📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 এই অভিযান হইতে শিক্ষণীয়

📄 এই অভিযান হইতে শিক্ষণীয়


বনূ নাযীর অভিযানে ঐ ইয়াহুদী গোত্রের নির্বাসনের ফলে একদিকে যেমন মুসলমান জাতি অতি নিকটে অবস্থানকারী বৈরী ও ষড়যন্ত্রকারী একটি গোষ্ঠীর নিত্য-নূতন ষড়যন্ত্রের কবল হইতে নিরাপদ হইল তেমনি তাঁহাদের হাতে আসিল শত্রুদের বিশাল ভূ-সম্পদ ও বাগবাগিচা। তাহাদের যে অস্ত্রশস্ত্র মুসলমানদের হস্তগত হয় তাহার মধ্যে ছিল ৫০টি বর্ম, ৫০টি লৌহ শিরস্ত্রাণ ও ৩৪০টি তরবারি।

বনূ নাযীরের ইয়াহুদীরা দেশান্তরিত হইলেও অচিন্ত্যনীয়ভাবে তাহারা ঢাকঢোল পিটাইয়া নৃত্য-গীত করিয়া শানশওকতপূর্ণ মিছিল সহকারে মদীনা ত্যাগ করে। বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হইতে হযরতের মহানুভবতায় রক্ষা পাইয়া তাহারা যে তাহাদের বিপুল সম্পদ সঙ্গে লইয়া যাইতে পারিতেছে উহাই সম্ভবত তাহাদের এই মহাধুমধামপূর্ণ মিছিলের কারণ ছিল। মদীনারাসীরা ইতিপূর্বে কোনদিন এতবড় মিছিলের সমারোহ প্রত্যক্ষ করেন নাই (দ্র. তাবারী, পৃ. ১৪৫২; সীরতুন্নবী, উর্দু, ১ খ., পৃ. ৪১২)। আল্লাহ তা'আলা তাহাদের এই পতন সম্পর্কে বলেন:
وَأَنْزَلَ الَّذِينَ ظَاهَرُوهُمْ مِّنْ أَهْلِ الْكِتَابِ مِنْ صَيَاصِيْهِمْ وَقَذَفَ فِي قُلُوبِهِمُ الرُّعْبَ فَرِيقًا تَقْتُلُونَ وَتَأْسِرُونَ فَرِيقًا وَأَوْرَثَكُمْ أَرْضَهُمْ وَدِيَارَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ وَأَرْضًا لَّمْ تَطَئُوهَا وَكَانَ اللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرًا .
"কিতাবীদের মধ্যে যাহারা উহাদিগকে (কুরায়শদিগকে) সাহায্য করিয়াছিল তাহাদিগকে তিনি তাহাদের দুর্গসমূহ হইতে অবতরণ করাইলেন এবং তাহাদের অন্তরে ভীতির সঞ্চার করিলেন। এখন তোমরা উহাদের কতককে হত্যা করিতেছ এবং কতককে করিতেছ বন্দী। আর তিনি তোমাদিগকে অধিকারী করিলেন উহাদের ভূমি-ঘরবাড়ী ও ধন-সম্পদের এবং এমন ভূমির যাহাতে তোমরা এখনও পদার্পণ কর নাই। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান" (৩৩ আহযাব: ২৬-২৭)।

