📄 মক্কা বিজয়ে অনুসৃত প্রতিরক্ষা কৌশল
সন্ধিচুক্তি লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ অভিযান হইল মক্কা অভিযান। হুদায়বিয়ার সন্ধির একটি শর্ত ছিল, যে কেহ ইচ্ছা করিলে মুহাম্মাদ (স) বা তাঁহার প্রতিপক্ষ কুরায়শের সহিত মৈত্রীবন্ধনে আবদ্ধ হইতে পারিবে। মিত্ররা তাহাদের মিত্র গোত্রের অন্তর্ভুক্ত বলিয়া বিবেচিত হইবে। সুতরাং ঐ মিত্র গোত্রের উপর আক্রমণ করা সন্ধিকারী মূল পক্ষের উপর আক্রমণ বলিয়া গণ্য হইবে।
হুদায়বিয়ার সন্ধির উক্ত শর্তানুযায়ী বনূ খুযা'আ রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত এবং তাহাদের প্রতিপক্ষ বনূ বাক্র কুরায়শদের সহিত মিত্রতাবন্ধনে আবদ্ধ হয়। এইভাবে তাহারা একে অপরের নিকট হইতে নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত থাকার প্রয়াস পায়। কিন্তু বনু বাক্র ঐ সুযোগে সুদীর্ঘ কাল হইতে চলিয়া আসা বনু খুযা'আর সহিত তাহাদের বৈরিতা চরিতার্থ করার সুযোগ পাইল। নাওফাল ইব্ন মু'আবিয়া আদ-দায়লীর নেতৃত্বে তাহাদের একটি বাহিনী ৮ম হিজরীর শা'বান মাসে ওতীর নামক একটি ঝর্ণা পাড়ে তাঁবু গাড়িয়া থাকা বুযা'আ গোত্রের উপর নৈশ আক্রমণ চালাইয়া তাহাদের ২০জন লোককে নৃশংসভাবে হত্যা করে (দ্র. আল-ওয়াকিদী, আল-মাগাযী, ২খ., পৃ. ৭৮৪)।
ইবন ইসহাক বর্ণনা করেন যে, আক্রমণকারীরা তাহাদিগকে হারাম সীমানায় ঠেলিয়া দেয় এবং যুদ্ধ নিষিদ্ধ সেই পবিত্র হারাম সীমায় তাহাদের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হয় (দ্র. ইব্ন হিশাম, সীরাতুন নাবাবিয়্যা (আরবী), ২খ., পৃ. ৩৮৯)।
মূসা ইব্ন উকবা বর্ণনা করেন যে, বনু খুযা'আকে আক্রমণে বন্ বাক্রকে প্রত্যক্ষভাবে সাহায্য করিয়াছিল কুরায়শ সর্দার সাওয়ান ইবন উমায়্যা, শায়বা ইন্ন উছমান ও সুহায়ল ইবন আমর প্রমুখ এবং তাহারা তাহাদের দাসদিগকে পাঠাইয়া ও অস্ত্রশস্ত্র দিয়া বনূ বাকরকে সাহায্য করিয়াছিল (ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৩৬৫; যাদুল মা'আদ, ১খ., ৪১০; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৮১)।
মাওলানা আকরম খাঁ এই যুদ্ধের পিছনে কুরায়শ তথা গোটা পৌত্তলিক গোষ্ঠীর মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা বিশ্লেষণ করিয়াছেন এইভাবে : “(হুদায়বিয়া) সন্ধি স্থাপনের অল্প দিনের মধ্যে এই মহা বিজয়ের মহিমা প্রকাশ পাইতে লাগিল এবং কুরায়শগণ দেখিতে পাইল যে, মক্কা ও উহার দক্ষিণ অঞ্চলের আরব গোত্রগুলিও অল্প দিনের মধ্যে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হইয়া যাইবে। এই আশংকায় মক্কার কুরায়শ, তায়েফের ছাকীফ ও হুনায়নের হাওয়াযিন গোত্র যারপর নাই বিচলিত হইয়া পড়িল। এতদিনে তাহাদের কৃতকর্মগুলির স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া