📄 জিহাদের ফযীলাত ও সুফল
যে কোন বিষয়ের মর্যাদা, মাহাত্ম্য এবং উহার গুরুত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব নিরূপিত হয় উহার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের মানদণ্ডে। জিহাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য যেহেতু অতি মহান তাই উহার ফযীলাত ও গুরুত্বও অতি অধিক। জিহাদ ইসলামের একটি শ্রেষ্ঠ ইবাদত। হাদীছের ভাষায়, “জিহাদ ইসলামের শীর্ষচূড়া”। সাধারণ পরিস্থিতিতে উহা ফরযে কিফায়া এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে ফরযে ‘আয়ন। আল-কুরআন ও আল-হাদীছের বর্ণনামতে জিহাদের সমতুল্য কোন ইবাদত নাই (বুখারী, হাদীছ নং ২৭৮৬)। জিহাদ হইতে পলায়ন কবীরা গুনাহ (৮: ১৫-১৬; মুসলিম, ১৯শ, পৃ. ৬৪)। জিহাদে অংশগ্রহণ বিহীন বা উহার নিয়তবিহীন মৃত্যু মুনাফিকী মৃত্যুতুল্য (মুসলিম, ইমারা, হাদীছ নং ১৯১৭, ১৯১০; আবু দাউদ, জিহাদ)। জিহাদে কাফিরদিগকে হত্যা ও তাহাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র পরিচালনা আল্লাহ তা'আলা নিজের সহিত সম্পৃক্ত করিয়াছেন (৮: ১৭)। জিহাদে মুসলমানদের পক্ষে ফেরেশতাগণের আগমন (৩: ১২৪-১২৫; ৮: ৯-১০), প্রতিটি জিহাদী অভিযানে অংশগ্রহণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর আন্তরিক বাসনা এবং নবী-রাসূলের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হওয়া সত্ত্বেও জিহাদ করিয়া শাহাদাতের স্বাদ আস্বাদনের প্রতি তাঁহার প্রবল বাসনা ইত্যাদির বহুবিধ বিষয়সহ পবিত্র কুরআন ও হাদীছে বর্ণিত জিহাদের বিশাল ও অপরিসীম সওয়াব, বিশেষত শহীদগণের অতুলনীয় মর্যাদা ও সুখ-শান্তির বিবরণ জিহাদের সুমহান ফযীলাত, মাহাত্ম্য ও উহার গুরুত্ব নির্দেশ করে।
ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের জীবন এবং তাহার দেহ-মন তথা যাবতীয় শক্তি ও বুদ্ধি এবং সকল সম্পদ মানুষকে আল্লাহ তা'আলার দেওয়া নি'আমত ও পবিত্র আমানত। এই আমানতের সর্বোত্তম ব্যবহার হইল আল্লাহর কলেমাকে সমুন্নত করিবার প্রয়াসে উহার নিৰ্ভেজাল, সামগ্রিক ও সার্বক্ষণিক ব্যবহার এবং এই ব্যবহারই জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ। বিশাল ও অপরিসীম ফযীলাতের কারণেই প্রত্যক্ষ জিহাদে জীবন কুরবান করিবার সর্বোচ্চ ফযীলাতের পাশাপাশি উহার পূর্বাপর বিষয়সমূহ, পূর্বপ্রস্তুতি, যাবতীয় উপকরণ, রসদ ইত্যাদি সংগ্রহ, সংরক্ষণ, সরবরাহ, নিঘাত ও সন্ধি সহকারে প্রস্তুতিমূলক যে কোন কার্যক্রম ফযীলাতের আওতাভুক্ত হইয়াছে। জীবন দানের ধারায় জিহাদে যে কোন প্রকার আঘাতও ফযীলাতস্বরূপ। তদুপরি মুজাহিদদের সহায়তা প্রদান, তাহাদিগকে যুদ্ধোপকরণ প্রদান এবং মুজাহিদদের অনুপস্থিতিতে তাহার বাড়ীর ও পরিবার-পরিজনদের খোঁজ-খবর রাখা, দেখাশুনা করা ও প্রয়োজনীয় সেবা প্রদানও জিহাদের ফযীলাতে অংশীদার হিসাবে পরিগণিত।
**জিহাদের গুরুত্ব: মুসলমানদের উপর জিহাদ ফরয করিয়া**
মুসলমানদের উপর জিহাদ ফরয করিয়া তাহাদেরকে সার্বিক কষ্ট সহ্য করিতে অনুপ্রাণিত করা হইয়াছে এবং মু'মিনদিগকে উহাতে উদ্বুদ্ধ করিবার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-কে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে যাহা জিহাদের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য প্রমাণিত করে। যেমন: كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ وَهُوَ كُرْهُ لَكُمْ وَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ . "তোমাদের জন্য যুদ্ধের বিধান দেওয়া হইল যদিও তোমাদের নিকট উহা অপ্রিয়। কিন্তু তোমরা যাহা অপসন্দ কর সম্ভবত তাহা তোমাদের জন্য কল্যাণকর...." (২: ২১৬)।
فَقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ لَا تُكَلِّفُ إِلا نَفْسَكَ وَحَرِّضِ الْمُؤْمِنِينَ. "সুতরাং তুমি (হে নবী) আল্লাহ্র পথে যুদ্ধ কর; তোমাকে শুধু তোমার নিজের জন্য দায়ী করা হইবে এবং মুমিনগণকে উদ্বুদ্ধ কর" (৪:৮৪)।
يأَيُّهَا النَّبِيُّ حَرَّضِ الْمُؤْمِنِينَ عَلَى الْقِتَالِ. "হে নবী! মুমিনদিগকে যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ কর" (৮: ৬৫)।
জিহাদের জন্য সদা ও সার্বিক প্রস্তুতি রাখিবার, বিশেষ পরিস্থিতিতে সদলবলে জিহাদে আত্মনিয়োগ করিবার জন্য নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে এবং জিহাদ অভিযানের ব্যাপারে কোন প্রকার অনীহা বা শিথিলতা প্রদর্শন তিরস্কার করা হইয়াছে এবং কখনও হুমকি দেওয়া হইয়াছে। যেমন: يأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا خُذُوا حِدْرَكُمْ فَانْفِرُوا ثُبَاتِ أَوِ انْفِرُوا جَمِيعًا. "হে মু'মিনগণ! সতর্কতা অবলম্বন কর, অতঃপর হয় দলে দলে বিভক্ত হইয়া অগ্রসর হও অথবা একসঙ্গে অগ্রসর হও” (৪: ৭১)।
وَأَعِدُّوا لَهُمْ مَّا اسْتَطَعْتُمْ مِنْ قُوَّةٍ وَمِنْ رَبَّاطِ الخَيْلِ تُرْهِبُوْنَ بِهِ عَدُوَّ اللَّهِ وَعَدُوكُمْ وَأَخَرِيْنَ مِنْ دُونِهِمْ لَا تَعْلَمُونَهُمْ اللهُ يَعْلَمُهُمْ وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ شَيْءٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ يُوَفَّ إِلَيْكُمْ وَأَنْتُمْ لَا تُظْلَمُونَ. "তোমরা তাহাদের মুকাবিলার জন্য যথাসাধ্য শক্তি ও অশ্ববাহিনী প্রস্তুত রাখিবে, এতদ্দ্বারা তোমরা সন্ত্রস্ত করিবে আল্লাহর শত্রুকে, তোমাদের শত্রুকে এবং এতদ্ব্যতীত অন্যদিগকে যাহাদিগকে তোমরা জান না, আল্লাহ তাহাদিগকে জানেন। আল্লাহ্ পথে তোমরা যাহা কিছু ব্যয় করিবে উহার পূর্ণ প্রতিদান তোমাদিগকে দেওয়া হইবে এবং তোমাদের প্রতি জুলুম করা হইবে না" (৮ঃ ৬০)।
বলিবার অপেক্ষা রাখে না যে, যুদ্ধাস্ত্র ও সমরোপকরণ যুগোপযোগীরূপে প্রস্তুত, সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করিতে হইবে এবং পবিত্র কুরআনের 'যথাসাধ্য শক্তি' সর্ববিধ সাজসরঞ্জাম, অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র ও প্রয়োজনীয় সামগ্রিক সামরিক প্রশিক্ষণকে অন্তর্ভুক্ত করে (মা'আরিফুল কুরআন, ৪খ., পৃ. ২৭২)। মৃত্যুভীতি সম্পর্কে ভর্ৎসনা করিয়া বলা হইয়াছে:
قُلْ لَوْ كُنْتُمْ فِي بُيُوتِكُمْ لَبَرَزَ الَّذِينَ كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقَتْلُ إِلَى مَضَاجِعِهِمْ. "বল, যদি তোমরা তোমাদের গৃহে অবস্থান করিতে তবুও নিহত হওয়া যাহাদের জন্য অবধারিত ছিল তাহারা অবশ্যই নিজেদের মৃত্যুস্থানে বাহির হইত" (৩: ১৫৪)।
أَلَمْ تُرَ إِلَى الَّذِينَ قَبْلَ لَهُمْ كُفُّوا أَيْدِيَكُمْ وَأَقِيمُوا الصَّلوةَ وَأَتَو الزَّكُوةَ فَلَمَّا كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقِتَالُ إِذَا فَرِيقٌ مِّنْهُمْ يَخْشَوْنَ النَّاسَ كَخَشْيَةِ اللَّهِ أَوْ أَشَدَّ خَشْيَةً وَقَالُوا رَبَّنَا لِمَ كَتَبْتَ عَلَيْنَا الْقِتَالَ لَوْ لا أَخَّرْتَنَا إِلى أَجَلٍ قَرِيبٍ قُلْ مَتَاعُ الدُّنْيَا قَلِيلٌ وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ لَمَنِ اتَّقَى وَلَا تُظْلَمُونَ فَتِيْلاً. أَيْنَ مَا تَكُونُوا يُدْرِكْكُمُ الْمَوْتُ وَلَوْ كُنْتُمْ فِي بُرُوج مُشَيَّدَة. "তুমি কি তাহাদিগকে দেখ নাই যাহাদিগকে বলা হইয়াছিল, তোমরা তোমাদের হস্ত সংবরণ কর এবং সালাত কায়েম কর ও যাকাত দাও? অতঃপর যখন তাহাদিগকে যুদ্ধের বিধান দেওয়া হইল তখন তাহাদের একদল মানুষকে ভয় করিতেছিল আল্লাহকে ভয় করার মত অথবা তদপেক্ষা অধিক এবং বলিতে লাগিল, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্য যুদ্ধের বিধান কেন দিলে? আমাদিগকে কিছু দিনের অবকাশ দাও না? বল, পার্থিব ভোগ সামান্য এবং যে মুত্তাকী তাহার জন্য পরকালই উত্তম। তোমাদের প্রতি সামান্য পরিমাণও জুলুম করা হইবে না। তোমরা যেখানেই থাক না কেন মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাইবেই, এমন কি তোমরা সুউচ্চ সুদৃঢ় দুর্ভেদ্য দুর্গে অবস্থান করিলেও” (৪: ৭৭-৭৮)।
قُلْ لَنْ يَنْفَعُكُمُ الْفِرَارُ إِنْ فَرَرْتُمْ مِّنَ الْمَوْتِ أَوِ الْقَتْلِ وَإِذَا لَا تُمَتَّعُونَ إِلَّا قَلِيلاً. "বল, পলায়নে তোমাদের কোন লাভ হইবে না, যদি তোমরা মৃত্যু অথবা হত্যার ভয়ে পলায়ন কর। তবে সেই ক্ষেত্রে তোমাদিগকে সামান্যই পার্থিব সুখ ভোগ করিতে দেয়া হইবে" (৩৩: ১৬)।
এই সকল ভর্ৎসনা, কঠোর নির্দেশ ও উদ্বুদ্ধকরণ জিহাদের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য প্রকাশ করে। যেমন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا قِيلَ لَكُمُ انْفِرُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ انَّا قَلْتُمْ إِلَى الْأَرْضِ أَرَضِيْتُمْ بالْحَياةِ الدُّنْيَا مِنَ الْآخِرَةِ فَمَا مَتَاعُ الحَيُوةِ الدُّنْيَا فِي الْآخِرَةِ إِلا قَلِيلٌ إِلا تَنْفِرُوا يُعَذِّبُكُمْ عَذَابًا أَلِيمًا وَيَسْتَبْدِلْ قَوْمًا غَيْرَكُمْ وَلَا تَضُرُّوهُ شَيْئًا ..... انْفِرُوا خَفَافًا وَثِقَالاً وَجَاهِدُوا بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ. "হে মু'মিনগণ! তোমাদের হইল কী যে, যখন তোমাদিগকে আল্লাহর পথে অভিযানে বাহির হইতে বলা হয় তখন তোমরা ভারাক্রান্ত হইয়া ভূতলে ঝুঁকিয়া পড়? তোমরা কি আখিরাতের পরিবর্তে পার্থিব জীবনে পরিতুষ্ট হইয়াছ? আখিরাতের তুলনায় পার্থিব জীবনের ভোগের উপকরণ তো অকিঞ্চিতকর। যদি তোমরা অভিযানে বাহির না হও, তবে তিনি তোমাদিগকে মর্মন্তুদ শাস্তি দিবেন এবং অপর জাতিকে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করিবেন এবং তোমরা তাঁহার কোনই ক্ষতি করিতে পারিবে না।... তোমরা অভিযানে বাহির হইয়া পড়, হালকা অবস্থায় হউক অথবা ভারী অবস্থায় এবং জিহাদ কর আল্লাহর পথে তোমাদের সম্পদ ও জীবন দ্বারা। উহাই তোমাদের জন্য শ্রেয়, যদি তোমরা জানিতে" (৯: ৩৮, ৩৯, ৪১)।
