📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাহাবীগণের যাত্রা

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাহাবীগণের যাত্রা


রাসূলুল্লাহ (স) ও সাহাবীগণের যাত্রা: রাসূলে কারীম (স) স্বীয় সাহাবীগণকে লইয়া ২য় হিজরী অর্থাৎ হিজরতের ১৯ মাসের মাথায় রামাদান মাসে মদীনা হইতে এই যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বাহির হইলেন। ইবন সা'দ-এর বর্ণনামতে ১২ রামাদান শনিবার, আর ইন হিশাম-এর বর্ণনামতে ৮ রামাদান সোমবার তিনি যাত্রা শুরু করেন। এই সময় তাঁহার সঙ্গে ছিল ৩০৫ জন সাহাবী। তন্মধ্যে ৬৪ জন মুহাজির এবং ২৪১ জন আনসার। এতদ্ব্যতীত ৮ জন সাহাবীর এই সফরে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গী হওয়ার অদম্য ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সঙ্গত কারণে তাহারা মদীনায় থাকিয়া গিয়াছিলেন যাহাদিগকে এই যুদ্ধে শামিল বলিয়া গণ্য করা হয়। তন্মধ্যে ৩ জন মুহাজির এবং ৫ জন আনসার। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাদিগকে গনীমাতের অংশ প্রদান করেন।
মুহাজিরগণ হইলেন: (১) উছমান ইব্‌ন আফফান (রা), তাঁহার স্ত্রী ও রাসূলুল্লাহ (স)-এর কন্যা রুকায়্যা (রা) অসুস্থ থাকায় তাঁহার সেবা-শুশ্রূষা করার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁহাকে মদীনায় রাখিয়া যান, এই রোগেই তিনি ইনতিকাল করেন; (২) তালহা ইবন 'উবায়দিল্লাহ ও (৩) সা'ঈদ ইবন যায়দ; এই দুইজনকে রাসূলুল্লাহ (স) আবু সুফ্যানের কাফেলার খবর সংগ্রহ করার জন্য গুপ্তচর হিসাবে প্রেরণ করেন। আনসারগণ হইলেনঃ (১) আবু লুবাবা ইন্ন 'আবদিল মুনযির। তিনি যথারীতি সাহাবীগণের সহিত বাহির হইয়াছিলেন কিন্তু আর-রাওহা নামক স্থানে পৌঁছিয়া রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে মদীনার গভর্নর বানাইয়া প্রেরণ করেন; (২) 'আসিম ইব্‌ন 'আদী আল-আজলানী; রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁহাকে আপার মদীনার শাসকরূপে নিয়োগ দিয়া পাঠান; (৩) আল-হারিছ ইবন হাতিব আল-'উমরী; তাঁহাকেও রাসূলুল্লাহ (স) আর-রাওহা হইতে বানু 'আমর ইবন 'আওফ গোত্রের নিকট ফেরত পাঠান। কারণ তাহাদের সম্পর্কে বিশেষ কোনও সংবাদ রাসূলুল্লাহ (স) অবহিত হন; (৪) আল-হারিছ ইবনুস সিম্মা ও (৫) খাওওয়াত ইবন জুবায়র; উভয়কেই পায়ে অসুবিধার কারণে রাসূলুল্লাহ (স) আর-রাওহা হইতে ফেরত পাঠান।
