📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মদীনা সনদ ও অন্যান্য সন্ধিচুক্তি

📄 মদীনা সনদ ও অন্যান্য সন্ধিচুক্তি


যেই রাষ্ট্র বা জাতি ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক দিক দিয়া সুসংহত নয়, ইহার আত্মরক্ষা করা কঠিন হইয়া পড়ে। সেই সময় মদীনার জনসংখ্যা ছিল তিন সম্প্রদায়ের, যথাঃ মুসলিম, ইয়াহুদী ও মুশরিক। ইসলাম গ্রহণ করিবার পর মুসলিমগণের সংখ্যা বৃদ্ধি পাইলেও ইয়াহুদী ও মুশরিক সম্প্রদায় ছিল শক্তিশালী। মদীনা নগরীর চারিপাশে ছিল ইয়াহুদী জনবসতি। তাহারা মদীনার রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করিতে সদা সচেষ্ট ছিল। মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় তাহারা ইব্‌ন উবাইয়ের নেতৃত্বে নিজেদের গোত্রীয় প্রভাব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নতুন নতুন ষড়যন্ত্রের জাল বুনাইতেছিল। মক্কার কুরায়শগণও মদীনার মুসলিম ও ইয়াহুদীদের দুর্বল সম্পর্ককে সুযোগ হিসাবে গ্রহণ করিয়াছিল। ইয়াহুদীদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও গোত্রীয় রেষারেষি তাহাদিগকে দুর্বল করিয়া ফেলিয়াছিল। তাহারা নিজেদের মধ্যে বারংবার যুদ্ধে লিপ্ত হইত। ইয়াহুদী গোত্র বানু কায়নুকা, বানু নাযীর ও বানু কুরায়যা ইয়াসরিবে (মদীনা) বসবাস করিত। বানু কায়নুকা ও বানু নাযীর বনূ খাযরাজ গোত্রের মিত্র ছিল। বানু কুরায়যা বানূ আওস গোত্রের মিত্র ছিল। এই মিত্রতা ও রেষারেষির ফলে তাহারা একে অন্যের সহিত যুদ্ধে লিপ্ত হইত। এই কারণে ইয়াসরিবে একটি কেন্দ্রীয় শাসন প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হইতেছিল (আবু যাহরা, খাতিমুন নাবিয়্যীন, পৃ. ২৪৫)।
এই প্রেক্ষাপটে রাসূলুল্লাহ (স) একটি সর্বাত্মক সনদ প্রণয়ন করেন। এই সনদে মদীনার সকল সম্প্রদায়ের লোক স্বতস্ফুর্তভাবে অংশগ্রহণ করে। ইয়াহুদী গোত্রগুলিও এই সনদে শামিল ছিল। ইব্‌ন ইসহাক তাঁহার সীরাত গ্রন্থে সনদটির বিবরণ সবিস্তারে উল্লেখ করিয়াছেন। এই সনদে মোট ৫৩টি অনুচ্ছেদ ছিল। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক, অভ্যন্তরীণ শান্তি ও সংহতি প্রতিষ্ঠা করাই ছিল এই সনদের মৌলিক উদ্দেশ্য (সীরাত ইবন হিশাম, ২খ, পৃ. ৫০১-৫০৬)। ইয়াহুদীগণ তাহাদের ধর্ম পালনের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে। যুদ্ধ ও শান্তি সংক্রান্ত বিষয়ে তাহারা মুসলমানদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ থাকিবে এবং মক্কার কুরায়শদের বিরুদ্ধে মুসলমানদেরকে সর্বাত্মকভাবে সাহায্য করিবে, এই মর্মে তাহারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩খ, পৃ. ২৭৭-২৭৮)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মদীনা চুক্তির প্রতিরক্ষা তাৎপর্য

