📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বুওয়াতের ভৌগোলিক গুরুত্ব

📄 বুওয়াতের ভৌগোলিক গুরুত্ব


তৎকালীন আরবের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র বলিয়া গণ্য করা হইত সিরিয়াকে। মক্কাবাসীরা তাহাদের পণ্যদ্রব্য বিক্রয়ের জন্য এইখানে লইয়া আসিত এবং তাহাদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী এইখান হইতে আমদানী করিত। আর এই বাণিজ্যিক যোগাযোগের জন্য স্থলপথই ছিল একমাত্র উপায়। যেহেতু পথের দূরত্ব ছিল যেমন অধিক, তেমনি ঐ সময় দস্যুবৃত্তির প্রকোপও ছিল অত্যধিক। তাই যোগাযোগ ছিল কাফেলাভিত্তিক। অনেকের অনেকগুলো প্রয়োজন একত্র হওয়ার পর একটি বাণিজ্যিক কাফেলায় রূপ নিত। উট, ঘোড়া, গাধা ও খচ্চর প্রভৃতি বাহনের মাধ্যমে মক্কার লোকেরা কাফেলাবদ্ধ হইয়া সিরিয়ায় যাইত এবং তাহাদের বাণিজ্যিক তৎপরতা পরিচালিত করিত।

বুওয়াত স্থানটি মক্কা-সিরিয়া বাণিজ্যিক কাফেলাগুলির পথে পড়িত। স্থানটি মদীনার নিকটে হওয়ায় মদীনাবাসীদের দ্বারা উহা নিয়ন্ত্রিত ছিল। মক্কার সহিত মদীনাবাসীদের সম্পর্কের কোন প্রকার অবনতি ঘটিলে যেমনটি উক্ত স্থানের নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন হইত তেমনিভাবে সিরিয়ামুখী বাণিজ্যের অবস্থাও নাযুক হইয়া পড়িত। বুওয়াত কেবল মক্কা-সিরিয়া বাণিজ্যিক পথের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নহে, বরং আরবের গোটা দক্ষিণাঞ্চলের বাণিজ্যিক পথের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চল হইতে যেই সকল বাণিজ্যিক কাফেলা চলাচল করিত বা মক্কায় আসিত তাহার কোন কোনটিতে আড়াই হাজার পর্যন্ত উট বোঝাই পণ্য থাকিত। এইসব পণ্যের মূল্য পঞ্চাশ হাজার দীনারেরও বেশী হইত। ড. স্প্রেংগার বলেন, এই সময় মক্কা হইতে যেইসব পণ্য বাহিরে যাইত সেই সবের মূল্য অনেক সময় এক লাখ ষাট হাজার লিরা বা দুই লাখ ডলার ছাড়াইয়া যাইত।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 গাযওয়া প্রেক্ষাপট

📄 গাযওয়া প্রেক্ষাপট


হিজরতের পর হইতেই রাসূলুল্লাহ (স) ও তাঁহার সাহাবীদের বিরুদ্ধে মক্কাবাসীরা যে ষড়যন্ত্র করিয়া আসিতেছিল উহা প্রতিহত করার লক্ষ্যে রাসূলুল্লাহ (স) পরপর কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করিলেন। ফলে মক্কাবাসীদের সিরিয়ামুখী বাণিজ্য ব্যবস্থা বিপন্ন হইয়া পড়িল। মদীনার পার্শ্ববর্তী এলাকার গোত্রগুলি ক্রমান্বয়ে মুসলমানদের সাথে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হইতে লাগিল। তাহাদের মদীনায় যাওয়ার পথ সংকীর্ণ ও অবরুদ্ধ হইয়া পড়িল।

এই পরিস্থিতিতে মক্কাবাসীরা তাৎক্ষণিকভাবে মদীনা আক্রমণের প্রস্তুতি নিল এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর আবওয়া অভিযানের পর মাত্র এক মাসের মধ্যে মদীনায় পরপর দুইটি অভিযান পরিচালনা করিল, যদিও ইহাতে তাহারা কোন সাফল্য অর্জন করিতে সক্ষম হয় নাই। এমনকি মুসলমানদের সহিত তাহাদের কোন ধরনের সম্মুখ সংঘর্ষও হয় নাই। কিন্তু মদীনার জন্য ইহা একদিকে বড় ধরনের ভবিষ্যত হামলার আশংকা বাড়াইয়া তুলিল, অন্যদিকে মদীনার পার্শ্ববর্তী গোত্রের সহিত মুসলমানদের মৈত্রী চুক্তির ভিতও দুর্বল হইয়া পড়ার আশংকা দেখা দিল। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (স) কয়েকটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করিলেন। তম্মধ্যে মুসলমানদের মনোবল বৃদ্ধি ও রণ প্রস্তুতি-প্রশিক্ষণ নিশ্চিতকরণ, মক্কাবাসীদের বাণিজ্যিক তৎপরতাকে আরও সূদৃঢ়ভাবে প্রতিরোধকরণ, সম্পাদিত মৈত্রী চুক্তি আরো জোরদার করার লক্ষ্যে তাহাদের সহিত সৌজন্যমূলক সাক্ষাতকরণ ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

