📄 অমুসলিমদের সাহায্য গ্রহণ
এই যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স) মক্কার অমুসলিমদিগকে সঙ্গে নেওয়া ছাড়াও আবু জাহলের বৈমাত্রেয় ভাই আবদুল্লাহ ইবন রাবী'আর নিকট হইতে ঋণ গ্রহণ করেন। [মুসনাদ আহমাদ, ৪খ, পৃ. ৩৬] মুসনাদের উক্ত বর্ণনায় ঐ ঋণের পরিমাণ ত্রিশ হাজার দিরহাম বলা হইলেও ইসাবায় ইমাম বুখারী প্রমুখাত বর্ণিত রিওয়ায়াতে ঐ ঋণের পরিমাণ দশ হাজার দিরহাম বলা হইয়াছে। [সীরাতুন্নবী, শিবলী, ২খ., ৫৩৩, পাদটীকায়] সাফওয়ান ইব্ন উমায়্যার কাছে প্রচুর যুদ্ধাস্ত্র মওজুদ রহিয়াছে জানিতে পারিয়া রাসূলুল্লাহ (স) তাহার নিকট যুদ্ধাস্ত্র চাহিলে সে জিজ্ঞাসা করে যে, উহা কি তাহার নিকট হইতে ছিনাইয়া লইতে চাহিতেছেন ? জবাবে রাসূলুল্লাহ (স) জানাইলেন, না, ধারস্বরূপ, ফেরত দেওয়ার নিশ্চয়তাসহ। তাহাতে সে সম্মত হইল এবং এক শত বর্ম ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য অস্ত্র দিল। [ইবন হিশাম, সীরাতুন্নবী, ৪খ, পৃ. ৯৬-৯৭]
📄 সেনাপতির আসনে গোলাম: ইসলামী সাম্যের নমুনা
রাসূলুল্লাহ (স) নিজ হাতে পতাকা বাঁধিয়া যাঁহার হস্তে এই বিশাল বাহিনীর সেনাপতির গুরুদায়িত্ব অর্পণ করিলেন তিনি যায়দ ইবন হারিছা (রা), রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুক্তদাস। এত বড় বড় বয়োজ্যেষ্ঠ সাহাবীগণ এই যুদ্ধে সাধারণ সৈনিকরূপে যোগদান করিলেন, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) সেনাপতি নির্বাচিত করিলেন এই যায়দ্যক। কুরায়শ বংশীয় আরব নেতাগণের কেহ এইজন্য অসন্তুষ্ট হইলেন না। রাসূলুল্লাহ (স) স্পষ্ট ভাষায় বলিয়া দিলেনঃ "যায়দ শহীদ হইলে তারপর জা'ফার ইবন আবী তালিব এবং সেও শহীদ হইলে আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করিবে"। [ফাতহুল বারী, ৭/৫১০; সীরাত ইবন হিশাম, ৩/৪২৮]
📄 হুনায়ন যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর পৃষ্ঠপ্রদর্শনের রহস্য
জিহাদ হইতে পলায়ন করা মহাপাপ- শিরক ও নরহত্যার সমপর্যায়ের কবীরা গুনাহ। এতদসত্ত্বেও আল্লাহর রাসূলকে রণক্ষেত্রে পরিত্যাগ করিয়া সহযোদ্ধাগণ হুনায়নের যুদ্ধ পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিলেন। ইহার রহস্য কি? সহীহ মুসলিমে ইহার কারণ বর্ণিত হইয়াছে। আবূ ইসহাক হইতে বর্ণিত, এক ব্যক্তি হযরত বারা'আ (রা)-কে জিজ্ঞাসা করিল, হুনায়নের যুদ্ধের দিন কি আপনারা পলায়ন করিয়াছিলেন? জবাবে তিনি বলিলেন, না, আল্লাহ্র