📄 খন্দক বা পরিখার যুদ্ধকে আহযাব যুদ্ধের নামকরণ
সমগ্র আরবের পৌত্তলিক ও ইয়াহুদী শক্তির সমবেত সমর প্রচেষ্টা যেহেতু মুসলিম শক্তির বিরুদ্ধে নিযুক্ত করা হইয়াছিল, এইজন্য ইহাকে আহ্যাব যুদ্ধ বলা হইয়া থাকে। আহ্যাব হইতেছে আরবী হিযত্ব শব্দের বহুবচন। হিব অর্থ দল। উল্লেখ্য যে, এই যুদ্ধে মুসলমানদের বিরুদ্ধে আরবের অনেক দল-উপদল যুদ্ধযাত্রা ও মদীনা অবরোধে অংশগ্রহণ করিয়াছিল। খন্দক (পরিখা) খননের মাধ্যমে সম্মিলিত কাফির বাহিনীকে প্রতিরোধ করা হইয়াছিল বলিয়া ইহার অপর নাম খন্দক বা পরিখার যুদ্ধ।
📄 যুদ্ধের গোপনীয়তা রক্ষা
বানু কুরায়যার বিশ্বাসঘাতকতার সংবাদ সর্বপ্রথম হযরত উমার ফারূক (রা)-এর কর্ণগোচর হয়। কিন্তু এইরূপ দুঃসংবাদে সৈন্যবাহিনীর মনোবল ভাঙ্গিয়া পড়িতে পারে এই আশংকায় রাসূলুল্লাহ (স) উহা সাধারণ্যে প্রকাশ করিতে নিষধ করিলেন এবং উহার সত্যতা যাচাই করার জন্য সা'দ ইব্ন মু'আয ও সা'দ ইব্ন উবাদা (রা)-কে পাঠাইলেন। তাঁহাদিগকে বিদায় করার সময় তিনি বলিয়া দিলেন, খবর যদি সত্য হয় তবে অবোধ্য সাঙ্কেতিক ভাষায় তাহা প্রকাশ করিবে, যাহাতে সাধারণ সৈন্যদের মনোবল ভাঙ্গিয়া না পড়ে। তাহারা ফিরিয়া আসিয়া উচ্চারণ করিলেন, 'আদাল ও কারা'। মানে ইতোমধ্যে ঐ নামের দুইটি গোত্র যেমন বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছে, বানু কুরায়যার ইয়াহুদীরাও তাহাদের পথই ধরিয়াছে। [ইন হিশাম, সীরাহ, ২খ., পৃ. ১৪০; যুরকানী, ১২খ., পৃ. ১১১]
রাসূলুল্লাহ (স) এই দুঃসংবাদে মর্মাহত হইলেন বটে কিন্তু তাকবীর ধ্বনি উচ্চারণ করিয়া শত্রুবাহিনীতে সদ্য যোগদানকারী বানু কুরায়যাকে ভয় প্রদর্শনের ব্যবস্থা করিলেন। বানু হারিছার দুর্গে অবস্থানরত মুসলিম মহিলা ও শিশুদের আশ্রয়স্থল এইবার আক্রান্ত হইবার আশঙ্কা দেখা দিলে রাসূলুল্লাহ (স) হযরত আবূ সালামার নেতৃত্বে ২০০ জন এবং যায়দ ইব্ন হারিছার নেতৃত্বে আরও ৩০০ জনকে মদীনার অভ্যন্তরভাগ প্রহরার জন্য পাঠাইয়া দিলেন। মোটকথা, মুসলমানদের সংকট ও উৎকণ্ঠা চরমে পৌছিল। [সাইয়েদুল মুরসালীন, ২খ., পৃ. ৬৫০-৬৫১]
📄 আঁধার রাতে আলোর ঝলকানী
রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, الحرب خدعة "যুদ্ধ কৌশলমাত্র"। অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্রে কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে শত্রুকে পরাস্ত করা দূষণীয় নহে। [বুখারী, কিতাবুল জিহাদ, হাদীছ নং ২৮০৪-২৮০৫] খন্দকের প্রায় এক মাসব্যাপী প্রাণান্তকর অবরোধ ও মুসলমানদের বিব্রতকর অবস্থার অবসানকল্পে একটি কূটনৈতিক কৌশল অত্যন্ত কার্যকরী প্রতিপন্ন হয়।
নু'আয়ম ইবন মাসউদ ইব্ন আমের নামক গাতাফান গোত্রের এক ব্যক্তি একদিন রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে উপস্থিত হইয়া তাহার ইসলাম গ্রহণের কথা তাঁহাকে অবগত করিলেন এবং আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার ইসলাম গ্রহণের কথা কিন্তু কাফিররা ঘুণাক্ষরেও টের পায় নাই। এখন আপনি আমাকে যেই নির্দেশ দিবেন আমি তাহা পালন করিতে ত্রুটি করিব না। মহানবী (স) বলিলেন, তুমি তো একজন মাত্র ব্যক্তি (দলবল লইয়া সাহায্য করা তো আর তোমার পক্ষে সম্ভবপর নহে। অতএব পরিস্থিতির চাহিদামতো তুমি যাহা সমীচীন মনে কর তাহাই কর।
