📄 মুসলমানদের প্রথম শহীদ
নিয়মিত যুদ্ধ শুরু হইবার পূর্বেই মুসলিম বাহিনীর দুইজন সৈন্য শাহাদাত বরণ করেন। ইবন ইসহাক ও ইবন সা'দ-এর বর্ণনামতে মুসলমানদের মধ্যে সর্বপ্রথম শাহাদাত লাভ করেন মুহাজির সাহাবী উমার ইবনুল খাত্তাব (রা)-এর মুক্তদাস মিহজা' (রা)। শত্রুসৈন্য 'আমের ইবনুল হাদরামী কর্তৃক নিক্ষিপ্ত একটি তীর বিদ্ধ হইয়া তিনি শহীদ হন। অতঃপর আনসারদের মধ্যে আদী ইবনুন, নাজ্জার গোত্রের আল-হারিছা ইব্ন সুরাকা তীরবিদ্ধ হন। হাউয হইতে পানি পান করিবার সময় একটি তীর আসিয়া তাঁহার কণ্ঠনালীতে বিদ্ধ হইলে তিনি শাহাদাত লাভ করেন। হিব্বান ইবনুল আরিকার নিক্ষিপ্ত তীরে তিনি শহীদ হন (ইবন সা'দ, তাবাকাত, ২খ., পৃ. ১৬-১৭; ইব্ন হিশাম, আস-সীরা, ২খ., পৃ. ১৬৯)। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে জান্নাতুল ফিরদাওসের বাসিন্দা বলিয়া ঘোষণা করেন।
আনাস (রা) হইতে বর্ণিত যে, বদর যুদ্ধের দিন যুদ্ধশেষে হারিছার মাতা আসিয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! হারিছা সম্পর্কে আমাকে বলুন। সে যদি জান্নাতী হয় তবে আমি ধৈর্য ধারণ করিব। আর তাহা না হইলে আল্লাহ দেখিবেন আমি কি করি (অর্থাৎ বিলাপ করিয়া কাঁদিব ও মাতম করিব। উল্লেখ্য যে, তখনও ইহা নিষিদ্ধ হয় নাই)। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে বলিলেন, ধিক তোমাকে! জানিয়া রাখো, জান্নাত আটটি। তোমার পুত্র সর্বোচ্চ জান্নাত জান্নাতুল ফিরদাওসে পৌছিয়াছে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ২৭৪)।
📄 যুদ্ধের সূচনায় মল্লযুদ্ধ
আল-উমাবীর বর্ণনামতে আল-আসওয়াদ ইবন 'আবদিল আসাদ আল-মাখযূমী নিহত হওয়ার ফলে কুরায়শ নেতা উতবা ইব্ন রাবী'আ উত্তেজিত হইয়া পড়িল এবং স্বীয় বীরত্ব প্রদর্শন করিতে চাহিল। সে স্বীয় ভ্রাতা শায়با ইবন রাবী'আ ও পুত্র আল-ওয়ালীদকে লইয়া প্রকাশ্য ময়দানে অবতীর্ণ হইল। তাহারা উভয় সেনাদলের কাতারের মধ্যখানে আসিয়া মল্লযুদ্ধের আহবান জানাইল। তখন আসনারদের মধ্য হইতে তিন ব্যক্তি তাহাদের মুকাবিলায় বাহির হইলেন। ইবন সা'দ-এর বর্ণনামতে, তাহারা হইলেন 'আওফ ইবনুল হারিছ, মু'আয ইবনুল হারিছ ও মু'আওবিয ইবনুল হারিছ নামক ভ্রাতৃত্রয়। ইহাদের মাতার নাম ছিল 'আফরা। ইব্ন কাছীর-এর বর্ণনামতে তৃতীয় ব্যক্তি হইলেন আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা)। উতবা জিজ্ঞাসা করিল, তোমরা কাহারা? তাঁহারা উত্তর দিলেন, আমরা আনসারদের লোক।
