📄 ইয়াহুদী নেতার কন্যার উম্মুল মুমিনীনের মর্যাদা লাভ
খায়বার বিজিত হইল। খায়বারের ইয়াহুদী নেতা হুয়াই ইব্ন আখতাব, যে মক্কার কুরায়শ কুলকে, আরবের বিভিন্ন পৌত্তলিক গোত্র ও ইয়াহুদী গোত্রসমূহকে ইসলামের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করার এবং ইসলামকে চিরতরে ধরাপৃষ্ঠ হইতে মিটাইয়া দেওয়ার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়াছিল, সে নিহত হইয়াছে। তাহারই কন্যা সাফিয়্যা মুসলমানদের হাতে বন্দী হইলেন।
পিতা, ভ্রাতা, আত্মীয়-স্বজনের নিহত হওয়ার ফলে হিংসা ও ঘৃণায় সাফিয়্যার মন রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি অতিশয় বিরুপ হইয়া উঠিয়াছিল। তাই মনের গতি পরিবর্তনের জন্য রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে আনাসের মাতার তত্ত্বাবধানে রাখিয়াছিলেন। বিশেষ আদর-যত্নে থাকায় তাহার মনের পরিবর্তন ঘটিলে তিনি এক শুভ মুহূর্তে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে মুক্ত করিয়া তাহার সহিত পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হইলেন। প্রত্যাবর্তন পথে আস-সাহ্হ্বা নামক স্থানে শাদী মুbarak সুসম্পন্ন হইল। তিনি সেখানে তিন দিন অবস্থান করেন। দাসত্বমুক্তিই ছিল তাঁহার মোহরানা। এইরূপ মোহরানা আদায় করা রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য জায়েয ছিল। হযরত সাফিয়্যা স্বয়ং বর্ণনা করিয়াছেন, বন্দিনী অবস্থায় আমাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট উপস্থিত করা হইল। পিতা, ভ্রাতা ও কওমকে কতল করার দরুন তিনি আমার নিকট ঘৃণ্যতম মনে হইতেছিলেন। কিন্তু তাঁহার অমায়িক ব্যবহারে আমি বিমোহিত হইয়া পড়িলাম। আমার অন্তর হইতে হিংসা চিরতরে মুছিয়া গেল। এক্ষণে তিনি আমার নিকট সারা জাহানের মধ্যে সর্বাধিক প্রিয়। [সাইয়েদুল মুরসালীন, ২খ., পৃ. ৮২৭]
আল্লামা শিবলী নু'মানী এই প্রসঙ্গে লিখেন, "বলা বাহুল্য, হযরত সাফিয়্যা (রা)-কে খান্দানের ধ্বংসের পর খান্দানের বাহিরে কাহারও স্ত্রী বা বাঁদী হইয়া থাকিতে হইত। তিনি ছিলেন খায়বারের রঈস-দুহিতা, তাহার স্বামীও বনূ নযীর গোত্রের রঈস ছিল। পিতা ও স্বামী দুইজনই নিহত। এমতাবস্থায় তাহার মন রক্ষা, মর্যাদা রক্ষা এবং বিষাদ দূরীকরণের ইহা ছাড়া আর কোন উত্তম উপায় ছিল না যে, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে সহধর্মিনী ও জীবন-সঙ্গিনীরূপে বরণ করিলেন। তিনি তাহাকে বাঁদীরূপেও রাখিতে পারিতেন, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) তাহার বংশকৌলিন্যের দিকে লক্ষ্য করিয়া তাহাকে আযাদ করিয়া দেন, তারপর যথারীতি বিবাহ করিলেন। মুসনাদে আহমাদ ইব্ন হাম্বল-এর বর্ণনা অনুযায়ী তিনি তাহাকে স্বাধীন হইয়া নিজের পরিবারে চলিয়া যাওয়ার অথবা তাহাকে পতিরূপে বরণের মধ্যে কোন একটি প্রস্তাব বাছিয়া লওয়ার এখতিয়ার দান করেন। সদাচরণ, করুণা, বিপন্নের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন ছাড়াও রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দিক হইতেও তাঁহার এইরূপ আচরণ অত্যন্ত সঙ্গত ও যথার্থ ছিল। এই জাতীয় কর্মপদ্ধতির ফলে আরবগণ ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট ও মোহিত হইত। তাহারা বিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করিত যে, ইসলাম তাহার শত্রুদের উত্তরাধিকারীদের প্রতি কিরূপ সদয় ও সহানুভূতিশীল! বনূ মুসতালিকের যুদ্ধে হযরত জুওয়ায়রিয়া (রা)-এর সহিতও অনুরূপ আচরণ করা হইয়াছিল। [শিবলী, সীরাতুন্নবী, ১খ., পৃ. ৪৯২, ৫ম সংস্করণ, আলীগড়]
📄 যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলমানদের সহনশীলতা ও পরধর্মের প্রতি সম্মান প্রদর্শন
ইয়াহুদীদের ইসলাম বৈরিতা ছিল সর্বজনবিদিত। আল-কুরআনে বলা হইয়াছে:
لَتَجِدَنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَدَاوَةً لِّلَّذِينَ آمَنُوا الْيَهُودَ وَالَّذِينَ أَشْرَكُوا .
