📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 খায়বার যাত্রা: কেবল পরীক্ষিত যোদ্ধাগণই অনুমতিপ্রাপ্ত

📄 খায়বার যাত্রা: কেবল পরীক্ষিত যোদ্ধাগণই অনুমতিপ্রাপ্ত


অবশেষে হিজরী' ৭ম সনের মুহাররাম মাসের শেষদিকে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার সেই পূর্ব কথিত 'শত্রুর দেশে গিয়া যুদ্ধ' করার উদ্দেশ্যে খায়বার অভিমুখে রওয়ানা হইলেন। পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে যে, আল্লাহ তা'আলা মুসলমানদিগকে প্রচুর গনীমত-সম্ভারের প্রতিশ্রুতি দিয়া ঐ সময়ই জানাইয়া দিয়াছিলেন যে, অচিরেই ঐ সমস্ত পশ্চাতে অবস্থানকারী ঐ সমস্ত লোক যাহারা মুসলমানদের কঠিন মুহূর্তে নানা অজুহাতে অভিযানে যাওয়া হইতে বিরত রহিয়াছে, গনীমত প্রাপ্তির আশায় তোমাদের সহিত অভিযানে যাইতে পরম আগ্রহী হইয়া উঠিবে। [৪৮: ১১, ১৫]
খায়বার অভিযানের সময় সেই সত্যটিই প্রকাশিত হইল। যাহারা পূর্বে নানা অজুহাতে পশ্চাতে থাকিয়া যাইবার জন্য সচেষ্ট ছিল গনীমতের লোভে এখন তাহারাও রাসুলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করিতে লাগিল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে প্রশ্রয় দিলেন না। তিনি ঘোষণা করিয়া দিলেন যে, কেবল ঐ সমস্ত লোকই যুদ্ধযাত্রার যোগ্য বিবেচিত হইবে, যাহারা প্রকৃতই জিহাদের জন্য আগ্রহী। সেই মতে, কেবল ঐ সকল জানবায সাহাবাগণই যুদ্ধ যাত্রার যোগ্য বিবেচিত হইলেন, যাহারা হুদায়বিয়ার বৃক্ষতলে রাসূলুল্লাহ (স)-এর হাতে মরণপণ বায়'আত (বায়'আত রিদওয়ান) গ্রহণ করিয়াছিলেন। তাঁহাদের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৪০০ (চৌদ্দ শত)। [ফাতহুল বারী, ৭/৪৬৫; যাদুল মা'আদ, ২/১০০; আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪০৯]
অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে গৃহীত রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই আদেশ ছিল অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত। কেননা বিভিন্ন যুদ্ধে, বিশেষত উহুদ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর সঙ্কটজনক মুহূর্তে মুনাফিকদের কাটিয়া পড়ায় যে মহাসঙ্কটের উদ্ভব হইয়াছিল, উহার পুনরাবৃত্তি ঘটানোর সুযোগ দান কোনমতেই বাঞ্ছনীয় ছিল না।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 শত্রুদের মিত্র বাহিনীকে বিচ্ছিন্ন রাখা

