📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হুনায়ন যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর পৃষ্ঠপ্রদর্শনের রহস্য

📄 হুনায়ন যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর পৃষ্ঠপ্রদর্শনের রহস্য


জিহাদ হইতে পলায়ন করা মহাপাপ- শিরক ও নরহত্যার সমপর্যায়ের কবীরা গুনাহ। এতদসত্ত্বেও আল্লাহর রাসূলকে রণক্ষেত্রে পরিত্যাগ করিয়া সহযোদ্ধাগণ হুনায়নের যুদ্ধ পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিলেন। ইহার রহস্য কি? সহীহ মুসলিমে ইহার কারণ বর্ণিত হইয়াছে। আবূ ইসহাক হইতে বর্ণিত, এক ব্যক্তি হযরত বারা'আ (রা)-কে জিজ্ঞাসা করিল, হুনায়নের যুদ্ধের দিন কি আপনারা পলায়ন করিয়াছিলেন? জবাবে তিনি বলিলেন, না, আল্লাহ্র কসম! রাসূলুল্লাহ (স) পৃষ্ঠপ্রদর্শন করেন নাই, বরং তাঁহার সঙ্গে তরুণরা ও অস্থিরচিত্ত ও অস্ত্রশস্ত্রবিহীন লোক যাহাদের হয় অস্ত্র একেবারে ছিল না অথবা নামমাত্র অস্ত্র ছিল তাহারাই হাওয়াযিন ও বনূ নষীরের অব্যর্থ তীরন্দাজদের তীরের সম্মুখে টিকিয়া থাকিতে না পারিয়া এইদিক সেইদিক হইয়া যায় এবং কাফিররা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে চলিয়া আসে। [মুসলিম, হুনায়ন যুদ্ধ প্রসঙ্গ, হাদীছ নং ৪৪৬৪-৪৪৬৫, ৬খ., পৃ.২৪০-২৪১]
কিছু লোক শুধু এই উদ্দেশ্যে মুসলমান পক্ষে যুদ্ধে যোগ দিয়াছিল যাহাতে ঠিক যুদ্ধের মুহূর্তে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করিয়া মুসলমানদের সাহস ও উৎসাহ-উদ্দীপনাকে বিনষ্ট করিয়া দেওয়া যায়। সহীহ মুসলিমের বর্ণনা হইতে প্রতীয়মান হয় যে, ঐ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গে অবস্থানকারী উম্মু সুলায়ম (রা) এই সত্যটি উপলব্ধি করিয়াই তাঁহাকে পরামর্শ দিয়াছিলেন: اقتل من بعدنا من الطلقاء انهزموا بك. "আমাদের ব্যতীত ঐ যে মুক্তি ও ক্ষমাপ্রাপ্ত মক্কাবাসীরা (আমাদের সহিত যুদ্ধে আসিয়াছে) উহাদের সকলকে হত্যা করুন। কারণ উহারাই আপনার পরাজয়ের হেতু"। [সহীহ মুসলিম, হাদীছ নং ৪৫২৯, পুরুষদের সহিত স্ত্রীলোকের যুদ্ধযাত্রা প্রসঙ্গ]
সহীহ মুসলিমের ভাষ্যকার ইমাম নববী (র) লিখেন, ঐ সময়ে সকলেই পলায়ন করেন নাই, বরং মক্কার ঐ সকল লোক যাহাদের হৃদয় জয়ের উদ্দেশ্যে ধন-সম্পদ দান করা হইয়াছিল এবং তাহাদের মধ্যকার পৌত্তলিকরা যাহারা তখনও ইসলাম গ্রহণ করে নাই, তাহারাই পলায়ন করিতে শুরু করে। এই অভাবনীয় পরাজয় এজন্য হইয়াছিল যে, শত্রুপক্ষ অতর্কিতে তীর নিক্ষেপ করিতে থাকে এবং মুসলিম বাহিনীতে মক্কার এমন লোকেরাও ছিল যাহাদের অন্তরে ইসলামের বিশ্বাস বদ্ধমূল হয় নাই এবং তাহারা এই অপেক্ষায় ছিল যে, কখন মুসলমানদের উপর বিপদ নামিয়া আসিবে এবং তাহাদের মধ্যে এমন নারী এবং শিশুও ছিল যাহারা কেবল গনীমত সম্ভারের লোভে ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিল। [মুসলিম, গাযওয়া হুনায়ন প্রসঙ্গ, তথ্যসূত্র সীরাতুন্নবী, পৃ. ৫২৫, পাদটীকা]
ইবন ইসহাক ও ইবন সা'দ-এর বর্ণনা হইতে জানা যায় যে, এমন লোকও হুনায়ন যুদ্ধে মুসলমানদের পক্ষ সাজিয়া যোগদান করিয়াছিল যাহার সঙ্কল্প ছিল নবী করীম (স)-কে সুযোগ বুঝিয়া আঘাত করা। তাহারা উভয়ে বর্ণনা করিয়াছেন, শায়বা ইব্‌ন উছমান ইব্‌ন আবূ তালহা বর্ণনা করেন, আমি সংকল্প করিলাম যে, কুরায়শদের সহিত আমিও হুনায়নে যাইব এবং সুযোগ পাইলেই মুহাম্মাদকে হত্যা করিয়া কুরায়শগণের রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণ করিব। আমি মনে মনে সঙ্কল্প করিলাম, আরব-আজম সকলেও যদি মুহাম্মাদের অনুসারী হইয়া যায় আমি কস্মিনকালেও তাঁহার আনুগত্য স্বীকার করিব না। তারপর রণক্ষেত্রে গিয়া আমি মওকা খুঁজিতে লাগিলাম।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 তায়েফের পথে দুইটি সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ

📄 তায়েফের পথে দুইটি সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ


সামরিক দিক হইতে কৌশলপূর্ণ দুইটি কাজ তায়েফে সম্পন্ন করা হয়। একটি হইল সেখানে অবস্থিত আওফ ইবন মালিকের দুর্গ ধ্বংস করা, আর অপর কাজটি হইল ছাকীফ গোত্রের এবং তাহাদের সম্ভাব্য সাহায্যকারী হাওয়াযিন গোত্রের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান গ্রহণ, যাহাতে ছাকীফদের সাহায্যার্থে তাহারা আগাইয়া আসিতে না পারে। [আস্-সীরাতুন নাবাবিয়্যা আস্-সাহীহা, ২খ., পৃ. ৫০৮] তুফায়ল ইবন 'আমর দাওসী যুল-কাফফায়ন বিগ্রহটি ভস্মীভূত করিয়া আসার সময় সেখান হইতে মিনজানীক নামক কামান সদৃশী লোষ্ট্র নিক্ষেপক যন্ত্র ও ট্যাংক সদৃশ দাব্বাবা যন্ত্র লইয়া আসেন। [আসাহহুস্ সিয়ার, পৃ. ২৮৮]
আল-ওয়াকিদীর বর্ণনা হইতে প্রতীয়মান হয় যে, মিনজানীক ও দাব্বাবা দুইটি জারাশ হইতে লইয়া আসিয়াছিলেন হযরত খালিদ ইব্‌ন সাঈদ ইবনুল 'আস (রা)। অন্য বর্ণনা হইতে জানা যায় যে, হযরত সালমান ফারসী (রা) নিজ হাতে মিনজানীক নির্মাণ করেন। [কিতাবুল মাগাযী, ৩/৯২৭; আস্-সীরাতুন নাবাবিয়্যা আস-সাহীহা, পৃ. ৫০৯, পাদটীকায়]
