📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মজলিসে শূরা

📄 মজলিসে শূরা


কেবল সামরিক বিষয়ই নহে, ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রের অন্যতম স্বীকৃত নীতি হইতেছে মুশাওরা বা পরামর্শ। স্বয়ং আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ- وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ. "এবং কাজেকর্মে তুমি তাহাদের সহিত পরামর্শ কর। অতঃপর তুমি কোন সংকল্প করিলে আল্লাহর উপর নির্ভর করিবে। যাহারা নির্ভর করে, আল্লাহ তাহাদিগকে ভালবাসেন"। [৩:১৫৯]
যেইসব ব্যাপারে আল্লাহর সুস্পষ্ট নির্দেশ নাই, সেইসব ব্যাপারেই উক্ত আয়াতে বিচক্ষণ ব্যক্তিগণের সহিত পরামর্শের আদেশ দেওয়া হইয়াছে।
তাই রাসূলুল্লাহ (স) যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে অনেক সময় সাহাবীগণের পরামর্শ আহবান করিতেন। উহুদ যুদ্ধের জন্য রওয়ানা হওয়ার প্রাক্কালেও তিনি পরামর্শ আহবান করেন। রাসূলুল্লাহ (স) ব্যক্তিগতভাবে মদীনার অভ্যন্তরে থাকিয়াই আক্রমণ মুকাবিলার পক্ষে ছিলেন। ঘটনাচক্রে মুনাফিক সর্দার ইবন উবায়্যিও এই মতের পক্ষে স্বীয় মত প্রকাশ করে। কিন্তু বদর যুদ্ধে যাহারা অংশগ্রহণ করিতে পারেন নাই, বিশেষত সেইসব তরুণ বয়সী যোদ্ধা মদীনা হইতে বাহির হইয়া বীরত্ব প্রদর্শনের পক্ষে ছিলেন। তাহারা মদীনার অভ্যন্তরে থাকিয়া মুকাবিলা করাকে অনেকটা কাপুরুষোচিত বলিয়া ধারণা করিতেছিলেন। অবশেষে রাসূলুল্লাহ (স) শহর হইতে বাহির হইয়াই যুদ্ধ মুকাবিলার পক্ষে মত দিলেন রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করেনঃ যুদ্ধের পোশাক পরিধান করার পর যুদ্ধ না করা পর্যন্ত কোন নবীর জন্য তাহা ত্যাগ করা বৈধ নহে। উল্লেখ্য, বদর যুদ্ধের সময়ও নবী করীম (স) আনসার ও মুহাজির সাহাবীগণের সুস্পষ্ট মতামত নিয়াছিলেন।

