📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 গনীমত ও ফায়

📄 গনীমত ও ফায়


ইসলামের প্রথম যুগে বেতনভোগী নিয়মিত সেনাবাহিনীর কোন অস্তিত্ব ছিল না। প্রতিটি সামর্থ্যবান মুসলমানই ছিলেন এক একজন যোদ্ধা-মুজাহিদ। যুদ্ধলব্ধ সম্পদের সবকিছুই রাসূলুল্লাহ (স)-এর হাতে তুলিয়া দেওয়া হইত। ঈমানদারগণ নামায-রোযার মত ইবাদত হিসাবে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে জিহাদে গমন করিতেন, সম্পদ লাভের লোভে বা মোহে নহে। গনীমত ছিল তাহাদের বাড়তি পুরস্কারস্বরূপ। তাই সূরা আল-আনফালের শুরুতেই ইরশাদ হইয়াছে:
يَسْتَلُونَكَ عَنِ الْأَنْفَالِ قُلِ الْأَنْفَالُ لِلْهِ وَالرَّسُولِ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَصْلِحُوا ذَاتَ بَيْنِكُمْ وأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ إِنْ كُنْتُمْ مُّؤْمِنِينَ.
"লোকে তোমাকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বল, যুদ্ধলব্ধ সম্পদ আল্লাহ এবং রাসূলের। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, নিজেদের মধ্যে সদ্ভাব স্থাপন কর এবং আল্লাহ ও তদীয় রাসূলের আনুগত্য কর যদি তোমরা মু'মিন হও"। [৮:১]
লক্ষণীয় যে, প্রশ্নটি আসলে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সংক্রান্ত, কিন্তু আল্লাহ তা'আলা উহাকে গনীমত না বলিয়া 'আনফাল' বলিয়াছেন। আনফাল শব্দটি 'নফল'-এর বহুবচন। নফল অর্থ বাড়তি বা ফাও। এই শব্দ ব্যবহারই ইঙ্গিত করিতেছে যে, গনীমত কোন অবশ্য প্রাপ্য সম্পদ নহে। উহা একান্তই মহান আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের মালিকানা ও এখতিয়ারধীন। মুসলিম যোদ্ধাগণ উহা লাভ করেন বাড়তি বা অতিরিক্ত প্রাপ্য সম্পদস্বরূপ। উহা আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ মাত্র, দাবি করিয়া আদায় করিয়া লওয়ার বস্তু নহে।
যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সংক্রান্ত প্রাচীন যুগের নিয়ম সম্পর্কে বাইবেল বিশারদগণের বক্তব্য অনেকটা এইরূপঃ By ancient custom a special share of booty taken in warfalk to the commander, he has the first choice, and in old Arabia was entitled to a forth of the whole. In ancient Israel the practice was similar (Cheyene and Black's Encyclopedia Biblica (Black, London, c. 4905) ।
"প্রাচীন রীতি অনুযায়ী যুদ্ধলব্ধ সম্পদের একটি বিশেষ অংশ পাইতেন সেনাপতি, প্রথম তাঁহার চাহিদাই বিবেচ্য ছিল। প্রাচীন আরবেও সেনাপতি মোট যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক-চতুর্থাংশের অধিকারী হইত। প্রাচীন ইসরাঈলেও অনুরূপ রীতি ছিল"।