قُلْ إِنْ كَانَ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَالُ نِ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسْكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُمْ مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ. "বল তোমাদের নিকট যদি আল্লাহ, তাঁহার রাসূল এবং আল্লাহ্র পথে জিহাদ করা অপেক্ষা অধিক প্রিয় হয় তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভ্রাতাগণ, তোমাদের স্ত্রীগণ, তোমাদের স্বগোষ্ঠী, তোমাদের অর্জিত সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য যাহার মন্দা পড়ার আশংকা কর এবং তোমাদের বাসস্থান যাহা তোমরা ভালবাস, তবে অপেক্ষা কর আল্লাহ্র বিধান আসা পর্যন্ত। আল্লাহ সত্যত্যাগী সম্প্রদায়কে সৎপথ প্রদর্শন করেন না" (৯: ২৪)।
জিহাদ ও অন্যান্য দীনী কর্মে অর্থব্যয়ে অনীহার ক্ষেত্রে সতর্কবাণী উচ্চারিত হইয়াছে: هَانْتُمْ هَؤُلاءِ تُدْعَوْنَ لِتُنْفِقُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَمِنْكُمْ مَّنْ يَبْخَلُ وَمَنْ يَبْخَلْ فَإِنَّمَا يَبْخَلُ عَنْ نَّفْسِهِ وَاللَّهُ الْغَنِيُّ وَأَنْتُمُ الْفُقَرَاءُ وَانْ تَتَوَلَّوْا يَسْتَبْدِلْ قَوْمًا غَيْرَكُمْ ثُمَّ لَا يَكُونُوا أَمْثَالَكُمْ. "দেখ, তোমরাই তো তাহারা যাহাদিগকে আল্লাহ্ পথে ব্যয় করিতে বলা হইতেছে, অথচ তোমাদের অনেকে কৃপণতা করিতেছে। যাহারা কার্পণ্য করে তাহারা তো কার্পণ্য করে নিজেদেরই প্রতি। আল্লাহ অভাবমুক্ত এবং তোমরা অভাবগ্রস্ত। যদি তোমরা বিমুখ হও, তিনি অন্য জাতিকে তোমাদের স্থলবর্তী করিবেন। অতঃপর তাহারা তোমাদের মত হইবে না” (৪৭ঃ৩৮)।
জিহাদ না করাকে ধ্বংস ও আত্মহননের শামিল সাব্যস্ত করা হইয়াছে:
وَأَنْفِقُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ. "তোমরা আল্লাহ্র পথে ব্যয় কর এবং নিজেদের হাতে নিজদিগকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করিও না” (২: ১৯৫)।
এই আয়াতের তাফসীরে মুফাসসিরগণ লিখিয়াছেন, জিহাদ বর্জন করিয়া নিজেদের ধ্বংস করিবার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হইয়াছে। আবূ ইমরান আসলাম (র) বলেন, কুনতুনিয়া (কনস্টান্টিনোপল/ ইস্তাম্বুল) অবরোধকালে জনৈক মুহাজির শত্রুবাহিনীর উপর আক্রমণ করিয়া একাকী তাহাদের সারি ছত্রভঙ্গ করিয়া ফেলিল। আমাদের সঙ্গে আবু আইয়ূব আনসারী (রা)-ও ছিলেন। লোকেরা বলিতে লাগিল, লোকটি নিজেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলিয়া দিয়াছে। তখন আবূ আইয়ূব আনসারী (রা) বলিলেন, তোমরা এই আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা করিয়া থাক (অর্থাৎ যুদ্ধে ঝাপাইয়া পড়া ধ্বংসের মুখে পতিত হওয়া নয়)। আয়াতটি আমাদের আনসারদের সম্পর্কে নাযিল হইয়াছিল। আমরা মদীনার আনসাররা রাসূলুল্লাহ (স)-কে সঙ্গ ও সান্নিধ্য দিয়াছিলাম এবং সকল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিয়া তাঁহাকে সাহায্য-সহযোগিতা করিয়াছিলাম। এক সময় ইসলাম বিস্তার লাভ করিল এবং উহার সাহায্যকারীদের সংখ্যা অধিক হইল। তখন আমরা আনসাররা একটি প্রীতি বৈঠকে আলোচনা করিলাম, আল্লাহ তা'আলা তাঁহার নবীকে সঙ্গদান ও তাঁহার সাহায্য করিবার সুযোগ প্রদানে আমাদিগকে ভাগ্যবান করিয়াছেন। আমরা আমাদের পরিবার-পরিজন ও ধন-সম্পদের চাইতে তাঁহাকে অগ্রাধিকার দিয়াছিলাম। এখন তো যুদ্ধ উহার অস্ত্র নামাইয়া ফেলিয়াছে। এখন আমরা আমাদের বাড়িঘর, ক্ষেত-খামার ও ধন-সম্পদের সংস্কারে মনোযোগ নিবদ্ধ করিতে পারি। তখন আল্লাহ তা'আলা আমাদের সম্বন্ধে উপরিউক্ত আয়াত নাযিল করিলেন। সুতরাং ধ্বংসের অর্থ ছিল জিহাদ বর্জন করিয়া বাড়ি-ঘর ও সম্পদ-সম্পত্তিতে নিমগ্ন হওয়া (তাফসীরে ইব্ন কাছীর, ১খ., পৃ. ২২৮-২২৯; তাফসীরে মাজহারী, ১খ., পৃ. ২০০; তাফসীরে মা'আরিফুল কুরআন, ১খ., পৃ. ৪৭২-৪৭৪)।
যুদ্ধ হইতে পলায়ন গুরুতর অপরাধ যাহা জাহান্নাম অবধারিত করে (দ্র. ৮ : ১৫-৬)। এই বিধান জিহাদের অপরিসীম গুরুত্ব নির্দেশ করে। হাদীছে যুদ্ধক্ষেত্র হইতে পলায়নকে ধ্বংসাত্মক বিষয় ও নিকৃষ্টতম কবীরা গুনাহের তালিকাভুক্ত করা হইয়াছে। আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, "তোমরা ধ্বংসাত্মক সাত বিষয় হইতে আত্মরক্ষা করিবে। সাহাবীগণ বলিলেন, সেই সাত বিষয় কি? তিনি বলিলেন, আল্লাহর সঙ্গে শরীক করা..... যুদ্ধক্ষেত্র হইতে পলায়ন করা” (মুসলিম, ১খ., পৃ. ৬৪)। অর্থাৎ ইহাকে শিরকের ন্যায় নিকৃষ্টতম পাপের তালিকাভুক্ত করা হইয়াছে।
অপরদিকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর হাতে জিহাদের বায়'আতকে আল্লাহ্র হাতে বায়'আত সাব্যস্ত করা, মুসলমানদের যুদ্ধাস্ত্র পরিচালনাকে সরাসরি আল্লাহর পরিচালনা সাব্যস্ত করা এবং জিহাদে ফেরেশতাগণের অংশগ্রহণ উহার সবিশেষ গুরুত্ব ও ফযীলাত নির্দেশ করে।
ইরশাদ হইয়াছেঃ إِنَّ الَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ اللَّهَ يَدُ اللهِ فَوْقَ أَيْدِيهِمْ فَمَنْ نَكَثَ فَإِنَّمَا يَنْكُتُ عَلَى نَفْسِهِ وَمَنْ أَوْفَى بِمَا عُهَدَ عَلَيْهِ اللَّهَ فَسَيُؤْتِيْهِ أَجْرًا عَظِيمًا. "যাহারা তোমার হাতে বায়'আত করে তাহারা তো আল্লাহরই হাতে বায়'আত করে। আল্লাহ্র হাত তাহাদের হাতের উপর। অতঃপর যে উহা ভঙ্গ করে, উহা ভঙ্গ করিবার পরিণাম তাহারই এবং যে আল্লাহ্র সহিত অঙ্গীকার পূর্ণ করে তিনি অবশ্যই তাহাকে মহাপুরস্কার দেন" (৪৮:১০)।
فَلَمْ تَقْتُلُوهُمْ وَلَكِنَّ اللهَ قَتَلَهُمْ وَمَا رَمَيْتَ إِذْ رَمَيْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ رَمَى وَلِيُبْلِيَ الْمُؤْمِنِينَ مِنْهُ بَلَاءٌ حَسَنًا وَإِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ. "তোমরা তাহাদিগকে হত্যা কর নাই, আল্লাহই তাহাদিগকে হত্যা করিয়াছেন এবং তুমি যখন নিক্ষেপ করিয়াছিলে তখন তুমি নিক্ষেপ কর নাই, আল্লাহই নিক্ষেপ করিয়াছিলেন, এবং ইহা মু'মিনদিগকে আল্লাহর পক্ষ হইতে উত্তমরূপে পরীক্ষা করিবার জন্য। আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ” (৮:১৭)।
إِذْ تَسْتَغِيثُونَ رَبَّكُمْ فَاسْتَجَابَ لَكُمْ أَنِّي مُمِدُكُمْ بِأَلْفِ مِّنَ الْمَلَئِكَةِ مُرْدِفِينَ. وَمَا جَعَلَهُ اللهُ إِلَّا بُشْرَى لَكُمْ وَلِتَطْمَئِنَّ بِهِ قُلُوبُكُمْ وَمَا النَّصْرُ إِلَّا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ. "স্মরণ কর, যখন তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করিয়াছিলে; তখন তিনি তোমাদিগকে জবাব দিয়াছিলেন, আমি তোমাদিগকে সাহায্য করিব এক সহস্র ফেরেশতা দ্বারা, যাহারা একের পর এক আসিবে। আল্লাহ ইহা করেন কেবল শুভ সংবাদ দেওয়ার জন্য এবং এই উদ্দেশ্যে যাহাতে তোমাদের অন্তর প্রশান্তি লাভ করে। আর সাহায্য তো শুধু আল্লাহ্র নিকট হইতেই আসে; আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়” (৮: ৯-১০; আরও দ্র. ৮ ৪৫০; ৩৪ ১২৪-৬)।
মু'মিনের জিহাদ আল্লাহর পথে এবং নির্যাতিত অসহায় নারী-পুরুষের মুক্তির উদ্দেশ্যে। আর কাফিরদের যুদ্ধ তাগূত ও শয়তানের পথে।
وَمَا لَكُمْ لَا تُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللهِ وَالْمُسْتَضْعَفِينَ مِنَ الرِّجَالِ وَالنِّسَاءِ وَالْوِلْدَانِ الَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا أَخْرِجْنَا مِنْ هَذِهِ القَرْيَةِ الظَّالِمِ أَهْلُهَا وَاجْعَلْ لَّنَا مِنْ لَدُنْكَ وَلِيًّا وَاجْعَلْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ نَصِيرًا . الَّذِينَ آمَنُوا يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالَّذِينَ كَفَرُوا يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ الطَّاغُوتِ فَقَاتِلُوا أَوْلِيَاءَ الشَّيْطَانِ إِنَّ كَيْدَ الشَّيْطَانِ كَانَ ضَعِيفًا . "তোমাদের কী হইল যে, তোমরা যুদ্ধ করিবে না আল্লাহ্র পথে এবং অসহায় নরনারী এবং শিশুগণের জন্য, যাহারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! এই জনপদ— যাহার অধিবাসী জালিম, উহা হইতে আমাদিগকে অন্যত্র লইয়া যাও। তোমার নিকট হইতে কাহাকেও আমাদের অভিভাবক কর এবং তোমার নিকট হইতে কাহাকেও আমাদের সহায় কর। যাহারা মু'মিন তাহারা আল্লাহ্র পথে যুদ্ধ করে এবং যাহারা কাফির তাহার তাগূতের পথে যুদ্ধ করে। সুতরাং তোমরা শয়তানের বন্ধুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর; শয়তানের কৌশল অবশ্যই দুর্বল” (৪: ৭৪-৭৬)।
