📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ফেরেশতাদের অবতরণ ও যুদ্ধে অংশগ্রহণ

📄 ফেরেশতাদের অবতরণ ও যুদ্ধে অংশগ্রহণ


ফেরেশতাদের অবতরণ ও যুদ্ধে অংশগ্রহণ: বদর যুদ্ধে মুসলমানদের সাহায্যার্থে আল্লাহ তাআলা ফেরেশতা প্রেরণ করেন। তাহারা অবতরণ করিয়া কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। কুরআন ও হাদীছে ইহার বিশদ বর্ণনা আসিয়াছে। পূর্বেই বর্ণনা করা হইয়াছে যে, আরীশে অবস্থানকালে রাসূলুল্লাহ (স) মাথা উঠাইয়া আবূ বাকর (রা)-কে সুসংবাদ দিয়া বলিয়াছিলেন, আল্লাহর সাহায্য আসিয়া গিয়াছে। এই যে জিবরীল ঘোড়ার লাগাম ধরিয়া হাঁকাইয়া আসিতেছে। কুরআন কারীমে এই ব্যাপারে সুস্পষ্ট বর্ণনা আসিয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
إِذْ تَسْتَغِيْثُونَ رَبَّكُمْ فَاسْتَجَابَ لَكُمْ أَنِّي مُمِدُّكُمْ بِأَلْفِ مِنَ الْمَلَائِكَةِ مُرْدِفِينَ.
"স্মরণ কর, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করিয়াছিলে। তিনি উহা কবুল করিয়াছিলেন এবং বলিয়াছিলেন, আমি তোমাদিগকে সাহায্য করিব এক সহস্র ফেরেশতা দ্বারা যাহারা একের পর এক আসিবে" (৮:৯)।
এই আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হইয়াছে যে, এই যুদ্ধে এক হাজার ফেরেশতা অবতরণ করিয়াছিল। ইব্‌ন আব্বাস (রা)-এর এক বর্ণনায় ইহারই সমর্থন পাওয়া যায়। তিনি বলেন, আল্লাহ তাঁহার নবী ও মুমিনদিগকে এক হাজার ফেরেশতা দ্বারা সাহায্য করেন। ডানদিকে পাঁচ শত ফেরেশতার নেতৃত্বে ছিলেন জিবরীল (আ) এবং বামদিকের পাঁচ শত ফেরেশতার নেতৃত্বে ছিলেন মীকাঈল (আ)। ইহাই প্রসিদ্ধ। অন্য এক আয়াতে তিন হাজার ফেরেশতার কথা বলা হইয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
إِذْ تَقُولُ لِلْمُؤْمِنِينَ أَلَنْ يَكْفِيَكُمْ أَنْ يُمِدَّكُمْ رَبُّكُمْ بِثَلُثَةِ أَلْفِ مِّنَ الْمَلَئِكَةِ مُنْزَلِينَ. "স্মরণ কর, যখন তুমি মুমিনগণকে বলিতেছিলে, ইহা কি তোমাদের জন্য যথেষ্ট নয় যে, তোমাদের প্রতিপালক প্রেরিত তিন সহস্র ফেরেশতা দ্বারা তোমাদিগকে সহায়তা করিবেন" (৩৪ : ১২৪)!'
