📄 সমুদ্রোপকূলে ইসলামের নূতন প্রতিরক্ষা ঘাঁটি
সাহাবীগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কুরায়শ পক্ষের দাবির কাছে বাহ্যত নতি স্বীকার করিয়া সম্পাদিত হুদায়বিয়ার সন্ধি এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর সেই সন্ধির শর্ত পালনে কড়াকড়ি ও নিষ্ঠার সুফল শীঘ্রই ফলিতে শুরু করে। ছাকীফ গোত্রীয় জনৈক নওমুসলিম যুবক আবূ বসীর ইসলাম গ্রহণ করিয়া মক্কায় কুরায়শদের অত্যাচার হইতে আত্মরক্ষা ও প্রিয়নবীর সহিত মিলনের উদ্দেশ্যে অভিভাবকদের অনুমতি না লইয়াই মদীনায় চলিয়া আসেন। ছাকীফরা ছিল কুরায়শদের চুক্তিবদ্ধ মিত্র, তাই হুদায়বিয়ার সন্ধির শর্তানুসারে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে মক্কায় ফেরৎ পাঠাইয়া দিয়াছিলেন। তাই আযহার ইব্ন আওফ ও আখনাস ইব্ন শুরায়ক তাঁহাকে ফেরৎ পাঠাইবার দাবি জানাইয়া মদীনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পত্র প্রেরণ করে। পত্রের মর্মানুসারে তাহারা বনী আমের গোত্রের একজন লোককে এবং তাহাদের একটি ক্রীতদাসকে তাহার সাথীরূপে প্রেরণ করে। রাসূলুল্লাহ (স) আবূ বসীরকে বলিলেন: يا ابا بصير انا قد اعطينا هؤلاء القوم ما قد علمت ولا يصح لنا في ديننا الغدر وان الله جاعل لك ولمن معك من المستضعفين فرجا ومخرجا فانطلق الى قومك. “হে আবূ বসীর! আমরা ঐ সম্প্রদায়কে যে কথা দিয়াছি (অর্থাৎ তাহাদের সহিত আমরা চুক্তিবদ্ধ হইয়াছি) তাহা তুমি জান। আর ইসলামে বিশ্বাস ভঙ্গের অবকাশ নাই। আল্লাহ তোমার এবং তোমার সাথীদের জন্য অবশ্যই একটা ব্যবস্থা করিয়া দিবেন। সুতরাং তুমি তোমার সম্প্রদায়ের নিকট চলিয়া যাও” (দ্র. হায়কাল, হায়াতু মুহাম্মাদ (আরবী), মিসর ১৫তম সংস্করণ ১৯৬৮, পৃ. ৩৮৪)।
আবূ বসীর অনেক অনুনয়-বিনয় করিয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি আমাকে আবার পৌত্তলিকদের নিকট ফেরৎ পাঠাইবেন? উহারা যে আমাকে ধর্মচ্যুত করিয়া ফেলিবে! কিন্তু আল্লাহর রাসূল একাধিকবার তাঁহার ঐ কথারই পুনরুক্তি করিয়া তাহাকে আশ্রয় দানে তাঁহার নীতিগত অসামর্থ্যের কথা জানাইলেন। অগত্যা আবূ বসীর ঐ দুই ব্যক্তির সহিত প্রস্থান করিলেন। যুল-হুলায়ফায় পৌঁছিয়া তিনি অত্যন্ত চাতুর্যের সহিত সঙ্গীটিকে তাঁহার চমৎকার তরবারিটি একবার দেখিতে দিতে অনুরোধ করিলেন। সঙ্গীটি তরবারি তাঁহার হাতে তুলিয়া দিতেই তিনি উহার দ্বারা তাহাকে হত্যা করেন। সঙ্গী ক্রীতদাসটি ভয়ে পালাইয়া মদীনায় গিয়া উপস্থিত হইল। রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে ভীত-সন্ত্রস্তভাবে উপস্থিত হইয়া সে আরয করিল, আপনার লোকটি আমার সঙ্গীকে হত্যা করিয়া ফেলিয়াছে। এমনি সময় উন্মুক্ত তরবারি হাতে আবূ বসীরও সেখানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) কোন মন্তব্য করার পূর্বেই তিনি বলিলেন: يا رسول الله وقت ذمتك وادي الله عنك اسلمتنى بيد القوم وقد امتنعت بديني ان افتن فيه أو يعبث بي. “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আপনার সন্ধির শর্ত পূরণ করিয়াছেন এবং আল্লাহ তা'আলা আপনাকে দায়িত্বমুক্ত করিয়াছেন। আপনি যথারীতি আমাকে তাহাদের হাতে অর্পণ করিয়াছেন। আমি ধর্মচ্যুতির ফিৎনা ও তাহাদের নির্যাতনের পাশবিক ব্যবহার হইতে আত্মরক্ষা করিয়াছি" (ইবন হিশাম, সীরাত, ৩য় খ., পৃ. ২২০-২১)।