📄 মদীনা চুক্তির প্রতিরক্ষা তাৎপর্য


মদীনা চুক্তিতে এমন সব বিষয় অন্তর্ভূক্ত ছিল যাহার ভিত্তিতে একটি সুসংহত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হইতে পারিত। এই চুক্তি মদীনার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করিয়াছিল। সনদে মুসলিম ও অমুসলিমদের দায়িত্ব ও কর্তব্যগুলিকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করা হইয়াছিল। ইয়াহুদীগণ তাহাদের ধর্ম পালন করিতে পারিবে, তবে তাহারা স্বীয় ধর্মের মূলনীতিগুলি পরিবর্তন করিতে পারিবে না। যুদ্ধ ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় তাহারা মুসলমানদের সহযোগী হইবে। সনদে এই কথাও উল্লেখ ছিল যে, কুরায়শদের সাথে চুক্তিভুক্ত কোন লোকের সহিত তাহারা কোন প্রকার সম্পর্ক স্থাপন করিতে পারিবে না। ইহা ছিল মদীনার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি (আবুল আলা মওদূদী, সীরাতে সারওয়ারে আলম, ৪খ, পৃ. ৭১-৭৬)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হুদায়বিয়ার সন্ধি

📄 হুদায়বিয়ার সন্ধি


সন্ধি চুক্তির মাধ্যমে প্রতিরক্ষাকে মজবুত করার এবং বৃহত্তর বিজয়ের পথ সুগম করার সর্বোত্তম নমুনা হইতেছে ৬ষ্ঠ হিজরীতে সম্পাদিত হুদায়বিয়ার সন্ধি। ১৪০০ জন নিবেদিতপ্রাণ সাহাবীকে সঙ্গে করিয়া সেইদিন রাসূলুল্লাহ (স) উমরার উদ্দেশ্যে বাহির হইয়াছিলেন (যিলকদ ৬ হি.)। যুলহুলায়ফা নামক স্থানে পৌঁছিয়া তাঁহারা কুরবানীর পশুসমূহের গলায় কুরবানীর পশুর প্রতীক চিহ্ন লৌহ পাদুকা ঝুলাইয়া দেন, কিন্তু উসফান নামক স্থানে পৌঁছিতেই উমরা করার বিষয়ে কুরায়শদের পরম অনীহার কথা জানিতে পারেন। এই সন্ধির বিস্তারিত বিবরণ প্রদান যেহেতু আমাদের উদ্দেশ্য নহে, কেবল উহার প্রতিরক্ষার গুরুত্বই আমাদের প্রতিপাদ্য, তাই সংক্ষেপে এতটুকু বলা যায় যে, আপাত দৃষ্টিতে উহা মুসলমানদের জন্য নতি স্বীকারমূলক চুক্তি বলিয়া ম'নে হইলেও প্রকৃতপক্ষে এই চুক্তিদ্বারাই সর্বপ্রথম ইসলাম একটি অপরাজেয় শক্তি হিসাবে আরবদের কাছে অনানুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত হয় এবং এই চুক্তি দ্বারাই নিরাপদে ইসলামের বাণী বিশ্বদরবারে পৌঁছাইয়া দেওয়ার মত অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হইয়াছিল। অন্তত পরবর্তী দশ বৎসর কুরায়শদের পক্ষ হইতে আক্রমণের কোন সুযোগ ছিল না, তাই এই সুযোগে রাসূলুল্লাহ (স) তদানীন্তন বৃহত্তম শক্তিদ্বয় রোমক সম্রাট ও পারস্য সম্রাটসহ সভ্যজগত এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার দেশসমূহের রাজন্যবর্গের দরবারে দূত ও পত্র প্রেরণ করিয়া ইসলামের দাওয়াতকে ছাড়াইয়া দিয়াছিলেন। এই চুক্তিই পরবর্তী কালে মাত্র দুই বৎসরের ব্যবধানে বিনা বাধায় মক্কা বিজয়ের পথ সুগম করিয়া দিয়াছিল। আর মক্কা বিজয় হওয়া মাত্র আরবের বিভিন্ন গোত্রের প্রতিনিধিগণ দলে দলে মদীনায় হাযির হইয়া ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিল। হুদায়বিয়ার চুক্তি সম্পাদনের তিনদিন পর মদীনার পথে রওয়ানা হইলে রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি আল-কুরআনের এই আয়াত নাযিল হইল: إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُّبِينًا. “আমি তোমাকে স্পষ্ট বিজয় দান করিয়াছি” (৪৮:১)।