আলী (রা) হইতে বর্ণিত একটি রিওয়ায়াতে ইহার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। তিনি বলেন, জিবরীল (আ) এক হাজার ফেরেশতাসহ রাসূলুল্লাহ (স)-এর ডানদিকে অবতরণ করেন। সেইদিকে ছিলেন আবূ বাকর (রা), আর মীকাঈল (আ) এক হাজার ফেরেশতাসহ রাসূলুল্লাহ (সা)-এর বামদিকে অবতরণ করেন, সেইদিকে ছিলাম আমি। ইমাম বায়হাকী (র) আলী (রা) হইতে উক্ত রিওয়ায়াতে আরও বর্ণনা করেন যে, ইসরাফীল (আ)-ও এক হাজার ফেরেশতাসহ অবতরণ করেন।
আলী (রা) হইতে অপর এক বর্ণনায় আছে যে, তিনি বলেন, আমি বদরের কূপের নিকট বিচরণ করিতেছিলাম। তখন এমন প্রবল বেগে এক বায়ু প্রবাহিত হইল যাহা ইতোপূর্বে আমি আর কখনও দেখি নাই। অতঃপর তাহা চলিয়া গেল। আবার প্রবল বেগে বায়ু প্রবাহিত হইল, যাহা আমি কখনও দেখি নাই পূর্বের ব্যতীত। ইহার পর পুনরায় প্রবল বেগে বায়ু প্রবাহিত হইল। প্রথমবারের বায়ু ছিলেন জিবরীল (আ), যিনি এক হাজার ফেরেশতাসহ অবতরণ করেন। দ্বিতীয়বারের বায়ু মীকাঈল (আ), যিনি এক হাজার ফেরেশতাসহ রাসূলুল্লাহ (স)-এর ডানে অবতরণ করেন। আবূ বাকর (রা) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর ডানদিকে, আর তৃতীয় বায়ু ছিলেন ইসরাফীল (আ), তিনি এক হাজার ফেরেশতাসহ রাসূলুল্লাহ (স)-এর বামদিকে অবতরণ করেন। আমি ছিলাম তাঁহার বামদিকে। আল্লাহ তাঁহার শত্রুদিগকে পরাজিত করার পর রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে তাঁহার ঘোড়ায় তুলিয়া নিলেন। ঘোড়াটি লম্ফঝম্ফ করিলে আমি উহার ঘাড়ের উপর পড়িয়া গেলাম, অতঃপর আমার প্রতিপালককে ডাকিলাম। তিনি আমাকে রক্ষা করিলেন। আমি বগলে আঘাত পাইলাম।
মুহাম্মাদ ইবন উমার আল-আসলামী হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) সেই দিন বলিলেন, এই হইল জিবরীল, বায়ু হাঁকাইয়া লইয়া যাইতেছে। সে যেন দিহয়াতুল কালবী। আমাকে পূর্বের হাওয়া দ্বারা সাহায্য করা হইয়াছে। আর আদ জাতি পশ্চিমের হাওয়ায় ধ্বংস হইয়াছে।
ফেরেশতাগণ যুদ্ধ করিবার এবং শত্রুদিগকে আঘাত করিবার পদ্ধতি জানিতেন না বিধায় আল্লাহ তা'আলা তাহাদিগকে শত্রুদের ঘাড়ের উপর এবং প্রতি হাড়ের জোড়ায় আঘাত করিবার নির্দেশ দেন। এই সম্পর্কে কুরআন কারীমে উল্লিখিত হইয়াছেঃ (৮ : ১২) إِذْ يُوْحِي رَبُّكَ إِلَى الْمَلَائِكَةِ أَنِّي مَعَكُمْ فَثَبِّتُوا الَّذِيْنَ آمَنُوا سَأُلْقِي فِي قُلُوْبِ الَّذِيْنَ كَفَرُوا الرُّعْبَ فَاضْرِبُوْا فَوْقَ الْأَعْنَاقِ وَاضْرِبُوْا مِنْهُمْ كُلَّ بَنَانِ: "স্মরণ কর, তোমাদের প্রতিপালক ফেরেশতাদের প্রতি প্রত্যাদেশ করেন, আমি তোমাদের সহিত আছি। সুতরাং তোমরা মুমিনগণকে অবিচলিত রাখো। যাহারা কুফরী করে আমি তাহাদের হৃদয়ে ভীতির সঞ্চার করিব। সুতরাং তোমরা তাহাদের স্কন্ধে এবং আঘাত কর তাহাদের প্রত্যেক আঙ্গুলের অগ্রভাগ" (৮ : ১২)।