هُوَ الَّذِي أَخْرَجَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ مِنْ دِيَارِهِمْ لِأَوَّلِ الْحَشْرِ طَ مَا ظَنَنْتُمْ أَنْ يُخْرَجُوا وَظَنُّوا أَنَّهُمْ مَانِعَتُهُمْ حُصُونُهُمْ مِّنَ اللهِ فَأَتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ حَيْثُ لَمْ يَحْتَسِبُوا وَقَذَفَ فِي قُلُوبِهِمُ الرُّعْبَ يُخْرِبُونَ بُيُوتَهُمْ بِأَيْدِيهِمْ وَأَيْدِ الْمُؤْمِنِينَ فَاعْتَبِرُوا يَا أُولِي الْأَبْصَارِ.
"তিনিই কিতাবীদের মধ্যে যাহারা কাফির তাহাদিগকে প্রথমবার সমবেতভাবে তাহাদের আবাসভূমি হইতে বিতাড়িত করিয়াছিলেন। তোমরা কল্পনাও কর নাই যে, উহারা নির্বাসিত হইবে এবং উহারা মনে করিয়াছিল উহাদের দুর্ভেদ্য দুর্গগুলি উহাদিগকে রক্ষা করিবে আল্লাহ হইতে। কিন্তু আল্লাহর শাস্তি এমন এক দিক হইতে আসিল যাহা ছিল উহাদের ধারণাতীত এবং উহাদের অন্তরে তাহা ত্রাসের সঞ্চার করিল। উহারা ধ্বংস করিয়া ফেলিল নিজেদের বাড়ীঘর নিজেদের হাতে এবং মু'মিনদের হাতেও। অষ্টগ্রহে চক্ষুষ্মান ব্যক্তিগণ। তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর" (৫৯:২)।

উহাদের এই শাস্তির কারণস্বরূপ আল্লাহ তা'আলা বলেন: ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ شَاقُوا اللهَ وَرَسُولَهُ وَمَنْ يُشَاقِ اللَّهَ فَإِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ. "ইহা এইজন্য যে, উহারা আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করিয়াছিল, এবং কেহ আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ করিলে আল্লাহ তো শাস্তি দানে কঠোর" (৫৯:৪)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আবূ লুবাবা (রা)-এর স্ব-আরোপিত শাস্তি

📄 আবূ লুবাবা (রা)-এর স্ব-আরোপিত শাস্তি


বনু কুরায়যার ইয়াহুদীরা তাহাদের আর্থিক সচ্ছলতা এবং সুরক্ষিত দুর্গের জন্য গর্বিত ছিল। ইহা ছাড়া তাহারা কল্পনাও করিতে পারে নাই যে, কুরায়শ ও ইয়াহুদীদের সম্মিলিত বাহিনীর দশ সহস্র সৈন্যের মুকাবিলায় ক্লান্ত শ্রান্ত অবস্থায় মুসলমানগণ এত তাড়াতাড়ি বনু কুরায়যা গোত্রকে অবরোধ করিতে ছুটিয়া আসিবে। দীর্ঘ অবরোধে বনু কুরায়যার ইয়াহুদীদের মনোবল একেবারে ভাঙ্গিয়া পড়িলে তাহারা অবরোধ হইতে নিষ্কৃতি লাভের উদ্দেশ্যে দুর্গ হইতে চীৎকার করিয়া আবু লুবাবাকে তাহাদের নিকট পাঠাইবার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আবেদন জানায়।

