📄 আঁধার রাতে আলোর ঝলকানী
রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, الحرب خدعة "যুদ্ধ কৌশলমাত্র"। অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্রে কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে শত্রুকে পরাস্ত করা দূষণীয় নহে। [বুখারী, কিতাবুল জিহাদ, হাদীছ নং ২৮০৪-২৮০৫] খন্দকের প্রায় এক মাসব্যাপী প্রাণান্তকর অবরোধ ও মুসলমানদের বিব্রতকর অবস্থার অবসানকল্পে একটি কূটনৈতিক কৌশল অত্যন্ত কার্যকরী প্রতিপন্ন হয়।
নু'আয়ম ইবন মাসউদ ইব্ন আমের নামক গাতাফান গোত্রের এক ব্যক্তি একদিন রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে উপস্থিত হইয়া তাহার ইসলাম গ্রহণের কথা তাঁহাকে অবগত করিলেন এবং আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার ইসলাম গ্রহণের কথা কিন্তু কাফিররা ঘুণাক্ষরেও টের পায় নাই। এখন আপনি আমাকে যেই নির্দেশ দিবেন আমি তাহা পালন করিতে ত্রুটি করিব না। মহানবী (স) বলিলেন, তুমি তো একজন মাত্র ব্যক্তি (দলবল লইয়া সাহায্য করা তো আর তোমার পক্ষে সম্ভবপর নহে। অতএব পরিস্থিতির চাহিদামতো তুমি যাহা সমীচীন মনে কর তাহাই কর।
সেই মতে ন'অয়ায়ম ইবন মাসউদ বাহির হইয়া পড়িলেন। সর্বপ্রথম তিনি বানু কুরায়যা গোত্রের কাছে উপস্থিত হইয়া তাহাদের সহিত তাহার ঘনিষ্ঠভা ও সহানুভূতি প্রকাশ করিলেন। তিনি তাহাদিগকে বলিলেন, তোমরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত বাহিনীতে যোগদান করিয়াছ বটে, কিন্তু তাহার পরিণাম কী হইতে পারে তাহা কি চিন্তা করিয়া দেখিয়াছ? কুরায়শ আর গাতাফানীদের কী! যুদ্ধে জয় হইলে তো ভাল কথা, নতুবা তাহারা তাহাদের পথে চলিয়া যাইবে। তারপর মুহাম্মাদ ও তাহার অনুসারীদের রোষানল পড়িবে তোমাদের উপর। কুরায়শ ও গাতাফানীরা তাহাদের স্ত্রী-পুত্র তাঁহাদের দেশে রাখিয়া আসিয়াছে। তোমাদের অবস্থা কিন্তু তাহা নহে। মদীনা তোমাদের শহর; স্ত্রী পুত্র-পরিজন লইয়া তোমরা কোথায় গিয়া দাঁড়াইবে? ইহা ছাড়া বানু কায়নুকা ও বানু নাযীরের পরিণাম তো তোমরা স্বচক্ষেই দেখিয়াছ। তবুও নির্বাসনে যাওয়াকালে তাহারা তো অস্থাবর ধন-সম্পদ সাথে লইয়া যাইতে পারিয়াছে যদি কুরায়শ ও গাভাফানীরা সত্য সত্য রণেভঙ্গ দিয়া চলিয়া যায়' তাহা হইলে ভোমাদের উপায়টা কী হইবে? তাহারা বলিল, তথাস্থ! এখন উপায়?
