📄 প্রতিপক্ষের সর্দারদের সম্মাননা এবং রক্তপাত এড়াইবার ব্যবস্থা গ্রহণ
নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বলিপ্সা মানুষের একটা সহজাত প্রবৃত্তি, বিশেষত রাজ-রাজড়া ও গোত্র প্রধানগণ উহার কবল হইতে সহজে মুক্ত হইতে পারে না। তাহাদের এই তৃষ্ণা নিবৃত্ত করার ব্যবস্থা গৃহীত না হইলে সত্যকে সম্যকরূপে জানিয়াও অনেকের পক্ষে তাহা গ্রহণ করিয়া লওয়া সম্ভব হইয়া উঠে না। রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াসের নিকট আল্লাহ্র রাসূলের সত্যতা নিখুঁতভাবেই ধরা পড়িয়াছিল, কেবল রাজত্ব হারাইবার আশঙ্কাই তাহার ইসলাম গ্রহণের পথে প্রতিবন্ধক হইয়া দাঁড়ায়। [মৎপ্রণীত রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর পত্রাবলীঃ সন্ধি চুক্তি ও ফয়সালাসমূহ, পৃ. ৩৮-৫৭; সূত্রঃ ফাতহুল বারী, ১খ., পৃ. ৪০; তারীখ তাবারী, ৩খ., পৃ. ৮৭; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৬২-২৬৮; আল-জাওয়াবুস সাহীহ্, ১খ., পৃ. ৯৪ ইত্যাদি]
তাই রাসূলুল্লাহ (স) রাজন্যবর্গের নামে লিখিত তাঁহার পত্রাবলীতে প্রায়ই উল্লেখ করিতেন:
فاسلم تسلم واسلم يجعل لك الله ما تحت يديك.
"অতএব ইসলাম গ্রহণ করুন, শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করিবেন এবং ইসলাম কবুল করুন, আপনার অধীনে যাহা কিছু রহিয়াছে তাহা আল্লাহ্ আপনার অধীনেই রাখিয়া দিবেন"। [মুনযির ইবন সাওয়ার নামে রাসূলুল্লাহ (স)-এর পত্র, প্রাগুক্ত রসূলুল্লাহ্র পত্রাবলী...., পৃ. ৯৬; সূত্র: যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৬১; তাবাকাত, ৩খ., পৃ. ১৯ ও ২৭; ফুতূহুল বুলদান, ১খ., পৃ. ৭৯-৮১; ইব্ন তুলুন, ই'লামুস সাইলীন, পৃ. ৮ ইত্যাদি]
সত্য সত্যই ইসলাম গ্রহণের পর এই মুনযির ইবন সাওয়া এবং আরও অনেককে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের রাজত্বে বহাল রাখিয়াছেন। আবূ সুফ্যানের ইসলাম গ্রহণ কালেও সেই ব্যাপারটি সম্মুখে আসিল। আব্বাস (রা) আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আবূ সুফ্যান মক্কার অন্যতম প্রধান সর্দার, সে অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি। আপনি তাহার গৌরববর্ধক ও বৈশিষ্ট্যবোধক কোন ব্যবস্থা করিয়া দিন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ঠিক আছে। ঘোষণা করিয়া দাও, যেই ব্যক্তি আবু সুফ্যানের ঘরে প্রবেশ করিবে সে নিরাপদ। আবূ সুফ্যান বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ। আমার ঘরে কয়জন লোকই বা আশ্রয় নিতে পারিবে? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ঠিক আছে, যাহারা মসজিদুল হারামে প্রবেশ করিবে (আশ্রয় গ্রহণ করিতে) তাহারাও নিরাপদ।
এইবার আবূ সুফয়ান বলিলেন, মসজিদেও তো সকলের স্থান সঙ্কুলান হইবে না ইয়া রাসূলাল্লাহ্! রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ঠিক আছে, যেই ব্যক্তি তাহার নিজ ঘরে অবস্থান করিবে সেও নিরাপদ। এইবার আবূ সুফ্যান আশ্বস্ত হইলেন এবং বলিলেন, হাঁ, এখন আর স্থান সঙ্কুলানের সমস্যা হইবে না।
