📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 যুদ্ধের সূচনায় মল্লযুদ্ধ

📄 যুদ্ধের সূচনায় মল্লযুদ্ধ


আল-উমাবীর বর্ণনামতে আল-আসওয়াদ ইবন 'আবদিল আসাদ আল-মাখযূমী নিহত হওয়ার ফলে কুরায়শ নেতা উতবা ইব্‌ন রাবী'আ উত্তেজিত হইয়া পড়িল এবং স্বীয় বীরত্ব প্রদর্শন করিতে চাহিল। সে স্বীয় ভ্রাতা শায়با ইবন রাবী'আ ও পুত্র আল-ওয়ালীদকে লইয়া প্রকাশ্য ময়দানে অবতীর্ণ হইল। তাহারা উভয় সেনাদলের কাতারের মধ্যখানে আসিয়া মল্লযুদ্ধের আহবান জানাইল। তখন আসনারদের মধ্য হইতে তিন ব্যক্তি তাহাদের মুকাবিলায় বাহির হইলেন। ইবন সা'দ-এর বর্ণনামতে, তাহারা হইলেন 'আওফ ইবনুল হারিছ, মু'আয ইবনুল হারিছ ও মু'আওবিয ইবনুল হারিছ নামক ভ্রাতৃত্রয়। ইহাদের মাতার নাম ছিল 'আফরা। ইব্‌ন কাছীর-এর বর্ণনামতে তৃতীয় ব্যক্তি হইলেন আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা)। উতবা জিজ্ঞাসা করিল, তোমরা কাহারা? তাঁহারা উত্তর দিলেন, আমরা আনসারদের লোক।
উতবা বলিল, আমাদের তোমাদের কোনও প্রয়োজন নাই। এক বর্ণনামতে তাহারা বলিল, সম্মানিত সমতুল্য ব্যক্তিবর্গ। তবে আমাদের চাচার বংশের লোকজনকে আমাদের নিকট বাহির করিয়া দাও। তাহাদের একজন ডাকিয়া বলিল, হে মুহাম্মাদ! আমাদের স্বগোত্রীয় সমতুল্য লোকদিগকে আমাদের নিকট পাঠাও। তখন নবী (স) বলিলেন, উঠ হে 'উবায়দা ইবনুল হারিছ! উঠ হে হামযা! উঠ হে আলী! ইবন সা'দ-এর বর্ণনামতে রাসূলুল্লাহ (স) বানু হাশিমকে ডাকিয়া বলিয়াছিলেন, হে বানু হাশিম। তোমরা উঠ। হক প্রতিষ্ঠায় যুদ্ধ কর যাহা লইয়া আল্লাহ তোমাদের নবীকে প্রেরণ করিয়াছেন। উহারা তো বাহির হইয়া আসিয়াছে আল্লাহ্ নূরকে নিভাইয়া দেওয়ার জন্য। তখন হামযা ইবন আবদিল মুত্তালিব, আলী ইব্‌ন আবী তালিব ও উবায়দা ইবনুল হারিছ উঠিয়া ময়দানে গিয়া দাঁড়াইলেন।
আল-উমাবী ও ইবন সা'দ-এর বর্ণনামতে আনসারগণ মুকাবিলার জন্য বাহির হইলে রাসূলুল্লাহ (স) তাহা অপসন্দ করেন। কারণ এই প্রথম তিনি শত্রুর মুকাবিলা করিতেছেন। তাই তিনি চাহিতেছিলেন, মুকাবিলাকারী তাঁহারই পরিবারের লোক হউক। তাই তিনি তাহাদিগকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিয়া কাতারের মধ্যে ফেরত যাইবার নির্দেশ দিলেন এবং তাঁহার পরিবারের এই তিনজনকে বাহির হইবার নির্দেশ দিলেন।
