📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর আরীশে প্রবেশ ও আল্লাহ্র নিকট মুনাজাত

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর আরীশে প্রবেশ ও আল্লাহ্র নিকট মুনাজাত


রাসূলুল্লাহ (স)-এর আরীশে প্রবেশ ও আল্লাহর নিকট মুনাজাত : মুসলিম বাহিনীকে কাতারবন্দী করার পর রাসূলুল্লাহ (স) 'আরীশে প্রবেশ করিলেন। তখন তাঁহার সঙ্গে ছিলেন কেবল আবূ বাক্স (রা), আর কেহই সেখানে ছিল না। তিনি সেখানে কাকুতি-মিনতি সহকারে মহান আল্লাহ্র দরবারে তাঁহার সাহায্য প্রার্থনা করিয়া দু'আ করিতে লাগিলেন। বিভিন্নভাবে তিনি দু'আ করিলেন। কখনও সিজদায় পড়িয়া, কখনও উভয় হস্ত উত্তোলন করিয়া। দু'আর মধ্যে তিনি বলিলেন:
اللهم ان تهلك هذه العصابة اليوم لا تعبد بعدها في الأرض.
“হে আল্লাহ! এই দলটি যদি আজ ধ্বংস হইয়া যায় তাহা হইলে আর পৃথিবীতে তোমার ইবাদত করা হইবে না" (ইবন হিশাম, আস-সীরা, ২খ., পৃ. ২৬৯)।
তিনি আরও বলিলেন:
أنجزلي ما وعدتني اللهم نصرك.
"হে আল্লাহ! তুমি আমার নিকট যে অঙ্গীকার করিয়াছ তাহা পূরণ কর। হে আল্লাহ! তোমার সাহায্য পাঠাও”।
আকাশের দিকে হস্ত উত্তোলন করিয়া তিনি এই দু'আ করিতেছিলেন। ইহাতে এক পর্যায়ে তাঁহার উভয় কাঁধ হইতে চাদর পড়িয়া গেল। আবূ বাক্স (রা) তাঁহার পিছনে থাকিয়া চাদর তুলিয়া দিতেছিলেন এবং তাঁহার অধিক কান্নাকাটির কারণে সমবেদনা ও সান্ত্বনাদান পূর্বক বলিতেছিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ক্ষান্ত হউন। আপনার প্রতিপালকের নিকট প্রার্থনা সীমিত করুন। কারণ অতি সত্বর তিনি আপনাকে দেওয়া অঙ্গীকার পূরণ করিবেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ২৭২)। এই সময় রাসূলুল্লাহ (স) একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হইয়াছিলেন। তিনি জাগ্রত হইয়া বলিলেন, সুসংবাদ গ্রহণ কর হে আবু বাক্স! আল্লাহ্র সাহায্য আসিয়া গিয়াছে। এই হইল জিবরীল, ঘোড়ার লাগাম ধরিয়া সম্মুখে ধূলা উড়াইয়া উহাকে হাঁকাইয়া আসিতেছে (ইবন হিশাম, আস-সীরা, ২খ., পৃ. ২৬৯; 'উয়ূনুল আছার, ১খ., পৃ. ২৯৮)।
এই সময় 'আরীশে আল্লাহ্র নিকট তাঁহার দু'আ ও কান্নাকাটির যে এক অবর্ণনীয় অবস্থার সৃষ্টি হইয়াছিল, বিভিন্ন রিওয়ায়াতে তাহা সুস্পষ্টরূপে ফুটিয়া উঠিয়াছে। আলী (রা) বলেন, আমি কিছুক্ষণ যুদ্ধ করিবার পর রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট দৌঁড়াইয়া আসিলাম, তিনি কি করিতেছেন তাহা দেখিবার জন্য। তিনি সিজদায় পড়িয়া বলিতেছেন, يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ (হে চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারক), ইহার বেশী আর কিছুই নহে। অতঃপর আমি যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়া যুদ্ধ করিতে লাগিলাম। ফিরিয়া আসিয়া দেখিলাম, তিনি সিজদায় পড়িয়া ইহাই বলিতেছেন। আমি আবারও যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরিয়া গেলাম। আবার আসিয়া দেখিলাম, তিনি সিজদায় পড়িয়া উহাই বলিতেছেন। অবশেষে আল্লাহ তাঁহাকে বিজয় দান করিলেন (আত-তাবাকাত, ২খ., পৃ. ২৬)।