বাইবেল অভিধানেও আছে যে, ইস্রাইলে, Booty was to be divided in equal shares between those who went into the battle and those who guarded the camp. A chosen part was sometimes dedicated to the Lord, or reserved for a leader (Hasting's Dictionary of the Bible, Clark, London, vol. vi, page 895)।
"যুদ্ধলব্ধ সম্পদ যাহারা যুদ্ধে গমন করিত এবং যাহারা তাঁবু রক্ষায় নিয়োজিত থাকিত তাহাদের মধ্যে সমভাবে বিভাজ্য ছিল। কখনও কখনও ইহার একটি বিশেষ অংশ 'প্রভু'-এর উদ্দেশ্যে নিবেদিত হইত বা নেতার জন্য সংরক্ষিত থাকিত"।
পক্ষান্তরে উপরিউক্ত আয়াতে মুসলমান যোদ্ধাগণকে নীতিগতভাবে জানাইয়া দেওয়া হইল যে, যুদ্ধলব্ধ সম্পদের প্রকৃত মালিক আল্লাহ ও তদীয় রাসূল (স)।
গনীমত সংক্রান্ত প্রশ্নটি প্রথমে দেখা দেয় যখন বদর যুদ্ধে বিজয়ের পর প্রভূত সম্পদ মুসলমানদের হস্তগত হয়। আল্লামা শাব্বীর আহমাদ উছমানী (র) এই সম্পর্কে লিখেন, বদর যুদ্ধে গনীমতস্বরূপ প্রাপ্ত সম্পদের মালিকানা সম্পর্কে সাহাবীগণের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। যুবকগণ যাহারা যুদ্ধের অগ্রভাগে থাকিয়া লড়াই করিয়াছিল তাহারা নিজদিগকেই গোটা গনীমত সম্ভারের অধিকারী বলিয়া মনে করিতেছিল। প্রবীণগণ যাহারা তাহাদের পশ্চাতে থাকিয়া শক্তি ও সাহস যোগাইতেছিলেন তাহাদের বক্তব্য ছিল, আমাদের সহযোগিতায়ই তো এই বিজয় অর্জিত হইয়াছে, তাই গনীমত আমাদেরই প্রাপ্য। আবার যাহারা নবী করীম (স)-এর হিফাযতে নিযুক্ত ছিলেন তাহাদের ধারণা ছিল যে, গনীমতের আসল হকদার তাহারাই।
আয়াতে স্পষ্ট জানাইয়া দেওয়া হইল যে, কাহারও বীরত্ব বা কাহারও বুদ্ধি-পরামর্শ- পৃষ্ঠপোষকতায় যুদ্ধে বিজয় অর্জিত হয় নাই। উহা কেবল আল্লাহ্ তা'আলার মদদেই সম্ভবপর হইয়াছে। তাই গনীমত সম্ভারের মালিক আল্লাহই এবং রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার নায়েব। তাই যেভাবে আল্লাহ তদীয় রাসূল (স) মারফত হুকুম দিবেন, ঠিক সেইভাবেই উহার বিলি-বণ্টন হইবে। মুসলমানদের কাজ হইল, আল্লাহকে ভয় করিয়া নিজেদের পরস্পরিক সম্পর্ক – সৌহার্দ বজায় রাখিয়া নিজেদের মন-মর্জি ও অভিমত বিসর্জন দিয়া একমাত্র তাঁহারই নির্দেশিত পথে চলা, সর্ব ব্যাপারে আল্লাহ্র উপর ভরসা করা, আল্লাহ্র সন্তুষ্টি ও মাগফিরাত লাভে সচেষ্ট থাকা। [তাফসীরে উছমানী, সূরা আনফালের প্রথম পাদটীকা] তারপর ঐ সূরা আনফালেরই ৪১ নং আয়াতে ইরশাদ হইয়াছে:
وَاعْلَمُوا أَنَّمَا غَنِمْتُمْ مِّنْ شَيْءٍ فَأَنَّ لِلَّهِ خُمُسَهُ وَلِلرَّسُولِ وَلِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتْمَى وَالْمَسَاكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ أَنْ كُنْتُمْ أَمَنْتُمْ بِاللهِ وَمَا أَنْزَلْنَا عَلَى عَبْدِنَا يَوْمَ الْفُرْقَانِ يَوْمَ الْتَقَى الْجَمْعُنِ وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ.
