📄 সেনাপতি ও সৈনিকের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ
ইহা ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতিরক্ষা কৌশলের অন্যতম নীতি। খায়বার যুদ্ধকালে রাসূলুল্লাহ (স) যখন একেবারেই দুর্গের নীচে শিবির স্থাপন করিলেন তখন হযরত হুবাব (রা) জিজ্ঞাসা করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই শিবিরের স্থান নির্বাচন কি ওহীর ভিত্তিতে? খায়বারের দুর্গবাসীরা তীরন্দাযীতে অত্যন্ত দক্ষ, আর আমাদের শিবির একেবারে তাহাদের লক্ষ্য সীমার মধ্যে পড়িয়া গিয়াছে। ইহা ছাড়া ঘন খেজুর বীথির মধ্য দিয়া আসিয়াও তাহারা বিপদের কারণ হইতে পারে। সাথে সাথে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার পরামর্শ গ্রহণ করিলেন এবং প্রায় ৪০০ খেজুর গাছ কর্তন করাইলেন। তিনি শিষ্যদের উৎসাহবোধক একটি খুৎবাও দিলেন। [সাইয়েদুল মুরসালীন, ২খ., পৃ. ৮০৮-৮০৯]
📄 ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে কাবু করা
জেনারেল আকবর খান বলেন, “রাসূলুল্লাহ (স)-এর লড়াই করার উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধের পর শান্তি ফিরে আসবে এবং বিজেতা ও বিজিত উভয় পক্ষই আত্মিক, মানসিক ও সামাজিক প্রশান্তি ও তৃপ্তি লাভ করবে। এই লক্ষ্য সামনে রেখেই যুদ্ধে তিনি ঠিক ততটুকু মাত্র জীবন ও সম্পদহানি ঘটানোকে জায়েয রেখেছেন যতটুকু যুদ্ধ পরিসমাপ্তি ও শান্তি লাভের জন্য ছিল অপরিহার্য। অন্যথায় তিনি এমন যুদ্ধ পরিকল্পনা তৈরী করতেন না বা এমন সামরিক চাল চালতেন না যার ফলে দুশমন বিনা যুদ্ধেই ভীতিগ্রস্ত ও হতভম্ব হয়ে হিম্মত হারিয়ে যেতো আর অধিক রক্তক্ষয় ব্যতিরেকেই যুদ্ধের উদ্দেশ্য হাসিল হয়ে যেত। এই সামরিক কলাকৌশলকেই বৃটিশ প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ লীডল হার্ট-এর উক্তি মুতাবিক জার্মানীর প্রখ্যাত প্রতিরক্ষা পর্যবেক্ষক নিম্নোক্ত ভাষায় পুনরাবৃত্তি করেছেন : 'প্রতিরক্ষা কৌশলের সাহায্যে এমনভাবে কর্ম সম্পাদন করতে হবে যে, লড়াই ব্যতিরেকে অন্য পন্থায়ও শত্রুর উপর বিজয় সাধিত হয়'”। [ইসলামে প্রতিরক্ষা কৌশল, পৃ. ২১৯-২২০]
রাসূলুল্লাহ (স)-এর উক্ত নীতি সম্পর্কে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রতিটি মুসলিম যোদ্ধা সবিশেষ অবহিত ছিলেন। তাই আহ্যাব যুদ্ধের সময় বিশ্বাসঘাতক বনূ কুরায়যা যখন স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করে এবং তাহাদের একটি লোক মদীনার দুর্গে আশ্রয় গ্রহণকারী নারী ও শিশুদের খবর লইয়া তাহাদের উপর আক্রমণের পাঁয়তারা করিতেছিল তখন স্বয়ং নবী করীম (স)-এর ফুফু সাফিয়্যা (র) তাঁবুর