রাসূলুল্লাহ (স) তায়েফ অবরোধ করিলেন। হুনায়ন যুদ্ধে পরাজিত পৌত্তলিকগণ তাহাদের সর্দার আওফ ইবন মালিকের নেতৃত্বে দুর্গাভ্যন্তরে ঢুকিয়া পড়িল। ইসলামের ইতিহাসে প্রথমবারের মত রাসূলুল্লাহ (স) মিনজানীক ও দাব্বাবা ব্যবহারের দ্বারা দুর্গ ধ্বংসের প্রয়াস পাইলেন। মিনজানীক দ্বারা দূর হইতে বিশালাকার শিলাখণ্ড নিক্ষেপ করা যাইত। আর অনেকটা সিন্দুকের মত কাষ্ঠ নির্মিত দাব্বাবার মধ্যে প্রবেশ করিয়া শত্রু দুর্গমূলে পৌঁছিয়া শাবল ইত্যাদির সাহায্যে দুর্গ প্রাচীর ধ্বংসের কাজ করা যাইত। কিন্তু রণকুশলী তায়েফবাসীরা দুর্গাভ্যন্তর হইতে উত্তপ্ত লৌহশলাকা নিক্ষেপ করিয়া দাব্বাবায় অগ্নিসংযোগ করিতে থাকিলে উহাতে অবস্থান করা আর সম্ভব হইয়া উঠিল না। দাব্বাবা হইতে বাহির হইলেই তাহারা অব্যর্থ শর নিক্ষেপে যোদ্ধা সাহাবীগণকে হত্যা করিত। শেষ পর্যন্ত কুড়ি দিনের অবরোধের পর তাহা প্রত্যাহার করিয়া লইতে হয়।
শত্রুদিগকে কাবু করার উদ্দেশ্যে তাহাদের দীর্ঘকালের পরিশ্রমে লালিত দ্রাক্ষাকুঞ্জসমূহে অগ্নিসংযোগ করা হইলে দুর্গাভ্যন্তর হইতে অসহায়ের মত তাহারা তাহা প্রত্যক্ষ করে এবং তীব্র মর্মপীড়ায় ভুগিতে থাকে। শেষ পর্যন্ত তাহাদের অনুনয়-বিনয়ে দয়াপরবশ হইয়া রহমতের নবী ঐ যুদ্ধাবস্থায়ও শত্রুদের অনুরোধ রক্ষা করেন এবং উহা হইতে বিরত থাকেন। [বায়হাকীর সুনানুল কুবরা, ৯/৮৪; কিতাবুল উন্ম, ৭/৩২৩; আস-সীরাতুন নাবabія আস্-সাহীহা, ২খ., পৃ. ৫০৯]
দুর্গের বাহির হইতে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করিয়া দেওয়া হইল, যে সমস্ত দাস দুর্গ হইতে বাহির হইয়া আসিবে তাহাদিগকে মুক্ত করিয়া দেওয়া হইবে। ইহার চমৎকার ফল ফলিল। পরবর্তী কালের বিখ্যাত সাহাবী আবূ বাকরাসহ কুড়িজন, মতান্তরে ২২জন দাস বাহির হইয়া আসিলেন এবং চিরতরে দাসত্ব মুক্ত হইয়া গেলেন। [মুসনাদ আবদুর রায্যাক, ৫/৩০১; ফাতহুল বারী, ৮/৪৬; বুখারী, ৫/১২৯]
বাহ্যত তায়েফ অবরোধ নিষ্ফল প্রতিপন্ন হইল। কিন্তু আল্লাহ্র রাসূল (স) প্রত্যাবর্তনকালে সহযোদ্ধা সাহাবীগণকে বলিলেন, আল্লাহ্র দরবারে নিবেদন কর :
ائبون تائبون عابدون لربنا حامدون
"আমরা প্রত্যাবর্তনকারী, তওবাকারী, ইবাদতগুযার এবং নিজেদের প্রভুর প্রশংসাকারী"। এই সময় রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলা হইল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! বানু ছাকীফকে বদদু'আ করুন। তিনি দু'আ করিলেন:
اللَّهُمَّ اهْدِ ثَقِيفًا وَاتِ بِهِمْ.
