📄 কুরায়শদের নামমাত্র প্রতিরোধ
পূর্বে উল্লিখিত হইয়াছে যে, আবূ সুফ্যানের পরমার্শ অনুসারে কুরায়শগণ মসজিদুল হারামে প্রবেশ করিয়া বা নিজ নিজ ঘরে অবস্থান করিয়া আত্মরক্ষায় যত্নবান হয়। কিন্তু মরণ কামড়ের মত তাহাদের মধ্যকার কিছু গুণ্ডা-বদমাশ প্রকৃতির লোক গোয়ার্তুমীপূর্ণ প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করিতে ইকরামা ইব্ন আবু জাহল, সাফওয়ান ইব্ন উমায়্যা ও সুহায়ল ইব্ন আমরের নেতৃত্বে জাবাল আবূ কুবায়সের পূর্বদিকে অবস্থিত খানদামায় সমবেত হইল। সংঘর্ষে হযরত খালিদের বাহিনীর হাতে তাহাদের বার-তেরজন নিহত হইল। অবশ্য মুসলিম পক্ষের দুইজন কুরয ইব্ন্ন জাবির ফিত্রী এবং খুনায়স ইব্ন খালিদ ইবন রাবী'আ (রা)-ও ভুলক্রমে ভিন্ন পথে চলিয়া যাওয়ায় মুশরিকদের কবলে পড়িয়া শহীদ হন। ইব্ন ইসহাকের বর্ণনা হইতে জানা যায় যে, খালিদ-বাহিনীর আরেকজন মুজাহিদ জুহায়না গোত্রের সালামা ইব্ন সায়লাও এই সময় শহীদ হন। [ইব্ন হিশাম, আস-সীরা, ৪খ., পৃ. ৪৮]
📄 চূড়ান্ত বিজয়
অষ্টম হিজরীর ১৭ রমযান, মঙ্গলবার। রাসূলুল্লাহ্ (স) মাররুজ জাহান হইতে মক্কায় রওয়ানা হইলেন। যী-তুয়া প্রান্তরে উপনীত হইয়া তিনি থামিলেন। কুরায়শদের পক্ষ হইতে কোনরূপ আক্রমণের লক্ষণই নাই দেখিয়া তিনি সম্যক উপলব্ধি করিলেন যে, বিনা যুদ্ধে ও বিনা রক্তপাতেই আল্লাহ তা'আলা বিজয় আনিয়া দিয়াছেন। মহান আল্লাহ্ প্রদত্ত বিজয়ের কৃতজ্ঞতায় তাঁহার শির নত হইয়া আসিল। তাঁহার মস্তক আক্ষরিক অর্থেই এত অবনত হইল যে, উটের পিঠের হাওদা তাঁহার শ্বশ্রুরাজি স্পর্শ করিতেছিল। তাঁহার নির্দেশ অনুসরণে খালিদ ইদুল ওয়ালীদ তাহার দক্ষিণ বাহিনীসহ মক্কার নিম্নাঞ্চল দিয়া সাফা পাহাড়ে গিয়া থামিলেন। বাম বাহিনী প্রধান যুবায়র ইবনুল আওয়াম (রা) মক্কার উচু এলাকা দিয়া 'কাদা'-এর পথে অগ্রসর হইয়া 'হাজুনে' তাহার ঝাণ্ডা উড্ডীন করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য একটি কুব্বা নির্মাণ করিয়া তাঁহার অপেক্ষায় থাকিলেন। আবু উবায়দাও তাহার পদাতিক বাহিনী লইয়া বাতনে ওয়াদীর পথ ধরিয়া মক্কার কেন্দ্রভূমিতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে গিয়া উপস্থিত হইলেন। এইভাবে আল্লাহ্র ফযল ও করমে প্রায় বিনা বাধায় ও বিনা রক্তপাতেই মক্কা বিজয় সমাপ্ত হইল। যে বিজয়ের জন্য উভয় পক্ষের হাজার হাজার যোদ্ধার প্রাণনাশ হওয়া ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক, রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর প্রজ্ঞাপূর্ণ প্রতিরক্ষা কৌশল ও সামরিক ব্যবস্থাপনার দরুন উহা ন্যূনতম ক্ষয়ক্ষতিতে এইভাবে সম্পন্ন হইল।
📄 সামরিক দৃষ্টিকোণ হইতে মক্কা বিজয়ের মূল্যায়ন
