📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 যুদ্ধের কারণ

📄 যুদ্ধের কারণ


এই যুদ্ধে সংঘটনের কারণ সম্পর্কে দুই ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়। উভয় বর্ণনার পিছনেই নির্ভরযোগ্য যুক্তি রহিয়াছে। বর্ণনা দুইটি নিম্নরূপ:
(১) অধিকাংশ সীরাতবিদগণের মতে কুরায়শ নেতা আবূ সুফয়ান ইবন হারব-এর নেতৃত্বে ৩০ বা ৪০ জনের, মতান্তরে ৭০ জনের একটি বাণিজ্যিক কাফেলা বাণিজ্য ব্যাপদেশে শাম (সিরিয়া) গিয়াছিল। তাহাদের সহিত প্রচুর পণ্যসম্ভার ছিল। এক বর্ণনামতে ৫০ হাজার স্বর্ণমুদ্রা ও এক হাজার উট ছিল। উক্ত কাফেলায় মাখরামা ইবন নাওফাল ও আমর ইবনুল আসও ছিলেন, যাহারা পরবর্তী কালে ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ (স) শাম হইতে তাহাদের প্রত্যাবর্তনের সংবাদ পাইয়া মদীনার মুসলমানগণকে ডাকিয়া উহার প্রতি উদ্বুদ্ধ করিয়া বলিলেন, এই যে কুরায়শদের বাণিজ্যিক কাফেলা আসিতেছে তাহাদের সহিত তাহাদের প্রচুর সম্পদ রহিয়াছে। তোমরা তাহাদের প্রতিরোধে বাহির হও, হয়তোবা আল্লাহ তোমাদিগকে উক্ত সম্পদ গনীমত হিসাবে প্রদান করিবেন।

অতঃপর মুসলমানগণকে উক্ত কাফেলার অনুসন্ধানে বাহির হইবার জন্য ঘোষণা দেওয়া হইল। কতক মুসলমান ইহা ভাল মনে করিল এবং বাহির হওয়ার বিষয়টি সহজে মানিয়া লইল। আর কতকে বাহির হওয়া অপছন্দ করিল। ইহা এই কারণে যে, তাহারা ধারণাও করিতে পারেন নাই যে, রাসূলুল্লাহ (স) যুদ্ধের সম্মুখীন হইবেন। রাসূলুল্লাহ (স)-ও ইহার জন্য খুব গুরুত্ব সহকারে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন নাই। তিনি এই বলিয়া ঘোষণা দেন, যে প্রস্তুত আছে সে আমাদের সহিত রওয়ানা হউক। কেহ কেহ একটু দূরে মদীনার উচু অঞ্চলে তাহাদের বাড়িতে গিয়া প্রস্তুত হইয়া আসিবার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করিল। তিনি বলিলেন, না, এখনই যে প্রস্তুত আছে সে ব্যতীত আর কেহ নহে। এইভাবে তিনি মাত্র ৩১৩ জন সাহাবী লইয়া উক্ত বাণিজ্যিক কাফেলার উদ্দেশ্যে বাহির হইলেন। অপরদিকে আবূ সুফ্য়ান এই সংবাদ পাইয়া দামদাম ইব্‌ন 'আমর আল-গিফারীকে মজুরী দিয়া এই সংবাদ কুরায়শদের নিকট পৌঁছাইতে এবং তাহাদিগকে যুদ্ধের প্রস্তুতি লইয়া বাহির হইতে উদ্বুদ্ধ করিবার জন্য মক্কায় প্রেরণ করিলেন। আর নিজে সোজা পথে বদরের দিকে না গিয়া সমুদ্রোপকূলের দিক দিয়া বদরকে বাম দিকে রাখিয়া মক্কার পথ ধরিলেন। কুরায়শগণ যুদ্ধের পূর্ণ প্রস্তুতি লইয়া বদর প্রান্তরে আসিয়া উপনীত হইল। আর রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীগণসহ আবূ সুফ্য়ানের চলিয়া যাওয়ার সঠিক পথ অবহিত হইতে না পারিয়া বদর প্রান্তরে আসিয়া পৌঁছিলেন। এইখানে পৌছিয়া তিনি কুরায়শ বাহিনীর যুদ্ধপ্রস্তুতিসহ আগমনের সংবাদ জানিতে পারিয়া সাহাবীদের সহিত পরামর্শক্রমে যুদ্ধের পূর্ব-প্রস্তুতি না থাকা সত্ত্বেও কুরায়শ বাহিনীর সহিত সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিলেন। সেইমত বদر প্রান্তরে উভয় পক্ষের মধ্যে প্রচণ্ড যুদ্ধ সংঘটিত হইল। পূর্বে হইতে যুদ্ধ করার সংকল্প থাকিলে তিনি আরও সৈন্য ও যুদ্ধোপকরণ সংগ্রহ করিতে পারিতেন।

(২) এই সম্পর্কে দ্বিতীয় মতটি পোষণ করিয়াছেন পরবর্তী কালের কতিপয় সীরাতবিদ। তাহা হইল, রাসূলুল্লাহ (স) ও সাহাবীগণ মদীনায় হিজরত করিয়া সেখানে সুখ-শান্তিতে দিনাতিপাত করিতেছেন এবং নির্বিঘ্নে আপন দ্বীন ইসলাম শুধু পালনই করিতেছেন না, বরং মদীনার প্রায় সকল লোককে তাঁহাদের অনুসারী বানাইয়া ফেলিতেছেন। ইহা দেখিয়া মক্কার কুরায়শগণ হিংসায় জ্বলিতে লাগিল। অপরদিকে নিজেদের কৃত অত্যাচার ও গভীর ষড়যন্ত্রের কথা তাঁহাদের স্মরণে উদিত হইত। তাঁহারা নিজেদের মানসিকতার হিসাবে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করিতেছিল যে, সুযোগ পাইলেই মুহাম্মাদ এই সকল অত্যাচারের প্রতিশোধ গ্রহণ করিবেন। এতদতীত মুসলমানগণ মদীনায় প্রবল হইয়া উঠিলে তাঁহাদের পক্ষে সিরিয়ার বাণিজ্যপথ যে একেবারে বন্ধ হইয়া যাইবে এবং ইহার ফলে তাঁহাদেরকে যে ভীষণ অসুবিধায় পড়িতে হইবে, এই কথাও তাঁহারা সম্যক হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিয়াছিল। এই সকল কারণে মুসলমানদের সহিত যথাসম্ভব সত্বর যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার জন্য কুরায়শ দলপতিগণ আগ্রহী হইয়া উঠে।