কসম! রাসূলুল্লাহ (স) পৃষ্ঠপ্রদর্শন করেন নাই, বরং তাঁহার সঙ্গে তরুণরা ও অস্থিরচিত্ত ও অস্ত্রশস্ত্রবিহীন লোক যাহাদের হয় অস্ত্র একেবারে ছিল না অথবা নামমাত্র অস্ত্র ছিল তাহারাই হাওয়াযিন ও বনূ নষীরের অব্যর্থ তীরন্দাজদের তীরের সম্মুখে টিকিয়া থাকিতে না পারিয়া এইদিক সেইদিক হইয়া যায় এবং কাফিররা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে চলিয়া আসে। [মুসলিম, হুনায়ন যুদ্ধ প্রসঙ্গ, হাদীছ নং ৪৪৬৪-৪৪৬৫, ৬খ., পৃ.২৪০-২৪১]
কিছু লোক শুধু এই উদ্দেশ্যে মুসলমান পক্ষে যুদ্ধে যোগ দিয়াছিল যাহাতে ঠিক যুদ্ধের মুহূর্তে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করিয়া মুসলমানদের সাহস ও উৎসাহ-উদ্দীপনাকে বিনষ্ট করিয়া দেওয়া যায়। সহীহ মুসলিমের বর্ণনা হইতে প্রতীয়মান হয় যে, ঐ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গে অবস্থানকারী উম্মু সুলায়ম (রা) এই সত্যটি উপলব্ধি করিয়াই তাঁহাকে পরামর্শ দিয়াছিলেন: اقتل من بعدنا من الطلقاء انهزموا بك. "আমাদের ব্যতীত ঐ যে মুক্তি ও ক্ষমাপ্রাপ্ত মক্কাবাসীরা (আমাদের সহিত যুদ্ধে আসিয়াছে) উহাদের সকলকে হত্যা করুন। কারণ উহারাই আপনার পরাজয়ের হেতু"। [সহীহ মুসলিম, হাদীছ নং ৪৫২৯, পুরুষদের সহিত স্ত্রীলোকের যুদ্ধযাত্রা প্রসঙ্গ]
সহীহ মুসলিমের ভাষ্যকার ইমাম নববী (র) লিখেন, ঐ সময়ে সকলেই পলায়ন করেন নাই, বরং মক্কার ঐ সকল লোক যাহাদের হৃদয় জয়ের উদ্দেশ্যে ধন-সম্পদ দান করা হইয়াছিল এবং তাহাদের মধ্যকার পৌত্তলিকরা যাহারা তখনও ইসলাম গ্রহণ করে নাই, তাহারাই পলায়ন করিতে শুরু করে। এই অভাবনীয় পরাজয় এজন্য হইয়াছিল যে, শত্রুপক্ষ অতর্কিতে তীর নিক্ষেপ করিতে থাকে এবং মুসলিম বাহিনীতে মক্কার এমন লোকেরাও ছিল যাহাদের অন্তরে ইসলামের বিশ্বাস বদ্ধমূল হয় নাই এবং তাহারা এই অপেক্ষায় ছিল যে, কখন মুসলমানদের উপর বিপদ নামিয়া আসিবে এবং তাহাদের মধ্যে এমন নারী এবং শিশুও ছিল যাহারা কেবল গনীমত সম্ভারের লোভে ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিল। [মুসলিম, গাযওয়া হুনায়ন প্রসঙ্গ, তথ্যসূত্র সীরাতুন্নবী, পৃ. ৫২৫, পাদটীকা]