অতঃপর ইহারা উঠিয়া ময়দানে কাফিরদের নিকটবর্তী হইলে উতবা বলিল, তোমরা কথা বল, যাহাতে আমরা চিনিতে পারি। তাহাদের পরনে লৌহ-শিরস্ত্রাণ ছিল। সেইজন্যই উতবা এরূপ বলিয়াছিল। তখন হামযা (রা) বলিলেন, আমি হামযা ইব্‌ন আবদিল মুত্তালিব; আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের সিংহ। উতবা বলিল, সম্মানিত সমতুল্য ব্যক্তি আর আমি মিত্রবর্গের সিংহ। তোমার সহিত এই দুইজন কাহারা? হামযা (রা) বলিলেন, আলী ইবন আবী তালিব ও উবায়দা ইবনুল হারিছ। উতবা বলিল, উভয়েই সম্মানিত সমতুল্য ব্যক্তি। ইহাদের মধ্যে 'উবায়দা ইবনুল হারিছ ছিলেন বয়বৃদ্ধ। অতঃপর 'উবায়দা উতবার সহিত, হামযা (রা) শায়বার সহিত এবং আলী (রা) আল-ওয়ালীদের সহিত মল্লযুদ্ধে লিপ্ত হইলেন। ইহা ইন্ন কাছীর-এর বর্ণনা। ইবন সা'দ-এর বর্ণনামতে, হামযা (রা) উতবার সহিত এবং উবায়দা (রা) শায়বার সহিত মল্লযুদ্ধে লিপ্ত হন। অতঃপর হামযা (রা) নিমিষেই তাঁহার প্রতিদ্বন্দ্বী শায়বাকে হত্যা করেন। আলী (রা)-ও নিমিষেই তাঁহার প্রতিদ্বন্দ্বী আল-ওয়ালীদকে হত্যা করেন। 'উবায়দা (রা) ও 'উতবা উভয়ে আঘাত পাল্টা আঘাত হানিতে লাগিলেন। উভয়েই উভয়কে ঘায়েল করিয়া ফেলিলেন। ইবন সা'দ-এর বর্ণনামতে, শায়বা 'উবায়দার একটি পা কাটিয়া ফেলে। অতঃপর হামযা ও আলী (রা) উভয়ে তরবারি চালাইয়া দ্রুত তাহাকে হত্যা করেন এবং তাঁহাদের সঙ্গী উবায়দাকে বহন করিয়া সাহাবীদের মধ্যে লইয়া আসেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পাশেই তাঁহাকে শোয়াইয়া দিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার পাখানি তাহাকে দেখাইলেন। উবায়দা (রা) উক্ত পায়ের উপর স্বীয় মুখ রাখিয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আবূ তালিব যদি আমাকে দেখিত তবে অবশ্যই বুঝিতে যে, আমিই তাহার এই কবিতার যোগ্য ব্যক্তি:
كذبتم وبيت الله نبزى محمدا ولما نطاعن حوله ونناضل ونسلمه حتى نصرع دونه ونزهل عن ابنائنا والحلائل.
"তোমরা মিথ্যা বলিয়াছ, আল্লাহ্র ঘরের কসম। মুহাম্মাদকে ছিনাইয়া লওয়া বা তাঁহার উপর বিজয়ী হওয়া যায় না, যখন আমরা তাঁহার চতুষ্পার্শ্ব হইতে বল্লম ও তীর নিক্ষেপ করি। আমরা তাঁহাকে সমর্পণ করিব না, এমনকি আমরা তাঁহার সম্মুখে লুটাইয়া পড়িব এবং আমাদের সন্তান-সন্ততি ও স্ত্রীদের কথা ভুলিয়া যাইব।"
অতঃপর যুদ্ধশেষে ফিরিবার পথে তিনি ইনতিকাল করিলে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, তুমি শহীদ।
বদর যুদ্ধের দিন মল্লযুদ্ধে অংশগ্রহণকারিগণ তথা 'উবায়দা (রা), হামযা (রা) ও আলী (রা) এবং উতবা ইবন রাবীআ, শায়ba ইবন রাবী'আ ও আল-ওয়ালীদ ইবন 'উতবা সম্পর্কে এই আয়াত নাযিল হয়: هُذَانِ خَصْمَانِ اخْتَصَمُوا فِي رَبِّهِمْ. "ইহারা দুইটি বিবদমান পক্ষ, তাহারা তাহাদের প্রতিপালক সম্বন্ধে বিতর্ক করে" (২২:১৯)।
আলী (রা) হইতে এইরূপ বর্ণিত আছে।
