📄 প্রতিশোধ স্পৃহামুক্ত ক্ষমা সুন্দর হৃদয়
প্রতিশোধ স্পৃহামুক্ত ক্ষমাশীল হৃদয় ও আচরণের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ্ (স) সেই বিরাট বিজয় অর্জন করিয়াছেন যাহা অন্যান্য সেনাপতিগণ বিরাট রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমেও ছিনাইয়া আনিতে পারেন না। মক্কা অভিযানে রওয়ানা হওয়ার প্রথম দিকেই মুসলিম বাহিনী আবওয়ায় পৌঁছিতেই তাঁহার দুই আজীবন শত্রু নিকটাত্মীয় তাঁহার পিতৃব্য পুত্র আবূ সুফ্যান ইব্ন হারিছ এবং ফুফাতো ভাই আবদুল্লাহ ইব্ন উমায়্যা আসিয়া তাঁহার সহিত সাক্ষাত করিবার অনুমতি প্রার্থনা করিলেন। আজীবন ইহারা আল্লাহ্ রসূলের সহিত বৈরী আচরণের কিছুই বাদ দেয় নাই।
উভয়ে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর প্রাণের শত্রু হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ্র রাসূল (স) তাহাদিগকে ক্ষমা করিয়া তাঁহাদের ইসলামে দীক্ষিত করার আবেদনে সাড়া দিলেন। অবশ্য হযরত আলী (রা) তাহাদিগকে ক্ষমা প্রার্থনার কৌশল ও পদ্ধতি শিক্ষা দিয়া এবং উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা (রা) তাহাদের জন্য সুপারিশ করিয়া ঐ ব্যাপারে বিরাট ভূমিকা রাখিয়াছিলেন। [আর-রাহীকুল মাখতুম, আরবী, পৃ. ৪৪৮-৪৪৯; আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২৫০-২৫১]
কুরায়শ বাহিনীর পক্ষে গোপনে মুসলিম বাহিনীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করিতে আসিয়া গভীর রাতে আবূ সুফ্যান রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর চাচা সদ্য ঘোষিত মুসলমান আব্বাস (রা)-এর কাছে ধরা পড়িয়া যান। হাকীম ইব্ন হিযাম ও বুদায়ল ইব্ন ওয়াশ সমভিব্যাহারে নৈশ পর্যবেক্ষণে আগত এই দলের পারস্পরিক শলা-পরামর্শের সময় আব্বাস (রা) আবূ সুফ্যানের কণ্ঠস্বর চিনিয়া ফেলেন। আবূ সুফ্যান এই দিকের সংবাদ জানিতে চাহিলে তাহার পুরাতন বন্ধু আব্বাস (রা) জানাইলেন, কুরায়শদের ধ্বংস অনিবার্য। সময় থাকিতে সুবুদ্ধির আশ্রয় নিতে হইবে। আবু সুফ্যান এখন উপায় কী জানিতে চাহিলে আব্বাস তাহাকে লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে উপস্থিত হওয়ার প্রস্তাব দিলেন।
মক্কাবাসীরা মুসলিম বাহিনীর অগ্রাভিযানের মুখে যুদ্ধ করিয়া ধ্বংস হইয়া যাউক, ইহা কোনমতেই আব্বাসের কাম্য ছিল না। তাই কাহারও মাধ্যমে সংবাদ পাঠাইয়া মক্কাবাসীদিগকে আবার সতর্ক করিয়া দেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি রাত্রিকালে একাকী বাহির হইয়া পড়িয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সুপরিচিত শুভ্র বর্ণের খচ্চরে আরোহণ করিয়াই তিনি বাহির হইয়াছিলেন।
আব্বাস (রা) যেহেতু রাসূলুল্লাহ্ (স)-এরই পিতৃব্য এবং তাঁহার বাহন রাসূলুল্লাহ্ (স)-এরই সুপরিচিত বাহন শুভ্র খচ্চরটি, তাই মুসলিম বাহিনীর মধ্য দিয়া আবু সুফ্যানকে লইয়া অতিক্রম করিতে আব্বাসকে কোন বেগ পাইতে হইল না। তাঁহার পিছনে উপবিষ্ট লোকটি কে, তাহাও কেহ জানার প্রয়োজন বোধ করিল না। কিন্তু উমার (রা)-এর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাহা ধরা পড়িয়া গেল। আব্বাস (রা)-এর নিজের বর্ণনা:
“শেষ পর্যন্ত যখন আমি উমার ইবনুল খাত্তাব (রা)-এর জ্বলন্ত চুল্লীর পার্শ্ব অতিক্রম করিতেছিলাম তখন তিনি গর্জিয়া উঠিলেন, কে হে? তিনি আমার দিকে অগ্রসর হইলেন এবং যখন আমার পিছনে আবূ সুফ্যানকে উপবিষ্ট দেখিতে পাইলেন তখন চিৎকার করিয়া বলিলেন, আল্লাহ্র দুশমন আবূ সুফ্যান? প্রশংসা সেই আল্লাহ্ যিনি কোনরূপ সন্ধিচুক্তি ও শর্ত ব্যতীতই তোমাকে আমাদের করায়ত্ত করিয়া দিয়াছেন! এই কথা বলিয়াই তিনি রাসূলুল্লাহ্ (স) -এর দিকে দ্রুত দৌড়াইলেন। আর আমিও প্রাণপণে খচ্চরকে জুটাইলাম এবং তাঁহার পূর্বেই নবী করীম (স)-এর সম্মুখে পৌছিয়া গেলাম। ততক্ষণে উমার আসিয়া পৌছিলেন এবং আবূ সুফ্যানকে হত্যার অনুমতি প্রার্থনা করিলেন। তৎক্ষণাত আমি বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি কিন্তু তাহাকে অভয় আশ্রয় দিয়া আনিয়াছি। আমি রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর মাথায় হাত রাখিয়া বলিলাম, আল্লাহর কসম! অদ্যকার রাত্রিতে আমি ব্যতীত অন্য কোন ব্যক্তি যেন আপনার সহিত একান্তে মিলিত না হয়। রাসূলুল্লাহ্ (স) আমাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, আবূ সুফ্যানকে আপনি আপনার তাঁবুতে লইয়া যান, সকালে তাহাকে আমার নিকট লইয়া আসিবেন।
আব্বাস (রা)-এর এই দীর্ঘ বর্ণনায় হযরত উমার (রা)-এর সঙ্গে আবূ সুফ্যানের হত্যার ব্যাপারে তাঁহার বাদানুবাদের বর্ণনাও রহিয়াছে। পরদিন সকালে মহানবী (স) দরবারে হাযির হইলে আবূ সুফ্যানের সহিত রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিম্নরূপ কথোপকথন হয়:
রাসূলুল্লাহ্ (স) : আবু সুফ্যান! তোমার জন্য আক্ষেপ, এখনও কি তোমার এই কথা অনুসরণ করার সময় আসে নাই যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নাই?
আবু সুফ্যান : আমার পিতামাতা আপনার জন্য কুরবান হউন। আপনি কত ধৈর্যশীল! কত আত্মীয় বৎসল!! আমি সম্যক উপলব্ধি করিয়াছি যে, আল্লাহ্ ব্যতীত যদি অন্য কোন ইলাহ আদৌ থাকিত তবে এই দুর্দিনে সে আমার কাজে আসিত।
রাসূলুল্লাহ্ : আবূ সুফ্যান! তোমার জন্য আক্ষেপ, এখনও কি তোমার এই কথা উপলব্ধি করার সময় হয় নাই যে, আমি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল?
আবু সুফ্যান : আমার পিতামাতা আপনার জন্য কুরবান হউন! আপনি কতইনা ধৈর্যশীল ও স্বজন বৎসল। এই ব্যাপারে এখনও আমার কিছুটা সংশয় রহিয়া গিয়াছে।
যাহা হউক, শেষ পর্যন্ত আব্বাসের পরামর্শক্রমে আবূ সুফ্যান ইসলাম গ্রহণ করিলেন। [ইবন হাজার, মাতালিবুল আলিয়া, পৃঃ ২৪৪]
বুদায়ল ও হাকীম ইবন হিযাম যখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত সাক্ষাত করেন তখন তাহারাও ইসলাম গ্রহণ করেন। [মাগাযী, পৃ. ৮১৫; তাবাকাত, পৃ. ১৩৫]
রাসূলুল্লাহ্ (স) প্রদত্ত পতাকা হস্তে আনছার-নেতা হযরত সা'দ ইবন উবাদা (রা) বীরদর্পে যখন মাররুজ জাহরানের গিরিপথ অতিক্রম করিতেছিলেন তখন প্রবল উৎসাহে তাঁহার মুখে উচ্চারিত হইল : اليوم يوم الملحمة اليوم تستحل الحرمة. "আজকের দিন মনের সুখে নিধন হবে। আজকে কা'বায় হারাম কাজ হালাল হবে।"
ভীত-সন্ত্রস্ত আৰু সুফ্যান সা'দ ইবন উবাদার এই ঘোষণার প্রতি রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করিলেন। হযরত উছমান এবং আবদুর রহমান ইব্ন আওফ (রা)-ও সা'দ (রা)-এর বাহিনীর হাতে কুরায়শদের ব্যাপক নিধনের আশঙ্কা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট ব্যক্ত করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তৎক্ষণাৎ বলিলেনঃ না, না, তাহা হইবার নয়।
يا ابا سفيان اليوم يوم المرحمة يعز الله فيه قريشا .