“হে আল্লাহ! ছাকীফ গোত্রকে হিদায়াত দান করুন এবং অনুগত করিয়া তাহাদিগকে আমার নিকট হাযির করুন"। [আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪৭১-৪৭২]
আল্লামা ইবনুল কায়্যিম (র) বলেন, 'আল্লাহর দরবারে এই দু'আ কবুল হইয়াছিল। অথচ আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে তাহারা যুদ্ধ করিয়াছে, কতিপয় সাহাবীকে হত্যা করিয়াছে, এমনকি তাঁহার দূতকে পর্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করিয়াছে। তাহাদের ঐ অপকর্মসমূহের পরও তিনি তাহাদিগকে বদদু'আ না করিয়া তাহাদের কল্যাণ কামনা করিয়াছেন। ইহা অবশ্যই তাঁহার আশীর্বাদ, ক্ষমা ও ঔদার্যের পরিচায়ক। তাঁহার প্রতি আল্লাহর অজস্র রহমত ও শান্তি বর্ষিত হউক'। [যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ৩৫৭, বাংলা অনু.]

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হুনায়নের গনীমত সম্ভারের অভূতপূর্ব বিলিবণ্টন

📄 হুনায়নের গনীমত সম্ভারের অভূতপূর্ব বিলিবণ্টন


তায়েফ অবরোধ প্রত্যাহার করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) সদলবলে জি'রানায় ফিরিয়া আসিলেন। এখন পূর্বোল্লেখিত বিপুল সংখ্যক বন্দী ও গনীমত-সম্ভার বণ্টনের পালা। দশ-বার দিন পর্যন্ত তিনি হাওয়াযিনদের জন্য অপেক্ষা করিলেন এই ভাবিয়া যে, তাহাদের কেহ তাহার স্ত্রী-পুত্রকে মুক্ত করিয়া লইয়া যাইতেও আসিতে পারে। কিন্তু না, কেহই আসিল না। অগ্যতা রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে যোদ্ধাগণের মধ্যে ভাগ করিয়া দিলেন। [ফাতহুল বারী, ৮/৩৮; 'উয়ূনুল আছার, ২/১৯৩]
এতকাল দেখা গিয়াছে যে, গনীমত বণ্টনের সময় যুদ্ধে যোদ্ধাদের বীরত্ব ও অবদানের কথা বিবেচনায় রাখিয়া তাহা করা হইত। অনেককে তাহার অতিরিক্ত ত্যাগ ও বীরত্বের জন্য অধিক গনীমত দান করিয়া উৎসাহিত করা হইত। এইবার হইল তাহার সম্পূর্ণ বিপরীত। আজীবন ইসলামের সহিত, ইসলামের নবীর সহিত, মুসলিম জাতির সহিত যাহারা বৈরী আচরণ করিয়াছে, ষড়যন্ত্র করিয়াছে, যুদ্ধ করিয়াছে, মক্কা বিজয়ের পর মুসলমানদের জয়যুক্ত হওয়ার পর ইসলাম গ্রহণ করিয়াই তাহারা গনীমত সম্ভার হইতে অঢেল পরিমাণ লাভ করিল। সাধারণভাবে সৈনিকদের প্রত্যেকে যেখানে চারটি উট ও চল্লিশটি করিয়া ছাগল-ভেড়া পাইলেন, আর প্রতিজন অশ্বারোহী সৈন্য পাইলেন বারটি করিয়া উট ও ১টি করিয়া ছাগল-ভেড়া, সেখানে আবূ সুফ্যান ও তাহার দুই পুত্র ইয়াযীদ ও মু'আবিয়ার প্রত্যেকে পাইলেন এক শত করিয়া উট এবং চল্লিশ উকিয়া করিয়া রৌপ্য। হাকীম ইব্‌ন হিযাম দুই শত উট, হারিছ ইব্‌ন হিশাম, সুহায়ল ইবন 'আমর, সাফওয়ান ইবন উমায়্যার মত আরও অনেকে ১০০টি করিয়া উট লাভ করিলেন। কুরায়শের বাহিরের আব্বাস ইব্‌ন মিরদাসকেও ৫০টি উট দেওয়া হইল। সে তাহার কবিতায় এইজন্য অসন্তুষ্টি প্রকাশ করিলে মহানবী (স) বলিলেন, যেভাবেই হউক আমার পক্ষ হইতে তাহার রসনা কাটিয়া দাও। সাহাবাগণ তাহার সন্তুষ্টিমত তাহাকে দান করিয়া তাহার মুখ বন্ধ করিলেন। [বিস্তারিত দ্র. ফাতহুল বারী ও যুরকানী, সীরাতুন-নবী, ইন্ন হিশাম, ৮খ., পৃ. ১৫৪]