আবূ বসীর তৎক্ষণাৎ প্রস্থান করিলেন এবং সমুদ্র উপকূলবর্তী ঈস নামক স্থানে অবস্থান করিলেন। উহা ছিল কুরায়শদের সিরিয়ায় বাণিজ্য যাত্রার পথ। সন্ধিমতে কোন পক্ষই এই পথ রোধ করিতে পারিতেন না। মক্কায় এই খবর পৌঁছিতেই সেখানকার অত্যাচারিত মুসলমানগণ আসিয়া তাঁহার নেতৃত্বে ঈসে একত্র হইতে থাকিলেন। দেখিতে দেখিতে সত্তরজনের একটি দল জুটিয়া গেল। প্রতিটি কুরায়শ কাফেলার উপর তাহারা আক্রমণ চালাইয়া তাহাদের বাণিজ্য-সম্ভার লুণ্ঠন এবং তাহাদের লোকজনকে হত্যা করিতে শুরু করিলেন।
এতদিন পর্যন্ত কুরায়শরা তাহাদের উপর যে অকথ্য নির্যাতন চালাইয়াছে, যেইভাবে নিজেরাই জেদ ধরিয়া মক্কা হইতে পলাতক মুসলমানগণের মদীনার আশ্রয় চাওয়ার পথ চুক্তিদ্বারা রুদ্ধ করিয়া দিয়াছে, এখন আর তাহাদের বলার মতও কিছুই ছিল না। কেননা রাসূলুল্লাহ (স) এই ব্যাপারে তাঁহার দায়িত্ব যথারীতি পালন করিয়াছেন। মক্কায় যে নির্যাতিত মুসলমানগণ চুক্তির বাহিরে অবস্থান করিতেছিলেন তাহাদিগকে এইভাবে অত্যাচারিত হইয়া মরিতে বা ধর্মত্যাগ করিতে সুযোগ দেওয়ারও কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ ছিল না। এইদিকে সিরিয়ার বাণিজ্যপথ রুদ্ধ হইলে তাহাদেরও বাঁচিয়া থাকার পথ রুদ্ধ হইয়া যায়। এই পথটিকে ঝুঁকিমুক্ত রাখার জন্যই তো তাহারা মদীনার মুসলমানদের বিরুদ্ধে এত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করিয়াছে। চুক্তির দ্বারা উহা মুক্ত হইয়াছিল বটে কিন্তু এখন তো আবূ বসীর ও তাঁহার সঙ্গী-সাথীরা অপ্রতিরোধ্য এক নূতন শক্তিরূপে দেখা দিয়াছে। ইসলামের এক নূতন রক্ষাব্যূহ সৃষ্টি হইয়াছে যাহা পূর্বেকার ঝুঁকি হইতে কোনমতেই কম বিপজ্জনক নহে। অগত্যা তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর কৃপাদৃষ্টি আকর্ষণ করিয়া মদীনায় দূত পাঠাইল। আত্মীয়তার দোহাই দিয়া তাহারা তাহাদের বাঁচিবার তাগিদে আবু বসীর তথা তাবৎ মক্কাবাসী নির্যাতিত মুসলমানগণকে মদীনায় ডাকাইয়া লইবার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ফরিয়াদ জানাইল। মানবতার নবী মানবিক কারণে তাহাদের সেই আবেদনে সাড়া দিয়া আবূ বসীর ও মক্কাবাসী তাবৎ মুসলমানগণকে মদীনায় ডাকিয়া পাঠাইলেন। এইভাবে স্বয়ং কুরায়শদের আবেদনে হুদায়বিয়া চুক্তির একটি শর্ত বিলুপ্ত করিয়া তাহাদের সিরিয়ার বাণিজ্যপথ নিরাপদ করিয়া দেওয়া হইল (হায়াতে মুহাম্মাদ, আরবী, পৃ. ৩৮৪-৮৫)।
📄 অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা
মদীনায় হিজরত, আনসার-মুহাজিরের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন সৃষ্টি, মদীনার আশেপাশে বসবাসকারী বিভিন্ন গোত্রের সহিত সমঝোতা সৃষ্টি, সর্বোপরি মদীনার প্রভাবশালী ইয়াহুদী গোত্রসমূহ ও পৌত্তলিকদের সহিত মদীনা সনদ সম্পাদনের পর জিহাদ সংক্রান্ত নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়:
أُذِنَ لِلَّذِينَ يُقَاتَلُونَ بِأَنَّهُمْ ظُلِمُوا وَإِنَّ اللَّهَ عَلَى نَصْرِهِمْ لَقَدِيرُ الَّذِينَ أُخْرِجُوا مِنْ دِيَارِهِمْ بِغَيْرِ حَقٌّ إِلا أَنْ يَقُولُوا رَبُّنَا اللهُ وَلَوْلا دَفْعُ اللَّهِ النَّاسَ بَعْضَهُمْ بِبَعْضٍ لَهُدِّمَتْ صَوَامِعُ وَبِيَعٌ وَصَلَوَاتٌ وَمَسَاجِدُ يُذْكَرُ فِيهَا اسْمُ الله كَثِيرًا وَلَيَنْصُرَنَّ اللَّهُ مَنْ يَنْصُرُهُ إِنَّ اللهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ.
"যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হইল তাহাদিগকে যাহারা আক্রান্ত হইয়াছে; কারণ তাহাদের প্রতি অত্যাচার করা হইয়াছে। আল্লাহ নিশ্চয়ই তাহাদিগকে সাহায্য করিতে সম্যক সক্ষম। তাহাদিগকে তাহাদের ঘর-বাড়ি হইতে অন্যায়ভাবে বহিষ্কার করা হইয়াছে শুধু এই কারণে যে, তাহারা বলে: 'আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ'। আল্লাহ যদি মানব জাতির এক দলকে অন্য দল দ্বারা প্রতিহত না করিতেন, তাহা হইলে বিধ্বস্ত হইয়া যাইত খৃস্টান সংসারবিরাগীদের উপাসনা স্থান, গির্জা, ইয়াহুদীদের উপাসনালয় এবং মসজিদসমূহ-যাহাতে অধিক স্মরণ করা হয় আল্লাহ্র নাম। আল্লাহ নিশ্চয়ই তাহাকে সাহায্য করেন যে তাঁহাকে সাহায্য করে। আল্লাহ নিশ্চয়ই শক্তিমান, পরাক্রমশালী" (২২: ৩৯-৪০)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হইতেছে আল-কুরআনের নির্দেশনা ভিত্তিক জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ বা আল্লাহর পথে জিহাদ।
মক্কার কুরায়শরা যখন লক্ষ্য করিল যে, তাহাদের সমস্ত ষড়যন্ত্রকে ব্যর্থ করিয়া দিয়া রাসূলুল্লাহ (স) ও সাহাবীগণ মদীনার মত এমন একটি স্থানে গিয়া একত্র হইয়াছেন যাহা তাহাদের সিরিয়াগামী বাণিজ্য পথের নিকটবর্তী। ইহা ছাড়া মদীনায়ও তাহারা একান্তই বাস্তহারা ও আশ্রিত নহেন, মদীনা সনদ ও সিরিয়াগামী বাণিজ্য পথের নিকটবর্তী গোত্রসমূহের সহিত সন্ধিচুক্তি করিয়া তাহারা সেখানকার কর্তৃত্বভার গ্রহণ করিয়া একটি সাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন তখন তাহাদের উৎকণ্ঠার সীমা রহিল না। অঙ্কুরেই এই উদীয়মান শক্তিকে নির্মূল না করিলে তাহাদের ভবিষ্যত অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ভাবিয়া তাহারা সেইভাবেই অগ্রসর হইতে লাগিল। তাহারা জানিত, মদীনার আওস ও খাযরাজ গোত্রীয়রা পারস্পরিক দ্বন্দ্বের অবসান ঘটাইয়া আবদুল্লাহ ইবন উবায়্যিকে তাহাদের একচ্ছত্র সর্বাধিনায়করূপে গ্রহণ করার উদ্যোগ গ্রহণ করিয়াছিল। তাই তাহারা ঐ নেতাকেই সম্বোধন করিয়া পত্র লিখিল:
انكم اويتم صاحبداوانا نقسم بالله اتقاتلنه او تخرجنه او اسيرن اليكم باجمعنا حتى نقتل مقاتلتكم ونستبح نسائكم .