"হে আবু সুফ্যান! আজকের দিন দয়া ও সৌহার্দ্য প্রকাশের দিন। আজ আল্লাহ কুরায়শদিগকে মর্যাদায় ভূষিত করিবেন"।
বুখারী শরীফের বর্ণনায় রহিয়াছে, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেনঃ كذب سعد ولكن هذا يوم يعظم الله فيه الكعبة ويوم تكسى فيه الكعبة.
"সা'দ ভুল বলিয়াছে। আজ আল্লাহ্ তা'আলা কা'বাকে সম্মানিত করিবেন এবং কা'বাকে গিলাফ পরানো হইবে"।
সাথে সাথে তিনি অতি উৎসাহী সাদের হাত হইতে পতাকা লইয়া তাঁহার পুত্র কায়সের হাতে অর্পণের নির্দেশ দিলেন। [সহীহ বুখারী, হাদীছ নং ৪২৮০; নাদ্রাতুন না'ঈম, ১খ., পৃ ৫০১, বাংলা অনু.]
তারপর আবূ সুফ্যান মহানবী (স)-এর দরবার হইতে প্রস্থান করিলেন এবং দ্রুত মক্কায় গিয়া মক্কাবাসীদিগকে স্পষ্ট ভাষায় জানাইয়া দিলেন যে, তাহারা কোনমতেই পারিয়া উঠিবে না। তাই কোনক্রমেই যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া সমীচীন হইবে না। [কান্ধলবী, সীরাতুল মুসতাফা, পৃ. ২১-২২] রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর ক্ষমাপরায়ণতার সেই দৃশ্য আল্লামা সায়্যিদ সুলায়মান নদবী (র)-র ভাষায় ছিল এইরূপ:
"মক্কা বিজয় তখন সমাপ্ত হয়েছে। হারাম প্রাঙ্গণ। এই সেই হারাম প্রাঙ্গণ যেখানে নূরের নবীকে গালিগালাজ করা হয়েছে, তাঁর উপর আবর্জনা নিক্ষেপ করা হয়েছে, তাঁকে হত্যার প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। কুরাইশ দলপতিরা বিজিতের বেশে দণ্ডায়মান। ইসলামকে মিটিয়ে দেয়ার কুটিল ষড়যন্ত্রের নায়করা, নূরের নবীকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারী, তাঁর বিরুদ্ধে কুৎসা রটনাকারী, তাঁকে অপদস্ত করার প্রয়াসে প্রয়াসীদের মত স্পর্ধাকারী, তাঁর উপর প্রস্তর বর্ষণকারী, তাঁর উপর তলোয়ার চালনাকারী, অকারণে তাঁর আত্মীয়-স্বজনের বক্ষ বিদারণকারী ও তাঁদের হৃৎপিণ্ড চর্বণকারী, নিঃস্ব-দরিদ্র মুসলমানদেরকে অকারণে উৎপীড়নকারী, নিরস্ত্র মুসলমানদের বুকে যারা অত্যাচারের আগ্নেয় মহর অঙ্কন করেছিল, দুপুরের অগ্নিক্ষরা রোদে মরুভূমির তপ্ত বালুতে শুইয়ে রেখেছিল, জলন্ত অঙ্গারে মুসলিমদের চেপে ধরে যারা পাশবিক আনন্দ লাভ করত, বল্লমের খোঁচায় একদা যারা মুসলিমদেরকে ক্ষতবিক্ষত ও ছিদ্র করেছিল, এদের সবাই আজ নত মস্তকে সম্মুখে দণ্ডায়মান। পশ্চাতে ওদের দশ সহস্রাধিক তলোয়ার রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইঙ্গিতের শুধু অপেক্ষা করছিল। সহসা রাসূলে খোদার মুখে উচ্চারিত হলো- হে কুরাইশকুল! বল, আজ তোমরা আমার কাছে কেমন ব্যবহার প্রত্যাশা কর? 'মুহাম্মদ! অমায়িক ব্যবহারের অধিকারী ভাই আমার, ভাতিজা আমার। জবাবে নানাজনের নানা সম্ভাষণ উচ্চারিত হয়। নূরের নবীর মুখে উচ্চারিত হলো: আজ আমি তাই বলবো ইউসুফ আলায়হিস্ সালাম তাঁর যালিম ভাইদেরকে যা বলেছিলেন:
لا تَشْرِيْبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ. "আজকের দিনে তোমাদের বিরুদ্ধে আমার কোন অভিযোগ নেই"।
اذهبوا فانتم الطلقاء. "যাও, আজ তোমরা স্বাধীন, যদৃচ্ছ অবাধে যেতে পার"।
প্রিয় ভায়েরা আমার! বন্ধুরা আমার। এই হলো শত্রুকে ক্ষমা প্রদর্শনে ইসলামের নবীর বাস্তব আদর্শ, বাস্তব ভিত্তিক শিক্ষা-যা দুনিয়ার বাস্তব ইতিহাসের পাতায় দেদীপ্যমান ঘটনারূপে ভাস্বর হয়ে রয়েছে”। [আল্লামা সায়ি্যদ সুলায়মান নদবী (র) কর্তৃক ১৯২৫ সালে মাদ্রাযের লালী হলে প্রদত্ত সীরাত-ভাষণ, দ্র. নবী চিরন্তন, খুৎবাতে মাদ্রাজ-এর আবদুল্লাহ্ বিন সাঈদ জালালাবাদী কৃত বঙ্গানুবাদ, পৃ. ১৩৬]
📄 প্রতিপক্ষকে বিব্রত ও ভীতিগ্রস্ত করার ব্যবস্থা গ্রহণ
মায়রুজ জাহরানে রাত্রি যাপনকালে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার দশ হাজার সহযাত্রীকে অগ্নিচুল্লি প্রজ্জ্বলনের নির্দেশ দিলেন। ইহার উদ্দেশ্য ছিল যেন প্রতিপক্ষ কুরায়শগণ এই বিপুল অগ্নি সমারোহ দর্শনে সৈন্য-সংখ্যার আধিক্য সম্পর্কে অবগত হইয়া প্রস্তুত হইয়া যায় এবং তাহাদের মনোবল নষ্ট হইয়া যায়। তাঁহার এই সমর কৌশল অত্যন্ত ফলপ্রসূ প্রমাণিত হয়। এই বিপুল অগ্নিসমারোহ দর্শনে ভীত-সন্ত্রস্থ আবূ সুফ্যান ও তাহার সঙ্গীদের জল্পনা-কল্পনার সময়ই যে আব্বাস (রা)-এর সাথে আবূ সুয়ানের যোগাযোগ ঘটে এবং আব্বাস (রা)-র পরামর্শে তিনি মহানবী (স)-এর দরবারে উপস্থিত হইয়া ইসলাম গ্রহণ করেন সেই কথা পূর্বেই বিবৃত হইয়াছে।
ইহা ছাড়া মাররুজ জাহানের সঙ্কীর্ণ গিরিপথ অতিক্রমকালে বিশাল ইসলামী বাহিনীর সংক্ষেপে অগ্রযাত্রা যেন আবূ সুফ্যান প্রত্যক্ষ করিতে পারেন, সেইজন্য তাহাকে লইয়া সেই সময় ঐ স্থানে দাঁড়াইয়া থাকার জন্যও রাসূলুল্লাহ্ (স) আব্বাস (রা)-কে নির্দেশ দিয়াছিলেন। সত্য সত্যই সেই দৃশ্য দর্শনে অভিভূত হইয়া পরম ভীতিগ্রস্ত অন্তরে আবূ সুফ্যান মক্কায় প্রত্যাবর্তন করিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর গৃহীত এই ব্যবস্থাটিও অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়। অল্প কিছু লোক ছাড়া মক্কা বিজয়ের দিন বিশাল মুসলিম বাহিনীর মুকাবিলায় দাঁড়াইতে মক্কাবাসীরা সাহসী হয় নাই। ফলে অতি সহজেই মক্কা বিজিত হয় এবং এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের কবল হইতে কুরায়শরা রক্ষা পায়।
📄 প্রতিপক্ষের সর্দারদের সম্মাননা এবং রক্তপাত এড়াইবার ব্যবস্থা গ্রহণ
নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বলিপ্সা মানুষের একটা সহজাত প্রবৃত্তি, বিশেষত রাজ-রাজড়া ও গোত্র প্রধানগণ উহার কবল হইতে সহজে মুক্ত হইতে পারে না। তাহাদের এই তৃষ্ণা নিবৃত্ত করার ব্যবস্থা গৃহীত না হইলে সত্যকে সম্যকরূপে জানিয়াও অনেকের পক্ষে তাহা গ্রহণ করিয়া লওয়া সম্ভব হইয়া উঠে না। রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াসের নিকট আল্লাহ্র রাসূলের সত্যতা নিখুঁতভাবেই ধরা পড়িয়াছিল, কেবল রাজত্ব হারাইবার আশঙ্কাই তাহার ইসলাম গ্রহণের পথে প্রতিবন্ধক হইয়া দাঁড়ায়। [মৎপ্রণীত রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর পত্রাবলীঃ সন্ধি চুক্তি ও ফয়সালাসমূহ, পৃ. ৩৮-৫৭; সূত্রঃ ফাতহুল বারী, ১খ., পৃ. ৪০; তারীখ তাবারী, ৩খ., পৃ. ৮৭; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৬২-২৬৮; আল-জাওয়াবুস সাহীহ্, ১খ., পৃ. ৯৪ ইত্যাদি]
তাই রাসূলুল্লাহ (স) রাজন্যবর্গের নামে লিখিত তাঁহার পত্রাবলীতে প্রায়ই উল্লেখ করিতেন:
فاسلم تسلم واسلم يجعل لك الله ما تحت يديك.
"অতএব ইসলাম গ্রহণ করুন, শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করিবেন এবং ইসলাম কবুল করুন, আপনার অধীনে যাহা কিছু রহিয়াছে তাহা আল্লাহ্ আপনার অধীনেই রাখিয়া দিবেন"। [মুনযির ইবন সাওয়ার নামে রাসূলুল্লাহ (স)-এর পত্র, প্রাগুক্ত রসূলুল্লাহ্র পত্রাবলী...., পৃ. ৯৬; সূত্র: যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৬১; তাবাকাত, ৩খ., পৃ. ১৯ ও ২৭; ফুতূহুল বুলদান, ১খ., পৃ. ৭৯-৮১; ইব্ন তুলুন, ই'লামুস সাইলীন, পৃ. ৮ ইত্যাদি]
সত্য সত্যই ইসলাম গ্রহণের পর এই মুনযির ইবন সাওয়া এবং আরও অনেককে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের রাজত্বে বহাল রাখিয়াছেন। আবূ সুফ্যানের ইসলাম গ্রহণ কালেও সেই ব্যাপারটি সম্মুখে আসিল। আব্বাস (রা) আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আবূ সুফ্যান মক্কার অন্যতম প্রধান সর্দার, সে অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি। আপনি তাহার গৌরববর্ধক ও বৈশিষ্ট্যবোধক কোন ব্যবস্থা করিয়া দিন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ঠিক আছে। ঘোষণা করিয়া দাও, যেই ব্যক্তি আবু সুফ্যানের ঘরে প্রবেশ করিবে সে নিরাপদ। আবূ সুফ্যান বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ। আমার ঘরে কয়জন লোকই বা আশ্রয় নিতে পারিবে? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ঠিক আছে, যাহারা মসজিদুল হারামে প্রবেশ করিবে (আশ্রয় গ্রহণ করিতে) তাহারাও নিরাপদ।
এইবার আবূ সুফয়ান বলিলেন, মসজিদেও তো সকলের স্থান সঙ্কুলান হইবে না ইয়া রাসূলাল্লাহ্! রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ঠিক আছে, যেই ব্যক্তি তাহার নিজ ঘরে অবস্থান করিবে সেও নিরাপদ। এইবার আবূ সুফ্যান আশ্বস্ত হইলেন এবং বলিলেন, হাঁ, এখন আর স্থান সঙ্কুলানের সমস্যা হইবে না।