অপরদিকে দীর্ঘকাল অবধি যাহারা সুখে-দুঃখে রাসূলুল্লাহ (স)-কে সঙ্গ দিয়াছেন, প্রাণ বাজি রাখিয়া ইসলামের জন্য ইসলামের নবীর জন্য লড়িয়াছেন সেই পরীক্ষিত আনসার সাহাবীগণের ভাগে পরিমাণে কম পড়িল। ইহা তাহাদের মধ্যে দারুণ হতাশার সৃষ্টি করিল। তাহারা ভাবিলেন, মক্কাবাসী ও বিশেষত কুরায়শগণ মহানবীর স্বদেশবাসী ও আত্মীয়-স্বজন হওয়ায় বুঝি তাহাদের অগ্রাধিকার লাভের কারণ। মদীনার আনসার সাহাবীগণের বিপুল আত্মত্যাগ এবং মহানবী (সা)-এর চরম দুর্দিনে তাঁহাকে সঙ্গদান বুঝি এখন অতীতের বিষয় হইয়া গেল। তাহাদের কথাবার্তায় সেই হতাশা ফুটিয়া উঠিতে লাগিল। বুখারী বর্ণিত হাদীছে উহার সুন্দর চিত্র ফুটিয়া উঠিয়াছে। হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন, আল্লাহ তা'আলা যখন তাঁহার নবীকে হাওয়াযিনের বিপুল গনীমত-সম্ভারের অধিকারী করিলেন, আর তিনি তাহা হইতে কুরায়শদের কিছু লোককে এক শত করিয়া উট প্রদান করিলেন, তখন আনসার সম্প্রদায়ের কিছু লোক বলিতে লাগিলেন:
يغفر الله لرسول الله ﷺ يعطى قريشا ويدعنا وسيوفنا تقطر من دمائهم.
"আল্লাহ তাঁহার রাসূলকে ক্ষমা করুন! তিনি কুরায়শদিগকে দান করিয়া চলিয়াছেন আর আমাদিগকে পরিহার করিতেছেন। অথচ আমাদের তরবারিসমূহ হইতে এখনও তাহাদের রক্ত ঝরিতেছে"।
হযরত আনাস (রা) বলেন, আনসারদের অসন্তোষের কথা রাসূলুল্লাহ (স)-এর গোচরে আনা হইল। সংশয় নিরসনকল্পে তিনি লোক পাঠাইয়া চর্ম নির্মিত তাঁবুর নিচে তাহাদের সকলকে ডাকাইয়া আনিলেন এবং তাহাদের ব্যতীত আর কাহাকেও সেখানে ডাকিলেন না। সকলে সমবেত হইলে রাসূলুল্লাহ (স) আসিলেন এবং বলিলেনঃ তোমাদের পক্ষ হইতে আমি এইসব কি শুনিতেছি? তখন তাহাদের নেতৃস্থানীয়গণ বলিলেন, আমাদের মধ্যকার প্রাজ্ঞগণ কিছু বলিতেছেন না, উঠতি বয়সের যুবকরাই এইরূপ বলাবলি করিতেছে। [সহীহ বুখারী, হাদীছ নং ২৯১২]
সেই বলাবলি যে মাত্রা ছাড়াইয়া গিয়াছিল তাহার প্রমাণ বুখারীর ১৯১৫ নং হাদীছ যাহাতে বলা হইয়াছেঃ হুনায়ন যুদ্ধকালে রাসূলুল্লাহ (স) কিছু সংখ্যক লোককে প্রাধান্য দিলেন, আকরা' ইবন হাবিস ও 'উয়ায়নাকে এক শত করিয়া উট দিলেন এবং আরবের সর্দার গোত্রের লোকদিগকে বেশী বেশী দান করিলেন। তখন এক ব্যক্তি এই পর্যন্ত বলিয়া ফেলিল যে, ইহা এমন একটি বণ্টন যাহাতে সুবিচার করা হয় নাই বা আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে খেয়াল রাখা হয় নাই। কেহ কেহ তো এই কথা পর্যন্ত বলিল যে, যখন বিপদ আসে তখন আনসারদিগকে আহবান করা হয়, আর যখন গনীমত বণ্টনের পালা আসে তখন স্বজাতির লোকজনকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।