"আরও জানিয়া রাখ যে, যুদ্ধে তোমরা যাহা লাভ কর উহার এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহ্, রাসূলের, রাসূলের স্বজনদের, ইয়াতীমদের, মিসকীনদের এবং পথচারীদের। যদি তোমরা ঈমান রাখ আল্লাহ এবং তাহাতে যাহা মীমাংসার দিন আমি আমার বান্দার প্রতি অবতীর্ণ করিয়াছি যেই দিন দুই দল পরস্পরের সম্মুখীন হইয়াছিল এবং আল্লাহ সর্ববিষয়ে শক্তিমান"। [৮:৪১]
বিনা যুদ্ধে যে সমস্ত সম্পদ শত্রুপক্ষের দখল হইতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর মালিকানাধীনে আসে, আল-কুরআনের ভাষায় উহাই হইতেছে 'ফায়'। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَى رَسُولِهِ مِنْهُمْ فَمَا أَوْجَفْتُمْ عَلَيْهِ مِنْ خَيْلٍ وَلَا رِكَابٍ وَلَكِنَّ اللَّهَ يُسَلِّطُ رُسُلَهُ عَلَى مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ.
"আল্লাহ্ ইয়াহুদীদের নিকট হইতে তাঁহার রাসূলকে যে ফায় দিয়াছেন তাহার জন্য তোমরা অশ্বে কিংবা উষ্ট্রে আরোহণ করিয়া যুদ্ধ কর নাই। আল্লাহ তো যাহার উপর ইচ্ছা তাঁহার রাসূলদিগকে কর্তৃত্ব দান করেন; আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান"। [৫৯:৬]
এই ফায় ব্যয়ের খাতসমূহও আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করিয়া দিয়াছেন পরবর্তী আয়াতেঃ مَا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَى رَسُولِهِ مِنْ أَهْلِ الْقُرَى فَلِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ وَلِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسْكِينِ وَابْنَ السَّبِيل.
"আল্লাহ জনপদবাসীদের নিকট হইতে তাঁহার রাসূলকে যাহা কিছু দিয়াছেন তাহা আল্লাহর, তদীয় রাসূলের, রাসূলের স্বজনগণের, ইয়াতীমদের, অভাবগ্রস্ত ও পথচারীদের"। [৫৯: ৭]
উহার উদ্দেশ্যও আল্লাহ তা'আলা ব্যক্ত করিয়া দিয়াছেন ঐ আয়াতের শেষাংশেঃ كَيْ لَا يَكُونُ دُولَةً بَيْنَ الْأَغْنِيَاء مِنْكُمْ.
"যাহাতে তোমাদের মধ্যে যাহারা বিত্তবান, কেবল তাহাদের মধ্যেই ঐশ্বর্য আবর্তন না করে"। [৫৯:৭]

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 খায়বারের গনীমত বণ্টন

📄 খায়বারের গনীমত বণ্টন


খায়বার বিজয়ের পর যে দুর্গগুলি ও জমিজমা ভাগবণ্টন করা হয় নাই, সহীহ রিওয়ায়াতসমূহে ঐগুলিকে 'ফায়' বলা হইয়াছে। ফাদাকের অর্ধেক জমি এবং ওয়াদিল কুরার এক-তৃতীয়াংশ বিনাযুদ্ধে চুক্তির মাধ্যমে অর্জিত হয় বিধায় ঐগুলিকেও ফায় বলা হইয়াছে। [আসাহ্হুস্ সিয়ার, পৃ. ৩৬৬-৩৬৭] বনূ নাযীরের পরিত্যক্ত জমিজমাও ফায় ছিল। [ঐ, পৃ. ২১৪]