**জিহাদের ফযীলাত ও সুফল**
আল্লাহ্র রহমত ও মাগফিরাত লাভ, আল্লাহর সন্তুষ্টি মানব জীবনের চূড়ান্ত সফলতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির স্থান জান্নাতের অধিকারী হওয়ার সূত্র ও উপায় জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ। জিহাদে অংশগ্রহণ করিবার পর জীবন ও গনীমতসহ প্রত্যাবর্তনকারী মুজাহিদ এবং শাহাদাত বরণকারী মুজাহিদ উভয়ের জন্য রহিয়াছে অপরিসীম সওয়াব ও প্রতিদানের প্রতিশ্রুতি। তবে শহীদের জন্য রহিয়াছে অতি সমুন্নত মর্যাদা, অবর্ণনীয় ও অকল্পনীয় সুখ শান্তির অংগীকার।
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ هَاجَرُوا وَجْهَدُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أُولَئِكَ يَرْجُونَ رَحْمَتَ اللَّهِ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ. "যাহারা ঈমান আনে এবং যাহারা হিজরত করে ও জিহাদ করে আল্লাহ্ পথে, তাহারাই আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশা করে। আল্লাহ ক্ষমাপরায়ণ, পরম দয়ালু” (২ : ২১৮)।
وَلَئِنْ قُتِلْتُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَوْ مُتُّمْ لَمَغْفِرَةٌ مِّنَ اللَّهِ وَرَحْمَةٌ خَيْرٌ مِّمَّا يَجْمَعُوْنَ. "তোমরা আল্লাহ্র পথে নিহত হইলে অথবা মৃত্যুবরণ করিলে, যাহা তাহারা জমা করে, আল্লাহ্ ক্ষমা ও দয়া অবশ্যই উহা অপেক্ষা শ্রেয়” (৩ : ১৫৭)।
فَلْيُقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يَشْرُوْنَ الْحَيُوةَ الدُّنْيَا بِالْآخِرَةِ وَمَنْ يُقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيُقْتَلْ أَوْ يَغْلِبُ فَسَوْفَ نُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا . "সুতরাং যাহারা আখিরাতের বিনিময়ে পার্থিব জীবন বিক্রয় করে তাহারা আল্লাহ্র পথে সংগ্রাম করুক এবং কেহ আল্লাহর পথে সংগ্রাম করিলে সে নিহত হউক অথবা বিজয়ী হউক আমি তাহাকে মহাপুরস্কার দান করিবই” (৪ : ৭৪)।
فَاسْتَجَابَ لَهُمْ رَبُّهُمْ أَنِّي لَا أَضِيعُ عَمَلَ عَامِلٍ مِّنْكُمْ مِّنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى بَعْضُكُمْ مِّنْ بَعْضٍ فَالَّذِينَ هَاجَرُوا وَأُخْرِجُوا مِنْ دِيَارِهِمْ وَأُوذُوا فِي سَبِيلِي وَقَتَلُوا وَقُتِلُوا لَأُكَفِّرَنَّ عَنْهُمْ سَيِّاتِهِمْ وَلَأُدْخِلَنَّهُمْ جَنَّتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ ثَوَابًا مِّنْ عِنْدِ اللَّهِ وَاللَّهُ عِنْدَهُ حُسْنُ الثَّوَاب. "অতঃপর তাহাদের প্রতিপালক তাহাদের ডাকে সাড়া দিয়া বলেন, আমি তোমাদের মধ্যে কর্মে নিষ্ঠ কোন নর অথবা নারীর কর্ম বিফল করি না; তোমরা একে অপরের অংশ। সুতরাং যাহারা হিজরত করিয়াছে, নিজ গৃহ হইতে উৎখাত হইয়াছে, আমার পথে নির্যাতিত হইয়াছে এবং যুদ্ধ করিয়াছে ও নিহত হইয়াছে আমি তাহাদের পাপ কার্যগুলি অবশ্যই দূরীভূত করিব এবং অবশ্যই তাহাদিগকে দাখিল করিব জান্নাতে, যাহার পাদদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত। ইহা আল্লাহ্র নিকট হইতে পুরস্কার; উত্তম পুরস্কার আল্লাহ্রই নিকট" (৩: ১৯৫)।
**জিহাদ মু'মিনের সফলতার চাবিকাঠি**
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَابْتَغُوا إِلَيْهِ الوَسِيلَةَ وَجَاهِدُوا فِي سَبِيلِهِ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ. "হে মু'মিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তাঁহার নৈকট্য লাভের উপায় অন্বেষণ কর ও তাঁহার পথে জিহাদ কর যাহাতে তোমরা সফলকাম হইতে পার" (৫:৩৫)।
এই আয়াতের তাফসীরে মুফাসসিরগণ লিখিয়াছেন, "এই আয়াতে প্রথমত আল্লাহ তা'আলা তাকওয়া অবলম্বন এবং ঈমান ও নেক আমল দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের হিদায়াত দানের পরে "তাঁহার পথে জিহাদ কর" ইরশাদ করিয়াছেন। ইহার মর্ম এই যে, জিহাদ নেক আমলের তালিকাভুক্ত অন্যতম সৎকর্ম। জিহাদের স্থান অতি ঊর্ধ্বে তাহা বুঝাইবার জন্য স্বতন্ত্ররূপে উল্লিখিত হইয়াছে। ডাকাতি, লুটতরাজ ও অন্যায়ভাবে বিদ্রোহের মাধ্যমে যে খুনখারাবী ও সম্পদ লুণ্ঠন সংঘটিত হয় উহা শুধু ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার নিকৃষ্ট উদ্দেশ্যে হইয়া থাকে। জিহাদে নরহত্যা ইত্যাদি সংঘটিত হইলে উহাতে একমাত্র উদ্দেশ্য থাকে আল্লাহ্র কলেমা সমুন্নত করা এবং পৃথিবীর বুক হইতে জুলুম-নির্যাতন নির্মূল করা (তাফসীরে মা'আরিফুল কুরআন, ৩খ., পৃ. ১২৮: তাফসীরে ইব্ন কাছীর, ২খ., পৃ. ৫৩-৫৪)।
**জিহাদ প্রকৃত ঈমানের মাপকাঠি**
وَالَّذِينَ آمَنُوا وَهَاجَرُوا وَجَاهَدُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالَّذِينَ أَوْوْا وَنَصَرُوا أُولَئِكَ هُمُ الْمُؤْمِنُونَ حَقًّا لَهُمْ مَّغْفِرَةٌ وَرِزْقٌ كَرِيمٌ.. "যাহারা ঈমান আনিয়াছে, হিজরত করিয়াছে ও আল্লাহ্র পথে জিহাদ করিয়াছে এবং যাহারা (হিজরতকারী মুজাহিদগণকে) আশ্রয় দান করিয়াছে ও সাহায্য করিয়াছে তাহারাই প্রকৃত মুমিন। তাহাদের জন্য রহিয়াছে ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিকা" (৮:৭৪)।
আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই জিহাদের উদ্দেশ্য। যেমন আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে:
الَّذِينَ آمَنُوا وَهَاجَرُوا وَجْهَدُوا فِي سَبِيلِ اللهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ أَعْظَمُ دَرَجَةً عِنْدَ اللَّهِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْفَائِزُونَ. يُبَشِّرُهُمْ رَبُّهُمْ بِرَحْمَةٍ مِّنْهُ وَرِضْوَانٍ وَجَنَّتٍ لَّهُمْ فِيهَا نَعِيمٌ مُّقِيمٌ. "যাহারা ঈমান আনে, হিজরত করে এবং নিজেদের সম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহ্র পথে জিহাদ করে তাহারা আল্লাহ্র নিকট মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ, আর তাহারাই সফলকাম। উহাদের প্রতিপালক উহাদিগকে সুসংবাদ দিতেছেন, স্বীয় দয়া ও সন্তোষের এবং জান্নাতের, যেখানে তাহাদের জন্য আছে স্থায়ী সুখ-শান্তি” (৯: ২০-২২)।
জিহাদের মাধ্যমে মাগফিরাত লাভ হয়। আল-কুরআনে ইরশাদ হইতেছে:
ثُمَّ إِنَّ رَبَّكَ لِلَّذِينَ هَاجَرُوا مِنْ بَعْدِ مَا فُتِنُوا ثُمَّ جَهَدُوا وَصَبَرُوا إِنَّ رَبَّكَ مِنْ بَعْدِهَا لَغَفُورٌ رَّحِيمٌ. "যাহারা নির্যাতিত হইবার পর হিজরত করে, পরে জিহাদ করে এবং ধৈর্য ধারণ করে, তোমার প্রতিপালক এই সবের পর তাহাদের প্রতি অবশ্যই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু" (১৬: ১১০)।
জিহাদের জানমাল উৎসর্গ করিবার ফযীলাত এবং যথাসময়ে ব্যয়ের সবিশেষ গুরুত্ব ও মাহাত্ম বর্ণিত হইয়াছে। আল-কুরআনে বলা হইয়াছে:
لا يَسْتَوِي الْقُعَدُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ غَيْرُ أُولى الضَّرَرِ وَالْمُجْهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ فَضَّلَ اللهُ المُجْهِدِيْنَ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ عَلَى الْقُعِدِينَ دَرَجَةً وَكُلاً وَعَدَ اللهُ الْحُسْنَى وَفَضَّلَ اللهُ المُجْهِدِيْنَ عَلَى الْقَعِدِينَ اَجْرًا عَظِيمًا . دَرَجَتٍ مِّنْهُ وَمَغْفِرَةً وَرَحْمَةً وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا. "মু'মিনদের মধ্যে যাহারা অক্ষম নহে অথচ ঘরে বসিয়া থাকে এবং যাহারা আল্লাহ্র পথে স্বীয় সম্পদ ও জীবন দ্বারা জিহাদ করে তাহারা পরস্পর সমান নহে। যাহারা স্বীয় সম্পদ ও জীবন দ্বারা জিহাদ করে আল্লাহ তাহাদিগকে, যাহারা ঘরে বসিয়া থাকে তাহাদের উপর মর্যাদা দিয়াছেন। আল্লাহ সকলকেই কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়াছেন। যাহারা ঘরে বসিয়া থাকে তাহাদের উপর যাহারা জিহাদ করে তাহাদিগকে আল্লাহ্ মহা পুরস্কারের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়াছেন। ইহা তাঁহার নিকট হইতে মর্যাদা, ক্ষমা ও রহমত; আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু" (৪:৯৫-৯৬; আরও দ্র. ৫৭:১০)।
يٰأَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا إِنْ تَنْصُرُوا اللّٰهَ يَنْصُرْكُمْ وَيُثَبِّتْ أَقْدَامَكُمْ. "হে মু’মিনগণ! যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর আল্লাহ তোমাদিগকে সাহায্য করিবেন এবং তোমাদের পদসমূহ দৃঢ় করিবেন” (৪৭:৭)।
মু’মিনের জীবন ও সম্পদ বিক্রীত বটে; আল্লাহ ইহার ক্রেতা এবং ইহার বিনিময় তাঁহার সন্তুষ্টি ও জান্নাত। বিক্রীত পণ্য সমর্পণের পদ্ধতি জিহাদে ধন ও প্রাণ উৎসর্গীত করা। কাজেই মু’মিনের ক্ষুদ্র-বৃহৎ যে কোন ব্যয় এবং নগণ্য ও বড় যে কোন দুঃখ-কষ্ট আল্লাহ্ জন্যই নিবেদিত। যেমন:
يٰأَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلٰى تِجَارَةٍ تُنْجِيْكُمْ مِّنْ عَذَابٍ أَلِيْمٍ تُؤْمِنُوْنَ بِاللّٰهِ وَرَسُوْلِهِ وَتُجَاهِدُوْنَ فِيْ سَبِيْلِ اللّٰهِ بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ ذٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ. "হে মু’মিনগণ! আমি কি তোমাদিগকে এমন এক বাণিজ্যের সন্ধান দিব যাহা তোমাদিগকে রক্ষা করিবে মর্মন্তুদ শাস্তি হইতে? উহা এই যে, তোমরা আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলে বিশ্বাস স্থাপন করিবে এবং তোমাদের ধন-সম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহ্ পথে জিহাদ করিবে। ইহাই তোমাদের জন্য শ্রেয় যদি তোমরা জানিতে” (৬১: ১০-১৪)!