উতবা বলিল, আমাদের তোমাদের কোনও প্রয়োজন নাই। এক বর্ণনামতে তাহারা বলিল, সম্মানিত সমতুল্য ব্যক্তিবর্গ। তবে আমাদের চাচার বংশের লোকজনকে আমাদের নিকট বাহির করিয়া দাও। তাহাদের একজন ডাকিয়া বলিল, হে মুহাম্মাদ! আমাদের স্বগোত্রীয় সমতুল্য লোকদিগকে আমাদের নিকট পাঠাও। তখন নবী (স) বলিলেন, উঠ হে 'উবায়দা ইবনুল হারিছ! উঠ হে হামযা! উঠ হে আলী! ইবন সা'দ-এর বর্ণনামতে রাসূলুল্লাহ (স) বানু হাশিমকে ডাকিয়া বলিয়াছিলেন, হে বানু হাশিম। তোমরা উঠ। হক প্রতিষ্ঠায় যুদ্ধ কর যাহা লইয়া আল্লাহ তোমাদের নবীকে প্রেরণ করিয়াছেন। উহারা তো বাহির হইয়া আসিয়াছে আল্লাহ্ নূরকে নিভাইয়া দেওয়ার জন্য। তখন হামযা ইবন আবদিল মুত্তালিব, আলী ইব্ন আবী তালিব ও উবায়দা ইবনুল হারিছ উঠিয়া ময়দানে গিয়া দাঁড়াইলেন।
আল-উমাবী ও ইবন সা'দ-এর বর্ণনামতে আনসারগণ মুকাবিলার জন্য বাহির হইলে রাসূলুল্লাহ (স) তাহা অপসন্দ করেন। কারণ এই প্রথম তিনি শত্রুর মুকাবিলা করিতেছেন। তাই তিনি চাহিতেছিলেন, মুকাবিলাকারী তাঁহারই পরিবারের লোক হউক। তাই তিনি তাহাদিগকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিয়া কাতারের মধ্যে ফেরত যাইবার নির্দেশ দিলেন এবং তাঁহার পরিবারের এই তিনজনকে বাহির হইবার নির্দেশ দিলেন।
অতঃপর ইহারা উঠিয়া ময়দানে কাফিরদের নিকটবর্তী হইলে উতবা বলিল, তোমরা কথা বল, যাহাতে আমরা চিনিতে পারি। তাহাদের পরনে লৌহ-শিরস্ত্রাণ ছিল। সেইজন্যই উতবা এরূপ বলিয়াছিল। তখন হামযা (রা) বলিলেন, আমি হামযা ইব্ন আবদিল মুত্তালিব; আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের সিংহ। উতবা বলিল, সম্মানিত সমতুল্য ব্যক্তি আর আমি মিত্রবর্গের সিংহ। তোমার সহিত এই দুইজন কাহারা? হামযা (রা) বলিলেন, আলী ইবন আবী তালিব ও উবায়দা ইবনুল হারিছ। উতবা বলিল, উভয়েই সম্মানিত সমতুল্য ব্যক্তি। ইহাদের মধ্যে 'উবায়দা ইবনুল হারিছ ছিলেন বয়বৃদ্ধ। অতঃপর 'উবায়দা উতবার সহিত, হামযা (রা) শায়বার সহিত এবং আলী (রা) আল-ওয়ালীদের সহিত মল্লযুদ্ধে লিপ্ত হইলেন। ইহা ইন্ন কাছীর-এর বর্ণনা। ইবন সা'দ-এর বর্ণনামতে, হামযা (রা) উতবার সহিত এবং উবায়দা (রা) শায়বার সহিত মল্লযুদ্ধে লিপ্ত হন। অতঃপর হামযা (রা) নিমিষেই তাঁহার প্রতিদ্বন্দ্বী শায়বাকে হত্যা করেন। আলী (রা)-ও নিমিষেই তাঁহার প্রতিদ্বন্দ্বী আল-ওয়ালীদকে হত্যা করেন। 'উবায়দা (রা) ও 'উতবা উভয়ে আঘাত পাল্টা আঘাত হানিতে লাগিলেন। উভয়েই উভয়কে ঘায়েল করিয়া ফেলিলেন। ইবন সা'দ-এর বর্ণনামতে, শায়বা 'উবায়দার একটি পা কাটিয়া ফেলে। অতঃপর হামযা ও আলী (রা) উভয়ে তরবারি চালাইয়া দ্রুত তাহাকে হত্যা করেন এবং তাঁহাদের সঙ্গী উবায়দাকে বহন করিয়া সাহাবীদের মধ্যে লইয়া আসেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পাশেই তাঁহাকে শোয়াইয়া দিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার পাখানি তাহাকে দেখাইলেন। উবায়দা (রা) উক্ত পায়ের উপর স্বীয় মুখ রাখিয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আবূ তালিব যদি আমাকে দেখিত তবে অবশ্যই বুঝিতে যে, আমিই তাহার এই কবিতার যোগ্য ব্যক্তি:
كذبتم وبيت الله نبزى محمدا ولما نطاعن حوله ونناضل ونسلمه حتى نصرع دونه ونزهل عن ابنائنا والحلائل.