তাই কিভাবে মুসলমানদের এই দলটিকে ধরাশায়ী হইতে চিরতরে বিলীন করিয়া দেওয়া যায়, কিভাবে তাঁহাদিগকে সমূলে ধ্বংস করা যায়, তাঁহারা সর্বদা তাহারই ফন্দি-ফিকির করিতে লাগিল এবং সেইজন্য নানভাবে ষড়যন্ত্র করিতে লাগিল। এমনকি তাঁহারা সরাসরি মদীনা আক্রমণের প্রস্তুতি শুরু করিয়া দিয়াছিল। তাঁহারা মুনাফিক সরদার আবদুল্লাহ ইবন উবাইকে এই মর্মে এক পত্র প্রেরণ করিয়াছিল যে, হে মদীনা বাসী! তোমরা আমাদের চরম শত্রু মুহাম্মাদকে নিজ দেশে আশ্রয় দিয়াছ। হয় তোমরা যুদ্ধ করিয়া তাহাকে ধ্বংস কর, না হয় নিজেদের দেশ হইতে তাহাকে বাহির করিয়া দাও। আমরা কসম করিয়া বলিতেছি যে, এই দুইটি শর্তের কোনও একটি তোমরা অবলম্বন না করিলে আমরা নিজেদের সমস্ত শক্তি লইয়া তোমাদিগকে আক্রমণ করিব, তোমাদের যুবক দলকে হত্যা করিব এবং তোমাদের স্ত্রীলোকদেরকে বাঁদী বানাইয়া লইব।

মদীনা আক্রমণের উদ্দেশ্যেই কুরায়শদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গুপ্তচর দল মদীনার দিকে আনাগোনা করিত এবং সুযোগ পাইলেই মুসলমানদের সম্পদ লুণ্ঠন করিয়া পালাইয়া যাইত। কুবয় ইবন জাবির আল-ফিহরীর কথা পূর্বেই (গাওওয়া বদর আল-উলা অধ্যায়) উল্লেখ করা হইয়াছে। এই সকল ক্ষুদ্র বাহিনীর লুটতরাজ হইতে রক্ষা পাওয়ার জন্য এবং কুরায়শদের গতিবিধির প্রতি লক্ষ্য রাখিবার জন্য রাসূলুল্লাহ (স) বিভিন্ন দিকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল প্রেরণ করিতে থাকেন। কারণ তিনি কুরায়শদের দূরভিসন্ধি সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হইয়াছিলেন। এই প্রেক্ষিতেই বুওয়াত ও উশায়রা প্রভৃতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গাওওয়া সংঘটিত হইয়াছিল। কিন্তু ইহাতে কুরায়শদের হিংসার আগুন নির্বাপিত হইতেছিল না। তাহারা চাহিতেছিল মুসলমানদের সহিত একটি সিদ্ধান্তমূলক যুদ্ধ। তাই কুরায়শ দল মদীনায় বড় ধরনের একটি আক্রমণের সংকল্প করে। আর ইহার জন্য প্রয়োজন বিপুল অস্ত্রসম্ভার ও অর্থ-সম্পদের, যাহা দ্বারা রসদপত্র সংগ্রহ করা যায়। তাই এই উদ্দেশ্যে তাহারা অগাধ ধন-সম্পদ দিয়া হিজরী দ্বিতীয় সনের জুমাদাল উখরা মাসে আবু সুয়ানের নেতৃত্বে একটি বাণিজ্যিক কাফেলা সিরিয়ায় প্রেরণ করে। তাহারা এতই গুরুত্বের সহিত সম্পদ সংগ্রহ করিয়াছিল যে, মক্কায় নর-নারীদের মধ্যে এক রত্তি বা মাসা পরিমাণ স্বর্ণ-রৌপ্যও যাহার নিকট ছিল সেও উহা এই কাফেলার সহিত প্রেরণ করিয়াছিল।
মোট প্রায় পঞ্চাশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা আবূ সুফ্যানের সঙ্গে প্রেরণ করা হয়। তাহার বাণিজ্যসম্ভার বহন করিবার জন্য এক হাজার উট তাহার সঙ্গে চলিল। এই বণিক দল তিন মাস সিরিয়ায় অবস্থান করিয়া সরঞ্জামাদির ক্রয়-বিক্রয় সমাপ্ত করিয়া মক্কায় রওয়ানা হয়। তাহারা সিরিয়া হইতে প্রত্যাবর্তনের পূর্বেই 'নাখলা' নামক স্থানে কুরায়শ গোত্রের 'আমর আল-হাদরামী মুসলমান গুপ্তচরদের হাতে নিহত হয়। ইহাতে কুরায়শদের প্রতিশোধ স্পৃহা বহু গুণে বাড়িয়া যায়। ইতোমধ্যে গুজব রটিল যে, মদীনার মুসলমানগণ কুরায়শদের উক্ত বাণিজ্যিক কাফেলা লুণ্ঠন করিবার জন্য অগ্রসর হইতেছে। ইহাতে মক্কার কুরায়শদের অগ্নিতে ঘৃত নিক্ষেপের ন্যায় প্রতিশোধের আগুন দাউ দাউ করিয়া জ্বলিয়া উঠিল এবং তাহা সমগ্র আরবে ছড়াইয়া পড়িল। কাফেলার সরদার আবূ সুফয়ান সাবধানতাবশত শাম (সিরিয়া) হইতেই মক্কায় দূত পাঠাইয়া দিয়াছিল। এইসব কারণে মক্কার কুরায়শগণ বিরাট বাহিনী লইয়া মদীনার দিকে অগ্রসর হইতে থাকে।
রাসূলুল্লাহ (স) এই অবস্থা সম্পর্কে অবহিত হইলেন। তিনি সকল সাহাবীকে একত্র করিয়া সব ঘটনা তাহাদিগকে খুলিয়া বলিলেন এবং ঘটনার গুরুত্ব বিশ্লেষণ করিলেন। অতঃপর আনসার ও মুহাজির সাহাবী উভয় দলই যুদ্ধের পক্ষে সমর্থন ও সহযোগিতার কথা ব্যক্ত করিয়া জ্বালাময়ী বক্তৃতা করিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (স) ৩১৩ (তিন শত তের) জন সাহাবীসহ ১২ই (এক বর্ণনামতে ৮ই) রমযান মদীনা হইতে বাহির হইলেন। অতঃপর বদর প্রান্তরে পৌছিয়া উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হইল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ঘটনার সূচনা