إِنَّ اللّٰهَ اشْتَرٰى مِنَ الْمُؤْمِنِيْنَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ يُقَاتِلُوْنَ فِيْ سَبِيْلِ اللّٰهِ فَيَقْتُلُوْنَ وَيُقْتَلُوْنَ وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيْلِ وَالْقُرْآنِ وَمَنْ أَوْفٰى بِعَهْدِهِ مِنَ اللّٰهِ فَاسْتَبْشِرُوْا بِبَيْعِكُمُ الَّذِيْ بَايَعْتُمْ بِهِ وَذٰلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيْمُ. "নিশ্চয় আল্লাহ মু’মিনদের নিকট হইতে ক্রয় করিয়া লইয়াছেন তাহাদের জীবন ও সম্পদ, ইহার বিনিময়ে তাহাদের জন্য জান্নাত রহিয়াছে। তাহারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে, নিধন করে এবং নিহত হয়। তাওরাত ইনজীল ও কুরআনে এই সম্পর্কে তাহাদের প্রতি দৃঢ় প্রতিশ্রুতি রহিয়াছে। নিজ প্রতিজ্ঞা পালনে আল্লাহ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর কে আছে? তোমরা যে সওদা করিয়াছ সেই সওদার জন্য আনন্দিত হও এবং উহাই তো মহাসাফল্য” (৯:১১১)।
পবিত্র কুরআনের আরও বহু আয়াতে জিহাদের বিভিন্ন ফযীলাতের বিবরণ রহিয়াছে। বিশেষত জিহাদে জীবন উৎসর্গকারী শহীদের ফযীলাত বর্ণিত হইয়াছে উচ্চাংগ অনুপম ধারায়।
وَلَا تَقُولُوا لِمَنْ يُقْتَلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتٌ بَلْ أَحْيَاءٌ وَلَكِنْ لَا تَشْعُرُونَ. "আল্লাহ্র পথে যাহারা নিহত হয় তোমরা তাহাদিগকে, মৃত বলিও না, বরং তাহারা জীবিত; কিন্তু তোমরা উপলব্ধি করিতে পার না” (২: ১৫৪; আরও দ্র. ৩: ১৬৯-৭১)।
وَالَّذِينَ هَاجَرُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ ثُمَّ قُتِلُوا أَوْ مَاتُوا لَيَرْزُقَنَّهُمُ اللَّهُ رِزْقًا حَسَنًا وَإِنَّ اللَّهَ لَهُوَ خَيْرُ الرِّزْقِينَ. "এবং যাহারা হিজরত করিয়াছে আল্লাহর পথে, অতঃপর নিহত হইয়াছে অথবা মারা গিয়াছে তাহাদিগকে আল্লাহ অবশ্যই উৎকৃষ্ট জীবিকা দান করিবেন। আর নিশ্চয় আল্লাহ, তিনি তো সর্বোৎকৃষ্ট রিযিকদাতা” (২২ঃ ৫৮)।
বস্তুত শহীদগণ অমর ও আনন্দময় জীবনের অধিকারী হন। তাঁহাদের জীবন মান ও আনন্দের পরিধি ও ধরন অন্যদের ঈর্ষার বিষয়। হাদীছে ইহার বিশদ বিস্তৃত বিবরণ আছে।
**হাদীছে জিহাদের ফযীলাত ও মাহাত্ম্য**
**সর্বোত্তম আমল:** আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা) হইতে বর্ণিত। আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে জিজ্ঞাসা করিলাম, সর্বোত্তম আমল কোনটি? তিনি বলিলেন, "যথাসময়ে সালাত আদায় করা"। আমি বলিলাম, অতঃপর কোনটি? তিনি বলিলেন, "পিতা-মাতার আনুগত্য ও তাহাদের প্রতি সদাচরণ। আমি বলিলাম, অতঃপর কোনটি? তিনি বলিলেন, "আল্লাহর পথে জিহাদ করা" (বুখারী, কিতাবুল জিহাদ, বাব ১, হাদীছ নং ২৭৮২)।
**সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি:** আবু সাঈদ খুদরী (রা) হইতে বর্ণিত। এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-কে জিজ্ঞাসা করিল, সর্বোত্তম ব্যক্তি কে? তিনি বলিলেন, "সেই মু'মিন ব্যক্তি যে তাহার সম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করে" (বুখারী, কিতাবুল জিহাদ, বাব ১, হাদীছ নং ২৭৮৬; মুসলিম ২খ., পৃ. ১৩৬)।
আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, من خير معاش الناس لهم رجل ممسك عنان فرسه في سبيل الله يطير على متنه كلما سمع هيعة او فزعة طار عليه يبتغى القتل او الموت مظانه. "জীবন যাপনে মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম অবস্থার অধিকারীদের অন্তর্ভুক্ত সেই ব্যক্তি যে আল্লাহ্ পথে তাহার ঘোড়ার লাগাম ধরিয়া রাখে (সদা প্রস্তুত থাকে), উহার পিঠে উড়িয়া চলে, যখনই শত্রুদলের আগমনের আওয়াজ কিংবা ভীতিকর ধ্বনি শুনিতে পায় তখন সে উহার পিঠে উড়িয়া যায় এবং জীবননাশ ও মৃত্যুর ক্ষেত্রসমূহ খুঁজিতে থাকে” (মুসলিম, ২খ., পৃ. ১৩৬; নববীর ব্যাখ্যাসহ)।
**জিহাদের সমতুল্য আমল:** আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া বলিল, আমাকে জিহাদের সমতুল্য কোন আমল বলিয়া দিন। তিনি বলিলেন: আমি তাহা দেখিতেছি না। পরে তিনি বলিলেন, তুমি কি এইরূপ করিতে পারিবে যে, যখন মুজাহিদ বাহির হইয়া যায় তখন তুমি তোমার মসজিদে (সালাতের স্থানে) প্রবেশ করিবে, অতঃপর বিরতিহীনভাবে সালাতে দাঁড়াইয়া থাকিবে এবং সিয়াম পালন করিবে, ইফতার করিবে না" (বুখারী, কিতাবুল জিহাদ, বাব ১, হাদীছ নং ২৭৮৫)?