আল্লামা ইন কাছীরের ভাষায়: "এই সন্ধিকে উহার অন্তর্নিহিত মঙ্গলসমূহ ও পরিণতির দিক হইতে আল্লাহ তা'আলা মুসলমানদের জন্য সুস্পষ্ট বিজয় বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছেন। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) বলেন, বিজয় বলিতে তোমরা মক্কা বিজয়কে গণ্য করিয়া থাক. আর আমরা বিজয় বলিতে গণ্য করি হুদায়বিয়ার সন্ধিকে। ইমাম বুখারী হযরত বারাক ইবন 'আযিব (রা)-এর বিবরণে উল্লেখ করেন, তোমরা বিজয় বলিতে মক্কা বিজয়কে গণ্য করিয়া থাক। মক্কা বিজয় একটি বিজয় ছিল তাহাতে সন্দেহ নাই, কিন্তু আমরা বিজয় বলিতে গণ্য করি হুদায়বিয়ার সন্ধির সমমর্যাদার বায়'আতে রিদওয়ানকে” (মুখতাসার তাফসীর ইবন কাছীর, খ. ৩, পৃ. ৩০১)।

এই সময় কুরায়শদের পক্ষ হইতে আক্রমণের আর কোন আশঙ্কা না থাকার রাসূলুল্লাহ (স) নির্বিঘ্নে খায়বার অভিযান করিয়া সেই বিরাট বিজয় ও বিপুল গণীমতের সামগ্রীর অধিকারী হইতে পারিয়াছিলেন যাহা মদীনার মুসলমানদিগের মধ্যে সচ্ছলতা আনিয়া দিয়াছিল। আর অর্থনৈতিক সচ্ছলতা যে প্রতিরক্ষার অন্যতম প্রধান উপাদান উহাও অর্জিত হইয়াছিল।

হুদায়বিয়ার সন্ধি যে সুস্পষ্ট বিজয় ছিল উহার সমর্থনে সাঈদ কুতুব শহীদ লিখেন, “বিজয়ের বিভিন্ন কেন্দ্রের মধ্যে হইতে একটি হইল দাওয়াত তথা ইসলামের প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রে বিজয়। ইমাম যুহরী বলেন, ইসলামের আগমনের পর হুদায়বিয়ার সন্ধি চুক্তির পূর্বে ইহার ন্যায় এত বিরাট বিজয় সংঘটিত হয় নাই। যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হওয়ার লক্ষ্যে বহু লোকের সমাগম হইয়াছিল। অতঃপর যুদ্ধ বন্ধ হইয়া গেল। এক পক্ষের লোকজনের কাছে অপর পক্ষের লোকজনের প্রাণের নিরাপত্তা ছিল। পরিশেষে বাদানুবাদের উভয় পক্ষ মীমাংসায় উপনীত হইয়া সন্ধি চুক্তি স্বাক্ষর করিল। এ সন্ধির পর মক্কা বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত অসংখ্য মুসলিম নর-নারী ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিল যাহাদের সংখ্যা ইতিপূর্বে দীক্ষিত মুসলমানদের সমান বা উহার চাইতে বেশী” (ফী যিলালিল কুরআন, বাংলা অনু., ২৮ খ., পৃ. ১৫৬-১৫৭)।

যুহরীর বক্তব্যই আরও বিশদভাবে উদ্ধৃত করিয়া ইবন হিশাম নিম্নলিখিতভাবে উল্লেখ করেন, “পূর্বে যেখানেই লোকজন সমবেত হইত বা পারস্পরিক সাক্ষাৎ হইত সেখানেই যুদ্ধের সূচনা হইত। এই সন্ধি স্থাপিত হইলে সেই যুদ্ধের অবসান হইল এবং লোকজন একে অপরের হইতে নিরাপত্তাবোধ করিতে লাগিল। তখন পারস্পরিক সাক্ষাতে তাহারা আলাপ-আলোচনা, ভাব বিনিময়, বিতর্ক ও বাদানুবাদের সুযোগ পাইল। যখন কেহ ইসলাম সম্পর্কে কোন কথা বলিত এবং উহা কাহারো বোধগম্য হইয়া যাইত তখনই সে ইসলাম গ্রহণ করিত। ফলে দুই বৎসরে এত অধিক সংখ্যক লোক ইসলাম গ্রহণ করিল যাহা ইতিপূর্বে সামগ্রিকভাবে ইসলাম গ্রহণকারীদের সমান, বরং সেই সংখ্যাকেও অতিক্রম করিয়াছিল।”