ইবন মাসউদ (রা) বলেন, বদর যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (স) এই দু'আ করেন: اللهم اني انشدك عهدك ووعدك اللهم ان تهلك هذه العصابة لا تعبد. "হে আল্লাহ! আমি আপনার ওয়াদা ও অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন কামনা করিতেছি। হে আল্লাহ! আপনি যদি এই দলটিকে ধ্বংস করেন তবে আপনার ইবাদত করা হইবে না"।
অতঃপর ফিরিয়া উৎফুল্ল চিত্তে তিনি' বলিলেন, আমি যেন মুশরিকদের নিহত হইবার স্থানসমূহ দেখিতে পাইতেছি (ইউসুফ সালিহী আশ-শামী, প্রাগুক্ত, ৪খ., পৃ. ৩৭; ইব্‌ন কাছীর, প্রাগুক্ত, ৩খ., পৃ. ২৭৬)।
উমার (রা) বলেন, বদর যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (স) মুশরিকদের দিকে দৃষ্টিপাত করিলেন। তাহারা ছিল সংখ্যায় এক হাজার, আর তাঁহার সাহাবীগণ ছিলেন ৩১৯ জন। অতঃপর তিনি কিবলামুখী হইয়া উভয় হস্ত প্রসারিত করিয়া দিলেন এবং তাঁহার প্রতিপালকের নিকট এই বলিয়া দু'আ করিতে লাগিলেন: اللهم انجزلي ما وعدتني اللهم اتني ما وعدتني اللهم أن تهلك هذه العصابة من اهل الاسلام لا تعبد في الارض. "হে আল্লাহ! তুমি আমার নিকট যে অঙ্গীকার করিয়াছ তাহা পূরণ কর। হে আল্লাহ! তুমি আমার নিকট যাহার ওয়াদা করিয়াছ তাহা আমাকে দাও, হে আল্লাহ! মুসলমানদের এই দলটিকে যদি তুমি ধ্বংস করিয়া দাও তবে পৃথিবীতে তোমার ইবাদত করা হইবে না"।
অতঃপর এইভাবেই তিনি কিবলামুখী হইয়া উভয় হস্ত প্রসারিত করিয়া অবিরত তাঁহার প্রতিপালকের নিকট দু'আ করিতে থাকিলেন, এমনকি তাঁহার কাঁধ হইতে চাদর পড়িয়া গেল। আবূ বাক্স (রা) আসিয়া তাঁহার কাঁধে চাদর তুলিয়া দিলেন, অতঃপর তিনি চাদর আঁকড়াইয়া ধরিয়া রাখিলেন। তিনি বলিলেন, হে আল্লাহ্ নবী! আপনার প্রতিপালকের নিকট চাওয়া যথেষ্ট হইয়াছে। অতি সত্বর তিনি আপনাকে দেওয়া অঙ্গীকার পূরণ করিবেন। অতঃপর আল্লাহ এই আয়াত (৮ : ৯) নাযিল করিলেন: إِذْ تَسْتَغِيْثُوْنَ رَبَّكُمْ... مردفين (ইউসুফ সালিহী আশ-শামী, প্রাগুক্ত, ৪খ., পৃ. ৩৭-৩৮)।
উবায়দুল্লাহ ইব্‌ন আবদুল্লাহ ইব্‌ন উতবা বলেন, বদর যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (স) মুশরিকদের প্রতি দৃষ্টিপাত করিলেন এবং মুসলমানদের প্রতিও দৃষ্টিপাত করিলেন। মুশরিকদের তুলনায় মুসলমানদের সংখ্যা কম দেখিয়া তিনি দুই রাক্'আত সালাত আদায় করিলেন। আবূ বাক্স তাঁহার ডান পাশে দাঁড়াইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) সালাতের মধ্যে বলিলেন:
اللهم لا تودع منى اللهم لا تخذلنى اللهم انشدك ما وعدتني.
"হে আল্লাহ! তুমি আমাকে পরিত্যাগ করিও না। হে আল্লাহ! আমাকে অপদস্থ করিও না। হে আল্লাহ! তুমি আমার নিকট যাহার অঙ্গীকার করিয়াছ আমি তাহাই চাহিতেছি"।
ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত যে, বদরের দিন রাসূলুল্লাহ (স) উঁচু স্থানে (কুব্বায়) থাকিয়া বলিতেছিলেন:
اللهم اني انشدك عهدك ووعدك اللهم ان تشأ لم تعبد.