আবূ লুবাবা ইব্‌ন মুনযির ছিলেন আওস গোত্রের মিত্র বনূ 'আমর ইবন 'আওফ গোত্রের লোক। এই হিসাবে তিনি তাহাদের মিত্র ছিলেন। ইহা ছাড়া তাঁহার পরিবার-পরিজন এবং বাগ-বাগিচা তাহাদেরই এলাকায় ছিল বিধায় তাঁহার সহিত তাহাদের ঘনিষ্ঠতা ছিল। অবরুদ্ধ বনু কুরায়যা গোত্রের অনুরোধে সাড়া দিয়া নবী করীম (স) আবু লুবাবাকে তাহাদের নিকট পাঠাইয়া দিলেন। তিনি সেইখানে পৌঁছিতেই ইয়াহুদীদের পুত্র-কন্যা ও মহিলাগণ কান্নাকাটি করিয়া এই অসহায় অবস্থায় তাহাদের আত্মসমর্পণ সঙ্গত হইবে কিনা এই ব্যাপারে তাঁহার পরামর্শ কামনা করে। আবু লুবাবা (রা)-এর হৃদয় বিগলিত হইয়া যায় এবং মনের অজান্তেই গলার দিকে ইঙ্গিত করিয়া তাহাদিগকে বুঝাইয়া দেন যে, ইহার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হইবে তোমাদের মৃত্যুদণ্ড। মুহূর্তেই তিনি তাঁহার ভুল বুঝিতে পারেন। তিনি কোন মুনাফিক নহেন, তিনি আল্লাহর রাসূলের একজন সাহাবী। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে বিশ্বাস করিয়া শত্রুদের দুর্গে প্রেরণ করিয়াছেন। এই সামান্য একটি ইশারা দিয়া তিনি কি আল্লাহ্র রাসূলের সহিত বিশ্বাসভঙ্গ করিয়া ফেলেন নাই? নিদারুণ মর্মবেদনা ও বিবেকের তাড়নায় তিনি অস্থির হইয়া উঠিলেন। ফলে তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে ফিরিয়া গেলেন না। তিনি সোজা মদীনায় পৌঁছিয়া মসজিদে নববীর একটি খুঁটির সহিত নিজেকে বাঁধিয়া ফেলিলেন। তিনি কসম খাইলেন, স্বয়ং নবী করীম (স) তাঁহাকে বাঁধনমুক্ত না করা পর্যন্ত তিনি আর মুক্ত হইবেন না এবং ভবিষ্যতে আর কোন দিন বনূ কুরায়যার পল্লীতে যাইবেন না। বিবেকের তাড়নায়, ঈমানী শক্তির তাগিদে সৃষ্ট অপরাধবোধ হইতে এইরূপ স্ব-আরোপিত শাস্তিভোগের ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে বিরল।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরও যখন আবু লুবাবা মুসলিম শিবিরে ফিরিয়া আসিলেন না, তখন স্বভাবতই রাসূলুল্লাহ (স) চিন্তিত হইলেন। তারপর সবকিছু অবগত হইয়া তিনি মন্তব্য করিলেন : আবু লুবাবা চলিয়া আসিলে আমি হয়ত তাহার অপরাধ মার্জনার জন্য দু'আ করিতাম। এখন সে এমন একটি কাজ করিয়া বসিয়াছে যে, আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে কোন নির্দেশ না আসা পর্যন্ত আমি আর কিছু করিতে পারিব না।

দীর্ঘ ছয় রাত পর্যন্ত আবু লুবাবা (রা) এইভাবে তাঁহার স্ব-আরোপিত শাস্তি ভোগ করেন। তাঁহার স্ত্রী প্রতি নামাযের সময় আসিয়া তাঁহাকে খুলিয়া দিতেন। নামাযের পর আবার তিনি পূর্বাবস্থায় ফিরিয়া যাইতেন। রাতের পর প্রত্যুষে তাঁহার তওবা কবুলের আসমানী সংবাদ আসিল। ঐ রাত্রিতে মহানবী (স) উম্মুল মু’মিনীন হযরত উম্মে সালামা (রা)-এর গৃহে অবস্থান করেন। পরবর্তীতে আবূ লুবাবা বলেন, তিনি তাঁহার হুজরার দরজা খুলিয়া আমাকে আমার তওবা কবুলের সুসংবাদ জানাইয়া অভিনিশ্চিত করিলেন। ইহা শুনিয়া উৎকন্ঠিত সাহাবীগণ চারিদিক হইতে ছুটিয়া আসিয়া তাঁহাকে বন্ধনমুক্ত করিতে চাহিলেন। কিন্তু আবূ লুবাবা নাছোড়বান্দা! আল্লাহর রাসূলের পবিত্র হাত ছাড়া আর কাহারও হাতে মুক্ত হইতে তিনি রাজী হইলেন না। অবশেষে ফজরের নামাযের সময় স্বয়ং রসূলুল্লাহ (স) তাঁহার পবিত্র হাতে তাঁহাকে বন্ধনমুক্ত করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুজাহিদ সঙ্গীগণ যে কী উচ্চ মানের নৈতিক শক্তির অধিকারী ছিলেন, এই ঘটনা উহার একটি উজ্জ্বল প্রমাণ।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সা'দ ইব্‌ন মু'আয (রা)-এর দৃঢ়তা