"তোমরা আমাদের লোককে আশ্রয় দিয়াছ। আল্লাহ্র কসম! হয় তোমরা নিজেরা তাহাকে হত্যা করিবে কিংবা তাহাকে মদীনা হইতে বহিষ্কার করিবে। অন্যথায় আমরা সংঘবদ্ধভাবে তোমাদের উপর আক্রমণ চালাইব, তোমাদেরকে হত্যা করিয়া তোমাদের নারীদিগকে আমাদের ভোগদখলে লইয়া আসিব” (সুনান আবূ দাউদ, খ. ২, পৃ. ৬৭)।
যদিও রাসূলুল্লাহ (স) বা তদীয় অনুসারী মুসলমানগণকে হত্যা করা বা মদীনা হইতে বহিষ্কার করিয়া দেওয়ার ক্ষমতা তখন আর মুনাফিক নেতা আবদুল্লহ ইবন উবায়্যির ছিল না, তবুও মক্কাবাসীদের নিকট হইতে এইরূপ পত্র পাইয়া তাহার উন্নাসিকতা ও ঔদ্ধত্য বৃদ্ধি পাইয়াছিল যাহার উল্লেখ ইতোপূর্বেই করা হইয়াছে। তাহার আত্মীয়-স্বজনের অনেকেই তখন ইসলাম গ্রহণ করিয়া নিষ্ঠাবান মুসলমান হিসাবে জীবন যাপন করিতেছিলেন। তাই রাসূলুল্লাহ (স) যখন তাহার নিকট উপস্থিত হইয়া তাহাকে বুঝাইয়া বলিলেন, তুমি কি তোমার আত্মীয়-পরিজনের সহিত যুদ্ধে অবতীর্ণ হইবে তখন সে ব্যাপারটি সম্পর্কে বুঝিতে পারিয়া এইরূপ কোন উদ্যোগ গ্রহণ হইতে বিরত থাকিতে বাধ্য হয় (দ্র. শিবলী, সীরাতুন্নবী, ১খ., পৃ. ৩০৫-৩০৬)।
কিন্তু কুরায়শরা তাহাদের পরিকল্পনা মত প্রস্তুতি গ্রহণ করিতে থাকে এবং যে কোন প্রকারেই মুসলমানদের ক্ষতি করার সুযোগ খুঁজিতে থাকে। তাহাদের একজন সর্দার কুরয ইব্ন ফিহর মদীনার উপকণ্ঠে পৌছিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর পশুপাল লুট করিয়া লইয়া যায়। অবশ্য যথারীতি তাহার পশ্চাদ্ধাবন করা হইয়াছিল। কা'বা ঘরের খাদেম হওয়ার দরুন তাহাদের যে গুরুত্ব গোটা আরবে স্বীকৃত ছিল ইসলাম ও ইসলামের নবীর বিরুদ্ধে সমগ্র আরবদেশ জুড়িয়া তাহারা অপপ্রচারে সেই প্রভাবকে ব্যবহার করিয়া মুসলমানদের বিরুদ্ধে সকল গোত্রকে ক্ষেপাইয়া তোলে। চরম উৎকণ্ঠায় মুসলমানদিগকে দিনের বেলায় তো বটেই রাত্রি বেলায়ও সশস্ত্র অবস্থায় কাটাইতে হইত। কুরআনুল করীমে সেই উৎকণ্ঠার সময়টির বর্ণনা রহিয়াছে এইভাবেঃ
وَاذْكُرُوا إِذْ أَنْتُمْ قَلِيلٌ مُسْتَضْعَفُونَ فِي الْأَرْضِ تَخَافُونَ أَنْ يُتَخَطَّفَكُمُ النَّاسُ فَأَوكُمْ وَأَيَّدَكُمْ بِنَصْرِهِ وَرَزَقَكُمْ مِّنَ الطَّيِّبَاتِ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ .
"স্মরণ কর, তোমরা ছিলে স্বল্প সংখ্যক, পৃথিবীতে তোমরা দুর্বলরূপে পরিগণিত হইতে। তোমরা আশঙ্কা করিতে যে, লোকেরা তোমাদিগকে অকস্মাৎ ছোঁ মারিয়া ধরিয়া লইয়া যাইবে। অতঃপর তিনি তোমাদিগকে আশ্রয় দেন, স্বীয় সাহায্য দ্বারা তোমাদিগকে শক্তিশালী করেন এবং তোমাদিগকে উত্তম বস্তুসমূহ জীবিকারূপে দান করেন, যাহাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হও” (৮:২৬)।
মোটকথা, নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য সর্বদিক হইতেই তখন মুসলমানদের জন্য যুদ্ধ অপরিহার্য হইয়া উঠিয়াছিল। ঠিক এই পরিস্থিতিতেই আল্লাহ তা'আলা জিহাদের আয়াত নাযিল করিয়া তাঁহাদিগকে আঘাতের জবাবে প্রত্যাঘাত করিয়া নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণের অনুমতি দান করিলেন।
📄 বনূ কায়নুকা'র বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ
ইবন ইসহাক বলেন, আমাকে 'আসিম ইব্ন 'আমর ইব্ন কাতাদা এই তথ্য অবহিত করেন যে, বনু কায়নুকা' ইয়াহুদীদের প্রথম সম্প্রদায় যাহারা তাহাদের ও রাসূলুল্লাহ (স)-এর মধ্যকার চুক্তি ভঙ্গ করিয়া বদর ও উহুদ যুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। ইবন হিশামের বর্ণনা হইতে জানা যায় যে, জনৈকা আরব মহিলা কিছু জিনিস লইয়া বনূ কায়নুকা'র বাজারে যান এবং সেখানে তাহা বিক্রয় করিয়া জনৈক ইয়াহুদী স্বর্ণকারের দোকানে বসেন। মওলানা আকরম খাঁ উল্লেখ করেন যে, ইয়াহুদীগণ কর্তৃক উত্যক্ত হইয়া তিনি ঐ দোকানে আশ্রয় লইয়াছিলেন। ইয়াহুদীরা তাহার মুখের অবগুণ্ঠন খুলিতে বলিলে মহিলাটি তাহাতে সম্মত হইলেন না। স্বর্ণকার মহিলাটির চাদরের এক কোণা দোকানের খুঁটির সহিত বাঁধিয়া দেয়। নরাধমরা মজা দেখিবার জন্য একটু দূরে সরিয়া দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ পর দুর্বৃত্তরা সরিয়া পড়িয়াছে মনে করিয়া মহিলাটি উঠিতে চাহিলে তাহার গায়ের চাদরখানি খসিয়া পড়িল। এই ভদ্র মহিলাকে বিবস্ত্র হইতে দেখিয়া তাহারা হাসিয়া উঠে এবং করতালি দিতে থাকে। মহিলাটি লজ্জা ও ক্ষোভে মৃতপ্রায় হইয়া নিজেকে রক্ষার জন্য আর্তনাদ করিয়া উঠিলে জনৈক মুসলিম তরবারি হস্তে ছুটিয়া আসেন। ইয়াহুদীরা তাহাকে হত্যা করে এবং তাহার হাতেও তাহাদের একজন নিহত হয়। মুসলিম সমাজে স্বভাবতই ইহার দারুণ প্রতিক্রিয়া হয়।