"হে আল্লাহ! আমি তোমার ওয়াদা ও অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন চাহিতেছি। হে আল্লাহ! তুমি ইচ্ছা করিলে আজিকার পর আর কখনও তোমার ইবাদাত করা হইবে না" (আল-বুখারী, আস-সাহীহ, কিতাবুল মাগাযী, হাদীছ নং ৩৯৫৩)।
ইবন আব্বাসেরই অপর বর্ণনায় আছে, তিনি আরও বলিতেছিলেন:
اللهم ان ظهروا على هذه العصابة ظهر الشرك وما يقوم لك دين.
"হে আল্লাহ! তাহারা যদি এই দলের উপর বিজয়ী হয় তবে শিরকের প্রসার ঘটিবে এবং তোমার দীন প্রতিষ্ঠিত হইবে না"।
তখন আবূ বাক্স (রা) দুই হাতে তাঁহাকে ধরিয়া বলিলেন, যথেষ্ট হইয়াছে ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আপনার প্রতিপালকের প্রতি বেশী দু'আ করিয়াছেন (সুবুলুল হুদা, ৪খ., পৃ. ৩৭-৩৮; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ২৭৬)।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) দ্রুত লৌহবর্ম পরিধান করিলেন এবং বলিলেন:
سَيُهْزَمُ الجَمْعُ وَيُوَلُّوْنَ الدُّبْرُ . بَلِ السَّاعَةُ مَوْعِدُهُمْ وَالسَّاعَةُ أَدْهُى وَأَمَرُّ.
"এই দল তো শীঘ্রই পরাজিত হইবে এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিবে। অধিকন্তু কিয়ামত তাহাদের শাস্তির নির্ধারিত কাল এবং কিয়ামত হইবে কঠিনতর ও তিক্ততর" (৫৪:৪৫-৬)।
আবূ জাহলের বদদু'আঃ উভয় পক্ষ মুখামুখী হইলে কুরায়শ নেতা আবূ জাহল আল্লাহ্র নিকট এই বলিয়া দু'আ করিয়াছিল:
اللهم أقطعنا الرحم واتانا بما لا يعرف فاحنه الغداة.
"হে আল্লাহ! সে আমাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করিয়াছে এবং আমাদের নিকট এক অপরিচিত বিষয় লইয়া আসিয়াছে। তাই আগামী কালই তুমি তাহাকে ধ্বংস কর" (ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরা, ২খ., পৃ. ২৭০; 'উয়ূনুল আছার, ১খ., পৃ. ৩০০)।
ইব্‌ন আব্বাস (রা)-এর এক বর্ণনামতে আবু জাহল তাহার অভিশাপের মধ্যে ইহাও বলিয়াছিল:
اللهم من كان أحب إليك وأرضى عندك فانصره اليوم.
"হে আল্লাহ! তোমার নিকট যে প্রিয় এবং তুমি যাহার উপর সন্তুষ্ট অদ্য তাহাকেই তুমি সাহায্য কর" (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ২৩৯; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৪খ., পৃ. ৪৬)।
এই বদদু'আ তাহার নিজের উপরই পতিত হইয়াছিল এবং সে নিজেই ধ্বংস হইয়াছিল। এই সম্পর্কেই নাযিল হয়:
إِنْ تَسْتَفْتِحُوا فَقَدْ جَاءَكُمُ الْفَتْحُ.