📄 ঘটনার সূচনা


ইতিহাস ও সীরাতবিদগণের বর্ণনামতে রাসূলুল্লাহ (স) মদীনা হইতে বাহির হইবার দশদিন পূর্বে আবূ সুফয়ানের বাহিনীর সংবাদ লইবার জন্য তালহা ইব্‌ন উবায়দিল্লাহ ও সাঈদ ইব্‌ন যায়দ (রা)-কে সিরিয়ার পথে প্রেরণ করেন। তাহারা সিরিয়ার নিকটবর্তী খুওয়ার নামক স্থানে পৌছিয়া কুছায়্যির ইবন মালিক আল-জুমাহীর আশ্রয়ে উঠেন। তিনি তাহাদিগকে লুকাইয়া রাখেন। ইত্যবসরে কুরায়শদের বাণিজ্যিক দল রওয়ানা হইয়া আসে। অতঃপর তাঁহারা কুছায়্যিরসহ 'যুল-মারওয়া' নামক স্থানে আগমন করেন। সেখান হইতে তাঁহারা উভয়ে রাসূলুল্লাহ (স)-কে সংবাদ দেওয়ার জন্য মদীনায় আগমন করিয়া দেখিতে পান যে, ইতোমধ্যে তিনি মদীনা হইতে বাহির হইয়া আসিয়াছেন। এদিকে আবূ সুফয়ান দামিশক হইতে পাঁচ দিনের পথ মু'আন নামক বড় দুর্গের নিকটস্থ 'যারকা' নামক স্থানে পৌছিয়া জুযাম গোত্রের এক লোকের নিকট জানিতে পারিলেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের কাফেলার জন্য অপেক্ষা করিতেছেন। তখন আবূ সুফয়ান ও তাহার সঙ্গীবৃন্দ রাসূলুল্লাহ (স) ও তাঁহার সাহাবীগণ কোথায়ও ওঁৎ পাতিয়া থাকার ভয়ে সন্তর্পণে অগ্রসর হইলেন। অতঃপর আবূ সুফয়ান যখন হিজাযের নিকটবর্তী হইলেন তখন একাধিক সূত্রে সংবাদ সংগ্রহ করিতে লাগিলেন এবং পথচারীদের নিকট জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন লোকজনের সম্পদ যেহেতু তাহাদের যিম্মায় রহিয়াছে সেই ভয়ে। ইহারই এক পর্যায়ে তাহাকে কোন এক পথচারী খবর দিল যে, মুহাম্মাদ (স) তোমার ও তোমার কাফেলাকে পাকড়াও করিবার জন্য বাহির হইয়াছেন। এই সংবাদে আবূ সুফয়ান ভীত হইয়া পড়িলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে দামদাম ইব্‌ন আমর আল-গিফারীকে মজুরী দিয়া এই সংবাদ কুরায়শদের নিকট পৌঁছাইতে এবং তাহাদিগকে যুদ্ধের প্রস্তুতি লইয়া বাহির হইতে উদ্বুদ্ধ করিবার জন্য মক্কায় প্রেরণ করিলেন। তাহাকে সংবাদের গুরুত্ব বুঝাইবার জন্য নির্দেশ দিলেন যে, সে যেন মক্কায় প্রবেশের সময় স্বীয় উটের নাক কাটিয়া দেয়, নিজের পরিহিত জামার অগ্র ও পশ্চাদ্‌ভাগ ছিড়িয়া ফেলে, অতঃপর কুরায়শদের নিকট গিয়া তাহাদিগকে তাহাদের সম্পদ রক্ষার্থে দ্রুত বাহির হইবার জন্য প্ররোচিত করে এবং তাহাদিগকে সংবাদ দেয় যে, মুহাম্মাদ তাহার সঙ্গীদিগকে লইয়া উক্ত সম্পদ আটক করিতে অগ্রসর হইয়াছেন। অতঃপর দামদাম দ্রুত মক্কায় পথে রওয়ানা হইল এবং আবূ সুফয়ান যাহা যাহা করিতে নির্দেশ দিয়াছিলেন উহা পালন করিল।