ফেরেশতাগণ ছিল পুরুষের আকৃতিতে সাদা-কালো মিশ্রিত বর্ণের ঘোড়ায় আরোহী সাদা পোশাক পরিহিত। তাঁহাদের মস্তকে ছিল সাদা পাগড়ী, যাহার প্রান্তভাগ উভয় কাঁধের মধ্যখানে ঝুলন্ত ছিল।
ইব্‌ন আব্বাস (রা) বলেন, বদর যুদ্ধে ফেরেশতাদের পাগড়ী ছিল সাদা, আর হুনায়নের যুদ্ধে ছিল সবুজ। তাঁহার অপর এক বর্ণনায় আছে যে, বদর যুদ্ধে ফেরেশতাদের ছিল কালো পাগড়ী, আর হুনায়নের যুদ্ধে সবুজ। তবে শেষোক্ত বর্ণনাটির সনদ খুবই দুর্বল বিধায় ইহা গ্রহণযোগ্য নহে।
ফেরেশতাদের আগমন সম্পর্কে প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা দিয়াছেন গিফার গোত্রের এক লোক। ইব্‌ন আব্বাস (রা) বলেন, গিফার গোত্রের এক লোক আমাকে বলিয়াছেন যে, বদর যুদ্ধের দিন আমি ও আমার এক চাচাতো ভাই কি ঘটে তাহা প্রত্যক্ষ করিবার জন্য পাহাড়ে আরোহণ করিলাম। তখন আমরা মুশরিক ছিলাম। কাহাদের পরাজয় হয় আমরা সেই অপেক্ষায় ছিলাম, যাহাতে বিজয়ী দলের লুটপাটের সময় আমরাও কিছু লুটপাট করিয়া লইতে পারি। আমরা পর্বতে আরোহণ করিতেছিলাম, হঠাৎ একখানি মেঘখণ্ড আমাদের নিকটবর্তী হইল। আমরা উহার মধ্য হইতে অশ্বের ডাক শুনিতে পাইলাম। অতঃপর আমি শুনিলাম, উহার মধ্য হইতে কে একজন বলিতেছে, “হায়যূম! সম্মুখে অগ্রসর হও” ইহা শ্রবণ করিয়া আমার চাচাতো ভাই হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হইয়া ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করিল। আর আমিও প্রায় মৃত্যুর দুয়ারে পৌছিয়া গিয়াছিলাম, একটু পরই সম্বিত ফিরিয়া পাইলাম। এক বর্ণনামতে হায়যূম জিবরীল (আ)-এর ঘোড়ার নাম। কিন্তু ইহা সঠিক বলিয়া প্রতীয়মান হয় না। কারণ অপর এক বর্ণনায় দেখা যায়, রাসূলুল্লাহ (স) জিবরীল (আ)-কে জিজ্ঞাসা করেন, বদর যুদ্ধের দিন "হায়যূম! সম্মুখে অগ্রসর হও” এই কথা কোন্ ফেরেশতা বলিয়াছিল? উত্তরে তিনি বলেন, হে মুহাম্মাদ! আকাশের সকল অধিবাসীকে তো আমি চিনি না।
অনুরূপ একটি ঘটনা মুহাম্মাদ ইবন উমার আল-আসলামী (র) আবূ রুহম আল-গিফারী (রা) হইতে, তিনি তাঁহার চাচাতো ভাই হইতে বর্ণনা করেন। তাহার চাচাতো ভাই বলেন, আমি ও আমার চাচাতো ভাই বদরের কূপের নিকট বিচরণ করিতেছিলাম। আমরা মুহাম্মাদের সঙ্গীদের সংখ্যা কম এবং কুরায়শদের সংখ্যা বেশী দেখিয়া বলিলাম, এই দুই দল যখন সংঘর্ষে লিপ্ত হইবে, আমরা মুহাম্মাদ ও তাহাদের সৈন্যদের কাছাকাছি থাকিব। তাই আমরা তাহাদের বামদিকে গেলাম। আমরা বলাবলি করিতেছিলাম, ইহারা তো কুরায়শদের চার ভাগের এক ভাগ। অতঃপর আমরা যখন তাহাদের বামদিকে চলিতেছিলাম তখন হঠাৎ একখণ্ড মেঘ আসিয়া আমাদিগকে ঢাকিয়া লইল। আমরা চক্ষু তুলিয়া উহার দিকে তাকাইলাম। আমরা পুরুষদের কণ্ঠস্বর ও অস্ত্রের ঝনঝনানী শুনিতে পাইলাম। আমরা শুনিলাম, এক ব্যক্তি তাহার ঘোড়াকে বলিতেছে, “হায়যূম! সম্মুখে অগ্রসর হও।" ইহার পর তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর ডানদিকে অবতরণ করিল। অতঃপর অনুরূপ আরও একটি দল আসিল। তাহারা রাসূলুল্লাহ (স) ও তাঁহার সঙ্গীদের সহিত অবস্থান করিল। এইবার তাহারা কুরায়শদের দ্বিগুণ হইয়া গেল। অতঃপর আমার চাচাতো ভাইটি মৃত্যুবরণ করিল। আর আমি সম্বিত ফিরিয়া পাইলাম। ইহার পর রাসূলুল্লাহ (স)-কে ইহা অবহিত করিলাম এবং ইসলাম গ্রহণ করিলাম।