"তোমরা মীমাংসা চাহিয়াছিলে তাহা তো তোমাদের নিকট আসিয়াছে" (৮:১৯)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কাফিরদের মধ্যে সর্বপ্রথম নিহত ব্যক্তি

📄 কাফিরদের মধ্যে সর্বপ্রথম নিহত ব্যক্তি


নিয়মিত যুদ্ধ শুরু হইবার পূর্বে কাফিরদের আল-আসওয়াদ ইবন 'আবদিল আসাদ আল-মাখযুমী নিজের হিংসা ও একগুয়েমীর কারণে মুসলমানদের হাতে নিহত হয়। ইব্‌ন ইসহাক বর্ণনা করেন যে, আল-আসওয়াদ ছিল এক দুশ্চরিত্রের লোক। সে বাহির হইয়া বলিল, আমি আল্লাহর নামে কসম করিতেছি যে, আমি অবশ্যই মুসলমানদের হাউয হইতে পানি পান করিব অথবা উহা নষ্ট করিয়া দিব অথবা উহার সামনে মৃত্যুবরণ করিব। সে উক্ত সংকল্প করিয়া বাহির হইলে মুসলিম বাহিনীর হামযা ইব্‌ন আবদিল মুত্তালিবও তাহাকে মুকাবিলা করার উদ্দেশ্যে বাহির হইলেন। উভয়ে মুখামুখী হইতেই হামযা (রা) তাহাকে তরবারি দ্বারা আঘাত করিয়া তাহার পা নলার মধ্যভাগ হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া ফেলিলেন। সে তখন হাউযের সম্মুখে ছিল। ফলে সে চীৎ হইয়া মাটিতে পড়িয়া গেল। তাহার পা দিয়া তখন তীরবেগে রক্ত প্রবাহিত হইতেছিল। সে হামাগুড়ি দিয়া হাউযের দিকে অগ্রসর হইল এবং উহার মধ্যে গিয়া পড়িল। ইহা দ্বারা সে তাহার শপথ পূর্ণ করার ইচ্ছা করিল। হামযা (রা)-ও তাহার অনুসরণ করিলেন এবং হাউযের মধ্যে তাহাকে হত্যা করিলেন (ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরা, ২খ., পৃ. ২৬৭; আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ২৪০)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মুসলমানদের প্রথম শহীদ

📄 মুসলমানদের প্রথম শহীদ


নিয়মিত যুদ্ধ শুরু হইবার পূর্বেই মুসলিম বাহিনীর দুইজন সৈন্য শাহাদাত বরণ করেন। ইবন ইসহাক ও ইবন সা'দ-এর বর্ণনামতে মুসলমানদের মধ্যে সর্বপ্রথম শাহাদাত লাভ করেন মুহাজির সাহাবী উমার ইবনুল খাত্তাব (রা)-এর মুক্তদাস মিহজা' (রা)। শত্রুসৈন্য 'আমের ইবনুল হাদরামী কর্তৃক নিক্ষিপ্ত একটি তীর বিদ্ধ হইয়া তিনি শহীদ হন। অতঃপর আনসারদের মধ্যে আদী ইবনুন, নাজ্জার গোত্রের আল-হারিছা ইব্‌ন সুরাকা তীরবিদ্ধ হন। হাউয হইতে পানি পান করিবার সময় একটি তীর আসিয়া তাঁহার কণ্ঠনালীতে বিদ্ধ হইলে তিনি শাহাদাত লাভ করেন। হিব্বান ইবনুল আরিকার নিক্ষিপ্ত তীরে তিনি শহীদ হন (ইবন সা'দ, তাবাকাত, ২খ., পৃ. ১৬-১৭; ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরা, ২খ., পৃ. ১৬৯)। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে জান্নাতুল ফিরদাওসের বাসিন্দা বলিয়া ঘোষণা করেন।
আনাস (রা) হইতে বর্ণিত যে, বদর যুদ্ধের দিন যুদ্ধশেষে হারিছার মাতা আসিয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! হারিছা সম্পর্কে আমাকে বলুন। সে যদি জান্নাতী হয় তবে আমি ধৈর্য ধারণ করিব। আর তাহা না হইলে আল্লাহ দেখিবেন আমি কি করি (অর্থাৎ বিলাপ করিয়া কাঁদিব ও মাতম করিব। উল্লেখ্য যে, তখনও ইহা নিষিদ্ধ হয় নাই)। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে বলিলেন, ধিক তোমাকে! জানিয়া রাখো, জান্নাত আটটি। তোমার পুত্র সর্বোচ্চ জান্নাত জান্নাতুল ফিরদাওসে পৌছিয়াছে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ২৭৪)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 যুদ্ধের সূচনায় মল্লযুদ্ধ

