📄 মক্কী জীবন
মক্কার দীর্ঘ তেরটি বৎসরে আঘাতের পর আঘাত সহ্য করিয়া প্রিয়নবী (স) ও তদীয় সহাবীগণ ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার নযীরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়াছেন। আঘাতের পর আঘাত আসিয়াছে কিন্তু তিনি প্রত্যাঘাত করেন নাই।
মহানবী (স) মক্কার মুসলমানদের এক বিরাট সংখ্যক লোককে দুইবারে সুদূর হাবশায় (ইথিওপিয়ায়) প্রেরণ করেন। সকলেই মক্কা ত্যাগ করিয়া বিদেশের পথে পাড়ি জমাইলেন। তাঁহাদের পশ্চাতে ধাওয়া করিয়াছিল মক্কার কাফিরগণ। তাহারা তাঁহাদিগকে ধরিতে ব্যর্থ হইয়া তাঁহাদিগকে মক্কায় ফেরত আনার জন্য ইথিওপীয়-রাজ ও তাঁহার সভাষদগণকে প্রচুর উপহার-উপঢৌকনসহ একটি প্রতিনিধিদল সেইদেশে পাঠায়; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাহাদের প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। প্রিয়নবীর এক বিরাট সংখ্যক সাথী ইথিওপীয় সম্রাটের বদান্যতায় সেই দেশে আশ্রয় লাভ করিলেন। কুরায়শ প্রতিনিধিগণ ব্যর্থমনোরথ হইয়া সেই দেশ হইতে ফিরিয়া আসে।
সাফা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত সাহাবী আরকাম ইবন আবিল আরকাম আল-মাখযূমী (রা)-র বাড়ী দারুল আরকাম ছিল একটি নিরাপদ স্থান। ইসলাম প্রচারের প্রাথমিক পর্যায়ে এইরূপ একটি নিরাপদ স্থানের প্রয়োজন ছিল। কেননা মক্কার কুরায়শরা তখন মুসলমানদের উপর এমনভাবে নির্যাতন চালাইয়া যাইতেছিল যে, কেহ ইসলাম গ্রহণ করিয়াছে এই কথা প্রকাশ করাও নিরাপদ ছিল না। নবুওয়াতের চতুর্থ বৎসরে একদা একটি সুরক্ষিত স্থানে সাহাবীগণের একত্র নামায আদায় করার বিষয়টি একদল পৌত্তলিকের দৃষ্টিগোচর হয়। ফলে তাহারা এতই অসহিষ্ণু হইয়া উঠে যে, মুসলমানদিগকে গালিগালাজ করিতে শুরু করে। জবাবে হযরত সা'দ ইব্ন আবী ওয়াক্কাস (রা) একজন শত্রুকে এমন প্রত্যাঘাত করিলেন যে, তাঁহার দেহ হইতে রক্ত গড়াইয়া পড়িল। ইসলামে ইহাই ছিল সর্বপ্রথম রক্তপাতের ঘটনা। এই ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা বারবার ঘটিতে থাকিলে মুসলমানদের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কাবশতঃ নবী করীম (স) দারুল আরকাম নামক বাড়ীটিকে একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসাবে গ্রহণ করেন।
📄 ভ্রাতৃবন্ধন : প্রতিরক্ষার মযবুত বুনিয়াদ
রাসূলুল্লাহ (স) মদীনাতে আগমন করিয়া সেখানকার মুসলমানদিগকে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করিয়াছিলেন। এই বন্ধন ছিল আদর্শ ও ঈমানের ভিত্তিতে। ইহাতে সকল ভেদাভেদ, বংশীয় শ্রেষ্ঠত্ব, অর্থ ও প্রভাবের পার্থক্য বিলুপ্ত হইয়া যায়। ইহাতে ধনী-নির্ধন, আরব-অনারব, সাদা-কালো এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক পার্থক্য সম্পূর্ণ দূর হইয়া যায়। রাসূলুল্লাহ (স) এই ভ্রাতৃত্বের যেই বন্ধন স্থাপন করিয়াছিলেন, তাহার দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে বিরল। ইহা কেবল মৌখিক অঙ্গীকার ছিল না, বরং সাহাবীগণের আন্তরিকতা, নিষ্ঠা, আত্মত্যাগ ও উদারতার এক বিস্ময়কর ইতিহাস। আনসারগণ তাহাদের যাবতীয় সম্পদ, ঘর-বাড়ি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বাগ-বাগিচা মুহাজিরদিগকে দ্বিধাহীন চিত্তে অর্ধেক করিয়া দান করিয়াছিলেন (আল-বুখারী, কিতাবুল মানাকিব, বাবু ইখাইস সাহাবিয়্যি, হাদীছ নং ৩৫৪৩; মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, বাবুল উখুওয়াত)।
📄 মদীনা সনদ ও অন্যান্য সন্ধিচুক্তি
