📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কা'ব ইব্‌ন আশরাফ হত্যা

📄 কা'ব ইব্‌ন আশরাফ হত্যা


কা'ব ইবনুল আশরাফ দীন ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি তীব্র শত্রুতা ও বিদ্বেষ পোষণ করিত। সে প্রকাশ্যে সর্বদা ইসলামের বিরুদ্ধাচরণে লিপ্ত থাকিত। সে ইয়াহুদী ধর্মগুরুদের আর্থিক সাহায্য প্রদান করিত। রাসূলুল্লাহ (স)-এর মদীনায় হিজরতের পর কোন ইয়াহুদী পণ্ডিত তাঁহার বিরুদ্ধাচরণ না করিলে সে তাহার আর্থিক সাহায্য বন্ধ করিয়া দিত (শারহুল মাওয়াহিবিল লাদুন্নিয়্যা, ২খ., পৃ. ৯)। বদর যুদ্ধে কুরায়শদের পরাজয়ে কা'ব-এর প্রতিক্রিয়া বদর যুদ্ধে (২য় হি.) মুসলমানদের বিজয় এবং কুরায়শদের পরাজয়ের সংবাদ লইয়া যায়দ ইব্‌ন হারিছা (রা) মদীনার নিম্নভূমির লোকদের নিকট এবং ‘আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন রাওয়াহা (রা) উচ্চ ভূমির লোকদের নিকট আগমন করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) মদীনার মুসলমানদের কাছে বিজয়বার্তা এবং মুশরিক নৈতৃবৃন্দের নিহত হওয়ার সংবাদ প্রেরণ করিলেন (ইব্‌ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৭)। কুরায়শদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের নিহত হওয়ার খবর শুনিয়া কা'ব আশ্চর্যান্বিত হইয়া বলিল, সত্যিই কি এইরূপ ঘটিয়াছে? ইহারা তো আরবের সম্ভ্রান্ত লোক এবং জনগণের রাজা। আল্লাহর শপথ! যদি সত্যিই মুহাম্মাদ (স) তাহাদিগকে হত্যা করিয়া থাকে তাহা হইলে পৃথিবীর উপরিভাগের চেয়ে অভ্যন্তরভাগই আমাদের জন্য অধিক উত্তম (তারীখ তাবারী, ২খ., পৃ.১৭৮; ইব্‌ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৮; সীরাতুল মুসতাফা, ২খ., ১৭৫; তাফহীমুল কুরআন, ৫খ., পৃ. ৩৭৭)। কা'ব যখন নিশ্চিত হইল যে, বদর যুদ্ধে কুরায়শদের শোচনীয় পরাজয় ও নেতৃবর্গের নিহত হওয়ার সংবাদ সত্য, তখন সে ক্ষোভে, দুঃখে ও বিদ্বেষে ফাটিয়া পড়িল। সে রাসূলুল্লাহ (স) ও মুসলমানদের ভর্ৎসনা ও নিন্দা করিতে এবং ইসলামের শত্রুপক্ষের প্রশংসা ও তাহাদিগকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করিতে লাগিল। সে তাহার তৎপরতার অংশ হিসাবে মক্কায় গমন করিয়া আবদুল মুত্তালিব ইব্‌ন আবী ওয়াদা'আর গৃহে উঠিল, তাহার স্ত্রী আতিকা ফিন্ত আবূ আয়াস ইবন উমায়্যা কা'বের যথেষ্ট সেবা-যত্ন ও সমাদর করিল। অতঃপর সে রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিরুদ্ধে কুরায়শদিগকে প্ররোচিত করিতে লাগিল। সে. বদর যুদ্ধে নিহত কুরায়শ নেতাদের সম্পর্কে শোকগাথা রচনা করিয়া তাহাদের শোকাভিভূত আত্মীয়-স্বজনদিগকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য উত্তেজিত করিয়া তুলিল (ইন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৮; আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ২৬৯)। বদরে নিহত কুরায়শ সর্দারদের এবং পর্বতের গুহায় নিক্ষিপ্ত তাহাদের লাশসমূহ সম্পর্কে তাহার রচিত শোকগাথার কিছু অংশ নিম্নরূপ: "বদরের যাতা আপন লোকদিগকে পিষিয়া মারিল। বদরের অনুরূপ ঘটনায় চক্ষুগুলি অশ্রু ঝরায় এবং ঝরিতে থাকে। জনগণের নেতৃবৃন্দ নিজেদেরই হাওযের পাশে নিহত হইল। তবে ইহা অস্বাভাবিক কিছু মনে করিও না, কারণ বাদশাহগণও পরাজিত হইয়া থাকে। কত সম্ভ্রান্ত, শুভ্র চেহারাবিশিষ্ট ও জাঁকজমকপূর্ণ ব্যক্তিরা বিপদগ্রস্ত হইয়াছে যাহাদের কাছে নিঃস্ব লোক আশ্রয় গ্রহণ করিয়া থাকে। অনাবৃষ্টির সময় (দুর্ভিক্ষে) দুই হাতে দানকারী অন্যের বোঝা নিজের মাথায় বহনকারী সর্দার, যাহারা খাজনা আদায় করিয়া থাকে। জাতির লোকেরা বলে যে, তাহাদের ক্ষোভে আমি সন্তুষ্ট হই (ইহা মোটেই ঠিক নয়, বরং) কা'ব ইব্‌ন আশরাফ ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া পড়িয়াছে। তাহারা সত্যই বলিয়াছে, কিন্তু যখন তাহারা নিহত হইয়াছিল, তখন যমীন যদি তাহার লোকদিগকে ধ্বসাইয়া দিত এবং টুকরা টুকরা হইয়া যাইত তাহা হইলে কতই না উত্তম হইত! এই কথা সে প্রচার করিয়াছে, হায়, যদি সে-ই বর্শার লক্ষ্যবস্তু হইয়া যাইত কিংবা অন্ধ হইয়া বাঁচিয়া থাকিত অথবা বধির হইয়া যাইত, কিছুই শুনিতে না পাইত, কতই না ভাল হইত! খবর পাইয়াছি যে, আবুল হাকামের নিহত হওয়ার কারণে গোটা মুগীরা বংশের নাক কাটা গিয়াছে এবং তাহারা অপদস্থ ও লাঞ্ছিত হইয়াছে। আর রবী'আর দুই পুত্রও তাহার নিকট চলিয়া গিয়াছে, আর মুনাব্বিহও। এই নিহত ব্যক্তিরা ছিল এমন যে, কেহ তাহাদের মত (মর্যাদা ও গুণ) অর্জন করিতে পারে নাই, আর না (ইয়ামানের বাদশাহ) তুব্বা'ও। শুনিলাম, তাহাদের মধ্যকার হারিছ ইব্‌ন হিশাম জনতার মধ্যে সৎকর্ম করিয়াছে এবং লোকদিগকে একত্র করিয়াছে, সৈন্যদল লইয়া ইয়াছরিবের (মদীনা) মুকাবিলা করিবার উদ্দেশ্যে। সত্য কথা এই যে, অভিজাত মহৎ লোকেরাই পিতৃপুরুষের মর্যাদা রক্ষা করিয়া থাকে” (ইবন হিশাক, ৩খ., পৃ. ৮; ইব্‌ন ইসহাক, ৩খ., পৃ. ২২৩)। ইবন ইসহাক বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর সভাকবি হাসসান ইব্‌ন ছাবিত (রা) কা'বের কবিতার