আবূ সুফ্যান যখন মক্কায় প্রত্যাবর্তন করিয়া নিরাপত্তা লাভের এই ব্যবস্থার কথা লোকজনকে বলিলেন, তখন তাহার স্ত্রী হিন্দ লোকজনকে ডাকিয়া বলিতে লাগিল- দেখ, দেখ, এই অর্বাচীন বৃদ্ধটি কী প্রলাপ বকিতেছে! তোমরা ইহার কথায় কর্ণপাত করিও না। সে আবূ সুফ্যানকে অত্যন্ত অমার্জিত ভাষায় গালিগালাজ করিতে লাগিল। আবু সুফিয়ান বলিলেন, মঙ্গল চাহিলে ইসলাম গ্রহণ কর! প্রাণ বাঁচাইতে চাহিলে ঘরের দরজা বন্ধ করিয়া বসিয়া থাক। আমি যাহা বলিতেছি, সত্য বলিতেছি। ইহা ছাড়া প্রাণে বাঁচিবার আর কোন পথ নাই। তাহার এইরূপ বক্তব্য শ্রবণে লোকজন মসজিদুল হারামের দিকে দৌড়াইতে লাগিল। কেহ বা তাহার নিজ ঘরের দরজা বন্ধ করিয়া বসিয়া রহিল। [কান্ধলবী, সীরাতুল মুসতাফা, ৩খ., পৃ. ২০-২৩]
ইসলাম গ্রহণের পর জাহিলী যুগের সর্দার শ্রেণীর লোকদের পুনর্বাসনের অন্তত আরও তিনটি নযীর পাওয়া যায়। মক্কা বিজয়কালে হাকীম ইবন হিযামের বাড়ীও নিরাপদ ঘোষিত হইয়াছিল।
আমর ইবনুল আস (রা)-এর ইসলাম গ্রহণের পর পূর্বতন বয়োঃজ্যেষ্ঠ ও ইসলাম গ্রহণে অগ্রবর্তী অনেক উল্লেখযোগ্য সাহাবীর বর্তমানে তাঁহাকেই সেনাপতির মর্যাদা দিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বিভিন্ন অভিযানে প্রেরণ করেন। উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয়ের হোতা হওয়া সত্ত্বেও খালিদ ইব্দুল ওয়ালীদ ইসলাম গ্রহণ করিবার সাথে সাথে তাহাকে 'সায়ফুল্লাহ' (আল্লাহ্ তরবারি খেতাবে ভূষিত করা হয়। এই সম্মাননাগুলি ছিল রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর বাণী-
خياركم في الجاهلية خياركم في الاسلام اذا فقهوا .
"তোমাদের মধ্যকার যাহারা ইসলাম- পূর্ব যুগে সম্মানিত ছিল, ইসলাম গ্রহণের পরও তাহারা সম্মানিত বিবেচিত হইবে যদি তাহারা ইসলামের ব্যুৎপত্তি সম্পন্ন হয়"-এরই প্রতিফলন। [ডঃ হামীদুল্লাহ্, উর্দু মাসিক সিয়াসাত, হায়দরাবাদ, দাক্ষিণাত্য, জানুয়ারী ১৯৪০ সংখ্যা এবং আহদে নববী কে নিযামে হুমরানী, পৃ. ২৭২]
📄 যুদ্ধাভিযানে সঙ্কেত ব্যবহার
যুদ্ধ যাত্রাকালে বিশাল বাহিনীর মধ্যে যাহাতে শত্রু পক্ষের গুপ্তচর ঢুকিয়া পড়িতে না পারে, সেই লক্ষ্যে আল্লাহ্র রাসূল (স) পরিচিতিমূলক বিশেষ সাঙ্কেতিক শব্দ নির্ধারণ করিয়া দিতেন, এমনকি নিজেদের বাহিনীর বিভিন্ন অংশের জন্য ভিন্ন ভিন্ন সাঙ্কেতিক শব্দও নির্ধারণ করিয়া দিতেন। যেমন মক্কা অভিযানকালে মুহাজিরগণের সাঙ্কেতিক শব্দ ছিল 'ইয়া বনী আবদুর রহমান'। আনসারদের মধ্যকার খাযরাজীদের সঙ্কেত ছিল 'ইয়া বনী আবদুল্লাহ'। আর আওস গোত্রীয়দের সঙ্কেত ছিল 'ইয়া বানু উবায়দুল্লাহ্'। [সীরাতু ইব্ন হিশাম, ৪খ., পৃ. ৪৯, ইফা.]
গাযওয়া বানু মুস্তালিক অভিযানে মুসলমান যোদ্ধাদের সাঙ্কেতিক শব্দ ছিল "ইয়া মানসূর"! আমিত আমিত (হে সাহায্যপ্রাপ্ত বিজয়ী! মৃত্যুর দ্বারে ঠেলিয়া দাও! মৃত্যুর দ্বারে ঠেলিয়া দাও)! খায়বার যুদ্ধেও মুসলিম মুজাহিদগণের বিশেষ সাঙ্কেতিক শব্দ ছিল-আমিত! আমিত!!