মদীনার মসজিদে সালাতের ইমামতি করার জন্য রাসূলুল্লাহ (স) আবদুল্লাহ ইব্‌ন উম্মে মাকতুম (রা)-কে দায়িত্ব প্রদান করিয়া আসেন। মদীনা হইতে এক মাইল দূরে 'আবূ 'ইনাবা' নামক কূপের নিকট পৌছিয়া তিনি সৈন্যদিগকে বাছাই করিলেন। এই সময় তিনি যাহাদিগকে অল্পবয়স্ক মনে করিলেন তাহাদিগকে মদীনায় ফেরত পাঠাইলেন। যাহাদিগকে তিনি ফেরত পাঠাইয়াছিলেন তাঁহারা হইলেন: (১) আবদুল্লাহ ইবন উমার; (২) উসামা ইব্‌ন যায়দ; (৩) রাফে ইব্‌ন খাদীজ; (৪) আল-বারাআ ইবন 'আযিব; (৫) উসায়দ ইবন হুদায়র; (৬) যায়দ ইব্‌ন আরকাম ও (৭) যায়দ ইব্‌ন ছাবিত। এতদ্ব্যতীত 'উমায়র ইব্‌ন আবী ওয়াক্কাস (রা)-কেও তিনি ফেরত যাওয়ার নির্দেশ দিয়াছিলেন। কিন্তু এই নির্দেশ শুনিয়া তিনি কাঁদিতে লাগিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে অনুমতি দেন। বদর প্রান্তৱে এই যুদ্ধে তিনি শহীদ হন। তখন তাঁহার বয়স ছিল মাত্র ১৬ বৎসর।
মদীনা হইতে চার মারহালা দূরে 'আস-সুরুয়া' নামক স্থানে পৌঁছিয়া সেখানকার কূপ হইতে পানি পান করার জন্য রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীদিগকে নির্দেশ দিলেন। তিনি নিজেও উহা হইতে পানি পান করিলেন। সেখানকার গৃহের নিকট সালাত আদায় করিলেন এবং সেই দিন মদীনার জন্য এই দু'আ করিলেন:
اللهم أن إبراهيم عبدك وخليلك ونبيك دعاك لاهل مكة واني محمد عبدك ونبيك ادعوك لاهل المدينة أن تبارك لهم في صاعهم ومدهم وثمارهم اللهم حبب الينا المدينة واجعل ما بها من الوباء بخم اللهم اني حرمت ما بين لابتـيـهـا كـمـا حـرم ابراهيم خليلك مكة.
"হে আল্লাহ! ইবরাহীম (আ) তোমার বান্দা, তোমরা বন্ধু, তোমার নবী। তিনি মক্কাবাসীদের জন্য দু'আ করিয়াছেন। আর আমি মুহাম্মাদ তোমার দাস ও তোমার নবী। আমি মদীনাবাসীর জন্য তোমার নিকট এই দু'আ করিতেছি যে, তুমি তাহাদের সা' ও মুদ্দ ওজন পরিমাণে ও ফল-ফলাদিতে বরকত দাও। উহাতে যত মহামারী আছে সব খুম (জুহফা হইতে তিন মাইল দূরে একটি স্থান)- এ আনিয়া দাও। হে আল্লাহ! আমি উহার দুই প্রস্তরময় ভূমির মধ্যবর্তী অংশকে হারাম করিলাম, যেমনিভাবে তোমার খলীল ইবরাহীম (আ) মক্কাকে হারাম করিয়াছিলেন”।
'আস-সুয়া' হইতে রবিবার সন্ধ্যায় তিনি রওয়ানা হন এবং দু'আ করেন:
أللهم انهم حفاة فاحملهم وعراة فاكسهم وجياع فاشبعهم وعالة فاغنهم من فضلك.
"হে আল্লাহ! ইহারা নগ্নপদবিশিষ্ট (পদাতিক), ইহাদেরকে বাহন দাও। ইহারা উলংগ বদন, খালী শরীর বিশিষ্ট; ইহাদিগকে কাপড় পরিধান করাও। ইহারা ক্ষুধার্ত; ইহাদিগকে পর্যাপ্ত পরিমাণে আহার দান কর এবং ইহারা দরিদ্র; ইহাদিগকে তোমার অনুগ্রহে স্বনির্ভর কর।”