জবাবে নিম্নোক্ত কবিতা রচনা করেন: "কা'ব তাহার শোকগাথা পাঠ করিয়াছে। ইহার পরও তাহাকে আবার অশ্রু ঝরাইতে হইয়াছে এবং সে এমন লাঞ্ছিত জীবন অতিবাহিত করে যে, সে কিছুই শুনে নাই। আমি বদরের নিম্ন ভূমিতে তাহাদের নিহতদিগকে দেখিয়াছি যাহাদের জন্য চক্ষু ক্রন্দন করিতেছে এবং অশ্রুধারা ঝরিতেছে। তুমি তো ইতর গোলামদিগকে অনেক কাঁদাইলে, এইবার তুমি নিজেই কাঁদ, যেমন ছোট কুকুর ছোট কুকুরীর জন্য চীৎকার করিয়া ডাকে। দয়াময় আল্লাহ আমাদের নেতৃবৃন্দের হৃদয় শান্ত করিয়া দিয়াছেন, আর যাহারা তাঁহার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিয়াছে তাহাদিগকে লাঞ্ছিত করিয়াছেন এবং তাহারা পরাজিত হইয়াছে। তাহাদের মধ্যে যে বাঁচিয়া পালাইয়া গিয়াছে তাহার অন্তর দন্ধিভূত ও ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া বিদীর্ণ হইতেছে” (ইবন ইসহাক, ৩খ., পৃ. ২২৪; ইব্‌ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯)। ইবন হিশাম বলেন, অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ এই কবিতাগুলি হাসসান (রা)-এর নয় বলিয়া মন্তব্য করিয়াছেন (সীরাতে ইবন হিশাম, ৩খ, পৃ. ৯)। ইবন ইসহাক বলেন, বানু বালীর শাখা বানু মুরাদ-এর মায়মূনা বিন্ত আবদুল্লাহ নাম্নী এক মুসলিম মহিলা কা'বের কবিতার প্রতিউত্তরে নিম্নোক্ত কবিতা রচনা করেন: "এই গোলাম নিহতদের উদ্দেশ্যে প্রদর্শনীমূলক বিলাপ করিয়াছে এবং অন্যদিগকেও কাঁদাইয়াছে, আসলে সে মোটেই চিন্তিত ও দুঃখিত নয়। বদর ও বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের যাহাদের জন্য সে কাঁদিতেছে, তাহাদের চক্ষু তো কাঁদিয়াছে, কিন্তু লুওয়ায় ইব্‌ন গালিবদের তাহাদের অশ্রুর দ্বিগুণ দান করানো হইয়াছে। হায়! যাহারা স্বীয় রক্তে রঞ্জিত হইয়াছে, মক্কার দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী লোকেরা যদি তাহাদের দুরবস্থা দেখিতে পাইত, তাহা হইলে তাহারা নিশ্চিতভাবে জানিতে সক্ষম হইত এবং তাহারা তাহাদের অধঃমুখে উপুড় অবস্থায় দেখিতে পাইত" (ইবন ইসহাক, ৩খ.?)। অবশ্য অনেকেই এই কবিতাগুলি কা'বের উদ্দেশ্যে এবং মায়মুনার রচিত নয় বলিয়া অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন (ইন্ন হিশাম, ৩খ., পৃ.৯)। কা'ব ইব্‌ন আশরাফ মায়মূনার কবিতার উত্তরে যে কবিতা রচনা করে উহার সারমর্ম নিম্নরূপ: "শোন! আপন নির্বোধদিগকে তিরস্কার কর, যাহাতে এমন সকল উক্তি হইতে বাঁচিতে পার যাহা অসঙ্গত পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। সে কি আমাকে এইজন্য তিরস্কার করিয়াছে যে, আমি ঐ সম্প্রদায়ের জন্য অশ্রু বিসর্জন দিয়াছি, যাহাদের প্রতি আমার ভালবাসা কৃত্রিম নয়? আমি যতদিন বাঁচিয়া থাকিব, ততদিন কাঁদিবই এবং তাহাদের গুণাবলী স্মরণ করিবই যাহাদের শান-শওকত মক্কার প্রতিটি স্থানে সুস্পষ্ট" (ইব্‌ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯)। এমনিভাবে একের পর এক কাব্য রচনার মাধ্যমে কা'ব কুরায়শদিগকে বদরের পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণ করিবার জন্য উত্তেজিত করে। আবূ সুফ্যান ও মুশরিকরা তাহাকে মক্কায় অবস্থানকালে জিজ্ঞাসা করিল, তোমার নিকট আমাদের ধর্ম বেশী পছন্দনীয়, না মুহাম্মাদ ও তাহার সাথীদের ধর্ম? কা'ব বলিল, তোমরাই তাহাদের চাইতে অধিক হিদায়াতপ্রাপ্ত এবং উত্তম (আল-বিদায়া ২খ., পৃ. ৭)। এই ব্যাপারেই আল্লাহ তা'আলা নিম্নের আয়াত নাযিল করেন (কুরতুবী, ৫খ., পৃ. ২৪৯): أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ أُوتُوا نَصِيبًا مِّنَ الْكِتَابِ يُؤْمِنُونَ بِالْجِبْتِ وَالطَّاغُوتِ وَيَقُولُونَ لِلَّذِينَ كَفَرُوا هَؤُلَاءِ أَهْدَىٰ مِنَ الَّذِينَ آمَنُوا سَبِيلًا. "তুমি কি তাহাদিগকে দেখ নাই যাহাদিগকে কিতাবের এক অংশ দেওয়া হইয়াছিল, তাহারা জিব্‌ত ও তাগূতে বিশ্বাস করে? তাহারা কাফিরদিগের সম্বন্ধে বলে, 'ইহাদেরই পথ মু'মিনদের অপেক্ষা প্রকৃষ্টতর" (৪:৫১)। ইবন মাস'উদ (রা) বলেন, অত্র আয়াতে "আল-জিব্‌ত" ও "আত-তাগূত” বলিতে কা'ব ইব্‌ন আশরাফ ও হুয়াই ইব্‌ন আখতাবকে বুঝানো হইয়াছে (আল-জামে' লিআহকামিল কুরআন, ৫খ., পৃ. ২৪৮)। আল্লামা ইয়া'কূবী তাঁহার তারীখ গ্রন্থে বলেন: كعب بن الاشرف اليهودي الذي اراد ان يمكر رسول الله ﷺ . "ইয়াহুদী কা'ব ইবনুল আশরাফ রাসূলুল্লাহ (স)-কে ধোঁকা দিয়া হত্যা করার ষড়যন্ত্র করিয়াছিল" (শিবলী, সীরাতুন নবী, ১খ., পৃ. ২৩৭)। আল্লামা ইবন হাজার আসকালানী বলেন, কা'ব ইবনুল আশরাফ মহানবী (স)-কে বিবাহভোজের অনুষ্ঠানে যোগদানের দাওয়াত দিল এবং কয়েক ব্যক্তি এই উদ্দেশ্যে নিযুক্ত করিল যে, মহানবী (স) আগমন করিলে তাহারা তাঁহাকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলিয়া হত্যা করিবে (ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৩৩৮)। এখানে ঘটনাটি সবিস্তারে আলোচিত হইয়াছে। কা'ব ইব্‌ন আশরাফ হত্যার পরিকল্পনা কা'ব ইব্‌ন আশরাফ রাসূলুল্লাহ (স) ও মুসলমানদিগকে অব্যাহতভাবে ভর্ৎসনা ও কাব্যিক কটূক্তির মাধ্যমে ভীষণভাবে