সেই মতে ন'অয়ায়ম ইবন মাসউদ বাহির হইয়া পড়িলেন। সর্বপ্রথম তিনি বানু কুরায়যা গোত্রের কাছে উপস্থিত হইয়া তাহাদের সহিত তাহার ঘনিষ্ঠভা ও সহানুভূতি প্রকাশ করিলেন। তিনি তাহাদিগকে বলিলেন, তোমরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত বাহিনীতে যোগদান করিয়াছ বটে, কিন্তু তাহার পরিণাম কী হইতে পারে তাহা কি চিন্তা করিয়া দেখিয়াছ? কুরায়শ আর গাতাফানীদের কী! যুদ্ধে জয় হইলে তো ভাল কথা, নতুবা তাহারা তাহাদের পথে চলিয়া যাইবে। তারপর মুহাম্মাদ ও তাহার অনুসারীদের রোষানল পড়িবে তোমাদের উপর। কুরায়শ ও গাতাফানীরা তাহাদের স্ত্রী-পুত্র তাঁহাদের দেশে রাখিয়া আসিয়াছে। তোমাদের অবস্থা কিন্তু তাহা নহে। মদীনা তোমাদের শহর; স্ত্রী পুত্র-পরিজন লইয়া তোমরা কোথায় গিয়া দাঁড়াইবে? ইহা ছাড়া বানু কায়নুকা ও বানু নাযীরের পরিণাম তো তোমরা স্বচক্ষেই দেখিয়াছ। তবুও নির্বাসনে যাওয়াকালে তাহারা তো অস্থাবর ধন-সম্পদ সাথে লইয়া যাইতে পারিয়াছে যদি কুরায়শ ও গাভাফানীরা সত্য সত্য রণেভঙ্গ দিয়া চলিয়া যায়' তাহা হইলে ভোমাদের উপায়টা কী হইবে? তাহারা বলিল, তথাস্থ! এখন উপায়?
বিজ্ঞের মত মাথা নাড়িয়া নুআয়ম বলিলেন, উপায় একটা আছে বৈ কি! তবে ব্যাপারটা তোমাদিগকে গোপন রাখিতে হইবে। তাহারা গোপনীয়তার নিশ্চয়তা দিলে তিনি বলিলেন, তোমরা কুরায়শদের কয়েকজনকে মুচলেকাস্বরূপ না রাখিয়া যুদ্ধে যোগ দিবে না। বানু কুরায়যার লোকজন উহার প্রতি সমর্থন জালাইয়া বলিল, কী একটা উপযুক্ত পরামর্শ না আপনি আমাদিগকে দিয়াছেন! দু'আয়ম (রা) উপলব্ধি করিলেন যে, তাহার প্রথম তীরটি লক্ষ্য ভেদ করিতে সমর্থ হইয়াছে।
এবার তিনি কুরায়শদের তাঁবুতে গিয়া বলিলেন, আপনাদের সহিত আমার দীর্ঘ দিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা আপনারা নিশ্চয় স্বীকার করিবেন। তাহারা একবাক্যে বলিল, কেন নয়? আপনি তো আমাদের অনেক পুরাতন বন্ধু। তিনি বলিলেন, সেইজন্য তো আপনাদের কাছে আসিয়াছি। ইয়াহুদীরা কিন্তু মুহাম্মাদের সহিত চুক্তিভঙ্গের জন্য অত্যন্ত অনুতপ্ত ও লজ্জিত। এখন আপনাদের কিছু লোককে মুচলেকাস্বরূপ নিজেদের কাছে রাখিয়া উহাদিগকে তাহারা মুহাম্মাদের হাতে তুলিয়া দিবার মতলব আঁটিতেছে। তাহারা হাড়ে হাড়ে বজ্জাত। আপনারা কোনক্রমে তাহাদের হাতে আপনাদের কোন লোককে মুচলেকাস্বরূপ দিতে রাজী হইবেন না। তারপর তিনি গাতাফান গোত্রের কাছে গিয়া বলিলেন, তোমরা তো আমার স্বগোত্রীয় ও আত্মীয়-স্বজন। একটি গোপন কথা বলিতেছি, গোপন রাখিও। এই কথা বলিয়া তিনি কুরায়শদিগকে যাহা বলিয়াছিলেন উহার পুনরাবৃত্তি করিলেন। এইভাবে সম্মিলিত বাহিনীর পক্ষের মধ্যে মহা অবিশ্বাস ও ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হইল।
তারপর আবু সুফ্যান যখন যুদ্ধ শেষ করার জন্য মুসলিম বাহিনীর উপর একযোগে চরম আঘাত হানিবার জন্য বানু কুরায়যাকে প্রস্তুত হইতে অনুরোধ করিলেন তখন তাহারা কুরায়যা কতিপয় লোককে মুচলেকাস্বরূপ তাহাদের কাছে না রাখিলে এত বড় ঝুঁকি গ্রহণে তাহাদের অপারগতার কথা জানাইয়া দিল। নুআয়মের সতর্কবাণীর সত্যতা কুরায়শ পক্ষ প্রত্যক্ষ করিল। কুরায়শ পক্ষ যখন তাহাদের একজনকেও মুচলেকাস্বরূপ রাখিতে রাজী হইল না, তখন বানু কুরায়যা গোত্রেরও তাহাদের প্রতি অবিশ্বাস বাড়িয়া গেল। এইভাবে নুআয়ম (রা)-এর কূটনৈতিক কৌশলের ফলে সম্মিলিত বাহিনীর মধ্যে ভাঙ্গন দেখা দিল এবং তাহারা দ্বিধাবিভক্ত হইয়া পড়িল। [ইবন হিশাম, সীরাতুন্নবী, ৩খ., পৃ. ২২১-২২২, ইফাবা]
