📄 কাফেলাসহ আবূ সুফ্যানের পলায়ন
কাফেলাসহ আবু সুয়ানের পলায়ন: অপরদিকে আবু সুফ্যান ইবন হারব মুসলমানদের ভয়ে ভীত হইয়া পড়িয়াছিল। তাই সে তাহার কাফেলার আগে ভাগে অগ্রসর হইয়া উক্ত পানির নিকট আগমন করিল। এখানে আসিয়া সে মাজদী ইন্ন 'আমরকে জিজ্ঞাসা করিল, তুমি কি এখানে কাহারও আগমন টের পাইয়াছ? সে বলিল, আমি তো অপরিচিত কাহাকেও দেখি নাই। তবে দুইজন আরোহীকে দেখিয়াছি, যাহারা এই উঁচু ভূমিতে তাহাদের উট বাঁধিয়া রাখিয়া তাহাদের মশকে পানি ভরিয়া চলিয়া গিয়াছে। তখন আবূ সুফ্যান তাহাদের উট বাঁধার স্থানে গমন পূর্বক উটের বিষ্ঠা সংগ্রহ করিল, অতঃপর উহা ভাঙ্গিয়া ফেলিল এবং উহাতে খেজুরের আঁটি পাইয়া বলিয়া উঠিল, আল্লাহর কসম! ইহা ইয়াছরিবের খেজুরের আঁটি। এক বর্ণনামতে সে উহা তকিয়া দেখিয়া এই মন্তব্য করিয়াছিল, অতঃপর দ্রুত তাহার সঙ্গী দের নিকট ফিরিয়া আসিল এবং কাফেলাকে লইয়া বদর প্রান্তর বাম দিকে রাখিয়া পশ্চিমে সমুদ্রকূলের দিকে চলিয়া গেল। কাফেলাসহ সে খুব দ্রুতবেগে ছুটিতে লাগিল। এইভাবে একরাত্র এক দিন চলিবার পর তাহারা মুসলমানদের নাগালের বাহিরে চলিয়া গেল।
📄 কুরায়শদের নিকট আবু সুফ্যানের সংবাদ প্রেরণ
কুরায়শদের নিকট আবু সুফিয়ানের সংবাদ প্রেরণ : আবু সুফিয়ান যখন দেখিল যে, সে তাহার কাফেলাসহ মুসলিম বাহিনীর নাগালের বাহিরে চলিয়া আসিয়াছে। কাফেলার সবাই এখন নিরাপদ, তখন কায়স ইবন ইমরুল কায়স-এর মাধ্যমে কুরায়শদের নিকট সংবাদ পাঠাইল যে, তোমরা তো তোমাদের কাফেলা, তোমাদের লোকজন ও তোমাদের সম্পদ রক্ষা করিতে বাহির হইয়াছিলে। অথচ আল্লাহ উহা রক্ষা করিয়াছেন। তাই তোমরা ফিরিয়া আস। এই সংবাদ পাইয়া আবু জাহল ইবন হিশাম বলিল, আল্লাহর কসম! আমরা বদর প্রান্ত হতে অবতরণ না করিয়া ফিরিবনা। বদর প্রান্তরে আরবের মেলা বসিত। প্রতি বৎসর এখানকার বাজারে আরবের সকলে একত্র হইত। তাই আবু জাহল বলিল, আমরা এইখানে তিনদিন অবস্থান করিব। উট যবেহ করিব, খাওয়া-দাওয়া করিব এবং মদ পান করিব, আর গায়িকা দাসীরা আমাদিগকে গান শুনাইবে। সমস্ত আরবের লোকজন আমাদের আগমন সমাগমের কথা শুনিবে। ফলে ইহার পর হইতে তাহারা সর্বদা আমাদিগকে ভয় করিবে। তাই চল, আমরা তথায় গমন করি।
কিন্তু বুদ্ধিমান নেতৃবর্গ সম্মুখে অগ্রসর হওয়া অপছন্দ করিতেছিল। যাহারা পিছুটান দিতেছিল তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হইল : আল-হারিছ ইবন আমের, উমাইয়্যা ইবন খালাফ, উতবা ও শায়ba ইবন রাবী'আ, হাকীম ইবন হিযাম, আবুল বাখতারী, ‘আলী ইবন উমাইয়্যা ইবন খালাফ, আল-‘আস ইবন মুনাব্বিহ প্রমুখ। কিন্তু আবু জাহল তাহাদিগকে কাপুরুষতার অপবাদ দিতে লাগিল। আর এই কাজে উকবা ইবন আবী মু‘আয়াত ও আন-নাদর ইবনুল হারিছ ইবন কালদা তাহাকে সহযোগিতা করিতে লাগিল। অবশেষে সম্মুখে অগ্রসর হইবার জন্য সকলে ঐক্যবদ্ধ হইল। উল্লেখ্য যে, কুরায়শগণ এই সময় আল-জুহফা নামক স্থানে অবস্থান