'আতিকা বিন্ত 'আবদুল মুত্তালিবের স্বপ্নঃ এইদিকে আতিকা বিন্ত আবদুল মুত্তালিব এক ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখিল যাহাতে অদূর ভবিষ্যতে যুদ্ধের আভাস ছিল। এই স্বপ্ন মক্কায় আলোড়ন সৃষ্টি করে। ইবন ইসহাকের বর্ণনামতে, দামদাম আল-গিফারী মক্কায় আগমনের তিনদিন পূর্বে আতিকা বিন্ত 'আবদিল মুত্তালিব এক স্বপ্ন দেখেন যাহা তাহাকে খুবই বিচলিত করিয়া তোলে। তিনি স্বীয় ভ্রাতা 'আব্বাস-এর নিকট লোক প্রেরণ করেন। তিনি আগমন করিলে আতিকা বলিলেন, ভ্রাত! আমি গত রাত্রে এক স্বপ্ন দেখিয়াছি যাহা আমকে খুবই বিচলিত করিয়া তুলিয়াছে। আমি আশঙ্কা করিতেছি যে, আপনার কওমের উপর শীঘ্রই কোন বালা-মুসীবত আসিবে। আপনার নিকট যাহা বিবৃত করিব, আপনি তাহা গোপন রাখিবেন। এক বর্ণনামতে তিনি গোপন রাখিবার কারণ বর্ণনা করিয়া বলিয়াছিলেন, কুরায়শগণ উহা শুনিলে আমাদিগকে নির্যাতন করিবে এবং এমন কথা শুনাইবে যাহা আমরা পছন্দ করি না। 'আব্বাস বলিলেন, আপনি কি দেখিয়াছেন? আতিকা বলিলেন, আমি দেখিয়াছি, এক আরোহী তাহার উটের পিঠে করিয়া 'আবতাহ' নামক স্থানে আসিয়া থামিয়াছে। অতঃপর উচ্চকণ্ঠে বলিতেছে, ওহে খিয়ানতকারীদের বংশধর। তোমরা দ্রুত বাহির হও। তিনদিন পরই তোমাদের যুদ্ধ সংঘটিত হইবে। অতঃপর আমি দেখিলাম, লোকজন তাহার নিকট জড়ো হইল, আর ঐ আগন্তুক তাহার উট লইয়া মসজিদে প্রবেশ করিল। লোকজনও তাহার অনুসরণ করিল। তাহারা তাহার চতুষ্পার্শ্বে সমবেত ছিল, এমন সময় সে তাহার উটকে কাবার উপর দাঁড় করাইল এবং অনুরূপভাবে চীৎকার করিয়া বলিল, ওহে খিয়ানতকারীদের বংশধর! তোমরা দ্রুত বাহির হও। তিনদিন পরেই তোমাদের জীবন যুদ্ধ। অতঃপর সে তাহার উটকে আবু কুবায়েস পর্বতশীর্ষে দাঁড় করাইয়া আবার চীৎকার করিয়া অনুরূপ কথা বলিল। ইহার পর সে একখানি পাথর লইল এবং পর্বতের শীর্ষদেশ হইতে ছুঁড়িয়া দিল। পাথরটি গড়াইয়া পড়িতে লাগিল। পর্বতের নিচে আসিয়া উহা ভাঙ্গিয়া টুকরা টুকরা হইয়া গেল। অতঃপর মক্কার কোনও ঘরবাড়ী এমন রহিল না যেখানে উক্ত পাথরের টুকরা পৌঁছিল না। ইহা শুনিয়া আব্বাস বলিলেন, আল্লাহ্র কসম! এই স্বপ্ন আপনি গোপন রাখুন, কাহারও নিকট বিবৃত করিবেন না।

এক বর্ণনামতে আব্বাস এই কথা বলার পর ‘আতিকা আব্বাসকে বলিলেন, আপনিও ইহা গোপন রাখিবেন। ইহা কুরায়শদের নিকট পৌঁছিলে তাহারা আমাদিগকে নির্যাতন করিবে।

অতঃপর আব্বাস তাহার নিকট হইতে বাহির হইয়া আসিলেন। পথিমধ্যে আল-ওয়ালীদ ইবন উতবা ইবন রবী’আর সহিত তাহার সাক্ষাত হইল। আল-ওয়ালীদ ছিলেন আব্বাসের বন্ধু। তিনি তাহাকে উক্ত স্বপ্নের কথা বিবৃত করিলেন এবং তাহাকে গোপন রাখিতে বলিলেন। আল-ওয়ালীদ উহা স্বীয় পিতা ও কুরায়শ নেতা উতবা ইবন রবী’আর নিকট বলিলেন। অতঃপর এই স্বপ্নের কথা মক্কায় ছড়াইয়া পড়িল। এমনকি কুরায়শগণ তাহাদের মজলিসে ইহা আলোচনা করিতে লাগিল।

আব্বাস বলেন, পরদিন সকালবেলা আমি বায়তুল্লাহ্ তাওয়াফ করিতে গেলাম। আবু জাহল ইবন হিশাম তখন কুরায়শদের একটি দলের সহিত বসিয়া আতিকার স্বপ্ন লইয়া আলাপ-আলোচনা করিতেছিল। আমাকে দেখিয়া আবু জাহল বলিল, হে আবুল ফাদল! তাওয়াফ শেষ করিয়া আমাদের নিকট আসিও। আমি তাওয়াফ শেষ করিয়া তাহাদের নিকট গিয়া বসিলাম। তখন আবু জাহল আমাকে বলিল, হে আবদুল মুত্তালিবের পুত্র! এই মহিলা নবী তোমাদিগকে কখন বলিয়াছে? আমি বলিলাম, উহা কি? সে বলিল, আতিকা যে স্বপ্ন দেখিয়াছে তাহা। আমি বলিলাম, সে কি দেখিয়াছে? সে বলিল, হে আবদুল মুত্তালিবের পুত্র! তোমরা কি তোমাদের পুরুষদের নবুওয়াতের দাবিতে সন্তুষ্ট নও! এখন তোমাদের মহিলারাও নবুওয়াতের দাবি করিতেছে? মুসা ইবন উকবার বর্ণনামতে আবু জাহল বলিল, ওহে হাশিমের বংশধর! তোমরা কি পুরুষদের মিথ্যাচারে সন্তুষ্ট নও, এখন মহিলাদের মিথ্যাচার লইয়া আসিয়াছ? তোমরা ও আমরা যেন বহু যুগ ধরিয়া সম্মানের প্রতিযোগিতা করিয়া চলিয়াছি। এই প্রতিযোগিতায় উভয় পক্ষ যখন সমপর্যায়ে ছিলাম তখন তোমরা বলিলে, আমাদের মধ্যে একজন নবী আছেন। কিছুদিন পর আবার বলিতেছ, আমাদের মধ্যে একজন মহিলা নবী। কুরায়শদের কোনও ঘরে তোমাদের চেয়ে বেশী মিথ্যাবাদী নারী ও মিথ্যাবাদী পুরুষ আছে বলিয়া আমার জানা নাই।