কষ্ট দিতে লাগিল। তাহার সীমাহীন কাব্যাত্যাচার ও দুর্ব্যবহারে অতীষ্ঠ ইইয়া তিনি বলিলেন: "কা'ব ইব্‌ন আশরাফকে কে দমন করিতে পারিবে? সে আল্লাহ ও তদীয় রাসূলকে কষ্ট দিয়াছে" (বিদায়া, ২খ., পৃ. ৬)। বনূ আবদুল আশহালের মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি ইহার জন্য প্রস্তুত আছি। আমি কি তাহাকে হত্যা করিব? নবী করীম (স) বলিলেন, সম্ভব হইলে তাহাই কর (আল-কামিল ফিত-তারীখ, ২খ., পৃ. ১৪৩)। মুহাম্মাদ ইব্‌ন মাসলামা (রা) ফিরিয়া আসিয়া চিন্তিত অবস্থায় খাওয়া-দাওয়া ছাড়িয়া দিয়া তিন দিন অতিবাহিত করিলেন। ইহা অবগত হইয়া রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, পানাহার ত্যাগ করিলে কেন? তিনি বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার সামনে একটি কথা বলিয়া ফেলিয়াছি সত্য, কিন্তু তাহা বাস্তবায়ন করিতে পারিব কিনা জানি না। নবী করীম (স) বলিলেন, চেষ্টা করাই শুধু তোমার দায়িত্ব (তারীখুত তাবারী, ২খ., পৃ. ১৭৯; ইব্‌ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ১০)। পরিকল্পনা কার্যকর করিবার জন্য মুহাম্মাদ ইব্‌ন মাসলামা (রা) আওস গোত্রীয় আরও চার ব্যক্তিকে সঙ্গে লইলেন। তাহারা হইলেন: মিলকান ইব্‌ন সালামা ইব্‌ন ওয়াক্‌শ আবূ নাইলা, কা'ব ইব্‌ন আশরাফের দুধভ্রাতা; 'আব্বাদ ইব্‌ন বিশ্‌র ইব্‌ন ওয়াক্‌শ (রা); হারিছ ইব্‌ন আওস ইব্‌ন মু'আয এবং আৰু 'আবস ইব্‌ন জাবর (রা) (তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ৩২; আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়‍্যা, ১খ., পৃ. ৩৫১-৩৫২; ইব্‌ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ১০)। কা'ব ইব্‌ন আশরাফের হত্যাকাণ্ডের যেই বর্ণনা হাদীছের বিভিন্ন কিতাবে (সামান্য শাব্দিক পার্থক্য সহকারে) উল্লিখিত হইয়াছে তাহা নিম্নরূপ: "জাবির ইবন 'আবদিল্লাহ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: কা'ব ইব্‌ন আশরাফের (নিধনের) জন্য কে আছে? কারণ সে আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলকে খুবই কষ্ট দিতেছে। মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) দাঁড়াইয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি যদি তাহাকে হত্যা করি তবে তাহা কি আপনি পছন্দ করিবেন? তিনি বলিলেন, হাঁ। তিনি বলিলেন, তাহা হইলে আমাকে কিছু উল্টাপাল্টা বলিবার অনুমতি দিন। তিনি বলেন, বলিও। অতএব মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) তাহার নিকট গিয়া বলিল, এই লোকটি আমাদের নিকট সদাকা (যাকাত) দাবি করিয়াছে। সে আমাদিগকে উত্যক্ত করিয়া তুলিয়াছে। আমি তোমার নিকট কিছু ঋণ চাহিবার জন্য আসিয়াছি। সৈ বলিল, আরও দেখ। আল্লাহর শপথ! সে তোমাদিগকে অতিষ্ঠ করিয়া তুলিবে। ইবন মাসলামা বলেন, যাহা হউক, আমরা তো তাঁহার আনুগত্য স্বীকার করিয়াছি। শেষ পর্যন্ত কি দাঁড়ায় তাহা না দেখা পর্যন্ত এখনই তাঁহাকে ত্যাগ করা উত্তম মনে করিতেছি না। আমি তোমার নিকট এক বা দুই ওয়াস্ক খাদ্যশস্য ধার চাই। সে বলিল, আচ্ছা! আমার নিকট কিছু বন্ধক রাখ। তাহারা বলিলেন, কি জিনিস বন্ধক চাও? সে বলিল, তোমাদের স্ত্রীলোকদিগকে আমার নিকট বন্ধক রাখ। তাহারা বলিলেন, তোমার নিকট আমাদের স্ত্রীলোকদিগকে কিভাবে বন্ধক রাখিতে পারি? অথচ তুমি আরবের সর্বাধিক সুশ্রী পুরুয়। সে বলিল, তাহা হইলে তোমাদের সন্তানদিগকে আমার নিকট বন্ধক রাখ। তাহারা বলিলেন, আমরা কি করিয়া আমাদের সন্তানদিগকে তোমার নিকট বন্ধক রাখিতে পারি? ইহাতে তাহাদেরকে গালমন্দ করা হইবে এবং বলা হইবে, এক বা দুই ওয়াস্ক-এর জন্য (তাহাদেরকে) বন্ধক রাখা হইয়াছিল। ইহা আমাদের জন্য অপমানজনক; বরং আমরা তোমার নিকট আমাদের যুদ্ধাস্ত্র বন্ধক রাখিব। অতএব ইবন মাসলামা পুনরায় তাহার নিকট আসিবার ওয়াদা করিলেন। এক রাত্রে তিনি কা'ব-এর দুধভ্রাতা আবূ নাইলা (রা)-কে সঙ্গে লইয়া আসিলেন। সে তাহাদিগকে দুর্গের মধ্যে ডাকিয়া নিল এবং সেও (উপর হইতে) তাহাদের নিকট নামিয়া আসিল। তাহার স্ত্রী জিজ্ঞাসা করিল, এই মুহূর্তে তুমি কোথায় বাহির হইতেছ? সে বলিল, এই তো মুহাম্মাদ ইব্‌ন মাসলামা এবং আমার ভাই আবু নাইলা। স্ত্রী বলিল, আমি এই ডাকের মধ্যে রক্তের গন্ধ পাইতেছি। সে বলিল, অভিজাত ব্যক্তিকে রাত্রিবেলা বর্শাবিদ্ধ করিবার জন্য ডাকা হইলেও সে অবশ্যই সাড়া দেয়। মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) আবূ আক্স ইব্‌ন জাত্র, আল-হারিছ ইব্‌ন আওস ও 'আব্বাদ ইব্‌ন বিশর (রা)-কে সঙ্গে লইয়া প্রবেশ করিলেন। ইন্ন মাসলামা বলিলেন, সে আসিয়া পৌঁছিলে আমি তাহার মাথার চুল ধরিয়া ঝুঁকিতে থাকিব। তোমরা যখন দেখিবে যে, আমি তাহার মাথা শক্ত করিয়া ধরিয়াছি তখনই তোমরা তাহাকে হত্যা করিবে। কা'ব চাদর পরিহিত অবস্থায় তাহাদের নিকট আসিল এবং তাহার দেহ হইতে সুগন্ধি ছড়াইতেছিল। ইবন মাসলামা (রা) বলেন, আমি আজিকার মত এত উত্তম খোশবু কখনও দেখি নাই। তিনি বলিলেন, তুমি কি আমাকে তোমার মাথার ঘ্রাণ শুঁকিবার অনুমতি দিবে? সে বলিল, হাঁ। অতএব তিনি তাহার মাথার