এদিকে প্রচণ্ড শীতের মধ্যে পূর্বদিক হইতে প্রবল বাতাস প্রবাহিত হইয়া অবরোধকারী বাহিনীর সবকিছু লণ্ডভণ্ড করিয়া দিল। উনুনস্থ বৃহদাকার ডেগ ও কড়াই উল্টাইয়া অগ্নি নির্বাপিত হইয়া এবং তাঁবুসমূহের রজ্জু ছিড়িয়া ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হইয়া রাত্রির ঘন অন্ধকারে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হইল। তাহাদের মালামাল দিকবিদিক বিক্ষিপ্ত হইল। অশ্বগুলি বাঁধনমুক্ত হইয়া পলায়ন করিল। লোকজন বালুরাশির নীচে চাপা পড়িবার উপক্রম হইল। তাহাদের চক্ষু অন্ধ হইবার উপক্রম হইল। চতুর্দিকে বজ্র গর্জনের শোঁ শোঁ শব্দ হইতে লাগিল। বায়ু প্রবাহের সহিত আসমানী ফেরেশতাকুল নামিয়া আসিয়া অস্ত্রের ঝনঝনানীতেও আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে শত্রুদলের অন্তরে ভীতি ও ব্যাকুলতার সৃষ্টি করিলেন। সেনাপতি আবু সুফ্যান বলিল, অশ্বগুলি হালাক হইয়া গেল। বানু কুরায়যা বিশ্বাসঘাতকতা করিল। প্রবল বাতাস আমাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত করিয়া ফেলিল। কুরায়শ বাহিনী! আর এখানে নয়, এবার দেশে ফিরিয়া চল। মুসলমানদের প্রতি মহান আল্লাহর এই মহা অনুগ্রহের কথাই ব্যক্ত হইয়াছে এইভাবে:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ جَاتَتْكُمْ جُنُودٌ فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ رِيحًا وجُنُودًا لَّمْ تَرَوْهَا وَكَانَ اللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرًا.
"হে মু'মিনগণ! তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ কর, যখন শত্রু বাহিনী তোমাদের বিরুদ্ধে সমাগত হইয়াছিল এবং আমি উহাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করিয়াছিলাম ঝঞ্ঝাবায়ু এবং এক বাহিনী যাহা তোমরা দেখ নাই। তোমরা যাহা কর আল্লাহ তাহার সম্যক দ্রষ্টা"। [৩৩:৪৯]
রাসূলুল্লাহ (স) এই প্রসঙ্গে বলেনঃ "আমি সাহায্যপ্রাপ্ত হইয়াছি প্রাচ্য-বাত্যায় এবং কওমে আদ হালাক হইয়াছে প্রতীচ্য বাত্যায়"। সেদিন ফেরেশতা বাহিনীসমূহ প্রেরিত হইয়াছিল শত্রুদের মনে ভয়-ভীতি সৃষ্টির জন্য, যুদ্ধের জন্য নহে। ইহাতে নিশ্চয়ই আল্লাহর হিকমত রহিয়াছে। কেননা পরবর্তী কালে আবু সুফ্যান ও ইকরামাসহ তাহাদের অনেকেই মহানবী (স)-এর প্রতিরক্ষা কৌশলে মুগ্ধ হইয়া ইসলাম গ্রহণ করিয়া দীনের সেবায় আত্মনিয়োগ করিয়াছিলেন।
📄 যুদ্ধ কৌশলমাত্র
রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, الحرب خدعة "যুদ্ধ কৌশলমাত্র"। অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্রে কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে শত্রুকে পরাস্ত করা দূষণীয় নহে। [বুখারী, কিতাবুল জিহাদ, হাদীছ নং ২৮০৪-২৮০৫] খন্দকের প্রায় এক মাসব্যাপী প্রাণান্তকর অবরোধ ও মুসলমানদের বিব্রতকর অবস্থার অবসানকল্পে একটি কূটনৈতিক কৌশল অত্যন্ত কার্যকরী প্রতিপন্ন হয়।