"তোমরা মিথ্যা বলিয়াছ, আল্লাহ্র ঘরের কসম। মুহাম্মাদকে ছিনাইয়া লওয়া বা তাঁহার উপর বিজয়ী হওয়া যায় না, যখন আমরা তাঁহার চতুষ্পার্শ্ব হইতে বল্লম ও তীর নিক্ষেপ করি। আমরা তাঁহাকে সমর্পণ করিব না, এমনকি আমরা তাঁহার সম্মুখে লুটাইয়া পড়িব এবং আমাদের সন্তান-সন্ততি ও স্ত্রীদের কথা ভুলিয়া যাইব।"
অতঃপর যুদ্ধশেষে ফিরিবার পথে তিনি ইনতিকাল করিলে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, তুমি শহীদ।
বদর যুদ্ধের দিন মল্লযুদ্ধে অংশগ্রহণকারিগণ তথা 'উবায়দা (রা), হামযা (রা) ও আলী (রা) এবং উতবা ইবন রাবীআ, শায়ba ইবন রাবী'আ ও আল-ওয়ালীদ ইবন 'উতবা সম্পর্কে এই আয়াত নাযিল হয়: هُذَانِ خَصْمَانِ اخْتَصَمُوا فِي رَبِّهِمْ. "ইহারা দুইটি বিবদমান পক্ষ, তাহারা তাহাদের প্রতিপালক সম্বন্ধে বিতর্ক করে" (২২:১৯)।
আলী (রা) হইতে এইরূপ বর্ণিত আছে।
আবুল আলিয়া হইতে বর্ণিত যে, কাফিরদের তিনজন মল্লযুদ্ধে যখন নিহত হইল এবং মুসলমানদের তিনজন ফিরিয়া গেল তখন আবু জাহল ও তাহার সঙ্গীবৃন্দ বলিল, আমাদের 'উয্যা (দেবতা) রহিয়াছে, তোমাদের কোনও 'উয্যা নাই। ইহা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর পক্ষ হইতে এক ঘোষক বলিয়া উঠিল, আল্লাহ আমাদের অভিভাবক, তোমাদের কোনও অভিভাবক নাই।
📄 সাহাবীদের সম্মুখ সমরে উদ্বুদ্ধকরণ এবং 'উমায়র-এর শাহাদাতবরণ
রাসূলুল্লাহ (স) আরীশ হইতে বাহির হইয়া আসিয়া সাহাবায়ে কিরামকে সম্মুখ জিহাদে উদ্বুদ্ধ ও উৎসাহিত করিলেন। তিনি বলিলেন, সেই সত্তার কসম যাঁহার হাতে মুহাম্মাদের জীবন! আজ কোনও ব্যক্তি যদি এমনভাবে যুদ্ধ করে যে, সে ধৈর্য ধারণকারী, ছওয়াবের প্রত্যাশী, সম্মুখে অগ্রসরমান, পশ্চাতে নহে, এই অবস্থায় যদি সে নিহত হয় তবে আল্লাহ তাহাকে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করাইবেন (ইবন হিশাম, ২খ., পৃ. ২৭০)।
অন্য বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমরা এমন এক জান্নাতের জন্য উঠ যাহার প্রশস্ততা আসমান ও যমীনসম। তখন উমায়র ইবনুল হুমাম আল-আনসারী বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এমন জান্নাত যাহা আসমান ও যমীন পরিব্যাপ্ত! তিনি বলিলেন, হাঁ। উমায়র (রা) বলিলেন, বাহ্ বাহ্! রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, 'বাহ, বাহ বলিতে কিসে তোমাকে উদ্বুদ্ধ করিল? তিনি বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! শুধু এই আশায়ই যে, আমি উহার অধিবাসী হইব। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি উহার অধিবাসী। তিনি তখন কিছু খেজুর বাহির করিয়া খাইতেছিলেন। অতঃপর বলিলেন, এই খেজুরগুলি খাওয়া পর্যন্ত যদি আমি জীবিত থাকি তবে তাহা তো অনেক দীর্ঘ সময়! এই বলিয়া তিনি খেজুরগুলি ছুড়িয়া ফেলিয়া দিয়া যুদ্ধে ঝাঁপাইয়া পড়িলেন এবং যুদ্ধ করিতে করিতে শহীদ হইলেন। যুদ্ধ করিবার সময় তিনি এই কবিতা আবৃত্তি করিতেছিলেন:
ركضا إلى الله بغير زاد الا التقى وعمل المعاد والصبر في الله على الجهاد وكل زاد عرضة النفاد غير التقى والبر والرشاد
"আমি আল্লাহ্র প্রতি দৌড়াইয়া যাইতেছি পাথেয় ছাড়া। তাকওয়া, পরকালের আমল এবং জিহাদের জন্য আল্লাহর প্রতি ধৈর্য ধারণ ছাড়া। আর তাকওয়া, সৎকাজ এবং সোজা পথে বিচরণ ব্যতীত অন্য সকল পাথেয়ই বিলীন হইয়া যাইবে" (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ২৭৭; হায়াতুস সাহাবা, ১খ., পৃ. ৪১৬-১৭)।
📄 আওফ ইবনুল হারিছের শাহাদাত
আওফ ইবনুল হারিছের শাহাদাত: আওফ ইবনুল হারিছ আল-আনসারী, যাহার মাতা ছিলেন 'আফরা, রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট জিজ্ঞাসা করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! বান্দার কোন্ কাজে তাহার প্রতিপালক (আনন্দের আতিশয্যে) সন্তুষ্ট হন? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, বর্মহীন অবস্থায় শত্রুদের মধ্যে ঝাঁপাইয়া পড়ায়। অতঃপর তিনি শরীর হইতে বর্ম খুলিয়া ছুড়িয়া ফেলিলেন এবং তরবারি হাতে শত্রুদের সহিত যুদ্ধ করিতে করিতে শহীদ হইলেন (আত-তাবারী, তারীখ, ২খ., পৃ. ৪৪৮-৪৯; উয়ূনুল আছার, ১খ., পৃ. ২৯৯-৩০০)।