📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হুনায়নের গনীমত সম্ভারের অভূতপূর্ব বিলিবণ্টন

📄 হুনায়নের গনীমত সম্ভারের অভূতপূর্ব বিলিবণ্টন


তায়েফ অবরোধ প্রত্যাহার করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) সদলবলে জি'রানায় ফিরিয়া আসিলেন। এখন পূর্বোল্লেখিত বিপুল সংখ্যক বন্দী ও গনীমত-সম্ভার বণ্টনের পালা। দশ-বার দিন পর্যন্ত তিনি হাওয়াযিনদের জন্য অপেক্ষা করিলেন এই ভাবিয়া যে, তাহাদের কেহ তাহার স্ত্রী-পুত্রকে মুক্ত করিয়া লইয়া যাইতেও আসিতে পারে। কিন্তু না, কেহই আসিল না। অগ্যতা রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে যোদ্ধাগণের মধ্যে ভাগ করিয়া দিলেন। [ফাতহুল বারী, ৮/৩৮; 'উয়ূনুল আছার, ২/১৯৩]
এতকাল দেখা গিয়াছে যে, গনীমত বণ্টনের সময় যুদ্ধে যোদ্ধাদের বীরত্ব ও অবদানের কথা বিবেচনায় রাখিয়া তাহা করা হইত। অনেককে তাহার অতিরিক্ত ত্যাগ ও বীরত্বের জন্য অধিক গনীমত দান করিয়া উৎসাহিত করা হইত। এইবার হইল তাহার সম্পূর্ণ বিপরীত। আজীবন ইসলামের সহিত, ইসলামের নবীর সহিত, মুসলিম জাতির সহিত যাহারা বৈরী আচরণ করিয়াছে, ষড়যন্ত্র করিয়াছে, যুদ্ধ করিয়াছে, মক্কা বিজয়ের পর মুসলমানদের জয়যুক্ত হওয়ার পর ইসলাম গ্রহণ করিয়াই তাহারা গনীমত সম্ভার হইতে অঢেল পরিমাণ লাভ করিল। সাধারণভাবে সৈনিকদের প্রত্যেকে যেখানে চারটি উট ও চল্লিশটি করিয়া ছাগল-ভেড়া পাইলেন, আর প্রতিজন অশ্বারোহী সৈন্য পাইলেন বারটি করিয়া উট ও ১টি করিয়া ছাগল-ভেড়া, সেখানে আবূ সুফ্যান ও তাহার দুই পুত্র ইয়াযীদ ও মু'আবিয়ার প্রত্যেকে পাইলেন এক শত করিয়া উট এবং চল্লিশ উকিয়া করিয়া রৌপ্য। হাকীম ইব্‌ন হিযাম দুই শত উট, হারিছ ইব্‌ন হিশাম, সুহায়ল ইবন 'আমর, সাফওয়ান ইবন উমায়্যার মত আরও অনেকে ১০০টি করিয়া উট লাভ করিলেন। কুরায়শের বাহিরের আব্বাস ইব্‌ন মিরদাসকেও ৫০টি উট দেওয়া হইল। সে তাহার কবিতায় এইজন্য অসন্তুষ্টি প্রকাশ করিলে মহানবী (স) বলিলেন, যেভাবেই হউক আমার পক্ষ হইতে তাহার রসনা কাটিয়া দাও। সাহাবাগণ তাহার সন্তুষ্টিমত তাহাকে দান করিয়া তাহার মুখ বন্ধ করিলেন। [বিস্তারিত দ্র. ফাতহুল বারী ও যুরকানী, সীরাতুন-নবী, ইন্ন হিশাম, ৮খ., পৃ. ১৫৪]
অপরদিকে দীর্ঘকাল অবধি যাহারা সুখে-দুঃখে রাসূলুল্লাহ (স)-কে সঙ্গ দিয়াছেন, প্রাণ বাজি রাখিয়া ইসলামের জন্য ইসলামের নবীর জন্য লড়িয়াছেন সেই পরীক্ষিত আনসার সাহাবীগণের ভাগে পরিমাণে কম পড়িল। ইহা তাহাদের মধ্যে দারুণ হতাশার সৃষ্টি করিল। তাহারা ভাবিলেন, মক্কাবাসী ও বিশেষত কুরায়শগণ মহানবীর স্বদেশবাসী ও আত্মীয়-স্বজন হওয়ায় বুঝি তাহাদের অগ্রাধিকার লাভের কারণ। মদীনার আনসার সাহাবীগণের বিপুল আত্মত্যাগ এবং মহানবী (সা)-এর চরম দুর্দিনে তাঁহাকে সঙ্গদান বুঝি এখন অতীতের বিষয় হইয়া গেল। তাহাদের কথাবার্তায় সেই হতাশা ফুটিয়া উঠিতে লাগিল। বুখারী বর্ণিত হাদীছে উহার সুন্দর চিত্র ফুটিয়া উঠিয়াছে। হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন, আল্লাহ তা'আলা যখন তাঁহার নবীকে হাওয়াযিনের বিপুল গনীমত-সম্ভারের অধিকারী করিলেন, আর তিনি তাহা হইতে কুরায়শদের কিছু লোককে এক শত করিয়া উট প্রদান করিলেন, তখন আনসার সম্প্রদায়ের কিছু লোক বলিতে লাগিলেন:
يغفر الله لرسول الله ﷺ يعطى قريشا ويدعنا وسيوفنا تقطر من دمائهم.
"আল্লাহ তাঁহার রাসূলকে ক্ষমা করুন! তিনি কুরায়শদিগকে দান করিয়া চলিয়াছেন আর আমাদিগকে পরিহার করিতেছেন। অথচ আমাদের তরবারিসমূহ হইতে এখনও তাহাদের রক্ত ঝরিতেছে"।
হযরত আনাস (রা) বলেন, আনসারদের অসন্তোষের কথা রাসূলুল্লাহ (স)-এর গোচরে আনা হইল। সংশয় নিরসনকল্পে তিনি লোক পাঠাইয়া চর্ম নির্মিত তাঁবুর নিচে তাহাদের সকলকে ডাকাইয়া আনিলেন এবং তাহাদের ব্যতীত আর কাহাকেও সেখানে ডাকিলেন না। সকলে সমবেত হইলে রাসূলুল্লাহ (স) আসিলেন এবং বলিলেনঃ তোমাদের পক্ষ হইতে আমি এইসব কি শুনিতেছি? তখন তাহাদের নেতৃস্থানীয়গণ বলিলেন, আমাদের মধ্যকার প্রাজ্ঞগণ কিছু বলিতেছেন না, উঠতি বয়সের যুবকরাই এইরূপ বলাবলি করিতেছে। [সহীহ বুখারী, হাদীছ নং ২৯১২]
সেই বলাবলি যে মাত্রা ছাড়াইয়া গিয়াছিল তাহার প্রমাণ বুখারীর ১৯১৫ নং হাদীছ যাহাতে বলা হইয়াছেঃ হুনায়ন যুদ্ধকালে রাসূলুল্লাহ (স) কিছু সংখ্যক লোককে প্রাধান্য দিলেন, আকরা' ইবন হাবিস ও 'উয়ায়নাকে এক শত করিয়া উট দিলেন এবং আরবের সর্দার গোত্রের লোকদিগকে বেশী বেশী দান করিলেন। তখন এক ব্যক্তি এই পর্যন্ত বলিয়া ফেলিল যে, ইহা এমন একটি বণ্টন যাহাতে সুবিচার করা হয় নাই বা আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে খেয়াল রাখা হয় নাই। কেহ কেহ তো এই কথা পর্যন্ত বলিল যে, যখন বিপদ আসে তখন আনসারদিগকে আহবান করা হয়, আর যখন গনীমত বণ্টনের পালা আসে তখন স্বজাতির লোকজনকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।
আনসারদের এইরূপ অসন্তুষ্টি যে কেবল তাহাদের নব্য যুবকদের মধ্যে ছিল তাহা ঠিক নহে। কেননা সা'দ ইবন 'উবাদা (রা)-র মত পরীক্ষিত ও প্রজ্ঞাবান নেতা রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতে হাযির হইয়া আনসারদের এই অসন্তুষ্টির কথা তাঁহাকে অবগত করিলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, আচ্ছা! অন্যরা যাহা ইচ্ছা বলুক, তোমার কী অভিমত হে সা'দ? তিনি জবাব দিলেন, আমিও তো আমার সম্পদ্রায়েরই একজন, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
নওমুসলিমরা যদি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝিতে না পারিয়া উল্টাপাল্টা মন্তব্য করে তবে তাহা মানিয়া নেওয়া যায় এইজন্য যে, জাহিলিয়াতের সমাজ হইতে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত মূল্যবোধ এখনও তাহাদের দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করিয়া রাখিয়াছে, তাহাদের কাছে মাল-দৌলত, উট, ছাগল ইত্যাদি হইতেছে প্রাধান্যের মাপকাঠি। কিন্তু পরীক্ষিত আনসারগণও যদি অনুরূপ ভুলে নিমগ্ন থাকেন, এইরূপ কথাবার্তা তাহাদের মুখ হইতেও বাহির হয় তাহা হইলে বুঝিতে হইবে তাহা ঔদ্ধত্য নয়, ভুল বুঝাবুঝি। তাই তাহাদের সন্দেহ নিরসনের জন্য আনসার নেতা উবাদা ইবনুস সামিতের মাধ্যমে তিনি কেবল আনসারগণকে এক স্থানে সমবেত