📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 যুদ্ধাভিযানে সঙ্কেত ব্যবহার

📄 যুদ্ধাভিযানে সঙ্কেত ব্যবহার


যুদ্ধ যাত্রাকালে বিশাল বাহিনীর মধ্যে যাহাতে শত্রু পক্ষের গুপ্তচর ঢুকিয়া পড়িতে না পারে, সেই লক্ষ্যে আল্লাহ্র রাসূল (স) পরিচিতিমূলক বিশেষ সাঙ্কেতিক শব্দ নির্ধারণ করিয়া দিতেন, এমনকি নিজেদের বাহিনীর বিভিন্ন অংশের জন্য ভিন্ন ভিন্ন সাঙ্কেতিক শব্দও নির্ধারণ করিয়া দিতেন। যেমন মক্কা অভিযানকালে মুহাজিরগণের সাঙ্কেতিক শব্দ ছিল 'ইয়া বনী আবদুর রহমান'। আনসারদের মধ্যকার খাযরাজীদের সঙ্কেত ছিল 'ইয়া বনী আবদুল্লাহ'। আর আওস গোত্রীয়দের সঙ্কেত ছিল 'ইয়া বানু উবায়দুল্লাহ্'। [সীরাতু ইব্‌ন হিশাম, ৪খ., পৃ. ৪৯, ইফা.]
গাযওয়া বানু মুস্তালিক অভিযানে মুসলমান যোদ্ধাদের সাঙ্কেতিক শব্দ ছিল "ইয়া মানসূর"! আমিত আমিত (হে সাহায্যপ্রাপ্ত বিজয়ী! মৃত্যুর দ্বারে ঠেলিয়া দাও! মৃত্যুর দ্বারে ঠেলিয়া দাও)! খায়বার যুদ্ধেও মুসলিম মুজাহিদগণের বিশেষ সাঙ্কেতিক শব্দ ছিল-আমিত! আমিত!!

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কুরায়শদের নামমাত্র প্রতিরোধ

📄 কুরায়শদের নামমাত্র প্রতিরোধ


পূর্বে উল্লিখিত হইয়াছে যে, আবূ সুফ্যানের পরমার্শ অনুসারে কুরায়শগণ মসজিদুল হারামে প্রবেশ করিয়া বা নিজ নিজ ঘরে অবস্থান করিয়া আত্মরক্ষায় যত্নবান হয়। কিন্তু মরণ কামড়ের মত তাহাদের মধ্যকার কিছু গুণ্ডা-বদমাশ প্রকৃতির লোক গোয়ার্তুমীপূর্ণ প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করিতে ইকরামা ইব্‌ন আবু জাহল, সাফওয়ান ইব্‌ন উমায়‍্যা ও সুহায়ল ইব্‌ন আমরের নেতৃত্বে জাবাল আবূ কুবায়সের পূর্বদিকে অবস্থিত খানদামায় সমবেত হইল। সংঘর্ষে হযরত খালিদের বাহিনীর হাতে তাহাদের বার-তেরজন নিহত হইল। অবশ্য মুসলিম পক্ষের দুইজন কুরয ইব্‌ন্ন জাবির ফিত্রী এবং খুনায়স ইব্‌ন খালিদ ইবন রাবী'আ (রা)-ও ভুলক্রমে ভিন্ন পথে চলিয়া যাওয়ায় মুশরিকদের কবলে পড়িয়া শহীদ হন। ইব্‌ন ইসহাকের বর্ণনা হইতে জানা যায় যে, খালিদ-বাহিনীর আরেকজন মুজাহিদ জুহায়না গোত্রের সালামা ইব্‌ন সায়লাও এই সময় শহীদ হন। [ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরা, ৪খ., পৃ. ৪৮]

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 চূড়ান্ত বিজয়

📄 চূড়ান্ত বিজয়


অষ্টম হিজরীর ১৭ রমযান, মঙ্গলবার। রাসূলুল্লাহ্ (স) মাররুজ জাহান হইতে মক্কায় রওয়ানা হইলেন। যী-তুয়া প্রান্তরে উপনীত হইয়া তিনি থামিলেন। কুরায়শদের পক্ষ হইতে কোনরূপ আক্রমণের লক্ষণই নাই দেখিয়া তিনি সম্যক উপলব্ধি করিলেন যে, বিনা যুদ্ধে ও বিনা রক্তপাতেই আল্লাহ তা'আলা বিজয় আনিয়া দিয়াছেন। মহান আল্লাহ্ প্রদত্ত বিজয়ের কৃতজ্ঞতায় তাঁহার শির নত হইয়া আসিল। তাঁহার মস্তক আক্ষরিক অর্থেই এত অবনত হইল যে, উটের পিঠের হাওদা তাঁহার শ্বশ্রুরাজি স্পর্শ করিতেছিল। তাঁহার নির্দেশ অনুসরণে খালিদ ইদুল ওয়ালীদ তাহার দক্ষিণ বাহিনীসহ মক্কার নিম্নাঞ্চল দিয়া সাফা পাহাড়ে গিয়া থামিলেন। বাম বাহিনী প্রধান যুবায়র ইবনুল আওয়াম (রা) মক্কার উচু এলাকা দিয়া 'কাদা'-এর পথে অগ্রসর হইয়া 'হাজুনে' তাহার ঝাণ্ডা উড্ডীন করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য একটি কুব্বা নির্মাণ করিয়া তাঁহার অপেক্ষায় থাকিলেন। আবু উবায়দাও তাহার পদাতিক বাহিনী লইয়া বাতনে ওয়াদীর পথ ধরিয়া মক্কার কেন্দ্রভূমিতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে গিয়া উপস্থিত হইলেন। এইভাবে আল্লাহ্র ফযল ও করমে প্রায় বিনা বাধায় ও বিনা রক্তপাতেই মক্কা বিজয় সমাপ্ত হইল। যে বিজয়ের জন্য উভয় পক্ষের হাজার হাজার যোদ্ধার প্রাণনাশ হওয়া ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক, রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর প্রজ্ঞাপূর্ণ প্রতিরক্ষা কৌশল ও সামরিক ব্যবস্থাপনার দরুন উহা ন্যূনতম ক্ষয়ক্ষতিতে এইভাবে সম্পন্ন হইল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সামরিক দৃষ্টিকোণ হইতে মক্কা বিজয়ের মূল্যায়ন