সহীহ মুসলিমে আবু হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত আছে যে, তাহরা (প্রশ্নকারীরা) উহা করিতে সমর্থ হইবে না। তাহারা দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করিলে প্রতিবারে তিনি (স) বলিলেন, لا يستطيعوه তৃতীয়বারে বলিলেন : مثل المجاهد في سبيل الله كمثل الصائم القائم القانت بايات الله لا يفتر من صيام ولا صلوة حتى يرجع المجاهد في سبيل الله تعالى. "আল্লাহ্ পথের মুজাহিদের অবস্থা সেই সিয়াম পালনকারী, ইবাদাতে দণ্ডায়মান, আল্লাহর আয়াতসমূহ (তিলাওয়াত ও) প্রতিপালনকারীর ন্যায় যে আল্লাহ তা'আলার পথের মুজাহিদ প্রত্যাগমন পর্যন্ত সালাত, সিয়াম ও ইবাদাতে বিরতি দেয় না" (মুসলিম, ২খ., পৃ. ১৩৪; বুখারী, হাদীছ নং ২৭৮৭)।
**জিহাদের ফযীলাত ধাপে ধাপে**
**আল্লাহর পথে জিহাদের এক সকাল বা বিকাল:** হযরত আবূ আয়্যব, সাহল ইবন সা'দ, আবূ হুরায়রা ও আনাস (রা) প্রমুখ সাহাবী হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: الغدوة في سبيل الله او روحة خير من الدنيا وما فيها . "আল্লাহ্ পথে জিহাদের একটি সকাল কিংবা একটি বিকাল দুনিয়া ও ইহার অভ্যন্তরে যাহা কিছু আছে উহা হইতে উত্তম"। অপর বর্ণনায় আছেঃ "আল্লাহ্র পথে এক সকাল অথবা এক বিকাল যাহার উপর সূর্য উদিয় হয় ও অস্তমিত হয় তাহার চাইতে উত্তম" (বুখারী, কিতাবুল জিহাদ, বাব ৫, ৬, হাদীছ নং ২৭৯২, ২৭৯৩, ২৭৯৪, ২৭৯৬; মুসলিম, ২খ., ১৩৪, পৃ. ১৩৫)।
উক্ত হাদীছের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবন হাজার একটি হাদীছ উল্লেখ করিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স) একটি সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করিলেন যাহাতে আবদুল্লাহ ইব্ন্ন রাওয়াহা (রা)-ও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। বাহিনী রওয়ানা হইয়া গেলে ইব্ন রাওয়াহা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত এক ওয়াক্ত সালাতে উপস্থিত থাকিবার উদ্দেশ্যে কিছু সময় বিলম্ব করিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে বলিলেন : والذي نفسي بيده لو انفقت ما في الارض ما ادركت فضل غدوتهم. "যাঁহার হাতে আমার জীবন তাঁহার কসম! সমগ্র পৃথিবীতে যাহা আছে উহা ব্যয় করিলেও তুমি তাহাদের এক সকালের ফযীলাত আহরণ করিতে পারিবে না"। ইহাতে বুঝা যায় যে, আল্লাহ্ পথের এক সকাল বা এক বিকাল দুনিয়া হইতে উত্তম হওয়ার অর্থ দুনিয়ার সমস্ত সম্পদ ব্যয় করা হইতেও উত্তম (ফাতহুল বারী, ৬খ., পৃ. ১৮)।
**জিহাদে প্রহরীর দায়িত্ব পালন:** আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: طوبي لعبد اخد بعنان فرسه في سبيل الله اشعث رأسه مغبرة قدماه ان كان في الحراسة كان في الحراسة وان كان في الساقة كان في الساقة ان استأذن لم يؤذن له وان شفع لم يشفع. "অতিশয় সৌভাগ্যবান সেই বান্দা যে আল্লাহ্র পথে তাহার ঘোড়ার লাগাম ধরিয়া চলিতে থাকে। তাহার মাথা উস্কো-খুস্কো, দুই পা ধুলি মাখা। তাহাকে প্রহরার দায়িত্ব দেওয়া হইলে সে প্রহরায় নিয়োজিত থাকে, বাহিনীর পশ্চাদভাগে দায়িত্ব দেওয়া হইলে পশ্চাদভাগেই দায়িত্ব পালনে নিবেদিত থাকে। সে অনুমতি প্রার্থনা করিলে তাহাকে অনুমতি দেওয়া হয় না এবং কাহারও জন্য সুপারিশ করিলে তাহার সুপারিশ গ্রহণ করা হয় না" (বুখারী, কিতাবুল জিহাদ, বাব ৭০, হাদীছ নং ২৮৮৭)।
সাহল ইব্দুল হানজালিয়া (রা) হইতে বর্ণিত: হুনায়ন (হাওয়াযিন) যুদ্ধকালে এক রাত্রে রাসূলুল্লাহ (স) নৈশ প্রহরার দায়িত্ব পালনের আহবান জানাইলে আনাস ইব্ন আবূ মারছাদ গানাবী (রা) এই দায়িত্ব পালনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে গিরিপথে অবস্থান করিয়া সতর্কতার সহিত প্রহরার দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিলেন। সারা রাত্রি প্রহরার দায়িত্ব পালনের পর সকালে তিনি ফিরিয়া আসিলে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে বলিলেন: আজ রাত্রে কি তুমি নিচে নামিয়াছিলে? আনাস বলিলেন, সালাত ও প্রাকৃতিক প্রয়োজন ব্যতীত নহে। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে বলিলেন: তুমি (জান্নাত) অবধারিত করিয়া লইয়াছ। সুতরাং ইহার পর তুমি আর কোন (নফল) আমল না করিলেও তোমার কোন ক্ষতি হইবে না (আবূ দাউদ, কিতাবুল জিহাদ, ১খ., পৃ. ৩৩৮, ৩৩৯)।
رباط يوم في سبيل الله خير من الدنيا وما عليها. "আল্লাহ্র পথে এক দিনের জন্য (ইসলামী রাষ্ট্রের) সীমান্ত প্রহরা দেওয়া দুনিয়া ও তাহাতে যাহা কিছু আছে উহা হইতে উত্তম” (বুখারী, কিতাবুল জিহাদ, বাব ৭৩, হাদীছ নং ২৮৯২)।
সালমান (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: رباط يوم وليلة خير من صيام شهر وقيامه وان مات جرى عليه عمله الذي كان يعمله واجرى عليه رزقه وامن الفتان "এক দিন ও এক রাত্রের সীমান্ত প্রহরা এক মাসের সিয়াম পালন ও ইবাদতে রাত্রি জাগরণ হইতে উত্তম। তাহার মৃত্যু হইলে সে যে কাজ করিতেছিল তাহার নামে উহা অব্যাহত থাকিবে ও তাহার জন্য রিযিক বরাদ্দ থাকিবে এবং তাহাকে বিপদে নিক্ষেপকারীদের হইতে নিরাপত্তা দেওয়া হইবে" (মুসলিম, ২খ., পৃ. ১৪২)।
ফাদালা ইবন উবায়দ (রা) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: كل الميت يختم على عمله الا المرابط فانه ينمو له عمله الى يوم القيامة وامن فتان القبر. "সকল মৃত ব্যক্তির (আমলের) পরিসমাপ্তি ঘটিবে কিন্তু সীমান্ত প্রহরী; তাহার আমল কিয়ামত পর্যন্ত পাইতে থাকিবে এবং কবরে বিপদগ্রস্তকারী (মুনকার-নাকীর) হইতে নিরাপদ থাকিবে” (আবূ দাউদ, ১খ., কিতাবুল জিহাদ, পৃ. ৩৩৮)।
**জিহাদ হইতে প্রত্যাবর্তনও জিহাদে গমনের সমতুল্য:** আবদুল্লাহ ইব্ন আম্র (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, قفلة كفزوة "(যুদ্ধ হইতে) প্রত্যাবর্তন (অথবা পুনঃ অভিযানে গমন) জিহাদ অভিযানের ন্যায়” (আবু দাউদ, কিতাবুল জিহাদ, ১খ., পৃ. ৩৩৬)।
**মুজাহিদের মর্যাদার স্তরসমূহ:** আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: من امن بالله وبرسوله واقام الصلاة وصام رمضان كان حقا على الله ان يدخله الجنة جاهد في سبيل الله او جلس في ارضه التي ولد فيها . "যে ব্যক্তি আল্লাহকে ও তাঁহার রাসূলকে বিশ্বাস করিবে, সালাত কায়েম করিবে, রমযানের সিয়াম পালন করিবে তাহাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো আল্লাহর কর্তব্য হইয়া যাইবে। সে আল্লাহ্ পথে জিহাদ করুক অথবা যে ভূমিতে তাহার জন্ম হইয়াছে সেইখানে বসিয়া থাকুক"। তাহারা বলিল, আমরা লোকদিগকে (এই) সুসংবাদ পৌঁছাইয়া দিব কি? তিনি বলিলেন: ان في الجنة مائة درجة اعدها الله للمجاهدين في سبيل الله ما بين الدرجتين كما بين السماء والارض "নিশ্চয় জান্নাতে এক শতটি মর্যাদার স্তর রহিয়াছে যাহা মহান আল্লাহ তাঁহার পথের মুজাহিদগণের জন্য প্রস্তুত করিয়া রাখিয়াছেন, যাহার প্রতি দুই স্তরের মধ্যকার ব্যবধান আসমান ও যমীনের মধ্যবর্তী দূরত্বের সমান" (বুখারী, কিতাবুল জিহাদ, বাব ৪, হাদীছ নং ২৭৯০, ৭৪২৩)।
**মুজাহিদের পায়ের ধুলি:** অবদুর রহমান ইন্ন জার (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: ما اغبرت قدما عبد في سبيل الله (ساعة من النهار) فتمسه النار. "কোন বান্দার দুই পা আল্লাহ্র পথে জিহাদে গমন করার ফলে ধূলিমাখা হইলে আগুন তাহাকে স্পর্শ করিবে না” (বুখারী, হাদীছ নং ২৮১; জিহাদ বাব ১৬; ফাতহুল বারী, ৬খ., পৃ. ৩৬)।
**আল্লাহ মুজাহিদের যামিন:** আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: تكفل الله لمن جاهد في سبيله لا يخرجه من بيته الا جهاد في سبيله وتصديق كلمته بان يدخله الجنة أو يرجعه الى مسكنه الذى خرج منه مع ما نال من اجر او غنيمة. "যে ব্যক্তি আল্লাহ্র পথে জিহাদ করে এবং তাঁহার পথে জিহাদ করা ও তাঁহার কলেমার প্রতি বিশ্বাসই তাহাকে তাহার বাড়ী হইতে বাহির করে, তাহার ব্যাপারে আল্লাহ এই যামানত গ্রহণ করিয়াছেন যে, তাহাকে জান্নাতে প্রবেশ করাইবেন অথবা তাহাকে তাহার প্রাপ্ত সওয়ার ও গনীমতসহ তাঁহার সেই নিবাসে পৌছাইয়া দিবেন যেখান হইতে সে বাহির হইয়াছিল” (মুসলিম, ২খ., জিহাদ, পৃ. ১৩৩)।
আবূ উমামা আল-বাহিলী (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: ثلثة كلهم ضامن على الله عز وجل رجل خرج غازيا في سبيل الله عز وجل فهو ضامن على الله حتى يتوفهاه فيدخله الجنة او يرده مما نال من اجر او عنيمة. "তিন ব্যক্তির প্রত্যেকেই মহান আল্লাহ্র দায়িত্বে। (এক) যে ব্যক্তি আল্লাহ্ পথে গাযী (মুজাহিদ)-রূপে বাহির হইল সে আল্লাহর দায়িত্বে— তিনি তাহাকে মৃত্যু দান করিয়া জান্নাতে প্রবেশ করাইবেন অথবা তাহার প্রাপ্ত সওয়াব ও 'গনীমতসহ (তাহার বাড়িতে) ফিরাইয়া আনিবেন” (আবূ দাউদ, ১খ., জিহাদ, পৃ. ৩৩৭)।