করিতেছিল। এই সময় যুহরা গোত্রের মিত্র আল-আখনাস ইবন শারীক যুহরা গোত্রকে লক্ষ্য করিয়া বলিল, হে যুহরা গোত্র! আল্লাহ তোমাদের সম্পদ রক্ষা করিয়াছেন, তোমাদের সঙ্গী মাখরামা ইবন নাওফালকে ছাড়াইয়া আনিয়াছেন। আর তোমরা তো বাহির হইয়াছিলে তাহাকে ও তাহার সম্পদ রক্ষা করিতে। তাই আমার উপর কাপুরুষতার দায়ভার চাপাইয়া ফিরিয়া চল। কারণ ধ্বংস ও যুদ্ধের জন্য বাহির হওয়ার এখন আর কোনও প্রয়োজন নাই। সে (আবু জাহল) যাহা বলিতেছে এইরুপ করার কোনো প্রয়োজন নাই। যুহরা গোত্র তাহাকে খুবই মান্য করিত। তাই তাহার কথামত তাহারা ফিরিয়া গেল। ফলে যুহরা গোত্রের কেহই বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে নাই। অনুরূপভাবে 'আদী ইব্ন কা'ব গোত্রেরও কেহ উক্ত যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে নাই।
মক্কা হইতে বাহির হইবার সময় সকল গোত্রের লোক কুরায়শদের সঙ্গী হইলেও কা'ব ইবন 'আদী গোত্রের কেহই তাহাদের সহিত বাহির হয় নাই। ইবন সা'দ-এর বর্ণনামতে তাহারা কুরায়শদের সঙ্গে ছিল কিন্তু ছানিয়্যা লাফ্ট (বা লিফাত) নামক স্থানে আসিবার পর শেষ রাত্রে উপকূল দিয়া তাহারা মক্কায় ফিরিয়া যায়। ফলে বানু যুহরা ও বানু কা'ব এই দুই গোত্রের কেহই বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে নাই। আবূ তালিবের পুত্র তালিবের সহিত কুরায়শদের কাহারও কাহারও দ্বন্দ্ব ছিল। তাহারা বলিল, আল্লাহ্র কসম, হে বানু হাশিম! আমরা জানি যে, তোমরা যদিও আমাদের সহিত আসিয়াছ, তোমাদের হৃদয় অবশ্যই মুহাম্মাদের দলে শামিল আছে।
📄 বদর প্রান্তরে উভয় পক্ষের অবতরণ
বদর প্রান্তরে উভয় পক্ষের অবতরণ
কুরায়শদল সম্মুখে অগ্রসর হইয়া উপত্যকার দূরপ্রান্তে বাতনে ওয়াদী ও উঁচু বালুর ঢিবির পিছনে অবতরণ করিল। আর রাসূলুল্লাহ (স) ও মুসলমানগণ উপত্যকার নিকট প্রান্তে বালুকাময় প্রান্তরে অবতরণ করিলেন। উহা ছিল নরম ভূমি। ফলে মানুষের পা ও জন্তু-জানোয়ারের ক্ষুর অবিয়া যাইতেছিল। প্রথমদিকে কাফিরগণ পানির নিকটবর্তী ছিল। ফলে তাহারা উহা সংরক্ষণ করিল। আর পুরাতন কূপও তাহারা সংস্কার করিয়া লইল। অপরদিকে কূপ হইতে দূরে থাকায় মুসলমানদের খুবই অসুবিধা হইল। তাহারা পিপাসার্ত রহিলেন। তাহাদের উযূ-গোসলেরও সমস্যা দেখা দিল। তখন শয়তান তাহাদের কতকের অন্তরে ক্রোধের সঞ্চার করিয়া দিল এবং এই বলিয়া কুমন্ত্রণা দিতে লাগিল, তোমরা ধারণা কর, তোমরাই হকের উপর আছ। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নবী আছেন, আর তোমরা আল্লাহর বন্ধু। অথচ মুশরিকগণ পানির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করিয়া লইয়াছে। তোমরা তৃষ্ণার্ত রহিয়াছ। তোমরা একাগ্রচিত্তে সালাত আদায় করিতেছ। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা সেই দিন রাত্রে প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টি বর্ষণ করিলেন যাহাতে সমস্ত উপত্যকা প্লাবিত হইল। উহাতে মুশরিকদের ভীষণ অসুবিধা হইল। তাহারা সম্মুখে অগ্রসর হইতে পারিল না। কিন্তু মুসলমানদের জন্য ইহা রহমতস্বরূপ হইল। ইহা দ্বারা আল্লাহ তাহাদিগকে পবিত্র করিলেন, শয়তানের কুমন্ত্রণার ক্লেদ দূর করিলেন। বৃষ্টিপাতের ফলে তাহাদের ভূমি সমতল হইল। বালু আঁটিয়া মজবুত হইয়া গেল। ইহাতে তাহাদের পা শক্ত হইল। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার সঙ্গী-সাথীসহ বদরের পানির নিকট গিয়া অবতরণ করিলেন। প্লাবনের পানি দ্বারা মুসলমানগণ তৃষ্ণা নিবারণ করিলেন, উযূ-গোসল সম্পন্ন করিলেন সওয়ারীগুলিকে পানি পান করাইলেন এবং নিজেদের পানপাত্রগুলি পূর্ণ করিয়া রাখিলেন। ইহার প্রতিই ইঙ্গিত করা হইয়াছে কুরআন কারীমের এই আয়াতে: اِذْ يُغَشِّيْكُمُ النُّعَاسَ اَمَنَةً مِّنْهُ وَيُنَزِّلُ عَلَيْكُمْ مِّنَ السَّمَاءِ مَاءً لِّيُطَهِّرَكُمْ بِهِ وَيُذْهِبَ عَنْكُمْ رِجْزَ الشَّيْطَانِ وَلِيَرْبِطَ عَلٰى قُلُوْبِكُمْ وَيُثَبِّتَ بِهِ الْاَقْدَامَ. "স্মরণ কর, তিনি তাঁহার পক্ষ হইতে শান্তির জন্য তোমাদিগকে তন্দ্রায় আচ্ছন্ন করেন এবং আকাশ হইতে তোমাদের উপর বারি বর্ষণ করেন। উহা দ্বারা তোমাদিগকে পবিত্র করিবার জন্য, তোমাদের মধ্য হইতে শয়তানের কুমন্ত্রণা অপসরণের জন্য, তোমাদের হৃদয় দৃঢ় করিবার জন্য এবং তোমাদের পা স্থির রাখিবার জন্য" (৮:১১)।
ইব্ন ইসহাকের বর্ণনামতে মুসলিম বাহিনীর আল-হুবাব ইব্নুল মুনযির ইব্নুল জামূহ এই সময় রাসূলুল্লাহ (স)-কে খুবই গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন, যাহা মুসলমানদের জন্য ছিল খুবই মঙ্গলজনক। তিনি বলিলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাদের এই অবতরণস্থল কি আল্লাহই আপনাকে নির্ধারণ করিয়া দিয়াছেন যাহা হইতে আমরা আর সম্মুখে বা পিছনে যাইতে পারিব না; নাকি ইহা শুধু নিজেদের অভিমত এবং যুদ্ধের কৌশল মাত্র? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ইহা নিছক নিজেদের অভিমত ও যুদ্ধের কৌশল মাত্র। হুবাব ইব্নুল মুনযির (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! ইহা আমাদের অবতরণস্থল নহে; বরং লোকজনসহ সম্মুখে চলুন, যাহাতে আমরা শত্রুপক্ষ হইতে পানির নিকটতর হইতে পারি। আমরা সেখানে অবতরণ করিব, অতঃপর পিছনের অন্যান্য কূপ নষ্ট করিয়া দিব। আর আমরা সেখানে একটি হাউজ নির্মাণ করিয়া উহাতে পানি পূর্ণ রাখিব। অতঃপর আমরা শত্রু পক্ষের সহিত যুদ্ধ করিব। তখন আমরা পানি পান করিতে পারিব আর উহারা পারিবে না। ইহা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি সঠিক মত ব্যক্ত করিয়াছ। ইব্ন সা’দ-এর বর্ণনামতে জিবরীল (আ) আসিয়া বলিলেন, হুবাব যাহা বলিয়াছে তাহাই সঠিক। হাফিজ ইব্ন কাছীর (র) ইব্ন আব্বাস (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, হুবাবের পরামর্শের সময় জিবরীল (আ) রাসূলুল্লাহ (স.)