করিলেন। তারপর তিনি তাহাদিগকে এই ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করিলেন, তাহারা এইরূপ জবাব দিলে মহানবী (স) বলিলেন, হে আনসারগণ! দুনিয়ার এই তুচ্ছ ক্ষণস্থায়ী সম্পদের জন্য তোমরা আমার প্রতি মনোক্ষুণ্ণ? ইহা তো আমি কেবল সেই সকল লোককেই দিয়াছি যাহারা সদ্য ইসলাম গ্রহণ করিয়াছে, যাহাদের অন্তরে এখনও ইসলামের প্রতি অনুরাগ সৃষ্টি হয় নাই। ইসলামের স্বপক্ষে তাহাদের অন্তর জয় করা কেবল ইহার উদ্দেশ্য, যাহাতে ইসলামের প্রতি বৈরিতা ত্যাগ করিয়া তাহারা আল্লাহ্ দীনের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে।
হে আনসারগণ! তোমরা কি ইহা মানিয়া নিতে পারিলে না যে, লোকজনকে উট-ছাগল দিয়া আমি ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার প্রয়াস পাইয়াছি, আর তোমাদের ইসলাম-নিষ্ঠার উপর আমি দৃঢ় আস্থা পোষণ করিয়াছি? তোমাদের কাছে ইহা কি গ্রহণযোগ্য নহে যে, লোকজন উট ছাগল লইয়া তাহাদের ঘরে ফিরিবে, আর তোমরা ফিরিবে আল্লাহ্র রাসূলকে সঙ্গে লইয়া? আল্লাহ্র কসম! যে যে পথে যাউক না কেন, আমার পথ তো ঐটাই যে পথে আনসারগণ গমন করিবে। জীবনে-মরণে সর্বাবস্থায় আমি তোমাদের সাথী।
আনসারগণ! আজ তোমরা তুচ্ছ পার্থিব সম্পদের জন্য আমার প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করিতেছ। আচ্ছা বল দেখি, আমি কি তোমাদিগকে পথহারা বিভ্রান্ত অবস্থায় পাই নাই? আল্লাহ আমার মাধ্যমে তোমাদিগকে পথের সন্ধান দিয়াছেন। তোমরা কি শতধা বিচ্ছিন্ন ছিলে না? আল্লাহ আমার মাধ্যমে তোমাদিগকে ঐক্যবদ্ধ করিয়াছেন। তোমরা কি অভাবগ্রস্ত ছিলে না? আল্লাহ আমার দ্বারা তোমাদিগকে অভাবমুক্ত ও সমৃদ্ধ করিয়াছেন। মহানবী (স)-এর প্রতিটি কথার মাঝে মাঝে সায় দিয়া তাহারা 'অবশ্যই, অবশ্যই' বলিতেছিলেন এবং তাহাদের প্রতি রাসূলুল্লাহ (স)-এর অবদানের কথা অকুণ্ঠ চিত্তে স্বীকার করিয়া যাইতেছিলেন।
রাসূলুল্লাহ (স) পুনরায় বলিলেনঃ তোমরা যথার্থভাবে বলিতে পার, যখন তোমাকে অপর সকলেই মিথ্যা প্রতিপন্ন করিয়াছে তখন আমরা তোমাকে সত্য নবী বলিয়া বরণ করিয়াছি। যখন সকলেই তোমাকে অপমান করিয়াছে, আমরা তোমাকে মর্যাদা দিয়াছি। যখন সকলেই তোমাকে দেশছাড়া করিয়াছে আমরা তোমাকে আশ্রয় দিয়াছি। ফলে তুমি অভাবগ্রস্ত ছিলে, আমরা তোমার সাহায্যার্থে আগাইয়া আসিয়াছি!
হে আনসারগণ! তোমরা আমার অন্তর্বাস, আর অন্য সকলে আমার বহির্বাস। হে আল্লাহ! আনসারদিগকে রহম করুন! আনসারদের সন্তানদের প্রতি রহম করুন! আনসারদের সন্তানদের সন্তানদের প্রতিও রহম করুন!!!
রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই মর্মস্পর্শী বক্তব্য শ্রবণে আনসারগণ অঝোর ধারায় ক্রন্দন করিতে লাগিলেন। তাঁহাদের শ্মশ্রু তাঁহাদের অশ্রুতে ভিজিয়া গেল। সকলে সমস্বরে বলিয়া উঠিলেন, আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের বণ্টনে আমরা সন্তুষ্ট। তারপর রাসূলুল্লাহ (স) প্রস্থান করিলেন এবং আনসারগণও প্রস্থান করিলেন। [আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২৯৫-৩০১; সীরাতুন নবী, ইব্‌ন হিশাম, ৪খ., পৃ. ৫৯-৬০ ই.ফা.]