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মুসলমানদের ঘোড়া ও উটের সংখ্যা

📄 মুসলমানদের ঘোড়া ও উটের সংখ্যা


মুসলমানদের ঘোড়া ও উটের সংখ্যা: মুসলমানদের যুদ্ধের উপকরণ ছিল খুবই কম। তাহাদের সহিত মাত্র দুইটি ঘোড়া (মতান্তরে তিনটি) এবং ৭০টি উট ছিল। আল-উমাবীর বর্ণনামতে একটি ঘোড়ার আরোহী ছিলেন মুস'আব ইবন 'উমায়র (রা) এবং অপরটির আরোহী ছিলেন আয-যুবায়র ইবনুল আওওয়াম (রা)। সেনাবাহিনীর ডাইন দিকের নেতৃত্বে ছিলেন সা'দ ইবন খায়ছামা (রা) এবং বামদিকের নেতৃত্বে ছিলেন আল-মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ (রা)। আল-উমাবীর অপর এক বর্ণনামতে দুইজন অশ্বারোহীর মধ্যে আয-যুবায়র ইবনুল আওওয়াম (রা) ডানদিকের এবং অপর অশ্বারোহী আল-মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ বাম দিকের নেতৃত্বে ছিলেন। হযরত আলী (রা) হইতে একটি বর্ণনা পাওয়া যায় যে, তিনি বলেন, বদর যুদ্ধের দিন আমাদের সঙ্গে দুইটি ঘোড়াই ছিল। একটি যুবায়র-এর, অপরটি আল-মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ-এর। ইউসুফ সালিহী আশ-শামীও অনুরূপ বর্ণনা করিয়াছেন। তিনি ঘোড়া দুইটির নামও উল্লেখ করিয়াছেন: মিকদাদের ঘোড়ার নাম ছিল 'সাবহা', মতান্তরে বা'রাজা এবং আয-যুবায়র ইবনুল 'আওওয়াম (রা)-এর ঘোড়ার নাম ছিল 'আস-সায়ল', মতান্তরে আল-ইয়া'সূব। ইবন সা'দ-এর এক বর্ণনামতে বদr যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর তিনটি ঘোড়া ছিল। তৃতীয়টি ছিল মারছাদ ইব্‌ন আবী মারছাদ আল-গানাবী (রা)-এর; উহার নাম ছিল 'আস-সায়ল'। রাসূলুল্লাহ (স) কায়স ইব্‌ন আবী সা'সা'আকে সাকা-এ নিযুক্ত করেন এবং আস-সুয়া অঞ্চল হইতে পৃথক হইবার পর মুসলমানদের সংখ্যা গণনা করিবার জন্য তাঁহাকে নির্দেশ দেন। অতঃপর তিনি আবূ 'ইনাবা কূপের নিকট তাহাদিগকে থামাইয়া গণনা করেন এবং গণনাশেষে রাসূলুল্লাহ (স)-কে অবহিত করেন যে, তাহারা সংখ্যায় ৩১৩ জন। ইহা শ্রবণ করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) খুশী হইয়া বলিলেন, ইহা তালুত বাহিনীর সংখ্যা।
পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে যে, মুসলমানদের সঙ্গে ৭০টি উট ছিল। উহাতে তাহারা পালাক্রমে আরোহণ করিতেছিলেন। তিন তিনজন করিয়া তাহারা একটি উটে আরোহণ করিতেন। ইব্‌ন ইসহাক-এর বর্ণনামতে রাসূলুল্লাহ (স), আলী ইব্‌ন আবী তালিব (রা) ও মারছাদ ইব্‌ন আবী মারছাদ আল-গানাবী (রা) একটি উটে, হামযা ইব্‌ন আবদিল মুত্তালিব, যায়দ ইব্‌ন হারিছা (রা), রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুক্ত দাস আবূ কাবশা ও আনাস (রা) পালাক্রমে একটি উটে এবং আবূ বাক্‌র (রা), উমার (রা) ও 'আবদুর রাহমান ইব্‌ন আওফ (রা) একটি উটে আরোহণ করিতেন। তবে ইমাম আহমাদ (র) ইব্‌ন মাসউদ (রা) হইতে বর্ণনা করেন:
عن ابن مسعود قال كانوا يوم بدر بين كل ثلاثة نفر بعير وكان على وابو لبابة زميل رسول الله ﷺ قال اذا كانت عقبة النبى ﷺ قالا له اركب حتى نمشى عنك فيقول ما انتما باقوى منى وما انا باغني عن الاجر منكما .
"তিনি বলেন, বদr যুদ্ধের সময় আমরা তিনজন করিয়া একটি উটে আরোহণ করিয়াছিলাম। একটি উটে আবূ লুবাবা ইব্‌ন আবদিল মুনযির ও আলী (রা) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহগামী। রাসূলুল্লাহ (স)-এর পদব্রজে চলিবার পালা আসিলে তাঁহার সঙ্গীদ্বয় বলিলেন, আপনার পক্ষ হইতে আমরাই হাঁটিয়া চলি। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমরা দুইজন আমার চাইতে অধিক শক্তিশালী নহ। আর আমি সওয়াব লাভের ক্ষেত্রে তোমাদের চাইতে বেশী মুখাপেক্ষী”।
হাফিজ ইব্‌ন কাছীর ইহা বর্ণনা করিয়া উভয় রিওয়ায়াতের মধ্যে এইভাবে সামঞ্জস্য বিধান করিয়াছেন যে, সম্ভবত ইমাম আহমাদ ও নাসাঈর বর্ণনাটি আবু লুবাবা (রা)-কে আর-রাওহা হইতে মদীনায় ফেরত পাঠাইবার পূর্বের। তাঁহাকে ফেরত পাঠাইবার পর তদস্থলে তাঁহার সহগামী হন মারছাদ ইব্‌ন আবী মারছাদ আল-গানাবী। হযরত আইশা (রা) হইতে বর্ণিত যে, এই সময় রাসূলুল্লাহ (স) উটের গলা হইতে ঘণ্টাধ্বনি কাটিয়া ফেলার নির্দেশ দেন।
'উবায়দা ইবনুল হারিছ, আত-তুফায়ল ও আল-হুসায়ন ইবনুল হারিছ ভ্রাতৃবর্গ ও মিসতাহ ইব্‌ন উছাছা উবায়দা ইবনুল হারিছের ক্রয়কৃত উটের পিঠে, মুআয, আওফ ও মুআওবিষ ইব্‌ন আফরা' ভ্রাতৃবর্গ ও তাঁহাদের দাস আবুল হামরা একটি উটে এবং উবাই ইব্‌ন কা'ব, উমারা ইব্‌ন হাযম ও হারিছা ইব্‌নুন নু'মান একটি উটে আরোহণ করিতেছিলেন। আল-ওয়াকিদী ইহার আরও দীর্ঘ ফিরিস্তি প্রদান করিয়াছেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বদরের রাস্তা