খায়বারের সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল ভূমি ও বাগ-বাগিচা। ভূ-সম্পদ ব্যতীত অন্যান্য সকল সম্পদ রাসূলুল্লাহ (স) কুরআনের নির্দেশানুযায়ী যোদ্ধাগণের মধ্যে ভাগবণ্টন করিয়া দেন এবং ভূ-সম্পদ কেবল হুদায়বিয়ার অভিযানে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বণ্টন করেন। [ইমাম তাহাবী (শারহু মা'আনিল আছার, ১খ., পৃ. ৩১৬]
উল্লেখ্য, হুদায়বিয়া অভিযানের সময় কেবল নিষ্ঠাবান ঈমানদার সাহাবীগণই রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহযাত্রী হইয়াছিলেন, দুর্বল চিত্তের লোকজন নানা ছল-ছুতায় উহাতে অংশগ্রহণ হইতে বিরত থাকে। ঐ অভিযানকালেই খায়বার বিজয়ে প্রচুর গনীমত লাভের সুসংবাদ দেওয়া হইয়াছিল। ঐ সময় ঘোষণা করিয়া দেওয়া হয় যে, খায়বারের গনীমত-সম্ভার কেবল হুদায়বিয়ার সহযাত্রীদের মধ্যেই ভাগবণ্টন করা হইবে, অন্য কেহ ইহার অংশ পাইবে না। [ইযালাতুল খিফা, ১খ., পৃ. ৩৮]
সুনান আবূ দাউদে ও মুসতাদরাক হাকেমে খায়বারের ভূ-সম্পদ বণ্টনের বিবরণ রহিয়াছে। মহানবী (স) খুমুস বাহির করার পর খায়বারের সমস্ত ভূ-সম্পদকে ৩৬ ভাগ করিয়া উহার অর্ধেক ১৮ ভাগ জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য রাখিয়া অবশিষ্ট ১৮ ভাগ মুজাহিদগণের মধ্যে প্রতি ভাগ ১০০ অংশ করিয়া বিভক্ত করিয়া দেন। [সুনান আবূ দাউদ, ৩/৪১৩; হাকেম, আল-মুসতাদরাক, ২/১৩১]
মুজাহিদদের সংখ্যা ছিল ১৫০০। তন্মধ্যে ৩০০ জন ছিলেন আরোহী। রাসূলুল্লাহ (স) প্রত্যেক পদাতিককে এক ভাগ হিসাবে এবং প্রতি আরোহী সৈন্যকে দুই ভাগ করিয়া প্রদান করেন। এইভাবে ৩০০×২=৬০০ এবং বার শত পদাতিকের বার শত, মোট ১৮ শত ভাগ হইল। [বাযলুল মাজহুদ, ৪খ., পৃ. ১৪৬; ইব্‌ন হিশাম, সীরাতুন্নবী, বঙ্গানু., ৩/ ৩৭২, ইফাবা]

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কূটনৈতিক কৌশলের মাধ্যমে শত্রু কবলিত এলাকা হইতে সম্পদ উদ্ধার

📄 কূটনৈতিক কৌশলের মাধ্যমে শত্রু কবলিত এলাকা হইতে সম্পদ উদ্ধার


পূর্বেই উক্ত হইয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) যুদ্ধকে কূটনৈতিক কৌশল বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। খায়বার যুদ্ধ জয়ের অব্যাহিত পরে এবং মক্কায় সেই সংবাদ পৌঁছিবার পূর্বেই হাজ্জাজ ইব্‌ন ঈলাত নামক একজন সদ্য ইসলাম গ্রহণকারী সাহাবী রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে আরয করিলেন যে, মক্কায় কুরায়শদের কাছে তাহার প্রচুর সম্পদ রহিয়া গিয়াছে। তিনি ইসলাম গ্রহণ করিয়াছেন জানিতে পারিলে অন্যরা তো বটেই, তাহার নিজ স্ত্রীও সম্পদ ফেরত দিবে না। এমতাবস্থায় পূর্বাহ্নেই মক্কায় গিয়া কূটনৈতিক চাল না চালিলে তাহার সম্পদ উদ্ধারের কোনই পথ নাই। তিনি বলিলেন, আমাকে অনুমতি দেওয়া হউক, প্রয়োজনে কিছু উল্টাপাল্টা কথাও যেন আমি বলিতে পারি। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে সেই অনুমতি দিলে তিনি সত্বর মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হইলেন।