একটি খুঁটি খুলিয়া লইয়া পশ্চাৎদিক হইতে লোকটির মাথায় এমন প্রচণ্ড আঘাত হানিলেন যে, তাহার মাথা চূর্ণ হইয়া গেল। তারপর ত্বরিৎ গতিতে তাহার শিরশ্ছেদ করিয়া তাহার খণ্ডিত মুণ্ডসহ তিনি দুর্গে প্রবেশ করিলেন। তারপর দুর্গের পশ্চাৎদিকে খণ্ডিত অংশটি এমনভাবে নিক্ষেপ করিলেন যে, শত্রুরা ভাবিল নিশ্চয়ই দুর্গের মধ্যে পুরুষ সৈন্যরা রহিয়াছে। অথচ সেখানে কোন পুরুষ যোদ্ধা ছিল না। কেবল ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমেই দুর্গটি বনু কুরায়যার ইয়াহুদীদের আক্রমণ হইতে রক্ষা পাইল। [সাইয়েদুল মুরসালীন, ২খ., পৃ. ৬৫৯-৬৬০]
খায়বার আক্রমণের তৃতীয় দিনে সা'ব দুর্গ দখলের উদ্দেশ্যে হযরত হুবাব (রা)-এর হস্তে পতাকা অর্পণ করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) যখন তাহাকে প্রেরণ করিলেন তখন একে একে ইউশা ও দাইয়ান নামক দুইজন ইয়াহুদী অবরুদ্ধ দুর্গ হইতে বাহির হইয়া আসিয়া তাঁহার মুকাবিলায় অগ্রসর হইল। তিনি প্রথমজনকে অসির আঘাতে হত্যা করিয়া দ্বিতীয় ইয়াহুদীকেও আঘাত করিলেন। যখন সেও নিহত হইল তখন তিনি তাহার শিরশ্ছেদ করিয়া কর্তিত মুণ্ডটি সজোরে অদূরে দাঁড়াইয়া থাকা, তাহার স্বগোত্রীয়দের দিকে নিক্ষেপ করিয়া বলিলেন, "লও, ইহা তোমাদের উপহার"। ভীত-সন্ত্রস্ত ইয়াহুদীরা তখন রণে ভঙ্গ দিয়া তাড়াতাড়ি দুর্গমধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করিল। রাসূলুল্লাহ (স) নিজে অশ্ব হইতে অবতরণ করিয়া মুসিলম যোদ্ধাগণকে উৎসাহ দিতেছিলেন। মুসলিম বাহিনী পলায়নরত ইয়াহুদীদের পশ্চাদ্ধাবন করিয়া বলপূর্বক দুর্গ মধ্যে ঢুকিয়া পড়িলেন। এইভাবে তৃতীয় দিবসে দুর্ভেদ্য সা'ব দুর্গও অধিকৃত হইল। সঞ্চিত বিপুল রসদ এবং বহু মিনজানিক (লোষ্ট্র বর্ষণ চক্র), দাব্বাবা, বর্ম ও তলোয়ার মুসলমানদের হস্তগত হইল। [প্রাগুক্ত, পৃ. ৮১৫]
নায়েম দুর্গ প্রথমেই অধিকৃত হইয়াছিল। ওয়াতীহ ও সুলালিম দুর্গ চৌদ্দ দিন পর্যন্ত অবরোধ করিয়া রাখার পরও যখন একটি লোকও দুর্গের বাহিরে আসিল না তখন ভয় প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ্ (স) মিনজানিক সন্নিবেশ করিলেন। তাহা দেখিয়া ইয়াহুদীরা প্রমাদ গণিতে লাগিল। তাহারা জীবনভিক্ষা চাহিয়া শর্তাধীনে সন্ধির প্রার্থনা জানাইল। [প্রাগুক্ত, পৃ. ৮১৬-৮১৭] এইরূপ শত্রুপক্ষকে ভীতি প্রদর্শনের ব্যাপারটি স্বয়ং আল-কুরআনের নির্দেশ। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
وَاعِدُوا لَهُمْ مَّا اسْتَطَعْتُمْ مِنْ قُوَّةٍ وَمِنْ رَبَاطِ الخَيْلِ تُرْهِبُونَ بِهِ عَدُوٌّ اللَّهِ وَعَدُوكُمْ وَأَخَرِينَ مِنْ دُونِهِمْ.