ফেরেশতাদের দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত বহু মুশরিককে মুসলিম সেনাগণ প্রত্যক্ষ করেন। ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত। মুসলিম বাহিনীর এক লোক তাহার সম্মুখস্থ এক মুশরিককে প্রবল বেগে ধাওয়া করিতেছিলেন। হঠাৎ তাহার উপর চাবুকের আঘাতের আওয়ায এবং একজন অশ্বারোহীর কন্ঠস্বর শুনিতে পাইলেন। অশ্বarোহী বলিতেছিল, হায়যূম। সম্মুখে অগ্রসর হও। তখন তিনি সম্মুখস্থ মুশরিক ব্যক্তিটির দিকে তাঁকাইয়া দেখিলেন, সে ঢলিয়া পড়িতেছে। নিকটে আসিয়া দেখিলেন তাহার নাক ও চেহারায় চাবুকের আঘাত। সেই আঘাতের জায়গা সবুজ বর্ণ ধারণ করিয়াছে। উক্ত আনসারী সাহাবী আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-কে এই ঘটনা বিবৃত করিল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি সত্য বলিয়াছ, ইহা তৃতীয় আকাশ হইতে আগত সাহায্য।
বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবী আবূ দাউদ আল-মাযিনী (রা) বলেন, বদর যুদ্ধের দিন আমি মুশরিকদের এক ব্যক্তিকে হত্যা করিবার জন্য তাহার অনুসরণ করিতেছিলাম। তাহার প্রতি আমার তরবারি পৌঁছিবার পূর্বেই তাহার মস্তক লুটাইয়া পড়িল। আমি বুঝিতে পারিলাম যে, অন্য কেহ তাহাকে হত্যা করিয়াছে।
আর-রবী' ইব্‌ন আনাস (রা) বলেন, লোকে ফেরেশতাগণ কর্তৃক হত্যাকৃত ব্যক্তিকে চিনিত তাহার কাঁধের উপর ও জোড়ার উপর আঘাত দেখিয়া তাহা যেন আগুনে পোড়া চিহ্নের ন্যায়।
সুহায়ল ইব্‌ন আমর (রা) বলেন, বদর যুদ্ধের দিন আমি বহু লোককে দেখিলাম সাদা পোশাক পরিহিত, সাদা-কালো মিশ্রিত রংয়ের ঘোড়ার উপর আরোহী, যাহা আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যস্থল জুড়িয়া ছিল এবং যাহা ছিল বিশেষভাবে চিহ্নিত। তাহারা হত্যা ও বন্দী করিতেছিল। কোনও কোনও রিওয়ায়াত দ্বারা বুঝা যায় যে, ফেরেশতাগণ গিরিগুহা হইতেও আত্মপ্রকাশ করিয়াছিলেন। যেমন-
আবু উসায়দ (রা) তাহার চক্ষু অন্ধ হইবার পর বলিতেন, এখন যদি আমি তোমাদের সহিত বদর প্রান্তরে থাকিতাম এবং আমার চক্ষু ভাল থাকিত তবে অবশ্যই আমি তোমাদিগকে সেই গুহা দেখাইতাম যেখান হইতে ফেরেশতাকুল বাহির হইয়াছিল। এই ব্যাপারে আমি কোনরূপ সন্দেহ-সংশয় পোষণ করি না।
আবু বুরদা ইব্‌ন নিয়ার (রা) বলেন, বদর যুদ্ধের দিন আমি তিনটি মস্তক আনিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে রাখিয়া বলিলাম, ইহার দুইটি মস্তকধারীকে আমি হত্যা করিয়াছি। আর তৃতীয় মস্তকধারীকে আমি দেখিলাম সাদা লম্বা এক লোক হত্যা করিল। অতঃপর আমি তাহার মস্তক লইয়া আসিয়াছি। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, সে (হত্যাকারী সাদা লম্বা লোকটি) অমুক ফেরেশতা।