📄 শত্রুদের মিত্র বাহিনীকে বিচ্ছিন্ন রাখা


ইহা রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্যতম প্রতিরক্ষা কৌশল। আহযাব বাহিনীত্রয়কে পরস্পর হইতে কীভাবে কৌশলে বিচ্ছিন্ন করিয়া দেওয়া হইয়াছিল ইতোপূর্বে তাহা উল্লেখ করা হইয়াছে। এইবার খায়বারের নেতাদের মিত্র গাভাফানী বাহিনীর তাহাদের সাহাযার্থে আগাইয়া আসার সম্ভাবনা ছিল। মুনাফিক সর্দার আবদুল্লাহ ইবন উবায়্যি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সদলবলে খায়বার অভিমুখে রওয়ানা হওয়ার সাথে সাথে খায়বারবাসীদিগকে পত্রযোগে তাহা জানাইয়া দিয়াছিল। সাথে সাথে সে খায়বারের ইয়াহুদীদিগকে প্রবোধ দিয়াছিল যে, মুহাম্মাদ ও তাঁহার বাহিনীর তুলনায় সংখ্যায় তোমরা অনেক বেশী এবং তোমাদের সৈন্য ও অস্ত্র অনেক বেশী। মুহাম্মাদ স্বল্প সংখ্যক সঙ্গী এবং যৎসামান্য অস্ত্রশস্ত্র লইয়া যাত্রা করিয়াছেন, সুতরাং তোমাদের ভয়ের কোন কারণ নাই। সেমতে ইয়াহুদী নেতা কিনানা ইব্‌ন আবুল হুকায়ক এবং হাওযা ইব্‌ন কায়স গাতাফানীদের সাহায্য কামনায় তাহাদের এলাকায় ছুটিয়া গিয়াছিল। মুসলমানদিগকে পরাজিত করিতে পারিলে খায়বারের অর্ধেক ফসল গাতাফানীদিগকে দেওয়ার টোপও তাহারা দিয়াছিল।
রাসূলুল্লাহ (স) মদীনা হইতে রওয়ানা হইয়া সদলবলে আর-রাজী' নামক স্থানে গিয়া উপনীত হইলেন। গাতাফানীদের আবাসস্থল ঐ স্থান হইতে মাত্র একদিন এক রাত্রির পথের দূরত্বে অবস্থিত ছিল। গাতাফানীরা ততক্ষণে খায়বারের দিকে যাত্রা শুরু করিয়া দিয়াছে। পথিমধ্যে পিছন দিক হইতে শোরগোল শুনিতে পাইয়া তাহারা ভাবিল, নিশ্চয় মুসলিম বাহিনী তাহাদের জনপদে হামলা চালাইয়াছে। তাই আর অগ্রসর হওয়ার পরিবর্তে নিজেদের জনপদ রক্ষার তাগিদে তাহারা প্রত্যাবর্তনকেই সমীচীন মনে করিল। খায়বারের ইয়াহুদীদের শক্তি বর্ধনের জন্য যাওয়া তাহাদের আর হইয়া উঠিল না। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার সামরিক প্রজ্ঞা দ্বারা শত্রুবাহিনীকে তাহাদের বন্ধুদের হইতে সার্থকভাবে বিচ্ছিন্ন করিয়া দিলেন। [তাবারী, তারীখ, পৃ. ৫৭৫]

