📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর পঞ্চ বাহিনী আল-খামীস
প্রত্যূষে গাত্রোত্থান করিয়া যদি কোন জনপদে আযানের শব্দ শুনিতে পাইতেন তাহা হইলে নবী করীম (স) আক্রমণ হইতে বিরত থাকিতেন। ঐ রাত্রি সেখানে যাপন করিয়া প্রত্যূষে যখন কোন আযানের ধ্বনি শুনিতে পাইলেন না তখন তিনি অতি প্রত্যুষে ফজরের নামায আদায় করিয়া সদলবলে সওয়ারীতে আরোহণ করিয়া খায়বারের দিকে অগ্রসর হইলেন। খায়বারের কৃষককূল তখন কোদাল-ঝুড়ি হাতে লইয়া মাঠের দিকে বাহির হইতেছে। রাসূলুল্লাহ (স) ও তাঁহার সৈন্যবাহিনীকে দেখিয়া তাহারা চীৎকার করিয়া উঠিল: محمد والله محمد والخميس "মুহাম্মাদ! আল্লাহ্র কসম, মুহাম্মাদ, আর তাঁহার গঠিত বাহিনী"।
তারপর তাহারা পলায়ন করিয়া তাহাদের নগরীর মধ্যে গিয়া প্রবেশ করিল। রাসূলুল্লাহ (স) তখন বলিলেন:
الله اکبر خربت خيبر الله اکبر خربت خیبر انا اذا نزلنا بساحة قوم فساء صباح المنذرين. "আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ! খায়বার ধ্বংস (বিজিত) হইল! আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ! খায়বার ধ্বংস হইল। আমরা যখন কোন সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণের জন্য উপনীত হই, তখন সতর্কীকৃত সম্প্রদায়ের প্রাতকাল কতই না মন্দ"। [সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৬০৩-৬০৪, খায়বার যুদ্ধ প্রসঙ্গ; অনন্তর কিতাবুস সালাত ও কিতাবুল আষানেও হাদীছখানা রহিয়াছে]
উক্ত বৰ্ণনা হইতে প্রতীয়মান হয় যে, নবী করীম (স)-এর সমর কৌশলের 'আল-খামীস' বা পঞ্চ বাহিনীর খ্যাতি তখন সুদূর খায়বারবাসীদের কানেও পৌঁছিয়াছিল এবং তাহাদের আগমনের আশঙ্কা তাহারা পূর্ব হইতেই করিত। বানু নষীরের উৎখাতে সেই ভীতি খায়বারেও ছাড়াইয়া পড়িবে উহাই ছিল স্বাভাবিক।
ইব্ন খালদূন বলেন, পৌত্তলিক আরবদের মধ্যে যে যুদ্ধরীতি প্রচলিত ছিল তাহা ছিল 'আল-কার ওয়াল ফার' ঝোপ বুঝিয়া কোপ মারার মত আক্রমণ আবার ত্বড়িৎ গতিতে সরিয়া পড়া। কিন্তু ইসলামের আবির্ভাবের প্রাক্কালে তাহারা অনারবদিগকে লইয়া সেনাবাহিনী (তাবি'আ) গড়িয়া তুলিতে শুরু করে। ইহা তাহারা করিয়াছিল দুইটি কারণে। প্রথমত, শত্রু