দুই দুইটি বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সমর নায়ক জেনারেল আকবর খান বিশ্বযুদ্ধগুলির অভিজ্ঞতার আলোকে মক্কা বিজয়ের যে পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন করিয়াছেন উহাতে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর প্রতিরক্ষা কৌশল যে সর্বোত্তম ছিল তাহা সহজেই অনুমেয়। তাই তাঁহারই ভাষায় এই বক্তব্যটি উদ্ধৃত করিতেছিঃ
"মক্কা বিজয়ের বেলা মহানবী (স) যে নীতি অবলম্বন করেছিলেন তা আজকালও অবলম্বন করা হয়ে থাকে। দৃষ্টান্তস্বরূপ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে হিটলার indirect approach -এর প্রতিরক্ষা নীতিকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেন। হিটলার প্রথমে প্রচার-প্রোপাগান্ডা চালিয়ে শত্রুরাষ্ট্রে বিরোধিতার আবেগ-উদ্দীপনাকে খতম করে দিতেন এবং এভাবে নিজেদের হামলার সাফল্যকে নিশ্চিত করতেন, এরই সঙ্গে শত্রুর শক্তিশালী সহযোগীকে তার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতেন যেন সে তাদের থেকে সরাসরি ফায়দা উঠাতে না পারে এবং এভাবে সে দুর্বল হয়ে পড়ে। অতঃপর তার রাষ্ট্রে অস্থিরতা সৃষ্টি করা হতো যার ফলে তাদের অবশিষ্ট ছিটেফোটা মনোবলটুকুও ভেঙ্গে পড়ে। এসব নীতি অনুসরণ করেই ১৯৩৮ সালে তিনি জার্মানীকে বিশালতর জার্মানীতে পরিণত করেছিলেন।
মহানবী (স) আজ থেকে সাড়ে তের শ' বছর পূর্বে এই প্রতিরক্ষা স্ট্রাটেজী এমনভাবে কার্যকর করেন যে, বুদ্ধি খেই হারিয়ে ফেলে। তিনি প্রথমে কুরায়শদেরকে রণক্ষেত্রে পরাজিত করেন। তারপর তাদের সহযোগী শক্তিগুলোকে তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন করেন। হুদায়বিয়ার সন্ধির মাধ্যমে তাদের অবশিষ্ট মর্যাদা ও প্রভাবটুকু খতম করে দেন। এরপর মক্কা বিজয় পাকা ফলের ন্যায় হয়ে রইল যা সামান্য ঝাকুনীতেই বোটা থেকে খসে টস করে কোলের উপর এসে পড়লো। কিন্তু এতদসত্ত্বেও কুরাইশদেরকে তিনি ধ্বংস করেননি। তাদেরকে তিনি হেয় ও অপমানিত করেননি, বরং মুষ্টিমেয় কয়েকজন ব্যতিরেকে সবাইকে তিনি মুক্ত করে দেন। না কারো জীবন ও সম্মানের উপরই তিনি আচড় কেটেছেন, না তিনি কারো সম্পদহানি করিয়াছেন! আর এসবই ছিল সংস্কার ও গঠন, ধ্বংস ও প্রতিশোধ গ্রহণ নয়। তিনি তাদেরকে মক্কার মুহাফিয রাখতে চেয়েছিলেন এবং তাদের দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। তাদেরকে যদি এমত পরিমাণ অবনমিত করা হতো যে, ইসলামী সমাজ জীবনের উপর বোঝাস্বরূপ হত তাহলে তা রহমতস্বরূপ হবার পরিবর্তে মুসিবতরূপে দেখা দিত। কিন্তু তিনি এমনভাবে কাজ করলেন যে, সাপও মারলেন অথচ লাঠিও ভাঙলো না।
📄 শত্রুকে দুর্বল করিবার তিনটি পদ্ধতি