ইবন হিশাম বলেন, যুহরীর এই বক্তব্যের যথার্থতার প্রমাণ হইল রাসূলুল্লাহ (স) যখন হুদায়বিয়ার দিকে যাত্রা করেন তখন জাবীর ইবন আবদুল্লাহর ভাষ্য অনুসারে তাঁহার সঙ্গীসাথীর সংখ্যা ছিল চৌদ্দশ। পক্ষান্তরে দুই বৎসর পর মক্কা বিজয়ের সময় যখন তিনি পুনরায় যাত্রা করেন তখন তাঁহার সঙ্গী-সাথীদের সংখ্যা ছিল দশ হাজার (ইফা প্রকাশিত বাংলা ভাষ্য সীরাতুনবী, ৩ খ., পৃ. ৩৩৮-৩৩৯)।

“প্রকৃত তথ্য হইতেছে, সাহাবীগণের জিহাদের বায়'আত এবং মামুলী বাঙ্গানুবাদের পর বিদ্বেষপরায়ণ কাফিররা ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া সন্ধির দিকে ঝুঁকিয়া পড়া এবং নবী করীম (স)-এর যুদ্ধ ও প্রতিশোধ গ্রহণের পূর্ণশক্তি থাকা সত্ত্বেও প্রতিটি ব্যাপারে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ এবং কেবল বায়তুল্লাহর সম্মানার্থে তাহাদের আবদারসমূহ অর্থহীন হওয়া সত্ত্বেও বিন্দুমাত্র উত্তেজিত না হওয়া প্রভৃতি একদিকে আল্লাহর রহমত আকর্ষণের মাধ্যম হইয়াছিল, অপরদিকে শত্রুদের অন্তরে ইসলামের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শক্তি এবং নবী করীম (স)-এর পয়গাম্বরী প্রভাব বিস্তার করিয়া চলিয়াছিল। সত্য কথা এই যে, কেবল মক্কা বিজয় বা খায়বর বিজয়েরই নহে, বরং অনাগত কালের তাবৎ ইসলামী বিজয়সমূহের ভিত্তি এবং সোনালী পূর্বাভাস ছিল এই হুদায়বিয়ায় সন্ধি” (তাফসীরে উছমানী, সূরা ফাতহ-এর তফসীর প্রসঙ্গে, পৃ. ৮৭৪-৭৫)।

অনুরূপ নাজরান চুক্তি এবং বিভিন্ন আরব গোত্রের সহিত সম্পাদিত চুক্তিগুলিও রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতিরক্ষা কৌশলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসাবে গণ্য। ঐ সমস্ত চুক্তির বরখেলাফ করায়ই মক্কা বিজয়, খায়বার বিজয় ও বনূ নাযীর, বনু কায়নুকা প্রভৃতি ইয়াহুদী গোষ্ঠীসমূহের দেশান্তরিতকরণের হেতু হইয়াছিল (আল-ওয়াকিদী, কিতাবুল মাগাযী; আল-বালাযুরী, আনসাব আল-আশরাফ; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সমুদ্রোপকূলে ইসলামের নূতন প্রতিরক্ষা ঘাঁটি