আবূ দাউদের বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ (স) ইয়াহুদীদের বাজারে গিয়া তাহাদিগকে সতর্ক হওয়ার আহবান জানাইলেন। নতুবা তাহাদের অবস্থাও যে বদরে বিপর্যস্ত কুরায়শদের অনুরূপ হইতে পারে তাহাও জানাইয়া দিলেন। ইয়াহুদীরা তাঁহাকে পাল্টা চ্যালেঞ্জ করিয়া বলে, মুসলমানগণ যুদ্ধে কতিপয় অনভিজ্ঞ কুরায়শ হত্যা করিয়াছে বলিয়া গর্বিত হওয়ার কারণ নাই। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাদের আচরণে হতাশ হইয়া ফিরিয়া আসিলেন। ইয়াহুদীরা উত্তমরূপে দুর্গের দরজা বন্ধ করিয়া এই ভাবিয়া অপেক্ষা করিতে লাগিল যে, মক্কার কুরায়শদের আক্রমণে অচিরেই মুসলমানগণ দিশাহারা হইয়া পালাইয়া যাইবে। দীর্ঘ ১৫ দিন পর্যন্ত দুর্গ অবরোধের পর ও যখন তাহাদের সেই প্রত্যাশিত মক্কার কুরায়শদের সাহায্য আসিল না তখন তাহারা আত্মসমর্পণ করিয়া ধনসম্পদ ও অস্ত্রশস্ত্র মদীনায় রাখিয়াই বসতবাড়ি ত্যাগের অনুমতি ভিক্ষা করিল। তখনকার প্রচলিত প্রথানুসারে তিনি উহাদের সকলকে গুরুতর দণ্ডে দণ্ডিত না করিয়া তাহাদের প্রস্তাবে সম্মতি জানাইলেন। কেবল সম্মতিই নহে, সাহাবী উবাদা ইন্সুস সামিতকে তাহাদের যাত্রার সুব্যবস্থার জন্য নিয়োগ করিলেন। পূর্বে এই বনু কায়নুকার সহিত তাঁহার সৌহার্দ্যমূলক সম্পর্ক ছিল। ইহা ছাড়া মদীনা ত্যাগের জন্য তাহাদিগকে তিন দিনের অবকাশও দেওয়া হইল। এইভাবে ইয়াহুদীদের মুসলমানদিগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিবার জন্য প্রস্তুতকৃত অস্ত্রশস্ত্র ও রণসম্ভার মুসলমানদের হস্তগত হয়। বনু কায়নুকার সাত শত যুদ্ধবাজ সৈনিক, যাহাদের অধিকাংশই ছিল স্বর্ণকার ও দোকানদার, তাহাদের অস্থাবর সম্পত্তিসহ সিরিয়ার দিকে পাড়ি জমাইল। এইভাবে বিদ্রোহ ও চুক্তিভঙ্গের জন্য যাহারা মুত্যুদণ্ডের অপেক্ষা করিতেছিল তাহারা নিরাপদে ইয়াছরিব ত্যাগে সক্ষম হয় (দ্র. ইবন হিশাম, সীরাতুননবী, ৩খ., পৃ. ৫-৮; মোস্তফা চরিত, পৃ. ৬৩৮-৬৪০; যাদুল মা'আদ, ১খ., পৃ. ৩৪৮, আবুল হাসান আলী নদভী, আস্-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, আরবী, পৃ. ১৯৫)।
প্রাচ্যবিদ মন্টগোমারী ওয়াট মনে করেন, ইয়াহুদীদের ঐ বহিষ্কারের মূলে ছিল ইয়াহুদীদের মদীনার সমাজ জীবনে মিশিয়া না যাওয়া। ইহা ছাড়া মুসলমানদের প্রতিদ্বন্দ্বী মক্কার কুরায়শদের সহিত তাহাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথারও হয়তো মুহাম্মাদ (স) অবগত ছিলেন যাহা ছিল মুসলমান ও ইয়াহুদীদের চুক্তির পরিপন্থী (দ্র. নবীয়ে রহমত, পৃ. ২৪০, পাদটীকা)।
📄 বনু কুরায়যার বিরুদ্ধে অভিযান
