📄 হুদায়বিয়ার সন্ধি
সন্ধি চুক্তির মাধ্যমে প্রতিরক্ষাকে মজবুত করার এবং বৃহত্তর বিজয়ের পথ সুগম করার সর্বোত্তম নমুনা হইতেছে ৬ষ্ঠ হিজরীতে সম্পাদিত হুদায়বিয়ার সন্ধি। ১৪০০ জন নিবেদিতপ্রাণ সাহাবীকে সঙ্গে করিয়া সেইদিন রাসূলুল্লাহ (স) উমরার উদ্দেশ্যে বাহির হইয়াছিলেন (যিলকদ ৬ হি.)। যুলহুলায়ফা নামক স্থানে পৌঁছিয়া তাঁহারা কুরবানীর পশুসমূহের গলায় কুরবানীর পশুর প্রতীক চিহ্ন লৌহ পাদুকা ঝুলাইয়া দেন, কিন্তু উসফান নামক স্থানে পৌঁছিতেই উমরা করার বিষয়ে কুরায়শদের পরম অনীহার কথা জানিতে পারেন। এই সন্ধির বিস্তারিত বিবরণ প্রদান যেহেতু আমাদের উদ্দেশ্য নহে, কেবল উহার প্রতিরক্ষার গুরুত্বই আমাদের প্রতিপাদ্য, তাই সংক্ষেপে এতটুকু বলা যায় যে, আপাত দৃষ্টিতে উহা মুসলমানদের জন্য নতি স্বীকারমূলক চুক্তি বলিয়া ম'নে হইলেও প্রকৃতপক্ষে এই চুক্তিদ্বারাই সর্বপ্রথম ইসলাম একটি অপরাজেয় শক্তি হিসাবে আরবদের কাছে অনানুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত হয় এবং এই চুক্তি দ্বারাই নিরাপদে ইসলামের বাণী বিশ্বদরবারে পৌঁছাইয়া দেওয়ার মত অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হইয়াছিল। অন্তত পরবর্তী দশ বৎসর কুরায়শদের পক্ষ হইতে আক্রমণের কোন সুযোগ ছিল না, তাই এই সুযোগে রাসূলুল্লাহ (স) তদানীন্তন বৃহত্তম শক্তিদ্বয় রোমক সম্রাট ও পারস্য সম্রাটসহ সভ্যজগত এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার দেশসমূহের রাজন্যবর্গের দরবারে দূত ও পত্র প্রেরণ করিয়া ইসলামের দাওয়াতকে ছাড়াইয়া দিয়াছিলেন। এই চুক্তিই পরবর্তী কালে মাত্র দুই বৎসরের ব্যবধানে বিনা বাধায় মক্কা বিজয়ের পথ সুগম করিয়া দিয়াছিল। আর মক্কা বিজয় হওয়া মাত্র আরবের বিভিন্ন গোত্রের প্রতিনিধিগণ দলে দলে মদীনায় হাযির হইয়া ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিল। হুদায়বিয়ার চুক্তি সম্পাদনের তিনদিন পর মদীনার পথে রওয়ানা হইলে রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি আল-কুরআনের এই আয়াত নাযিল হইল: إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُّبِينًا. “আমি তোমাকে স্পষ্ট বিজয় দান করিয়াছি” (৪৮:১)।
আল্লামা ইন কাছীরের ভাষায়: "এই সন্ধিকে উহার অন্তর্নিহিত মঙ্গলসমূহ ও পরিণতির দিক হইতে আল্লাহ তা'আলা মুসলমানদের জন্য সুস্পষ্ট বিজয় বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছেন। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) বলেন, বিজয় বলিতে তোমরা মক্কা বিজয়কে গণ্য করিয়া থাক. আর আমরা বিজয় বলিতে গণ্য করি হুদায়বিয়ার সন্ধিকে। ইমাম বুখারী হযরত বারাক ইবন 'আযিব (রা)-এর বিবরণে উল্লেখ করেন, তোমরা বিজয় বলিতে মক্কা বিজয়কে গণ্য করিয়া থাক। মক্কা বিজয় একটি বিজয় ছিল তাহাতে সন্দেহ নাই, কিন্তু আমরা বিজয় বলিতে গণ্য করি হুদায়বিয়ার সন্ধির সমমর্যাদার বায়'আতে রিদওয়ানকে” (মুখতাসার তাফসীর ইবন কাছীর, খ. ৩, পৃ. ৩০১)।