হাজ্জাজ বলেন, তারপর আমি বাহির হইয়া পড়িলাম। ছানিয়াতুল বিদায় পৌঁছিতেই কুরায়শের কয়েক ব্যক্তির সহিত আমার সাক্ষাত হইল। তাহারা আমার ইসলাম গ্রহণের সংবাদ জানিত না। তাহারা রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর ব্যাপারে লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করিতেছিল। আমাকে দেখিয়াই তাহারা বলিয়া উঠিল, এই যে হাজ্জাজ ইব্‌ন ঈলাত! নিশ্চয় তাহার কাছে সংবাদ পাওয়া যাইবে। তাহারা বলিল, হে আবূ মুহাম্মাদ! আমরা তো সংবাদ পাইয়াছি যে, ঐ ডাকাতটা খায়বার যাত্রা করিয়াছে, আর খায়বার হইতেছে ইয়াহুদী জনপদ ও হিজাযের সমৃদ্ধতম এলাকা। আমাদিগকে তাহার সংবাদ জানাও। হাজ্জাজ বলেন, আমিও এইরূপ শুনিয়াছি। আমার কাছে এমন আরও সংবাদ আছে যে, তোমরা তাহা শুনিলে আনন্দিত হইবে। তারপর সেই শুভ সংবাদটি কী জানিবার জন্য কুরায়শরা আমার উটের চারিপাশে ভিড় জমাইল। হাজ্জাজ বলেন, আমি বলিলাম, সে এমন শোচনীয় পরাজয়ই বরণ করিয়াছে যেরূপ পরাজয়ের কথা তোমরা কোন দিন শুন নাই। তাহার সঙ্গী-সাথীরা শোচনীয়ভাবে নিহত হইয়াছে। মুহাম্মাদ তাহাদের হাতে বন্দী। মক্কাবাসীরা যাহাতে প্রকাশ্যে তাহাকে হত্যা করিয়া তাহাদের আত্মীয়-স্বজনকে হত্যার প্রতিশোধ তিল তিল করিয়া গ্রহণ করিতে পারে এইজন্য তাহারা নিজেরা তাহাকে হত্যা না করিয়া শীঘ্রই মক্কাবাসীদের হাতে হস্তান্তর করিবে। মক্কার কাফিররা এই সংবাদে উল্লাসে ফাটিয়া পড়িল। তাহারা বলাবলি করিতে লাগিল, শীঘ্রই তাহারা বন্দী মুহাম্মাদকে নিজেদের হাতের মুষ্টিতে পাইতে যাইতেছে।
আমি বলিলাম, মক্কায় ছড়াইয়া-ছিটাইয়া থাকা আমার অর্থসম্পদ উদ্ধারে তোমরা আমাকে একটু সাহায্য কর এবং আমার খাতকদিগকে চাপ দিয়া আমার পাওনাগুলি উশুল করিয়া দাও! আমি খায়বারে সর্বাগ্রে পৌঁছিয়া অন্যান্য ব্যবসায়ীদের পূর্বেই পরাজিত মুহাম্মাদ ও তাহার দলবলের মালপত্র কিনিয়া লইতে আগ্রহী। আমার কথায় তাহারা এতই উৎসাহিত হইল যে, অভাবনীয় স্বল্প সময়ের মধ্যে তাহারা আমার পাওনাগুলি আদায় করিয়া দিল। তারপর আমি আমার সঙ্গিনীটির কাছে গিয়াও অনুরূপ বলিয়া তাহার কাছে রক্ষিত আমার অর্থ-সম্পদ তাড়াতাড়ি দিয়া দেওয়ার জন্য বলিলাম।
আমি তখন ব্যবসায়ীদের একটি তাঁবুতে অবস্থান করিতেছিলাম। আমার মুখ হইতে প্রচারিত সংবাদ মক্কার আনাচে-কানাচে স্বল্প সময়ের মধ্যে পৌছিয়া গেল। নবী করীম (স)-এর চাচা আব্বাসের কানেও খবরটি পৌঁছিল। তিনি অস্থির হইয়া উঠিলেন এবং সাথে সাথে তাঁহার গোলামকে হাজ্জাজের নিকট পাঠাইয়া সঠিক সংবাদ আসলে কী তাহা জানিবার প্রয়াস পাইলেন। হাজ্জাজ বলিলেন, আবুল ফাদলকে আমার সালাম জানাইয়া বলিবে যে, আমি আসিলে যেন একান্তে মিলিত হওয়ার