📄 সমুদ্রোপকূলে ইসলামের নূতন প্রতিরক্ষা ঘাঁটি


সাহাবীগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কুরায়শ পক্ষের দাবির কাছে বাহ্যত নতি স্বীকার করিয়া সম্পাদিত হুদায়বিয়ার সন্ধি এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর সেই সন্ধির শর্ত পালনে কড়াকড়ি ও নিষ্ঠার সুফল শীঘ্রই ফলিতে শুরু করে। ছাকীফ গোত্রীয় জনৈক নওমুসলিম যুবক আবূ বসীর ইসলাম গ্রহণ করিয়া মক্কায় কুরায়শদের অত্যাচার হইতে আত্মরক্ষা ও প্রিয়নবীর সহিত মিলনের উদ্দেশ্যে অভিভাবকদের অনুমতি না লইয়াই মদীনায় চলিয়া আসেন। ছাকীফরা ছিল কুরায়শদের চুক্তিবদ্ধ মিত্র, তাই হুদায়বিয়ার সন্ধির শর্তানুসারে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে মক্কায় ফেরৎ পাঠাইয়া দিয়াছিলেন। তাই আযহার ইব্‌ন আওফ ও আখনাস ইব্‌ন শুরায়ক তাঁহাকে ফেরৎ পাঠাইবার দাবি জানাইয়া মদীনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পত্র প্রেরণ করে। পত্রের মর্মানুসারে তাহারা বনী আমের গোত্রের একজন লোককে এবং তাহাদের একটি ক্রীতদাসকে তাহার সাথীরূপে প্রেরণ করে। রাসূলুল্লাহ (স) আবূ বসীরকে বলিলেন: يا ابا بصير انا قد اعطينا هؤلاء القوم ما قد علمت ولا يصح لنا في ديننا الغدر وان الله جاعل لك ولمن معك من المستضعفين فرجا ومخرجا فانطلق الى قومك. “হে আবূ বসীর! আমরা ঐ সম্প্রদায়কে যে কথা দিয়াছি (অর্থাৎ তাহাদের সহিত আমরা চুক্তিবদ্ধ হইয়াছি) তাহা তুমি জান। আর ইসলামে বিশ্বাস ভঙ্গের অবকাশ নাই। আল্লাহ তোমার এবং তোমার সাথীদের জন্য অবশ্যই একটা ব্যবস্থা করিয়া দিবেন। সুতরাং তুমি তোমার সম্প্রদায়ের নিকট চলিয়া যাও” (দ্র. হায়কাল, হায়াতু মুহাম্মাদ (আরবী), মিসর ১৫তম সংস্করণ ১৯৬৮, পৃ. ৩৮৪)।

আবূ বসীর অনেক অনুনয়-বিনয় করিয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি আমাকে আবার পৌত্তলিকদের নিকট ফেরৎ পাঠাইবেন? উহারা যে আমাকে ধর্মচ্যুত করিয়া ফেলিবে! কিন্তু আল্লাহর রাসূল একাধিকবার তাঁহার ঐ কথারই পুনরুক্তি করিয়া তাহাকে আশ্রয় দানে তাঁহার নীতিগত অসামর্থ্যের কথা জানাইলেন। অগত্যা আবূ বসীর ঐ দুই ব্যক্তির সহিত প্রস্থান করিলেন। যুল-হুলায়ফায় পৌঁছিয়া তিনি অত্যন্ত চাতুর্যের সহিত সঙ্গীটিকে তাঁহার চমৎকার তরবারিটি একবার দেখিতে দিতে অনুরোধ করিলেন। সঙ্গীটি তরবারি তাঁহার হাতে তুলিয়া দিতেই তিনি উহার দ্বারা তাহাকে হত্যা করেন। সঙ্গী ক্রীতদাসটি ভয়ে পালাইয়া মদীনায় গিয়া উপস্থিত হইল। রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে ভীত-সন্ত্রস্তভাবে উপস্থিত হইয়া সে আরয করিল, আপনার লোকটি আমার সঙ্গীকে হত্যা করিয়া ফেলিয়াছে। এমনি সময় উন্মুক্ত তরবারি হাতে আবূ বসীরও সেখানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) কোন মন্তব্য করার পূর্বেই তিনি বলিলেন: يا رسول الله وقت ذمتك وادي الله عنك اسلمتنى بيد القوم وقد امتنعت بديني ان افتن فيه أو يعبث بي. “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আপনার সন্ধির শর্ত পূরণ করিয়াছেন এবং আল্লাহ তা'আলা আপনাকে দায়িত্বমুক্ত করিয়াছেন। আপনি যথারীতি আমাকে তাহাদের হাতে অর্পণ করিয়াছেন। আমি ধর্মচ্যুতির ফিৎনা ও তাহাদের নির্যাতনের পাশবিক ব্যবহার হইতে আত্মরক্ষা করিয়াছি" (ইবন হিশাম, সীরাত, ৩য় খ., পৃ. ২২০-২১)।