📄 বদরের রাস্তা


রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার সাহাবীগণসহ মদীনা হইতে মক্কার পথে রওয়ানা হইলেন। তাঁহারা মদীনার গিরিপথ ধরিয়া, 'আকীক, যুল-হুলায়ফা, 'উলাতুল-জায়শ হইয়া অগ্রসর হইতে থাকেন, অতঃপর তুরবান (মদীনা হইতে একদিনের পথ), মালাল (মদীনা হইতে ২৮ মাইল দূরে), মারায়ায়ন-এর গামীসুল হামam, সুখায়রাতুল ইয়ামাম, আস-সায়ালা, ফাজজুর রাওহা ও শানুকা হইয়া চলেন। ১৪ই রামাদান ইরকুজ-জারয়া নামক স্থানে পৌছিয়া তাঁহারা এক বেদুঈনের সাক্ষাত পাইলেন। তাহারা তাহাকে আবু সুফ্যান ও তাহার কাফেলা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলেন, কিন্তু তাহার নিকট কোন সংবাদ পাইলেন না। সাহাবীগণ তাহাকে বলিলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-কে সালাম কর। সে বলিল, তোমাদের মধ্যে কি রাসূলুল্লাহ (স) আছেন? তাহারা বলিলেন, হাঁ। অতঃপর সে রাসূলুল্লাহ (স)-কে সালাম করিয়া বলিল, আপনি যদি আল্লাহ্র রাসূল হন তবে বলুন, আমার এই উটের পেটে কি আছে? সালামা ইবন সালামা ইন ওয়াশ (রা) তাহাকে বলিলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-কে প্রশ্ন করিও না, বরং আমার নিকট আস। আমিই তোমাকে এই ব্যাপারে সংবাদ দিব। তুমি উহার সহিত অপকর্ম করিয়াছ। তাই উহার পেটে তোমার বাচ্চা রহিয়াছে। তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, থাম! লোকটি সম্পর্কে তুমি অশ্লীল কথা বলিয়াছ। অতঃপর তিনি সালামা (রা) হইতে মুখ ফিরাইয়া লইলেন।

অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) ১৫ই রামাদান বুধবার রাত্রে সাজসাজ তথা রাওহা কূপের নিকট অবতরণ করিলেন এবং সেখানে সালাত আদায় করিলেন। অতঃপর সেখান হইতে রওয়ানা হইয়া তিনি যখন মুনসারিফ নামক স্থানে পৌছিলেন তখন মক্কার পথ বামে রাখিয়া ডানদিকে আন-নাযিয়া হইয়া বদরের দিকে চলিলেন, তাহার পর উহার এক প্রান্তের দিকে চলিলেন। এমনিভাবে তিনি আন-নাযিয়া ও মাদীকিস-সাফরার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত রুঙ্কান নামক উপত্যকা অতিক্রম করিলেন। অতঃপর সেখান হইতে রওয়ানা হইলেন। আস-সাফরা নামক স্থানের নিকটবর্তী হইলে তিনি বানু সা'ইদা গোত্রের মিত্র বাসবাস ইব্‌ন 'আমর আল-জুহানী ও বানুন-নাজ্জার-এর মিত্র আদী ইব্‌ন আবিল যাগবা আল-জুহানী (রা)-কে গোপনে আবু সুফ্যানের কাফেলার সংবাদ সংগ্রহ করিবার জন্য বদর অভিমুখে প্রেরণ করিলেন।

মূসা ইব্‌ন উকবার বর্ণনামতে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে মদীনা হইতে বাহির হইবার পূর্বেই প্রেরণ করেন। অতঃপর তাহারা ফেরত আসিয়া আবূ সুফ্যানের বাণিজ্যিক কাফিলার খবর দিলে তিনি লোকজনসহ উহার উদ্দেশ্যে বাহির হন। হাফিজ ইব্‌ন কাছীর (র) বলেন, ইন্ন ইসহাক ও মূসা ইব্‌ন উকবা উভয়ের বর্ণনাই যদি সঠিক হয় তবে স্বীকার করিতে হইবে যে, রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে দুইবার প্রেরণ করেন। প্রথমবার মদীনায় থাকাকালে, আর দ্বিতীয়বার এই স্থানে আগমন করিয়া।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সাহাবীদের সহিত পরামর্শ

