📄 সহযোদ্ধাগণের দৃঢ়তায় চুক্তি সম্পাদন হইতে বিরত থাকা
আল্লাহর রাসূল (স) যেহেতু তাঁহার প্রিয় অনুসারিগণের প্রতি অত্যন্ত সদয় ছিলেন (بالمؤمنين رءوف رحيم) তাই খন্দকের যুদ্ধের সম্মিলিত কাফির বাহিনীর দীর্ঘ অবরোধে মুসলমানদের প্রাণান্তকর কষ্ট হইতেছে দেখিয়া এক পর্যায়ে তিনি বানু গাতাফানের সহিত প্রতি বৎসর খায়বারের উৎপন্নজাত খেজুরের এক-তৃতীয়াংশের বিনিময়ে চুক্তি করিতে মনস্থ করিয়া এই মর্মে একটি চুক্তিপত্র লিখাইয়া লইলেন। চুক্তিপত্রে স্বাক্ষরের পূর্বক্ষণে তিনি এই ব্যাপারে সাহাবীগণের পরামর্শ চাহিলেন। আওস ও খাযরাজ গোত্রপতিগণ সবিনয়ে জানিতে চাহেন যে, উহা কি ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত নির্দেশের ভিত্তিতে, নাকি আপনার ব্যক্তিগত অভিমত? ওহী ভিত্তিক নির্দেশ হইলে বলিবার কিছু নাই। আর যদি একান্তই আমাদের প্রতি অনুকম্পাবশত আপনার ব্যক্তিগত অভিমত হইয়া থাকে তাহা হইলে আরয করিব, ইসলাম-পূর্ব যুগে কোন দিন উহারা ক্রয় বা আপ্যায়ন সূত্রে ছাড়া মদীনার একটি খেজুর দানাও লাভ করিতে পারিত না। এখন যেহেতু ইসলাম দ্বারা আল্লাহ আমাদিগকে গৌরবান্বিত করিয়াছেন এবং আপনার যোগ্য নেতৃত্বে আমরা ঐক্যবদ্ধ হইয়াছি, কাজেই আমরা কেন এইরূপ হীনতা স্বীকার করিব? ফলে রাসূলুল্লাহ (স) সন্ধির এই আলোচনা স্থগিত করিয়া দেন। [মাজমা'উয যাওয়াইদ, ৬/১৩২; তাবাকাত ইবন সা'দ, ২/৭৩; সীরাত ইব্ন হিশাম, ৩/১১০-৩১১; নাদরাতুন নাঈম, ১/৪৭৫-৪৭৮]
সাহাবীগণের, পরামর্শকে যে রাসূলুল্লাহ (স) কীরূপ মূল্যায়ন করিতেন, তাঁহার নিজের অভি finishingেতের উপর তাহাদের পরামর্শকে অগ্রাধিকার দিয়া উহুদ যুদ্ধের সময়ের মত খন্দকের যুদ্ধেও সেই প্রমাণ রাখিলেন।
📄 আল্লাহ্র দরবারে ফরিয়াদ ও বিজয় প্রার্থনা
রাসূলুল্লাহর (স) দু'আকে মুমিনের অস্ত্র বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছেন। তিনি বলেন: الدعاء سلاح المؤمن . "দু'আ হইল মু'মিনের অস্ত্র"। الدعاء مخ العبادة "দু'আ হইতেছে ইবাদতের সারনির্যাস"।
জিহাদ একটি সর্বোৎকৃষ্ট ইবাদত এবং জিহাদে অস্ত্রের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। রাসূলুল্লাহ (স) জিহাদের ময়দানে বারবার এই অস্ত্র প্রয়োগ করিয়াছেন। মুসনাদে আহমাদের হাদীছে আছে : আবু সাঈদ খুদরী (রা) বর্ণনা করেন, অবরোধের ফলে আমাদের কষ্টের কথা বলিয়া আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-কে দু'আ করিবার জন্য আবেদন জানাইলে তিনি বলিলেন, তোমরা এইভাবে দু'আ করিবেঃ اللهم استر عوراتنا + وامن روعاتنا . “হে আল্লাহ! আমাদের ত্রুটিসমূহকে গোপন করুন এবং আমাদের ভয়-ভীতি দূর করিয়া দিন"।
সহীহ বুখারীর হাদীছে আছে, রাসূলুল্লাহ (স) তখন এইভাবে দু'আ করেন- اللهم منزل الكتاب ومجرى السحاب وهازم الاحراب واهزمهم وانصرنا عليهم. "হে কিতাব নাযিলকারী, মেঘমালা পরিচালনাকারী ও যূথবদ্ধ বাহিনীকে পরাস্তকারী আল্লাহ! উহাদিগকে পরাস্ত করুন এবং উহাদের বিরুদ্ধে আমাদিগকে জয়যুক্ত করুন"।
মুসনাদে আহমাদ ও তাবাকাতে ইবন সা'দের বর্ণনায় আছে যে, নবী করীম (স) মসজিদে আহযাবে হাত উঠাইয়া দণ্ডায়মান অবস্থায় এইরূপ দু'আ করিয়াছিলেন। আবূ নু'আয়মের রিওয়ায়াতে সূর্য পশ্চিম দিকে ঢলিয়া পড়ার পর দু'আটি করিয়াছিলেন বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছে। [যুরকানী, ২খ., পৃ. ১২০, পাদটীকায়]