আনসারদের এইরূপ অসন্তুষ্টি যে কেবল তাহাদের নব্য যুবকদের মধ্যে ছিল তাহা ঠিক নহে। কেননা সা'দ ইবন 'উবাদা (রা)-র মত পরীক্ষিত ও প্রজ্ঞাবান নেতা রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতে হাযির হইয়া আনসারদের এই অসন্তুষ্টির কথা তাঁহাকে অবগত করিলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, আচ্ছা! অন্যরা যাহা ইচ্ছা বলুক, তোমার কী অভিমত হে সা'দ? তিনি জবাব দিলেন, আমিও তো আমার সম্পদ্রায়েরই একজন, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
নওমুসলিমরা যদি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝিতে না পারিয়া উল্টাপাল্টা মন্তব্য করে তবে তাহা মানিয়া নেওয়া যায় এইজন্য যে, জাহিলিয়াতের সমাজ হইতে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত মূল্যবোধ এখনও তাহাদের দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করিয়া রাখিয়াছে, তাহাদের কাছে মাল-দৌলত, উট, ছাগল ইত্যাদি হইতেছে প্রাধান্যের মাপকাঠি। কিন্তু পরীক্ষিত আনসারগণও যদি অনুরূপ ভুলে নিমগ্ন থাকেন, এইরূপ কথাবার্তা তাহাদের মুখ হইতেও বাহির হয় তাহা হইলে বুঝিতে হইবে তাহা ঔদ্ধত্য নয়, ভুল বুঝাবুঝি। তাই তাহাদের সন্দেহ নিরসনের জন্য আনসার নেতা উবাদা ইবনুস সামিতের মাধ্যমে তিনি কেবল আনসারগণকে এক স্থানে সমবেত করিলেন। তারপর তিনি তাহাদিগকে এই ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করিলেন, তাহারা এইরূপ জবাব দিলে মহানবী (স) বলিলেন, হে আনসারগণ! দুনিয়ার এই তুচ্ছ ক্ষণস্থায়ী সম্পদের জন্য তোমরা আমার প্রতি মনোক্ষুণ্ণ? ইহা তো আমি কেবল সেই সকল লোককেই দিয়াছি যাহারা সদ্য ইসলাম গ্রহণ করিয়াছে, যাহাদের অন্তরে এখনও ইসলামের প্রতি অনুরাগ সৃষ্টি হয় নাই। ইসলামের স্বপক্ষে তাহাদের অন্তর জয় করা কেবল ইহার উদ্দেশ্য, যাহাতে ইসলামের প্রতি বৈরিতা ত্যাগ করিয়া তাহারা আল্লাহ্ দীনের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে।
হে আনসারগণ! তোমরা কি ইহা মানিয়া নিতে পারিলে না যে, লোকজনকে উট-ছাগল দিয়া আমি ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার প্রয়াস পাইয়াছি, আর তোমাদের ইসলাম-নিষ্ঠার উপর আমি দৃঢ় আস্থা পোষণ করিয়াছি? তোমাদের কাছে ইহা কি গ্রহণযোগ্য নহে যে, লোকজন উট ছাগল লইয়া তাহাদের ঘরে ফিরিবে, আর তোমরা ফিরিবে আল্লাহ্র রাসূলকে সঙ্গে লইয়া? আল্লাহ্র কসম! যে যে পথে যাউক না কেন, আমার পথ তো ঐটাই যে পথে আনসারগণ গমন করিবে। জীবনে-মরণে সর্বাবস্থায় আমি তোমাদের সাথী।