📄 সাহাবীদের সহিত পরামর্শ


অতঃপর রাসূলল্লাহ (স) সম্মুখে অগ্রসর হইয়া আস-সাফরা নামক গ্রামে পৌছিলেন। ইহা ছিল দুইটি পর্বতের মধ্যখানে অবস্থিত। তিনি উক্ত পর্বতদ্বয়ের নাম জিজ্ঞাসা করিলেন। লোকজন বলিল, উহার একটিকে বলা হয় 'মুসলিহ' এবং অপরটিকে মুখরি'। তিনি উহার অধিবাসীদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলেন। তাঁহাকে বলা হইল, ইহারা গিফার গোত্রের দুইটি শাখা বানুন-নাজজার ও বানূ হুরাক। রাসূলুল্লাহ (স) উহার মধ্য দিয়া যাইতে অপছন্দ করিলেন। তিনি পর্বতদ্বয় ও সেখানকার অধিবাসী গোত্রের শাখাদ্বয়ের নাম শুনিয়াই তাহা অপছন্দ করিলেন। অতঃপর তিনি উক্ত পথ ত্যাগ করিলেন এবং আস-সাফরাকে বামে রাখিয়া ডান দিকে একটি উপত্যকার মধ্য দিয়া চলিলেন যাহাকে যাফেরান বলে। আড়াআড়ি ভাবে তিনি উক্ত উপত্যকা পাড়ি দিয়া সেখানে অবতরণ করিলেন।

সাহাবীদের সহিত পরামর্শ: এই সময় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট সংবাদ আসিল যে, কুরায়শগণ বাণিজ্য কাফেলাকে রক্ষা করিতে পূর্ণ যুদ্ধের প্রস্তুতি লইয়া আগমন করিতেছে। তিনি সাহাবীদের নিকট পরামর্শ চাহিলেন এবং তাহাদিগকে কুরায়শদের সংবাদ অবহিত করাইলেন। তখন আবু বাক্স সিদ্দীক (রা) উঠিয়া দাঁড়াইলেন এবং তিনি উত্তম পরামর্শ দিলেন। অতঃপর উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) উঠিয়া দাঁড়াইলেন এবং তিনিও উত্তম পরামর্শ দিলেন। তিনি বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! উহারা কুরায়শ, সম্মানিত লোক। আল্লাহ্র কসম, যেদিন হইতে তাহারা সম্মান লাভ করিয়াছে তাহার পর আর কখনও অপdস্থ হয় নাই। আল্লাহ্র কসম! যেদিন হইতে তাহারা কুফরী করিয়াছে আর কখনও ঈমান আনয়ন করে নাই। আল্লাহ্র কসম! উহারা কখনও উহাদের সম্মান ভূলুণ্ঠিত হইতে দিবে না, বরং অবশ্যই আপনার সহিত যুদ্ধ করিবে। সুতরাং আপনি সেইজন্য পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করুন।

অতঃপর মিকদাদ ইব্‌ন 'আমর (রা) দাঁড়াইয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ আপনাকে যাহা দেখাইয়াছেন (ভিন্ন বর্ণনায় যাহার নির্দেশ দিয়াছেন) সেইদিকে আমাদিগকে লইয়া চলুন। আমরা আপনার সঙ্গেই থাকিব। আল্লাহ্র কসম! আমরা আপনাকে সেইরূপ বলিব না, মূসা (আ)-কে বানূ ইসরাঈল যেইরূপ বলিয়াছিল। আল্লাহ্র বাণী: فَاذْهَبْ أَنْتَ وَرَبُّكَ فَقَاتِلا إِنَّا هُهُنَا قَاعِدُونَ. "তুমি আর তোমার প্রতিপালক যাও এবং যুদ্ধ কর, আমরা এইখানেই বসিয়া থাকিব" (৫ঃ ২৪); বরং আপনি ও আপনার প্রতিপালক গিয়া যুদ্ধ করুন, আমরাও আপনাদের সহিত একত্র হইয়া যুদ্ধ করিব। এক বর্ণনায় ইহাও আছে, আমরাও আপনার ডানে-বামে, অগ্রে-পশ্চাতে থাকিয়া যুদ্ধ করিব। তিনি আরও বলিলেন, সেই সত্তার কসম! যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করিয়াছেন, আপনি যদি আমাদিগকে 'বারকুল গিমাদ' (ইয়ামানের, মতান্তরে হাবশার একটি স্থান) নামক স্থানেও লইয়া যান তবুও আমরা সেখানে পৌঁছা পর্যন্ত আপনার সহিত চলিতে থাকিব। ইহা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। তিনি তাহাকে ধন্যবাদ দিলেন এবং তাহার জন্য দু'আ করিলেন।