ঘ্রাণ শুঁকিলেন, অতঃপর তাহার সঙ্গীগণকেও শুঁকাইলেন। পুনরায় তিনি বলিলেন, আমাকে পুনর্বার শুঁকিবার অনুমতি দিবে কি? সে বলিল, হাঁ। অতএব তিনি তাহার মাথা শক্ত করিয়া ধরিয়া বলিলেন, এবার আঘাত হানো। অতএব তাহারা তাহাকে হত্যা করিল, অতঃপর মহানবী (স)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে অবহিত করিলেন" (বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, বাব কাতলি কা'ব ইবনিল আশরাফ, নং ৪০৩৭; মুসলিম, জিহাদ, বাব ঐ, নং ৪৬৬৪/১১৯; আবূ দাউদ, জিহাদ, বাব ১৫৭, নং ২৭৬৮)। সীরাত ও ইতিহাসের গ্রন্থাবলীতে উক্ত ঘটনা কিছুটা বিস্তারিতভাবে বর্ণিত আছে। তদনুসারে মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর সমীপে আরয করিলেন, আমাকে অস্বাভাবিক কিছু বলিবার অনুমতি দিবেন কি? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, হাঁ, তুমি বলিতে পার। ঐতিহাসিকগণ বলেন, এই কথার দ্বারা তাহারা কা'বের সহিত মিথ্যা বাক্যালাপের অনুমতি প্রার্থনা করিয়াছিলেন (নূরুল ইয়াকীন, পৃ. ১২২)। নবী করীম (স) তাহাদিগকে অনুমতি দিলেন। কেননা যুদ্ধে প্রতিপক্ষকে ফাঁকি দেয়া বৈধ (শিবলী নু'মানী, ১খ., পৃ. ২৩৮)। অতঃপর মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) কা'ব ইব্‌ন আশরাফের নিকট উপস্থিত হইয়া বলিলেন, আমরা মুহাম্মাদ (স)-কে আশ্রয় দিয়া ভীষণ অসুবিধায় পড়িয়াছি। এই ব্যক্তি আমাদের নিকট সদাকা চাহিতেছে। এখন আমরা অভাবগ্রস্ত হইয়া পড়িয়াছি। সে আমাদিগকে কষ্টের মধ্যে ফেলিয়া দিয়াছে। এই কথা শুনিয়া কা'ব বলিল, আল্লাহ্র কসম! সে তোমাদিগকে আরও দুর্ভোগে ফেলিবে। মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) বলিলেন, আমরা যেহেতু তাঁহার অনুসারী হইয়াই গিয়াছি, এখন আকস্মিক তাঁহার সঙ্গ ত্যাগ করা সমীচীন মনে করিতেছি না। অপেক্ষা করিয়া দেখি, পরিণামে কি হয়? আমি আপনার নিকট এক ওয়াস্ক বা দুই ওয়াস্ক (এক ওয়াস্ক-১৫০ কেজি) খাদ্য-দ্রব্য ধার চাহিতেছি। কা'ব বলিল, আমার নিকট কিছু বন্ধক রাখ। মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) বলিলেন, তুমি কি জিনিস বন্ধক রাখা পছন্দ কর? কা'ব বলিল, তোমাদের স্ত্রীলোকদিগকে আমার নিকট বন্ধক রাখ। ইবন মাসলামা (রা) বলিলেন, তুমি আরবের সর্বাপেক্ষা সুদর্শন পুরুষ। সুতরাং কিভাবে আমাদের স্ত্রীদিগকে তোমার নিকট বন্ধক'রাখিতে পারি? সে বলিল, তাহা হইলে (১) কুখ্যাত ইয়াহুদী সর্দার কা'ব ইবন আশরাফের দুর্গের ধ্বংসাবশেষ। (২) কা'ব ইবন আশরাফের বাড়ীর ধ্বংসাবশেষ। মদীনার জীবনে মহানবী (স) ও মুসলমানদের সবচেয়ে জঘন্য শত্রু ছিল এই কা'ব ইবন আশরাফ। এখানে অবস্থান করিয়া সে মহানবী (স) ও সাহাবায়ে কিরামের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা ও তাঁহাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করিত। সীরাত এলবাম (মদীনা পাবলিকেশান্স)-এর সৌজন্যে। তোমাদের পুত্রদিগকে বন্ধক রাখ। ইবন মাসলামা (রা) বলিলেন, এইরূপ করিলে তাহাদিগকে এক বা দুই ওয়াস্ক খাদ্যদ্রব্যের বিনিময়ে বন্ধক রাখা হইয়াছিল বলিয়া গালি দেওয়া হইবে। ইহা আমাদের জন্য খুবই লজ্জাজনক হইবে। আমরা অবশ্য তোমার নিকট অস্ত্র বন্ধক রাখিতে পারি (শারহুল মাওয়াহিবিল লাদুনিয়্যা, ২খ, পৃ. ১৩; আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ৩৩-৩৪)। ইহার পর উভয়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত হইল যে, ইবন মাসলামা (রা) অস্ত্র লইয়া তাহার নিকট আসিবেন। অপরদিকে কা'বের দুধভ্রাতা আবু নাইলা (রা)-ও তাহার নিকট আসিয়া গল্প-গুজব শুরু করিলেন এবং একজন অন্যজনকে কবিতা শুনাইতে লাগিলেন। এক পর্যায়ে আবূ নাইলা (রা) বলিলেন, ভাই কা'ব! বিশেষ প্রয়োজনে আমি তোমার নিকট আসিয়াছি। গোপনীয়তা রক্ষার প্রতিশ্রুতি পাইলে উহা ব্যক্ত করিব। কা'ব বলিল, ঠিক আছে, বল। আবূ নাইলা (রা) বলিলেন, মুহাম্মাদের আগমন আমাদের জন্য পরীক্ষা হইয়া দাঁড়াইয়াছে। সমগ্র আরব বিশ্ব আমাদের শত্রু হইয়া গিয়াছে। আমাদের রাস্তা-ঘাট বন্ধ হইবার উপক্রম হইয়াছে। পরিবার-পরিজন ধ্বংসের মুখামুখী, সন্তান-সন্ততি ভীষণ কষ্টে নিপতিত। আমাদের জীবন দুর্বিসহ হইয়া পড়িয়াছে (সীরাত ইবন হিশাম, ৩খ., পৃ. ১০)। ইহার পর তিনি মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা)-এর অনুরূপ কিছু আলোচনা করিলেন। বাক্যালাপের মধ্যে আবূ নাইলা (রা) এই কথাও বলিয়াছিলেন, আমার কয়েকজন বন্ধু আছে, যাহারা আমার মতই চিন্তাধারা লালন করে। আমি তাহাদিগকেও তোমার নিকট হাযির করিতে আগ্রহী। তুমি তাহাদের নিকটও কিছু খাদ্য বিক্রয় কর (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ২৭১)। মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা ও আবূ নাইলা (রা) নিজ নিজ বাক্যালাপে উদ্দেশ্য সাধনে সফল হইলেন। কেননা ইহার পর সশস্ত্রভাবে তাহাদের আগমনে কা'বের কোন সংশয় থাকিবে না (ইবন হিশাম, ৩খ., পৃ. ১০)। মুহাম্মাদ ইব্‌ন মাসলামা (রা)-এর নেতৃত্ব এই ক্ষুদ্র বাহিনী তৃতীয় হিজরীর রবীউল আওয়াল মাসের ১৪ তারিখ/ ৩-৪ সেপ্টেম্বর, ৬২৫ খৃ. রাত্রিবেলা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট একত্র হইলেন। নবী করীম (স) 'বাকীউল গার'কাদ' পর্যন্ত তাঁহাদের সহগামী হইয়া বলিলেন, আল্লাহ্ নামে রওয়ানা হও। অতঃপর তিনি তাঁহাদের জন্য আল্লাহ্র নিকট সাহায্য প্রার্থনাপূর্বক গৃহে প্রত্যাবর্তন করিলেন (ইবন হিশাম, ৩খ., পৃ. ১১)। ইবন মাসলামা (রা)-এর বাহিনী কা'ব ইব্‌ন আশরাফের দুর্গের দ্বারপ্রান্তে আসিয়া পৌঁছিলে আবূ নাইলা (রা) উচ্চস্বরে তাহাকে ডাক দিলেন। সে ছিল সদ্য বিবাহিত। ডাক শুনিয়াই বাহিরে আসিতে উদ্ধত হইলে তাহার স্ত্রী তাহাকে বাধা দিয়া বলিল, তুমি একজন যোদ্ধা, আর যোদ্ধাদের এই সময় বাহিরে যাওয়া সমীচীন নয়। আমি শুনিতে পাইতেছি যে, এই আওয়াজ হইতে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ঝরিতেছে। অন্য বর্ণনামতে আল্লাহর কসম! আমি তাহার আহ্বানে অনিষ্ট অনুভব করিতেছি। স্ত্রীর এই আপত্তি শুনিয়া কা'ব বলিল, আগন্তুক তো আমার ভাই মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা এবং দুধভাই আবূ নাইলা। সম্ভ্রান্ত লোককে সশস্ত্র যুদ্ধে যোগদানের আহ্বান জানানো হইলে সেই ডাকেও সে সাড়া দেয়। ইহার পর সে বাহিরে আসিল। তাহার দেহ ও মাথা হইতে অপূর্ব সুঘ্রাণ বিকশিত হইতেছিল (ইবন হিশাম, ৩খ., পৃ. ১১)। আবূ নাইলা (রা) তাঁহার সাথীদিগকে পূর্বেই বলিয়া রাখিয়াছিলেন, সে বাহির হইয়া আসিলে আমি তাহার মাথার চুল ধরিয়া শুঁকিব। তোমরা যখন বুঝিতে পারিবে যে, আমি তাহার মাথা ধরিয়া তাহাকে আমার আয়ত্তে নিয়া আসিয়াছি, সেই সুযোগে তোমরা তাহাকে হত্যা করিবে (সীরাতুল মুসতাফা, ২খ., পৃ. ১৭৮)। কা'ব তাহাদের নিকট আসিবার পর বেশ কিছুক্ষণ তাহারা বিভিন্ন গল্প-গুজবে মাতিয়া থাকিল। ইহার পর আবূ নাইলা (রা) বলিলেন, হে ইব্‌ন আশরাফ! চল আজুয ঘাঁটি পর্যন্ত যাই। অবশিষ্ট রাত আমরা সেখানেই গল্প করিয়া অতিবাহিত করিব। সে বলিল, তোমাদের যদি ইচ্ছা হয় চল। তাঁহারা কা'বকে সঙ্গে লইয়া হাঁটিতে লাগিল। পথিমধ্যে আবূ নাইলা (রা) তাহাকে বলিলেন, আজিকার মত এত উত্তম সুগন্ধি আমি আর কখনও অনুভব করিয়াছি। ইহা শুনিয়া কা'বের হৃদয় গর্বে ফুলিয়া উঠিল। সে বলিল, আমার নিকট আরবের সর্বাপেক্ষা অধিক সুগন্ধি ব্যবহারকারিণী রহিয়াছে। আবু নাইলা (রা) বলিলেন, সদয় অনুমতি পাইলে আপনার মাথাটি একটু শুঁকিব। সে বলিল, হাঁ, নিশ্চয়। আবূ নাইলা (রা) তখন কা'বের মাথায় হাত রাখিলেন, অতঃপর তাহার মাথা শুঁকিলেন এবং সঙ্গীদিগকেও শুঁকাইলেন। কিছু দূর অতিক্রম করিবার পর আবু নাইলা বলিলেন, ভাই! আর একবার শুঁকিতে পারি কি? কা'ব ইতিবাচক উত্তর দিলে তিনি আবার তাহার মাথা শুঁকিলেন। ফলে সে নিশ্চিন্ত হইয়া গেল (ইব্‌ন ইসহাক, ৩খ., পৃ. ২২৮)। কিছুক্ষণ চলিবার পর আবু নাইলা (রা) পুনরায় বলিলেন, ভাই! আর একবার শুঁকিব কি? কা'ব বলিল, হাঁ, শুঁকিতে পার। এইবার আবু নাইলা (রা) তাহার মাথায় হাত রাখিয়া তাহাকে সম্পূর্ণরূপে আয়ত্তে নিয়া আসিলেন এবং সাথীদিগকে বলিলেন, আল্লাহ ও রাসূলের এই শত্রুকে খতম কর। সকলে একযোগে তাহাকে আঘাত করিলেন, কিন্তু তাঁহাদের তরবারির আঘাত পরস্পরের তরবারির উপর পড়িতেছিল। ফলে কোন কাজ হইল না। মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) বলেন, যখন আমি লক্ষ্য করিলাম, আমাদের তরবারিগুলি কোনই কাজে আসিতেছে না, তখন আমার তরবারিতে রাখা ছুরিটির কথা আমার মনে পড়িল। আমি উহা তাহার নাভীর নিচে পূর্ণ শক্তিতে চাপিয়া ধরিলাম এবং তাহা নাভী ভেদ করিয়া পেটের ভিতর পৌঁছিয়া গেল। আক্রান্ত হইয়া সে উচ্চস্বরে চিৎকার দিল এবং চর্তুদিকে উহার শব্দ পৌঁছিয়া গেল। এমন কোন দুর্গ বাকী ছিল না যেখানে অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করা হয় নাই। কিন্তু উহা আমাদের কোন ক্ষতির কারণ হয় নাই (বিদায়া, ২খ., পৃ. ৮-৯)। এইভাবে কা'ব নিহত হইল। হারিছ ইব্‌ন আওস ইব্‌ন মু'আয (রা)-ও আহত হইলেন। তাঁহার মাথা কিংবা পায়ে আমাদের তরবারির আঘাত লাগিয়াছিল। ইহার পর আমরা রওয়ানা হইয়া বানু উমায়্যা ইব্‌ন যায়দ, বানু কুরায়যা ও বু'আছ-এর এলাকা অতিক্রম করিয়া হাররাতুল উরায়জে আসিয়া পৌঁছিলাম। আমাদের সঙ্গী হারিছ ইব্‌ন আওস (রা) আহত হওয়ার কারণে পিছনে পড়িয়া গেলেন। আমরা তাহার জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা করিলে তিনি আমাদের পদচিহ্ন ধরিয়া আমাদের পর্যন্ত আসিয়া পৌঁছিলেন। আমরা তাহাকে সঙ্গে লইয়া পুনরায় যাত্রা করিলাম (ইব্‌ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ১১-২২; আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ২৭১)। রাত্রের শেষাংশে মুসলিম বাহিনী বাকী আল-গারকাদে পৌঁছিয়া এমন জোরে তাকবীর ধ্বনি দিল যে, রাসূলুল্লাহ (স)-ও তাহা শুনিতে পাইলেন। তিনি বুঝিতে পারিলেন যে, কা'ব নিহত হইয়াছে। সুতরাং তিনিও তাকবীর ধ্বনি দিতে লাগিলেন। অতঃপর এই মুসলিম বাহিনী তাঁহার সমীপে উপস্থিত হইলে তিনি বলিলেনঃ افلحت الوجوه )এই চেহারাগুলি সফল থাকুক)। তাঁহারাও বলিলেন, ووجهك يارسول الله )হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনার চেহারাও সফলতা লাভ করুক)। তাঁহারা কা'বের কর্তিত মস্তক রাসূলুল্লাহ (স)-এর সামনে রাখিয়া দিলেন। তিনি আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা করিলেন (ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ২৬২; সীরাতুল মুসতাফা, ২খ., পৃ. ১৭৯; বিদায়া, ২খ., পৃ. ৯)। অতঃপর মহানবী (স) হারিছ ইব্‌ন আওস (রা)-এর ক্ষত স্থানে নিজ মুখ নিঃসৃত লালা লাগাইয়া দিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে তিনি আরোগ্য লাভ করিলেন। ইব্‌ন আশরাফের নিহত হওয়ার পর কা'ব ইবন মালিক (রা) নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করেন: "অবশেষে তাহাদের মধ্যকার কা'বকে ধরাশায়ী করা হইল এবং তাহার ধরাশায়ী হওয়ার পর বনূ নাযীর অপদস্ত হইল। সে তথায় তাহার দুই হাতের উপর পড়িয়াছিল এবং আমাদের হাতের তীক্ষ্ণ তরবারি তাহাকে আঘাত করিয়াছিল। যখন মুহাম্মাদ (স)-এর আদেশক্রমে বনূ কা'বের জনৈক ব্যক্তি রাত্রের অন্ধকারে গোপনে কা'বের দিকে যাইতেছিল। সে কৌশলে তাহাকে ঘর হইতে বাহির করিয়া আনিল। আত্মনির্ভরশীল ও সাহসী ব্যক্তি প্রশংসার উপযুক্ত হইয়া থাকে” (ইব্‌ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ১২)। উল্লেখ্য যে, ইব্‌ন হিশাম বলিয়াছেন যে, অধিকাংশ মনীষী এই শোকগাথাটি হাসসান ইব্‌ন ছাবিত (রা) রচিত বলিয়া মানিয়া লইতে অস্বীকার করিয়াছেন (ইব্‌ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৮৬)। এই কবিতাংশে মারছাদকে দলপতি বলা হইলেও আসলে দলপতি ছিলেন 'আসিম ইব্‌ন ছাবিত (রা), যেমনটি পূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে। হাসসান ইব্‌ন ছাবিত (রা) যেমন আর-রাজী'-এর যুদ্ধে শহীদদের শোকে শোকার্ত হইয়া শোকগাথা রচনা করিয়াছেন, তেমনি যাহারা প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতার প্রশ্রয় লইয়া আল্লাহর এই সকল নিবেদিতপ্রাণ সৈনিককে শহীদ করিয়াছিল তাহাদের জন্যও বিদ্রূপাত্মক ব্যঙ্গ কবিতাও ( الهجاء ) রচনা করিয়াছেন। উদাহরণস্বরূপ কিছু চরণ এখানে উল্লেখ করা হইলঃ "আমার জীবনের শপথ! হুযায়ল ইব্‌ন মুদরিককে কলংকিত করিয়াছে সেইসব আচরণ যাহা তাহারা খুবায়ব ও আসিমের সঙ্গে করিয়াছে। লিয়ানদের আচরণের পরিণতি তাহারা ভোগ করিয়াছে। আর লিয়ানরা তো জঘন্য অপরাধে অপরাধী। লিয়ানরা যদিও মূল হুযায়লদের অংশ তাহার পরও তাহারা অন্যদের তুলনায় পশুর সম্মুখ পায়ের পশমের মতই নিকৃষ্ট। তাহারা আর-রাজী'র দিন বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছে। পবিত্র ও উচ্চ বংশীয়দের সহিত প্রতারণা করিয়া তাহারা নিজেদের বিশ্বস্ততাকে জলাঞ্জলি দিয়াছে। তাহারা আল্লাহ্র রাসূল (স)-এর দূতের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছে, আর হুযায়লরা তো নিষিদ্ধ হারাম থেকে কখনও বাঁচিয়া থাকে নাই। শীঘ্রই তাহারা একদিন দেখিবে যে, তাহাদের বিরুদ্ধে অন্যদের সাহায্য করা হইতেছে এমন মহান ব্যক্তিকে হত্যা করার কারণে যাহার লাশকে অপরাধীদের হইতে রক্ষা করা হইয়াছে। তাহার মাংসে ভোমরার দল পাহারা দিয়াছে যিনি বড় বড় রণাঙ্গনে নৈপুণ্য দেখাইয়াছেন। হুযায়লগণ অন্যদেরকে আহত করিয়াছে, সম্ভবত তাহারা তাহার পরিবর্তে নিজেদেরকে নিহতের বধ্যভূমি অথবা শোক প্রকাশের স্থলে দেখিতে পাইবে। অর্থাৎ তাহাদের অনেকেই অল্প দিনের ভিতরেই নিহত হইবে" (ইব্‌ন হিশাম, ৩খ., ৯৮২-৯৮৩)। এই যুদ্ধ সম্পর্কে অবতীর্ণ আয়াতসমূহ আর-রাজী'-এর হৃদয়বিদারক ঘটনাকে লইয়া মুনাফিকরা বিভিন্ন প্রকার আজেবাজে কথাবার্তা বলিতে লাগিল। একদিকে তাহাদের এই অবাঞ্ছিত কথাবার্তার কঠোর প্রতিবাদ, অপরদিকে এই ঘটনায় যাহারা শাহাদাত বরণ করিয়াছেন তাহাদের ভূয়সী প্রশংসা করিয়া কুরআনের কয়েকটি আয়াত অবতীর্ণ হইয়াছে। আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আব্বাস (রা) বলিয়াছেন, মক্কা ও মদীনার মাঝে আর-রাজী' নামক স্থানে যখন খুবায়ব (রা)-এর সাথীগণ (তাবারী, ২খ., পৃ. ৩২৫), যাহাদের মধ্যে মারছাদ, 'আসিম ইব্‌ন ছাবিত ও ইন্সুদ দাছিনা ছিলেন (আবূ হায়‍্যান, ২খ., ১২২), তাঁহারা দুর্ঘটনায় পতিত হইলে মুনাফিকরা বলিতে লাগিলঃ "ঐ সমস্ত বিশৃঙখলা সৃষ্টিকারীর ধ্বংস অনিবার্য যাহারা এইভাবে ধ্বংস হইয়া গেল। না তাহারা নিজেদের ঘরে বসিয়া রহিল, না তাহারা তাহাদের সাথীর (রাসূলুল্লাহ) দেওয়া দায়িত্ব পালন করিল।" তখন আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন তাহাদের প্রচারণার প্রতি-উত্তরে নিম্নোক্ত আয়াতসমূহ অবতীর্ণ করিলেন (তাবারী, ২খ., ৩২৫; ইব্‌ন কাছীর, ৪খ., ৬৯; ইব্‌ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭৮; আবু হায়‍্যান, ২খ., ১২২): "মানুষের মধ্যে এমন ব্যক্তি আছে, পার্থিব জীবন সম্বন্ধে যাহার কথাবার্তা তোমাকে চমৎকৃত করে এবং তাহার অন্তরে যাহা রহিয়াছে তাহা সম্পর্কে আল্লাহকে সাক্ষী বানায়। প্রকৃতপক্ষে সে ভীষণ কলহপ্রিয়। যখন সে ফিরিয়া যায় তখন সে পৃথিবীতে কি করিয়া বিপর্যয় সৃষ্টি করিবে, কি করিয়া শস্য ক্ষেত ও বংশ ধ্বংস করিবে সেই চেষ্টায় নিয়োজিত হয়। অথচ আল্লাহ অশান্তি পছন্দ করেন না। এই ব্যক্তিকে যখন বলা হয়, তুমি আল্লাহকে ভয় কর তখন তাহার আত্মাভিমান তাহাকে পাপের মধ্যে লিপ্ত রাখে। সুতরাং তাহার জন্য জাহান্নামই যথেষ্ট। নিশ্চয় তাহা অত্যন্ত খারাপ স্থান। মানুষের মধ্যে এমন লোকও রহিয়াছে যে কেবল আল্লাহ্ সন্তোষ লাভের উদ্দেশ্যেই নিজের জীবন উৎসর্গ করে। আল্লাহ বান্দাদের প্রতি খুবই অনুগ্রহশীল" (২: ২০৪-২০৭)। মূলত এখানে শেষ আয়াতটিতে ইব্‌ন 'আব্বাস-এর বর্ণনা অনুযায়ী আর-রাজী'-এর শহীদদের আত্মত্যাগের কথাই বলা হইয়াছে (তাবারী, ২খ., পৃ. ৩২৫)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আসমা ইয়াহুদীকে হত্যা