📄 সা'দ ইব্‌ন মু'আয (রা)-এর দৃঢ়তা


বনু কুরায়যার পুরাতন মিত্রগোত্র আওস। সেই আওস গোত্রেরই নেতা সা’দ ইবন মু’আয (রা)। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে সিদ্ধান্ত প্রদানের ভার অর্পণ করিয়াছিলেন শুনিয়া তিনি মদীনা হইতে আসামাত্র গোটা আওস গোত্রের আনসারগণ দুই দিক হইতে তাঁহাকে ঘিরিয়া ধরিলেন। তাঁহার মুখের একটি কথায় গোটা বনু কুরায়যা রক্ষাও পাইতে পারে, আবার সমূলে ধ্বংসও হইয়া যাইতে পারে। আওসগণ বলিলেন, সা’দ! মিত্রগোত্রের প্রতি সদয় হউন। সদয় সিদ্ধান্ত প্রদানের জন্য রাসূলুল্লাহ (স) আপনাকে বিচারক মনোনীত করিয়াছেন। তিনি কাহারও কথার কোন জবাব দিলেন না। তাঁহারা যখন বারংবার তাঁহাদের আবদারের পুনরাবৃত্তি করিতেছিলেন তখন তিনি বলিলেন: لَقَدْ أَنْ لِسَعْدٍ اَنْ لاَ تَأْخُذَهُ فِى اللَّهِ لَوْمَةَ لاَئِمٍ. “এখন সেই সময় সমুপস্থিত যখন সা’দের আর আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে কোন ভর্ৎসনাকারীর ভর্ৎসনার তোয়াক্কা করা উচিত নয়।”

লোকেরা যাহা বুঝিবার বুঝিয়া লইল। তাঁহাদের মধ্যকার কেহ কেহ ঐ সময়ে মদীনার গিয়া বনু কুরায়যার মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়া গিয়াছে বলিয়া প্রচার করিয়া দিল (ড. ইবন হিশাম, ৩য়, পৃ. ২০০, বাংলা ভাষ্য ই.ফা.)। কবি গোলাম মোস্তফা তাঁহার কাব্যিক ভাষায় ঐ সময়ের চিত্র অঙ্কন করিয়াছেন এইভাবে: “সা’দ একটু বিব্রত হইয়া পড়িলেন। আসিবার কালে সারা পথ আওস গোত্রের অন্যান্য মুসলমানও ইয়াহুদীদের সহিত আওস গোত্রের সৌহার্দ্যের পূর্বস্মৃতিও তাঁহার মনে জাগিতেছিল। কিন্তু হইলে কী হয়, সেই খাতিরে ত তিনি পক্ষপাতিত্ব করিতে পারেন না! কারণ মরণ সাগরের তীরে দাঁড়াইয়া কেমন করিয়া তিনি ন্যায়ের মর্যাদা ক্ষুন্ন করিবেন? করিলে তাঁহাকে যে জবাবদিহি করিতে হইবে! পক্ষপাত বিচার তাঁহাকে করিতেই হইবে—তাহাতে যে যাহা বলে বলুক। ইহাই ভাবিয়া সা’দ তাঁহার মনকে দৃঢ় করিলেন।

"তখনকার দৃশ্য বাস্তবিকই বড় করুণ। বন্দী ইয়াহুদীকে অপেক্ষা করিতে হইতেছে অন্য পার্শ্বে হযরত ও তাঁহার সাহাবাগণ দাঁড়াইয়া আছেন। আশা-নিরাশার আলো-আঁধারে ইয়াহুদীদের ভাগ্য, দোল খাইয়া ফিরিতেছে। স্তব্ধ প্রকৃতি এই অভিশপ্তদিগের শেষ পরিণতি দেখিবার জন্য যেন নীরবে অপেক্ষা করিতেছে” (বিশ্বনবী, পৃ. ২৫৭, ৭ম সংস্করণ, ১৯৬০, ১ম সং. ১৯৪২)।