আরম্ভ হইয়া যাওয়ায় কুরায়শগণ এখন অবসাদগ্রস্ত হইয়া পড়িয়াছে। কাজেই হাওয়াযিন গোত্রের দলপতিগণ নেতৃত্ব গ্রহণ করিল এবং সমস্ত পৌত্তলিক আরব গোত্রকে লইয়া সম্মিলিতভাবে মদীনা আক্রমণ করার আয়োজন করিতে লাগিল। হাওয়াযিন দলপতিগণ এই উদ্দেশ্য সফল করার জন্য আরবের বিভিন্ন প্রদেশে গমন পূর্বক ষড়যন্ত্র পাকাইতে থাকে। অবশেষে পূর্ণ এক বৎসরের চেষ্টা-চরিত্র ও উদ্যোগ-আয়োজনের পর মদীনা আক্রমণ করার ব্যবস্থাদি সম্পন্ন হইয়া যায়” (মোস্তফা চরিত, পৃ. ৭৮৩; সূত্র যুরকানী, মাওয়াহিব, ১খ., ৩৮৮)।
এই পরিপ্রেক্ষিতে হুদায়বিয়ার সন্ধির শর্ত ভঙ্গ করিতে তাহারা ব্যস্ত হইয়া পড়ে। দক্ষিণ আরবের মধ্যে মুসলমানদের প্রতি একমাত্র সহানুভূতিসম্পন্ন খুযা'আ গোত্রের উপর আক্রমণ চালাইবার মধ্যে তাহারা বাক্র গোত্রকে ক্ষেপাইয়া তুলিয়াছিল। বনু খুযা'আর প্রতি আক্রমণ চালাইয়া তাহারা সন্ধিপত্র লঙ্ঘনের প্রক্রিয়াটি শুরু করিয়াছিল এবং সম্মিলিত পৌত্তলিক শক্তির বিরুদ্ধে এখন আর তেমন কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের শক্তি মুসলমানদের নাই, এইরূপ একটা ধারণায় তাহারা উপনীত হইয়াছিল।
বনূ বাকরের আক্রমণের সেই দুঃসহ রজনীতে মক্কায় আত্মগোপনকারী আমর ইব্ন সালিম খুযা'ঈ সেখান হইতে সরাসরি মদীনায় পৌছিয়া একটি কবিতা তাঁহাদের দুর্দশার বিবরণ দিলেন এইভাবে : ইন কুরায়শরা আপনার চুক্তির বরখেলাপ করিয়াছে এবং তাহারা পাকাপোক্ত অঙ্গীকার ভঙ্গ করিয়াছে। "তাহারা কাদা নামক স্থানে আমার জন্য ওঁৎ পাতিয়াছে এবং তাহারা ধারণা করিয়াছে যে, আমি বুঝি সাহায্যের জন্য কাহারও নিকট ফরিয়াদ জানাইব না। "তাহারা অতি হীন এবং সংখ্যায় নগণ্য। তাহারা ওতীরে আমাদের বাড়ীঘরে নৈশ আক্রমণ চালাইয়াছে এবং এমন অবস্থায় আমাদের উপর হত্যাকাণ্ড চালাইয়াছে যখন আমরা রুকূ সিজদার অবস্থায় (প্রার্থনারত) ছিলাম”। এই সময় আকাশে একখণ্ড মেঘ দেখা গেল। নবী করীম (স) বলিলেন: বনূ খুযা'আর সাহায্যের সুসংবাদে এই মেঘখণ্ড দীপ্ত হইয়া উঠিয়াছে। অতঃপর বুদায়ল ইব্ন ওয়ারাকার নেতৃত্বে বনু খুযা'আর একটি প্রতিনিধি দল মদীনায় পৌছিয়া তাহাদের নেতৃবৃন্দের নামধাম এবং কুরায়শদের ঐ হামলাকারী বাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতার বিবরণ নবী করীম (স)-কে অবগত করিয়া তাহারা আবার মক্কায় প্রত্যাবর্তন করেন। অপরাধ যে কত নাযুক তাহা উপলব্ধি করিয়া আবূ সুয়ান মদীনায় গমন করিয়া তাহাদের পূর্বের চুক্তির নবায়নের প্রয়াস চালান। কিন্তু নবী করীম (স), এমনকি তাঁহার ঘনিষ্ঠ সাহাবী ও আহলে বায়তগণের যাহাদিগের নিকটই আবূ সুয়ান সুপারিশের জন্য পিয়াছিলেন তাঁহারা তাহার কথায় কর্ণপাত করিলেন না। অগত্যা হযরত আলী (রা)-এর পরামর্শক্রমে কুরায়শ নেতা মসজিদে