📄 স্থান পরিচিতি
ইসলামের ইতিহাসে বুওয়াত একটি উল্লেখযোগ্য স্থান। এই স্থানেই রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নেতৃত্বে আনসার-মুহাজিরদের সমন্বিত বাহিনীর একটি জিহাদ পরিচালিত হইয়াছিল। স্থানটির শাব্দিক উচ্চারণের একক কোন সিদ্ধান্ত পাওয়া যায় নাই। ভাষাবিদগণের এক পক্ষ ইহাকে )بواط( অর্থাৎ প্রথম অক্ষর -এর উপর পেশ, ওয়াও -এর উপর যবর প্রদান করত স্থানটিকে বুওয়াত হিসাবে উচ্চারণ করিয়াছেন। অপরপক্ষে আসীল আল-মুসতামিলী (যিনি বুখারীর হাদীছ বর্ণনাকারী রাবীদের একজন) এবং আল-আযরী (যিনি মুসলিম শরীফের রাবীদের একজন) প্রমুখের বর্ণনানুযায়ী স্থানটিকে -এর উপর যবর প্রদান করত বাওয়াত উচ্চারণ করা হইয়াছে। তবে যুরকানী অবশ্য )طالعll( মাতালি' গ্রন্থের এবং কামূস গ্রন্থকারের বরাতে বলেন যে, প্রথমোক্ত মতটি যেমন সহজ তেমনি বেশী পরিচিত (শারহুল মাওয়াহিবিল লাদুন্নিয়্যা, পৃ. ৩৯৩)। প্রকৃতপক্ষে দেখা যায় যে, অধিকাংশ ঐতিহাসিক بوط শব্দটির উচ্চারণের বর্ণনায় পূর্বোক্ত দুইটি মতের কথা উল্লেখ করিলেও -এর উপর পেশযুক্ত উচ্চারণটিকেই গ্রহণ করিয়াছেন।
ঐতিহাসিকদের আলোচনায় বুওয়াতের স্থান পরিচিতি হিসাবে বিভিন্ন কথা আসিয়াছে। এক দিকে বলা হইয়াছে যে, বুওয়াত জুহায়না পর্বতমালার অন্তর্ভুক্ত একটি পাহাড়। ইহা ইয়ানবূ' )ينبوع(-এর নিকটবর্তী এবং মদীনা হইতে ৪৮ মাইল দূরে অবস্থিত। সুহায়লী বলেন, বুওয়াত একটি পাহাড়ের দুইটি শাখা পাহাড়। ভিন্নভাবে ইহাদেরকে জালসী )جلسی( এবং গাওরী )غوری( বলা হয়। তন্মধ্যে জালসী অঞ্চলে বন্ দীনার গোত্র বসবাস করিত এবং ইহা ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর জীবনের দ্বিতীয় বারের সামরিক মূল অভিযানস্থল (যুরকানী, প্রাগুক্ত)। তবে ইহা ছাড়াও স্থানটির অন্যান্য বর্ণনা আসিয়াছে। যেমন স্থানটি লোহিত সাগরের উপকূলীয় অঞ্চল হিসাবে বলা হইয়াছে (হযরত রাসূল করীম (স), জীবন ও শিক্ষা, পৃ. ৩৪৬)। আর-রাহীকুল মাখতুম-এ বলা হইয়াছে যে, বুওয়াত একটি পাহাড়ের নাম। বুওয়াত ও রাদওয়া জুহায়না পাহাড়ী এলাকার দুইটি পাহাড়। মূলত ইহা একটি পাহাড়ের দুইটি শাখা, মক্কা হইতে সিরিয়া যাওয়ার পথে পড়ে এবং এই কথা পূর্বেও বলা হইয়াছে যে, মদীনা হইতে উহা ৪৮ মাইল দূরে অবস্থিত (সফীউর রহমান মুবারকপুরী, আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ১৭৯)।
📄 বুওয়াতের ভৌগোলিক গুরুত্ব