ব্যবস্থা রাখেন। আমি যেই সংবাদ দিব তাহাতে তিনি খুশীই হইবেন। গোলাম ফিরিয়া গিয়া এই সংবাদ দিতেই আনন্দ-উৎফুল্ল আব্বাস তাঁহার বার্ধক্য ও রোগের কথা ভুলিয়া গিয়া চাঙ্গা হইয়া উঠিলেন। তারপর একান্তে মিলিত হইয়া হাজ্জাজ তাঁহাকে প্রকৃত সংবাদটি জানাইতে গিয়া বলিলেন, খায়বারপতির কন্যার সাথে আমি আপনার ভাতিজাকে বাসররত রাখিয়া আসিয়াছি। কৌশলে নিজের সম্পদ উদ্ধারের জন্য স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স)-এর অনুমতিক্রমে আমি এখানে এইরূপ প্রচার করিয়াছি। আমি চলিয়া যাওয়ার আগে কিন্তু এই কথা প্রচার করা যাইবে না। আপনি তিন দিনের আগে কোনক্রমেই ইহা কাহাকেও বলিবেন না।
তিন দিন পর বৃদ্ধ আব্বাস সুগন্ধি আতর মাখিয়া নক্শী শাল গায়ে দিয়া লাঠিতে ভর করিয়া রাজকীয় চালে ঐ মহিলা ও কুরায়শদের সম্মুখে কা'বা প্রাঙ্গণে উপস্থিত হইয়া কা'বাঘর তাওয়াফ করিলেন। আপন ভাতিজার এই দুর্দিনে আব্বাসের নিরুদ্বেগ আচরণ দর্শনে কুরায়শগণ বিস্মিত হইয়া এই ব্যাপারে তাঁহার দৃষ্টি আকর্ষণ করিল। তিনি বলিলেন, তোমরা যাহা শুনিয়াছ তাহা যথার্থ নহে। প্রকৃত সংবাদ হইল, খায়বার বিজিত। বিজয়ী মুহাম্মাদ (স) এবং তাঁহার সঙ্গী-সাথীগণের করতলগত সেখানকার তাবৎ সম্পদ। খায়বারের রাজকন্যার সহিত বাসররত অবস্থায় মুহাম্মাদকে রাখিয়া আসা হইয়াছে। হাজ্জাজ ইসলাম গ্রহণ করিয়া তাহার অর্থ-সম্পদ উদ্ধারের উদ্দেশ্যে আসিয়াছিল এবং আবার তাহাদের সহিত মিলিত হইবার উদ্দেশ্যে খায়বারের পথে পাড়ি জমাইয়াছে। এই সংবাদ শুনিয়া কাফিরগণ বিমর্ষ হইয়া পড়িল এবং মক্কায় অবস্থানরত মুসলমানগণের আনন্দের সীমা রহিল না। [ইব্‌ন হিশাম, সীরাতুন নবী, ৩খ., পৃ. ৩৬৭-৩৬৯; আসাহ্হুস্ সিয়ার, পৃ. ২০২-২০৪]

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ইয়াহুদী নেতার কন্যার উম্মুল মুমিনীনের মর্যাদা লাভ

📄 ইয়াহুদী নেতার কন্যার উম্মুল মুমিনীনের মর্যাদা লাভ


খায়বার বিজিত হইল। খায়বারের ইয়াহুদী নেতা হুয়াই ইব্‌ন আখতাব, যে মক্কার কুরায়শ কুলকে, আরবের বিভিন্ন পৌত্তলিক গোত্র ও ইয়াহুদী গোত্রসমূহকে ইসলামের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করার এবং ইসলামকে চিরতরে ধরাপৃষ্ঠ হইতে মিটাইয়া দেওয়ার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়াছিল, সে নিহত হইয়াছে। তাহারই কন্যা সাফিয়্যা মুসলমানদের হাতে বন্দী হইলেন।
