📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 স্থান পরিচিতি

📄 স্থান পরিচিতি


পূর্বেই বলা হইয়াছে যে, 'আবওয়া' নামক স্থানের নামানুসারে এই গাযওয়াকে 'গাযওয়া আবওয়া' এবং 'ওয়াদ্দান' নামক স্থানের নামানুসারে গাযওয়াটিকে 'গাযওয়া ওয়াদ্দান' নামে আখ্যায়িত করা হইয়াছে।
আবওয়া (الابواء) মক্কা ও মদীনার মাঝখানে মদীনার নিকটবর্তী একটি স্থানের নাম। মু'জামুল বুলদান গ্রন্থে বলা হইয়াছে যে, আবওয়া মূলত মদীনার ফুরু' (الفرع) অঞ্চলের বিস্তৃত এলাকা লইয়া গঠিত একটি গ্রাম, যাহা জুহফা হইতে মদীনার পথে। অর্থাৎ জুহফা হইতে মদীনার দিকে উহার দূরত্ব তেইশ মাইল। ইহাকে দক্ষিণ আরাত (عين اراة)-এর সংলগ্ন একটি অঞ্চল হিসাবেও উল্লেখ করা হইয়াছে। দক্ষিণ আরাত হইল অনেকগুলি প্রস্রবণ সমৃদ্ধ একটি পাহাড় যাহার প্রতিটি প্রস্রবণকে ঘিরিয়া রহিয়াছে এক একটি গ্রাম। এই পাহাড়ের উপত্যকা আবওয়া এবং ওয়াদ্দান নামক স্থানদ্বয়ের সহিত মিলিত হইয়াছে। আরও বলা হইয়াছে যে, উহা মদীনার হজ্জযাত্রীদের গমন পথে অবস্থিত একটি স্থান (আল-বাগদাদী, মু'জামুল বুলদান, ১খ., পৃ. ৭৯-৮০)।
ইহা ছাড়াও স্থানটি সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, উহা লোহিত সাগর উপকূলের নিকটবর্তী ছিল এবং এই পথ দিয়াই সিরিয়াগামী বাণিজ্য কাফেলা ও অভিযাত্রীরা যাতায়াত করিত। এই অঞ্চলের কর্তৃত্ব ছিল বানু দাম্মার হাতে (ইসলামী বিশ্বকোষ, হযরত রাসূল কারীম (স) জীবন ও শিক্ষা, পৃ. ৩৪২)।
আল্লামা শিবলী নু'মানী বলেন, স্থানটির মূল অঞ্চল হইল ফুরু' (فرع) যেখানে মুযায়না গোত্র বসবাস করিত। মদীনা হইতে উহার দূরত্ব আশি মাইল। মক্কার দিক হইতে ইহা মদীনার সীমান্তে অবস্থিত একটি অঞ্চল (আল্লামা শিবলী নু'মানী, সীরাতুন্নবী, ১খ., পৃ. ১৮৪)। স্থানটির কর্তৃত্ব ছিল বানু দামরার, তবে বানু খুযাআরও বসবাস ছিল এইখানে (মু'জামুল বুলদান, পৃ. ৭৯)।
স্থানটির নাম আবওয়া (الابواء) হওয়ার ব্যাপারে বিভিন্ন মত রহিয়াছে। কেহ বলেন, স্থানটির নাম আবওয়া রাখা হইয়াছে, ৩ শব্দের প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া। কারণ وباء অর্থ মহামারী। সম্ভবত সেখানকার কোন মহামারীর (وباء) কারণে স্থানটির নাম ابواء হইয়াছে। তবে এই ক্ষেত্রে ভিন্ন মত এই যে, নামটি (اوباء) হওয়া উচিৎ ছিল। কারণ وباء হইতে বহুবচন হিসাবে اوباء ব্যবহৃত হয়, ابواء নহে। এই মত অনুযায়ী ابواء শব্দটি بوء শব্দ হইতে উদ্‌গত। بوء শব্দের অর্থ কোন স্থানে স্থায়ী হওয়া। সম্ভবত স্থানের অধিবাসীরা স্থায়ীভাবে স্থানটিকে বসবাসের জন্য নির্ধারণ করিয়াছে বিধায় এই নামকরণ করা হইয়াছে (মু'জামুল বুলদান, পৃ. ৭৯; আরও দ্র. যুরকানী, শারহুল মাওয়াহিবুল-লাদুন্নিয়্যা, ১খ., পৃ. ৩৯২)।
উল্লেখ্য যে, আবওয়ায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর মায়ের কবর অবস্থিত। রাসূলুল্লাহ (স)-এর বয়স যখন ছয় বৎসর তখন তাঁহার মাতা তাঁহাকে লইয়া মদীনায় তাঁহার পিতার কবর যিয়ারত করিতে যান। সেইখান হইতে মক্কায় ফিরিবার পথে আবওয়ায় তাঁহার মাতা ইন্তেকাল করেন এবং সেইখানেই তাঁহাকে দাফন করা হয় (মু'জামুল বুলদান, পৃ.৭৯-৮০)।