বিজ্ঞের মত মাথা নাড়িয়া নুআয়ম বলিলেন, উপায় একটা আছে বৈ কি! তবে ব্যাপারটা তোমাদিগকে গোপন রাখিতে হইবে। তাহারা গোপনীয়তার নিশ্চয়তা দিলে তিনি বলিলেন, তোমরা কুরায়শদের কয়েকজনকে মুচলেকাস্বরূপ না রাখিয়া যুদ্ধে যোগ দিবে না। বানু কুরায়যার লোকজন উহার প্রতি সমর্থন জালাইয়া বলিল, কী একটা উপযুক্ত পরামর্শ না আপনি আমাদিগকে দিয়াছেন! দু'আয়ম (রা) উপলব্ধি করিলেন যে, তাহার প্রথম তীরটি লক্ষ্য ভেদ করিতে সমর্থ হইয়াছে।
এবার তিনি কুরায়শদের তাঁবুতে গিয়া বলিলেন, আপনাদের সহিত আমার দীর্ঘ দিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা আপনারা নিশ্চয় স্বীকার করিবেন। তাহারা একবাক্যে বলিল, কেন নয়? আপনি তো আমাদের অনেক পুরাতন বন্ধু। তিনি বলিলেন, সেইজন্য তো আপনাদের কাছে আসিয়াছি। ইয়াহুদীরা কিন্তু মুহাম্মাদের সহিত চুক্তিভঙ্গের জন্য অত্যন্ত অনুতপ্ত ও লজ্জিত। এখন আপনাদের কিছু লোককে মুচলেকাস্বরূপ নিজেদের কাছে রাখিয়া উহাদিগকে তাহারা মুহাম্মাদের হাতে তুলিয়া দিবার মতলব আঁটিতেছে। তাহারা হাড়ে হাড়ে বজ্জাত। আপনারা কোনক্রমে তাহাদের হাতে আপনাদের কোন লোককে মুচলেকাস্বরূপ দিতে রাজী হইবেন না। তারপর তিনি গাতাফান গোত্রের কাছে গিয়া বলিলেন, তোমরা তো আমার স্বগোত্রীয় ও আত্মীয়-স্বজন। একটি গোপন কথা বলিতেছি, গোপন রাখিও। এই কথা বলিয়া তিনি কুরায়শদিগকে যাহা বলিয়াছিলেন উহার পুনরাবৃত্তি করিলেন। এইভাবে সম্মিলিত বাহিনীর পক্ষের মধ্যে মহা অবিশ্বাস ও ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হইল।
তারপর আবু সুফ্যান যখন যুদ্ধ শেষ করার জন্য মুসলিম বাহিনীর উপর একযোগে চরম আঘাত হানিবার জন্য বানু কুরায়যাকে প্রস্তুত হইতে অনুরোধ করিলেন তখন তাহারা কুরায়যা কতিপয় লোককে মুচলেকাস্বরূপ তাহাদের কাছে না রাখিলে এত বড় ঝুঁকি গ্রহণে তাহাদের অপারগতার কথা জানাইয়া দিল। নুআয়মের সতর্কবাণীর সত্যতা কুরায়শ পক্ষ প্রত্যক্ষ করিল। কুরায়শ পক্ষ যখন তাহাদের একজনকেও মুচলেকাস্বরূপ রাখিতে রাজী হইল না, তখন বানু কুরায়যা গোত্রেরও তাহাদের প্রতি অবিশ্বাস বাড়িয়া গেল। এইভাবে নুআয়ম (রা)-এর কূটনৈতিক কৌশলের ফলে সম্মিলিত বাহিনীর মধ্যে ভাঙ্গন দেখা দিল এবং তাহারা দ্বিধাবিভক্ত হইয়া পড়িল। [ইবন হিশাম, সীরাতুন্নবী, ৩খ., পৃ. ২২১-২২২, ইফাবা]
এদিকে প্রচণ্ড শীতের মধ্যে পূর্বদিক হইতে প্রবল বাতাস প্রবাহিত হইয়া অবরোধকারী বাহিনীর সবকিছু লণ্ডভণ্ড করিয়া দিল। উনুনস্থ বৃহদাকার ডেগ ও কড়াই উল্টাইয়া অগ্নি নির্বাপিত হইয়া এবং তাঁবুসমূহের রজ্জু ছিড়িয়া ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হইয়া রাত্রির ঘন অন্ধকারে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হইল। তাহাদের মালামাল দিকবিদিক বিক্ষিপ্ত হইল। অশ্বগুলি বাঁধনমুক্ত হইয়া পলায়ন করিল। লোকজন বালুরাশির নীচে চাপা পড়িবার উপক্রম হইল। তাহাদের চক্ষু অন্ধ হইবার উপক্রম হইল। চতুর্দিকে বজ্র গর্জনের শোঁ শোঁ শব্দ হইতে লাগিল। বায়ু প্রবাহের সহিত আসমানী ফেরেশতাকুল নামিয়া আসিয়া অস্ত্রের ঝনঝনানীতেও আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে শত্রুদলের অন্তরে ভীতি ও ব্যাকুলতার সৃষ্টি করিলেন। সেনাপতি আবু সুফ্যান বলিল, অশ্বগুলি হালাক হইয়া গেল। বানু কুরায়যা বিশ্বাসঘাতকতা করিল। প্রবল বাতাস আমাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত করিয়া ফেলিল। কুরায়শ বাহিনী! আর এখানে নয়, এবার দেশে ফিরিয়া চল। মুসলমানদের প্রতি মহান আল্লাহর এই মহা অনুগ্রহের কথাই ব্যক্ত হইয়াছে এইভাবে:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ جَاتَتْكُمْ جُنُودٌ فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ رِيحًا وجُنُودًا لَّمْ تَرَوْهَا وَكَانَ اللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرًا.