"তাহাদের মুকাবিলার জন্য তোমাদের সাধ্যমত শক্তি ও অশ্ববাহিনী প্রস্তুত রাখিবে; এতদ্বারা তোমরা সন্ত্রস্ত করিবে আল্লাহ্র শত্রুকে, তোমাদের শত্রুকে এবং এতদ্ব্যতীত অন্যদিগকে"। [৮: ৬০]
যাহা হউক, খায়বারের ইয়াহুদীগণ যখন নিশ্চিতভাবে বুঝিতে পারিল যে, তাহাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা আর নাই তখন তাহারা রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নিকট মিনতি জানায় যেন তিনি তাহাদিগকে হত্যা না করিয়া দেশান্তরিত করেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের এই মিনতি মানিয়া লইলেন। ইহারই মাধ্যমে মুসলমানদের হাতে গোটা খায়বারের পতন ঘটিল।
বুখারী, মুসলিম ও আবূ দাউদের হাদীছের দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, মহানবী (স) শেষ পর্যন্ত ইয়াহূদীদিগকে খায়বার হইতে দেশান্তরিত করেন নাই। তিনি এই শর্তে তাহাদিগকে সেখানে বসবাসের অনুমতি দিলেন যে, তাহারা নিজ খরচে সেখানকার জমিজমা চাষাবাদ করিবে এবং উৎপন্নজাত ফসলের অর্ধেক মুসলমানদেরকে প্রদান করিবে। কিন্তু ইহা শর্ত রহিল যে, মুসলমানগণ যত দিন ইচ্ছা তাহাদিগকে রাখিবে, যখন ইচ্ছা খায়বার হইতে বহিষ্কার করিয়া দেওয়ার অধিকারী থাকিবে। ইয়াহুদীদের আবেদন ও উদ্যোগেই এইরূপ চুক্তি হইয়াছিল। [সহীহ বুখারী, খায়বারবাসীদের প্রতি নবী করীম (স) এর আচরণ প্রসঙ্গ, ৭/৪৯৬; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল মুসাকাত, ৩/১১৮৬-৮৭; ফাতহুল বারী, ৫খ., পৃ. ১৬, ঐ ৫খ., পৃ. ২৩৯, কিতাবুশ শুরূত; সুনান আবূ দাউদ, কিতাবুল বুয়, ৩/৬৯৭; নাদ্রাতুন নাঈম, ১/৪৮৬, পাদটীকায়]
ফাদাকবাসিগণের নিকট খায়বার বিজয়ের সংবাদ পৌঁছিলে আল্লাহ তা'আলা তাহাদের অন্তরেও ভীতির সঞ্চার করিয়া দিলেন। তখন তাহারাও তাহাদের জীবন রক্ষার বিনিময়ে তাহাদের তাবৎ সম্পদ নবী করীম (স)-কে নযরানাস্বরূপ দিয়া দেশান্তরিত হওয়ার প্রস্তাব দিল। এইভাবে ফাদাকের সমস্ত সম্পত্তি নবী করীম (স)-এর অধিকারে চলিয়া আসিল। অতঃপর ওয়াদিল কুরা ও তায়মার ইয়াহুদীগণও অনুরূপ শর্তে তাহাদের তাবৎ সম্পদ ত্যাগ করে। খায়বারের ইয়াহূদীদিগকে তথাকার জমিজমা বর্গা দেওয়া হয়। [যাদুল মা'আদ, ১/৪০৫; নাদরাতুন নাঈম, ১/৪৮৭]
📄 গনীমত ও ফায়
ইসলামের প্রথম যুগে বেতনভোগী নিয়মিত সেনাবাহিনীর কোন অস্তিত্ব ছিল না। প্রতিটি সামর্থ্যবান মুসলমানই ছিলেন এক একজন যোদ্ধা-মুজাহিদ। যুদ্ধলব্ধ সম্পদের সবকিছুই রাসূলুল্লাহ (স)-এর হাতে তুলিয়া দেওয়া হইত। ঈমানদারগণ নামায-রোযার মত ইবাদত হিসাবে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে জিহাদে গমন করিতেন, সম্পদ লাভের লোভে বা মোহে নহে। গনীমত ছিল তাহাদের বাড়তি পুরস্কারস্বরূপ। তাই সূরা আল-আনফালের শুরুতেই ইরশাদ হইয়াছে:
يَسْتَلُونَكَ عَنِ الْأَنْفَالِ قُلِ الْأَنْفَالُ لِلْهِ وَالرَّسُولِ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَصْلِحُوا ذَاتَ بَيْنِكُمْ وأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ إِنْ كُنْتُمْ مُّؤْمِنِينَ.