আস-সাইব ইব্‌ন আবী হুবায়শ (রা) উমার (রা)-এর খিলাফাত আমল বর্ণনা করিতেন, আল্লাহ্র কসম! মানুষের মধ্যে কেহই আমাকে বন্দী করে নাই। তাহাকে বলা হইল, তবে কে (আপনাকে বন্দী করিয়াছে)? তিনি বলিলেন, কুরায়শগণ যখন পরাজিত হইল তখন আমিও তাহাদের সহিত পরাজিত হইলাম। তখন লম্বা এক লোক, যিনি সাদা ঘোড়ায় আরোহী ছিলেন, অপর এক বর্ণনামতে সাদা এক লোক, যিনি সাদা-কালো রংয়ের ঘোড়ার পিঠে আরোহী ছিলেন, তিনি আমাকে ধরিয়া বাঁধিয়া ফেলিলেন। ইতোমধ্যে আবদুর রহমান ইব্‌ন আওফ আসিয়া আমাকে বাঁধা অবস্থায় পাইলেন। তিনি সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্য চীৎকার দিয়া বলিলেন, এই লোককে কে বন্দী করিয়াছে? কেহই ইহার উত্তর দিল না। এইভাবে তিনি আমাকে লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিলে তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমাকে কে বন্দী করিয়াছে? আমি বলিলাম, আমি তাহাকে চিনি না। আমি যাহা দেখিয়াছি তাহা তাঁহার নিকট বিবৃত করিতে অপছন্দ করিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমাকে এক ফেরেশতা বন্দী করিয়াছেন। আর হে ইব্‌ন আওফ! তোমার বন্দীকে লইয়া যাও।
হাকীম ইব্‌ন হিযাম (রা) বলেন, বদরের দিন আমরা দেখিলাম আকাশ হইতে একটি সেলাইকৃত কাপড় পতিত হইল যাহা আকাশের প্রান্তসীমা বন্ধ করিয়া দিল। তখন উপত্যকা পিপীলিকায় পূর্ণ হইয়া গেলে আমার মনে হইল, ইহা আকাশের কোনও জিনিস যাহা দ্বারা মুহাম্মাদকে সাহায্য করা হইতেছে। অতঃপর শত্রুর পরাজয় হইল। আর উহা ছিল ফেরেশতা। জুবায়র ইবন মুতইম (রা) হইতেও অনুরূপ একটি রিওয়ায়াত বর্ণিত আছে।
আবদুর রহমান ইব্‌ন আওফ (রা) বলেন, বদর যুদ্ধের দিন আমি দুই ব্যক্তিকে দেখিলাম। তাঁহাদের একজন রাসূলুল্লাহ (স)-এর ডানে এবং একজন বামে থাকিয়া প্রচণ্ড যুদ্ধ করিয়াছে। অতঃপর তৃতীয় এক ব্যক্তি আসিয়া তাঁহার পিছনে থাকিয়া যুদ্ধ করিতে লাগিল। একটু পরই চতুর্থ ব্যক্তি আসিয়া তাঁহার সম্মুখে যুদ্ধ করিতে লাগিল।
ইব্‌ন আব্বাস ও আলী (রা) হইতে বর্ণিত। আব্বাসকে বন্দী করেন আবুল ইয়াসার। তিনি ছিলেন হাঙ্কা-পাতলা আর আব্বাস ছিলেন মোটাতাজা ও ভারী। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, হে আবুল ইয়াসার! তুমি আব্বাসকে কিভাবে বন্দী করিলে? তিনি বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে এই কাজে এমন এক ব্যক্তি সাহায্য করিয়াছে যাহাকে আমি পূর্বে কখনও দেখি নাই এবং পরেও দেখি নাই। তাঁহার আকৃতি এইরূপ এইরূপ...। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বলিলেন, তোমাকে এই কাজে সাহায্য করিয়াছে একজন সম্মানিত ফেরেশতা।