পক্ষের যুদ্ধের মুকাবিলা একং দ্বিতীয়ত, স্বীয় বাহিনীকে অধিকতর অর্থবহ করিয়া গড়িয়া তোলা। তাহাদের বেপরোয়া লড়াইয়ের ক্ষেত্রে ইহাই ছিল অধিকতর সঠিক পদ্ধতি। পূর্ববর্তী লেখকগণ কর্তৃক 'আল-খামীস' নামে আখ্যায়িত এই পদ্ধতিতে সেনাবাহিনীকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করা হইত। প্রচলিতভাৰে এই ভাগগুলি ছিল : (১) কাল্ব (কেন্দ্র), (২) মায়মানা (দক্ষিণ বাহু), (৩) মায়সারা (বাম বাহু), (৪) মুকাদ্দামা (অগ্রবর্তী বাহিনী) ও (৫) সাকা (পশ্চাদরক্ষী বাহিনী)। ইন্ন খালদূন এই নয়া বিন্যাসকে যাহফ (বাহিনীর সম্মুখে অগ্রসর হওয়া) নামেও অভিহিত করিয়াছেন। তিনি বলেন, ইহা এমন এক রণপদ্ধতি যাহাতে সেনাবাহিনী সালাতের সারির মত বিভিন্ন সারিতে বিভক্ত হইয়া দাঁড়ায়। এই পদ্ধতিটি শত্রু বাহিনীর জন্য ছিল রীতিমত ভীতিকর। সাধারণত গাযওয়াসমূহে এবং বড় বড় সারিয়্যা অভিযানেও এই পদ্ধতি অবলম্বন করা হইত। উহুদ যুদ্ধকালে উহা পূর্ণরূপে চালু হয়। আল-ওয়াকিদীর খায়বার অভিযানের বিবরণে খামীস পদ্ধতির বিষয়টির স্পষ্ট উল্লেখ রহিয়াছে। হুনায়ন, তায়েফ ও খায়বার অভিযানেও খামীস পদ্ধতির কথা জানা যায়। মহানবী (স)-এর নেতৃত্বাধীন ইসলামী রাষ্ট্র যে সম্পূর্ণভাবে না হইলেও অন্তত পরীক্ষামূলকভাবে বদর যুদ্ধের অব্যবহিত পূর্ব হইতে তাবিয়া যুদ্ধকৌশল ও সেনাবিন্যাসে খামীস পদ্ধতি গ্রহণ করিয়াছিল। সময়ের সাথে সাথে উভয় পদ্ধতির উন্নয়ন, অগ্রগতি ও পূর্ণতা সাধন করিয়া ইসলামী বাহিনী এক সুদক্ষ যোদ্ধা বাহিনীতে পরিণত হইয়া বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম বাহিনীকে ধ্বংস করার ক্ষমতা অর্জন করে। [রাসূল মুহাম্মদ (স)-এর সরকার কাঠামো, পৃ. ১৫৫-১৫৮]
📄 যুদ্ধের মূল লক্ষ্য গনীমত নহে
খায়বর যুদ্ধের দিন হযরত আলী (রা) পতাকা লাভের পর বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি কি ততক্ষণ পর্যন্ত লড়িয়া যাইব যাবৎ না তাহারা আমাদের পর্যায়ে আসে? জবাবে তিনি বলিলেন:
انفذ على رسلك حتى تنزل بساحتهم ثم ادعهم الى الاسلام واخبرهم بما يجب عليهم من حق الله فيه فوالله لان يهدى الله بك رجلا واحدا خير لك من أن يكون لك حمر النعم.