রাসূলুল্লাহ (স)-এর জীবন ছিল পরামর্শের মূর্ত প্রতীক। তিনি জীবনের সকল গুরুত্বপূর্ণ কাজ পরামর্শের মাধ্যমে সমাধান করিতেন। বদর যুদ্ধের পূর্বে রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীগণের সঙ্গে পরামর্শ করিয়া বদরে গমন করিয়াছিলেন। উহুদ যুদ্ধের পূর্বেও তিনি সাহাবীগণের সঙ্গে পরামর্শ করিয়াছিলেন। যুদ্ধ সম্পর্কে বিভিন্ন প্রকার পরামর্শ সাহাবীগণ পেশ করিয়াছিলেন।
রাসূলুল্লাহ (স) স্বপ্নে দেখিলেন যে, তাহার তরবারি যুলফিকার খণ্ডিত হইয়াছে। তিনি আরও দেখিলেন যে, একটি ছাগল যবেহ করা হইয়াছে। তিনি হাতটাকে বর্মের মধ্যে প্রবেশ করাইয়াছেন। তিনি আরও দেখিলেন যে, একটি গরু যবেহ করা হইয়াছে। এই স্বপ্নের ব্যাখ্যায় রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছিলেন যে, তরবারি খণ্ডিত হওয়ার অর্থ হইল আমার আহলে বায়ত হইতে একজন শহীদ হইবে। ছাগল যবেহ হওয়া এবং হাতকে বর্মের মধ্যে প্রবেশ করানোর অর্থ হইল মুসলমানদের ক্ষতি কম হইবে। আর গরু যবেহ করার অর্থ হইল মুসলমানদের মধ্যে কিছু লোক শহীদ হইবে।
ইব্‌ন আব্বাস (রা) বলেন, উহুদ যুদ্ধের পূর্বে রাসূলুল্লাহ (স) স্বপ্নের বর্ণনা দিয়া সাহাবীগণের সহিত পরামর্শ করিয়াছিলেন। সাহাবীগণ তাহাকে পরামর্শ দিয়াছিলেন যে, মদীনার বাহিরে গিয়া শত্রুর মুকাবিলা না করার জন্য। সাহাবীগণ বলিলেন, মদীনার বাহিরে গিয়া শত্রুর মুকাবিলা করিলে শত্রুদের ব্যাপক ক্ষতি হইবে। এমনকি তাহারা যদি মদীনার বাহিরে থাকে তাহা হইলে তাহাদের জন্য মদীনার বাহিরে অবস্থান করাও নিরাপদ হইবে না। আর যদি শত্রুরা মদীনার ভিতর প্রবেশ করে তাহা হইলে পুরুষরা সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হইবে। আর মহিলারা ছাদ হইতে পাথর নিক্ষেপ করিবে। ইহাতে শত্রুদের ব্যাপক ক্ষতি হইবে।
হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ন উবাই ও এই ব্যাপারে পরামর্শ করিয়াছিলেন এবং তিনি ও মদীনার বাহিরে যাইয়া শত্রুর মুকাবিলা না করার জন্য মতামত দিয়াছিলেন (ইবন হিশাম, ২খ, পৃ. ৬৩-৬৪)।
রাসূলুল্লাহ (স) নিজের স্বপ্ন ও পরামর্শ সভায় অধিকাংশ সাহাবীর মতামত গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং মদীনার বাহিরে গিয়া শত্রু মুকাবিলার কথা বলিয়াছিলেন। তিনি বলিয়াছিলেন যে, আমি স্বপ্নে দেখিয়াছি যে, আমি বর্ম পরিধান করিয়াছি এবং একটি বকরি যবেহ করা হইয়াছে। সুতরাং আমি স্বপ্নের ব্যাখ্যায় মনে করি যে, মদীনার ভিতরে অবস্থান করা ভাল হইবে। আর আমি শত্রু মুকাবিলার জন্য প্রস্তুত নই। কিন্তু যুবকেরা বলিলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (স)! আমরা শত্রুর মুকাবিলা করিয়া শাহাদত বরণ করিব। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের আবেগ দেখিয়া চুপ হইয়া গিয়াছিলেন। তিনি তাহাদের আবেগকে সম্মান করিয়াছিলেন এবং তাহাদের মতামত গ্রহণ করিয়াছিলেন (সীরাত ইবন হিশাম, ২খ, পৃ. ৬৩)।
টিকা:
১. ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ২য় খণ্ড, মিসর, তা.বি.।
২. ইবন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, মিসর, তা.বি.।
৩. সফীউর রহমান মুবারকপুরী, আর-রাহীকুল মাখতুম, ১ম মুদ্রণ, রিয়াদ, সৌদি আরব, ২০০২ খৃ.।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 উহুদ যুদ্ধে রওয়ানা

📄 উহুদ যুদ্ধে রওয়ানা


তৃতীয় হিজরীর ১১ শাওয়াল জুমু'আর দিন আসরের নামাযান্তে এক হাজার যোদ্ধাসহ রাসূলুল্লাহ (স) মদীনা হইতে রওয়ানা হইলেন। দুইটি বর্ম পরিহিত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (স) ঘোড়ার পিঠে সওয়ার ছিলেন। সা'দ ইব্‌ন মু'আয ও সা'দ ইবন 'উবাদা (রা) বর্ম পরিহিত অবস্থায় তাঁহার অগ্রে, অবশিষ্ট সহযোদ্ধাগণ তাঁহার ডাইনে ও বামে কাতারবন্দী অবস্থায় অগ্রসর হইতেছিলেন। মদীনা ও উহুদের মধ্যবর্তী শায়খায়ন টিলার নিকট উপনীত হইয়া রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার বাহিনী পর্যবেক্ষণ করিলেন এবং অল্পবয়স্ক যে সমস্ত বালক অতি উৎসাহে যুদ্ধের জন্য বাহিনীতে শামিল হইয়া পড়িয়াছিলেন তাহাদিগকে ফেরত পাঠাইয়া দিলেন।

