📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর সৈন্যবিন্যাস
উহুদের ময়দানে মুসলিম বাহিনী উপস্থিত হওয়ার পূর্বে শায়খায়নে থাকিতেই সূর্য অস্ত গেল। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশে হযরত বিলাল (রা) আযান দিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইমামতিতে সালাত সম্পন্ন হইল। মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) সারা রাত প্রহরায় নিযুক্ত রহিলেন। শেষ রাত্রিতে আবার সৈন্যবাহিনী রওয়ানা হইল। উহুদের নিকটবর্তী হইলে ফজরের ওয়াক্ত হইল। সালাতশেষে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার বাহিনীকে এমনভাবে বিন্যাস করিলেন যে, উহুদ পাহাড় মুসলিম বাহিনীর পশ্চাতে এবং মদীনা শহর তাহাদের সম্মুখে রহিল। আবদুল্লাহ ইবনু যুবায়র (রা)-এর নেতৃত্বে পঞ্চাশজন তীরন্দাযকে তিনি উহুদ পাহাড়ের সম্মুখস্থ আয়নায়ন পাহাড়ের শীর্ষদেশে এই উদ্দেশ্যে মোতায়েন করিলেন, যাহাতে মুশরিক বাহিনীর সম্ভাব্য পশ্চাত দিকের আক্রমণ হইতে মুসলিম বাহিনী নিরাপদ থাকিতে পারে। তিনি তাহাদিগকে তাগিদ দিলেন যেন মুসলিম বাহিনীর চরম বিজয় বা চরম পরাজয়েও তাহারা স্থান ত্যাগ না করেন। এই ব্যাপারে তিনি জোর তাগিদ দিয়া এই পর্যন্ত বলিয়াছিলেনঃ إِنْ رَأَيْتُمُونَا تَخْطَفُنَا الطَّيْرُ فَلَا تَبْرَحُوا مَكَانَكُمْ هٰذَا وَإِنْ رَأَيْتُمُونَا هَزَمْنَا الْقَوْمَ وَأَوْطَأْنَاهُمْ فَلَا تَبْرَحُوا مَكَانَكُمْ.
"যদি তোমরা দেখিতে পাও যে, পাখী আমাদিগকে ছোঁ মারিয়া লইয়া যাইতেছে তাহা হইলেও তোমরা স্থান ত্যাগ করিবে না। আর যদি দেখ আমরা তাহাদিগকে পরাজিত ও দলিত-মথিত করিয়া ফেলিতেছি তবুও তোমরা স্থান ত্যাগ করিবে না"। [সহীহ বুখারী, হাদীছ নং ৩০৩৯; ফাতহুল বারী, ৭/৩৫৭, ৮/৩২৫; ইবন হিশাম, সীরাহ, ৩/৬৭; ইবন সা'দ, ২/৩৯-৪০; হাকেম, ২/২৯৬]
যুদ্ধের পতাকা মুস'আব ইবন উমায়র (রা)-কে অর্পণ করা হয়। যুবায়র ইব্দুল আওয়াম (রা) দক্ষিণ বাহিনীর এবং মুনযির ইবন উমার (রা) বাম বাহিনীর দায়িত্বে নিযুক্ত হন। নবী করীম (স)-এর তরবারি লাভ করিয়া আবূ দুজানা (রা) তাহার হক আদায় করেন। [আসাহ্হুস সিয়ার, পৃ. ১০৪] যুদ্ধের শুরুতেই মুশরিকদের পতাকাবাহী তালহা ইব্ন উছমান এবং তাহাদের অপর বীরপুরুষ সাবা ইব্ন আবদুল উয্যার চ্যালেঞ্জের জবাবে যুদ্ধে অবতীর্ণ হইয়া হযরত আলী (রা) ও হযরত হামযা (রা) তাহাদের উভয়কে হত্যা করিয়া তাঁহাদের বীরত্ব প্রদর্শন করেন। [তাবারী, তাফসীর, ৭/২৮১] মুসআব ইবন উমায়র, আবু দুজানা, আবূ তালহা, সা'দ ইব্ন আবী ওয়াক্কাস (রা) প্রমুখ সাহবীও অপূর্ব বীরত্ব প্রদর্শন করেন। [বুখারী, ফাতহুল বারী, ৭/৩৬৭; মুসলিম, ২/২৮৪; আহমাদ, ২১/৬০৫৯]
রাসূলুল্লাহ (স) মদীনা হইতে রওয়ানা করার পর শায়খাইন নামক স্থানে অবতরণ করেন। তিনি যুদ্ধ সম্পর্কে ব্যাপক সংখ্যক পরিকল্পনা গ্রহণ করিলেন এবং যুদ্ধের কৌশল সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করিয়াছিলেন। আবদুল্লাহ ইব্ন উবাই নামক মুনাফিক তাহার তিন শত সৈন্যসহ সেখান হইতে ফিরিয়া গিয়াছিল। অবশিষ্ট ছিল সাত শত সৈন্য। রাসূলুল্লাহ (স) উহুদ পাহাড়ের নিকট শিবির স্থাপন করিলেন। তিনি সাহাবীগণকে নির্দেশ দিলেন যে, উহুদ পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থান করার জন্য।
রাসূলুল্লাহ (স) পঞ্চাশ জন তীরন্দাজকে আবদুল্লাহ ইবন জুবায়র (রা)-এর নেতৃত্বে উহুদ পাহাড়ের নিকটবর্তী একটি গিরিপথে মোতায়েন করিলেন। তিনি তাহাদিগকে নির্দেশ দিলেন, শত্রুদের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য। তিনি তাহাদেরকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, তোমরা আমার নির্দেশ ব্যতীত এই স্থান হইতে কেহ নামিবে না। তোমরা যদি দেখ যে, আমরা বিজয় লাভ করিয়াছি, তবুও তোমরা এই স্থান হইতে নামিবে না। আর যদি তোমরা দেখ যে, আমরা যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হইয়াছি, তবুও তোমরা আমাদের সাহায্য করিতে আসিবে না। এই গিরিপথ হইতে তোমরা শত্রুদেরকে প্রতিহত করিবে। তিনি আবদুল্লাহ ইবন জুবায়রকে নির্দেশ দিলেন, তোমার ঘোড়সওয়ারী সৈন্যগণকে এই স্থান হইতে প্রতিহত করিবে (ইবন হিশাম, ২খ, পৃ. ৭২)।
রাসূলুল্লাহ (স) সেনাবাহিনীর সম্মুখভাগে যুহায়র ইবন সিনানকে, দক্ষিণ পার্শ্বে আবু বকর (রা)-কে, বাম পার্শ্বে উমার (রা)-কে, মধ্যভাগে আলী (রা)-কে, শেষভাগে হামযা (রা)-কে, ডানদিকে আবদুল্লাহ ইবন জুবায়র (রা)-কে এবং বামদিকে খালিদ ইবন ওয়ালীদকে নিযুক্ত করিলেন (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ২৬৬)।