আনসারগণ! আজ তোমরা তুচ্ছ পার্থিব সম্পদের জন্য আমার প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করিতেছ। আচ্ছা বল দেখি, আমি কি তোমাদিগকে পথহারা বিভ্রান্ত অবস্থায় পাই নাই? আল্লাহ আমার মাধ্যমে তোমাদিগকে পথের সন্ধান দিয়াছেন। তোমরা কি শতধা বিচ্ছিন্ন ছিলে না? আল্লাহ আমার মাধ্যমে তোমাদিগকে ঐক্যবদ্ধ করিয়াছেন। তোমরা কি অভাবগ্রস্ত ছিলে না? আল্লাহ আমার দ্বারা তোমাদিগকে অভাবমুক্ত ও সমৃদ্ধ করিয়াছেন। মহানবী (স)-এর প্রতিটি কথার মাঝে মাঝে সায় দিয়া তাহারা 'অবশ্যই, অবশ্যই' বলিতেছিলেন এবং তাহাদের প্রতি রাসূলুল্লাহ (স)-এর অবদানের কথা অকুণ্ঠ চিত্তে স্বীকার করিয়া যাইতেছিলেন।
রাসূলুল্লাহ (স) পুনরায় বলিলেনঃ তোমরা যথার্থভাবে বলিতে পার, যখন তোমাকে অপর সকলেই মিথ্যা প্রতিপন্ন করিয়াছে তখন আমরা তোমাকে সত্য নবী বলিয়া বরণ করিয়াছি। যখন সকলেই তোমাকে অপমান করিয়াছে, আমরা তোমাকে মর্যাদা দিয়াছি। যখন সকলেই তোমাকে দেশছাড়া করিয়াছে আমরা তোমাকে আশ্রয় দিয়াছি। ফলে তুমি অভাবগ্রস্ত ছিলে, আমরা তোমার সাহায্যার্থে আগাইয়া আসিয়াছি!
হে আনসারগণ! তোমরা আমার অন্তর্বাস, আর অন্য সকলে আমার বহির্বাস। হে আল্লাহ! আনসারদিগকে রহম করুন! আনসারদের সন্তানদের প্রতি রহম করুন! আনসারদের সন্তানদের সন্তানদের প্রতিও রহম করুন!!!
রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই মর্মস্পর্শী বক্তব্য শ্রবণে আনসারগণ অঝোর ধারায় ক্রন্দন করিতে লাগিলেন। তাঁহাদের শ্মশ্রু তাঁহাদের অশ্রুতে ভিজিয়া গেল। সকলে সমস্বরে বলিয়া উঠিলেন, আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের বণ্টনে আমরা সন্তুষ্ট। তারপর রাসূলুল্লাহ (স) প্রস্থান করিলেন এবং আনসারগণও প্রস্থান করিলেন। [আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২৯৫-৩০১; সীরাতুন নবী, ইব্‌ন হিশাম, ৪খ., পৃ. ৫৯-৬০ ই.ফা.]

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বর্ধিত দান সাফল্য আনিয়াছিল

📄 বর্ধিত দান সাফল্য আনিয়াছিল


ড. আকরম যিয়া উমারী বলেন, সর্দারদিগকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর উক্তরূপ দান ঐ সমস্ত সর্দার ও তাহাদের অনুসারিগণকে ইসলামের প্রতি আকর্ষণ করিয়াছিল এবং পরবর্তী কালে তাহারা উত্তম ও নিষ্ঠাবান মুসলমানরূপে ইসলামের জন্য লড়িয়াছেন, জানমাল দিয়া ইসলামের সেবা করিয়াছেন, অল্প কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া, যেমন 'উয়ায়না ইব্‌ন হিস্স্ন আল-ফাযারী তারপরও বৈরী-ভাবাপন্ন ছিল, যেমন ইব্‌ন হাযম বলিয়াছেন। [জাওয়ামিউস সীরা, পৃ. ২৪৮] আকরা' ইব্‌ন হাবিস (রা) পরবর্তী কালে তাঁহার দশটি সন্তানসহ ইয়ারমুকের যুদ্ধে লড়িয়াছিলেন। [তাবাকাত, ৭/৩৭; ইসতী'আব, ১/১০৩; ইসাবা, ১/৫৮; আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা আস-সাহীহা, পৃ. ৫১২]

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00