রাসূলুল্লাহ (স) সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিলেন যে, তিনি উহুদের যুদ্ধের জন্য বাহির হইবেন। তিনি ঘরে প্রবেশ করিলেন এবং যুদ্ধের পোশাক পরিধান করিলেন। তিনি লৌহবর্ম ও শিরস্ত্রাণ পরিধান করিলেন। অতঃপর নিজ হাতে তরবারি লইয়া রওয়ানা হইলেন। সাহাবীগণ তাঁহার এই অবস্থা দেখিয়া ভাবিলেন যে, আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর মতামত পরিবর্তন করিয়াছি। তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (স)! আপনি যদি মদীনার ভিতরে থাকিয়া যুদ্ধ করিতে চান, আমরা প্রস্তুত আছি। তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমি যুদ্ধের পোশাক পরিধান করিয়াছি। যখন কোন নবী যুদ্ধের পোশাক পরিধান করেন, তখন তিনি যুদ্ধ না করিয়া পোশাক খুলেন না। অতএব আমি যুদ্ধ না করিয়া পোশাক খুলিব না। অতঃপর তিনি যুদ্ধের জন্য রওয়ানা করিলেন (ইবন হিশাম, ২খ, পৃ. ৬৩)। তিনি এক হাজার সৈন্যসহ যুদ্ধের জন্য রওয়ানা করিলেন। তিনি সাহাবীগণকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, আল্লাহ্র উপর ভরসা কর। জয়লাভ হইবেই।
ইব্‌ন আব্বাস (রা) বলেন, উহুদ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স) মদীনার ভিতর যুদ্ধ করার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছিলেন। কিন্তু সাহাবীগণ বাহিরে যাওয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করিয়াছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের মতামত গ্রহণ করিয়াছিলেন (ইবন হিশাম, ২খ, পৃ. ৬৪)।
তিনি মদীনার দিকে ফিরিয়া আসিলেন। তিনি সাহাবীগণকে পরামর্শ দিলেন যে, আল্লাহ্র পথে সব সময় সবর করিবে। এই জন্য সবর করা আবশ্যক। যুদ্ধের জন্য সাহাবীগণকে উৎসাহিত করিয়াছেন (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪খ, পৃ. ২৯)। তিনি সাহাবীগণকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, তোমরা প্রস্তুত হও। তিনি যুদ্ধের জন্য রওয়ানা করিলেন (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪খ, পৃ. ২৯)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বাহিনী পর্যবেক্ষণও অল্প বয়স্কগণকে ফেরত পাঠানো

📄 বাহিনী পর্যবেক্ষণও অল্প বয়স্কগণকে ফেরত পাঠানো


মদীনা ও উহুদের মধ্যবর্তী শায়খায়ন টিলার নিকট উপনীত হইয়া রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার বাহিনী পর্যবেক্ষণ করিলেন এবং অল্পবয়স্ক যে সমস্ত বালক অতি উৎসাহে যুদ্ধের জন্য বাহিনীতে শামিল হইয়া পড়িয়াছিলেন তাহাদিগকে ফেরত পাঠাইয়া দিলেন। ইহাদের সংখ্যা ছিল সতের (১৭)। রাফে' ইন্ন খাদীজ (রা) এবং তাঁহার সমবয়স্ক সামুরা ইব্‌ন জুনদুব ব্যতিক্রমী শক্তি-সাহস ও তীর বর্ষণে দক্ষতার জন্য স্বল্পবয়সী হইলেও বাহিনীতে থাকার অনুমতি লাভ করিলেন। [তাবারী, ৩খ., পৃ. ১২; সীরাতুর রাসূল, ২খ., পৃ. ১৯২]
ইহা দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় অল্পবয়স্ক বালকদিগকে যুদ্ধক্ষেত্রে লইয়া যাওয়া এবং শত্রুর সম্মুখে লইয়া গিয়া বিপদের মুখে ঠেলিয়া দেওয়া নিষিদ্ধ ছিল এবং ব্যতিক্রমধর্মী সাহস ও দক্ষতার মূল্যায়ন করা হইত।

