📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 শত্রুকে দুর্বল করিবার তিনটি পদ্ধতি

📄 শত্রুকে দুর্বল করিবার তিনটি পদ্ধতি


শত্রুকে দুর্বল করিবার তিনটি পদ্ধতি: (ক) বৈষয়িক তথা বস্তুগত দিক দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করে তার মনোবল ভেঙ্গে দেয়া; (খ) নৈতিক দিক দিয়ে পরাজিত করা; (গ) সামাজিক দিক দিয়ে পর্যুদস্ত করা। উল্লেখিত তিনটির মধ্যে সবচাইতে কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল বৈষয়িক ক্ষতি। এই দুর্বলতাকে হয়তো দুশমন স্বয়ং মওকা পেতেই পূরণ করে নেয় অথবা তার মিত্ররা নিজেদের স্বার্থে তাকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচিয়ে নেয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্রান্সের পরাজয়ে মিত্র শক্তির সমরোপকরণ ও মারণাস্ত্রের উপর বিরাট বিপর্যয় নেমে আসে। কিন্তু এর কিছুটা স্বয়ং বৃটিশ পূরণ করে দেয় আর কিছুটা আমেরিকার সাহায্যে পূরণ হয়ে যায়। অনুরূপভাবে জার্মানির আক্রমণে রাশিয়া একেবারে নাস্তানাবুদ হয়ে যায়, কিন্তু ১৯৪১ সালে বৃটেন ও আমেরিকার সাহায্যে এই ক্ষতির একটা বিরাট পরিমাণই পূরণ হয়ে যায়। ফলে তারা জার্মানদেরকে রূশ ভূখণ্ডের বাইরে তাড়িয়ে দিতে কামিয়াব হয়।
আর্থিক তথা বৈষয়িক পরাজয়ের মুকাবিলায় নৈতিক পরাজয় কিন্তু অনেক বেশী ভয়াবহ ও বিপজ্জনক হয়ে থাকে। নেপোলিয়ন একে একের মুকাবিলায় তিন গুণ বেশী মারাত্মক বলেছেন।
বস্তুগত ক্ষতি সত্বর অথবা বিলম্বে পূরণ হতে পারে। কিন্তু নৈতিক পরাজয়ের ক্ষতিপূরণ অসম্ভব ব্যাপার। উদাহরণস্বরূপ ১৯৪০ সালের ফ্রান্সের কথাই ধরুন না কেন? নৈতিক অবনতির কারণে ফ্রান্স এ বছর অস্ত্র সমর্পণ করেছিল। কিন্তু কিছু কিছু লোক যাদের ভেতর মিত্র রাষ্ট্রগুলোর কাজ হাসিলের মাধ্যম, উদাহরণত রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধ সৃষ্টি সংগঠন Resistance movement এবং জানবাজ ফৌজ কৃতিত্বপূর্ণ ও গৌরবোজ্জ্বল দায়িত্ব পালন করে ফ্রান্সের মরা গাঙে জোয়ার সৃষ্টি করে এবং এভাবে ফ্রান্স বিশ্বের বুক থেকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পায়। অর্থাৎ ফ্রান্সের নৈতিক পরাজয়ের চিহ্ন পুরোপুরিভাবে ফুটে উঠেনি। অতএব তারা কোন না কোনভাবে বেঁচে ওঠে। কিন্তু মানসিক পরাজয় সবচাইতে ধ্বংসাত্মক ও ভয়াবহ হয়ে থাকে। কোন জাতির মধ্যে মানসিক পরাজয় আসন গেড়ে বসলে জীবনের আর কোন স্পন্দনই অবশিষ্ট থাকে না।
মহানবী (স) দুশমনকে প্রথমে বদর প্রান্তরে আর্থিক ও বৈষয়িক দিক দিয়ে পরাজিত করেন। তারপর খন্দক যুদ্ধে তিনি তাদেরকে নৈতিকভাবে পর্যুদস্ত করেন। তারপর হুদায়বিয়ার সন্ধিতে তাদের মনস্তাত্ত্বিক পরাজয় ঘটিয়ে তিনি তাদেরকে একেবারে অসহায় করে তোলেন। এ সন্ধি কাফিরদেরকে মুসলমানদের সঙ্গে মেলামেশার এবং ইসলাম ও তার প্রতিষ্ঠাতা এবং মুসলমানদের জানা-বুঝার এবং তাদের চরিত্র ও কার্যকলাপ যাচাই করার মওকা এনে দেয়। ফলে মক্কা বিজয় সহজ হয়ে যায়।...
যোগ্য জেনারেলই আপন ফৌজের ন্যূনতম ক্ষতি করে শত্রুর উপর অধিকতর ও গভীরতর প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। মক্কা বিজয় বিশ্ব ইতিহাসে সৈনিকসুলভ যোগ্যতার মহত্তম নমুনা, আর মহানবী (স) পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম ও যোগ্যতম সমরনায়ক"। [মহানবী (স)-এর প্রতিরক্ষা কৌশল, পৃ. ৩৪৬-৩৫০]