আবূ সুফ্যান যখন মক্কায় প্রত্যাবর্তন করিয়া নিরাপত্তা লাভের এই ব্যবস্থার কথা লোকজনকে বলিলেন, তখন তাহার স্ত্রী হিন্দ লোকজনকে ডাকিয়া বলিতে লাগিল- দেখ, দেখ, এই অর্বাচীন বৃদ্ধটি কী প্রলাপ বকিতেছে! তোমরা ইহার কথায় কর্ণপাত করিও না। সে আবূ সুফ্যানকে অত্যন্ত অমার্জিত ভাষায় গালিগালাজ করিতে লাগিল। আবু সুফিয়ান বলিলেন, মঙ্গল চাহিলে ইসলাম গ্রহণ কর! প্রাণ বাঁচাইতে চাহিলে ঘরের দরজা বন্ধ করিয়া বসিয়া থাক। আমি যাহা বলিতেছি, সত্য বলিতেছি। ইহা ছাড়া প্রাণে বাঁচিবার আর কোন পথ নাই। তাহার এইরূপ বক্তব্য শ্রবণে লোকজন মসজিদুল হারামের দিকে দৌড়াইতে লাগিল। কেহ বা তাহার নিজ ঘরের দরজা বন্ধ করিয়া বসিয়া রহিল। [কান্ধলবী, সীরাতুল মুসতাফা, ৩খ., পৃ. ২০-২৩]
ইসলাম গ্রহণের পর জাহিলী যুগের সর্দার শ্রেণীর লোকদের পুনর্বাসনের অন্তত আরও তিনটি নযীর পাওয়া যায়। মক্কা বিজয়কালে হাকীম ইবন হিযামের বাড়ীও নিরাপদ ঘোষিত হইয়াছিল।
আমর ইবনুল আস (রা)-এর ইসলাম গ্রহণের পর পূর্বতন বয়োঃজ্যেষ্ঠ ও ইসলাম গ্রহণে অগ্রবর্তী অনেক উল্লেখযোগ্য সাহাবীর বর্তমানে তাঁহাকেই সেনাপতির মর্যাদা দিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বিভিন্ন অভিযানে প্রেরণ করেন। উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয়ের হোতা হওয়া সত্ত্বেও খালিদ ইব্দুল ওয়ালীদ ইসলাম গ্রহণ করিবার সাথে সাথে তাহাকে 'সায়ফুল্লাহ' (আল্লাহ্ তরবারি খেতাবে ভূষিত করা হয়। এই সম্মাননাগুলি ছিল রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর বাণী-
خياركم في الجاهلية خياركم في الاسلام اذا فقهوا .
"তোমাদের মধ্যকার যাহারা ইসলাম- পূর্ব যুগে সম্মানিত ছিল, ইসলাম গ্রহণের পরও তাহারা সম্মানিত বিবেচিত হইবে যদি তাহারা ইসলামের ব্যুৎপত্তি সম্পন্ন হয়"-এরই প্রতিফলন। [ডঃ হামীদুল্লাহ্, উর্দু মাসিক সিয়াসাত, হায়দরাবাদ, দাক্ষিণাত্য, জানুয়ারী ১৯৪০ সংখ্যা এবং আহদে নববী কে নিযামে হুমরানী, পৃ. ২৭২]
📄 যুদ্ধাভিযানে সঙ্কেত ব্যবহার
যুদ্ধ যাত্রাকালে বিশাল বাহিনীর মধ্যে যাহাতে শত্রু পক্ষের গুপ্তচর ঢুকিয়া পড়িতে না পারে, সেই লক্ষ্যে আল্লাহ্র রাসূল (স) পরিচিতিমূলক বিশেষ সাঙ্কেতিক শব্দ নির্ধারণ করিয়া দিতেন, এমনকি নিজেদের বাহিনীর বিভিন্ন অংশের জন্য ভিন্ন ভিন্ন সাঙ্কেতিক শব্দও নির্ধারণ করিয়া দিতেন। যেমন মক্কা অভিযানকালে মুহাজিরগণের সাঙ্কেতিক শব্দ ছিল 'ইয়া বনী আবদুর রহমান'। আনসারদের মধ্যকার খাযরাজীদের সঙ্কেত ছিল 'ইয়া বনী আবদুল্লাহ'। আর আওস গোত্রীয়দের সঙ্কেত ছিল 'ইয়া বানু উবায়দুল্লাহ্'। [সীরাতু ইব্ন হিশাম, ৪খ., পৃ. ৪৯, ইফা.]
গাযওয়া বানু মুস্তালিক অভিযানে মুসলমান যোদ্ধাদের সাঙ্কেতিক শব্দ ছিল "ইয়া মানসূর"! আমিত আমিত (হে সাহায্যপ্রাপ্ত বিজয়ী! মৃত্যুর দ্বারে ঠেলিয়া দাও! মৃত্যুর দ্বারে ঠেলিয়া দাও)! খায়বার যুদ্ধেও মুসলিম মুজাহিদগণের বিশেষ সাঙ্কেতিক শব্দ ছিল-আমিত! আমিত!!