**মুজাহিদের নিদ্রাও জাগরণ সমতুল্য:** মু'আয ইবন জাবাল (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: “যুদ্ধাভিযান দুই প্রকার। (এক) যে ব্যক্তি আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অন্বেষণ করিল, নেতার আনুগত্য করিল, প্রিয় সম্পদ ব্যয় করিল, সংগীর সহিত সহজ আচরণ করিল এবং মন্দ কর্ম হইতে আত্মরক্ষা করিল তাহার নিদ্রা ও জাগরণ সবই সওয়াব” (আবূ দাউদ, জিহাদ, ১খ., ৩৪১)।
**মুজাহিদের দু'আ কবুলের নিশ্চয়তা:** সাহল ইবন সা'দ (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, "দুইটি দু'আ প্রত্যাখ্যাত হয় না অথবা অতি অল্পই প্রত্যাখ্যাত হয়। (এক) আযানের সময় দু'আ এবং (দুই) যুদ্ধ চলাকালে যখন একে অপরকে প্রচণ্ড আক্রমণ করিতে থাকে” (আবূ দাউদ, জিহাদ, ১খ., পৃ. ৩৪৪)।
আবূ সাঈদ খুদরী (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বনূ লিহয়ান অভিমুখে বাহিনী প্রেরণের সময় বলিলেন: “প্রতি দুইজনের মধ্য হইতে একজন যুদ্ধে যাইবে এবং সওয়াব তাহাদের মধ্যে সম্মিলিত হইবে” (মুসলিম, ইমরা, ২খ., পৃ. ১৩৮)।
**মুজাহিদের পরিবারস্থ নারীদের মর্যাদা:** বুরায়দা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: حرمة نساء المجاهدين على القاعدين كحرمة امهاتهم وما من رجل من القاعدين يخلف رجلا من المجاهدين في اهله فيخونه فيهم الا وقف له يوم القيامة .... وقال فخذ من حسناته ما شئت فالتفت الينا رسول الله ﷺ فقال فما ظنكم. "বাড়ীতে অবস্থানকারীদের দায়িত্বে জিহাদে গমনকারী নারীদের মর্যাদা তাহাদের মায়েদের মর্যাদার ন্যায়। বাড়িতে অবস্থানকারী যে ব্যক্তি কোন মুজাহিদের অনুপস্থিতিতে তাহার পরিবারের দেখাশুনা করিল এবং তাহাতে বিশ্বাসঘাতকতা করিল, তবে কিয়ামতের দিন তাহাকে দাঁড় করাইয়া দিয়া (মুজাহিদকে) বলা হইবে, তুমি তাহার আমল হইতে তোমার যাহা মন চায় নিয়া নাও। এই কথা বলিবার সময় রাসূলুল্লাহ (স) আমাদের দিকে দৃষ্টি প্রদান করিয়া বলিলেনঃ তোমাদের কী ধারণা যে, এইরূপ সুযোগ দেওয়া হইলে সে কি করিবে (এবং মুজাহিদ পরিবারের নারীর মর্যাদা কত উচ্চ)" (মুসলিম, ২খ., ১৩৮; আবু দাউদ, ১খ., পৃ. ৩৩৮)।
**জিহাদের অভিযানকালে সাধারণ মৃত্যুও শাহাদাততুল্য**
আনাস (রা)-এর খালা উম্মু হারাম বিনতে মিলহান (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) একদিন আমাদের এখানে দ্বিপ্রহরের বিশ্রাম করিলেন এবং ঘুমাইয়া পড়িলেন। পরে তিনি হাসিমুখে জাগ্রত হইলে আমি বলিলাম, আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য কুরবান হউন। আপনার হাসিবার কারণ কি? তিনি বলিলেন: আমার উম্মতের কিছু লোকের দৃশ্য আমাকে (স্বপ্নে) দেখানো হইয়াছে যাহারা এই মহাসাগরের বিক্ষুব্ধ তরংগের উপর আরোহণ করিবে, তাহারা যেন সিংহাসনে সমাসীন রাজা-বাদশাহ। উম্মু হারাম (রা) বলেন, আমি বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! দু'আ করুন, আল্লাহ যেন আমাকে তাহাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি দু'আ করিলেন এবং বলিলেন, তুমি তাহাদের অন্তর্ভুক্ত থাকিবে। অতঃপর তিনি দ্বিতীয়বার নিদ্রা গেলেন এবং পূর্বানুরূপ করিলেন। উম্মু হারাম (রা)-ও পূর্বানুরূপ বলিলে তিনি পূর্বানুরূপ জবাব দিলে। উম্মু হারাম বলিলেন, আমাকে তাহাদের অন্তর্ভুক্ত করিবার জন্য আল্লাহর নিকট দু'আ করুন। তিনি বলিলেন, তুমি প্রথম দলে। পরবর্তী কালে হযরত মু'আবিয়া (রা)-এর নেতৃত্বে প্রথম (মুসলিম) নৌবাহিনীর অভিযানকালে উম্মু হারাম (রা) তাঁহার স্বামী 'উবাদা ইবনুস সামিত (রা)-এর সহিত অভিযানে বাহির হইলেন। অভিযান হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়া তাঁহারা শামে অবস্থান করিলেন। এই সময় তাঁহার আরোহণের জন্য একটি জন্তুযান তাঁহার নিকট লইয়া আসা হইল। তিনি জন্তযানে উঠিবার সময় উহা তাঁহাকে ফেলিয়া দিলে উহাতে তিনি ইনতিকাল করিলেন (বুখারী, কিতাবুল জিহাদ, হাদীছ নং ২৭৯৯-২৮০০, ২৮৭৭-২৮৭৮; মুসলিম, ২খ., ১৪১, ১৪২)।
আবূ হুরায়রা (রা) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: من لقى الله بغير اثر من جهاد لقى الله وفيه ثلمة. "যে ব্যক্তি জিহাদের কোন প্রকার আলামত ব্যতীত আল্লাহ্ সাক্ষাতে উপস্থি হইবে সে নিজের মধ্যে ত্রুটি ও অপূর্ণতা সহকারে আল্লাহ্ সাক্ষাতে উপস্থি হইবে” (তিরমিযী, ফাদাইলুল জিহাদ, ১খ., পৃ. ২০০)।
**জিহাদের ধুলি, জিহাদের চিহ্ন ও রক্তবিন্দু:** আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, لا يلج النار رجل بكى من خشية الله حتى يعود اللبن في الضرع ولا يجتمع غبار في سبيل الله ودخان جهنم. "আল্লাহ্র ভয়ে যে ব্যক্তি ক্রন্দন করিয়াছে সে জাহান্নামে প্রবেশ করিবে না, যতক্ষণ না দুধ স্তনে ফিরিয়া যাইবে এবং আল্লাহ্ পথের ধুলিকণা ও জাহান্নামের ধুয়া একত্র হইবে না" (তিরমিযী, ১খ., পৃ. ১৯৬-১৯৭)。
আবূ উমামা (রা) সূত্রে নবী (স) বলিয়াছেন : ليس شيئ احب الى الله من قطرتين واثرين قطرة دموع من خشية الله وقطرة دم تهراق في سبيل الله واما الاثران فاثر في سبيل الله واثر في فريضة من فرائض الله. "দুইটি ফোঁটা ও দুইটি চিহ্নের ন্যায় অন্য কিছু আল্লাহ্র অধিক প্রিয় নহে। (১) আল্লাহ্র ভয়ে অশ্রুর ফোঁটা এবং (২) আল্লাহ্র পথে প্রবাহিত রক্তের ফোঁটা। চিহ্ন দুইটি (১) আল্লাহ্র পথে (জিহাদের) চিহ্ন (দাগ) (২) এবং আল্লাহর (অন্যান্য) ফরযসমূহের কোন ফরয পালনের চিহ্ন" (তিরমিযী, ১খ., পৃ. ২০০)।
**জিহাদের উপকরণ :** আবদুল্লাহ ইব্ন আবূ আওফা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসলূল্লাহ (স) বলিয়াছেন: واعلموا ان الجنة تحت ظلال السيوف. "জানিয়া রাখ! জান্নাত তরবারির ছায়াতলে" (বুখারী, জিহাদ, বাব ২২, হাদীছ নং ২৮১৮, ২৮৬৬)।
আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: بعثت بين يدى الساعة مع السيف وجعل رزقي تحت ظل رمحي. "আমি কিয়ামতের পূর্বক্ষণে প্রেরিত হইয়াছি তরবারি সহকারে এবং আমার রিযিক রাখা হইয়াছে আমার বর্শার ছায়াতলে” (বুখারী, কিতাবুল জিহাদ, বাব ৮৮; ফাতহুল বারী, ৬খ., পৃ. ১১৬)।
উকবা ইব্ন আমের (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে মিম্বারের উপরে বলিতে শুনিয়াছি: واعدوا لهم ما استطعتم من قوة الا ان القوة الرمي الا أن القوة الرمي الا ان القوة الرمي . "তোমরা তাহাদের (শত্রুদের) মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত রাখিবে যথাসাধ্য শক্তি" (৮ঃ ৬০)। শুনিয়া রাখ! শক্তি হইল তীরন্দাযী (দূর নিক্ষেপক অস্ত্র), শক্তি হইল তীরন্দাযী, শক্তি হইল তীরন্দাযী” (মুসলিম, ২খ., পৃ. ১৪৩; কিতাবুল ইমারা)। উকবা ইবন 'আমের (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিতে শুনিয়াছি : ستفتح عليكم ارضون ويكفيكم الله فلا يعجز احدكم ان يلهو باسهمه. "অচিরেই বহু এলাকা তোমাদের জন্য বিজিত হইবে এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য যথেষ্ট হইবেন। তবে তোমাদের কেহ যেন তাহার তীর ছুড়িতে অপারগ না হয়" (মুসলিম, ২খ., পৃ. ১৪৩)।
উকবা ইবন 'আমের (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিতে শুনিয়াছি : ان الله عز وجل يدخل بالسهم الواحد ثلثة نفر الجنة صانعه يحتسب في صنعته الخير والرامى به و منبله والممد به ارموا واركبوا ولان ترموا احب الى من ان تركبوا كل ما يلهو به الرجل المسلم باطل الأرميه بقوس وتادييه فرسه وملاعبته اهله فانهن من الحق . "মহান আল্লাহ একটি তীরের বদৌলতে তিন ব্যক্তিকে জান্নাতে প্রবেশ করাইবেন : (১) তীর নির্মাতা, যে উহা নির্মাণে কল্যাণ ও সওয়াবের উদ্দেশ্য রাখে, (২) তীর নিক্ষেপকারী এবং (৩) তীরের ফলা সরবরাহকারী। মুসলমানের সকল ক্রীড়া বাতিল তিনটি ব্যতীত, (১) তীর-ধনুক দ্বারা ক্রীড়া (প্রশিক্ষণ), (২) ঘোড়ার প্রশিক্ষণ ও ঘোড়দৌড় এবং (৩) স্ত্রীর সঙ্গে ক্রীড়া-কৌতুক। এইগুলি সঠিক ও যথার্থ” (তিরমিযী, ১খ., ফাদাইলুল জিহাদ, পৃ. ১৯৭; আবূ দাউদ, ১খ., পৃ. ৩৪০, জিহাদ)। আবূ দাউদের বর্ণনায় আরও আছে, من ترك الرمي بعد ما علمه رغبة عنه فانها نعمة تركها او كفرها فليس منا او عصى - مسلم) . "যে ব্যক্তি তীরন্দাযী শিখিবার পরে উহাতে অনীহা দেখাইয়া উহা বর্জন করিল সে অবশ্য একটি নিআমত বর্জন করিল অথবা উহাতে অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিল"। মুসলিমের বর্ণনায় আছে, "সে আমাদের দলভুক্ত নহে অথবা অবাধ্যতা দেখাইল" (আবূ দাউদ, ১খ., পৃ. ৩৪০; ফাতহুল বারী, ৬খ., পৃ. ১০৭)।
আবদুল্লাহ ইবন 'উমার, উরওয়া ইবনুল জা'দ, আনাস ইবন মালিক (রা) প্রমুখ হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, الخيل معقود فى نواصيها الخير الى يوم القيامة الاجر والمغنم. "ঘোড়ার কপালে কিয়ামত পর্যন্ত কল্যাণ সম্পৃক্ত রহিয়াছে: সওয়াব ও গনীমত” (বুখারী, ১খ., কিতাবুল জিহাদ, বাব ৪৩-৪৪, মানাকিব, বাব ২৮, হাদীছ নং ২৮৪৯, ২৮৫০, ২৮৫১, ৩১১৯, ২৮৫২, ৩৬৪৩, ৩৬৪৪, ৩৪৫; মুসলিম, কিতাবুল ইমারা, ২খ., পৃ. ১৩২; তিরমিযী, ফাদাইলুল জিহাদ, ১খ., পৃ. ২০২)।