"ধীরে সুস্থে যাও, তাহাদের অঙ্গনে গিয়া অবতরণ করিবে, তারপর তাহাদিগকে ইসলামের দিকে দাওয়াত দিবে এবং ইহাতে তাহাদের উপর আল্লাহ্ কী হক বর্তায় সেই সম্পর্কে তাহাদিগকে অবহিত করিবে। আল্লাহর কসম! তোমার দ্বারা একটি লোকেরও হিদায়াত লাভ তোমার জন্য লোহিত বর্ণের (মূল্যবান) উষ্ট্র লাভের চাইতেও উত্তম"। [সহীহ বুখারী, ২/৬০৩-৬০৪]
মুসলিম শরীফে রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীগণকে জিহাদে প্রেরণকালে যে উপদেশ দিতেন তাহার বিশদ বর্ণনা রহিয়াছে। হযরত বুরায়দা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) যখন কোন ব্যক্তিকে সেনাদল অথবা সারিয়্যা বাহিনীর আমীর নিযুক্ত করিতেন তখন তাহাকে বিশেষভাবে এবং সাধারণভাবে মুসলমানগণকে আল্লাহভীতি অবলম্বনের নসীহত করিতেন। তারপর বলিতেনঃ যুদ্ধ করিবে আল্লাহর নামে, আল্লাহ্র পথে। লড়াই কর তাহাদের সহিত যাহারা আল্লাহর সহিত কুফরী করে। যুদ্ধ চালাইয়া যাইবে তবে গনীমতের মাল আত্মসাৎ করিবে না। প্রতিশ্রুতি (চুক্তি) ভঙ্গ করিবে না। শত্রুপক্ষের নিহতদের অঙ্গহানি করিবে না। শিশুদিগকে হত্যা করিও না। যখন তুমি মুশরিক শত্রুর সম্মুখীন হইবে তখন তাহাকে তিনটি বিকল্প প্রস্তাব দিবে। সে যদি তাহার কোন একটিও গ্রহণ করিয়া লয় তবে তুমি তাহা মানিয়া লইবে এবং তাহাদের সহিত যুদ্ধ করা হইতে বিরত থাকিবে।
(১) তাহাদিগকে তুমি ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিবে। যদি তাহারা তাহা মানিয়া লয় তবে তাহা তুমিও মানিয়া লইবে এবং তাহাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হইতে বিরত থাকিবে। তারপর তুমি তাহাদিগকে তাহাদের বাড়ীঘর ত্যাগ করিয়া মুহাজিরগণের এলাকায় স্থানান্তরিত হওয়ার আহবান জানাইবে। তখন অধিকার ও দায়িত্বের ক্ষেত্রে তাহারা মুহাজিরদের সমপর্যায়ে থাকিবে। আর যদি তাহারা স্বগৃহ ত্যাগে সম্মত না হয় তাহা হইলে তাহারা বেদুঈন মুসলমানদের সমপর্যায়ে থাকিবে। সাধারণ মুসলমানদের উপর আল্লাহর যে সমস্ত হুকুম বর্তায় তাহাদের উপরও তাহাই বর্তাইবে, আর তাহারা গনীমত বা ফায় সম্পদে অংশীদার হইবে না- যাবৎ না মুসলমানদের সহিত জিহাদে গমন করিবে।
(২) যদি তাহারা ইসলাম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায় তবে তাহাদিগকে জিয়া প্রদানের আহবান জানাইবে। যদি তাহারা তাহাতে সম্মত হইয়া যায়, তবে তুমি তাহাতে সম্মত হইয়া তাহা গ্রহণ করিয়া লইবে এবং তাহাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হইতে বিরত থাকিবে।