"হে মু'মিনগণ! তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ কর, যখন শত্রু বাহিনী তোমাদের বিরুদ্ধে সমাগত হইয়াছিল এবং আমি উহাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করিয়াছিলাম ঝঞ্ঝাবায়ু এবং এক বাহিনী যাহা তোমরা দেখ নাই। তোমরা যাহা কর আল্লাহ তাহার সম্যক দ্রষ্টা"। [৩৩:৪৯]
রাসূলুল্লাহ (স) এই প্রসঙ্গে বলেনঃ "আমি সাহায্যপ্রাপ্ত হইয়াছি প্রাচ্য-বাত্যায় এবং কওমে আদ হালাক হইয়াছে প্রতীচ্য বাত্যায়"। সেদিন ফেরেশতা বাহিনীসমূহ প্রেরিত হইয়াছিল শত্রুদের মনে ভয়-ভীতি সৃষ্টির জন্য, যুদ্ধের জন্য নহে। ইহাতে নিশ্চয়ই আল্লাহর হিকমত রহিয়াছে। কেননা পরবর্তী কালে আবু সুফ্যান ও ইকরামাসহ তাহাদের অনেকেই মহানবী (স)-এর প্রতিরক্ষা কৌশলে মুগ্ধ হইয়া ইসলাম গ্রহণ করিয়া দীনের সেবায় আত্মনিয়োগ করিয়াছিলেন।
📄 যুদ্ধ কৌশলমাত্র
রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, الحرب خدعة "যুদ্ধ কৌশলমাত্র"। অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্রে কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে শত্রুকে পরাস্ত করা দূষণীয় নহে। [বুখারী, কিতাবুল জিহাদ, হাদীছ নং ২৮০৪-২৮০৫] খন্দকের প্রায় এক মাসব্যাপী প্রাণান্তকর অবরোধ ও মুসলমানদের বিব্রতকর অবস্থার অবসানকল্পে একটি কূটনৈতিক কৌশল অত্যন্ত কার্যকরী প্রতিপন্ন হয়।
📄 গুপ্তচর বৃত্তি প্রতিরক্ষার অন্যতম উপাদান
যে কোন যুদ্ধে গুপ্তচরদের বিরাট ভূমিকা থাকে। গুপ্তচরদিগকে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে কাজে লাগানো ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতিরক্ষা কৌশলের অন্যতম। এই গুরুদায়িত্বে প্রেরণ কালে হুযায়ফা (রা)-কে তিনি কিয়ামতের দিন তাঁহার নিজের সাহচর্যের ওয়াদা দিয়াছিলেন। [মুসলিম, ৩/১৪১৪]
ঝড়ের দাপটে, শীতের তীব্রতায়, ফেরেশতাগণের অস্ত্রের ঝনঝনানী ও তাকবীর ধ্বনিতে ভগ্নহৃদয় কুরায়শ বাহিনী যখন দেশে ফিরিয়া যাইবার জন্য ব্যগ্র, আবূ সুফ্যান যখন তমসাচ্ছন্ন রাত্রিতে তাহার বিপর্যস্ত বাহিনীকে ফেরত চলিয়া যাইবার নির্দেশ দিতেছিলেন তখন তিনি বলিতেছিলেন, কুরায়শ সেনাগণ! নিজ নিজ পার্শ্বের লোকগুলিকে চিনিয়া লও এবং গুপ্তচর হইতে সাবধান থাক! রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রত্যুৎপন্নমতি গুপ্তচর সাহাবী হুযায়ফা (রা) তখন তাহাদের মধ্যে অবস্থান করিতেছিলেন। তিনি অন্ধকারের মধ্যে হাত বাড়াইয়া সাথে সাথে তাহার ডান পার্শ্বস্ত লোকটির হাত ধরিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কে হে! উত্তর আসিল, মু'আবিয়া। বাম পার্শ্বস্থ লোকটির হাত ধরিয়া পরিচয় জিজ্ঞাসা করিতেই উত্তর আসিল, আমর ইবনুল 'আস। মধ্যবর্তী এই লোকটি যে তাহাদের শত্রুপক্ষের গুপ্তচর উহা কেহ ঘুণাক্ষরেও অনুমান করিতে পারিল না।