আল্লাহ তা'আলা তাঁহার এই দু'আ কবুল করেন। ফলে পূর্ব কথিত ঝঞ্ঝাবায়ু প্রবাহিত হইয়া কাফির বাহিনীর সবকিছু তছনছ করিয়া দেয় এবং তাহারা পালাইয়া যাইতে বাধ্য হয়। হুযায়ফা (রা)-কে কাফির বাহিনীর মধ্যে গুপ্তচরবৃত্তির জন্য প্রেরণকালে আল্লাহর রাসূল দু'আ করিয়াছিলেন:
اللهم احفظه من بين يديه ومن خلفه وعن يمينه وعن شماله ومن فوقه ومن تحته. “হে আল্লাহ! তুমি তাহাকে সম্মুখ দিক, পশ্চাৎ দিক, ডান দিক, বাম দিক, ঊর্ধ্ব ও অধঃ দিক হইতে হিফাযত করিও"। [যুরকানী, ২খ., পৃ. ১১৮]
পরদিন ভোরের আকাশ ছিল নির্মল মেঘমুক্ত। দীর্ঘ অবরোধের পর মদীনাবাসীদের জীবনে আবার স্বচ্ছন্দের হাতছানি। সদলবলে ঘরে ফিরিতে ফিরিতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুখে উচ্চারিত হইল:
لا اله الا الله وحده لاشريك له له الملك وله الحمد وهو على كل شيئ قدير. آیبون تائبون عابدون ساجدون لربنا حامدون صدق الله وعده ونصر عبده وهزم الاحزاب وحده. "আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই। তিনি এক-লা শরীক। রাজ্য তাঁহারই, প্রশংসাও একমাত্র তাঁহারই। তিনি সর্বশক্তিমান। আল্লাহর দিকে রুজুকারী, তওবাকারী, ইবাদতকারী, সিজদাকারী, আমাদের প্রভুর স্তুতিকারীরূপে (আমরা ঘরে ফিরিতেছি)। আল্লাহ তাঁহার ওয়াদাকে সত্য করিয়া দেখাইয়াছেন, তাঁহার বান্দাকে সাহায্য করিয়াছেন এবং সম্মিলিত বাহিনীকে তিনি একাই পরাস্ত করিয়াছেন"। [বুখারী, ২খ., পৃ. ৫৯০]
শরীফে উদ্ধৃত হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান (রা)-এর মুসলিম রিওয়ায়াত হইতে জানা যায় যে, খন্দকের যুদ্ধের অবরোধ চলাকালে রাসূলুল্লাহ (স) সর্বক্ষণিকভাবে দু'আ করিয়া চলিয়াছিলেন:
اللهم منزل الكتاب سريع الحساب اهزم الاحزاب. “হে কিভাব অবতরণকারী ও দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী আল্লাহ! সম্মিলিত বাহিনীকে পর্যুদস্ত ও প্রকম্পিত করিয়া দিন"। [বুখারী, কিতাবুল জিহাদ, ১খ., পৃ. ৪১১; মুসলিম, ৬খ., পৃ. ১৯০, হাদীছ নং ৪৩৯৩; কিতাবুল মাগাযী, ২খ., পৃ. ৫৯০]
মুসলমানদের চরম দুর্দিনে মদীনা অবরোধের বিপদজনক মুহূর্তে বানু কুরায়যা ইয়াহুদী গোষ্ঠী চুক্তিভঙ্গ করিয়া শত্রুবাহিনীতে যোগ দেওয়ার দুঃসংবাদ শ্রবণে বিমূঢ় মুহূর্তে নবী করীম (স)-এর পবিত্র যবানে উচ্চারিত হইল:
حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ. "আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট। তিনিই আমাদের উত্তম কর্মনির্বাহক"। [৩: ১৭৩]
রাসূলুল্লাহ (স) এইরূপ দু'আ করিয়াছেন বদর রণাঙ্গনে, তায়েফে, হুনায়নে, মক্কা বিজয়কালে, আরও কত যুদ্ধে ও বিপদাপদে। বদরের যুদ্ধের দিন যখন উভয় পক্ষে তুমুল যুদ্ধ চলিতেছিল তখন তিনি ছাউনীতে কিবলামুখী হইয়া আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ জানাইতেছিলেন:
اَللّٰهُمَّ اَنْجِزْ لِىْ مَا وَعَدْتَّنِىْ اَللّٰهُمَّ اِنْ تُهْلِكُ هٰذِهِ الْعِصَابَةَ مِنْ اَهْلِ الْاِسْلَامِ لَا تُعْبَدُ فِى الْاَرْضِ.