(৩) যদি তাহাতেও তাহারা অস্বীকৃতি জানায়, তবে আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করিয়া তাহাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপাইয়া পড়িবে। আর যদি তোমরা কোন দুর্গবাসীকে অবরোধ কর এবং তাহারা তোমাদের নিকট আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের যিম্মাদারি প্রার্থনা কর, তাহা হইলে তাহাদিগকে আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের যিম্মাদারিতে না দিয়া তোমার নিজের ও নিজের সাথীগণের যিম্মাদারিতে রাখিবে। কেননা তোমাদের ও তোমাদের সাথীগণের যিম্মাদারি ভঙ্গ আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের যিম্মাদারি ভঙ্গের তুলনায় লঘুতর হইবে। আর তোমাদের কোন দুর্গ অবরোধকালে দুর্গবাসীরা যদি আল্লাহ ও তদীয় রাসূলের হুকুমের বরাতে আত্মসমর্পণ করিতে চাহে তাহা হইলে তোমরা তাহা মানিয়া লইবে না, বরং তোমরা তোমাদের নিজেদের সিদ্ধান্তের নিকট আত্মসমর্পণ করাইবে। কেননা তোমার জানা নাই যে, তুমি তাহাদের ব্যাপারে আল্লাহ্ হুকুম কার্যকরী করিতে পারিবে কি না। [মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ, হাদীছ নং ৪৩৭২]
উক্ত হাদীছ হইতে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ্র বান্দাগণ কুফরীর অন্ধকার হইতে বাহির হইয়া মনগড়া উপাস্যদের দাসত্বের নিগড় হইতে এবং কায়েমী স্বার্থের প্রতিভূদের দাসত্বের নিগড় হইতে মুক্ত হইয়া এক আল্লাহর উপাসনা করুক, রাসূলুল্লাহ (স)-এর জিহাদ ছিল সেই উদ্দেশ্যে। মুসলমানরা প্রভৃত গনীমত ও বিত্ত-বৈভবের অধিকারী হইয়া যাউক, এই উদ্দেশ্যে জিহাদ পরিচালিত হইত না।
📄 শত্রুর মনে ভীতি সৃষ্টিকারী কবিতা পাঠ
রণক্ষেত্রে শত্রুর মনে ভয় উদ্রেককারী কবিতা পাঠ নবী করীম (স)-এর যুগে প্রচলিত ছিল। আরবে পূর্ব হইতেই এইরূপ প্রথা বিদ্যমান ছিল। তাই খায়বার বিজয়কালে নাইম দুর্গের দিকে রাসূলুল্লাহ (স) হযরত আলী (রা)-কে প্রেরণ করিলে ইয়াহূদী নেতা মারহাব তরবারি নাচাইতে নাচাইতে এই বীরত্ব ব্যঞ্জক পংক্তি উচ্চারণ করিতে করিতে অগ্রসর হইল:
قد علمت خیبر اني مرحب + شاك السلاح بطل محرب
اذا الحروب اقبلت تلمت "জানে খায়বার আমি মারহাব বীরপুরুষ সশস্ত্র বীর নখদর্পণে রচা আহব লড়াকু ব্যাঘ্র যবে হয় আগুনের সেও কাবু হয় বল্লম আর অসিতে ঘোর! ঘেঁষে না নিকট পালায় ভয়েতে অনন্তর"।
তাহার জবাবে মুসলিম পক্ষ হইতে আমের (রা), কা'ব ইবন মালিক ও শেরে খোদা আলী (রা) বীরত্বব্যঞ্জক কবিতা আবৃত্তি করিয়াছিলেন। কবি আমের (রা) বলিয়াছিলেনঃ
قد علمت خيبر انی عامر + شاکي السلاح بطل مغامر "জানে খায়বার আমি মহাবীর আমের হই অস্ত্রসজ্জা রণকুশলে যে পেছনে নই"। [সহীহ মুসলিম, খায়বার যুদ্ধ প্রসঙ্গ, ২খ., পৃ. ১২২; যী কারাদ যুদ্ধ প্রসঙ্গ, ২খ., পৃ. ১১৫; সহীহ বুখারী, খায়বার যুদ্ধ প্রসঙ্গ, ২খ., পৃ. ৬০৩; তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ৮০]
সীরাত ইবন হিশামের বর্ণনা হইতে জানা যায়, মারহাবের জবাবে কা'ব ইবন মালিক (রা) নিম্নরূপ পংক্তি উচ্চারণ করিতে করিতে অগ্রসর হইয়াছিলেন: জানে খায়বার আমি যে কবি শংকানাশী বীর বাহাদুর যবে হয় রণে সর্বত্রাসী যুদ্ধের আগুন জ্বলিয়া উঠিলে যুদ্ধ হয় চমকে অসি কর্তনকারী বিদ্যুৎময় এমনি দলন তোদের আমরা দলিব যে, কষ্টই তোদের পরিণত হবে সহজে। মারের বদলে হয়তো বা দেবো উচিত মার নয়তো লভিব গনীমত (রুখে সাধ্য কার?) এমন হস্তে নাই যাতে লেখা বক্রতার।