এই সময় কুরায়শদের পক্ষ হইতে আক্রমণের আর কোন আশঙ্কা না থাকার রাসূলুল্লাহ (স) নির্বিঘ্নে খায়বার অভিযান করিয়া সেই বিরাট বিজয় ও বিপুল গণীমতের সামগ্রীর অধিকারী হইতে পারিয়াছিলেন যাহা মদীনার মুসলমানদিগের মধ্যে সচ্ছলতা আনিয়া দিয়াছিল। আর অর্থনৈতিক সচ্ছলতা যে প্রতিরক্ষার অন্যতম প্রধান উপাদান উহাও অর্জিত হইয়াছিল।
হুদায়বিয়ার সন্ধি যে সুস্পষ্ট বিজয় ছিল উহার সমর্থনে সাঈদ কুতুব শহীদ লিখেন, “বিজয়ের বিভিন্ন কেন্দ্রের মধ্যে হইতে একটি হইল দাওয়াত তথা ইসলামের প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রে বিজয়। ইমাম যুহরী বলেন, ইসলামের আগমনের পর হুদায়বিয়ার সন্ধি চুক্তির পূর্বে ইহার ন্যায় এত বিরাট বিজয় সংঘটিত হয় নাই। যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হওয়ার লক্ষ্যে বহু লোকের সমাগম হইয়াছিল। অতঃপর যুদ্ধ বন্ধ হইয়া গেল। এক পক্ষের লোকজনের কাছে অপর পক্ষের লোকজনের প্রাণের নিরাপত্তা ছিল। পরিশেষে বাদানুবাদের উভয় পক্ষ মীমাংসায় উপনীত হইয়া সন্ধি চুক্তি স্বাক্ষর করিল। এ সন্ধির পর মক্কা বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত অসংখ্য মুসলিম নর-নারী ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিল যাহাদের সংখ্যা ইতিপূর্বে দীক্ষিত মুসলমানদের সমান বা উহার চাইতে বেশী” (ফী যিলালিল কুরআন, বাংলা অনু., ২৮ খ., পৃ. ১৫৬-১৫৭)।
যুহরীর বক্তব্যই আরও বিশদভাবে উদ্ধৃত করিয়া ইবন হিশাম নিম্নলিখিতভাবে উল্লেখ করেন, “পূর্বে যেখানেই লোকজন সমবেত হইত বা পারস্পরিক সাক্ষাৎ হইত সেখানেই যুদ্ধের সূচনা হইত। এই সন্ধি স্থাপিত হইলে সেই যুদ্ধের অবসান হইল এবং লোকজন একে অপরের হইতে নিরাপত্তাবোধ করিতে লাগিল। তখন পারস্পরিক সাক্ষাতে তাহারা আলাপ-আলোচনা, ভাব বিনিময়, বিতর্ক ও বাদানুবাদের সুযোগ পাইল। যখন কেহ ইসলাম সম্পর্কে কোন কথা বলিত এবং উহা কাহারো বোধগম্য হইয়া যাইত তখনই সে ইসলাম গ্রহণ করিত। ফলে দুই বৎসরে এত অধিক সংখ্যক লোক ইসলাম গ্রহণ করিল যাহা ইতিপূর্বে সামগ্রিকভাবে ইসলাম গ্রহণকারীদের সমান, বরং সেই সংখ্যাকেও অতিক্রম করিয়াছিল।”
ইবন হিশাম বলেন, যুহরীর এই বক্তব্যের যথার্থতার প্রমাণ হইল রাসূলুল্লাহ (স) যখন হুদায়বিয়ার দিকে যাত্রা করেন তখন জাবীর ইবন আবদুল্লাহর ভাষ্য অনুসারে তাঁহার সঙ্গীসাথীর সংখ্যা ছিল চৌদ্দশ। পক্ষান্তরে দুই বৎসর পর মক্কা বিজয়ের সময় যখন তিনি পুনরায় যাত্রা করেন তখন তাঁহার সঙ্গী-সাথীদের সংখ্যা ছিল দশ হাজার (ইফা প্রকাশিত বাংলা ভাষ্য সীরাতুনবী, ৩ খ., পৃ. ৩৩৮-৩৩৯)।