"লোকে তোমাকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বল, যুদ্ধলব্ধ সম্পদ আল্লাহ এবং রাসূলের। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, নিজেদের মধ্যে সদ্ভাব স্থাপন কর এবং আল্লাহ ও তদীয় রাসূলের আনুগত্য কর যদি তোমরা মু'মিন হও"। [৮:১]
লক্ষণীয় যে, প্রশ্নটি আসলে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সংক্রান্ত, কিন্তু আল্লাহ তা'আলা উহাকে গনীমত না বলিয়া 'আনফাল' বলিয়াছেন। আনফাল শব্দটি 'নফল'-এর বহুবচন। নফল অর্থ বাড়তি বা ফাও। এই শব্দ ব্যবহারই ইঙ্গিত করিতেছে যে, গনীমত কোন অবশ্য প্রাপ্য সম্পদ নহে। উহা একান্তই মহান আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের মালিকানা ও এখতিয়ারধীন। মুসলিম যোদ্ধাগণ উহা লাভ করেন বাড়তি বা অতিরিক্ত প্রাপ্য সম্পদস্বরূপ। উহা আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ মাত্র, দাবি করিয়া আদায় করিয়া লওয়ার বস্তু নহে।
যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সংক্রান্ত প্রাচীন যুগের নিয়ম সম্পর্কে বাইবেল বিশারদগণের বক্তব্য অনেকটা এইরূপঃ By ancient custom a special share of booty taken in warfalk to the commander, he has the first choice, and in old Arabia was entitled to a forth of the whole. In ancient Israel the practice was similar (Cheyene and Black's Encyclopedia Biblica (Black, London, c. 4905) ।
"প্রাচীন রীতি অনুযায়ী যুদ্ধলব্ধ সম্পদের একটি বিশেষ অংশ পাইতেন সেনাপতি, প্রথম তাঁহার চাহিদাই বিবেচ্য ছিল। প্রাচীন আরবেও সেনাপতি মোট যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক-চতুর্থাংশের অধিকারী হইত। প্রাচীন ইসরাঈলেও অনুরূপ রীতি ছিল"।
বাইবেল অভিধানেও আছে যে, ইস্রাইলে, Booty was to be divided in equal shares between those who went into the battle and those who guarded the camp. A chosen part was sometimes dedicated to the Lord, or reserved for a leader (Hasting's Dictionary of the Bible, Clark, London, vol. vi, page 895)।
"যুদ্ধলব্ধ সম্পদ যাহারা যুদ্ধে গমন করিত এবং যাহারা তাঁবু রক্ষায় নিয়োজিত থাকিত তাহাদের মধ্যে সমভাবে বিভাজ্য ছিল। কখনও কখনও ইহার একটি বিশেষ অংশ 'প্রভু'-এর উদ্দেশ্যে নিবেদিত হইত বা নেতার জন্য সংরক্ষিত থাকিত"।
পক্ষান্তরে উপরিউক্ত আয়াতে মুসলমান যোদ্ধাগণকে নীতিগতভাবে জানাইয়া দেওয়া হইল যে, যুদ্ধলব্ধ সম্পদের প্রকৃত মালিক আল্লাহ ও তদীয় রাসূল (স)।
গনীমত সংক্রান্ত প্রশ্নটি প্রথমে দেখা দেয় যখন বদর যুদ্ধে বিজয়ের পর প্রভূত সম্পদ মুসলমানদের হস্তগত হয়। আল্লামা শাব্বীর আহমাদ উছমানী (র) এই সম্পর্কে লিখেন, বদর যুদ্ধে গনীমতস্বরূপ প্রাপ্ত সম্পদের মালিকানা সম্পর্কে সাহাবীগণের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। যুবকগণ যাহারা যুদ্ধের অগ্রভাগে থাকিয়া লড়াই করিয়াছিল তাহারা নিজদিগকেই গোটা গনীমত সম্ভারের অধিকারী বলিয়া মনে করিতেছিল। প্রবীণগণ যাহারা তাহাদের পশ্চাতে থাকিয়া শক্তি ও সাহস যোগাইতেছিলেন তাহাদের বক্তব্য ছিল, আমাদের সহযোগিতায়ই তো এই বিজয় অর্জিত হইয়াছে, তাই গনীমত আমাদেরই প্রাপ্য। আবার যাহারা নবী করীম (স)-এর হিফাযতে নিযুক্ত ছিলেন তাহাদের ধারণা ছিল যে, গনীমতের আসল হকদার তাহারাই।