-এর ডান পাশে ছিলেন। তখন এক ফেরেশতা আসিয়া বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! আল্লাহ আপনাকে সালাম পাঠাইয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তিনিই সালাম, তাঁহার হইতেই আসে সালাম এবং তাঁহার প্রতিই সালাম। ফেরেশতা বলিলেন, আল্লাহ আপনাকে বলিয়া পাঠাইয়াছেন যে, হুবাব ইব্নুল মুনযির যে পরামর্শ দিয়াছে তাহাই সঠিক। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, হে জিবরীল! তুমি কি ইহাকে চিন? জিবরীল (আ) বলিলেন, আকাশের সকলকে আমি চিনি না, তবে সে সত্যবাদী, শয়তান নহে।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার সঙ্গী-সাথীসহ সম্মুখে অগ্রসর হইলেন। মধ্য রাত্রিতে তাঁহারা শত্রু পক্ষ হইতে পানির নিকটতর স্থানে আসিয়া অবতরণ করিলেন। তাঁহার নির্দেশে কূপগুলি বিনষ্ট করিয়া দেওয়া হইল। তাঁহারা যে কূপটির নিকট অবতরণ করিয়াছিলেন উহাতে হাউজ নির্মাণ করিয়া পানি পরিপূর্ণ করা হইল। অতঃপর তাঁহারা উহা হইতে নিজেদের পাত্রসমূহ পূর্ণ করিয়া লইলেন।
📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য আরীশ নির্মাণ
রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য 'আরীশ নির্মাণ আরীশ হইল তাঁবু সদৃশ যাহার উপরে ছাউনী থাকে, তবে আকৃতিতে ছোট। একজন লোক ভালভাবে তাহার নিচে অবস্থান করিতে পারে। বদর প্রান্তরে পৌঁছিবার পর আনসার নেতা সা'দ ইব্ন মু'আয (রা) বলিলেন, "ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা কি আপনার জন্য একটি 'আরীশ নির্মাণ করিয়া দিব যাহার মধ্যে আপনি অবস্থান করিবেন এবং আপনার নিকটেই আমরা আপনার উট প্রস্তুত রাখিব, অতঃপর আমরা গিয়া শত্রুর মুকাবিলা করিব? আল্লাহ যদি আমাদিগকে সম্মানিত করেন এবং শত্রুর উপর বিজয়ী করেন তবে তাহাই হইবে আমাদের পছন্দনীয় ও কাম্য। আর যদি ভিন্ন ফয়সালা হয় তবে আপনি উটে আরোহণ করিয়া মদীনায় যাহারা থাকিয়া গিয়াছে, তাহাদের সহিত যাইয়া মিলিত হইবেন। হে আল্লাহর নবী। আপনার পিছনে তো এমন একটি দল রহিয়া গিয়াছে, আমাদের চেয়েও যাহারা আপনাকে বেশী ভালোবাসে। তাহারা যদি অনুমান করিতে পারিত যে, আপনি যুদ্ধের সম্মুখীন হইবেন তবে কখনও তাহারা আপনার পিছনে পড়িয়া থাকিত না। আল্লাহ তাহাদের দ্বারা আপনাকে হেফাজত করিবেন। তাহারা আপনাকে সৎপরামর্শ দিবে, আপনার সহিত একত্রে মিলিয়া যুদ্ধ করিবে।"
ইহা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) তাহার প্রশংসা করিলেন এবং তাহার মঙ্গলের জন্য দু'আ করিলেন। অতঃপর তাঁহার জন্য যুদ্ধের ময়দানের দিকে মুখ করিয়া একটু উঁচু জায়গায় আরীশ বানানো হইল। তিনি সেখানে থাকিয়া আল্লাহ্র নিকট কান্নাকাটি করিয়া দু'আ করেন এবং সময় সময় যুদ্ধের ময়দানে গিয়া তদারকি করেন। এক বর্ণনামতে আরীশে তাঁহার সহিত আবূ বাক্স (রা)-ও ছিলেন এবং সা'দ ইবন মু'আয (রা) তরবারি সজ্জিত অবস্থায় দরজায় দাঁড়াইয়া প্রহরা দেন।