শত্রুকে দুর্বল করিবার তিনটি পদ্ধতি: (ক) বৈষয়িক তথা বস্তুগত দিক দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করে তার মনোবল ভেঙ্গে দেয়া; (খ) নৈতিক দিক দিয়ে পরাজিত করা; (গ) সামাজিক দিক দিয়ে পর্যুদস্ত করা। উল্লেখিত তিনটির মধ্যে সবচাইতে কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল বৈষয়িক ক্ষতি। এই দুর্বলতাকে হয়তো দুশমন স্বয়ং মওকা পেতেই পূরণ করে নেয় অথবা তার মিত্ররা নিজেদের স্বার্থে তাকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচিয়ে নেয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্রান্সের পরাজয়ে মিত্র শক্তির সমরোপকরণ ও মারণাস্ত্রের উপর বিরাট বিপর্যয় নেমে আসে। কিন্তু এর কিছুটা স্বয়ং বৃটিশ পূরণ করে দেয় আর কিছুটা আমেরিকার সাহায্যে পূরণ হয়ে যায়। অনুরূপভাবে জার্মানির আক্রমণে রাশিয়া একেবারে নাস্তানাবুদ হয়ে যায়, কিন্তু ১৯৪১ সালে বৃটেন ও আমেরিকার সাহায্যে এই ক্ষতির একটা বিরাট পরিমাণই পূরণ হয়ে যায়। ফলে তারা জার্মানদেরকে রূশ ভূখণ্ডের বাইরে তাড়িয়ে দিতে কামিয়াব হয়।
আর্থিক তথা বৈষয়িক পরাজয়ের মুকাবিলায় নৈতিক পরাজয় কিন্তু অনেক বেশী ভয়াবহ ও বিপজ্জনক হয়ে থাকে। নেপোলিয়ন একে একের মুকাবিলায় তিন গুণ বেশী মারাত্মক বলেছেন।
বস্তুগত ক্ষতি সত্বর অথবা বিলম্বে পূরণ হতে পারে। কিন্তু নৈতিক পরাজয়ের ক্ষতিপূরণ অসম্ভব ব্যাপার। উদাহরণস্বরূপ ১৯৪০ সালের ফ্রান্সের কথাই ধরুন না কেন? নৈতিক অবনতির কারণে ফ্রান্স এ বছর অস্ত্র সমর্পণ করেছিল। কিন্তু কিছু কিছু লোক যাদের ভেতর মিত্র রাষ্ট্রগুলোর কাজ হাসিলের মাধ্যম, উদাহরণত রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধ সৃষ্টি সংগঠন Resistance movement এবং জানবাজ ফৌজ কৃতিত্বপূর্ণ ও গৌরবোজ্জ্বল দায়িত্ব পালন করে ফ্রান্সের মরা গাঙে জোয়ার সৃষ্টি করে এবং এভাবে ফ্রান্স বিশ্বের বুক থেকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পায়। অর্থাৎ ফ্রান্সের নৈতিক পরাজয়ের চিহ্ন পুরোপুরিভাবে ফুটে উঠেনি। অতএব তারা কোন না কোনভাবে বেঁচে ওঠে। কিন্তু মানসিক পরাজয় সবচাইতে ধ্বংসাত্মক ও ভয়াবহ হয়ে থাকে। কোন জাতির মধ্যে মানসিক পরাজয় আসন গেড়ে বসলে জীবনের আর কোন স্পন্দনই অবশিষ্ট থাকে না।
মহানবী (স) দুশমনকে প্রথমে বদর প্রান্তরে আর্থিক ও বৈষয়িক দিক দিয়ে পরাজিত করেন। তারপর খন্দক যুদ্ধে তিনি তাদেরকে নৈতিকভাবে পর্যুদস্ত করেন। তারপর হুদায়বিয়ার সন্ধিতে তাদের মনস্তাত্ত্বিক পরাজয় ঘটিয়ে তিনি তাদেরকে একেবারে অসহায় করে তোলেন। এ সন্ধি কাফিরদেরকে মুসলমানদের সঙ্গে মেলামেশার এবং ইসলাম ও তার প্রতিষ্ঠাতা এবং মুসলমানদের জানা-বুঝার এবং তাদের চরিত্র ও কার্যকলাপ যাচাই করার মওকা এনে দেয়। ফলে মক্কা বিজয় সহজ হয়ে যায়।...
যোগ্য জেনারেলই আপন ফৌজের ন্যূনতম ক্ষতি করে শত্রুর উপর অধিকতর ও গভীরতর প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। মক্কা বিজয় বিশ্ব ইতিহাসে সৈনিকসুলভ যোগ্যতার মহত্তম নমুনা, আর মহানবী (স) পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম ও যোগ্যতম সমরনায়ক"। [মহানবী (স)-এর প্রতিরক্ষা কৌশল, পৃ. ৩৪৬-৩৫০]