মৃত্যুশয্যা হইতে প্রিয়নবীর নির্দেশে সা'দ রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে আসিয়া উপনীত হইলেন এবং কাহারও সহায়তা ব্যতীত তাঁহার গাধার পিঠ হইতে অবতরণের শক্তি ছিল না। নবী করীম (স) সাহাবীগণকে নির্দেশ দিলেন : "তোমাদের নেতার জন্য দাঁড়াও এবং তাহাকে গাধার পিঠ হইতে নামাইয়া আম (দ্র. মুসনাদে আহমাদ)। সা'দ' নামিয়া আসিতেই রাসূলুল্লাহ (স) জানাইলেন, বনু কুরায়যার দুর্গবাসীরা তাহার সিদ্ধান্ত মানিয়া লইবে এই শর্তে আত্মসমর্পণে রাযী হইয়াছে। সা'দ (রা) তখন দৃঢ়তার সহিত জিজ্ঞাসা করিলেন : حکمی نافذ عليهم "আমার আদেশ তাহাদের ব্যাপারে কার্যকরী হইবে"? রাসূলুল্লাহ (স) ইতিবাচক জবাব দিলে তিনি আবার জিজ্ঞাসা করিলেন : وعلى المسلمين মুসলমানদের উপরও? রাসূলুল্লাহ (স) এইবারও ইতিবাচক জবাব দিলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর দিকে বিনয় দৃষ্টিতে তাকাইয়া তিনি পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন : وعلى من ههنا "আর এই দিকে যে মহান সত্তা রহিয়াছেন তিনিও মানিয়া লইবেন তো"?

যখন রায় কার্যকরী হওয়ার পরিপূর্ণ নিশ্চয়তা লাভ করিলেন তখন গলদ গম্ভীর কন্ঠে তিনি ঘোষণা করিলেন : فانى احكم فيهم ان تقتل المقاتلة وان تسبى الذرية والنساء وتقسم أموالهم . "আমি রায় ঘোষণা করিতেছিঃ (১) তাহাদের মধ্যে যাহারা যুদ্ধক্ষম তাহাদিগকে হত্যা করা হউক; (২) শিশু ও নারীদিগকে বন্দী করা হউক এবং (৩) তাহাদের সম্পদসমূহ বণ্টন করা হউক" (দ্র. মুসলিম, অনুচ্ছেদ ৮৮, হাদীছ নং ৪৪৪৬; সহীহ বুখারী, বাব ১৬, হাদীছ নং ১২৭৬, কিতাবুল মাগাযী; আবু দাউদ, অধ্যায় ৫৭১, হাদীছ নং ১৭৭৪; সীরাত ইব্‌ন হিশাম, আরবী, ২খ., পৃ. ২৩০-৪০)।

রাসূলুল্লাহ (স) যে তাহার এই রায়ের প্রতি সন্তুষ্ট উহা পূর্ণই উক্ত হইয়াছে। ইহার মাত্র কয়েক দিন পরেই মসজিদে নববীর সন্নিকটস্থ ঐ তাঁবুতে চিকিৎসারত অবস্থায়ই হযরত সা'দ ইন্ন মুআয (রা) একেবারে মৃত্যুর মুখে দাঁড়াইয়া তাঁহার স্বগোত্রের সমস্ত লোকের আকৃতি আবদারকে অগ্রাহ্য করিয়া নির্ভীকভাবে সেদিন যে ঐতিহাসিক রায়টি ঘোষণা করিলেন, ইতিহাসে চিরদিন উহা মহানবী (স)-এর প্রতিরক্ষা কৌশল হিসাবে অক্ষয় হইয়া থাকিবে। কারণ এই ধরনের রায় কার্যকর না হইলে এই ইয়াহুদীরা ইসলাম ও মুসলমানদিগকে পুনরায় আক্রমণ করিত।