ইব্ন হিশাম আবূ যায়দ আনসারীর বরাতে কা'ব (রা)-এর নিম্নরূপ উক্তি শুনাইয়াছেন: জানে খায়বার আমি কবি (যাই যে বলি) স্বরূপে প্রকাশি সমর অগ্নি উঠিলে জ্বলি। যুদ্ধের মহাবিভীষিকা রাখি নিয়ন্ত্রণে দৃঢ়চেতা বীর লড়ি উদ্যমে অপরিসীম। সাথে তরবারি কর্তনকারী বিদ্যুৎপ্রায় উঠে যে চমকি কাপে না হস্ত বক্রতায়। খণ্ড খণ্ড করিব জানিস তোদের কেটে, (ফলে) কষ্টও আর কষ্ট রবে না মোটে। [সীরাতুন্নবী, ইবন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৩৫৩] অন্য বর্ণনায় আছে, মারহাব বলিয়াছিল: انا الذي سمتنى امى مرحب + شاك السلاح بطل مجرب "আমি সেই বীর যার মা নাম রাখিয়াছে মারহাব, অস্ত্রের সাজে অভিজ্ঞতায় আমি বীর পুঙ্গব"। তাহার মুকাবিলায় দ্বন্দ্বযুদ্ধে অগ্রসর হইয়া হযরত আলী (রা) বলিলেন: انا الذي سمتنى امى حیدره + كليث غابات كريمة المنظره "আমি সেই বীর যার মা নাম রাখিয়াছে হায়দার। গভীর বনের সিংহ যে আমি মূর্তি ভয়ঙ্কর"। [বর্ণনা মুসলিমের, দ্র. ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৩৬৭]
কথিত আছে যে, মারহাব পূর্বরাত্রিতে স্বপ্নে দেখিয়াছিল, একটি সিংহ তাহাকে রক্তাক্ত করিয়াছে। আলী (রা) স্বপ্নযোগে তাহা অবগত হইয়া তাহার জবাবে বলিলেন, হে মারহাব। আমি তোমার রাত্রিতে স্বপ্নে দেখা সেই সিংহ। এই বাক্যটি শোনামাত্র তাহার অন্তরাত্ম কাঁপিয়া উঠিল। তাহার সকল বীরত্ব কপূরের মত উবিয়া গেল এবং সে নিহত হইল। [যুরকানী, ২খ., পৃ. ২২৪]
ইব্ন কায়্যিম (র) বলেন, সহীহ মুসলিমের বর্ণনামতে, হযরত আলী (রা)-এর হাতেই মারহাব নিহত হয়। কিন্তু মূসা ইব্ন উক্বা ও যুহরী জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ (রা)-এর বরাতে বলেন, মারহাবের হত্যাকারী আসলে মুহাম্মাদ ইব্ন মাসলামা (রা)। মারহাব দ্বন্দ্বযুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর বীরগণকে আহবান জানাইলে তিনি তাঁহার ভাই মাহমূদ ইব্ন মাস্লামা-এর ঘাতক মারহাবকে হত্যা করিয়া ভ্রাতৃহত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের অনুমতি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট হইতে লাভ করেন এবং শেষ পর্যন্ত তাহাকে হত্যা করিতে সমর্থ হন।
আল-ওয়াকিদী বলেন, মুহাম্মাদ ইব্ন মাসলামার তরবারির আঘাতে মারহাবের পদযুগল বিচ্ছিন্ন হয়। তিনি এই বলিয়া তাহাকে ছাড়িয়া দেন, আমার নিহত ভাইয়ের মৃত্যুর যাতনাটি তুই এখন ভোগ কর। এই অবস্থায় হযরত আলী (রা) তাহার উপর চরম আঘাত হানিয়া তাহার দফা রফা করিয়া দেন এবং তাহার অস্ত্রশস্ত্র কাড়িয়া লন।
📄 যুদ্ধক্ষেত্রে গনীমত বণ্টনে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সুবিচার