📄 সামরিক দৃষ্টিকোণ হইতে মক্কা বিজয়ের মূল্যায়ন


দুই দুইটি বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সমর নায়ক জেনারেল আকবর খান বিশ্বযুদ্ধগুলির অভিজ্ঞতার আলোকে মক্কা বিজয়ের যে পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন করিয়াছেন উহাতে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর প্রতিরক্ষা কৌশল যে সর্বোত্তম ছিল তাহা সহজেই অনুমেয়। তাই তাঁহারই ভাষায় এই বক্তব্যটি উদ্ধৃত করিতেছিঃ
"মক্কা বিজয়ের বেলা মহানবী (স) যে নীতি অবলম্বন করেছিলেন তা আজকালও অবলম্বন করা হয়ে থাকে। দৃষ্টান্তস্বরূপ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে হিটলার indirect approach -এর প্রতিরক্ষা নীতিকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেন। হিটলার প্রথমে প্রচার-প্রোপাগান্ডা চালিয়ে শত্রুরাষ্ট্রে বিরোধিতার আবেগ-উদ্দীপনাকে খতম করে দিতেন এবং এভাবে নিজেদের হামলার সাফল্যকে নিশ্চিত করতেন, এরই সঙ্গে শত্রুর শক্তিশালী সহযোগীকে তার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতেন যেন সে তাদের থেকে সরাসরি ফায়দা উঠাতে না পারে এবং এভাবে সে দুর্বল হয়ে পড়ে। অতঃপর তার রাষ্ট্রে অস্থিরতা সৃষ্টি করা হতো যার ফলে তাদের অবশিষ্ট ছিটেফোটা মনোবলটুকুও ভেঙ্গে পড়ে। এসব নীতি অনুসরণ করেই ১৯৩৮ সালে তিনি জার্মানীকে বিশালতর জার্মানীতে পরিণত করেছিলেন।
মহানবী (স) আজ থেকে সাড়ে তের শ' বছর পূর্বে এই প্রতিরক্ষা স্ট্রাটেজী এমনভাবে কার্যকর করেন যে, বুদ্ধি খেই হারিয়ে ফেলে। তিনি প্রথমে কুরায়শদেরকে রণক্ষেত্রে পরাজিত করেন। তারপর তাদের সহযোগী শক্তিগুলোকে তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন করেন। হুদায়বিয়ার সন্ধির মাধ্যমে তাদের অবশিষ্ট মর্যাদা ও প্রভাবটুকু খতম করে দেন। এরপর মক্কা বিজয় পাকা ফলের ন্যায় হয়ে রইল যা সামান্য ঝাকুনীতেই বোটা থেকে খসে টস করে কোলের উপর এসে পড়লো। কিন্তু এতদসত্ত্বেও কুরাইশদেরকে তিনি ধ্বংস করেননি। তাদেরকে তিনি হেয় ও অপমানিত করেননি, বরং মুষ্টিমেয় কয়েকজন ব্যতিরেকে সবাইকে তিনি মুক্ত করে দেন। না কারো জীবন ও সম্মানের উপরই তিনি আচড় কেটেছেন, না তিনি কারো সম্পদহানি করিয়াছেন! আর এসবই ছিল সংস্কার ও গঠন, ধ্বংস ও প্রতিশোধ গ্রহণ নয়। তিনি তাদেরকে মক্কার মুহাফিয রাখতে চেয়েছিলেন এবং তাদের দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। তাদেরকে যদি এমত পরিমাণ অবনমিত করা হতো যে, ইসলামী সমাজ জীবনের উপর বোঝাস্বরূপ হত তাহলে তা রহমতস্বরূপ হবার পরিবর্তে মুসিবতরূপে দেখা দিত। কিন্তু তিনি এমনভাবে কাজ করলেন যে, সাপও মারলেন অথচ লাঠিও ভাঙলো না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00