খন্দকের যুদ্ধে জনৈক বনূ কুরায়যা বংশীয় যোদ্ধা তীরবিদ্ধ করিয়া সা'দকে আহত করিয়াছিল এবং ইহাতেই শেষ পর্যন্ত তাঁহার মৃত্যু হইয়াছিল। এইজন্য তাঁহার পক্ষে বনু কুরায়যার বিরুদ্ধে এইরূপ একটি যথার্থ রায় দেওয়া সম্ভব হইয়াছিল (দ্র. শিবলী, সীরাতুন্নবী, ১খ., পৃ. ৪০৫, পাদটীকায়)। কিন্তু তাঁহার উক্ত সমালোচনা সঠিক নয়। কারণ ঐ তীর নিক্ষেপকারী কোন ইয়াহুদী ছিল না। তীর নিক্ষেপকারী লোকটি ছিল কুরায়শ বংশীয়। তাহার নাম ছিল ইবনুল আরিকা (দ্র. মুসলিম, হাদীছ নং ৪৪৪৬, ই.ফা. প্রকাশিত ৬ষ্ঠ খণ্ড, তাহার পূর্ণ নাম ছিল হাব্বান ইব্‌ন কায়স ইবনুল আরিকা (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৪৯, বুখারী মুসলিমের বরাতে)। আল্লামা শিবলী নু'মানী লিখেন:

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হিন্দু শাস্ত্রের বিধান

📄 হিন্দু শাস্ত্রের বিধান


হিন্দু শাস্ত্রের বিধান ইস্রায়েলীদের ঘনিষ্ঠতম বন্ধু ভারতীয় হিন্দুগণ মুশরিক, যাহারা মুসলমানদের বিরোধিতা ও. তাহাদের প্রতি বৈরিতা পোষণে তাহাদের সমপর্যায়ের, তাহাদের সম্পর্কে কুরআনে বলা হইয়াছে: لَتَجِدَنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَدَاوَةً لِلَّذِينَ آمَنُوا الْيَهُودَ وَالَّذِينَ أَشْرَكُوا . "অবশ্য মুমিনদের প্রতি শক্রতায় মানুষের মধ্যে ইয়াহুদী ও মুশরিকদিগকেই তুমি সর্বাধিক উগ্র দেখিতে পাইবে" (দ্র. ৫:৮২)।

ঐ হিন্দুজাতির অনুসরণীয় বেদের বাণী উহা হইতে কোন অংশে কম নহে। ঋগবেদও বলা হইয়াছে : রঙ্গ বীর চৌতহে মন্ডল কে মন্ত্র - ১৭ রজা - ১০ মেস পে এস নে পেয়াস পজার সিয়া হাম দুশমন কো লরাই মেইন তবাহ ওয়া গারত কিয়া (কাদিম হিন্দুস্তান কী তেজীব)। ঋগবেদ ৪ র্থ বৃত্ত, মন্ত্র ১৬, শ্লোক ১০-এ আছে : তিনি পঞ্চাশ সহস্র কৃষ্ণকায় শত্রুদের যুদ্ধে পরাজিত ও ধ্বংস করেন। রঙ্গ বেদ মন্ডল ১০ মন্ত্র ৬৭ রজা - ৭ হম নে দাসুন (গোলামুন) কো দো ঠুকরুন মেইন কিত্তা কর দিয়া ক্বধা ও কদর নে ইন কো অসি ওয়াস্তে পয়দা কিয়া থা, সঃ - ৩৮ - আমরা দাসদিগকে দুই টুকরা করিয়া কর্তন করিয়া দিলাম। নিয়তি তাঁহাদিগকে এইজন্যই সৃষ্টি করিয়াছিল। রঙ্গ বেদ মন্ডল ৩ মন্ত্র রজা ৬-৭ ওহ আন্দার জসনে ঔর তরাকো কিতল কিয়া ঔর কসবে কে গাওন কে গাওন বরবাদ কর দিহ্নে ওহ কালে দাসুন কী ফউজুন কো তবাহ কর দিয়া (উরদু তরজমে কদিম হিন্দুস্তান কী তেজীব মসনদে মসতির আর সী দত্ত)। সেই ইন্দ্র যিনি তরত্রাকে নিধন করেন এবং যিনি সম্পদের পর সম্পদ, গ্রামের পর গ্রাম বিধ্বস্ত করেন, তিনি কৃষ্ণকায় বাহিনীকে সংহার করেন (মিঃ আর. সি. দত্তের প্রাচীন ভারতের কৃষি-র উর্দু অনুবাদ, পৃ. ৩৭; রহমাতুল লিল-আলামীন, ২য়, পৃ. ১৫৬-১৫৭)।