নববীতে দাঁড়াইয়া একতরফাভাবে শান্তি প্রস্তাবের নবায়নের ঘোষণা দিয়া মক্কায় প্রত্যাবর্তন করিলেন। কিন্তু তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর পক্ষ হইতে উহার অনুমোদন লাভে ব্যর্থ হন (দ্র. ইব্ন হাজার, আল-মাতালি আল-আলিয়্যা, ৪২৪৩, মুহাম্মাদ ইব্ন আব্বাদ ইব্ন জাফর হইতে বর্ণিত মুরসাল বর্ণনার বরাতে; ফাতহুল বারী, ৬খ., পৃ. ৮, ইব্ন উমরের হাদীছের বরাতে; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৮৩; আল-ওয়াকিদী, আল-মাগাযী, ২খ., পৃ.৭৮৬; ইব্ন হিশাম, ৪খ., পৃ. ৭-৮)। তাবারানীর রিওয়ায়াত হইতে প্রতীয়মান হয় যে, কুরায়শদের চুক্তি ভঙ্গের সংবাদপ্রাপ্তির তিনদিন পূর্বেই রাসূলুল্লাহ্ (স) হযরত আইশা (রা)-কে যুদ্ধের সাজসরঞ্জাম এমনভাবে প্রস্তুত করার আদেশ দিয়াছিলেন যাহাতে অন্য কেহ তাঁহার এই প্রস্তুতির ব্যাপারটি আঁচ করিতে না পারে। হযরত আবূ বাক্স (রা)-এর জিজ্ঞাসার জবাবেও হযরত আইশা (রা) এই ব্যাপারে তাঁহার অজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তৃতীয় দিন প্রত্যুষে 'আমর ইব্ন সালিম খুযা'ঈ চল্লিশজন অশ্বারোহীসহ আসিয়া কবিতা পাঠের মাধ্যমে ফরিয়াদ করিলেন। তাহার পর বুদায়লের আগমন এবং সর্বশেষ আবূ সুফিয়ানের আগমনে লোকজনের কাছে ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়। রাসূলুল্লাহ (স) লোকজনকে মক্কা যাত্রার প্রস্তুতির নির্দেশ দিলেন এবং সংবাদটি যাহাতে মল্লবাসীদের গোচরীভূত হইতে না পারে সেইজন্য দু'আ করেন (আর-রাহীকুল মাখতুম, উর্দু সংস্করণ, পৃ. ৫৪০)।
📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর ব্যূহ রচনা: দায়িত্ব বণ্টন ও পতাকা ব্যবহার
মক্কা অভিযানের বিবরণ হইতে প্রতীয়মান হয় যে, এই অভিযানের গোপনীয়তা রক্ষায় রাসূলুল্লাহ্ (স) এতই সফল হন যে, বিশাল মুসলিম বাহিনী মাররুজ জাহ্রান পর্যন্ত পৌঁছার পূর্বে কুরায়শরা তাঁহাদের এই অভিযান সম্পর্কে ঘৃণাক্ষরেও কিছু টের পায় নাই। এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমার সময় বাহিনীকে সামরিক নিয়মনীতি অনুসারে বিন্যাসও করা হয় নাই।
মাররুজ জাহানে পৌঁছিয়াই রাসূলুল্লাহ (স) গোটা বাহিনীর ব্যূহ রচনা করেন। তিনি অশ্বারোহী বাহিনীকে তিন ভাগে ভাগ করেনঃ (১) ডান দিকের বাহিনী, (২) বাম দিকের বাহিনী ও (৩) মধ্যবর্তী বাহিনী। ডান দিকের দায়িত্ব খালিদ ইব্ন ওয়ালীদ (রা)-কে, বাম বাহিনীর দায়িত্ব যুবায়র ইবনুল আওয়াম (রা)-কে এবং আবু উবায়দা আমের ইবনুল জাররাহ্ (রা)-কে পদাতিক বাহিনীর দায়িত্বভার অর্পণ করা হয়। [মুসলিম, হাদীছ ১৭৮০; সীরাত ইন্ন হিশাম, ২খ., পৃ. ৪০৭; নাদরাতুন না'ঈম, ১খ., পৃ.৫০২]