আবুল আলিয়া হইতে বর্ণিত যে, কাফিরদের তিনজন মল্লযুদ্ধে যখন নিহত হইল এবং মুসলমানদের তিনজন ফিরিয়া গেল তখন আবু জাহল ও তাহার সঙ্গীবৃন্দ বলিল, আমাদের 'উয্যা (দেবতা) রহিয়াছে, তোমাদের কোনও 'উয্যা নাই। ইহা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর পক্ষ হইতে এক ঘোষক বলিয়া উঠিল, আল্লাহ আমাদের অভিভাবক, তোমাদের কোনও অভিভাবক নাই।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সাহাবীদের সম্মুখ সমরে উদ্বুদ্ধকরণ এবং 'উমায়র-এর শাহাদাতবরণ

📄 সাহাবীদের সম্মুখ সমরে উদ্বুদ্ধকরণ এবং 'উমায়র-এর শাহাদাতবরণ


রাসূলুল্লাহ (স) আরীশ হইতে বাহির হইয়া আসিয়া সাহাবায়ে কিরামকে সম্মুখ জিহাদে উদ্বুদ্ধ ও উৎসাহিত করিলেন। তিনি বলিলেন, সেই সত্তার কসম যাঁহার হাতে মুহাম্মাদের জীবন! আজ কোনও ব্যক্তি যদি এমনভাবে যুদ্ধ করে যে, সে ধৈর্য ধারণকারী, ছওয়াবের প্রত্যাশী, সম্মুখে অগ্রসরমান, পশ্চাতে নহে, এই অবস্থায় যদি সে নিহত হয় তবে আল্লাহ তাহাকে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করাইবেন (ইবন হিশাম, ২খ., পৃ. ২৭০)।
অন্য বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমরা এমন এক জান্নাতের জন্য উঠ যাহার প্রশস্ততা আসমান ও যমীনসম। তখন উমায়র ইবনুল হুমাম আল-আনসারী বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এমন জান্নাত যাহা আসমান ও যমীন পরিব্যাপ্ত! তিনি বলিলেন, হাঁ। উমায়র (রা) বলিলেন, বাহ্ বাহ্! রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, 'বাহ, বাহ বলিতে কিসে তোমাকে উদ্বুদ্ধ করিল? তিনি বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! শুধু এই আশায়ই যে, আমি উহার অধিবাসী হইব। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি উহার অধিবাসী। তিনি তখন কিছু খেজুর বাহির করিয়া খাইতেছিলেন। অতঃপর বলিলেন, এই খেজুরগুলি খাওয়া পর্যন্ত যদি আমি জীবিত থাকি তবে তাহা তো অনেক দীর্ঘ সময়! এই বলিয়া তিনি খেজুরগুলি ছুড়িয়া ফেলিয়া দিয়া যুদ্ধে ঝাঁপাইয়া পড়িলেন এবং যুদ্ধ করিতে করিতে শহীদ হইলেন। যুদ্ধ করিবার সময় তিনি এই কবিতা আবৃত্তি করিতেছিলেন:
ركضا إلى الله بغير زاد الا التقى وعمل المعاد والصبر في الله على الجهاد وكل زاد عرضة النفاد غير التقى والبر والرشاد
"আমি আল্লাহ্র প্রতি দৌড়াইয়া যাইতেছি পাথেয় ছাড়া। তাকওয়া, পরকালের আমল এবং জিহাদের জন্য আল্লাহর প্রতি ধৈর্য ধারণ ছাড়া। আর তাকওয়া, সৎকাজ এবং সোজা পথে বিচরণ ব্যতীত অন্য সকল পাথেয়ই বিলীন হইয়া যাইবে" (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ২৭৭; হায়াতুস সাহাবা, ১খ., পৃ. ৪১৬-১৭)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আওফ ইবনুল হারিছের শাহাদাত

📄 আওফ ইবনুল হারিছের শাহাদাত