উপরিউক্ত প্রেক্ষাপটকে সামনে রাখিয়া রাসূলুল্লাহ (স) নিম্নবর্ণিত পদক্ষেপগুলি গ্রহণ করিলেন।
১. মুসলিম টহলদার বাহিনী আরও জোরদার করা;
২. কাফিরদের কোন বাণিজ্যিক কাফেলার সংবাদ পাইলে তাৎক্ষণিকভাবে তাহা প্রতিহত করার প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা গ্রহণ করা;
৩. মুসলিম সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং
৪. আনসার-মুহাজির নির্বিশেষে সকল সামরিক পদক্ষেপে সকল মুসলমানকে একই পতাকাতলে সমবেত করা।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 গাযওয়ার বিবরণ

📄 গাযওয়ার বিবরণ


মাহমূদ শাকের বলেন যে, আবওয়া অভিযান সমাপ্ত হওয়ার কয়েক দিন পরই এই গাযওয়া সংঘটিত হইয়াছিল। রাসূলুল্লাহ (স)-কে ওহীর মাধ্যমে জানানো হইয়াছিল যে, কুরায়শদের একটি বাণিজ্যিক কাফেলা সিরিয়া হইতে মক্কায় ফিরিয়া যাইতেছে। মহানবী (স) তখন দুই শত সৈন্যের এক বাহিনী লইয়া ঐ কাফেলার পথরোধ করার উদ্দেশ্যে মদীনা হইতে বাহির হইলেন। ইন্ন কাছীরের বর্ণনানুযায়ী, এই সময় রাসূলুল্লাহ (স) সাইব ইব্‌ন উছমান ইবন মাজ'ঊন (রা)-কে মদীনায় তাঁহার প্রতিনিধি নিযুক্ত করিয়া যান। তবে ওয়াকিদীর বর্ণনায় এই ক্ষেত্রে সা'দ ইব্‌ন মু'আয (রা)-এর নাম উল্লেখ করা হইয়াছে।

এই অভিযানে হযরত সা'দ ইব্‌ন আবী ওয়াককাস (রা)-কে পতাকা বহন করার দায়িত্ব প্রদান করা হয়। পতাকার রং ছিল সাদা।

কুরায়শদের উক্ত কাফেলা ছিল বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। কাফেলার নেতৃত্বে ছিল উমায়্যা ইব্‌ন খালাফ, লোকসংখ্যা ছিল এক শত। কাফেলাটি আড়াই হাজার উট লইয়া ফিরিতেছিল। রাসূলুল্লাহ (স) সৈন্য লইয়া বুওয়াত পর্যন্ত পৌছিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স)-এর আগমনের ব্যাপারটি উপলব্ধি করিতে পারিয়া কুরায়শ সর্দার কাফেলা লইয়া অন্য পথে গমন করিল। ফলে এই অভিযানেও কুরায়শদের সহিত মুসলমানদের কোন সম্মুখ সংঘর্ষও হয় নাই। রাসূলুল্লাহ্ (স) প্রায় একমাস সেখানে অবস্থান করিয়া কাফেলাসহ মদীনাতে ফিরিয়া আসিলেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 গাযওয়ার ফলাফল

📄 গাযওয়ার ফলাফল


গাযওয়া বুওয়াত ইসলামের ইতিহাসে একটি বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। ইহা মুসলমানদের অভ্যন্তরীণ পরিমণ্ডল, মদীনার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল ও মক্কার কাফিরদের মাঝে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। এই গাযওয়ার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ফল হইল ইসলামের বিরুদ্ধে সকল অপতৎপরতা রোধে আনসার-মুহাজির নির্বিশেষে সকল মুসলমানের ঐক্যবদ্ধভাবে একই পতাকাতলে সমবেত হওয়া। ইহা ছাড়া দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ফল হইল মদীনার পার্শ্ববর্তী এলাকার সকল মিত্র গোত্রের সহিত সম্পর্কের উন্নতি। এই ঘটনার প্রায় দুই মাস পর পরবর্তী গাযওয়া 'উশায়রা সংঘটিত হইয়াছিল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00