📄 আসমা ইয়াহুদীকে হত্যা


ইসলামের শত্রুদের গুপ্ত হত্যার তালিকায় প্রথম নামটি ছিল এক ইয়াহুদী নারীর। সেও কবি ছিল এবং তাহার নাম আসমা ইয়াহুদীয়া। তাহার কবিতার মাধ্যমে সে নবী করীম (স)-এর বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ও উত্তেজনা ছড়াইত। বদর হইতে রাসূলুল্লাহ (স) প্রত্যাবর্তন না করিতেই সে আবারও ঐরূপ কবিতা রচনা করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিন্দা করিতে লাগিল। অন্ধ সাহাবী উমায়র ইব্‌ন আদী (রা)-এর তাহা আর বরদাশত হইল না। তিনি তাহাকে হত্যার সঙ্কল্প করিলেন। রাতের অন্ধকারে তিনি হাতড়াইতে হাতড়াইতে আসমার গৃহে উপনীত হইলেন এবং নিদ্রামগ্ন আসমার পার্শ্বে শায়িত শিশুদিগকে সরাইয়া তরবারির এক কোপে তাহার দেহকে দ্বিখণ্ডিত করিলেন। তারপর তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পৌঁছিয়া সমস্ত বিবরণ তাঁহাকে অবগত করিয়া শঙ্কিত হৃদয়ে জিজ্ঞাসা করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এইজন্য কি আমাকে জবাবদিহি করিতে হইবে? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: এইজন্য দুইটি ভেড়াও শিং গুতাগুতি করিবে না। মুসান্নাফ হাম্মাদ ইব্‌ন সালামায় বর্ণিত হইয়াছে যে, ঐ নারী রাসূলুল্লাহ (স) ও ইসলামের প্রতি এতই বৈরী ভাবাপন্ন ছিল যে, মাসিক ঋতুস্রাবের রক্তমাখা নেকড়া মসজিদে নিক্ষেপ করিত। রাসূলুল্লাহ (স) উমায়র (রা)-এর এই কাজে সন্তুষ্ট হইয়া বলেনঃ "আল্লাহ ও তদীয় রাসূলকে অদৃশ্যে অজ্ঞাতে থাকিয়া সাহায্য করিয়াছে এমন কোন ব্যক্তিকে দেখিতে চাহিলে তোমরা উমায়রকে দেখ"। অন্ধ হইয়াও তিনি হাতড়াইতে হাতড়াইতে শত্রুর নিকট পৌঁছিয়া তাহার ঈমানী দায়িত্ব পালন করেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, তাহাকে অন্ধ বলিও না, বরং বাহ্য দৃষ্টিতে সে অন্ধ হইলেও অন্তরের দিক হইতে দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন। ২য় হিজরীর রমযানের পঁচিশ তারিখে তিনি এই কর্মটি সম্পাদন করেন (দ্র. যুরকানী, ১খ., পৃ. ৪৫৩; আস-সারিমুল মাসলুল আলা শাতিমির রাসূল, পৃ. ৯৪-১০৩; তাবাকাত ইবন সা'দ, ২/১৮; উষুনুল আছার, ২/২৯৩; সীরাতুর রাসূল, ২/১৬৫-৬)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আবু রাফে' ইব্‌ন আবিল হুকায়ককে হত্যা

📄 আবু রাফে' ইব্‌ন আবিল হুকায়ককে হত্যা


তাহার আসল নাম ছিল আবদুল্লাহ, তাহাকে সাল্লামও বলা হইত, কিন্তু আবু রাফে' উপনামেই সর্বাধিক পরিচিতি ছিল। তাহার পিতার নাম ছিল আবুল হুকায়ক; তাই সাল্লাম ইব্‌ন আবুল হুকায়ক ও আবু রাফে' ইব্‌ন আবুল হুকায়ক উভয় নামেই তাহার পরিচিতি পাওয়া যায়। খায়বারের নিকট একটি দুর্গে সে বাস করিত। খন্দক যুদ্ধের জন্য কুরায়শ বা অন্যান্য গোত্রকে সংগঠিত এবং তাহাদিগকে প্রচুর অর্থ দিয়া সাহায্য করিয়া এই ইয়াহুদী বণিকটি ইসলামের প্রচুর ক্ষতিসাধন করে। সে রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি বৈরিতার ব্যাপারে অর্থব্যয়ে সর্বদা অত্যন্ত তৎপর ও মুক্তহস্ত ছিল। কা'ব ইব্‌ন আশরাফের সে অন্যতম বন্ধু ও সহযোগী ছিল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ১০৭)।

মদীনার আওস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়ের মধ্যে আবহমান কাল হইতেই সর্বক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলিয়া আসিতেছিল। কা'বের হত্যাকারীরা সকলেই ছিলেন আওস গোত্রীয়। তাই খাযরাজ গোত্রীয়গণ তাহারই সমপর্যায়ের অন্য ইয়াহূদী শত্রু আবু রাফে'-কে হত্যা করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর সন্তুষ্টি অর্জনের তাগিদ অনুভব করিলেন এবং সত্য সত্যই তাঁহার কাছে ইহার অনুমতি প্রার্থনা করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে সেই অনুমতি দান করিলেন (ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ২৬২)।

আবদুল্লাহ ইব্‌ন আতীকের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি দল আবূ রাফে'-কে হত্যার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। তাহাদিগকে প্রেরণের সময় রাসূলুল্লাহ (স) সতর্ক করিয়া দিলেন, সাবধান! কোন শিশু বা নারীকে যেন হত্যা না করা হয়।