📄 যুদ্ধের সূচনায় মল্লযুদ্ধ


আল-উমাবীর বর্ণনামতে আল-আসওয়াদ ইবন 'আবদিল আসাদ আল-মাখযূমী নিহত হওয়ার ফলে কুরায়শ নেতা উতবা ইব্‌ন রাবী'আ উত্তেজিত হইয়া পড়িল এবং স্বীয় বীরত্ব প্রদর্শন করিতে চাহিল। সে স্বীয় ভ্রাতা শায়با ইবন রাবী'আ ও পুত্র আল-ওয়ালীদকে লইয়া প্রকাশ্য ময়দানে অবতীর্ণ হইল। তাহারা উভয় সেনাদলের কাতারের মধ্যখানে আসিয়া মল্লযুদ্ধের আহবান জানাইল। তখন আসনারদের মধ্য হইতে তিন ব্যক্তি তাহাদের মুকাবিলায় বাহির হইলেন। ইবন সা'দ-এর বর্ণনামতে, তাহারা হইলেন 'আওফ ইবনুল হারিছ, মু'আয ইবনুল হারিছ ও মু'আওবিয ইবনুল হারিছ নামক ভ্রাতৃত্রয়। ইহাদের মাতার নাম ছিল 'আফরা। ইব্‌ন কাছীর-এর বর্ণনামতে তৃতীয় ব্যক্তি হইলেন আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা)। উতবা জিজ্ঞাসা করিল, তোমরা কাহারা? তাঁহারা উত্তর দিলেন, আমরা আনসারদের লোক।
উতবা বলিল, আমাদের তোমাদের কোনও প্রয়োজন নাই। এক বর্ণনামতে তাহারা বলিল, সম্মানিত সমতুল্য ব্যক্তিবর্গ। তবে আমাদের চাচার বংশের লোকজনকে আমাদের নিকট বাহির করিয়া দাও। তাহাদের একজন ডাকিয়া বলিল, হে মুহাম্মাদ! আমাদের স্বগোত্রীয় সমতুল্য লোকদিগকে আমাদের নিকট পাঠাও। তখন নবী (স) বলিলেন, উঠ হে 'উবায়দা ইবনুল হারিছ! উঠ হে হামযা! উঠ হে আলী! ইবন সা'দ-এর বর্ণনামতে রাসূলুল্লাহ (স) বানু হাশিমকে ডাকিয়া বলিয়াছিলেন, হে বানু হাশিম। তোমরা উঠ। হক প্রতিষ্ঠায় যুদ্ধ কর যাহা লইয়া আল্লাহ তোমাদের নবীকে প্রেরণ করিয়াছেন। উহারা তো বাহির হইয়া আসিয়াছে আল্লাহ্ নূরকে নিভাইয়া দেওয়ার জন্য। তখন হামযা ইবন আবদিল মুত্তালিব, আলী ইব্‌ন আবী তালিব ও উবায়দা ইবনুল হারিছ উঠিয়া ময়দানে গিয়া দাঁড়াইলেন।
আল-উমাবী ও ইবন সা'দ-এর বর্ণনামতে আনসারগণ মুকাবিলার জন্য বাহির হইলে রাসূলুল্লাহ (স) তাহা অপসন্দ করেন। কারণ এই প্রথম তিনি শত্রুর মুকাবিলা করিতেছেন। তাই তিনি চাহিতেছিলেন, মুকাবিলাকারী তাঁহারই পরিবারের লোক হউক। তাই তিনি তাহাদিগকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিয়া কাতারের মধ্যে ফেরত যাইবার নির্দেশ দিলেন এবং তাঁহার পরিবারের এই তিনজনকে বাহির হইবার নির্দেশ দিলেন।