“প্রকৃত তথ্য হইতেছে, সাহাবীগণের জিহাদের বায়'আত এবং মামুলী বাঙ্গানুবাদের পর বিদ্বেষপরায়ণ কাফিররা ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া সন্ধির দিকে ঝুঁকিয়া পড়া এবং নবী করীম (স)-এর যুদ্ধ ও প্রতিশোধ গ্রহণের পূর্ণশক্তি থাকা সত্ত্বেও প্রতিটি ব্যাপারে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ এবং কেবল বায়তুল্লাহর সম্মানার্থে তাহাদের আবদারসমূহ অর্থহীন হওয়া সত্ত্বেও বিন্দুমাত্র উত্তেজিত না হওয়া প্রভৃতি একদিকে আল্লাহর রহমত আকর্ষণের মাধ্যম হইয়াছিল, অপরদিকে শত্রুদের অন্তরে ইসলামের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শক্তি এবং নবী করীম (স)-এর পয়গাম্বরী প্রভাব বিস্তার করিয়া চলিয়াছিল। সত্য কথা এই যে, কেবল মক্কা বিজয় বা খায়বর বিজয়েরই নহে, বরং অনাগত কালের তাবৎ ইসলামী বিজয়সমূহের ভিত্তি এবং সোনালী পূর্বাভাস ছিল এই হুদায়বিয়ায় সন্ধি” (তাফসীরে উছমানী, সূরা ফাতহ-এর তফসীর প্রসঙ্গে, পৃ. ৮৭৪-৭৫)।
অনুরূপ নাজরান চুক্তি এবং বিভিন্ন আরব গোত্রের সহিত সম্পাদিত চুক্তিগুলিও রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতিরক্ষা কৌশলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসাবে গণ্য। ঐ সমস্ত চুক্তির বরখেলাফ করায়ই মক্কা বিজয়, খায়বার বিজয় ও বনূ নাযীর, বনু কায়নুকা প্রভৃতি ইয়াহুদী গোষ্ঠীসমূহের দেশান্তরিতকরণের হেতু হইয়াছিল (আল-ওয়াকিদী, কিতাবুল মাগাযী; আল-বালাযুরী, আনসাব আল-আশরাফ; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া)।
📄 সমুদ্রোপকূলে ইসলামের নূতন প্রতিরক্ষা ঘাঁটি
সাহাবীগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কুরায়শ পক্ষের দাবির কাছে বাহ্যত নতি স্বীকার করিয়া সম্পাদিত হুদায়বিয়ার সন্ধি এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর সেই সন্ধির শর্ত পালনে কড়াকড়ি ও নিষ্ঠার সুফল শীঘ্রই ফলিতে শুরু করে। ছাকীফ গোত্রীয় জনৈক নওমুসলিম যুবক আবূ বসীর ইসলাম গ্রহণ করিয়া মক্কায় কুরায়শদের অত্যাচার হইতে আত্মরক্ষা ও প্রিয়নবীর সহিত মিলনের উদ্দেশ্যে অভিভাবকদের অনুমতি না লইয়াই মদীনায় চলিয়া আসেন। ছাকীফরা ছিল কুরায়শদের চুক্তিবদ্ধ মিত্র, তাই হুদায়বিয়ার সন্ধির শর্তানুসারে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে মক্কায় ফেরৎ পাঠাইয়া দিয়াছিলেন। তাই আযহার ইব্ন আওফ ও আখনাস ইব্ন শুরায়ক তাঁহাকে ফেরৎ পাঠাইবার দাবি জানাইয়া মদীনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পত্র প্রেরণ করে। পত্রের মর্মানুসারে তাহারা বনী আমের গোত্রের একজন লোককে এবং তাহাদের একটি ক্রীতদাসকে তাহার সাথীরূপে প্রেরণ করে। রাসূলুল্লাহ (স) আবূ বসীরকে বলিলেন: يا