পিতা, ভ্রাতা, আত্মীয়-স্বজনের নিহত হওয়ার ফলে হিংসা ও ঘৃণায় সাফিয়্যার মন রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি অতিশয় বিরুপ হইয়া উঠিয়াছিল। তাই মনের গতি পরিবর্তনের জন্য রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে আনাসের মাতার তত্ত্বাবধানে রাখিয়াছিলেন। বিশেষ আদর-যত্নে থাকায় তাহার মনের পরিবর্তন ঘটিলে তিনি এক শুভ মুহূর্তে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে মুক্ত করিয়া তাহার সহিত পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হইলেন। প্রত্যাবর্তন পথে আস-সাহ্হ্বা নামক স্থানে শাদী মুbarak সুসম্পন্ন হইল। তিনি সেখানে তিন দিন অবস্থান করেন। দাসত্বমুক্তিই ছিল তাঁহার মোহরানা। এইরূপ মোহরানা আদায় করা রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য জায়েয ছিল। হযরত সাফিয়্যা স্বয়ং বর্ণনা করিয়াছেন, বন্দিনী অবস্থায় আমাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট উপস্থিত করা হইল। পিতা, ভ্রাতা ও কওমকে কতল করার দরুন তিনি আমার নিকট ঘৃণ্যতম মনে হইতেছিলেন। কিন্তু তাঁহার অমায়িক ব্যবহারে আমি বিমোহিত হইয়া পড়িলাম। আমার অন্তর হইতে হিংসা চিরতরে মুছিয়া গেল। এক্ষণে তিনি আমার নিকট সারা জাহানের মধ্যে সর্বাধিক প্রিয়। [সাইয়েদুল মুরসালীন, ২খ., পৃ. ৮২৭]
আল্লামা শিবলী নু'মানী এই প্রসঙ্গে লিখেন, "বলা বাহুল্য, হযরত সাফিয়্যা (রা)-কে খান্দানের ধ্বংসের পর খান্দানের বাহিরে কাহারও স্ত্রী বা বাঁদী হইয়া থাকিতে হইত। তিনি ছিলেন খায়বারের রঈস-দুহিতা, তাহার স্বামীও বনূ নযীর গোত্রের রঈস ছিল। পিতা ও স্বামী দুইজনই নিহত। এমতাবস্থায় তাহার মন রক্ষা, মর্যাদা রক্ষা এবং বিষাদ দূরীকরণের ইহা ছাড়া আর কোন উত্তম উপায় ছিল না যে, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে সহধর্মিনী ও জীবন-সঙ্গিনীরূপে বরণ করিলেন। তিনি তাহাকে বাঁদীরূপেও রাখিতে পারিতেন, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) তাহার বংশকৌলিন্যের দিকে লক্ষ্য করিয়া তাহাকে আযাদ করিয়া দেন, তারপর যথারীতি বিবাহ করিলেন। মুসনাদে আহমাদ ইব্‌ন হাম্বল-এর বর্ণনা অনুযায়ী তিনি তাহাকে স্বাধীন হইয়া নিজের পরিবারে চলিয়া যাওয়ার অথবা তাহাকে পতিরূপে বরণের মধ্যে কোন একটি প্রস্তাব বাছিয়া লওয়ার এখতিয়ার দান করেন। সদাচরণ, করুণা, বিপন্নের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন ছাড়াও রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দিক হইতেও তাঁহার এইরূপ আচরণ অত্যন্ত সঙ্গত ও যথার্থ ছিল। এই জাতীয় কর্মপদ্ধতির ফলে আরবগণ ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট ও মোহিত হইত। তাহারা বিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করিত যে, ইসলাম তাহার শত্রুদের উত্তরাধিকারীদের প্রতি কিরূপ সদয় ও সহানুভূতিশীল! বনূ মুসতালিকের যুদ্ধে হযরত জুওয়ায়রিয়া (রা)-এর সহিতও অনুরূপ আচরণ করা হইয়াছিল। [শিবলী, সীরাতুন্নবী, ১খ., পৃ. ৪৯২, ৫ম সংস্করণ, আলীগড়]

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00