আতিয়্যা ইন্ন কায়স বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) যখন বদر যুদ্ধ শেষ করিলেন তখন জিবরীল (আ) একটি লাল রংয়ের উষ্ট্রীতে আরোহণ করিয়া আসিলেন। তাঁহার পরনে ছিল লৌহবর্ম এবং সঙ্গে ছিল তীর। তিনি বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! আল্লাহ আমাকে আপনার নিকট প্রেরণ করিয়াছেন এবং আমাকে নির্দেশ দিয়াছেন যে, আপনি সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত আমি যেন আপনার নিকট হইতে পৃথক না হই। আপনি কি সন্তুষ্ট হইয়াছেন? তিনি বলিলেন, হাঁ, আমি সন্তুষ্ট হইয়াছি। অতঃপর জibরীল (আ) চলিয়া গেলেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ঘোরতর যুদ্ধ শুরু

📄 ঘোরতর যুদ্ধ শুরু


মল্লযুদ্ধ সমাপ্ত হইবার পর রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবায়ে কিরামকে জিহাদে উদ্বুদ্ধ করিয়া লড়াই শানিত ও জোরদার করার নির্দেশ দিলেন। সাহাবায়ে কিরাম বীরত্বের সহিত শত্রুদের উপর ঝাঁপাইয়া পড়িলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-কে নিজেদের মধ্যে দেখিয়া তাহারা আরও প্রেরণা লাভ করিতেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) নিজেও বীরত্বের সহিত যুদ্ধ করিতেছিলেন। তাঁহার সঙ্গে আবূ বাকর (রা)-ও। তাঁহারা আরীশে আল্লাহর দরবারে যেমন বিনয় সহকারে দু'আ করিতেছিলেন তেমনি প্রত্যক্ষ রণাঙ্গনেও আসিয়া যুদ্ধ করিতেছিলেন এবং মুসলমানদিগকে যুদ্ধের প্রতি অনুপ্রাণিত করিতেছিলেন। আলী (রা) বলেন, বদর যুদ্ধের দিন যখন প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হইল তখন রাসূলুল্লাহ (স) আমাদের আগে আগে ছিলেন। আমরা তাঁহার আড়ালে ছিলাম। সেই দিন তিনি সকলের চেয়ে প্রচণ্ডভাবে যুদ্ধ করিতেছিলেন। আমাদের কেহই তদপেক্ষা মুশরিকদের নিকটবর্তী ছিল না।
ইমাম আহমাদ (র)-এর বরাতে ইউসুফ সালিহী তাঁহার সুবুলুল হুদা গ্রন্থে ইহা ছাড়া আরও উল্লেখ করিয়াছেন যে, বদরের দিন আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর দ্বারা আত্মরক্ষা করিতেছিলেন। তিনি বলিতেছিলেন, سَيُهْزَمُ الْجَمْعُ وَيُولُونَ الدُّبْرُ "এই দল তো শীঘ্রই পরাজিত হইবে এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিবে" (৫৪ঃ ৪৫)। এক পর্যায়ে তিনি একমুষ্ঠি কঙ্করযুক্ত মাটি উঠাইয়া شاهت الوجوه (মুখমণ্ডল গুলি কদাকার হউক) বলিয়া ছুড়িয়া মারিলেন। ফলে এমন কোন কাফির অবশিষ্ট রহিল না যাহার চোখে, মুখে ও নাকে গিয়া উহা না পৌঁছিল। ফলে তাহারা চক্ষু মুছিতে লাগিল। আর এই সুযোগে মুসলিমগণ তাহাদের মস্তক দ্বিখণ্ডিত করিয়া ফেলিতে লাগিল। ইহার কথাই বলা হইয়াছে আল-কুরআনের এই আয়াতে : وَمَا رَمَيْتَ إِذْ رَمَيْتَ وَلَكِنَّ اللهَ رَمَى "এবং তুমি যখন নিক্ষেপ করিয়াছিলে তখন তুমি নিক্ষেপ কর নাই, আল্লাহ্ই নিক্ষেপ করিয়াছিলেন" (৮: ১৭)।