"অবশ্য মু'মিনদের প্রতি শত্রুতায় মানুষের মধ্যে ইয়াহুদী ও মুশরিকদিগকে তুমি সর্বাধিক উগ্র দেখিবে"। [৫:৮২]
আল্লাহর কিতাব আল-কুরআন যেহেতু মুসলমানদের পথপ্রদর্শক, অমুসলিমদের অনেকেই এই কিতাবখানির প্রতি বিদ্বেষভাবাপন্ন। বুখারী শরীফে বর্ণিত হইয়াছে:
عن عبد الله بن عمر أن رسول الله ﷺ نهى ان تسافر بالقرآن الى ارض العدو.
"আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) বিধর্মী শত্রুদের ভূমিতে কুরআনসহ গমন করিতে বারণ করিয়াছেন"। [সহীহ বুখারী, হাদীছ নং ২৭৬৯, কিতাবুল জিহাদ]
শত্রুদের হাতে আল-কুরআনের অবমাননার আশঙ্কা থাকার কারণেই যে এই নিষেধাজ্ঞা তাহা বলাই বাহুল্য। কিন্তু ইসলামে অন্য ধর্মের বা তাহাদের ধর্মগ্রন্থের অবমাননা করার অনুমতি নাই। তাই খায়বার যুদ্ধে তাওরাতের কয়েকটি কপি মুসলমানদের হস্তগত হইলে ইয়াহুদীরা সেইগুলি তাহাদের নিকট ফিরাইয়া দেওয়ার আবেদন জানাইলে রাসূলুল্লাহ (স) সসম্মানে সেইগুলি ফেরত দানের নির্দেশ দিলেন। [তারীখুল খামীস, ২খ., পৃ. ৬০]
তারীখুল ইয়াহুদ ফী বিলাদিল 'আরাব গ্রন্থের (পৃ. ১৭০) বরাতে আল্লামা আবুল হাসান আলী নদবী ইয়াহুদী পণ্ডিত ডঃ ইসরাঈল ওয়েলফিন্সন-এর মন্তব্য উদ্ধৃত করিয়াছেন এইভাবে:
"এই ঘটনা থেকে আমরা পরিমাপ করতে পারি যে, এইসব ধর্মীয় সহীফার প্রতি রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্তরে কোন পর্যায়ের শ্রদ্ধাবোধ ছিল। তাঁর এই উদারতা ও সহনশীলতার বিরাট প্রভাব পড়ে ইয়াহুদীদের ওপর। তারা তাঁর এই বদান্যতা ভুলতে পারে না যে, তিনি তাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থের সঙ্গে এমন কোন আচরণ করেননি যা দ্বারা তার অসম্মান হয়। এর বিপরীতে তাদের সেই ঘটনা বেশ ভালই মনে আছে যখন রোমানরা খৃ. পূর্ব ৭০ সনে জেরুসালেম জয় করে ঐসব পবিত্র সহীফায় অগ্নিসংযোগ করে এবং সেসব পদদলিত করে। ঠিক তেমনি ঈর্ষাকাতর ও উগ্র সাম্প্রদায়িক খৃস্টানরা স্পেনে ইয়াহুদীদের উপর জুলুম-নির্যাতন চালানোকালীন তাওরাতের সহীফাগুলোকে অগ্নিদগ্ধ করে। এই সেই বিরাট পার্থক্য যা ঐসব বিজয়ী (যাদের কথা একটু ওপরে বলা হল) এবং ইসলামের নবীর মধ্যে দেখতে পাই”। [নবীয়ে রহমত, বাংলা অনু., পৃ. ৩২৭]