তৎকালীন আরবের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র বলিয়া গণ্য করা হইত সিরিয়াকে। মক্কাবাসীরা তাহাদের পণ্যদ্রব্য বিক্রয়ের জন্য এইখানে লইয়া আসিত এবং তাহাদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী এইখান হইতে আমদানী করিত। আর এই বাণিজ্যিক যোগাযোগের জন্য স্থলপথই ছিল একমাত্র উপায়। যেহেতু পথের দূরত্ব ছিল যেমন অধিক, তেমনি ঐ সময় দস্যুবৃত্তির প্রকোপও ছিল অত্যধিক। তাই যোগাযোগ ছিল কাফেলাভিত্তিক। অনেকের অনেকগুলো প্রয়োজন একত্র হওয়ার পর একটি বাণিজ্যিক কাফেলায় রূপ নিত। উট, ঘোড়া, গাধা ও খচ্চর প্রভৃতি বাহনের মাধ্যমে মক্কার লোকেরা কাফেলাবদ্ধ হইয়া সিরিয়ায় যাইত এবং তাহাদের বাণিজ্যিক তৎপরতা পরিচালিত করিত।
বুওয়াত স্থানটি মক্কা-সিরিয়া বাণিজ্যিক কাফেলাগুলির পথে পড়িত। স্থানটি মদীনার নিকটে হওয়ায় মদীনাবাসীদের দ্বারা উহা নিয়ন্ত্রিত ছিল। মক্কার সহিত মদীনাবাসীদের সম্পর্কের কোন প্রকার অবনতি ঘটিলে যেমনটি উক্ত স্থানের নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন হইত তেমনিভাবে সিরিয়ামুখী বাণিজ্যের অবস্থাও নাযুক হইয়া পড়িত। বুওয়াত কেবল মক্কা-সিরিয়া বাণিজ্যিক পথের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নহে, বরং আরবের গোটা দক্ষিণাঞ্চলের বাণিজ্যিক পথের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চল হইতে যেই সকল বাণিজ্যিক কাফেলা চলাচল করিত বা মক্কায় আসিত তাহার কোন কোনটিতে আড়াই হাজার পর্যন্ত উট বোঝাই পণ্য থাকিত। এইসব পণ্যের মূল্য পঞ্চাশ হাজার দীনারেরও বেশী হইত। ড. স্প্রেংগার বলেন, এই সময় মক্কা হইতে যেইসব পণ্য বাহিরে যাইত সেই সবের মূল্য অনেক সময় এক লাখ ষাট হাজার লিরা বা দুই লাখ ডলার ছাড়াইয়া যাইত।
📄 গাযওয়া প্রেক্ষাপট
হিজরতের পর হইতেই রাসূলুল্লাহ (স) ও তাঁহার সাহাবীদের বিরুদ্ধে মক্কাবাসীরা যে ষড়যন্ত্র করিয়া আসিতেছিল উহা প্রতিহত করার লক্ষ্যে রাসূলুল্লাহ (স) পরপর কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করিলেন। ফলে মক্কাবাসীদের সিরিয়ামুখী বাণিজ্য ব্যবস্থা বিপন্ন হইয়া পড়িল। মদীনার পার্শ্ববর্তী এলাকার গোত্রগুলি ক্রমান্বয়ে মুসলমানদের সাথে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হইতে লাগিল। তাহাদের মদীনায় যাওয়ার পথ সংকীর্ণ ও অবরুদ্ধ হইয়া পড়িল।
এই পরিস্থিতিতে মক্কাবাসীরা তাৎক্ষণিকভাবে মদীনা আক্রমণের প্রস্তুতি নিল এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর আবওয়া অভিযানের পর মাত্র এক মাসের মধ্যে মদীনায় পরপর দুইটি অভিযান পরিচালনা করিল, যদিও ইহাতে তাহারা কোন সাফল্য অর্জন করিতে সক্ষম হয় নাই। এমনকি মুসলমানদের সহিত তাহাদের কোন ধরনের সম্মুখ সংঘর্ষও হয় নাই। কিন্তু মদীনার জন্য ইহা একদিকে বড় ধরনের ভবিষ্যত হামলার আশংকা বাড়াইয়া তুলিল, অন্যদিকে মদীনার পার্শ্ববর্তী গোত্রের সহিত মুসলমানদের মৈত্রী চুক্তির ভিতও দুর্বল হইয়া পড়ার আশংকা দেখা দিল। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (স) কয়েকটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করিলেন। তম্মধ্যে মুসলমানদের মনোবল বৃদ্ধি ও রণ প্রস্তুতি-প্রশিক্ষণ নিশ্চিতকরণ, মক্কাবাসীদের বাণিজ্যিক তৎপরতাকে আরও সূদৃঢ়ভাবে প্রতিরোধকরণ, সম্পাদিত মৈত্রী চুক্তি আরো জোরদার করার লক্ষ্যে তাহাদের সহিত সৌজন্যমূলক সাক্ষাতকরণ ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
উপরিউক্ত প্রেক্ষাপটকে সামনে রাখিয়া রাসূলুল্লাহ (স) নিম্নবর্ণিত পদক্ষেপগুলি গ্রহণ করিলেন।
১. মুসলিম টহলদার বাহিনী আরও জোরদার করা;
২. কাফিরদের কোন বাণিজ্যিক কাফেলার সংবাদ পাইলে তাৎক্ষণিকভাবে তাহা প্রতিহত করার প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা গ্রহণ করা;
৩. মুসলিম সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং
৪. আনসার-মুহাজির নির্বিশেষে সকল সামরিক পদক্ষেপে সকল মুসলমানকে একই পতাকাতলে সমবেত করা।
📄 গাযওয়ার বিবরণ
মাহমূদ শাকের বলেন যে, আবওয়া অভিযান সমাপ্ত হওয়ার কয়েক দিন পরই এই গাযওয়া সংঘটিত হইয়াছিল। রাসূলুল্লাহ (স)-কে ওহীর মাধ্যমে জানানো হইয়াছিল যে, কুরায়শদের একটি বাণিজ্যিক কাফেলা সিরিয়া হইতে মক্কায় ফিরিয়া যাইতেছে। মহানবী (স) তখন দুই শত সৈন্যের এক বাহিনী লইয়া ঐ কাফেলার পথরোধ করার উদ্দেশ্যে মদীনা হইতে বাহির হইলেন। ইন্ন কাছীরের বর্ণনানুযায়ী, এই সময় রাসূলুল্লাহ (স) সাইব ইব্ন উছমান ইবন মাজ'ঊন (রা)-কে মদীনায় তাঁহার প্রতিনিধি নিযুক্ত করিয়া যান। তবে ওয়াকিদীর বর্ণনায় এই ক্ষেত্রে সা'দ ইব্ন মু'আয (রা)-এর নাম উল্লেখ করা হইয়াছে।
এই অভিযানে হযরত সা'দ ইব্ন আবী ওয়াককাস (রা)-কে পতাকা বহন করার দায়িত্ব প্রদান করা হয়। পতাকার রং ছিল সাদা।
কুরায়শদের উক্ত কাফেলা ছিল বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। কাফেলার নেতৃত্বে ছিল উমায়্যা ইব্ন খালাফ, লোকসংখ্যা ছিল এক শত। কাফেলাটি আড়াই হাজার উট লইয়া ফিরিতেছিল। রাসূলুল্লাহ (স) সৈন্য লইয়া বুওয়াত পর্যন্ত পৌছিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স)-এর আগমনের ব্যাপারটি উপলব্ধি করিতে পারিয়া কুরায়শ সর্দার কাফেলা লইয়া অন্য পথে গমন করিল। ফলে এই অভিযানেও কুরায়শদের সহিত মুসলমানদের কোন সম্মুখ সংঘর্ষও হয় নাই। রাসূলুল্লাহ্ (স) প্রায় একমাস সেখানে অবস্থান করিয়া কাফেলাসহ মদীনাতে ফিরিয়া আসিলেন।