**জিহাদে গোয়েন্দাগিরি ও গুপ্তচরের গুরুত্বঃ** জাবির (রা) বলেন, "আহযাব (খন্দক) যুদ্ধকালে (এক রাত্রে) রাসূলুল্লাহ (স) আহবান করিলেন, শত্রুদের সংবাদ কে লইয়া আসিতে পারে? যুবায়র (রা) বলিলেন, আমি। নবী (স) পুনরায় একই কথা জিজ্ঞাসা করিলে এবারও যুবায়র (রা) বলিলেন, আমি। তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, প্রত্যেক নবীর হাওয়ারী (অন্তরঙ্গ ও ঘনিষ্ঠ সহযোগী) থাকে, আমার হাওয়ারী হইল যুবায়র" (বুখারী, জিহাদ, হাদীছ নং ২৮৪৬, ২৮৪৭, ২৯৯৭, ৩৭১৯, ৪১১৩, ৭২৬১)।
**জিহাদে হতাহত হওয়া ও শাহাদাতের ফযীলাত:** জুনদুব ইব্ন্ন সুফয়ান (রা) হইতে বর্ণিত। কোন অভিযানে রাসূলুল্লাহ (স)-এর আংগুল আহত হইয়া রক্ত বাহির হইলে তিনি বলিলেন: هل انت الا اصبع دميت وفي سبيل الله ما لقيت. "তুমি তো একটি অংগুলি মাত্র, তুমি রক্তরঞ্জিত হইয়াছ; তুমি যাহা কিছু ভুগিয়াছ তাহা আল্লাহ্ পথেই” (বুখারী, জিহাদ, বাব ৯, হাদীছ নং ২৮০২)।
**যখমের রক্তে মিশকের সুঘ্রাণ:** আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, "যাঁহার হাতে আমার জীবন তাঁহার কসম! আল্লাহর পথে যে কোন ক্ষত ও যখম হইবে, আল্লাহই সমধিক অবগত যে, কে তাঁহার পথে যখম হইল, কিয়ামতের দিন সে উপস্থিত হইবে যখম হওয়ার সময়ের (তাজা ক্ষত) অবস্থায়। উহার বর্ণ হইবে রক্তের, কিন্তু ঘ্রাণ হইবে মিশকের" (বুখারী, জিহাদ, বাব ১০, হাদীছ নং ২৮০৩; মুসলিম, ২খ., পৃ. ১৩৩)।
**শহীদ হওয়ার বাসনা:** আনাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: طلب الشهادة صادقا اعطيها لولم يصبه. "যে ব্যক্তি খাঁটি অন্তরে শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষা করিবে সে উহা অর্জন না করিলেও তাহাকে শাহাদাতের মর্যাদা দান করা হইবে" (মুসলিম, কিতাবুল ইমারা, ২খ., পৃ. ১৪১)।
সাল ইব্ন হুনায়ফ (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: من سأل الله الشهادة بصدق بلغه الله منازل الشهداء وان مات على فراشه. "যে ব্যক্তি খাঁটি অন্তরে আল্লাহ্র নিকট শাহাদাতের প্রার্থনা করিবে সে তাহার বিছানায় (স্বাভাবিক) মৃত্যুবরণ করিলেও আল্লাহ তাহাকে শহীদগণের মর্যাদায় পৌঁছাইয়া দিবেন" (মুসলিম, ঐ, ২খ., পৃ. ১৪১)।
**জান্নাতে শহীদগণের বাসস্থানঃ** সামুরা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন (মি'রাজের ভ্রমণ প্রসঙ্গে): رأيت الليلة رجلان اتياني فصعدا بي الشجرة وادخلاني دارا هي احسن وافضل لم ار قط احسن منها قال اما هذه فدار الشهداء. "আজ রাত্রে আমি দেখিলাম, দুই ব্যক্তি আমার নিকট আসিল এবং আমাকে গাছটিতে (সিদরাতুল মুনতাহা) আরোহণ করাইল এবং আমাকে এমন একটি নিবাসে প্রবেশ করাইল যাহা সুন্দরতম ও শ্রেষ্ঠতম। উহার চাইতে সুন্দর আমি কখনও দেখি নাই। সে বলিল, এই নিবাস হইল শহীদগণের” (বুখারী, জিহাদ, বাব ৪, হাদীছ নং ২৭৯১)।
**শাহাদাত গুনাহ মিটাইয়া দেয়:** আবু কাতাদা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের সম্মুখে আল্লাহর পথে জিহাদ ও আল্লাহ্র প্রতি ঈমান শ্রেষ্ঠ আমল হওয়ার বিষয়ে আলোচনা করিলেন। এক ব্যক্তি বলিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আল্লাহ্র পথে নিহত হইলে আমার সমস্ত গুনাহ মিটাইয়া দেওয়া হইবে কি? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: نعم أن قتلت في سبيل الله وانت صابر محتسب مقبل غير مدبر الا الدين فان جبرئيل عليه السلام قال لى ذلك. "হাঁ, যদি তুমি আল্লাহ্ পথে নিহত হও এবং তুমি সবরকারী, একনিষ্ঠ ও অগ্রগামী হও, পশ্চাদগামী না হও, ঋণ ব্যতীত। জিবরীল (আ) আমাকে ইহা বলিয়াছেন" (মুসলিম, ২খ., পৃ. ১৩৫)।
**শহীদগণের ছয়টি বৈশিষ্ট্য:** মিকদাম ইব্ন মা'দীকারিব (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: للشهيد عند الله ست خصال يغفر له في اول دفعة ويرى مقعده من الجنة ويجار من عذاب القبر ويأمن من الفزع الأكبر ويوضع على رأسه تاج الوقار الياقوتة منها خير من الدنيا وما فيها ويزوج اثنتين وسبعين زوجة من الحور العين ويشفع في سبعين من اقاربه. "শহীদের জন্য আল্লাহর নিকট রহিয়াছে ছয়টি বৈশিষ্ট্য: (১) প্রথম মুহূর্তেই (প্রথম রক্তবিন্দু পতিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে) তাহাকে ক্ষমা করিয়া দেওয়া হয় এবং তাহার জান্নাতের নিবাস দেখাইয়া দেওয়া হয়, (২) কবরের আযাব হইতে তাহাকে নিরাপত্তা দেওয়া হয়, (৩) মহাসংকট (হাশরের বিভীষিকা) হইতে সে নিরাপদ থাকে, (৪) তাহার মাথায় এমন একটি মুকুট পরানো হয় যাহার এক একটি মুক্তা দুনিয়া ও উহাতে বিদ্যমান সব কিছু হইতে উত্তম, (৫) আয়তলোচনা সুন্দরী রূপবতী হুর-এর সহিত তাহার বিবাহ দেওয়া হয় এবং (৬) তাহার সত্তরজন আত্মীয়-স্বজনের জন্য তাহার সুপারিশ মঞ্জুর করা হয়” (তিরমিযী, ১খ., পৃ. ১৯৯-২০০)।
আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিতে শুনিয়াছি : والذي نفس محمد بيده لولا ان يشق على المسلمين ما قعدت خلف سرية تغزو في سبيل الله ابدا ولكن لا اجد سعة فاحملهم ولا يجدون سعة فيتبعوني ويشق عليه (ولا تطيب انفسهم أن يتخلفوا عنى ولو خرجت ما بقى احد فيه خير الا انطلق معى وذلك يشق على وعليهم والذي نفس محمد بيده لوددت انى اغزو في سبيل الله) اقتل في سبيل الله ثم احيا ( ثم اغزو ) ثم اقتل ثم احيا ثم اقتل ثم احيا ثم اقتل. "যাঁহার হাতে মুহাম্মাদের জীবন তাঁহার কসম! বিষয়টি মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর না হইলে আমি অবশ্যই কখনও আল্লাহ্র পথে জিহাদে অংশগ্রহণ করা হইতে বিরত থাকিতাম না। কিন্তু আমার নিকট সেই সামর্থ্য নাই যে, তাহাদের (সকলকে) বাহনের ব্যবস্থা করিয়া দিব এবং তাহাদেরও এই সামর্থ্য নাই যে, তাহারা (নিজ নিজ ব্যবস্থা করিয়া) আমার অনুগামী হইবে। আর আমার সহিত শরীক হইতে না পারিলে তাহারা মনক্ষুণ্ন হইবে। এই অবস্থায় আমি বাহির হইয়া পড়িলে যাহার মধ্যে কিছুমাত্র ভাল আছে তেমন কেহই আমার সহিত রওয়ানা না হইয়া থাকিবে না, অথচ উহা আমার জন্য এবং তাহাদের জন্য কঠিন। যাঁহার হাতে মুহাম্মাদের জীবন তাঁহার কসম! আমার তো পরম বাসনা হয় যে, আল্লাহ্র পথে (যুদ্ধ করিব এবং উহাতে) শহীদ হই, পুনরায় আমাকে জীবিত করিয়া দেওয়া হইবে এবং আমি পুনরায় (যুদ্ধ করিয়া ) শহীদ হইব; পুনরায় জীবিত হইব, পুনরায় শহীদ হইব” (বুখারী, কিতাবুল জিহাদ, বাব ৭, হাদীছ নং ২৭৯৭; মুসলিম, ২খ., পৃ. ১৩৩-১৩৪; ফাতহুল বারী, ৬খ., পৃ. ২১)।
**শহীদগণের আত্মা, তাহাদের নব জীবন ও জান্নাতের বাগিচায় ভ্রমণঃ** মাসরূক (র) বলেন, আমরা আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা)-কে আয়াত لَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتًا بَلْ أَحْيَاءٌ عِنْدَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُونَ. সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিলেন, আমরা এই সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স)-কে জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিলেন: “তাহাদের আত্মাগুলি সবুজ বর্ণের পাখীর দেহাভ্যন্তরে থাকিবে (অর্থাৎ তাহাদের দেহ ও কায়াকে সবুজ পাখীর আকৃতি দেওয়া হইবে)। তাহাদের জন্য রহিয়াছে আরশের সহিত ঝুলন্ত ঝাড়। তাহারা জান্নাতের যেই স্থানে ইচ্ছা ঘুরিয়া বেড়ায়, অতঃপর সেই সকল ঝাড়ে অবস্থান করে। একবার আল্লাহ তাহাদিগকে বিশেষ দর্শন দান করিয়া বলিলেন, তোমরা কোন কিছুর বাসনা প্রকাশ কর। তাহারা বলিল, আমরা তো জান্নাতের যেই স্থানে আমাদের ইচ্ছা হয় ঘুরিয়া বেড়াই, তাই আমরা আর কিসের বাসনা করিব? তিনি তাহাদের সহিত তিনবার এইরূপ করিলেন। যখন তাহারা দেখিল যে, কিছু একটা আবদার না করিলে তাহদিগকে অব্যাহতি দেওয়া হইবে না তখন তাহারা বলিল, হে পালনকর্তা! আমরা চাই যে, আপনি আমাদের রূহগুলি আমাদের দেহে ফিরাইয়া দিবেন এবং আমরা পুনরায় আপনার পথে শাহাদাত বরণ করিব। যখন আল্লাহ দেখিলেন যে, তাহাদের কোনও চাহিদা নাই তখন তাহদিগকে অব্যাহতি দেওয়া হইল" (মুসলিম, ২খ., কিতাবুল ইমারা, পৃ. ১৩৫-১৩৬)।
📄 জিহাদ মু'মিনের সফলতার চাবিকাঠি
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَابْتَغُوا إِلَيْهِ الوَسِيلَةَ وَجَاهِدُوا فِي سَبِيلِهِ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ. "হে মু'মিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তাঁহার নৈকট্য লাভের উপায় অন্বেষণ কর ও তাঁহার পথে জিহাদ কর যাহাতে তোমরা সফলকাম হইতে পার" (৫:৩৫)।