দীর্ঘ একমাস ব্যাপী কুরায়শ ও ইয়াহুদীদের সম্মিলিত বাহিনীর অবরোধ মুকাবিলা করিয়া ৫ম হিজরীর যুলকা'দা মাসের এক সপ্তাহ বাকী থাকিতে রাসূলুল্লাহ (স) মুসলিম বাহিনীসহ মদীনায় প্রত্যাবর্তন করিয়া উম্মুল মু'মিনীন হযরত উম্মু সালমার গৃহে গোসল করিতেছিলেন। এমন সময় জিবরাঈল (আ)-এর আগমন ঘটিল। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-কে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনারা কি যুদ্ধবিরতি করিয়া ফেলিয়াছেন? আমরা ফেরেশতাগণ কিন্তু এখনও অস্ত্রশস্ত্র খুলিয়া রাখি নাই। আপনি তাড়াতাড়ি সঙ্গী-সাথিগণকে লইয়া বন্ কুরায়যার দিকে রওয়ানা হন। আমি অগ্রে গিয়া তাহাদের দুর্গসমূহে ভূকম্পন সৃষ্টি করিব এবং তাহাদের অন্তরে ভীতির সঞ্চার করিব। এই বলিয়া ফেরেশতা জিবরাঈল প্রস্থান করিলেন।
রাসূলুল্লাহ (স) ও আনুগত্যের অঙ্গীকারে অটল সাহাবীগণকে আসরের নামায বনু কুরায়যার পল্লীতে গিয়া পড়ার নির্দেশ দিয়া নিজে সেইদিকে রওয়ানা হইয়া গেলেন। সেইখানে পৌঁছিয়া তিনি আনা নামক কূপের পাদদেশে অবতরণ করিলেন। মুসলিম বাহিনী সেইখানে পৌছিয়া সঙ্গে সঙ্গে বনু কুরায়যার দুর্গসমূহ অবরোধ করিলেন।
উল্লেখ্য যে, মদীনা সনদ অনুসারে এই ইয়াহুদীদের মদীনা আক্রান্ত হইলে মুসলমানদের কাঁধে কাঁধ মিলাইয়া মদীনার প্রতিরক্ষাকল্পে অংশগ্রহণ করার কথা ছিল। কিন্তু তাহারা উহা তো করেই নাই, উপরন্তু মদীনা আক্রমণ করিয়া মুসলিম জাতি ও তাহার নবীকে ধরাপৃষ্ঠ হইতে নিশ্চিহ্ন করিয়া ফেলার জন্য বহিশক্তির সহিত দীর্ঘকাল ধরিয়া ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল এবং এইজন্য গোপনে বিশাল প্রস্তুতিও নিয়া রাখিয়াছিল। খন্দকের যুদ্ধের সময় যখন মক্কার কুরায়শ ও তাহাদের মিত্র গোত্রগুলি এবং বনূ নাযীর প্রভৃতি ইয়াহুদী গোত্রসমূহের সম্মিলিত শক্তি ১০,০০০ সৈন্যসহ মদীনা আক্রমণের জন্য অগ্রসর হইল তখন বনু কুরায়যার ইয়াহুদীরাও স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করে এবং আক্রমণকারী বাহিনীর সহিত যোগ দেয়। মুসলমানদের সহিত চুক্তির নেতৃত্বদানকারী তাহাদের নেতা কাব ইব্ন আসাদ সত্য নবীর হাতে ইসলাম কবূল করিয়া এই বিপর্যয় এড়াইবার পরামর্শ দিলেও অপর নেতা হুয়াই ইব্ন আখতাবের গোঁড়ামির দরুন তাহা আর হইয়া উঠে নাই।
বনু কুরায়যার দুর্গে অস্ত্রশস্ত্র বা রসদের কোন অভাব ছিল না। ঐদিকে বাহিরে অবরোধরত মুসলমানগণ ক্ষুৎপিপাসায় ও শীতে ভীষণ কষ্টের মধ্যে ছিলেন। এতদসত্ত্বেও ইয়াহুদীরা মানসিক দুর্বলতায় ভুগিতেছিল, আর মুসলমানগণের ঈমানী চেতনা ছিল তুঙ্গে। তাই খন্দক যুদ্ধের অক্লান্ত পরিশ্রম বা পরিস্থিতির প্রতিকূলতা তাহাদিগকে দমাইতে পারে নাই। দীর্ঘ পঁচিশ দিন পর্যন্ত অবরোধ অব্যাহত থাকার পর এক পর্যায়ে হযরত 'আলী (রা) ও হযরত যুবায়র ইবনুল 'আওয়াম (রা) বীরদর্পে দুর্গের উপর চরম আঘাত হানিতে অগ্রসর হইতেই ইয়াহুদীরা আত্মসমর্পণ করে।