ابا بصير انا قد اعطينا هؤلاء القوم ما قد علمت ولا يصح لنا في ديننا الغدر وان الله جاعل لك ولمن معك من المستضعفين فرجا ومخرجا فانطلق الى قومك. “হে আবূ বসীর! আমরা ঐ সম্প্রদায়কে যে কথা দিয়াছি (অর্থাৎ তাহাদের সহিত আমরা চুক্তিবদ্ধ হইয়াছি) তাহা তুমি জান। আর ইসলামে বিশ্বাস ভঙ্গের অবকাশ নাই। আল্লাহ তোমার এবং তোমার সাথীদের জন্য অবশ্যই একটা ব্যবস্থা করিয়া দিবেন। সুতরাং তুমি তোমার সম্প্রদায়ের নিকট চলিয়া যাও” (দ্র. হায়কাল, হায়াতু মুহাম্মাদ (আরবী), মিসর ১৫তম সংস্করণ ১৯৬৮, পৃ. ৩৮৪)।
আবূ বসীর অনেক অনুনয়-বিনয় করিয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি আমাকে আবার পৌত্তলিকদের নিকট ফেরৎ পাঠাইবেন? উহারা যে আমাকে ধর্মচ্যুত করিয়া ফেলিবে! কিন্তু আল্লাহর রাসূল একাধিকবার তাঁহার ঐ কথারই পুনরুক্তি করিয়া তাহাকে আশ্রয় দানে তাঁহার নীতিগত অসামর্থ্যের কথা জানাইলেন। অগত্যা আবূ বসীর ঐ দুই ব্যক্তির সহিত প্রস্থান করিলেন। যুল-হুলায়ফায় পৌঁছিয়া তিনি অত্যন্ত চাতুর্যের সহিত সঙ্গীটিকে তাঁহার চমৎকার তরবারিটি একবার দেখিতে দিতে অনুরোধ করিলেন। সঙ্গীটি তরবারি তাঁহার হাতে তুলিয়া দিতেই তিনি উহার দ্বারা তাহাকে হত্যা করেন। সঙ্গী ক্রীতদাসটি ভয়ে পালাইয়া মদীনায় গিয়া উপস্থিত হইল। রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে ভীত-সন্ত্রস্তভাবে উপস্থিত হইয়া সে আরয করিল, আপনার লোকটি আমার সঙ্গীকে হত্যা করিয়া ফেলিয়াছে। এমনি সময় উন্মুক্ত তরবারি হাতে আবূ বসীরও সেখানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) কোন মন্তব্য করার পূর্বেই তিনি বলিলেন: يا رسول الله وقت ذمتك وادي الله عنك اسلمتنى بيد القوم وقد امتنعت بديني ان افتن فيه أو يعبث بي. “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আপনার সন্ধির শর্ত পূরণ করিয়াছেন এবং আল্লাহ তা'আলা আপনাকে দায়িত্বমুক্ত করিয়াছেন। আপনি যথারীতি আমাকে তাহাদের হাতে অর্পণ করিয়াছেন। আমি ধর্মচ্যুতির ফিৎনা ও তাহাদের নির্যাতনের পাশবিক ব্যবহার হইতে আত্মরক্ষা করিয়াছি" (ইবন হিশাম, সীরাত, ৩য় খ., পৃ. ২২০-২১)।
আবূ বসীর তৎক্ষণাৎ প্রস্থান করিলেন এবং সমুদ্র উপকূলবর্তী ঈস নামক স্থানে অবস্থান করিলেন। উহা ছিল কুরায়শদের সিরিয়ায় বাণিজ্য যাত্রার পথ। সন্ধিমতে কোন পক্ষই এই পথ রোধ করিতে পারিতেন না। মক্কায় এই খবর পৌঁছিতেই সেখানকার অত্যাচারিত মুসলমানগণ আসিয়া তাঁহার নেতৃত্বে ঈসে একত্র হইতে থাকিলেন। দেখিতে দেখিতে সত্তরজনের একটি দল জুটিয়া গেল। প্রতিটি কুরায়শ কাফেলার উপর তাহারা আক্রমণ চালাইয়া তাহাদের বাণিজ্য-সম্ভার লুণ্ঠন এবং তাহাদের লোকজনকে হত্যা করিতে শুরু করিলেন।