এইভাবে আবূ জাহল আব্বাসকে মানসিকভাবে খুবই নির্যাতন করিল। সে আরও বলিল, 'আতিকা মনে করে, তাহার স্বপ্নে সেই আগন্তুক বলিয়াছে তোমরা তিন দিনের মধ্যে বাহির হও। আমরা এই তিনদিন অপেক্ষা করিব। সে যাহা বলিতেছে তাহা যদি উক্ত তিন দিনের মধ্যে সত্যই সংঘটিত হয় তো হইল। আর যদি তিন দিন অতিবাহিত হইয়া যায় অথচ ইহার কিছুই সংঘটিত না হয় তবে আমরা তোমাদের বিরুদ্ধে এক অঙ্গীকারনামা লিখিব যে, তোমরা আরবের মধ্যে সর্বাধিক মিথ্যাবাদী পরিবার। আব্বাস বলেন, আল্লাহর কসম! আমার পক্ষ হইতে তাহার প্রতি বড় কোনও প্রতিবাদ ছিল না। আমি কেবল উহা অস্বীকার করিয়াছিলাম। অতঃপর আমরা পৃথক হইয়া গেলাম।

'আব্বাস বলেন, সন্ধ্যাবেলা আবদুল মুত্তালিবের বংশধর মহিলা কেহই আর বাকী রহিল না, সকলেই আমার নিকট একত্র হইয়া বলিল, আপনি কি ইহা মানিয়া লইয়াছেন যে, এই পাপিষ্ঠ দুর্বৃত্ত আপনাদের পুরুষদের ব্যাপারে জঘন্য ভূমিকা গ্রহণ করিবে, অতঃপর আপনাদের মহিলাদেরকেও উহার অন্তর্ভুক্ত করিয়া লইবে আর আপনি নীরবে তাহা শ্রবণ করিয়া যাইবেন? উহা শ্রবণের পরও কি আপনার কোনও আত্মসম্মানবোধ নাই? আমি বলিলাম, আল্লাহ্র কসম! আমি তাহা করিব। আমার পক্ষ হইতে তাহার প্রতি যত বড় মারাত্মক আচরণই করিতে হয় আমি তাহা করিব। আল্লাহর কসম! আমি তাহার মুখামুখী হইব। সে যদি পুনরায় উহা বলে তবে আমিই তাহার সহিত বোঝাপড়ায় তোমাদের জন্য যথেষ্ট হইব।

আব্বাস বলেন, আতিকার স্বপ্ন দেখার তৃতীয় দিবসের সকালে আমি তেজোদ্দীপ্ত ও রাগান্বিত অবস্থায় অনুভব করিলাম যে, এমন একটি বিষয় আমা হইতে ছুটিয়া গিয়াছে যাহা আমি তাহার নিকট হইতে পাইতে চাহি। অতঃপর আমি মসজিদে প্রবেশ করিয়া তাহাকে দেখিতে পাইলাম। আল্লাহর কসম! আমি তাহার মুকাবিলা করিবার জন্য তাহার দিকে অগ্রসর হইলাম, যাহাতে সে তাহার কথিত মন্তব্য প্রত্যাহার করিয়া লয়। সে ছিল দ্রুতগামী, কঠোর চেহারা, ধারালো বক্তব্য ও প্রখর দৃষ্টিশক্তির অধিকারী। হঠাৎ করিয়া সে মসজিদের দরজা দিয়া বাহির হইয়া গেল। তখন আমি মনে মনে বলিলাম, তাহার উপর আল্লাহ্ অভিশাপ বর্ষিত হউক, তাহার কী হইল! সে কি আমার গালির ভয়ে এইরূপ করিল? পরক্ষণেই বুঝিলাম, সে এমন কিছু শুনিয়াছে যাহা আমি শুনি নাই। তাহা হইল দামদাম ইব্‌ন আমর আল-গিফারীর আওয়ায। সে বাত্ন ওয়াদীতে (উপত্যকায়) চীৎকার করিতেছিল তাহার উটের উপর দণ্ডায়মান অবস্থায়। সে তাহার উটের নাক কাটিয়া ফেলিয়াছিল, তাহার সওয়ারী ঘুরাইয়া দিয়াছিল এবং নিজের জামা ছিড়িয়া ফেলিয়াছিল। এমতাবস্থায় সে বলিতেছিল, ওহে কুরায়শ দল! তোমরা সুবাস বহনকারী উট রক্ষা কর। আবূ সুফ্যানের সহিত তোমাদের যে সম্পদ রহিয়াছে, মুহাম্মাদ তাহার দলবলসহ উহা আটক করিয়াছে। আমার মনে হয় তোমরা তাহা পাইবে না। হায় সাহায্য! হায় সাহায্য! ইহা শুনিয়া কুরায়শগণ ঘাবড়াইয়া গেল এবং তাহারা আতিকার স্বপ্নের কথা স্মরণ করিয়া ভীত হইয়া পড়িল। আব্বাস বলেন, উদ্ভূত এই ঘটনাই আমাকে তাহা হইতে এবং তাহাকে আমা হইতে ফিরাইয়া রাখিল। তখন আতিকা নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করিলেন:
الم تكن الرويا بحق وجاءكم - بتصديقها فل من القوم هارب فقلتم ولم اكذب كذبت وإنما - يكذبنا بالصدق من هو كاذب.
"আমার স্বপ্ন কি সত্য ছিল না? কওমের এক লোক উহার সত্যতা প্রতিপন্ন করিয়া দ্রুত আগমন করিয়াছে। তোমরা বলিয়াছ যে, আমি মিথ্যা বলিয়াছি। অথচ আমি মিথ্যা বলি নাই; প্রকৃতপক্ষে যে নিজে মিথ্যাবাদী সে-ই সত্যকে মিথ্যা বলিয়া প্রতিপন্ন করে”।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কুরায়শদের যুদ্ধ প্রস্তুতি