উপরিউক্ত ব্যাপারটি রাসূলুল্লাহ (স)-এর গোচরীভূত করা হইলে হযরত আলী (রা) স্বীকার করিলেন যে, তিনি মারহাবকে পদযুগল বিচ্ছিন্ন ও মরণাপন্ন অবস্থায় পাইয়াছিলেন। সেইমতে রাসূলুল্লাহ (স) নিহত মারহাবের তরবারি, শিরস্ত্রাণ, বল্লম প্রভৃতি মুহাম্মাদ ইব্ন মাসলামাকে প্রদান করেন। ঐ তরবারিখানা মুহাম্মাদ ইব্ন মাসলামার বংশধরদের মধ্যে ছিল এবং উহাতে মারহাবের নাম খোদাইকৃত ছিল। [আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৯১-১৯২]
সেনাপতি ও সৈনিকের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ
ইহা ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতিরক্ষা কৌশলের অন্যতম নীতি। খায়বার যুদ্ধকালে রাসূলুল্লাহ (স) যখন একেবারেই দুর্গের নীচে শিবির স্থাপন করিলেন তখন হযরত হুবাব (রা) জিজ্ঞাসা করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই শিবিরের স্থান নির্বাচন কি ওহীর ভিত্তিতে? খায়বারের দুর্গবাসীরা তীরন্দাযীতে অত্যন্ত দক্ষ, আর আমাদের শিবির একেবারে তাহাদের লক্ষ্য সীমার মধ্যে পড়িয়া গিয়াছে। ইহা ছাড়া ঘন খেজুর বীথির মধ্য দিয়া আসিয়াও তাহারা বিপদের কারণ হইতে পারে। সাথে সাথে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার পরামর্শ গ্রহণ করিলেন এবং প্রায় ৪০০ খেজুর গাছ কর্তন করাইলেন। তিনি শিষ্যদের উৎসাহবোধক একটি খুৎবাও দিলেন। [সাইয়েদুল মুরসালীন, ২খ., পৃ. ৮০৮-৮০৯]
ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে কাবু করা
জেনারেল আকবর খান বলেন, “রাসূলুল্লাহ (স)-এর লড়াই করার উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধের পর শান্তি ফিরে আসবে এবং বিজেতা ও বিজিত উভয় পক্ষই আত্মিক, মানসিক ও সামাজিক প্রশান্তি ও তৃপ্তি লাভ করবে। এই লক্ষ্য সামনে রেখেই যুদ্ধে তিনি ঠিক ততটুকু মাত্র জীবন ও সম্পদহানি ঘটানোকে জায়েয রেখেছেন যতটুকু যুদ্ধ পরিসমাপ্তি ও শান্তি লাভের জন্য ছিল অপরিহার্য। অন্যথায় তিনি এমন যুদ্ধ পরিকল্পনা তৈরী করতেন না বা এমন সামরিক চাল চালতেন না যার ফলে দুশমন বিনা যুদ্ধেই ভীতিগ্রস্ত ও হতভম্ব হয়ে হিম্মত হারিয়ে যেতো আর অধিক রক্তক্ষয় ব্যতিরেকেই যুদ্ধের উদ্দেশ্য হাসিল হয়ে যেত। এই সামরিক কলাকৌশলকেই বৃটিশ প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ লীডল হার্ট-এর উক্তি মুতাবিক জার্মানীর প্রখ্যাত প্রতিরক্ষা পর্যবেক্ষক নিম্নোক্ত ভাষায় পুনরাবৃত্তি করেছেন : 'প্রতিরক্ষা কৌশলের সাহায্যে এমনভাবে কর্ম সম্পাদন করতে হবে যে, লড়াই ব্যতিরেকে অন্য পন্থায়ও শত্রুর উপর বিজয় সাধিত হয়'”। [ইসলামে প্রতিরক্ষা কৌশল, পৃ. ২১৯-২২০]