ইবন ইসহাক ও ইবন সা'দ-এর বর্ণনা হইতে জানা যায় যে, এমন লোকও হুনায়ন যুদ্ধে মুসলমানদের পক্ষ সাজিয়া যোগদান করিয়াছিল যাহার সঙ্কল্প ছিল নবী করীম (স)-কে সুযোগ বুঝিয়া আঘাত করা। তাহারা উভয়ে বর্ণনা করিয়াছেন, শায়বা ইব্ন উছমান ইব্ন আবূ তালহা বর্ণনা করেন, আমি সংকল্প করিলাম যে, কুরায়শদের সহিত আমিও হুনায়নে যাইব এবং সুযোগ পাইলেই মুহাম্মাদকে হত্যা করিয়া কুরায়শগণের রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণ করিব। আমি মনে মনে সঙ্কল্প করিলাম, আরব-আজম সকলেও যদি মুহাম্মাদের অনুসারী হইয়া যায় আমি কস্মিনকালেও তাঁহার আনুগত্য স্বীকার করিব না। তারপর রণক্ষেত্রে গিয়া আমি মওকা খুঁজিতে লাগিলাম।
📄 তায়েফের পথে দুইটি সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ
সামরিক দিক হইতে কৌশলপূর্ণ দুইটি কাজ তায়েফে সম্পন্ন করা হয়। একটি হইল সেখানে অবস্থিত আওফ ইবন মালিকের দুর্গ ধ্বংস করা, আর অপর কাজটি হইল ছাকীফ গোত্রের এবং তাহাদের সম্ভাব্য সাহায্যকারী হাওয়াযিন গোত্রের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান গ্রহণ, যাহাতে ছাকীফদের সাহায্যার্থে তাহারা আগাইয়া আসিতে না পারে। [আস্-সীরাতুন নাবাবিয়্যা আস্-সাহীহা, ২খ., পৃ. ৫০৮] তুফায়ল ইবন 'আমর দাওসী যুল-কাফফায়ন বিগ্রহটি ভস্মীভূত করিয়া আসার সময় সেখান হইতে মিনজানীক নামক কামান সদৃশী লোষ্ট্র নিক্ষেপক যন্ত্র ও ট্যাংক সদৃশ দাব্বাবা যন্ত্র লইয়া আসেন। [আসাহহুস্ সিয়ার, পৃ. ২৮৮]
আল-ওয়াকিদীর বর্ণনা হইতে প্রতীয়মান হয় যে, মিনজানীক ও দাব্বাবা দুইটি জারাশ হইতে লইয়া আসিয়াছিলেন হযরত খালিদ ইব্ন সাঈদ ইবনুল 'আস (রা)। অন্য বর্ণনা হইতে জানা যায় যে, হযরত সালমান ফারসী (রা) নিজ হাতে মিনজানীক নির্মাণ করেন। [কিতাবুল মাগাযী, ৩/৯২৭; আস্-সীরাতুন নাবাবিয়্যা আস-সাহীহা, পৃ. ৫০৯, পাদটীকায়]
রাসূলুল্লাহ (স) তায়েফ অবরোধ করিলেন। হুনায়ন যুদ্ধে পরাজিত পৌত্তলিকগণ তাহাদের সর্দার আওফ ইবন মালিকের নেতৃত্বে দুর্গাভ্যন্তরে ঢুকিয়া পড়িল। ইসলামের ইতিহাসে প্রথমবারের মত রাসূলুল্লাহ (স) মিনজানীক ও দাব্বাবা ব্যবহারের দ্বারা দুর্গ ধ্বংসের প্রয়াস পাইলেন। মিনজানীক দ্বারা দূর হইতে বিশালাকার শিলাখণ্ড নিক্ষেপ করা যাইত। আর অনেকটা সিন্দুকের মত কাষ্ঠ নির্মিত দাব্বাবার মধ্যে প্রবেশ করিয়া শত্রু দুর্গমূলে পৌঁছিয়া শাবল ইত্যাদির সাহায্যে দুর্গ প্রাচীর ধ্বংসের কাজ করা যাইত। কিন্তু রণকুশলী তায়েফবাসীরা দুর্গাভ্যন্তর হইতে উত্তপ্ত লৌহশলাকা নিক্ষেপ করিয়া দাব্বাবায় অগ্নিসংযোগ করিতে থাকিলে উহাতে অবস্থান করা আর সম্ভব হইয়া উঠিল না। দাব্বাবা হইতে বাহির হইলেই তাহারা অব্যর্থ শর নিক্ষেপে যোদ্ধা সাহাবীগণকে হত্যা করিত। শেষ পর্যন্ত কুড়ি দিনের অবরোধের পর তাহা প্রত্যাহার করিয়া লইতে হয়।