“হে আল্লাহ! আপনি আমাকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়াছেন তাহা পূরণ করুন! হে আল্লাহ! মুসলমানদের এই ক্ষুদ্র দলটি যদি আজ ধ্বংস হইয়া যায়, তাহা হইলে পৃথিবীবক্ষে আর আপনার ইবাদত হইবে না”।
📄 গুপ্তচর অস্ত্রধারণ করিবে না
সাধারণত একটি যুদ্ধে কেবল সশস্ত্র যোদ্ধাগণই থাকে না, উহাতে যোদ্ধা ছাড়াও গুপ্তচর, সেবক-সেবিকা প্রভৃতি বিভিন্ন শ্রেণীর লোক থাকে এবং তাহাদের কাহারও ভূমিকাকে খাটো করিয়া দেখার উপায় নাই। আধুনিক যুগে প্রতিটি সেনা বাহিনীর সহিত ইঞ্জিনিয়ারিং কোর এবং মেডিকেল কোরও রীতিমত বাহিনীর সৈন্য ছাতা ও পদস্থ কর্মকর্তার মর্যাদায় যুদ্ধে শামিল থাকেন। উহুদ যুদ্ধে আমরা প্রত্যক্ষ করিয়াছি যে; পঞ্চাশজন তীরন্দাজকে কেবল গিরিশৃঙ্গ পহরায় নিযুক্ত রাখা হইয়াছিল এবং যুদ্ধের জয় বা পরাজয় কোন অবস্থায় তাঁহাদিগকে ঐ স্থান ত্যাগ করিতে নিষেধ করিয়া দেওয়া হইয়াছিল। খন্দকের যুদ্ধে আমরা লক্ষ্য করিলাম তীব্র শীতের রাত্রিতে অন্ধকারের মধ্যে হযরত হুযায়ফা (রা)-কে শত্রুশিবিরে রাসূলুল্লাহ (স) প্রেরণ করিলেন এবং সাথে সাথে তাঁহাকে সতর্ক করিয়া দিয়া বলিলেন :
اذْهَبْ فَأْتِنِي بِخَبَرِ الْقَوْمِ وَلاَ تَذْعَرْهُمْ عَلَيَّ.
“যাও, সম্প্রদায়ের সংবাদ লইয়া আস! কিন্তু উহাদিগকে আমার উপর ক্ষেপাইবার মত কোন উস্কানিমূলক কাজ করিয়া বসিও না।” [মুসলিম, ৩/২98]
মুসলিমের ঐ হাদীসেই হুযায়ফার নিজের বর্ণনা :
فَلَمَّا وَلَّيْتُ مِنْ عِنْدِهِ جَعَلْتُ كَأَنَّمَا أَمْشِى فِى حَمَّامٍ حَتَّى أَتَيْتُهُمْ فَرَأَيْتُ أَبَا سُفْيَانَ يَصْلَى ظَهْرَهُ بِالنَّارِ تَوَضَّعْتُ سَهْمًا فِى كَبْدِ الْقَوْسِ فَأَرَدْتُ أَنْ أَرْمِيَهُ فَذَكَرْتُ قَوْلَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلَوْ رَمَيْتُهُ لَأَصَبْتُهُ.
“যখন আমি নবী করীম (স)-এর নিকট হইতে প্রস্থান করিলাম তখন আমার নিকট মনে হইতেছিল যে, আমি যেন হাম্মামের উষ্ণ পানিতে বিচরণ করিতেছি (অর্থাৎ তীব্র শীতের রাত্রিতেও শীত বোধ করিতেছিলাম না)। চলিতে চলিতে আমি তাহাদের একেবারে নিকটে চলিয়া গেলাম। লক্ষ্য করিলাম আবু সুফিয়ান আগুনে তাহার পিঠ সেঁকিতেছে। আমি তীর নিক্ষেপ করিতে মনস্থ করিয়া ধনুর্কে তাহা সংযোজনও করিলাম, এমন সময় আমার মনে পড়িয়া গেল রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে বলিয়া দিয়াছেন, “উস্কানিমূলক এমন কিছু করিও না যাহাতে উহারা আমার প্রতি ক্ষিপ্ত হইয়া উঠে” (তাই আমি তীর নিক্ষেপে বিরত রহিলাম)। ‘যদি আমি তীর নিক্ষেপ করিতাম তাহা হইলে উহা অবশ্যই লক্ষ্যভেদ করিত’”। [মুসলিম, ৩/ ১৪১৪-১৪১৫; যুরকানী, ২খ., পৃ. ১১৮; আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা আস্-সাহীহা, ২খ., পৃ. ৪০১]
খন্দকের অবরোধ সমাপ্ত হইলে নবী করীম (স) প্রত্যাবর্ত্তনকালে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দান করিলেন :
الان نَغْزُوهُمْ وَلاَ يَغْزُونَنَا نَحْنُ نَسِيرُ إِلَيْهِمْ.
“এখন হইতে আমরা তাহাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করিব, তাহারা আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা আর করিতে পারিবে না। আমরাই বরং তাহাদের উদ্দেশ্যে যাত্রা করিব”।