বিভিন্ন রিওয়ায়াত দ্বারা বুঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (স) কাফিরদের প্রতি কংকরই নিক্ষেপ করিয়াছিলেন। আবদুর রহমান ইব্‌ن যায়দ ইব্‌ন আসলাম-এর বর্ণনামতে, তিনি তিনটি কংকর লইয়া একটি শত্রুবাহিনীর ডাইনদিকে একটি বামদিকে এবং আর একটি তাহাদের সম্মুখভাগে নিক্ষেপ করিলেন এবং বলিলেনঃ شاهت الوجوه ইহার ফলে তাহারা পরাজিত হইল।
হাকীম ইব্‌ন হিযাম (রা), যিনি পরে মুসলমান হন, বলেন, বদরের দিন আমরা উভয় দল যখন মুখামুখী হইয়া যুদ্ধে লিপ্ত হইলাম তখন আমি তস্তরিতে পাথর পড়িলে যেইরূপ শব্দ হয় সেইরূপ একটি শব্দ শুনিতে পাইলাম যাহা আকাশ হইতে মাটিতে পড়িল। আর রাসুলুল্লাহ (স) একমুষ্টি মাটি উঠাইয়া নিক্ষেপ করিলেন, ফলে আমরা কাফিরগণ পরাজিত হইলাম।
নাওফাল ইব্‌ن মু'আবিয়া আদ-দীলী বলেন, আমরা বদর যুদ্ধে পরাজিত হইয়াছিলাম, কারণ আমরা আমাদের অন্তরে এবং আমাদের পিছনে তস্তরিতে পাথর পতনের ন্যায় একটি শব্দ শুনিতে পাইয়াছিলাম। ইহা আমাদের সবচেয়ে ভীতির কারণ হইয়াছিল।
অতঃপর অল্প সময়ের মধ্যেই যুদ্ধের গতি পাল্টাইয়া গেল। মুসলমানদের বিজয় সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হইয়া উঠিল। বিশিষ্ট কুরায়শ নেতাগণ নিহত হইল। অবশেষে মুসলমানগণ শত্রু সৈন্যদিগকে ব্যাপকভাবে বন্দী করিতে শুরু করিল। অধিকাংশ কাফিরই রণক্ষেত্র হইতে পলায়ন করিয়া প্রাণ রক্ষা করিল। এই যুদ্ধে ৭০জন কাফির নিহত এবং ৭০জন বন্দী হয়। আর মুসলমানদের পক্ষে ১৪জন শাহাদাত লাভ করেন, তন্মধ্যে ৬ জন মুহাজির এবং ৮জন আনসার।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 যুদ্ধক্ষেত্র হইতে ইবলীসের পলায়ন ও আবূ জাহলের সান্ত্বনাবাণী

📄 যুদ্ধক্ষেত্র হইতে ইবলীসের পলায়ন ও আবূ জাহলের সান্ত্বনাবাণী


যুদ্ধক্ষেত্র হইতে ইবলীসের পলায়ন ও আবূ জাহলের সান্ত্বনাবাণী
কুরায়শগণ যুদ্ধের জন্য রওয়ানা হইলে ইবলীস পথিমধ্যে বাক্স গোত্রের নেতা সুরাকা ইবন মালিকের আকৃতি ধারণ করিয়া তাহাদের সঙ্গ লইয়াছিল এবং বিভিন্ন রকমের আশ্বাসবাণী শুনাইতেছিল। সে তাহাদিগকে বলিয়াছিল:
لا غَالِبَ لَكُمُ الْيَوْمَ مِنَ النَّاسِ وَإِنِّي جَارٌ لَكُمْ.
"আজ মানুষের মধ্যে কেহই তোমাদের উপর বিজয়ী হইবে না। আমি তোমাদের পার্শ্বেই থাকিব" (৮:৪৮)।
অতঃপর যুদ্ধক্ষেত্রে সে যখন ফেরেশতাদের ভূমিকা ও কাফিরদের প্রতি তাহাদের আক্রমণের ভয়ানক অবস্থা দেখিল তখন তাহার হস্ত ছিল এক মুশরিকের হাতে ধরা অবস্থায়। সে এক ঝট্কায় নিজের হাত ছাড়াইয়া লইয়া ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটিতে লাগিল। তখন সেই লোকটি এবং অন্যান্য মুশরিক সৈন্য তাহাকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিতে লাগিল, "কোথায় যাইতেছ হে সুরাকা। তুমি না বলিয়াছিলে, তুমি আমাদের পার্শ্বেই থাকিবে, আমাদের হইতে বিচ্ছিন্ন হইবে না!" তখন সে বলিল,
إِنِّي بَرِيقٌ مِّنْكُمْ إِنِّي أَرَى مَالَا تَرَوْنَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ وَاللَّهُ شَدِيدُ الْعِقَابِ.