আওফ ইবনুল হারিছের শাহাদাত: আওফ ইবনুল হারিছ আল-আনসারী, যাহার মাতা ছিলেন 'আফরা, রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট জিজ্ঞাসা করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! বান্দার কোন্ কাজে তাহার প্রতিপালক (আনন্দের আতিশয্যে) সন্তুষ্ট হন? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, বর্মহীন অবস্থায় শত্রুদের মধ্যে ঝাঁপাইয়া পড়ায়। অতঃপর তিনি শরীর হইতে বর্ম খুলিয়া ছুড়িয়া ফেলিলেন এবং তরবারি হাতে শত্রুদের সহিত যুদ্ধ করিতে করিতে শহীদ হইলেন (আত-তাবারী, তারীখ, ২খ., পৃ. ৪৪৮-৪৯; উয়ূনুল আছার, ১খ., পৃ. ২৯৯-৩০০)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ফেরেশতাদের অবতরণ ও যুদ্ধে অংশগ্রহণ

📄 ফেরেশতাদের অবতরণ ও যুদ্ধে অংশগ্রহণ


ফেরেশতাদের অবতরণ ও যুদ্ধে অংশগ্রহণ: বদর যুদ্ধে মুসলমানদের সাহায্যার্থে আল্লাহ তাআলা ফেরেশতা প্রেরণ করেন। তাহারা অবতরণ করিয়া কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। কুরআন ও হাদীছে ইহার বিশদ বর্ণনা আসিয়াছে। পূর্বেই বর্ণনা করা হইয়াছে যে, আরীশে অবস্থানকালে রাসূলুল্লাহ (স) মাথা উঠাইয়া আবূ বাকর (রা)-কে সুসংবাদ দিয়া বলিয়াছিলেন, আল্লাহর সাহায্য আসিয়া গিয়াছে। এই যে জিবরীল ঘোড়ার লাগাম ধরিয়া হাঁকাইয়া আসিতেছে। কুরআন কারীমে এই ব্যাপারে সুস্পষ্ট বর্ণনা আসিয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
إِذْ تَسْتَغِيْثُونَ رَبَّكُمْ فَاسْتَجَابَ لَكُمْ أَنِّي مُمِدُّكُمْ بِأَلْفِ مِنَ الْمَلَائِكَةِ مُرْدِفِينَ.
"স্মরণ কর, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করিয়াছিলে। তিনি উহা কবুল করিয়াছিলেন এবং বলিয়াছিলেন, আমি তোমাদিগকে সাহায্য করিব এক সহস্র ফেরেশতা দ্বারা যাহারা একের পর এক আসিবে" (৮:৯)।
এই আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হইয়াছে যে, এই যুদ্ধে এক হাজার ফেরেশতা অবতরণ করিয়াছিল। ইব্‌ন আব্বাস (রা)-এর এক বর্ণনায় ইহারই সমর্থন পাওয়া যায়। তিনি বলেন, আল্লাহ তাঁহার নবী ও মুমিনদিগকে এক হাজার ফেরেশতা দ্বারা সাহায্য করেন। ডানদিকে পাঁচ শত ফেরেশতার নেতৃত্বে ছিলেন জিবরীল (আ) এবং বামদিকের পাঁচ শত ফেরেশতার নেতৃত্বে ছিলেন মীকাঈল (আ)। ইহাই প্রসিদ্ধ। অন্য এক আয়াতে তিন হাজার ফেরেশতার কথা বলা হইয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
إِذْ تَقُولُ لِلْمُؤْمِنِينَ أَلَنْ يَكْفِيَكُمْ أَنْ يُمِدَّكُمْ رَبُّكُمْ بِثَلُثَةِ أَلْفِ مِّنَ الْمَلَئِكَةِ مُنْزَلِينَ. "স্মরণ কর, যখন তুমি মুমিনগণকে বলিতেছিলে, ইহা কি তোমাদের জন্য যথেষ্ট নয় যে, তোমাদের প্রতিপালক প্রেরিত তিন সহস্র ফেরেশতা দ্বারা তোমাদিগকে সহায়তা করিবেন" (৩৪ : ১২৪)!'