যেই রাষ্ট্র বা জাতি ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক দিক দিয়া সুসংহত নয়, ইহার আত্মরক্ষা করা কঠিন হইয়া পড়ে। সেই সময় মদীনার জনসংখ্যা ছিল তিন সম্প্রদায়ের, যথাঃ মুসলিম, ইয়াহুদী ও মুশরিক। ইসলাম গ্রহণ করিবার পর মুসলিমগণের সংখ্যা বৃদ্ধি পাইলেও ইয়াহুদী ও মুশরিক সম্প্রদায় ছিল শক্তিশালী। মদীনা নগরীর চারিপাশে ছিল ইয়াহুদী জনবসতি। তাহারা মদীনার রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করিতে সদা সচেষ্ট ছিল। মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় তাহারা ইব্ন উবাইয়ের নেতৃত্বে নিজেদের গোত্রীয় প্রভাব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নতুন নতুন ষড়যন্ত্রের জাল বুনাইতেছিল। মক্কার কুরায়শগণও মদীনার মুসলিম ও ইয়াহুদীদের দুর্বল সম্পর্ককে সুযোগ হিসাবে গ্রহণ করিয়াছিল। ইয়াহুদীদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও গোত্রীয় রেষারেষি তাহাদিগকে দুর্বল করিয়া ফেলিয়াছিল। তাহারা নিজেদের মধ্যে বারংবার যুদ্ধে লিপ্ত হইত। ইয়াহুদী গোত্র বানু কায়নুকা, বানু নাযীর ও বানু কুরায়যা ইয়াসরিবে (মদীনা) বসবাস করিত। বানু কায়নুকা ও বানু নাযীর বনূ খাযরাজ গোত্রের মিত্র ছিল। বানু কুরায়যা বানূ আওস গোত্রের মিত্র ছিল। এই মিত্রতা ও রেষারেষির ফলে তাহারা একে অন্যের সহিত যুদ্ধে লিপ্ত হইত। এই কারণে ইয়াসরিবে একটি কেন্দ্রীয় শাসন প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হইতেছিল (আবু যাহরা, খাতিমুন নাবিয়্যীন, পৃ. ২৪৫)।
এই প্রেক্ষাপটে রাসূলুল্লাহ (স) একটি সর্বাত্মক সনদ প্রণয়ন করেন। এই সনদে মদীনার সকল সম্প্রদায়ের লোক স্বতস্ফুর্তভাবে অংশগ্রহণ করে। ইয়াহুদী গোত্রগুলিও এই সনদে শামিল ছিল। ইব্ন ইসহাক তাঁহার সীরাত গ্রন্থে সনদটির বিবরণ সবিস্তারে উল্লেখ করিয়াছেন। এই সনদে মোট ৫৩টি অনুচ্ছেদ ছিল। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক, অভ্যন্তরীণ শান্তি ও সংহতি প্রতিষ্ঠা করাই ছিল এই সনদের মৌলিক উদ্দেশ্য (সীরাত ইবন হিশাম, ২খ, পৃ. ৫০১-৫০৬)। ইয়াহুদীগণ তাহাদের ধর্ম পালনের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে। যুদ্ধ ও শান্তি সংক্রান্ত বিষয়ে তাহারা মুসলমানদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ থাকিবে এবং মক্কার কুরায়শদের বিরুদ্ধে মুসলমানদেরকে সর্বাত্মকভাবে সাহায্য করিবে, এই মর্মে তাহারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩খ, পৃ. ২৭৭-২৭৮)।
📄 মদীনা চুক্তির প্রতিরক্ষা তাৎপর্য
মদীনা চুক্তিতে এমন সব বিষয় অন্তর্ভূক্ত ছিল যাহার ভিত্তিতে একটি সুসংহত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হইতে পারিত। এই চুক্তি মদীনার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করিয়াছিল। সনদে মুসলিম ও অমুসলিমদের দায়িত্ব ও কর্তব্যগুলিকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করা হইয়াছিল। ইয়াহুদীগণ তাহাদের ধর্ম পালন করিতে পারিবে, তবে তাহারা স্বীয় ধর্মের মূলনীতিগুলি পরিবর্তন করিতে পারিবে না। যুদ্ধ ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় তাহারা মুসলমানদের সহযোগী হইবে। সনদে এই কথাও উল্লেখ ছিল যে, কুরায়শদের সাথে চুক্তিভুক্ত কোন লোকের সহিত তাহারা কোন প্রকার সম্পর্ক স্থাপন করিতে পারিবে না। ইহা ছিল মদীনার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি (আবুল আলা মওদূদী, সীরাতে সারওয়ারে আলম, ৪খ, পৃ. ৭১-৭৬)।