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সৈন্য পরিচালনায় হুদী গান

📄 সৈন্য পরিচালনায় হুদী গান


হযরত সালামা ইবনুল আকওয়া (রা) বর্ণনা করেন, আমরা নবী করীম (স)-এর সহিত খায়বারের পথে রওয়ানা হইলাম। সফরটি ছিল রাত্রিকালীন। জনৈক ব্যক্তি 'আমেরকে কিছু একটা শুনাইবার জন্য অনুরোধ করিলেন। তিনি ছিলেন কবি (তাই এরূপ আবদার লোকে তাহার নিকট করিতই)। তিনি সওয়ারী হইতে অবতরণ করিয়া হুদীর ছন্দে দরাজ কণ্ঠে আবৃত্তি করিতে লগিলেন :
اللهم لو لا انت ما اهتدينا ولا تصدقنا ولا صلينا فاغفر فداء لك ما اتقينا وثبت الاقدام ان لاقينا والقين سكينة علينا انا اذا صيح بنا ابينا وبالصياح عولوا علينا
“হে আল্লাহ! তুমি না থাকিলে পথের দিশা পেতাম না। না করিতাম সাদকা যাকাত না পড়িতাম তোমার সালাত যাবত থাকি তাকওয়া পথে করো মোদের মার্জনা নাযিল কর মোদের পরে তোমার শান্তি সাকীনা! বিপদে কেউ ডাকলে মোদের আমরা বসে থাকি না স্থির রাখিও যুদ্ধকালে যেন মোরা ভাগি না তারা নাও জানে যারা ডাকে আমরা বসে থাকি না”। [সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৬০৩; ইব্‌ন কাছীর, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ৩খ., পৃ. ৩৪৪-৩৪৫; মুসলিম, ২খ., পৃ. ১১৫]
তাহার এইরূপ হুদী (উট চালনার গান)। শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেনঃ কে এই হুদী গাহিতেছে? জনতা বলিল, আমের। আল্লাহর রাসূল (স) বলিলেনঃ আল্লাহ তাহার প্রতি রহম করুন! রাসূলুল্লাহ (স)-এর এইরূপ দু'আর অর্থ সকলের জানা ছিল। তাই সকলেই বুঝিয়া লইলেন, আমেরের শাহাদাত আসন্ন। উপস্থিত জনতার একজন বলিল, এখন তাহার জন্য (শাহাদাত) তো অবধারিত হইয়া গেল। হায়! তাঁহাকে দিয়া যদি আমাদিগকে আরও অধিক উপকৃত করা হইত। [সহীহ বুখারী, খায়বার যুদ্ধ প্রসঙ্গ, ২/৬০৩] সহীহ মুসলিমের হাদীছ হইতে জানা যায়, এইরূপ উক্তিকারী ব্যক্তিটি ছিলেন হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রা)। [সহীহ মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ, যী-কারাদ ও অন্যান্য যুদ্ধ প্রসঙ্গ, হাদীছ ৪৫২৬] উক্ত বর্ণনা হইতে প্রতীয়মান হয় যে, সৈন্যবাহিনীর চলার পথে বাহনকে উদ্দীপ্ত ও বাহিনীকে চাঙ্গা করার জন্য হুদী গানও রাসূলুল্লাহ (স)-এর সমর কৌশলের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর পঞ্চ বাহিনী আল-খামীস