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বিজয়ের আদর্শ

📄 বিজয়ের আদর্শ


মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে নবী করীম (স)-এর রহুল আকাঙ্ক্ষিত বিজয় অর্জিত হইল বটে, কিন্তু তিনি কোন দেশ বিজয়ী সম্রাটের বেশে মক্কায় প্রবেশ করেন নাই, বরং আল্লাহর একজন অতি অনুগত ও বিনয়ী বান্দার বেশে সেখানে প্রবেশ করিলেন। তাঁহার সওয়ারীর পিঠে উপবিষ্ট অবস্থায় করুণ স্বরে তিনি তিলাওয়াত করিতেছিলেন সূরা আল-ফাহ্, যাহাতে মহাবিজয়ের, নিরাপদে মক্কা প্রবেশের, (খায়বারে) প্রচুর গনীমত-সম্ভার লাভের, সর্বোপরি পরকালে ঈমানদারদের চিরস্থায়ী শান্তির আবাস জান্নাত লাভের সুসংবাদ রহিয়াছে এবং যাহা ৬ষ্ঠ হিজরীতে হুদায়বিয়া হইতে প্রত্যাবর্তনকালে আল্লাহ তা'আলা নাযিল করিয়াছিলেন। দুই বৎসর যাইতে না যাইতেই আজ সেই স্বপ্ন আল্লাহ্ পাক পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়িত করিয়া তাঁহার ওয়াদা পূর্ণ করিলেন। তাই মসজিদুল হারামে প্রবেশ করিয়া ৩৬০টি মূর্তি অপসারণ করিয়া কা'বার প্রতি কোণে প্রতিটি প্রাচীরের পার্শ্বে দাঁড়াইয়া তাকবীর ধ্বনি উচ্চারণ করিয়া, সেখানে শুকরানা সালাত আদায় করিয়া বিশ্বের শ্রেষ্ঠ কুশলী ও বিজয়ী নবী (স) কা'বার দরজা খুলিয়াই যে খুৎবা দিলেন তাহার প্রথম কথাটিই ছিল:
لا اله الا الله وحده لا شريك له صدق وعده ونصر عبده وهزم الاحزاب وحده.
"আল্লাহ্ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই এবং তাঁহার কোন শরীক নাই। তিনি তাঁহার ওয়াদাকে সত্য করিয়া দেখাইয়াছেন, তাঁহার বান্দাকে তিনি সাহায্য করিয়াছেন এবং তিনি একাই সকল বাহিনীকে পরাস্ত করিয়াছেন"।
অন্য কথায়, তিনি সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করিয়া দিলেন, এই বিজয়ের কৃতিত্ব তাঁহার নিজের নহে, এই কৃতিত্ব একমাত্র আল্লাহ্। তিনি নিজে তাঁহার বান্দা মাত্র, মনিব তাঁহার বান্দার সহিত বিজয়দানের যে অঙ্গীকার করিয়াছিলেন আজিকার বিজয় সেই অঙ্গীকার পূরণেরই বহিঃপ্রকাশ। বিজয়ের গৌরব একমাত্র মনিবেরই প্রাপ্য, বান্দার নহে। সুবহানাল্লাহ্! পৃথিবীর কোন বিজয়ী বীর কি বিজয়ের মহাআনন্দের মুহূর্তে এইভাবে আত্মবিলীন করিয়া তাঁহার মনিবের বিজয়বার্তা ঘোষণা করিয়া পরম তৃপ্তি লাভ করিয়াছেন? আত্মনিবেদনের এই মহা-কৃতিত্ব কেবল আল্লাহ্ রাসূল নবীকুল শিরোমণি মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)-এরই প্রাপ্য।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মক্কা বিজয় মহা বিজয়ের দ্বার উন্মোচিত করিল

📄 মক্কা বিজয় মহা বিজয়ের দ্বার উন্মোচিত করিল


যুদ্ধের জয়কে যদি জয় বলা হয় তাহা হইলে বিনা যুদ্ধের জয়কে বলিতে হয় মহাবিজয়। সূরা 'আন-নাসর' নাযিল করিয়া আল্লাহ্ তা'আলা মক্কা বিজয়ের বিজয় স্মৃতিকে অমর করিয়া দিলেন। মক্কা বিজয়ের সময় সূরাটি নাযিল হয়। [সহীহ বুখারী, ৫/১৮৯, হাদীছ নং ৪২৯৪]
اذا جَاءَ نَصْرُ اللَّهِ وَالْفَتْحُ.
"যখন আসিল আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়"।
তাফসীরবিদগণের সকলেই এই ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেন যে, উক্ত সূরায় বিজয় বলিতে মক্কা বিজয়ই বুঝান হইয়াছে। [তাফসীরে মা'আরিফুল কুরআন, সংক্ষিপ্ত, পৃ. ১৪৮১] পরবর্তী আয়াতেই উহার সুফলের কথা বর্ণিত হইয়াছে এইভাবেঃ
وَرَأَيْتَ النَّاسَ يَدْخُلُونَ فِي دِينِ اللَّهِ أَفْوَاجًا .
"আর তুমি দেখিতে পাইলে মানুষ আল্লাহ্ দীনে প্রবেশ করিতেছে দলে দলে"।
আল্লামা শাব্বীর আহমাদ উছমানী (র) উহার ব্যাখ্যায় লিখেন, “মক্কা মু'আজ্জমা (আল্লাহ্ যমীনে উহা যেন আল্লাহ্র রাজধানী)-এর বিজয় ছিল বড় একটি সিদ্ধান্তের ব্যাপার। অধিকাংশ আরব গোত্রের দৃষ্টি উহার প্রতি নিবদ্ধ ছিল। ইহার পূর্বে একজন দুইজন করিয়া ইসলাম গ্রহণ করিত, কিন্তু মক্কা বিজয়ের পর দলে দলে লোক ইসলাম গ্রহণ করিতে লাগিল, এমনকি গোটা আরব-উপদ্বীপ ইসলামের কলেমা পড়িয়া নিতে শুরু করিল। এইভাবে নবুওয়াতের অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জিত হইল। [তাফসীরে উছমানী, উক্ত আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে, পৃ. ৭৯০]

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00