📄 কুরায়শদের যুদ্ধ প্রস্তুতি


কুরায়শদের যুদ্ধ প্রস্তুতি : দামদামের এই সংবাদ শুনিয়া কুরায়শগণ ক্রোধে ফাটিয়া পড়িল। তাহারা দ্রুত প্রস্তুতি গ্রহণ করিতে লাগিল এবং বলিতে লাগিল, মুহাম্মাদ ও তাহার সঙ্গীবৃন্দ কি ধারণা করিয়াছে যে, ইবনুল হাদরামী দলের যে পরিণতি হইয়াছে, এই ক্ষেত্রেও তাহাই হইবে? কখনও না। আল্লাহ্র কসম! তাহারা অন্য কিছু জানিতে পারিবে (ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরা, ২খ., পৃ. ২৫২)। অতঃপর কুরায়শদের সকলেই হয়ত বা নিজে যুদ্ধে গমনের প্রস্তুতি গ্রহণ করিল অথবা নিজের স্থলে অন্য এক লোক প্রেরণ করিল। আবু লাহাব ব্যতীত কুরায়শদের কোনও নেতাই যুদ্ধে গমন করিতে বাকী রহিল না। এক বর্ণনামতে তাহার নিকট গমন করিলে সে যুদ্ধে যাইতে বা তদস্থলে কোনও লোক প্রেরণ করিতে অঙ্গীকার করে (সুবুলুল হুদা, ৪খ., পৃ. ২১)। তবে সঠিক বর্ণনামতে সে নিজের পরিবর্তে আল-আস ইব্‌ন হিশাম ইবনুল মুগীরাকে প্রেরণ করে, যিনি পরবর্তী কালে ইসলাম গ্রহন করেন। আবু লাহাব আল-আস-এর নিকট চার হাজার দিরহাম পাইত। উহার বিনিময়ে তাহাকে প্রেরণ করিয়া নিজে ঘরে বসিয়া থাকে (উয়ূনুল আছার, ১খ., পৃ. ২৮৪)। এক বর্ণনামতে আতিকার স্বপ্নের কারণে আবু লাহাব ভয় পাইয়া উক্ত যুদ্ধে অংশগ্রহণ হইতে বিরত থাকে (সুবুলুল হুদা, ৪খ., পৃ. ২১)। উমায়‍্যা 'হুবাল' নামক মূর্তির নিকট তীর নিক্ষেপের দ্বারা লটারী করে। লটারীতে নেতিবাচক দিক নির্ণীত হইলে তাহারা যুদ্ধে গমন না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু আবূ জাহল ইবন হিশাম তাহাদিগকে প্ররোচিত করে। ফলে তাহারা নিজেদের সংকল্প ত্যাগ করে। তবে উমায়্যা ইন্ন খালাফ ছিল কুরায়শদের মধ্যে সম্মানিত, বয়োবৃদ্ধ, মোটাসোটা ও ভারী লোক। সে এই সংকল্প করিলে উকবা ইবন আবী মুআয়ত জ্বলন্ত একটি অগ্নির পাত্র লইয়া আগমন করিল। উমায়্যা তখন মসজিদে স্বীয় কওমের সম্মুখে বসিয়াছিল। উকবা পাত্রটি উমায়‍্যার সম্মুখে রাখিয়া বলিল, ওহে আবূ আলী! লও, বসিয়া বসিয়া অগ্নি পোহাও। কারণ তুমি তো মহিলাদের অন্তর্ভুক্ত। উমায়‍্যা বলিল, আল্লাহ তোমাকে এবং তুমি যাহা লইয়া আসিয়াছ তাহাকে কুৎসিত আকার করিয়া দিন। অতঃপর উমায়‍্যা প্রস্তুতি গ্রহণ করিয়া অন্যান্যের সহিত যুদ্ধে গমন করে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খঃ, পৃ. ২৫৮)। উমায়‍্যা ইবন খালাফের যুদ্ধ হইতে পিছাইয়া থাকিবার কারণ ইমাম বুখারী (র) সা'দ ইব্‌ন মু'আয (রা) হইতে এইভাবে বর্ণনা করিয়াছেন যে, সা'd (রা) উমায়‍্যা ইন্ন খালাফের বন্ধু ছিলেন। উমায়্যা যখন মদীনায় গমন করিত তখন সা'd (রা)-এর গৃহে অবস্থান করিত। অনুরূপভাবে সা'd (রা)-ও যখন মক্কায় আগমন করিতেন তখন উমায়‍্যার গৃহে উঠিতেন। রাসূলুল্লাহ (স) মদীনায় হিজরত করিবার পর সা'd (রা) উমরা করার জন্য মক্কায় গমন করিলে উমায়্যার গৃহে উঠিলেন। সা'd (রা) উমায়‍্যাকে বলিলেন, একটু নির্জন সময় দেখ, যাহাতে আমি বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করিতে পারি। অতঃপর উমায়‍্যা তাহাকে লইয়া দ্বিপ্রহরের কাছাকাছি সময়ে বাহির হইল। ইতোমধ্যে আবূ জাহলের সহিত তাহাদের সাক্ষাত হইল। আবূ জাহল উমায়্যাকে লক্ষ্য করিয়া বলিল, ওহে আবূ সাফওয়ান! তোমার সঙ্গে এই লোক কে? সে বলিল, ইনি সা'd। আবূ জাহল তাহাকে বলিল, আমি তোমাকে দেখিতে পাইতেছি যে, তুমি নিরাপদে মক্কায় তাওয়াফ করিতেছ। অথচ তোমরা ধর্মত্যাগীদিগকে জায়গা দিয়াছ। তোমাদের ধারণামতে তোমরা তাহাদিগকে সাহায্য-সহযোগিতা করিবে। জানিয়া রাখ, আল্লাহ্র কসম! তুমি যদি আবূ সাফওয়ানের সঙ্গে না থাকিতে তবে নিরাপদে তোমার পরিবারের নিকট কিছুতেই ফিরিয়া যাইতে পারিতে না। সা'd (রা) উচ্চস্বরে তাহাকে বলিলেন, তুমি জানিয়া রাখ, আল্লাহ্র কসম! তুমি যদি এই কাজে আমাকে বাধা দাও তবে অবশ্যই আমি তোমাকে তোমার নিকট ইহা হইতে গুরুত্বপূর্ণ যে কাজ, তাহা হইতে বাধা দিব। আর তাহা হইল তোমার মদীনার নিকট দিয়া যাওয়ার রাস্তা। উমায়্যা তাহাকে বলিল, হে সা'd! আবুল হাকাম-এর নিকট উচ্চস্বরে কথা বলিও না। কারণ তিনি এই উপত্যকাবাসীদের নেতা। সা'd (রা) বলিলেন, রাখো হে উমায়‍্যা! আল্লাহ্র কসম, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিতে শুনিয়াছি যে, তিনিই তোমার হত্যাকারী হইবেন। উমায়‍্যা বলিল, মক্কায়? সা'd (রা) বলিলেন, আমি জানি না। ইহা শুনিয়া উমায়্যা ভীষণভাবে ঘাবড়াইয়া গেল। সে তাহার পরিবারের নিকট ফিরিয়া আসিয়া বলিল, হে উম্মু সাফওয়ান! তুমি কি জান, সা'd আমাকে কি বলিয়াছে? উমায়্যা বলিল, সে বলিয়াছে যে, মুহাম্মাদ তাহাকে জানাইয়াছে যে, সে আমার হত্যাকারী। আমি তাহাকে বলিলাম, মক্কাতেই? সে বলিল, জানি না। উমায়‍্যা বলিল, আল্লাহ্র কসম! আমি মক্কা হইতে বাহির হইব না। অতঃপর বদর যুদ্ধের দিন আবূ জাহল যখন লোকজনকে বাহির হইবার জন্য উদ্বুদ্ধ করিয়া বলিতেছিল, তোমাদের বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের জন্য বাহির হও তখন উমায়্যা বাহির হইতে পছন্দ করিল না। আবূ জাহল তাহার নিকট আসিয়া বলিল, হে আবূ সাফওয়ান! লোকে যখন দেখিবে যে, তুমি পিছনে থাকিয়া গিয়াছ, আর তুমি উপত্যকাবা'সীদের নেতা, তখন তাহারাও তোমার সহিত পিছনে থাকিয়া যাইবে। আবু জাহল অনবরত তাহাকে উদ্বুদ্ধ করিতে লাগিল। অবশেষে সে বলিল, জানিয়া রাখ, তুমি যদি আমার উপর বিজয়ী হইয়া যাও তবে অবশ্যই আমি মক্কার উত্তম উট ক্রয় করিব। অতঃপর উমায়‍্যা তাহার স্ত্রীকে বলিল, হে উম্মু সাফওয়ান! আমার সফরের প্রস্তুতি কর। স্ত্রী বলিল, হে আবূ সাফওয়ান! তুমি কি তোমার ইয়াছরিবী বন্ধু যাহা বলিয়াছিল তাহা ভুলিয়া গিয়াছ? উমায়‍্যা বলিল, না, আমি তাহাদের সহিত বেশীদূর যাইব না। অতঃপর উমায়‍্যা যখন বাহির হইল তখন যে মনযিলেই সে পৌঁছিতেছিল সেখানেই সে তাহার উট বাঁধিয়া দেখিতেছিল। এমনি করিয়া আল্লাহ তা'আলা বদর প্রান্তরে আনিয়া তাহাকে হত্যা করিলেন। এক বর্ণনামতে উমায়‍্যার স্ত্রী তাহাকে বলিয়াছিল, নিশ্চয় মুহাম্মাদ মিথ্যা বলে না। ইবন সায়ি‍্যদিন নাস বলেন, সীরাতবিদগণের নিকট প্রসিদ্ধ হইল যে, রাসূলুল্লাহ (স) এই কথা উমায়্যার ভ্রাতা উবাই ইব্‌ন খালাফকে হিজরতের পূর্বে মক্কায় বলিয়াছিলেন এবং তাহাকেই তিনি উহুদ যুদ্ধের দিন বর্শা দ্বারা স্পর্শ করিয়া হত্যা করেন। এমনিভাবে কুরায়শগণ তিন দিনের মধ্যে মতান্তরে দুই দিনের মধ্যে তাহাদের প্রস্তুতি সম্পন্ন করিল। তাহাদের শক্তিশালী ও সামর্থ্যবান ব্যক্তি দুর্বল ব্যক্তিকে বাহির হইতে সাহায্য করিল। সুহায়ল ইবন 'আমর, যাম'আ ইবনুল আসওয়াদ, তু'আয়মা ইবন আদী, হানজালা ইবন আবী সুফয়ান প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ জনগণকে বাহির হইতে উৎসাহিত ও উদ্বুদ্ধ করিতেছিল। সুহায়ল বলিল, ওহে গালিবের বংশধর! তোমরা কি মুহাম্মাদকে ও তাঁহার সহিত তোমাদের যুবক ধর্মত্যাগীদিগকে ছাড়িয়া দিবে, আর ইয়াছরিববাসী তোমাদের বাণিজ্যিক কাফেলা ও সহায়-সম্পদ লইয়া যাইবে? যে সম্পদ চাহিতেছে তাহার জন্য এই আমার সম্পদ রহিল। আর যে শক্তি চাহিতেছে এই আমার শক্তি। অতঃপর উমায়্যা ইবন আবিস সান্ত তাহার প্রশংসা করিয়া কবিতা রচনা করে। নাওফাল ইন্ন মু'আবিয়া কুরায়শদের সচ্ছল ব্যক্তিদের নিকট গিয়া তাহাদের সম্পদ ও বাহন যুদ্ধে গমনেচ্ছুদের জন্য খরচ করিবার অনুরোধ জানাইল। আবদুল্লাহ ইবন আবূ রাবী'আ বলিল, এই পাঁচ শত স্বর্ণমুদ্রা তুমি যেখানে ইচ্ছা খরচ কর। সে হুওয়ায়তিম ইবন আবদিন 'উযযা হইতে দুই শত, মতান্তরে তিন শত স্বর্ণমুদ্রা লইল'এবং উহা দ্বারা অস্ত্র ও বাহনের শক্তি বৃদ্ধি করিল। তু'আয়মা ইবন আদী ২০টি উটের ব্যবস্থা করিল এবং উহার আরোহীদের পরিবার- পরিজনের খরচাদির ব্যবস্থাও করিয়া দিল। যুদ্ধের জন্য বাহির হইতে অপছন্দকারী কোনও ব্যক্তিকে তাহারা ছাড়িল না এই ধারণার বশবর্তী হইয়া যে, তাহারা মুহাম্মাদ ও তাহার সঙ্গীদের দলভুক্ত। আর এমন কোন মুসলমানকেও ছাড়িল না যাহার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে তাহারা জানিত। বানু হাশিমের মধ্য হইতেও আবু লাহাব ব্যতীত কাহাকেও ছাড়িল না। 'আব্বাস ইবন আবদিল মুত্তালিব, নাওফাল ইবনুল হারিছ, তালিব ইবন আবী তালিব, 'আকীল ইব্‌ন আবী তালিব প্রমুখকে তাহাদের সঙ্গে লইল। এমনিভাবে তাহারা যুদ্ধে গমনের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করিল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কুরায়শদের বানু কিনানা ভীতি এবং শয়তানের সান্ত্বনা দান