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশক্রমে তাহাদের পুরুষদিগকে বাঁধিয়া ফেলা হইল, নারী ও শিশুদিগকে পৃথক করিয়া দেওয়া হইল। আওস বংশীয় আনসারগণ একসময় এই বনু কুরায়যা বংশের ইয়াহুদীদের মিত্র ছিল। তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আবেদন জানাইলেন, ইতোপূর্বে খাযরাজ বংশীয় আনসারদের মিত্রতার জন্য বনূ কায়নুকার ইয়াহুদীদের প্রতি যেইরূপ সদয় আচরণ করা হইয়াছে, এইবার তাঁহাদের পুরাতন মিত্রতার খাতিরে যেন বনূ কুরায়যার প্রতিও সেইরূপ সদয় আচরণ করা হয়। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদেরই এক ব্যক্তিকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব দিলে তাঁহার খুশী হইবে কিনা জিজ্ঞাসা করিলে তাহারা মদীনায় আহত অবস্থায় অবস্থানরত তাহাদের নেতা সা'দ ইব্ন মু'আয (রা)-কে ডাকিল। খাযরাজ বংশীয়গণ তাঁহার প্রতিও তাহাদের পুরাতন বন্ধুদের ব্যাপারে অপেক্ষাকৃত সহজতর সিদ্ধান্ত প্রদানের আবদার জানাইলেন। কিন্তু সা'দ (রা) তাহাদের যুদ্ধক্ষম পুরুষদের সকলকে মৃত্যুদণ্ডের রায় প্রদান করিলেন এবং তদনুযায়ী প্রায় সাত শত বিশ্বাসঘাতক বনু কুরায়যা বংশীয় ইয়াহুদীকে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। তাহাদের নারী ও শিশুরা দাস-দাসীতে পরিণত হয়। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার এই সিদ্ধান্তে সন্তোষ প্রকাশ করিয়া বলেন, সপ্ত আকাশের উপরে আল্লাহ তা'আলার যে ফয়সালা সা'দের সিদ্ধান্তে উহাই প্রতিফলিত হইয়াছে।
ইসলামের মূলোৎপাটনের জন্য বনু কুরায়যার ইয়াহুদীরা যে বিপুল অস্ত্রসম্ভার গড়িয়া তুলিয়াছিল তাহার সবগুলিই মুসলমানদের অধিকার আসে। সেই অস্ত্রভাণ্ডারে ছিল দেড় হাজার তরবারি, দুই হাজার বল্লম, তিন শত বর্ম ও পাঁচ শত ঢাল।
আল্লাহ্র শত্রু বনু কুরায়যার ইয়াহুদীরা এইভাবে তাহাদের বিশ্বাসঘাতকতার ফল লাভ করে। খাল্লাদ ইব্ন সুওয়ায়দ নামক একজন সাহাবী উক্ত অবরোধকালে দুর্গ হইতে যাতা নিক্ষেপের ফলে শহীদ হন এবং উক্কাশা (রা)-এর সহোদর আবূ সিনান ইব্ন মিহসান (রা) স্বাভাবিকভাবে ইনতিকাল করেন। সূরা আহযাবে আল্লাহ তা'আলা এই বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়াছেন (দ্র. আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৩৫২-৩৫৭)।