আবূ বসীর তৎক্ষণাৎ প্রস্থান করিলেন এবং সমুদ্র উপকূলবর্তী ঈস নামক স্থানে অবস্থান করিলেন। উহা ছিল কুরায়শদের সিরিয়ায় বাণিজ্য যাত্রার পথ। সন্ধিমতে কোন পক্ষই এই পথ রোধ করিতে পারিতেন না। মক্কায় এই খবর পৌঁছিতেই সেখানকার অত্যাচারিত মুসলমানগণ আসিয়া তাঁহার নেতৃত্বে ঈসে একত্র হইতে থাকিলেন। দেখিতে দেখিতে সত্তরজনের একটি দল জুটিয়া গেল। প্রতিটি কুরায়শ কাফেলার উপর তাহারা আক্রমণ চালাইয়া তাহাদের বাণিজ্য-সম্ভার লুণ্ঠন এবং তাহাদের লোকজনকে হত্যা করিতে শুরু করিলেন।

এতদিন পর্যন্ত কুরায়শরা তাহাদের উপর যে অকথ্য নির্যাতন চালাইয়াছে, যেইভাবে নিজেরাই জেদ ধরিয়া মক্কা হইতে পলাতক মুসলমানগণের মদীনার আশ্রয় চাওয়ার পথ চুক্তিদ্বারা রুদ্ধ করিয়া দিয়াছে, এখন আর তাহাদের বলার মতও কিছুই ছিল না। কেননা রাসূলুল্লাহ (স) এই ব্যাপারে তাঁহার দায়িত্ব যথারীতি পালন করিয়াছেন। মক্কায় যে নির্যাতিত মুসলমানগণ চুক্তির বাহিরে অবস্থান করিতেছিলেন তাহাদিগকে এইভাবে অত্যাচারিত হইয়া মরিতে বা ধর্মত্যাগ করিতে সুযোগ দেওয়ারও কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ ছিল না। এইদিকে সিরিয়ার বাণিজ্যপথ রুদ্ধ হইলে তাহাদেরও বাঁচিয়া থাকার পথ রুদ্ধ হইয়া যায়। এই পথটিকে ঝুঁকিমুক্ত রাখার জন্যই তো তাহারা মদীনার মুসলমানদের বিরুদ্ধে এত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করিয়াছে। চুক্তির দ্বারা উহা মুক্ত হইয়াছিল বটে কিন্তু এখন তো আবূ বসীর ও তাঁহার সঙ্গী-সাথীরা অপ্রতিরোধ্য এক নূতন শক্তিরূপে দেখা দিয়াছে। ইসলামের এক নূতন রক্ষাব্যূহ সৃষ্টি হইয়াছে যাহা পূর্বেকার ঝুঁকি হইতে কোনমতেই কম বিপজ্জনক নহে। অগত্যা তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর কৃপাদৃষ্টি আকর্ষণ করিয়া মদীনায় দূত পাঠাইল। আত্মীয়তার দোহাই দিয়া তাহারা তাহাদের বাঁচিবার তাগিদে আবু বসীর তথা তাবৎ মক্কাবাসী নির্যাতিত মুসলমানগণকে মদীনায় ডাকাইয়া লইবার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ফরিয়াদ জানাইল। মানবতার নবী মানবিক কারণে তাহাদের সেই আবেদনে সাড়া দিয়া আবূ বসীর ও মক্কাবাসী তাবৎ মুসলমানগণকে মদীনায় ডাকিয়া পাঠাইলেন। এইভাবে স্বয়ং কুরায়শদের আবেদনে হুদায়বিয়া চুক্তির একটি শর্ত বিলুপ্ত করিয়া তাহাদের সিরিয়ার বাণিজ্যপথ নিরাপদ করিয়া দেওয়া হইল (হায়াতে মুহাম্মাদ, আরবী, পৃ. ৩৮৪-৮৫)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00