আলী (রা) হইতে বর্ণিত একটি রিওয়ায়াতে ইহার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। তিনি বলেন, জিবরীল (আ) এক হাজার ফেরেশতাসহ রাসূলুল্লাহ (স)-এর ডানদিকে অবতরণ করেন। সেইদিকে ছিলেন আবূ বাকর (রা), আর মীকাঈল (আ) এক হাজার ফেরেশতাসহ রাসূলুল্লাহ (সা)-এর বামদিকে অবতরণ করেন, সেইদিকে ছিলাম আমি। ইমাম বায়হাকী (র) আলী (রা) হইতে উক্ত রিওয়ায়াতে আরও বর্ণনা করেন যে, ইসরাফীল (আ)-ও এক হাজার ফেরেশতাসহ অবতরণ করেন।
আলী (রা) হইতে অপর এক বর্ণনায় আছে যে, তিনি বলেন, আমি বদরের কূপের নিকট বিচরণ করিতেছিলাম। তখন এমন প্রবল বেগে এক বায়ু প্রবাহিত হইল যাহা ইতোপূর্বে আমি আর কখনও দেখি নাই। অতঃপর তাহা চলিয়া গেল। আবার প্রবল বেগে বায়ু প্রবাহিত হইল, যাহা আমি কখনও দেখি নাই পূর্বের ব্যতীত। ইহার পর পুনরায় প্রবল বেগে বায়ু প্রবাহিত হইল। প্রথমবারের বায়ু ছিলেন জিবরীল (আ), যিনি এক হাজার ফেরেশতাসহ অবতরণ করেন। দ্বিতীয়বারের বায়ু মীকাঈল (আ), যিনি এক হাজার ফেরেশতাসহ রাসূলুল্লাহ (স)-এর ডানে অবতরণ করেন। আবূ বাকর (রা) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর ডানদিকে, আর তৃতীয় বায়ু ছিলেন ইসরাফীল (আ), তিনি এক হাজার ফেরেশতাসহ রাসূলুল্লাহ (স)-এর বামদিকে অবতরণ করেন। আমি ছিলাম তাঁহার বামদিকে। আল্লাহ তাঁহার শত্রুদিগকে পরাজিত করার পর রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে তাঁহার ঘোড়ায় তুলিয়া নিলেন। ঘোড়াটি লম্ফঝম্ফ করিলে আমি উহার ঘাড়ের উপর পড়িয়া গেলাম, অতঃপর আমার প্রতিপালককে ডাকিলাম। তিনি আমাকে রক্ষা করিলেন। আমি বগলে আঘাত পাইলাম।
মুহাম্মাদ ইবন উমার আল-আসলামী হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) সেই দিন বলিলেন, এই হইল জিবরীল, বায়ু হাঁকাইয়া লইয়া যাইতেছে। সে যেন দিহয়াতুল কালবী। আমাকে পূর্বের হাওয়া দ্বারা সাহায্য করা হইয়াছে। আর আদ জাতি পশ্চিমের হাওয়ায় ধ্বংস হইয়াছে।
ফেরেশতাগণ যুদ্ধ করিবার এবং শত্রুদিগকে আঘাত করিবার পদ্ধতি জানিতেন না বিধায় আল্লাহ তা'আলা তাহাদিগকে শত্রুদের ঘাড়ের উপর এবং প্রতি হাড়ের জোড়ায় আঘাত করিবার নির্দেশ দেন। এই সম্পর্কে কুরআন কারীমে উল্লিখিত হইয়াছেঃ (৮ : ১২) إِذْ يُوْحِي رَبُّكَ إِلَى الْمَلَائِكَةِ أَنِّي مَعَكُمْ فَثَبِّتُوا الَّذِيْنَ آمَنُوا سَأُلْقِي فِي قُلُوْبِ الَّذِيْنَ كَفَرُوا الرُّعْبَ فَاضْرِبُوْا فَوْقَ الْأَعْنَاقِ وَاضْرِبُوْا مِنْهُمْ كُلَّ بَنَانِ: "স্মরণ কর, তোমাদের প্রতিপালক ফেরেশতাদের প্রতি প্রত্যাদেশ করেন, আমি তোমাদের সহিত আছি। সুতরাং তোমরা মুমিনগণকে অবিচলিত রাখো। যাহারা কুফরী করে আমি তাহাদের হৃদয়ে ভীতির সঞ্চার করিব। সুতরাং তোমরা তাহাদের স্কন্ধে এবং আঘাত কর তাহাদের প্রত্যেক আঙ্গুলের অগ্রভাগ" (৮ : ১২)।
ফেরেশতাগণ ছিল পুরুষের আকৃতিতে সাদা-কালো মিশ্রিত বর্ণের ঘোড়ায় আরোহী সাদা পোশাক পরিহিত। তাঁহাদের মস্তকে ছিল সাদা পাগড়ী, যাহার প্রান্তভাগ উভয় কাঁধের মধ্যখানে ঝুলন্ত ছিল।