ইহার পরও রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ওহে লোকসকল! আমাকে পরামর্শ দাও। ইহা দ্বারা তিনি আনসারদের পরামর্শই কামনা করিতেছিলেন। কারণ তাহারা ছিল সংখ্যায় বেশী। উপরন্তু বায়'আতে 'আকাবার সময় তাহারা যে শপথ করিয়াছিল তাহাতে বলিয়াছিল, "ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আমাদের গৃহে না পৌঁছা পর্যন্ত আমরা আপনার দায় দায়িত্ব হইতে মুক্ত। আপনি যখন আমাদের নিকট পৌঁছিবেন তখন আপনার দায়দায়িত্ব আমাদের উপর বর্তাইবে। আমরা আমাদের সন্তান-সন্ততি ও মহিলাদিগকে যেভাবে রক্ষা করি আপনাকেও সেভাবে রক্ষা করিব”। তাই রাসূলুল্লাহ (স) আকাঙ্ক্ষা করিতেছিলেন যে, মদীনার বাহিরে যেসব শত্রু তাঁহাকে আক্রমণ করিবে সেইসব শত্রুর বিরুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স)-কে সাহায্য করা আনসারগণ নিজদের জন্য জরুরী মনে করিবে না। আর তাঁহারও উচিৎ নহে তাহাদিগকে নিজ দেশের শত্রুর বিরুদ্ধে লইয়া যাওয়া।

রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই কথা শুনিয়া সা'দ ইব্‌ন মু'আয (রা) বলিলেন, আল্লাহ্র কসম! ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি মনে হয় আমাদিগকে লক্ষ্য করিয়াই বলিতেছেন? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, হাঁ। সা'দ (রা) বলিলেন, আমরা আপনার উপর ঈমান আনয়ন করিয়াছি, আপনাকে সত্য নবী বলিয়া বিশ্বাস করিয়াছি এবং সাক্ষ্য দিয়াছি যে, আপনি যাহা লইয়া আসিয়াছেন তাহাই সত্য। এই ব্যাপারে আমরা আপনাকে আমাদের পক্ষ হইতে শ্রবণ ও আনুগত্য করার অঙ্গীকার প্রদান করিয়াছি। তাই ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি যেখানে ইচ্ছা আমাদিগকে লইয়া চলুন। আমরা আপনার সঙ্গেই থাকিব। সেই সত্তার কসম! যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করিয়াছেন, আপনি যদি আমাদিগকে লইয়া সমুদ্রে ঝাঁপাইয়া পড়েন তবে আমরাও আপনার সহিত ঝাঁপাইয়া পড়িব। আমাদের মধ্য হইতে একজন লোকও পিছনে থাকিবে না। আমরা ইহা অপছন্দ করিব না যে, আপনি আগামী কাল আমাদিগকে আমাদের শত্রুর সম্মুখে হাজির করিবেন। আমরা যুদ্ধের ময়দানে ধৈর্যশীল, সাক্ষাতের ক্ষেত্রে সত্যবাদী। হয়তোবা আল্লাহ আপনাকে এমন জিনিস দেখাইবেন যাহাতে আপনার চক্ষু জুড়াইয়া যাইবে। তাই আল্লাহ্র রহমত ও বরকতে আমাদিগকে লইয়া চলুন।

হাফিজ ইব্‌ন কাছীর (র) ইন মারদুয়ায়হ্ সূত্রে বর্ণনা করেন যে, সা'দ ইব্‌ন মু'আয (রা) ইহাও বলিয়াছিলেন, আপনি যদি আমাদিগকে ইয়ামানের বারকুল গিমাদেও লইয়া যান তবে আমরা অবশ্যই আপনার সহিত যাইব। আমরা তাহাদের মত হইব না যাহারা মূসা (আ)-কে বলিয়াছিল, "তুমি ও তোমার প্রতিপালক যাও এবং যুদ্ধ কর, আমরা এখানেই বসিয়া থাকব বরং আপনি ও আপনার প্রতিপালক গিয়া যুদ্ধ করুন, আমরাও আপনাদের অনুসরণ করিব। আপনি হয়তোবা এক কাজের জন্য বাহির হইয়াছিলেন, আল্লাহ তদস্থলে অন্য এক কাজের ব্যবস্থা করিয়াছেন, তাহার প্রতিই লক্ষ্য রাখুন। আল-উমাবী তাঁহার মাগাযীর বর্ণনায় ইহাও উল্লেখ করিয়াছেন যে, সা'দ (রা) বলিয়াছিলেন, আমাদের সম্পদ হইতে যাহা ইচ্ছা গ্রহণ করুন, আর যাহা ইচ্ছা আমাদিগকে দিন। তবে আমাদের নিকট হইতে আপনি যাহা গ্রহণ করিবেন তাহাই আমাদের নিকট সর্বাপেক্ষা পছন্দনীয় যাহা আমাদের জন্য রাখিয়া দিবেন তাহার তুলনায়। আপনি আমাদিগকে যে কোনও আদেশ দিবেন আমরা তাহা মান্য করিব। আল্লাহ্র কসম! আপনি যদি বারকুল গিমাদেও পৌছিয়া যান, আমরাও আপনার সহিত যাইব।