ঋগ্বেদের শ্লোকে উল্লিখিত কৃষ্ণকায় দাস বা বেশ্য বলিতে কাহাদিগকে বুঝানো হইয়াছে ? তাহারা যে মধ্য এশিয়ার গৌরবর্ণের মরুচারী আর্যদের দৃষ্টিতে কৃষ্ণকায় আদিম ভারতীয় ডোম, কোল, তামিল, দ্রাবিড় ও আদিম সমাজের সাধারণ লোকজন ছিল উহা বলাই বাহুল্য। মনুসংহিতার পাতায় পাতায় তাঁহাদের মনুষ্যত্বের ও অধিকার বঞ্চিত জীবনের চিত্র বিধৃত হইয়াছে যাহার দীর্ঘ আলোচনার অবকাশ এখানে নাই। হযরত সা'দ (রা)-এর বনু কুরায়যার বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে প্রদত্ত রায়ের যে বিরোধিতা করার কোন সুযোগ কোন ইয়াহুদী, খৃষ্টান বা হিন্দু আর্য পণ্ডিতের নাই, এই কথাটি বুঝাইবার জন্যই কেবল এই আলোচনায়টুকু করিতে হইল।

স্বয়ং বনু কুরায়যার ইয়াহুদীরা এবং তাহাদের খাযরাজ বংশীয় বন্ধুগণ হযরত মু'আয (রা)-কে বিচারকরূপে মনোনীত করার জন্য প্রস্তাব দিয়াছিল এবং এই শর্তেই তাহারা আত্মসমর্পণ করিয়াছিল যে, তিনি যে রায় দিবেন, বিনা বাক্য ব্যয়ে তাহারা সেই সিদ্ধান্ত মানিয়া লইবেন। উহা না করিয়া তাহারা যদি রাসূলুল্লাহ্ (স) প্রতি আস্থা জ্ঞাপন করিত, তাহা হইলে তিনি কী সিদ্ধান্ত দিতেন উহা তাহারা বুঝিতে পারিত। বনু কুরায়যা খন্দকের যুদ্ধেই যে প্রথম বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছিল তাহা নহে, বদর যুদ্ধেও তাহারা মক্কার কুরায়শদিগকে অস্ত্রশস্ত্র দিয়া সাহায্য করিয়া মদীনা সনদের শর্ত লঙ্ঘন করিয়াছিল। রাসূলুল্লাহ (স) দয়াপরবশ হইয়া সেই সময় তাহাদিগকে ক্ষমা করিয়াছিলেন। কাজী সুলায়মান মনসূরপুরী বলেন: "আমাদের কাছে এমনটি বিশ্বাস করার সঙ্গত কারণ ও নজীর রহিয়াছে যাহার উপর ভিত্তি করিয়া বলা চলে যে, বনু কুরায়যার ইয়াহুদীরা যদি তাহাদের ভাগ্যের ব্যাপারটি রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর ছাড়িয়া দিত তবে তাহাদের বেশি হইতে বেশি যে শাস্তি দেওয়া হইত তাহা হইত, যাও, খায়বারে গিয়া বাস কর। বনূ নাষীর ও বনু কায়নুকার ইয়াহুদীদের ব্যাপারে তাঁহার সিদ্ধান্তই ইহার বাস্তব নজীর। রাসূলুল্লাহ (স) তো স্বয়ং বনু কুরায়যার কোন কোন ইয়াহুদীর প্রতিও বদান্যতা প্রদর্শন করিয়া রাজকীয় বদান্যতাস্বরূপ উক্ত সিদ্ধান্তের ব্যতিক্রম ঘোষণা করিয়াছিলেন। ইহা ছাড়া রিফা'আ ইব্‌ন শামুয়েল নামক ইয়াহুদীকেও তিনি ক্ষমা করিয়াছিলেন (দ্র. রহমতুললিল আলামীন, উর্দু, ১খ., পৃ. ১৫৬-১৫৭)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00