'গাওয়া ওয়াদ্দান' নামকরণের কারণ হিসাবে মু'জামুল বুলদান গ্রন্থকার বলেন, ওয়াদ্দান মোট তিনটি স্থানের নাম। তন্মধ্যে এইটি হইল মক্কা ও মদীনার মাঝে ফুরু' (فرع) অঞ্চলের বিস্তৃত এলাকা লইয়া গঠিত একটি গ্রাম। ইহার এবং হারশা (هرشی) -এর মাঝে ছয় মাইলের দূরত্ব। আর ইহার এবং আবওয়ার মাঝে দূরত্ব হইল প্রায় আট মাইল (মু'জামুল বুলদান, ৫খ., পৃ. ৩৬৫)। তবে অন্যান্য ঐতিহাসিক ছয় মাইল বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন (ইবন সা'দ, আত-তাবাকাত, ১খ., ৮)। মদীনার দিক হইতে উহার এবং রাবিগের মাঝে ২৯ মাইলের দূরত্ব (আল-বিদায়া, ৩খ., পৃ. ২৯৮)। স্থানটির অধিবাসী মোট তিনটি সম্প্রদায় অর্থাৎ বানু দামরা, বানু গিফার ও বানু কিনানা (মু'জামুল বুলদান, ৫খ, পৃ. ৩৬৫)।
এই প্রসঙ্গে মুহাম্মাদ রিদা বলেন যে, কেহ ইহাকে ওয়াদ্দান নামক স্থানের এবং কেহ আবওয়া নামক স্থানের নামানুসারে নামকরণ করিয়াছেন। কারণ জায়গা দুইটি পাশাপাশি। ইহাদের মাঝে মাত্র ছয় মাইলের ব্যবধান (মুহাম্মাদ রিদা, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স), পৃ. ১৫৮)। তবে অপর এক বর্ণনায় বলা হইয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় সাহাবীদের সঙ্গে লইয়া উপরিউক্ত স্থান দুইটিতেই অবস্থান গ্রহণ করিয়াছিলেন (হযরত রাসূল করীম (স) : জীবন ও শিক্ষা, পৃ. ৩৪৩)। সুতরাং গাযওয়াটির নামকরণে উহার যে কোন একটির নাম গৃহীত হওয়া স্বাভাবিক।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 গাযওয়ার প্রেক্ষাপট

📄 গাযওয়ার প্রেক্ষাপট


মক্কাবাসীদের অত্যাচার-নিপীড়নের চূড়ান্ত পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীদিগকে লইয়া মক্কা হইতে মদীনায় হিজরত করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন। হিজরতের পর মদীনায় তাঁহারা শান্তিতে বসবাস করিতে পারিলেন না। কারণ মক্কায় জীবনে কাফিরদের অত্যাচারের প্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর মদীনায় হিজরতের পরও মুসলমানদের সেখানকার স্বাভাবিক জীবন যাপন দেখিয়া মক্কার কাফিরগণ ঈর্ষান্বিত হইয়া পড়ে এবং দীন ইসলামের ক্রমোন্নতিতে তাহারা প্রতিহিংসার আগুনে জ্বলিতে থাকে। ফলে তাহারা ইসলামকে ধ্বংস করার জন্য মদীনায় সামরিক হামলা চালানোর প্রস্তুতি গ্রহণ করিতে থাকে এবং প্রয়োজনীয় রসদ ও অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহের জন্য সিরিয়ামুখী বাণিজ্যিক তৎপরতা জোরদার করে। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট যখন এই সকল সংবাদ আসিতে থাকে, তখন তাহাদের ষড়যন্ত্র হইতে ইসলাম ও মুসলমানদেরকে হেফাজত করার বিষয়টি তাঁহাকে চিন্তিত করিয়া তোলে।