এতদিন পর্যন্ত কুরায়শরা তাহাদের উপর যে অকথ্য নির্যাতন চালাইয়াছে, যেইভাবে নিজেরাই জেদ ধরিয়া মক্কা হইতে পলাতক মুসলমানগণের মদীনার আশ্রয় চাওয়ার পথ চুক্তিদ্বারা রুদ্ধ করিয়া দিয়াছে, এখন আর তাহাদের বলার মতও কিছুই ছিল না। কেননা রাসূলুল্লাহ (স) এই ব্যাপারে তাঁহার দায়িত্ব যথারীতি পালন করিয়াছেন। মক্কায় যে নির্যাতিত মুসলমানগণ চুক্তির বাহিরে অবস্থান করিতেছিলেন তাহাদিগকে এইভাবে অত্যাচারিত হইয়া মরিতে বা ধর্মত্যাগ করিতে সুযোগ দেওয়ারও কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ ছিল না। এইদিকে সিরিয়ার বাণিজ্যপথ রুদ্ধ হইলে তাহাদেরও বাঁচিয়া থাকার পথ রুদ্ধ হইয়া যায়। এই পথটিকে ঝুঁকিমুক্ত রাখার জন্যই তো তাহারা মদীনার মুসলমানদের বিরুদ্ধে এত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করিয়াছে। চুক্তির দ্বারা উহা মুক্ত হইয়াছিল বটে কিন্তু এখন তো আবূ বসীর ও তাঁহার সঙ্গী-সাথীরা অপ্রতিরোধ্য এক নূতন শক্তিরূপে দেখা দিয়াছে। ইসলামের এক নূতন রক্ষাব্যূহ সৃষ্টি হইয়াছে যাহা পূর্বেকার ঝুঁকি হইতে কোনমতেই কম বিপজ্জনক নহে। অগত্যা তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর কৃপাদৃষ্টি আকর্ষণ করিয়া মদীনায় দূত পাঠাইল। আত্মীয়তার দোহাই দিয়া তাহারা তাহাদের বাঁচিবার তাগিদে আবু বসীর তথা তাবৎ মক্কাবাসী নির্যাতিত মুসলমানগণকে মদীনায় ডাকাইয়া লইবার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ফরিয়াদ জানাইল। মানবতার নবী মানবিক কারণে তাহাদের সেই আবেদনে সাড়া দিয়া আবূ বসীর ও মক্কাবাসী তাবৎ মুসলমানগণকে মদীনায় ডাকিয়া পাঠাইলেন। এইভাবে স্বয়ং কুরায়শদের আবেদনে হুদায়বিয়া চুক্তির একটি শর্ত বিলুপ্ত করিয়া তাহাদের সিরিয়ার বাণিজ্যপথ নিরাপদ করিয়া দেওয়া হইল (হায়াতে মুহাম্মাদ, আরবী, পৃ. ৩৮৪-৮৫)।
📄 অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা
মদীনায় হিজরত, আনসার-মুহাজিরের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন সৃষ্টি, মদীনার আশেপাশে বসবাসকারী বিভিন্ন গোত্রের সহিত সমঝোতা সৃষ্টি, সর্বোপরি মদীনার প্রভাবশালী ইয়াহুদী গোত্রসমূহ ও পৌত্তলিকদের সহিত মদীনা সনদ সম্পাদনের পর জিহাদ সংক্রান্ত নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়:
أُذِنَ لِلَّذِينَ يُقَاتَلُونَ بِأَنَّهُمْ ظُلِمُوا وَإِنَّ اللَّهَ عَلَى نَصْرِهِمْ لَقَدِيرُ الَّذِينَ أُخْرِجُوا مِنْ دِيَارِهِمْ بِغَيْرِ حَقٌّ إِلا أَنْ يَقُولُوا رَبُّنَا اللهُ وَلَوْلا دَفْعُ اللَّهِ النَّاسَ بَعْضَهُمْ بِبَعْضٍ لَهُدِّمَتْ صَوَامِعُ وَبِيَعٌ وَصَلَوَاتٌ وَمَسَاجِدُ يُذْكَرُ فِيهَا اسْمُ الله كَثِيرًا وَلَيَنْصُرَنَّ اللَّهُ مَنْ يَنْصُرُهُ إِنَّ اللهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ.
"যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হইল তাহাদিগকে যাহারা আক্রান্ত হইয়াছে; কারণ তাহাদের প্রতি অত্যাচার করা হইয়াছে। আল্লাহ নিশ্চয়ই তাহাদিগকে সাহায্য করিতে সম্যক সক্ষম। তাহাদিগকে তাহাদের ঘর-বাড়ি হইতে অন্যায়ভাবে বহিষ্কার করা হইয়াছে শুধু এই কারণে যে, তাহারা বলে: 'আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ'। আল্লাহ যদি মানব জাতির এক দলকে অন্য দল দ্বারা প্রতিহত না করিতেন, তাহা হইলে বিধ্বস্ত হইয়া যাইত খৃস্টান সংসারবিরাগীদের উপাসনা স্থান, গির্জা, ইয়াহুদীদের উপাসনালয় এবং মসজিদসমূহ-যাহাতে অধিক স্মরণ করা হয় আল্লাহ্র নাম। আল্লাহ নিশ্চয়ই তাহাকে সাহায্য করেন যে তাঁহাকে সাহায্য করে। আল্লাহ নিশ্চয়ই শক্তিমান, পরাক্রমশালী" (২২: ৩৯-৪০)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হইতেছে আল-কুরআনের নির্দেশনা ভিত্তিক জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ বা আল্লাহর পথে জিহাদ।
মক্কার কুরায়শরা যখন লক্ষ্য করিল যে, তাহাদের সমস্ত ষড়যন্ত্রকে ব্যর্থ করিয়া দিয়া রাসূলুল্লাহ (স) ও সাহাবীগণ মদীনার মত এমন একটি স্থানে গিয়া একত্র হইয়াছেন যাহা তাহাদের সিরিয়াগামী বাণিজ্য পথের নিকটবর্তী। ইহা ছাড়া মদীনায়ও তাহারা একান্তই বাস্তহারা ও আশ্রিত নহেন, মদীনা সনদ ও সিরিয়াগামী বাণিজ্য পথের নিকটবর্তী গোত্রসমূহের সহিত সন্ধিচুক্তি করিয়া তাহারা সেখানকার কর্তৃত্বভার গ্রহণ করিয়া একটি সাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন তখন তাহাদের উৎকণ্ঠার সীমা রহিল না। অঙ্কুরেই এই উদীয়মান শক্তিকে নির্মূল না করিলে তাহাদের ভবিষ্যত অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ভাবিয়া তাহারা সেইভাবেই অগ্রসর হইতে লাগিল। তাহারা জানিত, মদীনার আওস ও খাযরাজ গোত্রীয়রা পারস্পরিক দ্বন্দ্বের অবসান ঘটাইয়া আবদুল্লাহ ইবন উবায়্যিকে তাহাদের একচ্ছত্র সর্বাধিনায়করূপে গ্রহণ করার উদ্যোগ গ্রহণ করিয়াছিল। তাই তাহারা ঐ নেতাকেই সম্বোধন করিয়া পত্র লিখিল:
انكم اويتم صاحبداوانا نقسم بالله اتقاتلنه او تخرجنه او اسيرن اليكم باجمعنا حتى نقتل مقاتلتكم ونستبح نسائكم .
"তোমরা আমাদের লোককে আশ্রয় দিয়াছ। আল্লাহ্র কসম! হয় তোমরা নিজেরা তাহাকে হত্যা করিবে কিংবা তাহাকে মদীনা হইতে বহিষ্কার করিবে। অন্যথায় আমরা সংঘবদ্ধভাবে তোমাদের উপর আক্রমণ চালাইব, তোমাদেরকে হত্যা করিয়া তোমাদের নারীদিগকে আমাদের ভোগদখলে লইয়া আসিব” (সুনান আবূ দাউদ, খ. ২, পৃ. ৬৭)।
যদিও রাসূলুল্লাহ (স) বা তদীয় অনুসারী মুসলমানগণকে হত্যা করা বা মদীনা হইতে বহিষ্কার করিয়া দেওয়ার ক্ষমতা তখন আর মুনাফিক নেতা আবদুল্লহ ইবন উবায়্যির ছিল না, তবুও মক্কাবাসীদের নিকট হইতে এইরূপ পত্র পাইয়া তাহার উন্নাসিকতা ও ঔদ্ধত্য বৃদ্ধি পাইয়াছিল যাহার উল্লেখ ইতোপূর্বেই করা হইয়াছে। তাহার আত্মীয়-স্বজনের অনেকেই তখন ইসলাম গ্রহণ করিয়া নিষ্ঠাবান মুসলমান হিসাবে জীবন যাপন করিতেছিলেন। তাই রাসূলুল্লাহ (স) যখন তাহার নিকট উপস্থিত হইয়া তাহাকে বুঝাইয়া বলিলেন, তুমি কি তোমার আত্মীয়-পরিজনের সহিত যুদ্ধে অবতীর্ণ হইবে তখন সে ব্যাপারটি সম্পর্কে বুঝিতে পারিয়া এইরূপ কোন উদ্যোগ গ্রহণ হইতে বিরত থাকিতে বাধ্য হয় (দ্র. শিবলী, সীরাতুন্নবী, ১খ., পৃ. ৩০৫-৩০৬)।