📄 কুরায়শদের নামমাত্র প্রতিরোধ
পূর্বে উল্লিখিত হইয়াছে যে, আবূ সুফ্যানের পরমার্শ অনুসারে কুরায়শগণ মসজিদুল হারামে প্রবেশ করিয়া বা নিজ নিজ ঘরে অবস্থান করিয়া আত্মরক্ষায় যত্নবান হয়। কিন্তু মরণ কামড়ের মত তাহাদের মধ্যকার কিছু গুণ্ডা-বদমাশ প্রকৃতির লোক গোয়ার্তুমীপূর্ণ প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করিতে ইকরামা ইব্ন আবু জাহল, সাফওয়ান ইব্ন উমায়্যা ও সুহায়ল ইব্ন আমরের নেতৃত্বে জাবাল আবূ কুবায়সের পূর্বদিকে অবস্থিত খানদামায় সমবেত হইল। সংঘর্ষে হযরত খালিদের বাহিনীর হাতে তাহাদের বার-তেরজন নিহত হইল। অবশ্য মুসলিম পক্ষের দুইজন কুরয ইব্ন্ন জাবির ফিত্রী এবং খুনায়স ইব্ন খালিদ ইবন রাবী'আ (রা)-ও ভুলক্রমে ভিন্ন পথে চলিয়া যাওয়ায় মুশরিকদের কবলে পড়িয়া শহীদ হন। ইব্ন ইসহাকের বর্ণনা হইতে জানা যায় যে, খালিদ-বাহিনীর আরেকজন মুজাহিদ জুহায়না গোত্রের সালামা ইব্ন সায়লাও এই সময় শহীদ হন। [ইব্ন হিশাম, আস-সীরা, ৪খ., পৃ. ৪৮]
📄 চূড়ান্ত বিজয়
অষ্টম হিজরীর ১৭ রমযান, মঙ্গলবার। রাসূলুল্লাহ্ (স) মাররুজ জাহান হইতে মক্কায় রওয়ানা হইলেন। যী-তুয়া প্রান্তরে উপনীত হইয়া তিনি থামিলেন। কুরায়শদের পক্ষ হইতে কোনরূপ আক্রমণের লক্ষণই নাই দেখিয়া তিনি সম্যক উপলব্ধি করিলেন যে, বিনা যুদ্ধে ও বিনা রক্তপাতেই আল্লাহ তা'আলা বিজয় আনিয়া দিয়াছেন। মহান আল্লাহ্ প্রদত্ত বিজয়ের কৃতজ্ঞতায় তাঁহার শির নত হইয়া আসিল। তাঁহার মস্তক আক্ষরিক অর্থেই এত অবনত হইল যে, উটের পিঠের হাওদা তাঁহার শ্বশ্রুরাজি স্পর্শ করিতেছিল। তাঁহার নির্দেশ অনুসরণে খালিদ ইদুল ওয়ালীদ তাহার দক্ষিণ বাহিনীসহ মক্কার নিম্নাঞ্চল দিয়া সাফা পাহাড়ে গিয়া থামিলেন। বাম বাহিনী প্রধান যুবায়র ইবনুল আওয়াম (রা) মক্কার উচু এলাকা দিয়া 'কাদা'-এর পথে অগ্রসর হইয়া 'হাজুনে' তাহার ঝাণ্ডা উড্ডীন করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য একটি কুব্বা নির্মাণ করিয়া তাঁহার অপেক্ষায় থাকিলেন। আবু উবায়দাও তাহার পদাতিক বাহিনী লইয়া বাতনে ওয়াদীর পথ ধরিয়া মক্কার কেন্দ্রভূমিতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে গিয়া উপস্থিত হইলেন। এইভাবে আল্লাহ্র ফযল ও করমে প্রায় বিনা বাধায় ও বিনা রক্তপাতেই মক্কা বিজয় সমাপ্ত হইল। যে বিজয়ের জন্য উভয় পক্ষের হাজার হাজার যোদ্ধার প্রাণনাশ হওয়া ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক, রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর প্রজ্ঞাপূর্ণ প্রতিরক্ষা কৌশল ও সামরিক ব্যবস্থাপনার দরুন উহা ন্যূনতম ক্ষয়ক্ষতিতে এইভাবে সম্পন্ন হইল।