রাসূলুল্লাহ (স) মদীনা হইতে বাহির হইবার পর সেনাবাহিনী পর্যবেক্ষণ করিলেন। তিনি দেখিলেন, কিছু অল্প বয়স্ক সাহাবীও আসিয়াছেন। তিনি তাহাদেরকে ফেরত পাঠাইয়া দিলেন এবং বলিলেন, তোমরা এখন অল্প বয়স্ক, তোমাদের বয়স কম। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদেরকে ফেরত পাঠাইয়া দিলেন। অতঃপর আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা), যায়দ ইবন ছাবিত, উসামা ইবন যায়দ, বারা ইবন আযিব, উসাইদ ইবন যুহায়র, আমর ইবন হাযম, উমার ইবন ছাবিত, আবু সাঈদ খুদরী, যায়দ ইবন আরকাম, উবাদা ইবন ছাবিত, আত্তাব ইবন উসাইদ, উসামা ইবন যায়দ, রাফি ইবন খাদীজ, সামুরা ইবন জুনদুব এবং আবদুল্লাহ ইবন উমার প্রমুখ সাহাবীগণকে ফেরত পাঠাইয়া দিলেন (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪খ, পৃ. ৩০)।
কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) কিছু অল্প বয়স্ক সাহাবীকে অনুমতি দিয়াছিলেন। তাহারা দুইজন ছিলেন রাফি ইবন খাদীজ এবং সামুরা ইবন জুনদুব। রাসূলুল্লাহ (স) রাফি ইবন খাদীজকে অনুমতি দিলেন এই জন্য যে, তিনি ছিলেন তীরন্দাজ এবং তীর নিক্ষেপ করিতে পারদর্শী। রাসূলুল্লাহ (স) রাফিকে অনুমতি দিলে তাহার মা সামুরা ইবন জুনদুবের মা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট গেলেন এবং বলিলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (স)! সামুরা তো রাফি অপেক্ষা শক্তিশালী। আপনি যদি রাফিকে অনুমতি দেন তাহা হইলে সামুরাকে কেন অনুমতি দিবেন না? সামুরা তো রাফিকে মল্ল যুদ্ধে পরাজিত করিতে পারে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমরা মল্ল যুদ্ধ করিয়া দেখাও। মল্ল যুদ্ধে সামুরা রাফিকে পরাজিত করিল। তখন রাসূলুল্লাহ (স) সামুরাকে অনুমতি দিলেন (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪খ, পৃ. ৩০)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মুনাফিকদের স্বরূপ উন্মোচন

📄 মুনাফিকদের স্বরূপ উন্মোচন


উহুদ পাহাড়ের নিকটবর্তী হইতেই মুনাফিকসর্দার আবদুল্লাহ ইবন উবায়্যি তাহার তিন শত অনুগামীসহ যুদ্ধক্ষেত্র হইতে এই বলিয়া দল ত্যাগ করিল, তিনি তো আমার কথা শুনিলেন না, শুনিলেন উহাদের কথা )أَطَاعَهُمْ وَعَصَائِی(। [সীরাত ইন্ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৮-১২] আল্লাহ তা'আলা আল-কুরআনুল কারীমে তাহাদের ঐ মুনাফিকীর কথা প্রকাশ করিয়াছেন এইভাঃেবঃ
وَمَا أَصَابَكُمْ يَوْمَ التَقَى الْجَمْعَانِ فَبِاذْنِ اللهِ وَلِيَعْلَمَ الْمُؤْمِنِينَ. وَلِيَعْلَمَ الَّذِينَ نَافَقُوا وَقِيلَ لَهُمْ تَعَالُوا قَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَوِ ادْفَعُوا قَالُوا لَوْ نَعْلَمُ قِتَالاً لا اتَّبَعْنُكُمْ هُمْ لِلْكُفْرِ يَوْمَئِذٍ أَقْرَبُ مِنْهُمْ لِلْإِيْمَانِ يَقُولُونَ بِأَفْوَاهِهِمْ مَا لَيْسَ فِي قُلُوبِهِمْ وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا يَكْتُمُونَ.
"যেদিন দুই দল পরস্পরের সম্মুখীন হইয়াছিল সেদিন তোমাদের উপর যে বিপর্যয় ঘটিয়াছিল তাহা আল্লাহ্ হুকুমে। ইহা মুমিনদিগকে জানিবার জন্য এবং মুনাফিকদিগকে জানিবার জন্য এবং তাহাদিগকে বলা হইয়াছিল, আইস! তোমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ কর অথবা প্রতিরোধ কর। তাহারা বলিয়াছিল, আমরা যদি যুদ্ধ জানিতাম তবে নিশ্চিতভাবে তোমাদের অনুসরণ করিতাম। সেদিন তাহারা ঈমান অপেক্ষা কুফরীর নিকটতর ছিল। যাহা তাহাদের অন্তরে নাই তাহারা তাহা মুখে বলে। তাহারা যাহা গোপন রাখে আল্লাহ তাহা বিশেষভাবে অবহিত"। [৩: ১৬৬-৭]
মুনাফিকদের চলিয়া যাওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত রহিলেন সাত শত জন, তাঁহাদের মধ্য হইতে ১৫জন তরুণও বাদ পড়িল। মাত্র ১০০ জন বর্ম পরিহিত এবং গোটা বাহিনীতে কেবল দুই জন অশ্বারোহী ছিলেন, একজন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স) এবং অপরজন হযরত আবূ বুরদা ইব্‌ন নায়ার হারিছী (রা)। [তাবারী, ৩খ., পৃ. ১২] মুনাফিকদের কাটিয়া পড়ায় খায়রাজ গোত্রের বানূ সালামা শাখার মুসলিম যোদ্ধাগণ এবং আওস গোত্রের বানু হারিছা শাখার যোদ্ধাগণ প্রভাবান্বিত হওয়ার উপক্রম হইয়াছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আল্লাহই তাহাদিগকে রক্ষা করেন। [৬ঃ ১২২; সহীহ বুখারী, ফাতহুল বারী, ৭/৩৫৮, ৮/৩২৫; সহীহ মুসলিম, ২/৪০২; ইবন হিশাম, সীরাহ, ৩/৬৭]