রাসূলুল্লাহ (স)-এর উক্ত নীতি সম্পর্কে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রতিটি মুসলিম যোদ্ধা সবিশেষ অবহিত ছিলেন। তাই আহ্যাব যুদ্ধের সময় বিশ্বাসঘাতক বনূ কুরায়যা যখন স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করে এবং তাহাদের একটি লোক মদীনার দুর্গে আশ্রয় গ্রহণকারী নারী ও শিশুদের খবর লইয়া তাহাদের উপর আক্রমণের পাঁয়তারা করিতেছিল তখন স্বয়ং নবী করীম (স)-এর ফুফু সাফিয়্যা (র) তাঁবুর একটি খুঁটি খুলিয়া লইয়া পশ্চাৎদিক হইতে লোকটির মাথায় এমন প্রচণ্ড আঘাত হানিলেন যে, তাহার মাথা চূর্ণ হইয়া গেল। তারপর ত্বরিৎ গতিতে তাহার শিরশ্ছেদ করিয়া তাহার খণ্ডিত মুণ্ডসহ তিনি দুর্গে প্রবেশ করিলেন। তারপর দুর্গের পশ্চাৎদিকে খণ্ডিত অংশটি এমনভাবে নিক্ষেপ করিলেন যে, শত্রুরা ভাবিল নিশ্চয়ই দুর্গের মধ্যে পুরুষ সৈন্যরা রহিয়াছে। অথচ সেখানে কোন পুরুষ যোদ্ধা ছিল না। কেবল ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমেই দুর্গটি বনু কুরায়যার ইয়াহুদীদের আক্রমণ হইতে রক্ষা পাইল। [সাইয়েদুল মুরসালীন, ২খ., পৃ. ৬৫৯-৬৬০]
খায়বার আক্রমণের তৃতীয় দিনে সা'ব দুর্গ দখলের উদ্দেশ্যে হযরত হুবাব (রা)-এর হস্তে পতাকা অর্পণ করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) যখন তাহাকে প্রেরণ করিলেন তখন একে একে ইউশা ও দাইয়ান নামক দুইজন ইয়াহুদী অবরুদ্ধ দুর্গ হইতে বাহির হইয়া আসিয়া তাঁহার মুকাবিলায় অগ্রসর হইল। তিনি প্রথমজনকে অসির আঘাতে হত্যা করিয়া দ্বিতীয় ইয়াহুদীকেও আঘাত করিলেন। যখন সেও নিহত হইল তখন তিনি তাহার শিরশ্ছেদ করিয়া কর্তিত মুণ্ডটি সজোরে অদূরে দাঁড়াইয়া থাকা, তাহার স্বগোত্রীয়দের দিকে নিক্ষেপ করিয়া বলিলেন, "লও, ইহা তোমাদের উপহার"। ভীত-সন্ত্রস্ত ইয়াহুদীরা তখন রণে ভঙ্গ দিয়া তাড়াতাড়ি দুর্গমধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করিল। রাসূলুল্লাহ (স) নিজে অশ্ব হইতে অবতরণ করিয়া মুসিলম যোদ্ধাগণকে উৎসাহ দিতেছিলেন। মুসলিম বাহিনী পলায়নরত ইয়াহুদীদের পশ্চাদ্ধাবন করিয়া বলপূর্বক দুর্গ মধ্যে ঢুকিয়া পড়িলেন। এইভাবে তৃতীয় দিবসে দুর্ভেদ্য সা'ব দুর্গও অধিকৃত হইল। সঞ্চিত বিপুল রসদ এবং বহু মিনজানিক (লোষ্ট্র বর্ষণ চক্র), দাব্বাবা, বর্ম ও তলোয়ার মুসলমানদের হস্তগত হইল। [প্রাগুক্ত, পৃ. ৮১৫]
নায়েম দুর্গ প্রথমেই অধিকৃত হইয়াছিল। ওয়াতীহ ও সুলালিম দুর্গ চৌদ্দ দিন পর্যন্ত অবরোধ করিয়া রাখার পরও যখন একটি লোকও দুর্গের বাহিরে আসিল না তখন ভয় প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ্ (স) মিনজানিক সন্নিবেশ করিলেন। তাহা দেখিয়া ইয়াহুদীরা প্রমাদ গণিতে লাগিল। তাহারা জীবনভিক্ষা চাহিয়া শর্তাধীনে সন্ধির প্রার্থনা জানাইল। [প্রাগুক্ত, পৃ. ৮১৬-৮১৭] এইরূপ শত্রুপক্ষকে ভীতি প্রদর্শনের ব্যাপারটি স্বয়ং আল-কুরআনের নির্দেশ। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
وَاعِدُوا لَهُمْ مَّا اسْتَطَعْتُمْ مِنْ قُوَّةٍ وَمِنْ رَبَاطِ الخَيْلِ تُرْهِبُونَ بِهِ عَدُوٌّ اللَّهِ وَعَدُوكُمْ وَأَخَرِينَ مِنْ دُونِهِمْ.