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বর্ধিত দান সাফল্য আনিয়াছিল

📄 বর্ধিত দান সাফল্য আনিয়াছিল


ড. আকরম যিয়া উমারী বলেন, সর্দারদিগকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর উক্তরূপ দান ঐ সমস্ত সর্দার ও তাহাদের অনুসারিগণকে ইসলামের প্রতি আকর্ষণ করিয়াছিল এবং পরবর্তী কালে তাহারা উত্তম ও নিষ্ঠাবান মুসলমানরূপে ইসলামের জন্য লড়িয়াছেন, জানমাল দিয়া ইসলামের সেবা করিয়াছেন, অল্প কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া, যেমন 'উয়ায়না ইব্‌ন হিস্স্ন আল-ফাযারী তারপরও বৈরী-ভাবাপন্ন ছিল, যেমন ইব্‌ন হাযম বলিয়াছেন। [জাওয়ামিউস সীরা, পৃ. ২৪৮] আকরা' ইব্‌ন হাবিস (রা) পরবর্তী কালে তাঁহার দশটি সন্তানসহ ইয়ারমুকের যুদ্ধে লড়িয়াছিলেন। [তাবাকাত, ৭/৩৭; ইসতী'আব, ১/১০৩; ইসাবা, ১/৫৮; আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা আস-সাহীহা, পৃ. ৫১২]

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হাওয়াযিন প্রতিনিধিদের আগমন ও বন্দীমুক্তি

📄 হাওয়াযিন প্রতিনিধিদের আগমন ও বন্দীমুক্তি


গনীমতের বিলি-বণ্টন সম্পন্ন হইলে বিলম্বে হাওয়াযিন গোত্রের ১৪ সদস্যবিশিষ্ট একটি প্রতিনিধি দল আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট ইসলাম গ্রহণ করে এবং তাহাদের হৃত সম্পদ ও বন্দীদের মুক্তি প্রার্থনা করে। রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, মাল ও বন্দীদের মধ্যে কোনটি তোমাদের নিকট অগ্রগণ্য? তাহারা বন্দীদের কথা বলিলে তিনি বলিলেন, আমার ও বনী মুত্তালিবদের ভাগে যাহারা পড়িয়াছে তাহাদিগকে আমি মুক্তি দিতে পারি। অন্যদের দায়িত্ব আমি নিতে পারি না, তবে সুপারিশ করিতে পারি মাত্র। সেইমতে তিনি সুপারিশ করিলে ছয় হাজার বন্দী একত্রে মুক্তি লাভ করিল। আক্রা ইবন হাবিস তাঁহার নিজের ও তামীম গোত্রের এবং উয়ায়না ইব্‌ন হিস্স তাঁহার নিজের এবং নিজ গোত্রের বহু ফাযারীর ভাগে পড়া বন্দীদিগকে তারপরও মুক্তি দিতে অনীহা প্রকাশ করিলে তাহাদিগকে পরবর্তীতে একটির বদলে ছয়টি করিয়া বন্দী দানের ওয়াদা দিয়া রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে মুক্ত করিয়া দিয়াছিলেন। [সীরাতুন নবী, ইব্‌ন হিশাম, ৮/১৫০-১৫১, বঙ্গানু.]

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00