অতঃপর ইহারা উঠিয়া ময়দানে কাফিরদের নিকটবর্তী হইলে উতবা বলিল, তোমরা কথা বল, যাহাতে আমরা চিনিতে পারি। তাহাদের পরনে লৌহ-শিরস্ত্রাণ ছিল। সেইজন্যই উতবা এরূপ বলিয়াছিল। তখন হামযা (রা) বলিলেন, আমি হামযা ইব্‌ন আবদিল মুত্তালিব; আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের সিংহ। উতবা বলিল, সম্মানিত সমতুল্য ব্যক্তি আর আমি মিত্রবর্গের সিংহ। তোমার সহিত এই দুইজন কাহারা? হামযা (রা) বলিলেন, আলী ইবন আবী তালিব ও উবায়দা ইবনুল হারিছ। উতবা বলিল, উভয়েই সম্মানিত সমতুল্য ব্যক্তি। ইহাদের মধ্যে 'উবায়দা ইবনুল হারিছ ছিলেন বয়বৃদ্ধ। অতঃপর 'উবায়দা উতবার সহিত, হামযা (রা) শায়বার সহিত এবং আলী (রা) আল-ওয়ালীদের সহিত মল্লযুদ্ধে লিপ্ত হইলেন। ইহা ইন্ন কাছীর-এর বর্ণনা। ইবন সা'দ-এর বর্ণনামতে, হামযা (রা) উতবার সহিত এবং উবায়দা (রা) শায়বার সহিত মল্লযুদ্ধে লিপ্ত হন। অতঃপর হামযা (রা) নিমিষেই তাঁহার প্রতিদ্বন্দ্বী শায়বাকে হত্যা করেন। আলী (রা)-ও নিমিষেই তাঁহার প্রতিদ্বন্দ্বী আল-ওয়ালীদকে হত্যা করেন। 'উবায়দা (রা) ও 'উতবা উভয়ে আঘাত পাল্টা আঘাত হানিতে লাগিলেন। উভয়েই উভয়কে ঘায়েল করিয়া ফেলিলেন। ইবন সা'দ-এর বর্ণনামতে, শায়বা 'উবায়দার একটি পা কাটিয়া ফেলে। অতঃপর হামযা ও আলী (রা) উভয়ে তরবারি চালাইয়া দ্রুত তাহাকে হত্যা করেন এবং তাঁহাদের সঙ্গী উবায়দাকে বহন করিয়া সাহাবীদের মধ্যে লইয়া আসেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পাশেই তাঁহাকে শোয়াইয়া দিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার পাখানি তাহাকে দেখাইলেন। উবায়দা (রা) উক্ত পায়ের উপর স্বীয় মুখ রাখিয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আবূ তালিব যদি আমাকে দেখিত তবে অবশ্যই বুঝিতে যে, আমিই তাহার এই কবিতার যোগ্য ব্যক্তি:
كذبتم وبيت الله نبزى محمدا ولما نطاعن حوله ونناضل ونسلمه حتى نصرع دونه ونزهل عن ابنائنا والحلائل.
"তোমরা মিথ্যা বলিয়াছ, আল্লাহ্র ঘরের কসম। মুহাম্মাদকে ছিনাইয়া লওয়া বা তাঁহার উপর বিজয়ী হওয়া যায় না, যখন আমরা তাঁহার চতুষ্পার্শ্ব হইতে বল্লম ও তীর নিক্ষেপ করি। আমরা তাঁহাকে সমর্পণ করিব না, এমনকি আমরা তাঁহার সম্মুখে লুটাইয়া পড়িব এবং আমাদের সন্তান-সন্ততি ও স্ত্রীদের কথা ভুলিয়া যাইব।"
অতঃপর যুদ্ধশেষে ফিরিবার পথে তিনি ইনতিকাল করিলে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, তুমি শহীদ।
বদর যুদ্ধের দিন মল্লযুদ্ধে অংশগ্রহণকারিগণ তথা 'উবায়দা (রা), হামযা (রা) ও আলী (রা) এবং উতবা ইবন রাবীআ, শায়ba ইবন রাবী'আ ও আল-ওয়ালীদ ইবন 'উতবা সম্পর্কে এই আয়াত নাযিল হয়: هُذَانِ خَصْمَانِ اخْتَصَمُوا فِي رَبِّهِمْ. "ইহারা দুইটি বিবদমান পক্ষ, তাহারা তাহাদের প্রতিপালক সম্বন্ধে বিতর্ক করে" (২২:১৯)।
আলী (রা) হইতে এইরূপ বর্ণিত আছে।
আবুল আলিয়া হইতে বর্ণিত যে, কাফিরদের তিনজন মল্লযুদ্ধে যখন নিহত হইল এবং মুসলমানদের তিনজন ফিরিয়া গেল তখন আবু জাহল ও তাহার সঙ্গীবৃন্দ বলিল, আমাদের 'উয্যা (দেবতা) রহিয়াছে, তোমাদের কোনও 'উয্যা নাই। ইহা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর পক্ষ হইতে এক ঘোষক বলিয়া উঠিল, আল্লাহ আমাদের অভিভাবক, তোমাদের কোনও অভিভাবক নাই।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00