ইব্‌ন আব্বাস (রা) বলেন, বদর যুদ্ধে ফেরেশতাদের পাগড়ী ছিল সাদা, আর হুনায়নের যুদ্ধে ছিল সবুজ। তাঁহার অপর এক বর্ণনায় আছে যে, বদর যুদ্ধে ফেরেশতাদের ছিল কালো পাগড়ী, আর হুনায়নের যুদ্ধে সবুজ। তবে শেষোক্ত বর্ণনাটির সনদ খুবই দুর্বল বিধায় ইহা গ্রহণযোগ্য নহে।
ফেরেশতাদের আগমন সম্পর্কে প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা দিয়াছেন গিফার গোত্রের এক লোক। ইব্‌ন আব্বাস (রা) বলেন, গিফার গোত্রের এক লোক আমাকে বলিয়াছেন যে, বদর যুদ্ধের দিন আমি ও আমার এক চাচাতো ভাই কি ঘটে তাহা প্রত্যক্ষ করিবার জন্য পাহাড়ে আরোহণ করিলাম। তখন আমরা মুশরিক ছিলাম। কাহাদের পরাজয় হয় আমরা সেই অপেক্ষায় ছিলাম, যাহাতে বিজয়ী দলের লুটপাটের সময় আমরাও কিছু লুটপাট করিয়া লইতে পারি। আমরা পর্বতে আরোহণ করিতেছিলাম, হঠাৎ একখানি মেঘখণ্ড আমাদের নিকটবর্তী হইল। আমরা উহার মধ্য হইতে অশ্বের ডাক শুনিতে পাইলাম। অতঃপর আমি শুনিলাম, উহার মধ্য হইতে কে একজন বলিতেছে, “হায়যূম! সম্মুখে অগ্রসর হও” ইহা শ্রবণ করিয়া আমার চাচাতো ভাই হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হইয়া ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করিল। আর আমিও প্রায় মৃত্যুর দুয়ারে পৌছিয়া গিয়াছিলাম, একটু পরই সম্বিত ফিরিয়া পাইলাম। এক বর্ণনামতে হায়যূম জিবরীল (আ)-এর ঘোড়ার নাম। কিন্তু ইহা সঠিক বলিয়া প্রতীয়মান হয় না। কারণ অপর এক বর্ণনায় দেখা যায়, রাসূলুল্লাহ (স) জিবরীল (আ)-কে জিজ্ঞাসা করেন, বদর যুদ্ধের দিন "হায়যূম! সম্মুখে অগ্রসর হও” এই কথা কোন্ ফেরেশতা বলিয়াছিল? উত্তরে তিনি বলেন, হে মুহাম্মাদ! আকাশের সকল অধিবাসীকে তো আমি চিনি না।
অনুরূপ একটি ঘটনা মুহাম্মাদ ইবন উমার আল-আসলামী (র) আবূ রুহম আল-গিফারী (রা) হইতে, তিনি তাঁহার চাচাতো ভাই হইতে বর্ণনা করেন। তাহার চাচাতো ভাই বলেন, আমি ও আমার চাচাতো ভাই বদরের কূপের নিকট বিচরণ করিতেছিলাম। আমরা মুহাম্মাদের সঙ্গীদের সংখ্যা কম এবং কুরায়শদের সংখ্যা বেশী দেখিয়া বলিলাম, এই দুই দল যখন সংঘর্ষে লিপ্ত হইবে, আমরা মুহাম্মাদ ও তাহাদের সৈন্যদের কাছাকাছি থাকিব। তাই আমরা তাহাদের বামদিকে গেলাম। আমরা বলাবলি করিতেছিলাম, ইহারা তো কুরায়শদের চার ভাগের এক ভাগ। অতঃপর আমরা যখন তাহাদের বামদিকে চলিতেছিলাম তখন হঠাৎ একখণ্ড মেঘ আসিয়া আমাদিগকে ঢাকিয়া লইল। আমরা চক্ষু তুলিয়া উহার দিকে তাকাইলাম। আমরা পুরুষদের কণ্ঠস্বর ও অস্ত্রের ঝনঝনানী শুনিতে পাইলাম। আমরা শুনিলাম, এক ব্যক্তি তাহার ঘোড়াকে বলিতেছে, “হায়যূম! সম্মুখে অগ্রসর হও।" ইহার পর তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর ডানদিকে অবতরণ করিল। অতঃপর অনুরূপ আরও একটি দল আসিল। তাহারা রাসূলুল্লাহ (স) ও তাঁহার সঙ্গীদের সহিত অবস্থান করিল। এইবার তাহারা কুরায়শদের দ্বিগুণ হইয়া গেল। অতঃপর আমার চাচাতো ভাইটি মৃত্যুবরণ করিল। আর আমি সম্বিত ফিরিয়া পাইলাম। ইহার পর রাসূলুল্লাহ (স)-কে ইহা অবহিত করিলাম এবং ইসলাম গ্রহণ করিলাম।