রাসূলুল্লাহ (স) এক হাজার সৈন্যসহ যুদ্ধের জন্য রওয়ানা করিয়াছিলেন। তিনি মদীনা হইতে তিন মাইল দূরে শায়খাইন নামক স্থানে অবতরণ করিলেন। ইব্‌ন উবাই তিন শত সৈন্যসহ মদীনার দিকে ফিরিয়া গিয়াছিল। সে বলিয়াছিল, মুহাম্মাদ আমার মতামত গ্রহণ করেন নাই। তিনি অল্প বয়স্কদের মতামত গ্রহণ করিয়াছেন। আল্লাহর শপথ! তিনি আমার মতামত গ্রহণ করেন নাই। তিনি কেন আমার কথা গ্রহণ করেন নাই। এই যুদ্ধে ব্যাপক সংখ্যক লোক নিহত হইবে। ইব্‌ন উবাই এই কথাগুলি বলিয়া তাহাদের মধ্য হইতে তিন শত সৈন্যসহ মদীনার দিকে ফিরিয়া গিয়াছিল। সে বলিয়াছিল, আমরা যুদ্ধ করিলে ব্যাপক সংখ্যক লোক নিহত হইবে।
ইব্‌ন ইসহাক বলেন, ইব্‌ন উবাই মুনাফিকদের দলনেতা ছিল। সে যুদ্ধ না করার জন্য তাহার পক্ষ হইতে এই কথা বলিয়াছিল (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪খ, পৃ. ৩১)। ইব্‌ন উবাইয়ের সঙ্গে মুনাফিকরা ফিরিয়া গেলে মুসলমানদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হইল। একদল সাহাবী বলিলেন, আমরা তাহাদের সঙ্গে যুদ্ধ করিব। আর অন্যদল বলিল, না, আমরা তাহাদের সঙ্গে যুদ্ধ করিব না। আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবন হারাম আনসারী বলিলেন, হে লোকসকল! তোমরা কেন আল্লাহ্র পথে যুদ্ধ করিবে না? রাসূলুল্লাহ (স) তোমাদের সহিত রহিয়াছেন। তাহারা বলিল, আমরা যুদ্ধ করিলে নিহত হইব। আবদুল্লাহ ইবন আমর বলিলেন, তোমাদের মৃত্যু যদি নিশ্চিত হয়, তাহা হইলে শহীদ হওয়া উত্তম। আবদুল্লাহ ইবন আমর আনসারী তাহাদের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য উৎসাহিত করিয়াছিলেন (ইবন হিশাম, ২খ, পৃ. ৭০-৭২)।
আবু জাবির আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবন হারাম আনসারী তাঁহাকে শহীদ করার জন্য আল্লাহর নিকট অঙ্গীকার করিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার এই কথা শুনিয়াছিলেন এবং তাঁহার নিকট অনুমতি চাহিয়াছিলেন (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪খ, পৃ. ৩১)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00