রাসূলুল্লাহ্ (স) যুদ্ধযাত্রাকালে বড় ও ছোট উভয়বিধ পতাকাই ব্যবহার করিতেন। বৃহদাকার পতাকাগুলি কাল বর্ণের এবং ক্ষুদ্রাকার পতাকাগুলি সাদা বর্ণের হইত। [সুনান ইব্ন মাজা, ২/৯৪১, হাদীছ নং ২২২৭ ও ২৮১৮; সুনান নাসাঈ, ৫খ., পৃ. ৩০০] বাহিনীতে প্রহরার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন হযরত উমার (রা)। [সাইয়েদুল মুরসালীন, ২খ., পৃ. ৮৬৯]
বলা বাহুল্য, প্রতিটি যুদ্ধযাত্রায়ই রাসূলুল্লাহ্ (স) ও তাঁহার প্রেরিত সেনাপতিগণ এই সমস্ত ব্যবস্থা অবলম্বন করিতেন এবং কোন কোন সময় যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁহার প্রেরিত কোন সেনাপতি শত্রুপক্ষের হাতে নিহত বা দায়িত্ব পালনে অক্ষম হইয়া পড়িলে তাঁহার পরবর্তী সেনাপতি কে হইবেন তাহাও তিনি যুদ্ধযাত্রার সময়ই বলিয়া দিতেন। যেমন মৃতার যুদ্ধে সেনাবাহিনী প্রেরণ কালে তিনি যায়দ ইবন হারিছাকে সেনাপতি নিযুক্ত করেন। সাথে সাথে তিনি বলিয়া দেন যে, তিনি যদি নিহত হন তাহা হইলে জাফর ইব্ন আবু তালিব নেতৃত্ব গ্রহণ করিবেন। তিনিও যদি নিহত হন তাহা হইলে আবদুল্লাহ্ ইব্ন রাওয়াহা (রা) সেনাপতির দায়িত্ব লাভ করিবেন। [সহীহ্ বুখারী, হাদীছ নং ৪২৬১, গাযওয়া মৃতা মিন আরদে শাম অধ্যায়; ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৫১৩; ইবন হিশাম, সীরাহ, ৩/৪২৭]
এই বিকল্প আমীর নিয়োগের দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, আমীর নিয়োগের সময় একজন আমীর নিয়োগ করা এবং তাহার অবর্তমানে বিকল্প আমীর মনোনয়নেরও অবকাশ রহিয়াছে। [অধ্যাপক আকরম যিয়া, Madinan Society at the Time of the Prophet, vol. 2, page 143]
📄 প্রতিশোধ স্পৃহামুক্ত ক্ষমা সুন্দর হৃদয়
প্রতিশোধ স্পৃহামুক্ত ক্ষমাশীল হৃদয় ও আচরণের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ্ (স) সেই বিরাট বিজয় অর্জন করিয়াছেন যাহা অন্যান্য সেনাপতিগণ বিরাট রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমেও ছিনাইয়া আনিতে পারেন না। মক্কা অভিযানে রওয়ানা হওয়ার প্রথম দিকেই মুসলিম বাহিনী আবওয়ায় পৌঁছিতেই তাঁহার দুই আজীবন শত্রু নিকটাত্মীয় তাঁহার পিতৃব্য পুত্র আবূ সুফ্যান ইব্ন হারিছ এবং ফুফাতো ভাই আবদুল্লাহ ইব্ন উমায়্যা আসিয়া তাঁহার সহিত সাক্ষাত করিবার অনুমতি প্রার্থনা করিলেন। আজীবন ইহারা আল্লাহ্ রসূলের সহিত বৈরী আচরণের কিছুই বাদ দেয় নাই।
উভয়ে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর প্রাণের শত্রু হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ্র রাসূল (স) তাহাদিগকে ক্ষমা করিয়া তাঁহাদের ইসলামে দীক্ষিত করার আবেদনে সাড়া দিলেন। অবশ্য হযরত আলী (রা) তাহাদিগকে ক্ষমা প্রার্থনার কৌশল ও পদ্ধতি শিক্ষা দিয়া এবং উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা (রা) তাহাদের জন্য সুপারিশ করিয়া ঐ ব্যাপারে বিরাট ভূমিকা রাখিয়াছিলেন। [আর-রাহীকুল মাখতুম, আরবী, পৃ. ৪৪৮-৪৪৯; আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২৫০-২৫১]