ফেরেশতাদের দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত বহু মুশরিককে মুসলিম সেনাগণ প্রত্যক্ষ করেন। ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত। মুসলিম বাহিনীর এক লোক তাহার সম্মুখস্থ এক মুশরিককে প্রবল বেগে ধাওয়া করিতেছিলেন। হঠাৎ তাহার উপর চাবুকের আঘাতের আওয়ায এবং একজন অশ্বারোহীর কন্ঠস্বর শুনিতে পাইলেন। অশ্বarোহী বলিতেছিল, হায়যূম। সম্মুখে অগ্রসর হও। তখন তিনি সম্মুখস্থ মুশরিক ব্যক্তিটির দিকে তাঁকাইয়া দেখিলেন, সে ঢলিয়া পড়িতেছে। নিকটে আসিয়া দেখিলেন তাহার নাক ও চেহারায় চাবুকের আঘাত। সেই আঘাতের জায়গা সবুজ বর্ণ ধারণ করিয়াছে। উক্ত আনসারী সাহাবী আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-কে এই ঘটনা বিবৃত করিল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি সত্য বলিয়াছ, ইহা তৃতীয় আকাশ হইতে আগত সাহায্য।
বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবী আবূ দাউদ আল-মাযিনী (রা) বলেন, বদর যুদ্ধের দিন আমি মুশরিকদের এক ব্যক্তিকে হত্যা করিবার জন্য তাহার অনুসরণ করিতেছিলাম। তাহার প্রতি আমার তরবারি পৌঁছিবার পূর্বেই তাহার মস্তক লুটাইয়া পড়িল। আমি বুঝিতে পারিলাম যে, অন্য কেহ তাহাকে হত্যা করিয়াছে।
আর-রবী' ইব্‌ন আনাস (রা) বলেন, লোকে ফেরেশতাগণ কর্তৃক হত্যাকৃত ব্যক্তিকে চিনিত তাহার কাঁধের উপর ও জোড়ার উপর আঘাত দেখিয়া তাহা যেন আগুনে পোড়া চিহ্নের ন্যায়।
সুহায়ল ইব্‌ন আমর (রা) বলেন, বদর যুদ্ধের দিন আমি বহু লোককে দেখিলাম সাদা পোশাক পরিহিত, সাদা-কালো মিশ্রিত রংয়ের ঘোড়ার উপর আরোহী, যাহা আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যস্থল জুড়িয়া ছিল এবং যাহা ছিল বিশেষভাবে চিহ্নিত। তাহারা হত্যা ও বন্দী করিতেছিল। কোনও কোনও রিওয়ায়াত দ্বারা বুঝা যায় যে, ফেরেশতাগণ গিরিগুহা হইতেও আত্মপ্রকাশ করিয়াছিলেন। যেমন-
আবু উসায়দ (রা) তাহার চক্ষু অন্ধ হইবার পর বলিতেন, এখন যদি আমি তোমাদের সহিত বদর প্রান্তরে থাকিতাম এবং আমার চক্ষু ভাল থাকিত তবে অবশ্যই আমি তোমাদিগকে সেই গুহা দেখাইতাম যেখান হইতে ফেরেশতাকুল বাহির হইয়াছিল। এই ব্যাপারে আমি কোনরূপ সন্দেহ-সংশয় পোষণ করি না।
আবু বুরদা ইব্‌ন নিয়ার (রা) বলেন, বদর যুদ্ধের দিন আমি তিনটি মস্তক আনিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে রাখিয়া বলিলাম, ইহার দুইটি মস্তকধারীকে আমি হত্যা করিয়াছি। আর তৃতীয় মস্তকধারীকে আমি দেখিলাম সাদা লম্বা এক লোক হত্যা করিল। অতঃপর আমি তাহার মস্তক লইয়া আসিয়াছি। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, সে (হত্যাকারী সাদা লম্বা লোকটি) অমুক ফেরেশতা।