"তোমাদের সহিত আমার কোনও সম্পর্ক রহিল না, তোমরা যাহা দেখিতে পাও না আমি উহা দেখিতেছি। আমি আল্লাহকে ভয় করি, আর আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর" (৮:৪৮)।
তখন আল-হারিছ ইব্‌ন হিশাম তাহাকে সুরাকা মনে করিয়া ধরিয়া ফেলিল। ইবলীস তখন হারিছের বুকে ঘুষি মারিলে সে মাটিতে পড়িয়া গেল। এই সুযোগে ইবলীস আর ডানে-বামে ও অগ্রে-পশ্চাতে ভ্রূক্ষেপ না করিয়া সোজা গিয়া সমুদ্রের মধ্যে পড়িল এবং উভয় হস্ত উত্তোলন করিয়া বলিতে লাগিল, হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমার প্রতি যে অঙ্গীকার করিয়াছিলে উহা পূরণ কর। হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট আমার প্রতি তোমার বিশেষ দৃষ্টি কামনা করিতেছি।" সে ভয় পাইতেছিল যে, যুদ্ধ বুঝি সম্প্রসারিত হইয়া তাহার নিকট পর্যন্ত গিয়া পৌঁছিবে।
আবূ জাহল সম্মুখে অগ্রসর হইয়া বলিল, ওহে লোকসকল! সুরাকা ইবন মালিকের অপদস্থ অবস্থা তোমাদিগকে যেন ঘাবড়াইয়া না দেয়। কারণ সে ছিল মুহাম্মাদের সহিত অঙ্গীকারাবদ্ধ। আর শায়ba, উতবা ও আল-ওয়ালীদের হত্যাও যেন তোমাদিগকে বিচলিত না করে। কারণ তাহারা বেশী তাড়াহুড়া করিয়াছিল। আল-লাত ও আল-উষ্যার কসম! মুহাম্মাদ ও তাহার সঙ্গীদিগকে রশি দ্বারা না বাঁধিয়া আমরা ফেরত যাইব না। তোমরা তাহাদিগকে জীবিত পাকড়াও কর, যাহাতে আমরা তাহাদেরকে তোমাদিগকে ত্যাগ করা ও লাত-'উয্যাক অবমাননা করা প্রভৃতি অপকর্মের প্রতিফল বুঝাইয়া দিতে পারি। এই সময় আবূ জাহল কবিতা আবৃত্তি করিতেছিল:
ما تنقم الحرب الشموس منى + بازل عامين حديث سنی لمثل هذا ولدتني أمي
"উজ্জ্বল আলোয় উদ্ভাসিত যুদ্ধক্ষেত্র, দুই বৎসর বয়স্ক নবীন উট আমার নিকট হইতে প্রতিশোধ গ্রহণ করিবে না। এই ধরনের কাজের জন্যই আমার মাতা আমাকে জন্মদান করিয়াছে”।
বর্ণিত আছে যে, কুরায়শগণ পরে সুরাকাকে মক্কায় দেখিয়া তাহাকে বলিয়াছিল, হে সুরাকা! তুমি যুদ্ধের কাতার ভঙ্গ করিয়াছ এবং আমাদের মধ্যে পরাজয়ের সূত্রপাত করিয়াছ। তিনি বলেন, আল্লাহ্র কসম! তোমাদের বিষয়ে শুরু হইতে পরাজিত হওয়া পর্যন্ত আমি কিছুই জানি না। আমি উপস্থিতও ছিলাম না, জানিও না কিছু। কিন্তু মুশরিকগণ উহা বিশ্বাস করিল না। অতঃপর এক সময় তাহারা ইসলাম গ্রহণ করিল এবং এই ব্যাপারে আল্লাহ যাহা অবতীর্ণ করিয়াছেন উহা শুনিল। তখন তাহারা জানিতে পারিল যে, ইবলীস তাহার আকৃতি ধারণ করিয়াছিল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলিম বাহিনীর বিশেষ সংকেত

📄 যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলিম বাহিনীর বিশেষ সংকেত


যুদ্ধক্ষেত্রে পরস্পরকে চিনিবার জন্য রাসূলুল্লাহ (স) বিভিন্ন গোত্রের জন্য বিভিন্ন সংকেত নির্ধারণ করিয়া দেন। আবদুল্লাহ ইবনুষ যুবায়র (রা) সূত্রে বর্ণিত যে, বদর যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (স) মুহাজিরদের জন্য 'ইয়া বানী আবদির রাহমান', খাযরাজ গোত্রের জন্য 'ইয়া বানী আবদিল্লাহ' ও আওস গোত্রের জন্য 'ইয়া বানী উবায়দিল্লাহ' সংকেত নির্ধারণ করিয়া দেন। এক বর্ণনামতে মুসলমানদের সকলের সংকেত ছিল أمت يا منصور "হে সাহায্যপ্রাপ্ত ব্যক্তি! মারিয়া ফেল” (ইবন সাদ, তাবাকাত, ২খ., পৃ. ১৪)। যায়দ ইব্‌ন আলীর বর্ণনামতে ইহাই ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর সংকেত। ইব্‌ন হিশামের বর্ণনামতে বদর যুদ্ধের দিন সাহাবায়ে কিরামের সংকেত ছিল 'আহাদুন আহাদ'। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার ঘোড়ার নামকরণ করেন খায়লুল্লাহ তথা আল্লাহর ঘোড়া।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00