কুরায়শ বাহিনীর পক্ষে গোপনে মুসলিম বাহিনীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করিতে আসিয়া গভীর রাতে আবূ সুফ্যান রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর চাচা সদ্য ঘোষিত মুসলমান আব্বাস (রা)-এর কাছে ধরা পড়িয়া যান। হাকীম ইব্ন হিযাম ও বুদায়ল ইব্ন ওয়াশ সমভিব্যাহারে নৈশ পর্যবেক্ষণে আগত এই দলের পারস্পরিক শলা-পরামর্শের সময় আব্বাস (রা) আবূ সুফ্যানের কণ্ঠস্বর চিনিয়া ফেলেন। আবূ সুফ্যান এই দিকের সংবাদ জানিতে চাহিলে তাহার পুরাতন বন্ধু আব্বাস (রা) জানাইলেন, কুরায়শদের ধ্বংস অনিবার্য। সময় থাকিতে সুবুদ্ধির আশ্রয় নিতে হইবে। আবু সুফ্যান এখন উপায় কী জানিতে চাহিলে আব্বাস তাহাকে লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে উপস্থিত হওয়ার প্রস্তাব দিলেন।
মক্কাবাসীরা মুসলিম বাহিনীর অগ্রাভিযানের মুখে যুদ্ধ করিয়া ধ্বংস হইয়া যাউক, ইহা কোনমতেই আব্বাসের কাম্য ছিল না। তাই কাহারও মাধ্যমে সংবাদ পাঠাইয়া মক্কাবাসীদিগকে আবার সতর্ক করিয়া দেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি রাত্রিকালে একাকী বাহির হইয়া পড়িয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সুপরিচিত শুভ্র বর্ণের খচ্চরে আরোহণ করিয়াই তিনি বাহির হইয়াছিলেন।
আব্বাস (রা) যেহেতু রাসূলুল্লাহ্ (স)-এরই পিতৃব্য এবং তাঁহার বাহন রাসূলুল্লাহ্ (স)-এরই সুপরিচিত বাহন শুভ্র খচ্চরটি, তাই মুসলিম বাহিনীর মধ্য দিয়া আবু সুফ্যানকে লইয়া অতিক্রম করিতে আব্বাসকে কোন বেগ পাইতে হইল না। তাঁহার পিছনে উপবিষ্ট লোকটি কে, তাহাও কেহ জানার প্রয়োজন বোধ করিল না। কিন্তু উমার (রা)-এর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাহা ধরা পড়িয়া গেল। আব্বাস (রা)-এর নিজের বর্ণনা:
“শেষ পর্যন্ত যখন আমি উমার ইবনুল খাত্তাব (রা)-এর জ্বলন্ত চুল্লীর পার্শ্ব অতিক্রম করিতেছিলাম তখন তিনি গর্জিয়া উঠিলেন, কে হে? তিনি আমার দিকে অগ্রসর হইলেন এবং যখন আমার পিছনে আবূ সুফ্যানকে উপবিষ্ট দেখিতে পাইলেন তখন চিৎকার করিয়া বলিলেন, আল্লাহ্র দুশমন আবূ সুফ্যান? প্রশংসা সেই আল্লাহ্ যিনি কোনরূপ সন্ধিচুক্তি ও শর্ত ব্যতীতই তোমাকে আমাদের করায়ত্ত করিয়া দিয়াছেন! এই কথা বলিয়াই তিনি রাসূলুল্লাহ্ (স) -এর দিকে দ্রুত দৌড়াইলেন। আর আমিও প্রাণপণে খচ্চরকে জুটাইলাম এবং তাঁহার পূর্বেই নবী করীম (স)-এর সম্মুখে পৌছিয়া গেলাম। ততক্ষণে উমার আসিয়া পৌছিলেন এবং আবূ সুফ্যানকে হত্যার অনুমতি প্রার্থনা করিলেন। তৎক্ষণাত আমি বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি কিন্তু তাহাকে অভয় আশ্রয় দিয়া আনিয়াছি। আমি রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর মাথায় হাত রাখিয়া বলিলাম, আল্লাহর কসম! অদ্যকার রাত্রিতে আমি ব্যতীত অন্য কোন ব্যক্তি যেন আপনার সহিত একান্তে মিলিত না হয়। রাসূলুল্লাহ্ (স) আমাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, আবূ সুফ্যানকে আপনি আপনার তাঁবুতে লইয়া যান, সকালে তাহাকে আমার নিকট লইয়া আসিবেন।
আব্বাস (রা)-এর এই দীর্ঘ বর্ণনায় হযরত উমার (রা)-এর সঙ্গে আবূ সুফ্যানের হত্যার ব্যাপারে তাঁহার বাদানুবাদের বর্ণনাও রহিয়াছে। পরদিন সকালে মহানবী (স) দরবারে হাযির হইলে আবূ সুফ্যানের সহিত রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিম্নরূপ কথোপকথন হয়:
রাসূলুল্লাহ্ (স) : আবু সুফ্যান! তোমার জন্য আক্ষেপ, এখনও কি তোমার এই কথা অনুসরণ করার সময় আসে নাই যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নাই?
আবু সুফ্যান : আমার পিতামাতা আপনার জন্য কুরবান হউন। আপনি কত ধৈর্যশীল! কত আত্মীয় বৎসল!! আমি সম্যক উপলব্ধি করিয়াছি যে, আল্লাহ্ ব্যতীত যদি অন্য কোন ইলাহ আদৌ থাকিত তবে এই দুর্দিনে সে আমার কাজে আসিত।
রাসূলুল্লাহ্ : আবূ সুফ্যান! তোমার জন্য আক্ষেপ, এখনও কি তোমার এই কথা উপলব্ধি করার সময় হয় নাই যে, আমি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল?
আবু সুফ্যান : আমার পিতামাতা আপনার জন্য কুরবান হউন! আপনি কতইনা ধৈর্যশীল ও স্বজন বৎসল। এই ব্যাপারে এখনও আমার কিছুটা সংশয় রহিয়া গিয়াছে।
যাহা হউক, শেষ পর্যন্ত আব্বাসের পরামর্শক্রমে আবূ সুফ্যান ইসলাম গ্রহণ করিলেন। [ইবন হাজার, মাতালিবুল আলিয়া, পৃঃ ২৪৪]
বুদায়ল ও হাকীম ইবন হিযাম যখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত সাক্ষাত করেন তখন তাহারাও ইসলাম গ্রহণ করেন। [মাগাযী, পৃ. ৮১৫; তাবাকাত, পৃ. ১৩৫]
রাসূলুল্লাহ্ (স) প্রদত্ত পতাকা হস্তে আনছার-নেতা হযরত সা'দ ইবন উবাদা (রা) বীরদর্পে যখন মাররুজ জাহরানের গিরিপথ অতিক্রম করিতেছিলেন তখন প্রবল উৎসাহে তাঁহার মুখে উচ্চারিত হইল : اليوم يوم الملحمة اليوم تستحل الحرمة. "আজকের দিন মনের সুখে নিধন হবে। আজকে কা'বায় হারাম কাজ হালাল হবে।"
ভীত-সন্ত্রস্ত আৰু সুফ্যান সা'দ ইবন উবাদার এই ঘোষণার প্রতি রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করিলেন। হযরত উছমান এবং আবদুর রহমান ইব্ন আওফ (রা)-ও সা'দ (রা)-এর বাহিনীর হাতে কুরায়শদের ব্যাপক নিধনের আশঙ্কা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট ব্যক্ত করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তৎক্ষণাৎ বলিলেনঃ না, না, তাহা হইবার নয়।
يا ابا سفيان اليوم يوم المرحمة يعز الله فيه قريشا .