📄 কুরায়শদের বানু কিনানা ভীতি এবং শয়তানের সান্ত্বনা দান


কুরায়শদের বানু কিনানা ভীতি এবং শয়তানের সান্ত্বনা দান : কুরায়শগণ যখন তাহাদের পূর্ণ প্রস্তুতি সম্পন্ন করিল এবং রওয়ানা হওয়ার ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ হইল তখন তাহাদের মধ্যে ও বানু বাক্স ইবন আব্দ মানাফ ইব্‌ন কিনানার মধ্যে দীর্ঘ দিন হইতে যে যুদ্ধ চলিয়া আসিতেছিল উহার কথা তাহাদের স্মরণ হইল। তখন তাহারা বলিল, আমাদের আশঙ্কা হইতেছে যে, তাহারা আমাদের পিছন দিক হইতে আমাদের উপর আক্রমণ করিয়া বসিবে। কুরায়শ ও বানু বাক্স গোত্রের মধ্যে যুদ্ধের সূত্রপাত হইয়াছিল 'আমের ইব্‌ লুআয়্যি গোত্রের হাম্স ইবনুল আখয়াফ তনয়কে কেন্দ্র করিয়া। তাহাকে বানু বাক্স নেতা 'আমের ইব্‌ন ইয়াযীদ ইব্‌ন 'আমের ইবনুল মাল্লহ-এর ইঙ্গিতে উক্ত গোত্রের এক লোক হত্যা করিয়াছিল। নিহতের ভ্রাতা মিকরায ইব্‌ন আখয়াফ ইহার বদলাস্বরূপ 'আমের ইবন ইয়াযীদকে হত্যা করিয়া তাহার তরবারি কা'বা শরীফের গিলাফের সহিত লটকাইয়া রাখে। অতঃপর কুরায়শগণ যুদ্ধে রওয়ানা হওয়ার মুহূর্তে তাহাদের সহিত দ্বন্দ্বের কথা স্মরণ করিয়া ভীত হইয়া পড়ে। ভয়ে তাহাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করিয়া ফিরিয়া যাইবার উপক্রম হইল। তখন ইবলীস কিনানা গোত্রের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি সুরাকা ইবন মালিক ইবন জু'শুম আল-মুদলিজী আল-কিনানী-এর আকৃতি ধারণ করিয়া তাহাদিগকে বলিল, কিনানা গোত্র তোমাদের পশ্চাত হইতে আক্রমণ করার ব্যাপারে আমি তোমাদিগকে নিরাপত্তা দান করিতেছি যাহা তোমরা অপছন্দ করিতেছ। ইহাতে তাহারা সান্ত্বনা লাভ করিয়া দ্রুত বাহির হইয়া পড়িল। এই সময় কুরায়শ যোদ্ধাদের সংখ্যা ছিল ৯৫০, মতান্তরে ১০০০। তাহাদের সঙ্গে ছিল ২০০ ঘোড়া, ৬০০ লৌহবর্ম। সমরাস্ত্রের বিপুল সমাহার ছাড়াও ছিল গায়িকাদল, যাহারা দফ বাজাইয়া এবং মুসলমানদের প্রতি ব্যঙ্গ-বিদ্রূপাত্মক সঙ্গীত গাহিয়া আনন্দ প্রকাশ করিতেছিল। তাহাদের সঙ্গে আরও ছিল ইবলীস সুরাকার আকৃতি ধরিয়া। সে তাহাদিগকে আশ্বাস দিতেছিল যে, তাহাদের সাহায্যার্থে কিনানা গোত্র তাহাদের পিছনে আসিতেছে, কেহই তোমাদের উপর বিজয়ী হইতে পারিবে না। কুরায়শদের এহেন দর্পভরে বাহির হওয়া এবং ইবলীসের আশ্বাসবাণী সম্পর্কে কুরআন কারীমে উক্ত হইয়াছে : وَلاَ تَكُونُوا كَالَّذِيْنَ خَرَجُوْا مِنْ دِيَارِهِمْ بَطَرًا وَرِيَاءَ النَّاسِ وَيَصُدُّوْنَ عَنْ سَبِيْلِ اللهِ وَاللهُ بِمَا يَعْمَلُوْنَ مُحِيْطٌ. وَإِذْ زَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ أَعْمَالَهُمْ وَقَالَ لاَ غَالِبَ لَكُمُ الْيَوْمَ مِنَ النَّاسِ وَإِنِّيْ جَارٌ لَكُمْ (٨ : ٤٧-٤٨) . "তোমরা তাহাদের ন্যায় হইবে না যাহারা দম্ভভরে ও লোক দেখাইবার জন্য স্বীয় গৃহ হইতে বাহির হইয়াছে এবং লোককে নিবৃত্ত করে। তাহারা যাহা করে আল্লাহ্ তাহা পরিবেষ্টন করিয়া রহিয়াছেন। স্মরণ কর, যখন শয়তান তাহাদের কার্যাবলী তাহাদের দৃষ্টিতে শোভন করিয়াছিল এবং বলিয়াছিল, আজ মানুষের মধ্যে কেহই তোমাদের উপর বিজয়ী হইতে পারিবে না। আমি তোমাদের পার্শ্বেই থাকিব" (৮:৪৭-৪৮)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00