আয়াতে স্পষ্ট জানাইয়া দেওয়া হইল যে, কাহারও বীরত্ব বা কাহারও বুদ্ধি-পরামর্শ- পৃষ্ঠপোষকতায় যুদ্ধে বিজয় অর্জিত হয় নাই। উহা কেবল আল্লাহ্ তা'আলার মদদেই সম্ভবপর হইয়াছে। তাই গনীমত সম্ভারের মালিক আল্লাহই এবং রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার নায়েব। তাই যেভাবে আল্লাহ তদীয় রাসূল (স) মারফত হুকুম দিবেন, ঠিক সেইভাবেই উহার বিলি-বণ্টন হইবে। মুসলমানদের কাজ হইল, আল্লাহকে ভয় করিয়া নিজেদের পরস্পরিক সম্পর্ক – সৌহার্দ বজায় রাখিয়া নিজেদের মন-মর্জি ও অভিমত বিসর্জন দিয়া একমাত্র তাঁহারই নির্দেশিত পথে চলা, সর্ব ব্যাপারে আল্লাহ্র উপর ভরসা করা, আল্লাহ্র সন্তুষ্টি ও মাগফিরাত লাভে সচেষ্ট থাকা। [তাফসীরে উছমানী, সূরা আনফালের প্রথম পাদটীকা] তারপর ঐ সূরা আনফালেরই ৪১ নং আয়াতে ইরশাদ হইয়াছে:
وَاعْلَمُوا أَنَّمَا غَنِمْتُمْ مِّنْ شَيْءٍ فَأَنَّ لِلَّهِ خُمُسَهُ وَلِلرَّسُولِ وَلِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتْمَى وَالْمَسَاكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ أَنْ كُنْتُمْ أَمَنْتُمْ بِاللهِ وَمَا أَنْزَلْنَا عَلَى عَبْدِنَا يَوْمَ الْفُرْقَانِ يَوْمَ الْتَقَى الْجَمْعُنِ وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ.
"আরও জানিয়া রাখ যে, যুদ্ধে তোমরা যাহা লাভ কর উহার এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহ্, রাসূলের, রাসূলের স্বজনদের, ইয়াতীমদের, মিসকীনদের এবং পথচারীদের। যদি তোমরা ঈমান রাখ আল্লাহ এবং তাহাতে যাহা মীমাংসার দিন আমি আমার বান্দার প্রতি অবতীর্ণ করিয়াছি যেই দিন দুই দল পরস্পরের সম্মুখীন হইয়াছিল এবং আল্লাহ সর্ববিষয়ে শক্তিমান"। [৮:৪১]
বিনা যুদ্ধে যে সমস্ত সম্পদ শত্রুপক্ষের দখল হইতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর মালিকানাধীনে আসে, আল-কুরআনের ভাষায় উহাই হইতেছে 'ফায়'। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَى رَسُولِهِ مِنْهُمْ فَمَا أَوْجَفْتُمْ عَلَيْهِ مِنْ خَيْلٍ وَلَا رِكَابٍ وَلَكِنَّ اللَّهَ يُسَلِّطُ رُسُلَهُ عَلَى مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ.
"আল্লাহ্ ইয়াহুদীদের নিকট হইতে তাঁহার রাসূলকে যে ফায় দিয়াছেন তাহার জন্য তোমরা অশ্বে কিংবা উষ্ট্রে আরোহণ করিয়া যুদ্ধ কর নাই। আল্লাহ তো যাহার উপর ইচ্ছা তাঁহার রাসূলদিগকে কর্তৃত্ব দান করেন; আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান"। [৫৯:৬]
এই ফায় ব্যয়ের খাতসমূহও আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করিয়া দিয়াছেন পরবর্তী আয়াতেঃ مَا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَى رَسُولِهِ مِنْ أَهْلِ الْقُرَى فَلِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ وَلِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسْكِينِ وَابْنَ السَّبِيل.