"হে আবু সুফ্যান! আজকের দিন দয়া ও সৌহার্দ্য প্রকাশের দিন। আজ আল্লাহ কুরায়শদিগকে মর্যাদায় ভূষিত করিবেন"।
বুখারী শরীফের বর্ণনায় রহিয়াছে, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেনঃ كذب سعد ولكن هذا يوم يعظم الله فيه الكعبة ويوم تكسى فيه الكعبة.
"সা'দ ভুল বলিয়াছে। আজ আল্লাহ্ তা'আলা কা'বাকে সম্মানিত করিবেন এবং কা'বাকে গিলাফ পরানো হইবে"।
সাথে সাথে তিনি অতি উৎসাহী সাদের হাত হইতে পতাকা লইয়া তাঁহার পুত্র কায়সের হাতে অর্পণের নির্দেশ দিলেন। [সহীহ বুখারী, হাদীছ নং ৪২৮০; নাদ্রাতুন না'ঈম, ১খ., পৃ ৫০১, বাংলা অনু.]
তারপর আবূ সুফ্যান মহানবী (স)-এর দরবার হইতে প্রস্থান করিলেন এবং দ্রুত মক্কায় গিয়া মক্কাবাসীদিগকে স্পষ্ট ভাষায় জানাইয়া দিলেন যে, তাহারা কোনমতেই পারিয়া উঠিবে না। তাই কোনক্রমেই যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া সমীচীন হইবে না। [কান্ধলবী, সীরাতুল মুসতাফা, পৃ. ২১-২২] রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর ক্ষমাপরায়ণতার সেই দৃশ্য আল্লামা সায়্যিদ সুলায়মান নদবী (র)-র ভাষায় ছিল এইরূপ:
"মক্কা বিজয় তখন সমাপ্ত হয়েছে। হারাম প্রাঙ্গণ। এই সেই হারাম প্রাঙ্গণ যেখানে নূরের নবীকে গালিগালাজ করা হয়েছে, তাঁর উপর আবর্জনা নিক্ষেপ করা হয়েছে, তাঁকে হত্যার প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। কুরাইশ দলপতিরা বিজিতের বেশে দণ্ডায়মান। ইসলামকে মিটিয়ে দেয়ার কুটিল ষড়যন্ত্রের নায়করা, নূরের নবীকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারী, তাঁর বিরুদ্ধে কুৎসা রটনাকারী, তাঁকে অপদস্ত করার প্রয়াসে প্রয়াসীদের মত স্পর্ধাকারী, তাঁর উপর প্রস্তর বর্ষণকারী, তাঁর উপর তলোয়ার চালনাকারী, অকারণে তাঁর আত্মীয়-স্বজনের বক্ষ বিদারণকারী ও তাঁদের হৃৎপিণ্ড চর্বণকারী, নিঃস্ব-দরিদ্র মুসলমানদেরকে অকারণে উৎপীড়নকারী, নিরস্ত্র মুসলমানদের বুকে যারা অত্যাচারের আগ্নেয় মহর অঙ্কন করেছিল, দুপুরের অগ্নিক্ষরা রোদে মরুভূমির তপ্ত বালুতে শুইয়ে রেখেছিল, জলন্ত অঙ্গারে মুসলিমদের চেপে ধরে যারা পাশবিক আনন্দ লাভ করত, বল্লমের খোঁচায় একদা যারা মুসলিমদেরকে ক্ষতবিক্ষত ও ছিদ্র করেছিল, এদের সবাই আজ নত মস্তকে সম্মুখে দণ্ডায়মান। পশ্চাতে ওদের দশ সহস্রাধিক তলোয়ার রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইঙ্গিতের শুধু অপেক্ষা করছিল। সহসা রাসূলে খোদার মুখে উচ্চারিত হলো- হে কুরাইশকুল! বল, আজ তোমরা আমার কাছে কেমন ব্যবহার প্রত্যাশা কর? 'মুহাম্মদ! অমায়িক ব্যবহারের অধিকারী ভাই আমার, ভাতিজা আমার। জবাবে নানাজনের নানা সম্ভাষণ উচ্চারিত হয়। নূরের নবীর মুখে উচ্চারিত হলো: আজ আমি তাই বলবো ইউসুফ আলায়হিস্ সালাম তাঁর যালিম ভাইদেরকে যা বলেছিলেন:
لا تَشْرِيْبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ. "আজকের দিনে তোমাদের বিরুদ্ধে আমার কোন অভিযোগ নেই"।
اذهبوا فانتم الطلقاء. "যাও, আজ তোমরা স্বাধীন, যদৃচ্ছ অবাধে যেতে পার"।
প্রিয় ভায়েরা আমার! বন্ধুরা আমার। এই হলো শত্রুকে ক্ষমা প্রদর্শনে ইসলামের নবীর বাস্তব আদর্শ, বাস্তব ভিত্তিক শিক্ষা-যা দুনিয়ার বাস্তব ইতিহাসের পাতায় দেদীপ্যমান ঘটনারূপে ভাস্বর হয়ে রয়েছে”। [আল্লামা সায়ি্যদ সুলায়মান নদবী (র) কর্তৃক ১৯২৫ সালে মাদ্রাযের লালী হলে প্রদত্ত সীরাত-ভাষণ, দ্র. নবী চিরন্তন, খুৎবাতে মাদ্রাজ-এর আবদুল্লাহ্ বিন সাঈদ জালালাবাদী কৃত বঙ্গানুবাদ, পৃ. ১৩৬]
📄 প্রতিপক্ষকে বিব্রত ও ভীতিগ্রস্ত করার ব্যবস্থা গ্রহণ
মায়রুজ জাহরানে রাত্রি যাপনকালে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার দশ হাজার সহযাত্রীকে অগ্নিচুল্লি প্রজ্জ্বলনের নির্দেশ দিলেন। ইহার উদ্দেশ্য ছিল যেন প্রতিপক্ষ কুরায়শগণ এই বিপুল অগ্নি সমারোহ দর্শনে সৈন্য-সংখ্যার আধিক্য সম্পর্কে অবগত হইয়া প্রস্তুত হইয়া যায় এবং তাহাদের মনোবল নষ্ট হইয়া যায়। তাঁহার এই সমর কৌশল অত্যন্ত ফলপ্রসূ প্রমাণিত হয়। এই বিপুল অগ্নিসমারোহ দর্শনে ভীত-সন্ত্রস্থ আবূ সুফ্যান ও তাহার সঙ্গীদের জল্পনা-কল্পনার সময়ই যে আব্বাস (রা)-এর সাথে আবূ সুয়ানের যোগাযোগ ঘটে এবং আব্বাস (রা)-র পরামর্শে তিনি মহানবী (স)-এর দরবারে উপস্থিত হইয়া ইসলাম গ্রহণ করেন সেই কথা পূর্বেই বিবৃত হইয়াছে।
ইহা ছাড়া মাররুজ জাহানের সঙ্কীর্ণ গিরিপথ অতিক্রমকালে বিশাল ইসলামী বাহিনীর সংক্ষেপে অগ্রযাত্রা যেন আবূ সুফ্যান প্রত্যক্ষ করিতে পারেন, সেইজন্য তাহাকে লইয়া সেই সময় ঐ স্থানে দাঁড়াইয়া থাকার জন্যও রাসূলুল্লাহ্ (স) আব্বাস (রা)-কে নির্দেশ দিয়াছিলেন। সত্য সত্যই সেই দৃশ্য দর্শনে অভিভূত হইয়া পরম ভীতিগ্রস্ত অন্তরে আবূ সুফ্যান মক্কায় প্রত্যাবর্তন করিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর গৃহীত এই ব্যবস্থাটিও অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়। অল্প কিছু লোক ছাড়া মক্কা বিজয়ের দিন বিশাল মুসলিম বাহিনীর মুকাবিলায় দাঁড়াইতে মক্কাবাসীরা সাহসী হয় নাই। ফলে অতি সহজেই মক্কা বিজিত হয় এবং এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের কবল হইতে কুরায়শরা রক্ষা পায়।