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর পঞ্চ বাহিনী আল-খামীস


প্রত্যূষে গাত্রোত্থান করিয়া যদি কোন জনপদে আযানের শব্দ শুনিতে পাইতেন তাহা হইলে নবী করীম (স) আক্রমণ হইতে বিরত থাকিতেন। ঐ রাত্রি সেখানে যাপন করিয়া প্রত্যূষে যখন কোন আযানের ধ্বনি শুনিতে পাইলেন না তখন তিনি অতি প্রত্যুষে ফজরের নামায আদায় করিয়া সদলবলে সওয়ারীতে আরোহণ করিয়া খায়বারের দিকে অগ্রসর হইলেন। খায়বারের কৃষককূল তখন কোদাল-ঝুড়ি হাতে লইয়া মাঠের দিকে বাহির হইতেছে। রাসূলুল্লাহ (স) ও তাঁহার সৈন্যবাহিনীকে দেখিয়া তাহারা চীৎকার করিয়া উঠিল: محمد والله محمد والخميس "মুহাম্মাদ! আল্লাহ্র কসম, মুহাম্মাদ, আর তাঁহার গঠিত বাহিনী"।
তারপর তাহারা পলায়ন করিয়া তাহাদের নগরীর মধ্যে গিয়া প্রবেশ করিল। রাসূলুল্লাহ (স) তখন বলিলেন:
الله اکبر خربت خيبر الله اکبر خربت خیبر انا اذا نزلنا بساحة قوم فساء صباح المنذرين. "আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ! খায়বার ধ্বংস (বিজিত) হইল! আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ! খায়বার ধ্বংস হইল। আমরা যখন কোন সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণের জন্য উপনীত হই, তখন সতর্কীকৃত সম্প্রদায়ের প্রাতকাল কতই না মন্দ"। [সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৬০৩-৬০৪, খায়বার যুদ্ধ প্রসঙ্গ; অনন্তর কিতাবুস সালাত ও কিতাবুল আষানেও হাদীছখানা রহিয়াছে]
উক্ত বৰ্ণনা হইতে প্রতীয়মান হয় যে, নবী করীম (স)-এর সমর কৌশলের 'আল-খামীস' বা পঞ্চ বাহিনীর খ্যাতি তখন সুদূর খায়বারবাসীদের কানেও পৌঁছিয়াছিল এবং তাহাদের আগমনের আশঙ্কা তাহারা পূর্ব হইতেই করিত। বানু নষীরের উৎখাতে সেই ভীতি খায়বারেও ছাড়াইয়া পড়িবে উহাই ছিল স্বাভাবিক।
ইব্‌ন খালদূন বলেন, পৌত্তলিক আরবদের মধ্যে যে যুদ্ধরীতি প্রচলিত ছিল তাহা ছিল 'আল-কার ওয়াল ফার' ঝোপ বুঝিয়া কোপ মারার মত আক্রমণ আবার ত্বড়িৎ গতিতে সরিয়া পড়া। কিন্তু ইসলামের আবির্ভাবের প্রাক্কালে তাহারা অনারবদিগকে লইয়া সেনাবাহিনী (তাবি'আ) গড়িয়া তুলিতে শুরু করে। ইহা তাহারা করিয়াছিল দুইটি কারণে। প্রথমত, শত্রু পক্ষের যুদ্ধের মুকাবিলা একং দ্বিতীয়ত, স্বীয় বাহিনীকে অধিকতর অর্থবহ করিয়া গড়িয়া তোলা। তাহাদের বেপরোয়া লড়াইয়ের ক্ষেত্রে ইহাই ছিল অধিকতর সঠিক পদ্ধতি। পূর্ববর্তী লেখকগণ কর্তৃক 'আল-খামীস' নামে আখ্যায়িত এই পদ্ধতিতে সেনাবাহিনীকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করা হইত। প্রচলিতভাৰে এই ভাগগুলি ছিল : (১) কাল্ব (কেন্দ্র), (২) মায়মানা (দক্ষিণ বাহু), (৩) মায়সারা (বাম বাহু), (৪) মুকাদ্দামা (অগ্রবর্তী বাহিনী) ও (৫) সাকা (পশ্চাদরক্ষী বাহিনী)। ইন্ন খালদূন এই নয়া বিন্যাসকে যাহফ (বাহিনীর সম্মুখে অগ্রসর হওয়া) নামেও অভিহিত করিয়াছেন। তিনি বলেন, ইহা এমন এক রণপদ্ধতি যাহাতে সেনাবাহিনী সালাতের সারির মত বিভিন্ন সারিতে বিভক্ত হইয়া দাঁড়ায়। এই পদ্ধতিটি শত্রু বাহিনীর জন্য ছিল রীতিমত ভীতিকর। সাধারণত গাযওয়াসমূহে এবং বড় বড় সারিয়্যা অভিযানেও এই পদ্ধতি অবলম্বন করা হইত। উহুদ যুদ্ধকালে উহা পূর্ণরূপে চালু হয়। আল-ওয়াকিদীর খায়বার অভিযানের বিবরণে খামীস পদ্ধতির বিষয়টির স্পষ্ট উল্লেখ রহিয়াছে। হুনায়ন, তায়েফ ও খায়বার অভিযানেও খামীস পদ্ধতির কথা জানা যায়। মহানবী (স)-এর নেতৃত্বাধীন ইসলামী রাষ্ট্র যে সম্পূর্ণভাবে না হইলেও অন্তত পরীক্ষামূলকভাবে বদর যুদ্ধের অব্যবহিত পূর্ব হইতে তাবিয়া যুদ্ধকৌশল ও সেনাবিন্যাসে খামীস পদ্ধতি গ্রহণ করিয়াছিল। সময়ের সাথে সাথে উভয় পদ্ধতির উন্নয়ন, অগ্রগতি ও পূর্ণতা সাধন করিয়া ইসলামী বাহিনী এক সুদক্ষ যোদ্ধা বাহিনীতে পরিণত হইয়া বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম বাহিনীকে ধ্বংস করার ক্ষমতা অর্জন করে। [রাসূল মুহাম্মদ (স)-এর সরকার কাঠামো, পৃ. ১৫৫-১৫৮]

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00