"আল্লাহ জনপদবাসীদের নিকট হইতে তাঁহার রাসূলকে যাহা কিছু দিয়াছেন তাহা আল্লাহর, তদীয় রাসূলের, রাসূলের স্বজনগণের, ইয়াতীমদের, অভাবগ্রস্ত ও পথচারীদের"। [৫৯: ৭]
উহার উদ্দেশ্যও আল্লাহ তা'আলা ব্যক্ত করিয়া দিয়াছেন ঐ আয়াতের শেষাংশেঃ كَيْ لَا يَكُونُ دُولَةً بَيْنَ الْأَغْنِيَاء مِنْكُمْ.
"যাহাতে তোমাদের মধ্যে যাহারা বিত্তবান, কেবল তাহাদের মধ্যেই ঐশ্বর্য আবর্তন না করে"। [৫৯:৭]
📄 খায়বারের গনীমত বণ্টন
খায়বার বিজয়ের পর যে দুর্গগুলি ও জমিজমা ভাগবণ্টন করা হয় নাই, সহীহ রিওয়ায়াতসমূহে ঐগুলিকে 'ফায়' বলা হইয়াছে। ফাদাকের অর্ধেক জমি এবং ওয়াদিল কুরার এক-তৃতীয়াংশ বিনাযুদ্ধে চুক্তির মাধ্যমে অর্জিত হয় বিধায় ঐগুলিকেও ফায় বলা হইয়াছে। [আসাহ্হুস্ সিয়ার, পৃ. ৩৬৬-৩৬৭] বনূ নাযীরের পরিত্যক্ত জমিজমাও ফায় ছিল। [ঐ, পৃ. ২১৪]
খায়বারের সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল ভূমি ও বাগ-বাগিচা। ভূ-সম্পদ ব্যতীত অন্যান্য সকল সম্পদ রাসূলুল্লাহ (স) কুরআনের নির্দেশানুযায়ী যোদ্ধাগণের মধ্যে ভাগবণ্টন করিয়া দেন এবং ভূ-সম্পদ কেবল হুদায়বিয়ার অভিযানে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বণ্টন করেন। [ইমাম তাহাবী (শারহু মা'আনিল আছার, ১খ., পৃ. ৩১৬]
উল্লেখ্য, হুদায়বিয়া অভিযানের সময় কেবল নিষ্ঠাবান ঈমানদার সাহাবীগণই রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহযাত্রী হইয়াছিলেন, দুর্বল চিত্তের লোকজন নানা ছল-ছুতায় উহাতে অংশগ্রহণ হইতে বিরত থাকে। ঐ অভিযানকালেই খায়বার বিজয়ে প্রচুর গনীমত লাভের সুসংবাদ দেওয়া হইয়াছিল। ঐ সময় ঘোষণা করিয়া দেওয়া হয় যে, খায়বারের গনীমত-সম্ভার কেবল হুদায়বিয়ার সহযাত্রীদের মধ্যেই ভাগবণ্টন করা হইবে, অন্য কেহ ইহার অংশ পাইবে না। [ইযালাতুল খিফা, ১খ., পৃ. ৩৮]
সুনান আবূ দাউদে ও মুসতাদরাক হাকেমে খায়বারের ভূ-সম্পদ বণ্টনের বিবরণ রহিয়াছে। মহানবী (স) খুমুস বাহির করার পর খায়বারের সমস্ত ভূ-সম্পদকে ৩৬ ভাগ করিয়া উহার অর্ধেক ১৮ ভাগ জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য রাখিয়া অবশিষ্ট ১৮ ভাগ মুজাহিদগণের মধ্যে প্রতি ভাগ ১০০ অংশ করিয়া বিভক্ত করিয়া দেন। [সুনান আবূ দাউদ, ৩/৪১৩; হাকেম, আল-মুসতাদরাক, ২/১৩১]
মুজাহিদদের সংখ্যা ছিল ১৫০০। তন্মধ্যে ৩০০ জন ছিলেন আরোহী। রাসূলুল্লাহ (স) প্রত্যেক পদাতিককে এক ভাগ হিসাবে এবং প্রতি আরোহী সৈন্যকে দুই ভাগ করিয়া প্রদান করেন। এইভাবে ৩০০×২=৬০০ এবং বার শত পদাতিকের বার শত, মোট ১৮ শত ভাগ হইল। [বাযলুল মাজহুদ, ৪খ., পৃ. ১৪৬; ইব্ন হিশাম, সীরাতুন্নবী, বঙ্গানু., ৩/ ৩৭২, ইফাবা]