনি বলিলেন, হাঁ, আল্লাহর কসম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! মুশরিকদের বিরুদ্ধে এই প্রথম আল্লাহ তা'আলা যুদ্ধ সংঘটিত করিয়া দিয়াছেন। তাই মুশরিক সৈন্যগণকে বাঁচাইয়া রাখার পরিবর্তে হত্যা করিয়া ফেলাই আমার নিকট পছন্দনীয় ছিল।