তারপর সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ ও আমর ইবনুল আসকে পরিখা মুখে ২০০ অশ্বারোহীসহ পাহারায় রাখিয়া কুরায়শদের বীরপুরুষগণ স্বদেশের পথে রওয়ানা হইল। তাহাদের আশঙ্কা ছিল পৃষ্ঠ প্রদর্শনরত পর্যুদস্ত কুরায়শ বাহিনী মুসলমানদের আক্রমণের শিকার হইতে পারে। ফেরেশতা বাহিনী হামরাউল আসাদ পর্যন্ত কুরায়শ বাহিনীর পশ্চাদ্ধাবন করিয়া তাহাদিগকে বিতাড়িত করিয়া আসেন। কুরায়শদের রওয়ানা হওয়ার সংবাদ পাইয়া গাতাফানী বাহিনীও রওয়ানা হইয়া গেল এবং অবরোধ পরিহার করিয়া বানু কুরায়যা দুর্গে গিয়া প্রবেশ করিল। সমগ্র আরবের যুদ্ধ বাহিনীর এইভাবে ব্যর্থ মনোরথ হইয়া প্রত্যাবর্তনের ঘটনাটি আল-কুরআনে অনাগত কালের লোকদের জন্য একটি শিক্ষণীয় বিষয় হইয়া রহিল! আল্লাহ তা'আলা এই প্রসঙ্গে বলেন:
وَرَدَّ اللهُ الَّذِيْنَ كَفَرُوا بِغَيْظِهِمْ لَمْ يَنَالُوا خَيْرًا وَكَفَى اللَّهُ الْمُؤْمِنِيْنَ الْقِتَالَ وَكَانَ اللَّهُ قويًّا عَزِيزاً .
"আল্লাহ কাফিরদিগকে ক্রুদ্ধাবস্থায় ফিরাইয়া দিলেন, তাহারা কোন কল্যাণ লাভ করে নাই। যুদ্ধে মুমিনদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। আল্লাহ সর্বশক্তিমান পরাক্রমশালী"। [৩৩: ২৫]
📄 যুদ্ধকৌশল হিসাবে সমর সঙ্গীত বা উদ্দীপনামূলক কবিতা পাঠ
যুদ্ধকালে সমর সঙ্গীত বা উদ্দীপনামূলক কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে আপন বাহিনীকে চাঙ্গা করিয়া তোলার প্রয়াসও এই যুদ্ধে লক্ষণীয়। পরিখা খননের কঠিন কাজে স্বয়ং আল্লাহর রাসূল (স) দৈহিকভাবে অংশগ্রহণ করেন। কোদাল চালনা করিতে, মাটি বহন ইত্যাদি কাজে তিনি সাহাবীগণের সঙ্গে ছিলেন। তাঁহার নূরানী বদন ধুলি ধুসরিত হয় সমস্ত দেহ ধূলা-বালিতে আচ্ছন্ন হইয়া যায়। [সহীহ বুখারী, ৫/৪৭; সহীহ মুসলিম, ৩/১৪৩০; ফাতহুল বারী, ৭/৩৯৫] কঠিন শিলা ভাঙ্গিতে গিয়া তিনি সোৎসাহে গাহিয়া উঠিলেন:
اللهم لو لا انت ما اهتدينا ولا تصدقنا ولا صلينا فانزلن سكينة علينا وثبت الاقدام ان لاقينا ان الأولى قد بغوا علينا وان ارادوا فتنة ابينا