রাসূলুল্লাহ (স) সা'দ ইব্‌ন মু'আয (রা)-এর কথা শুনিয়া খুবই আনন্দিত হইলেন এবং তাঁহাকে ধন্যবাদ দিলেন। অতঃপর তিনি বলিলেন, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর, আল্লাহ আমাকে দুইটি দলের একটির অঙ্গীকার করিয়াছেন। আল্লাহর কসম! আমি যেন এখনই কুরায়শ কওমের পরাজয় দেখিতে পাইতেছি। সহীহ মুসলিম-এর রিওয়ায়াতে এই বক্তব্য খাযরাজ গোত্রের নেতা সা'দ ইব্‌ন উবাদা (রা)-এর বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে।

তবে ইহা সা'দ ইব্‌ন মু'আয (রা)-এর বক্তব্য বলিয়াই প্রসিদ্ধ। ইবন ইসহাক, মূসা ইব্‌ন উকবা, ইবন সা'দ প্রমুখ ইহাই বর্ণনা করিয়াছেন। সা'দ ইবন উবাদা (রা)-এর বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ সম্পর্কে মতভেদ রহিয়াছে। ইব্‌ন্ন উকবা ও ইব্‌ন ইসহাক তাঁহাকে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবীদের মধ্যে উল্লেখ করেন নাই। আল-ওয়াকিদী, ইবনুল কালবী ও আল-মাদাইনী তাঁহাকে বদরী সাহাবীদের মধ্যে গণ্য করিয়াছেন। ইবন সা'দ-এর বর্ণনা হইল, তিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুত হইতেছিলেন এবং আনসারদের খাযরাজ গোত্রের সকলের ঘরে ঘরে গিয়া তাহাদিগকে বাহির করিবার জন্য উদ্বুদ্ধ করিতেছিলেন। কিন্তু তিনি অসুস্থ হইয়া পড়ায় আর যুদ্ধে যোগদান করিতে পারেন নাই। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, সা'দ যদিও বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিতে পারে নাই তবুও সে উহাতে যোগদানে আগ্রহী ছিল।

কোনও কোনও বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে গনীম'তের অংশ প্রদান করিয়াছিলেন। কিন্তু ইহা সুপ্রমাণিত নহে। যুদ্ধ সম্পর্কিত রিওয়ায়াত যাহারা বর্ণনা করিয়াছেন তাহাদের কেহই বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে তাঁহার নাম উল্লেখ করেন নাই; বরং তিনি উহুদ ও খন্দকসহ অন্যান্য সকল যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত অংশগ্রহণ করেন।

অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) যাফিরান হইতে রওয়ানা হইয়া 'আল-আসাফির' নামক উপত্যকার নিকট দিয়া চলিলেন। তারপর আসাফির ও বদর-এর মধ্যে অবস্থিত আদ-দাব্বা নামক একটি শহরে অবতরণ করিলেন। ডানে রহিল পর্বতের ন্যায় বিশাল হান্নান নামক একটি বালুকার ঢিবি। তিনি বদরের নিকটবর্তী এক স্থানে অবতরণ করিলেন। অতপর তিনি ও আবূ বাক্‌র (রা) কুরায়শদের খবরাখবর লইতে বাহনে চড়িয়া রওয়ানা হইলেন। তাঁহারা আরবের এক বৃদ্ধলোকের নিকট আসিয়া থামিলেন। কুরায়শ এবং মুহাম্মাদ ও তাঁহার সাথী-সঙ্গীদের সম্পর্কে তাহার নিকট কি সংবাদ আছে তিনি তাহাকে তাহা জিজ্ঞাসা করিলেন। বৃদ্ধলোকটি বলিল, তোমরা কাহারা, সেই কথা না বলা পর্যন্ত আমি তোমাদিগকে কোনও সংবাদই দিব না। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আপনি যখন আমাদিগকে উক্ত সংবাদ বলিবেন তখন আমরাও আপনাকে বলিব যে, আমরা কাহারা। বৃদ্ধ বলিল, ইহা কি উহার বিনিময়ে? তিনি বলিলেন, হাঁ।

বৃদ্ধ বলিল, আমার নিকট এই সংবাদ পৌছিয়াছে যে, মুহাম্মাদ ও তাঁহার সাথী-সঙ্গীবৃন্দ অমুক অমুক দিন বাহির হইয়াছে। সংবাদদাতা সত্য হইলে তাহারা আজ অমুক অমুক স্থানে আছে। যে স্থানে রাসূলুল্লাহ (স) ছিলেন, লোকটি সেই স্থানের কথাই বলিল। সে আরও বলিল, আমার নিকট সংবাদ পৌছিয়াছে যে, কুরায়শগণ অমুক অমুক দিন বাহির হইয়াছে। সংবাদদাতা যদি আমার নিকট সত্য বলিয়া থাকে তবে তাহারা আজ অমুক অমুক স্থানে আছে। ঠিক যেখানে কুরায়শগণ ছিল বৃদ্ধ লোকটি সেখানকার কথাই বলিল। লোকটি তাহার সংবাদ প্রদান করিয়া বলিল, তোমরা কোথা হইতে আসিয়াছ? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমরা পানির নিকট হইতে আসিয়াছি। অতঃপর তাহারা বৃদ্ধের নিকট হইতে প্রস্থান করিলেন। বৃদ্ধ তখন বলিতেছিল, কোন্ পানির নিকট হইতে? ইরাকের পানি? ইব্‌ন হিশামের বর্ণনামতে উক্ত বৃদ্ধের নাম ছিল সুফয়ান আদ-দামরী।

রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীদের নিকট ফিরিয়া আসিলেন। সন্ধ্যাবেলা তিনি আলী ইবন আবী তালিব, আয-যুবায়র ইবনুল 'আওওয়াম ও সা'দ ইব্‌ন আবী ওয়াককাস (রা)-কে সংবাদ সংগ্রহের জন্য বদর-এর কূপের নিকট পাঠাইলেন। তাঁহারা কুরায়শদের উটের পানি পান করাইবার স্থানে পৌঁছিয়া বানু হাজ্জাজের দাস আসলাম ও বানুল 'আস ইব্‌ন সাঈদের দাস 'আবীদ আবূ ইয়াসারকে পাইয়া ধরিয়া লইয়া আসিলেন এবং তাহাদিগকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তখন দাঁড়াইয়া সালাত আদায় করিতেছিলেন। দাসদ্বয় বলিল, আমরা কুরায়শদের পানি পান করানোর দায়িত্বে নিয়োজিত। তাহাদের জন্য পানি সংগ্রহের নিমিত্ত তাহারা আমাদিগকে প্রেরণ করিয়াছে। সাহাবায়ে কিরাম তাহাদের এই সংবাদ অপছন্দ করিলেন। তাঁহারা সন্দেহ করিতেছিলেন যে, ইহারা আবূ সুফ্যানের লোক। তাই তাঁহারা উহাদিগকে প্রহার করিতে লাগিলেন। প্রহারের মাত্রা বাড়িয়া গেলে তাহারা বলিল, আমরা আবূ সুফয়ানের লোক। ইহা শুনিয়া সাহাবায়ে কিরাম প্রহার বন্ধ করিলেন।

রাসূলুল্লাহ (স) রুকু-সিজদা সমাপ্ত করিয়া সালাম ফিরাইয়া বলিলেন, ইহারা যখন তোমাদের নিকট সত্য কথা বলিয়াছিল তখন তোমরা প্রহার করিয়াছ, আর যখন মিথ্যা কথা বলিয়াছে তখন ছাড়িয়া দিয়াছ। আল্লাহ্র কসম! তাহারা সত্য বলিয়াছে। তাহারা কুরায়শদের লোক। তাহাদিগকে লক্ষ্য করিয়া তিনি বলিলেন, তোমরা আমাকে কুরায়শদের সংবাদ দাও। তাহারা বলিল, আল্লাহ্র কসম। তাহারা এই বালুর ঢিবির অপর প্রান্তে রহিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে বলিলেন, উহাদের সংখ্যা কত? তাহারা বলিল, বহু। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, উহাদের সংখ্যা কত? তাহারা বলিল, আমরা জানি না। তিনি বলিলেন, তাহারা প্রতি দিন কতটি পশু যবেহ করে? উহারা বলিল, একদিন নয়টি, একদিন দশটি। তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তাহাদের সংখ্যা হইবে নয় শত হইতে এক হাজারের মধ্যে। অতঃপর তিনি তাহাদিগকে বলিলেন, তাহাদের মধ্যে কুরায়শ নেতা কে কে আছে? তাহারা বলিল, উতবা ইবন রাবী'আ, শায়ba ইবন রাবী'আ, আবুল বাখতারী ইব্‌ন্ন হিশাম, হাকীম ইব্‌ন্ন হিযাম, নাওফাল ইব্‌ন খুওয়ায়লিদ, আল-হারিছ ইবন 'আমের ইবন নাওফাল, তু'আয়মা ইন্ন আদী ইব্‌ন নাওফাল, আন-নাদূদ্র ইবনুল হারিছ, যাম'আ ইবনুল আসওয়াদ, আবূ জাহল ইব্‌ন হিশাম, উমায়্যা ইব্‌ন খালাফ, নুবায়হ ও মুনাব্বিহ ইবনুল হাজ্জাজ ও সুহায়ল ইব্‌ন 'আমর ইব্‌ন 'আব্দ উদ্দ। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীদের লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, মক্কা তাহার কলিজার টুকরাগুলিকে তোমাদের দিকে নিক্ষেপ করিয়াছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00