অপরদিকে মক্কায় কুরায়শগণ মদীনার পার্শ্ববর্তী এলাকায় বসবাসকারী গোত্রসমূহকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে এমনভাবে উত্তেজিত করিয়া তুলিতে থাকে যে, তাহাদের আক্রমণের আশংকায় কয়েক বৎসর পর্যন্ত মদীনায় রাত্রিতে নিয়মিত পাহারার ব্যবস্থা করিতে হয়। সাহাবীগণ অস্ত্রসহ নিদ্রা যাইতেন এবং সর্বদা যে কোন অতর্কিত হামলার জন্য সতর্ক থাকিতেন (হযরত রাসূল করীম (স) : জীবন ও শিক্ষা, পৃ. ৩৪১; সফিউর রহমান মুবারকপুরী, আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ১৭৩)। ইমাম বুখারী (র) উম্মুল মু'মিনীন হযরত আইশা (রা)-এর বরাতে সেই সময়ের ঘটনা বর্ণনা প্রসঙ্গে বলিয়াছেন যে, এক রাত্রে রাসূলুল্লাহ (স) শত্রুদের অতর্কিত হামলার আশংকায় গভীর রাত্রি পর্যন্ত জাগ্রত ছিলেন। অতঃপর তিনি বিশ্রাম গ্রহণের প্রয়োজন অনুভব করিলেন এবং বলিলেন, যদি কোন নেক্কার ব্যক্তি অবশিষ্ট রাত্রির প্রহরায় নিযুক্ত হইত তাহা হইলে আমি বিশ্রাম করিতে পারিতাম। এমন সময় বাহিরে অস্ত্রের ঝনঝনানি শোনা গেল। রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, কে? উত্তর আসিল, আমি সা'দ ইব্‌ন আবু ওয়াক্কাস, পাহারা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত আছি। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বিশ্রাম করিতে গেলেন (ইমাম বুখারী, আস্-সাহীহ, ২খ., ৫৬৩)।
ইহা ছাড়াও তৃতীয় যে সমস্যাটি রাসূলুল্লাহ (স) ও মুসলমানদেরকে উদ্বেগের মাঝে ফেলিয়াছিল, তাহা হইল ইয়াহুদীদের ষড়যন্ত্র। রাসূলুল্লাহ (স)-এর হিজরতের প্রথমদিকে ইয়াহুদীরা মুসলমানদের পক্ষে থাকিলেও পরবর্তীতে যখন তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর মর্যাদা ও অবস্থানের ক্রমোন্নতি দেখিতে লাগিল তখন তাহারা আর তাহা মনে প্রাণে মানিয়া লইতে পারিল না। কিন্তু মদীনাবাসীদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ্ (স) যে চুক্তি সম্পাদন করিয়াছিলেন, সেই চুক্তিতে ইয়াহুদীরা আবদ্ধ থাকার কারণে চুক্তি ভংগের অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার ভয়ে প্রকাশ্যে তেমন কিছু করিতে পারিতেছিল না। ফলে তাহারা পর্দার অন্তরালে ষড়যন্ত্রজাল বিস্তার করিতে লাগিল। তাহারা আনসার ও মুহাজিরদের ঐক্যে ফাটল ধরাইবার জন্য তৎপর হইয়া উঠিল। আবার কখনো আওস ও খাযরাজ গোত্রীয় মুসলমানদের মধ্যে বু'আছ যুদ্ধের বিস্মৃত স্মৃতি পুনরায় জাগাইয়া তুলিবার চেষ্টা করিতে লাগিল। বু'আছ যুদ্ধের সময় যেইসব জ্বালাময়ী কবিতা আবৃত্তি করা হইয়াছিল, আওস ও খাযরাজদের উত্তেজিত করিবার জন্য ইয়াহুদীরা সেইগুলি প্রায়ই আবৃত্তি করিত। এইভাবে তাহারা মুহাজির ও আনসার এবং আউস ও খাযরাজদের মধ্যে ঝগড়া বাধাইতে সচেষ্ট ছিল (ড. মুহাম্মাদ হোসাইন হায়কাল, অনুবাদ মাওলানা আবদুল আউয়াল, মহানবী (স)-এর জীবন চরিত, ৩২০)।
এই সকল পরিস্থিতিতে কুরায়শদের তৎপরতা রোধ করা, মদীনার পার্শ্ববর্তী গোত্রগুলিকে বশে রাখা এবং মদীনার ইয়াহুদীদেরকে তাহাদের তৎপরতা বন্ধে চাপ সৃষ্টি করা জরুরী হইয়া পড়িয়াছিল। এই প্রেক্ষিতেই রাসূলুল্লাহ (স) ইসলাম ও মুসলমানদেরকে রক্ষার জন্য প্রাথমিক কৌশল হিসাবে নিম্নের তিনটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।
(১) বিভিন্ন দিকে মুসলিম সশস্ত্র টহলদার বাহিনী প্রেরণ করা, যাহাতে মুসলমানদের শক্তির প্রকাশ ঘটে এবং মুসলমানদের মনোবল বৃদ্ধির পাশাপাশি কোন উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সশস্ত্র সংগ্রামের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়।