"তাহাদের মুকাবিলার জন্য তোমাদের সাধ্যমত শক্তি ও অশ্ববাহিনী প্রস্তুত রাখিবে; এতদ্বারা তোমরা সন্ত্রস্ত করিবে আল্লাহ্র শত্রুকে, তোমাদের শত্রুকে এবং এতদ্ব্যতীত অন্যদিগকে"। [৮: ৬০]
যাহা হউক, খায়বারের ইয়াহুদীগণ যখন নিশ্চিতভাবে বুঝিতে পারিল যে, তাহাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা আর নাই তখন তাহারা রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নিকট মিনতি জানায় যেন তিনি তাহাদিগকে হত্যা না করিয়া দেশান্তরিত করেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের এই মিনতি মানিয়া লইলেন। ইহারই মাধ্যমে মুসলমানদের হাতে গোটা খায়বারের পতন ঘটিল।
বুখারী, মুসলিম ও আবূ দাউদের হাদীছের দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, মহানবী (স) শেষ পর্যন্ত ইয়াহূদীদিগকে খায়বার হইতে দেশান্তরিত করেন নাই। তিনি এই শর্তে তাহাদিগকে সেখানে বসবাসের অনুমতি দিলেন যে, তাহারা নিজ খরচে সেখানকার জমিজমা চাষাবাদ করিবে এবং উৎপন্নজাত ফসলের অর্ধেক মুসলমানদেরকে প্রদান করিবে। কিন্তু ইহা শর্ত রহিল যে, মুসলমানগণ যত দিন ইচ্ছা তাহাদিগকে রাখিবে, যখন ইচ্ছা খায়বার হইতে বহিষ্কার করিয়া দেওয়ার অধিকারী থাকিবে। ইয়াহুদীদের আবেদন ও উদ্যোগেই এইরূপ চুক্তি হইয়াছিল। [সহীহ বুখারী, খায়বারবাসীদের প্রতি নবী করীম (স) এর আচরণ প্রসঙ্গ, ৭/৪৯৬; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল মুসাকাত, ৩/১১৮৬-৮৭; ফাতহুল বারী, ৫খ., পৃ. ১৬, ঐ ৫খ., পৃ. ২৩৯, কিতাবুশ শুরূত; সুনান আবূ দাউদ, কিতাবুল বুয়, ৩/৬৯৭; নাদ্রাতুন নাঈম, ১/৪৮৬, পাদটীকায়]
ফাদাকবাসিগণের নিকট খায়বার বিজয়ের সংবাদ পৌঁছিলে আল্লাহ তা'আলা তাহাদের অন্তরেও ভীতির সঞ্চার করিয়া দিলেন। তখন তাহারাও তাহাদের জীবন রক্ষার বিনিময়ে তাহাদের তাবৎ সম্পদ নবী করীম (স)-কে নযরানাস্বরূপ দিয়া দেশান্তরিত হওয়ার প্রস্তাব দিল। এইভাবে ফাদাকের সমস্ত সম্পত্তি নবী করীম (স)-এর অধিকারে চলিয়া আসিল। অতঃপর ওয়াদিল কুরা ও তায়মার ইয়াহুদীগণও অনুরূপ শর্তে তাহাদের তাবৎ সম্পদ ত্যাগ করে। খায়বারের ইয়াহূদীদিগকে তথাকার জমিজমা বর্গা দেওয়া হয়। [যাদুল মা'আদ, ১/৪০৫; নাদরাতুন নাঈম, ১/৪৮৭]