বুখারীর হাদীছে আছে, সাহাবী বারা'আ ইবন 'আযিব (রা) বর্ণনা করেন, ৩ হিজরীর জুমাদাল উখরা মাসের এক গোধূলি লগ্নে তাহারা খায়বারে গিয়া উপনীত হন। পূর্বেই বলা হইয়াছে যে, সে একটি দুর্গে বসবাস করিত। দুর্গদ্বারে গিয়া তাহারা উহার ভিতরে প্রবেশের ফন্দি-ফিকির করিতেছিলেন। দলনেতা সাথীদিগকে একটু তফাতে ও আড়ালে রাখিয়া নিজেই আগে অগ্রসর হইলেন। সন্ধ্যার অন্ধকারে তিনি প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতেছেন এইরূপ ভান করিয়া সুযোগের অপেক্ষায় রহিলেন। এমন সময় দুর্গরক্ষী হাঁক দিল, ভিতরে কেহ ঢুকিতে চাহিলে ঢুকিয়া পড়, আমি কিন্তু ফটকদ্বার বন্ধ করিয়া দিতেছি। অমনি তিনি তাড়াতাড়ি উঠিয়া দুর্গাভ্যন্তরে প্রবেশ করিলেন। দ্বাররক্ষী তাহাদের নিজেদের লোক মনে করিয়া তাঁহাকে ঢুকিতে দিল। তিনি গভীরভাবে লক্ষ্য করিলেন, দ্বাররক্ষী একটি খুঁটির সাথে চাবিগুচ্ছ ঝুলাইয়া রাখিয়া ভিতরে চলিয়া গেল।

আবু রাফে' দুর্গের অভ্যন্তরস্থ গৃহের দোতলায় বাস করিত। রাত্রে তাহার ঘরে রীতিমত জমজমাট মজলিস বসিত। মজলিসশেষে সকলে যখন নিজ নিজ ঘরে চলিয়া গেল এবং প্রকৃতি নিস্তব্ধ হইল তখন দলনেতা আবদুল্লাহ ইব্‌ন আতীক নির্দিষ্ট স্থান হইতে চাবিগুচ্ছ লইয়া একটি একটি করিয়া দরজা খুলিতে খুলিতে অন্ধকারে আচ্ছন্ন আবু রাফের শয়নকক্ষে ঢুকিয়া আবূ রাফে বলিয়া ডাক দিলেন।। আবু রাফে 'কে' বলিয়া উঠিতেই তিনি তাহার উপর তরবারি চালাইলেন। কিন্তু তাহা অন্ধকারে তাহার গায়ে লাগিল না। সে চীৎকার করিয়া উঠিল। এইবার অন্যরূপ কন্ঠে আবদুল্লাহ জিজ্ঞাসা করিলেন, আবু রাফে! কি হইল? এ কিসের আওয়াজ? সে বলিল, এইমাত্র কে যেন আমার প্রতি তরবারি চালাইল! আবু রাফের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হইতেই আবদুল্লাহ এইবার সুনির্দিষ্টভাবে তাহাকে লক্ষ্য করিয়া তরবারি চালাইলেন। এইবার তরবারি তাহার দেহে লাগিল। আবদুল্লাহ ইব্‌ন আতীক নিজে বর্ণনা করেন, তারপর তাহার মৃত্য নিশ্চিত করার জন্য তরবারি তাহার পেটে ঠেকাইয়া আমি জোরে চাপ দিলাম। তরবারি তাহার পেট ভেদ করিয়া পিঠে গিয়া ঠেকিল। তারপর তাহার মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত হইয়া আমি একে একে দরজা খুলিয়া সিঁড়ি বাহিয়া অন্ধকারের মধ্যে নামিতে গিয়া উপর হইতে পড়িয়া আমার পায়ের গোছার একটি হাড় ভাঙ্গিয়া গেল। তাড়াতাড়ি পাগড়ী খুলিয়া পা বাঁধিয়া আমি সঙ্গিগণকে লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে গিয়া সেই সুসংবাদ শুনাইলাম। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশে আমি আমার পা মেলিতেই তিনি উহাতে পবিত্র হস্ত বুলাইয়া দিলেন এবং আমি পূর্ণ সুস্থ হইয়া গেলাম (দ্র. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ১৩৮; বুখারী, ২/৫৭৭)।

শত্রুদের সহিত সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হইয়া তাহাদিগকে পরাস্ত করার মত এই সমস্ত শত্রু সর্দার ও বড় বড় কবি ও দলনেতাকে গুপ্ত হত্যার মাধ্যমে নির্মূল করায় শত্রুপক্ষ দুর্বল ও নেতৃশূন্য হইয়া পড়ে। সেই যুগে এই কবিরা বর্তমান যুগের প্রচার মাধ্যমের ভূমিকা পালন করিত। এই কবিদের কবিতা মুখে মুখে প্রচারিত হইয়া বিদ্বেষ ও উত্তেজনা ব্যাপকভাবে ছড়াইয়া পড়িত। তাই তাহাদিগকে নিমূর্ল করা ইসলামের স্বার্থে ও রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য হইয়া উঠিয়াছিল। রাসূলুল্লাহ (স)-এর আত্মোৎসর্গকারী সাহাবীগণ প্রাণের ঝুঁকি লইয়া তাই এই গুরুদায়িত্ব পালন করিয়া ইতিহাসে অমর হইয়া রহিয়াছেন। গুপ্তহত্যার মাধ্যমে এই অপশক্তিকে নির্মূল না করিলে ইহারা আরও অনেক যুদ্ধ ও রক্তপাতের কারণ হইয়া দাঁড়াইত। ইহাদিগকে নিশ্চিহ্ন করিয়া দেওয়ার পর মুসলমানগণ ও আল্লাহর রাসূল (স) স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিলেন।

The execution of the half dogen mwrked gews is generwler colled assaisination, became a muslim was sent secrethy to kill each of the criminals. The reason is almost tooobvious tobeed explanation. There were no police or law corerts al medina; some one of the followers of Mohammad must therefore be the executor of the sentance of death, and it was balter it should be done guetely, as the excenting of a man openlybefore his clan would have caused a braw and more bloodshed and relliation, till the whole city had become mexcd up in the quared. If secret assasination isthe woed for such decds, secrel assassinationwas necessway part of the internal government of medina. The man must be killed and best inthe war, in saying this I assume that muhammad was cognisant of the deed , and that it was nat merely a case at private vengeans; but in several instancer the cvidence that trece these execntions to Muhammads or der is either entirly wanting or is too doubt fue toclaine owr credence" (স্টাডিজ ইন এ মস্‌ক্ : পৃ. ৬৮)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00