(২) মক্কা হইতে মদীনার পার্শ্ববর্তী সিরিয়া অভিমুখে ঘন ঘন অভিযান পরিচালনা করা যাহাতে কুরায়শদের বাণিজ্য তৎপরতা সফল হইতে না পারে। কারণ সামরিক শক্তি-বৃদ্ধির লক্ষ্যেই এই বাণিজ্য পরিচালিত হইত।
(৩) উক্ত পথের পার্শ্ববর্তী গোত্রসমূহের সহিত মৈত্রীচুক্তি করা (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ১৭৭; আরও দ্র. ইসলামী বিশ্বকোষ, সম্পাদনা পরিষদ, হযরত রাসূল করীম (স) জীবন ও শিক্ষা, পৃ. ৩৪২)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আবওয়া অভিযানের লক্ষ্য

📄 আবওয়া অভিযানের লক্ষ্য


উপরে উল্লিখিত পরিকল্পনা অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ (স) আবওয়া অভিযানে বাহির হন। তবে এই ক্ষেত্রে বিশেষভাবে দুইটি লক্ষ্যের কথা ইতিহাসে উল্লেখ করা হইয়াছে। যথা-
(ক) সিরিয়া হইতে আগত কুরায়শদের একটি বাণিজ্য কাফেলার পথরোধ করা। বাণিজ্য কাফেলার এই পথরোধ করার উদ্দেশ্য হিসাবে অধিকাংশ ঐতিহাসিক বলেন যে, উহা ছিল কুরায়শদের বাণিজ্যিক তৎপরতা বন্ধ করা এবং কুরায়শদের কাছে মুসলমানদের শক্তি-সামর্থ্য সম্পর্কে এই কথা বুঝাইয়া দেওয়া যে, মুসলমানগণ তাহাদের বাণিজ্য পথ বন্ধ করিয়া দেওয়ার শক্তি রাখে (মহানবী (স)-এর জীবন চরিত, পৃ. ৩২০)। তবে কাফেলার সম্পদ লুন্ঠন করার উদ্দেশ্যে এই অভিযান পরিচালিত হয় নাই।
(খ) বনু দামরা গোত্রের সহিত মৈত্রী চুক্তি সম্পাদন করা (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ২৬৮)। পূর্বেই বলা হইয়াছে যে, আবওয়া নামক স্থানটির কর্তৃত্ব ছিল বনু দামরার হাতে এবং উহা মক্কাবাসীদের সিরিয়ামুখী বাণিজ্য পথের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান। বনু দামরার সহিত এই ধরনের চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল একাধিক। যেমন শতধা বিচ্ছিন্ন আরব গোত্রগুলির মধ্যে ঐক্য ও সংহতি গড়িয়া তোলা, মক্কাবাসীদের সিরিয়ার বাণিজ্যে বাধা দেওয়া ও কুরায়শদিগকে ভীতি প্রদর্শন করা।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 গাযওয়ার বিবরণ

📄 গাযওয়ার বিবরণ


ইন্ন কাছীরের বর্ণনামতে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার মদীনায় আগমনের বার মাস পর আবওয়া অভিযানে বাহির হন। এই হিসাবে অধিকাংশ ঐতিহাসিক ইহাকে দ্বিতীয় হিজরীর সফর মাসে সংঘটিত অভিযান বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। সফিউর রহমান মুবারকপুরী বলেন, গাযওয়া আবওয়া সংঘটিত হইয়াছিল দ্বিতীয় হিজরীর সফর মাস মুতাবিক ৬২৩ খৃস্টাব্দের আগস্ট মাসে (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ১৭৯)। যুরকানী অবশ্য সফর মাসের ১২ তারিখের কথা উল্লেখ করিয়াছেন (শারহুল মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়্যা, ১খ., পৃ. ৩৯৩)। ইসলামী ইনসাইক্লোপেডিয়া (উর্দু)-তে বলা হইয়াছে যে, মুসলমানগণ সফর মাসের প্রথম দিকে এই অভিযানে বাহির হইয়াছিলেন এবং ২০সফর ফিরিয়া আসিয়াছিলেন (শাহকার বেক ফাউন্ডেশন, ইসলামী ইনসাইক্লোপেডিয়া, করাচী, পৃ. ১১৮)।