আস-সাইব ইব্‌ন আবী হুবায়শ (রা) উমার (রা)-এর খিলাফাত আমল বর্ণনা করিতেন, আল্লাহ্র কসম! মানুষের মধ্যে কেহই আমাকে বন্দী করে নাই। তাহাকে বলা হইল, তবে কে (আপনাকে বন্দী করিয়াছে)? তিনি বলিলেন, কুরায়শগণ যখন পরাজিত হইল তখন আমিও তাহাদের সহিত পরাজিত হইলাম। তখন লম্বা এক লোক, যিনি সাদা ঘোড়ায় আরোহী ছিলেন, অপর এক বর্ণনামতে সাদা এক লোক, যিনি সাদা-কালো রংয়ের ঘোড়ার পিঠে আরোহী ছিলেন, তিনি আমাকে ধরিয়া বাঁধিয়া ফেলিলেন। ইতোমধ্যে আবদুর রহমান ইব্‌ন আওফ আসিয়া আমাকে বাঁধা অবস্থায় পাইলেন। তিনি সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্য চীৎকার দিয়া বলিলেন, এই লোককে কে বন্দী করিয়াছে? কেহই ইহার উত্তর দিল না। এইভাবে তিনি আমাকে লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিলে তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমাকে কে বন্দী করিয়াছে? আমি বলিলাম, আমি তাহাকে চিনি না। আমি যাহা দেখিয়াছি তাহা তাঁহার নিকট বিবৃত করিতে অপছন্দ করিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমাকে এক ফেরেশতা বন্দী করিয়াছেন। আর হে ইব্‌ন আওফ! তোমার বন্দীকে লইয়া যাও।
হাকীম ইব্‌ন হিযাম (রা) বলেন, বদরের দিন আমরা দেখিলাম আকাশ হইতে একটি সেলাইকৃত কাপড় পতিত হইল যাহা আকাশের প্রান্তসীমা বন্ধ করিয়া দিল। তখন উপত্যকা পিপীলিকায় পূর্ণ হইয়া গেলে আমার মনে হইল, ইহা আকাশের কোনও জিনিস যাহা দ্বারা মুহাম্মাদকে সাহায্য করা হইতেছে। অতঃপর শত্রুর পরাজয় হইল। আর উহা ছিল ফেরেশতা। জুবায়র ইবন মুতইম (রা) হইতেও অনুরূপ একটি রিওয়ায়াত বর্ণিত আছে।
আবদুর রহমান ইব্‌ন আওফ (রা) বলেন, বদর যুদ্ধের দিন আমি দুই ব্যক্তিকে দেখিলাম। তাঁহাদের একজন রাসূলুল্লাহ (স)-এর ডানে এবং একজন বামে থাকিয়া প্রচণ্ড যুদ্ধ করিয়াছে। অতঃপর তৃতীয় এক ব্যক্তি আসিয়া তাঁহার পিছনে থাকিয়া যুদ্ধ করিতে লাগিল। একটু পরই চতুর্থ ব্যক্তি আসিয়া তাঁহার সম্মুখে যুদ্ধ করিতে লাগিল।
ইব্‌ন আব্বাস ও আলী (রা) হইতে বর্ণিত। আব্বাসকে বন্দী করেন আবুল ইয়াসার। তিনি ছিলেন হাঙ্কা-পাতলা আর আব্বাস ছিলেন মোটাতাজা ও ভারী। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, হে আবুল ইয়াসার! তুমি আব্বাসকে কিভাবে বন্দী করিলে? তিনি বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে এই কাজে এমন এক ব্যক্তি সাহায্য করিয়াছে যাহাকে আমি পূর্বে কখনও দেখি নাই এবং পরেও দেখি নাই। তাঁহার আকৃতি এইরূপ এইরূপ...। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বলিলেন, তোমাকে এই কাজে সাহায্য করিয়াছে একজন সম্মানিত ফেরেশতা।
আতিয়্যা ইন্ন কায়স বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) যখন বদر যুদ্ধ শেষ করিলেন তখন জিবরীল (আ) একটি লাল রংয়ের উষ্ট্রীতে আরোহণ করিয়া আসিলেন। তাঁহার পরনে ছিল লৌহবর্ম এবং সঙ্গে ছিল তীর। তিনি বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! আল্লাহ আমাকে আপনার নিকট প্রেরণ করিয়াছেন এবং আমাকে নির্দেশ দিয়াছেন যে, আপনি সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত আমি যেন আপনার নিকট হইতে পৃথক না হই। আপনি কি সন্তুষ্ট হইয়াছেন? তিনি বলিলেন, হাঁ, আমি সন্তুষ্ট হইয়াছি। অতঃপর জibরীল (আ) চলিয়া গেলেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00