"হে আল্লাহ! তুমি না থাকিলে পথের দিশা পেতাম না, না করিতাম সাক্কা-যাকাত, না পড়িতাম তোমার সালাত। নাযিল কর মোদের প্রতি তোমার সাকীনা (শান্তি), তওফীক দাও যুদ্ধে যেন আমরা ভাগি না। মুশরিকরা মোদের প্রতি করছে বাড়াবাড়ি, তারা যদিও অশান্তি চায় আমরা না চাহি"। [সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৫৮৯, হাদীছ নং ২৮০৮; সহীহ মুসলিম, ২খ., পৃ. ১১২, হাদীছ নং ৪৫১৮]
মুসলমানগণ গর্বের সহিত মাটির ঝুড়ি লইয়া দৌড়াইতে দৌড়াইতে তাহাদের বায়'আতবদ্ধ হওয়ায় কথা ঘোষণা করিতেছিলেন গানের সুরে:
نحن الذين بايعوا محمدا - على الجهاد ما بقينا ابدا "আমরা সেই জাত মুহাম্মাদের হাতে নিলাম পণ। ইসলামে থাকবো অটল সারাটি জীবন"। [সহীহ মুসলিম, ২খ., পৃ. ১১৩]
জবাবে নবী করীম (স) বলিতেছিলেন-
اللهم لا عيش الا عيش الآخرة - فاغفر الانصار والمهاجرة "শান্তি-সুখ আখিরাতে দুনিয়ার জীবন জীবন না, আনসার ও মুহাজিরে আল্লাহ কর তুমি মার্জনা"। [মুসলিম, হাদীছ নং ৪৫২১]
আর-রাওদুল উনুফের বিবরণ হইতে জানা যায়, সর্বপ্রথম মহানবী (স) কোদাল হাতে লইয়া পরিখা খনলের উদ্দেশ্যে কোপ দিতে দিতে গাহিয়া উঠিলেন:
بسم الله وبه بدينا + ولو عبدنا غيره شقينا + حبذا ربا وحبذا دينا
"বিসমিল্লাহ আল্লাহর নামে শুরু করিলাম, অন্যেরে পুঁজিলে নিজে আভাগা হইতাম। কতই উত্তম মোদের পরোয়ারদিগার, কত না উত্তম ধর্ম ইসলাম তাঁহার"। [রাওদুল উনুফ, ৩খ., পৃ. ১৮৯; কান্দেহলবী, সীরতুর রাসূল, ২খ., পৃ. ৩১৫]
শুধু খন্দকের যুদ্ধেই নহে, হুনায়ন যুদ্ধের চরম বিপর্যয়ের সময় বার সহস্র মুসলিম সৈন্য যখন দিগ্বিদিক বিক্ষিপ্ত হইয়া পড়িলেন, তখন এক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ (স) একেবারে একাকী ছিলেন। যে এক শত সৈন্য ময়দানে টিকিয়া রহিয়াছিলেন তাঁহাদের মধ্যে তিনিই ছিলেন সর্বাগ্রবর্তী, অন্যরা পিছনে পড়িয়া গেলেন। [ফাতহুল বারী, ৮খ., পৃ. ৪৪]
খচ্চর পৃষ্ঠে উপবিষ্ট রাসূলুল্লাহ (স) নির্ভীক চিত্তে শত্রুর দিকে আগাইয়া চলিয়াছিলেন। তাঁহার চাচাত ভাই আবূ সুফিয়ান ইবন হারিছ প্রাণপণে খচ্চরের লাগাম টানিয়া ফিরাইয়া রাখিতে চেষ্টা করিতেছিলেন। নবী করীম (স)-এর মুখে তখন উচ্চারিত হইতেছিল:
انا النبى لا كذب + انا ابن عبد المطلب
"আমি আল্লাহর নবী মিথ্যুক নই কোন, আবদুল মুত্তালিবের সন্তান আমি জেনো"। [সহীহ বুখারী, ১/৪০১; সহীহ মুসলিম, ২/১০১]
এইভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে মহানবী (স) কবিতার সাহায্যে মুজাহিদ বাহিনীর মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা বৃদ্ধির প্রয়াস পাইতেন।