কিন্তু কুরায়শরা তাহাদের পরিকল্পনা মত প্রস্তুতি গ্রহণ করিতে থাকে এবং যে কোন প্রকারেই মুসলমানদের ক্ষতি করার সুযোগ খুঁজিতে থাকে। তাহাদের একজন সর্দার কুরয ইব্ন ফিহর মদীনার উপকণ্ঠে পৌছিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর পশুপাল লুট করিয়া লইয়া যায়। অবশ্য যথারীতি তাহার পশ্চাদ্ধাবন করা হইয়াছিল। কা'বা ঘরের খাদেম হওয়ার দরুন তাহাদের যে গুরুত্ব গোটা আরবে স্বীকৃত ছিল ইসলাম ও ইসলামের নবীর বিরুদ্ধে সমগ্র আরবদেশ জুড়িয়া তাহারা অপপ্রচারে সেই প্রভাবকে ব্যবহার করিয়া মুসলমানদের বিরুদ্ধে সকল গোত্রকে ক্ষেপাইয়া তোলে। চরম উৎকণ্ঠায় মুসলমানদিগকে দিনের বেলায় তো বটেই রাত্রি বেলায়ও সশস্ত্র অবস্থায় কাটাইতে হইত। কুরআনুল করীমে সেই উৎকণ্ঠার সময়টির বর্ণনা রহিয়াছে এইভাবেঃ
وَاذْكُرُوا إِذْ أَنْتُمْ قَلِيلٌ مُسْتَضْعَفُونَ فِي الْأَرْضِ تَخَافُونَ أَنْ يُتَخَطَّفَكُمُ النَّاسُ فَأَوكُمْ وَأَيَّدَكُمْ بِنَصْرِهِ وَرَزَقَكُمْ مِّنَ الطَّيِّبَاتِ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ .
"স্মরণ কর, তোমরা ছিলে স্বল্প সংখ্যক, পৃথিবীতে তোমরা দুর্বলরূপে পরিগণিত হইতে। তোমরা আশঙ্কা করিতে যে, লোকেরা তোমাদিগকে অকস্মাৎ ছোঁ মারিয়া ধরিয়া লইয়া যাইবে। অতঃপর তিনি তোমাদিগকে আশ্রয় দেন, স্বীয় সাহায্য দ্বারা তোমাদিগকে শক্তিশালী করেন এবং তোমাদিগকে উত্তম বস্তুসমূহ জীবিকারূপে দান করেন, যাহাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হও” (৮:২৬)।
মোটকথা, নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য সর্বদিক হইতেই তখন মুসলমানদের জন্য যুদ্ধ অপরিহার্য হইয়া উঠিয়াছিল। ঠিক এই পরিস্থিতিতেই আল্লাহ তা'আলা জিহাদের আয়াত নাযিল করিয়া তাঁহাদিগকে আঘাতের জবাবে প্রত্যাঘাত করিয়া নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণের অনুমতি দান করিলেন।
📄 বনূ কায়নুকা'র বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ
ইবন ইসহাক বলেন, আমাকে 'আসিম ইব্ন 'আমর ইব্ন কাতাদা এই তথ্য অবহিত করেন যে, বনু কায়নুকা' ইয়াহুদীদের প্রথম সম্প্রদায় যাহারা তাহাদের ও রাসূলুল্লাহ (স)-এর মধ্যকার চুক্তি ভঙ্গ করিয়া বদর ও উহুদ যুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। ইবন হিশামের বর্ণনা হইতে জানা যায় যে, জনৈকা আরব মহিলা কিছু জিনিস লইয়া বনূ কায়নুকা'র বাজারে যান এবং সেখানে তাহা বিক্রয় করিয়া জনৈক ইয়াহুদী স্বর্ণকারের দোকানে বসেন। মওলানা আকরম খাঁ উল্লেখ করেন যে, ইয়াহুদীগণ কর্তৃক উত্যক্ত হইয়া তিনি ঐ দোকানে আশ্রয় লইয়াছিলেন। ইয়াহুদীরা তাহার মুখের অবগুণ্ঠন খুলিতে বলিলে মহিলাটি তাহাতে সম্মত হইলেন না। স্বর্ণকার মহিলাটির চাদরের এক কোণা দোকানের খুঁটির সহিত বাঁধিয়া দেয়। নরাধমরা মজা দেখিবার জন্য একটু দূরে সরিয়া দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ পর দুর্বৃত্তরা সরিয়া পড়িয়াছে মনে করিয়া মহিলাটি উঠিতে চাহিলে তাহার গায়ের চাদরখানি খসিয়া পড়িল। এই ভদ্র মহিলাকে বিবস্ত্র হইতে দেখিয়া তাহারা হাসিয়া উঠে এবং করতালি দিতে থাকে। মহিলাটি লজ্জা ও ক্ষোভে মৃতপ্রায় হইয়া নিজেকে রক্ষার জন্য আর্তনাদ করিয়া উঠিলে জনৈক মুসলিম তরবারি হস্তে ছুটিয়া আসেন। ইয়াহুদীরা তাহাকে হত্যা করে এবং তাহার হাতেও তাহাদের একজন নিহত হয়। মুসলিম সমাজে স্বভাবতই ইহার দারুণ প্রতিক্রিয়া হয়।
আবূ দাউদের বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ (স) ইয়াহুদীদের বাজারে গিয়া তাহাদিগকে সতর্ক হওয়ার আহবান জানাইলেন। নতুবা তাহাদের অবস্থাও যে বদরে বিপর্যস্ত কুরায়শদের অনুরূপ হইতে পারে তাহাও জানাইয়া দিলেন। ইয়াহুদীরা তাঁহাকে পাল্টা চ্যালেঞ্জ করিয়া বলে, মুসলমানগণ যুদ্ধে কতিপয় অনভিজ্ঞ কুরায়শ হত্যা করিয়াছে বলিয়া গর্বিত হওয়ার কারণ নাই। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাদের আচরণে হতাশ হইয়া ফিরিয়া আসিলেন। ইয়াহুদীরা উত্তমরূপে দুর্গের দরজা বন্ধ করিয়া এই ভাবিয়া অপেক্ষা করিতে লাগিল যে, মক্কার কুরায়শদের আক্রমণে অচিরেই মুসলমানগণ দিশাহারা হইয়া পালাইয়া যাইবে। দীর্ঘ ১৫ দিন পর্যন্ত দুর্গ অবরোধের পর ও যখন তাহাদের সেই প্রত্যাশিত মক্কার কুরায়শদের সাহায্য আসিল না তখন তাহারা আত্মসমর্পণ করিয়া ধনসম্পদ ও অস্ত্রশস্ত্র মদীনায় রাখিয়াই বসতবাড়ি ত্যাগের অনুমতি ভিক্ষা করিল। তখনকার প্রচলিত প্রথানুসারে তিনি উহাদের সকলকে গুরুতর দণ্ডে দণ্ডিত না করিয়া তাহাদের প্রস্তাবে সম্মতি জানাইলেন। কেবল সম্মতিই নহে, সাহাবী উবাদা ইন্সুস সামিতকে তাহাদের যাত্রার সুব্যবস্থার জন্য নিয়োগ করিলেন। পূর্বে এই বনু কায়নুকার সহিত তাঁহার সৌহার্দ্যমূলক সম্পর্ক ছিল। ইহা ছাড়া মদীনা ত্যাগের জন্য তাহাদিগকে তিন দিনের অবকাশও দেওয়া হইল। এইভাবে ইয়াহুদীদের মুসলমানদিগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিবার জন্য প্রস্তুতকৃত অস্ত্রশস্ত্র ও রণসম্ভার মুসলমানদের হস্তগত হয়। বনু কায়নুকার সাত শত যুদ্ধবাজ সৈনিক, যাহাদের অধিকাংশই ছিল স্বর্ণকার ও দোকানদার, তাহাদের অস্থাবর সম্পত্তিসহ সিরিয়ার দিকে পাড়ি জমাইল। এইভাবে বিদ্রোহ ও চুক্তিভঙ্গের জন্য যাহারা মুত্যুদণ্ডের অপেক্ষা করিতেছিল তাহারা নিরাপদে ইয়াছরিব ত্যাগে সক্ষম হয় (দ্র. ইবন হিশাম, সীরাতুননবী, ৩খ., পৃ. ৫-৮; মোস্তফা চরিত, পৃ. ৬৩৮-৬৪০; যাদুল মা'আদ, ১খ., পৃ. ৩৪৮, আবুল হাসান আলী নদভী, আস্-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, আরবী, পৃ. ১৯৫)।
প্রাচ্যবিদ মন্টগোমারী ওয়াট মনে করেন, ইয়াহুদীদের ঐ বহিষ্কারের মূলে ছিল ইয়াহুদীদের মদীনার সমাজ জীবনে মিশিয়া না যাওয়া। ইহা ছাড়া মুসলমানদের প্রতিদ্বন্দ্বী মক্কার কুরায়শদের সহিত তাহাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথারও হয়তো মুহাম্মাদ (স) অবগত ছিলেন যাহা ছিল মুসলমান ও ইয়াহুদীদের চুক্তির পরিপন্থী (দ্র. নবীয়ে রহমত, পৃ. ২৪০, পাদটীকা)।