অবশ্য তারিখ সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় আরও মতপার্থক্য রহিয়াছে। ওয়াকিদী বলেন, উহা রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর মদীনায় আগমনের ১১ মাস পরের ঘটনা (ওয়াকিদী, কিতাবুল মাগাযী, ১খ., পৃ. ১১)। ইবনুল আছীর বলেন, অভিযানটি ছিল প্রথম হিজরীর যুলকা'দা মাসে (ইবনুল আছীর, আল-কামিল ফিত তারীখ, ২খ., ১০)। ইমাম তাবারী বলেন, ইহা দ্বিতীয় হিজরীর রবীউল আওয়াল মাসে সংঘটিত হইয়াছিল (ইবন জারীর আত-তাবারী, তারীখুল উমাম ওয়াল মুলুক, ১খ., ২৬১)। তবে অধিকাংশ ঐতিহাসিক প্রথমোক্ত মতটি গ্রহণ করিয়াছেন।
সৈন্যসংখ্যার হিসাব অধিকাংশ ঐতিহাসিক ৬০ জন বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। তবে সফিউর রহমান মুবারকপুরী ৭০ জন (আর-রাহীকুল মাখতুম, প্রাগুক্ত) এবং ইব্‌ন খালদুন তাঁহার তারীখে ২০০ জন উল্লেখ করিয়াছেন (ইব্‌ন খালদুন, আত-তারীখ, ২খ., পৃ. ১৭)। এই ক্ষেত্রে একটা বিষয়ে সকল ঐতিহাসিক একমত যে, এই অভিযানে কোন আনসার সাহাবী ছিলেন না (শারহুল মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া, প্রাগুক্ত)। নবী করীম (স) এই সময় মদীনায় হযরত সা'দ ইবন উবাদা (রা)-কে তাঁহার প্রতিনিধি নিযুক্ত করিয়াছিলেন। এই অভিযানে হযরত হামযা (রা)-এর হাতে পতাকা দেওয়া হইয়াছিল। পতাকার রং ছিল সাদা, রাসূলুল্লাহ (স) কুরায়শদের কাফেলার মুকাবিলা করার উদ্দেশ্যে আবওয়া বা ওয়াদ্দান পর্যন্ত পৌঁছেন কিন্তু কাফিরদের নাগাল না পাওয়ায় কোন সম্মুখ সংঘর্ষ হয় নাই। ফলে রাসূলুল্লাহ্ (স) সফরের অবশিষ্ট দিনগুলিতে সেইখানেই অবস্থান করেন। অবশ্য এই ক্ষেত্রে ইন্ন কাছীর বলেন যে, সফরের অবশিষ্ট দিনগুলিসহ রবীউল আওয়াল মাসেরও প্রথম কয়েক দিন অবস্থান করেন (আল-বিদায়া, ৩খ., পৃ. ২৪৩)। দা. মা. ই-তে বলা হইয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) ২০ সফর প্রত্যাবর্তন করেন। তবে ওয়াকিদীসহ অধিকাংশ ঐতিহাসিকের বর্ণনানুযায়ী তিনি পনের দিন মদীনা হইতে অনুপস্থিত থাকেন (কিতাবুল মাগাযী, ১খ., পৃ. ১২; আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ১৭৯)।
উক্ত অভিযানে বনূ দামরার দলপতি মাখশী ইব্‌ন আমর-এর সাথে রাসূলুল্লাহ (স)-এর একটি মৈত্রীচুক্তি সম্পাদিত হইয়াছিল, যাহা নিম্নরূপ : বনূ দামরা নিজেদের জান-মালের ব্যাপারে নিরাপদ থাকিবে। তাহাদের উপর কেহ হামলা করিলে তাহাদিগকে সাহায্য করা হইবে। তবে তাহারা যদি আল্লাহ্র দীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে, তবে এই সন্ধি বাতিল বলিয়া গণ্য হইবে। তাহারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিবে না এবং মুসলমানদের শত্রুদিগকেও সাহায্য করিবে না। তাহারা মুসলমানদের সহিত প্রতারণা করিবে না। সমুদ্র যত দিন তাহার সৈকতকে সিক্ত করিবে, ততদিন এই চুক্তির কার্যকারিতা অটুট থাকিবে। নবী করীম (স) যখন তাহাদেরকে তাঁহার সাহায্যের জন্য ডাকিবেন, তখন তাহাদিগকে আগাইয়া আসিতে হইবে (মুহাম্মাদ রিদা, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স), পৃ. ১৫৮)। উপরিউক্ত মৈত্রীচুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে আবওয়া অভিযানের পরিসমাপ্তি ঘটিল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00