শত্রুদিগকে কাবু করার উদ্দেশ্যে তাহাদের দীর্ঘকালের পরিশ্রমে লালিত দ্রাক্ষাকুঞ্জসমূহে অগ্নিসংযোগ করা হইলে দুর্গাভ্যন্তর হইতে অসহায়ের মত তাহারা তাহা প্রত্যক্ষ করে এবং তীব্র মর্মপীড়ায় ভুগিতে থাকে। শেষ পর্যন্ত তাহাদের অনুনয়-বিনয়ে দয়াপরবশ হইয়া রহমতের নবী ঐ যুদ্ধাবস্থায়ও শত্রুদের অনুরোধ রক্ষা করেন এবং উহা হইতে বিরত থাকেন। [বায়হাকীর সুনানুল কুবরা, ৯/৮৪; কিতাবুল উন্ম, ৭/৩২৩; আস-সীরাতুন নাবabія আস্-সাহীহা, ২খ., পৃ. ৫০৯]
দুর্গের বাহির হইতে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করিয়া দেওয়া হইল, যে সমস্ত দাস দুর্গ হইতে বাহির হইয়া আসিবে তাহাদিগকে মুক্ত করিয়া দেওয়া হইবে। ইহার চমৎকার ফল ফলিল। পরবর্তী কালের বিখ্যাত সাহাবী আবূ বাকরাসহ কুড়িজন, মতান্তরে ২২জন দাস বাহির হইয়া আসিলেন এবং চিরতরে দাসত্ব মুক্ত হইয়া গেলেন। [মুসনাদ আবদুর রায্যাক, ৫/৩০১; ফাতহুল বারী, ৮/৪৬; বুখারী, ৫/১২৯]
বাহ্যত তায়েফ অবরোধ নিষ্ফল প্রতিপন্ন হইল। কিন্তু আল্লাহ্র রাসূল (স) প্রত্যাবর্তনকালে সহযোদ্ধা সাহাবীগণকে বলিলেন, আল্লাহ্র দরবারে নিবেদন কর :
ائبون تائبون عابدون لربنا حامدون
"আমরা প্রত্যাবর্তনকারী, তওবাকারী, ইবাদতগুযার এবং নিজেদের প্রভুর প্রশংসাকারী"। এই সময় রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলা হইল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! বানু ছাকীফকে বদদু'আ করুন। তিনি দু'আ করিলেন:
اللَّهُمَّ اهْدِ ثَقِيفًا وَاتِ بِهِمْ.
“হে আল্লাহ! ছাকীফ গোত্রকে হিদায়াত দান করুন এবং অনুগত করিয়া তাহাদিগকে আমার নিকট হাযির করুন"। [আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪৭১-৪৭২]
আল্লামা ইবনুল কায়্যিম (র) বলেন, 'আল্লাহর দরবারে এই দু'আ কবুল হইয়াছিল। অথচ আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে তাহারা যুদ্ধ করিয়াছে, কতিপয় সাহাবীকে হত্যা করিয়াছে, এমনকি তাঁহার দূতকে পর্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করিয়াছে। তাহাদের ঐ অপকর্মসমূহের পরও তিনি তাহাদিগকে বদদু'আ না করিয়া তাহাদের কল্যাণ কামনা করিয়াছেন। ইহা অবশ্যই তাঁহার আশীর্বাদ, ক্ষমা ও ঔদার্যের পরিচায়ক। তাঁহার প্রতি আল্লাহর অজস্র রহমত ও শান্তি বর্ষিত হউক'। [যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ৩৫৭, বাংলা অনু.]