এই আয়াতের তাফসীরে মুফাসসিরগণ লিখিয়াছেন, "এই আয়াতে প্রথমত আল্লাহ তা'আলা তাকওয়া অবলম্বন এবং ঈমান ও নেক আমল দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের হিদায়াত দানের পরে "তাঁহার পথে জিহাদ কর" ইরশাদ করিয়াছেন। ইহার মর্ম এই যে, জিহাদ নেক আমলের তালিকাভুক্ত অন্যতম সৎকর্ম। জিহাদের স্থান অতি ঊর্ধ্বে তাহা বুঝাইবার জন্য স্বতন্ত্ররূপে উল্লিখিত হইয়াছে। ডাকাতি, লুটতরাজ ও অন্যায়ভাবে বিদ্রোহের মাধ্যমে যে খুনখারাবী ও সম্পদ লুণ্ঠন সংঘটিত হয় উহা শুধু ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার নিকৃষ্ট উদ্দেশ্যে হইয়া থাকে। জিহাদে নরহত্যা ইত্যাদি সংঘটিত হইলে উহাতে একমাত্র উদ্দেশ্য থাকে আল্লাহ্র কলেমা সমুন্নত করা এবং পৃথিবীর বুক হইতে জুলুম-নির্যাতন নির্মূল করা (তাফসীরে মা'আরিফুল কুরআন, ৩খ., পৃ. ১২৮: তাফসীরে ইব্ন কাছীর, ২খ., পৃ. ৫৩-৫৪)।
📄 জিহাদ প্রকৃত ঈমানের মাপকাঠি
وَالَّذِينَ آمَنُوا وَهَاجَرُوا وَجَاهَدُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالَّذِينَ أَوْوْا وَنَصَرُوا أُولَئِكَ هُمُ الْمُؤْمِنُونَ حَقًّا لَهُمْ مَّغْفِرَةٌ وَرِزْقٌ كَرِيمٌ.. "যাহারা ঈমান আনিয়াছে, হিজরত করিয়াছে ও আল্লাহ্র পথে জিহাদ করিয়াছে এবং যাহারা (হিজরতকারী মুজাহিদগণকে) আশ্রয় দান করিয়াছে ও সাহায্য করিয়াছে তাহারাই প্রকৃত মুমিন। তাহাদের জন্য রহিয়াছে ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিকা" (৮:৭৪)।
আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই জিহাদের উদ্দেশ্য। যেমন আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে:
الَّذِينَ آمَنُوا وَهَاجَرُوا وَجْهَدُوا فِي سَبِيلِ اللهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ أَعْظَمُ دَرَجَةً عِنْدَ اللَّهِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْفَائِزُونَ. يُبَشِّرُهُمْ رَبُّهُمْ بِرَحْمَةٍ مِّنْهُ وَرِضْوَانٍ وَجَنَّتٍ لَّهُمْ فِيهَا نَعِيمٌ مُّقِيمٌ. "যাহারা ঈমান আনে, হিজরত করে এবং নিজেদের সম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহ্র পথে জিহাদ করে তাহারা আল্লাহ্র নিকট মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ, আর তাহারাই সফলকাম। উহাদের প্রতিপালক উহাদিগকে সুসংবাদ দিতেছেন, স্বীয় দয়া ও সন্তোষের এবং জান্নাতের, যেখানে তাহাদের জন্য আছে স্থায়ী সুখ-শান্তি” (৯: ২০-২২)।
জিহাদের মাধ্যমে মাগফিরাত লাভ হয়। আল-কুরআনে ইরশাদ হইতেছে:
ثُمَّ إِنَّ رَبَّكَ لِلَّذِينَ هَاجَرُوا مِنْ بَعْدِ مَا فُتِنُوا ثُمَّ جَهَدُوا وَصَبَرُوا إِنَّ رَبَّكَ مِنْ بَعْدِهَا لَغَفُورٌ رَّحِيمٌ. "যাহারা নির্যাতিত হইবার পর হিজরত করে, পরে জিহাদ করে এবং ধৈর্য ধারণ করে, তোমার প্রতিপালক এই সবের পর তাহাদের প্রতি অবশ্যই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু" (১৬: ১১০)।
জিহাদের জানমাল উৎসর্গ করিবার ফযীলাত এবং যথাসময়ে ব্যয়ের সবিশেষ গুরুত্ব ও মাহাত্ম বর্ণিত হইয়াছে। আল-কুরআনে বলা হইয়াছে:
لا يَسْتَوِي الْقُعَدُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ غَيْرُ أُولى الضَّرَرِ وَالْمُجْهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ فَضَّلَ اللهُ المُجْهِدِيْنَ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ عَلَى الْقُعِدِينَ دَرَجَةً وَكُلاً وَعَدَ اللهُ الْحُسْنَى وَفَضَّلَ اللهُ المُجْهِدِيْنَ عَلَى الْقَعِدِينَ اَجْرًا عَظِيمًا . دَرَجَتٍ مِّنْهُ وَمَغْفِرَةً وَرَحْمَةً وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا. "মু'মিনদের মধ্যে যাহারা অক্ষম নহে অথচ ঘরে বসিয়া থাকে এবং যাহারা আল্লাহ্র পথে স্বীয় সম্পদ ও জীবন দ্বারা জিহাদ করে তাহারা পরস্পর সমান নহে। যাহারা স্বীয় সম্পদ ও জীবন দ্বারা জিহাদ করে আল্লাহ তাহাদিগকে, যাহারা ঘরে বসিয়া থাকে তাহাদের উপর মর্যাদা দিয়াছেন। আল্লাহ সকলকেই কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়াছেন। যাহারা ঘরে বসিয়া থাকে তাহাদের উপর যাহারা জিহাদ করে তাহাদিগকে আল্লাহ্ মহা পুরস্কারের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়াছেন। ইহা তাঁহার নিকট হইতে মর্যাদা, ক্ষমা ও রহমত; আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু" (৪:৯৫-৯৬; আরও দ্র. ৫৭:১০)।
يٰأَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا إِنْ تَنْصُرُوا اللّٰهَ يَنْصُرْكُمْ وَيُثَبِّتْ أَقْدَامَكُمْ. "হে মু’মিনগণ! যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর আল্লাহ তোমাদিগকে সাহায্য করিবেন এবং তোমাদের পদসমূহ দৃঢ় করিবেন” (৪৭:৭)।
মু’মিনের জীবন ও সম্পদ বিক্রীত বটে; আল্লাহ ইহার ক্রেতা এবং ইহার বিনিময় তাঁহার সন্তুষ্টি ও জান্নাত। বিক্রীত পণ্য সমর্পণের পদ্ধতি জিহাদে ধন ও প্রাণ উৎসর্গীত করা। কাজেই মু’মিনের ক্ষুদ্র-বৃহৎ যে কোন ব্যয় এবং নগণ্য ও বড় যে কোন দুঃখ-কষ্ট আল্লাহ্ জন্যই নিবেদিত। যেমন:
يٰأَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلٰى تِجَارَةٍ تُنْجِيْكُمْ مِّنْ عَذَابٍ أَلِيْمٍ تُؤْمِنُوْنَ بِاللّٰهِ وَرَسُوْلِهِ وَتُجَاهِدُوْنَ فِيْ سَبِيْلِ اللّٰهِ بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ ذٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ. "হে মু’মিনগণ! আমি কি তোমাদিগকে এমন এক বাণিজ্যের সন্ধান দিব যাহা তোমাদিগকে রক্ষা করিবে মর্মন্তুদ শাস্তি হইতে? উহা এই যে, তোমরা আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলে বিশ্বাস স্থাপন করিবে এবং তোমাদের ধন-সম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহ্ পথে জিহাদ করিবে। ইহাই তোমাদের জন্য শ্রেয় যদি তোমরা জানিতে” (৬১: ১০-১৪)!
إِنَّ اللّٰهَ اشْتَرٰى مِنَ الْمُؤْمِنِيْنَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ يُقَاتِلُوْنَ فِيْ سَبِيْلِ اللّٰهِ فَيَقْتُلُوْنَ وَيُقْتَلُوْنَ وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيْلِ وَالْقُرْآنِ وَمَنْ أَوْفٰى بِعَهْدِهِ مِنَ اللّٰهِ فَاسْتَبْشِرُوْا بِبَيْعِكُمُ الَّذِيْ بَايَعْتُمْ بِهِ وَذٰلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيْمُ. "নিশ্চয় আল্লাহ মু’মিনদের নিকট হইতে ক্রয় করিয়া লইয়াছেন তাহাদের জীবন ও সম্পদ, ইহার বিনিময়ে তাহাদের জন্য জান্নাত রহিয়াছে। তাহারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে, নিধন করে এবং নিহত হয়। তাওরাত ইনজীল ও কুরআনে এই সম্পর্কে তাহাদের প্রতি দৃঢ় প্রতিশ্রুতি রহিয়াছে। নিজ প্রতিজ্ঞা পালনে আল্লাহ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর কে আছে? তোমরা যে সওদা করিয়াছ সেই সওদার জন্য আনন্দিত হও এবং উহাই তো মহাসাফল্য” (৯:১১১)।
পবিত্র কুরআনের আরও বহু আয়াতে জিহাদের বিভিন্ন ফযীলাতের বিবরণ রহিয়াছে। বিশেষত জিহাদে জীবন উৎসর্গকারী শহীদের ফযীলাত বর্ণিত হইয়াছে উচ্চাংগ অনুপম ধারায়।
وَلَا تَقُولُوا لِمَنْ يُقْتَلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتٌ بَلْ أَحْيَاءٌ وَلَكِنْ لَا تَشْعُرُونَ. "আল্লাহ্র পথে যাহারা নিহত হয় তোমরা তাহাদিগকে, মৃত বলিও না, বরং তাহারা জীবিত; কিন্তু তোমরা উপলব্ধি করিতে পার না” (২: ১৫৪; আরও দ্র. ৩: ১৬৯-৭১)।
📄 হাদীছে জিহাদের ফযীলাত ও মাহাত্ম্য
**সর্বোত্তম আমল:** আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা) হইতে বর্ণিত। আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে জিজ্ঞাসা করিলাম, সর্বোত্তম আমল কোনটি? তিনি বলিলেন, "যথাসময়ে সালাত আদায় করা"। আমি বলিলাম, অতঃপর কোনটি? তিনি বলিলেন, "পিতা-মাতার আনুগত্য ও তাহাদের প্রতি সদাচরণ। আমি বলিলাম, অতঃপর কোনটি? তিনি বলিলেন, "আল্লাহর পথে জিহাদ করা" (বুখারী, কিতাবুল জিহাদ, বাব ১, হাদীছ নং ২৭৮২)।
**সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি:** আবু সাঈদ খুদরী (রা) হইতে বর্ণিত। এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-কে জিজ্ঞাসা করিল, সর্বোত্তম ব্যক্তি কে? তিনি বলিলেন, "সেই মু'মিন ব্যক্তি যে তাহার সম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করে" (বুখারী, কিতাবুল জিহাদ, বাব ১, হাদীছ নং ২৭৮৬; মুসলিম ২খ., পৃ. ১৩৬)।
আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, من خير معاش الناس لهم رجل ممسك عنان فرسه في سبيل الله يطير على متنه كلما سمع هيعة او فزعة طار عليه يبتغى القتل او الموت مظانه. "জীবন যাপনে মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম অবস্থার অধিকারীদের অন্তর্ভুক্ত সেই ব্যক্তি যে আল্লাহ্ পথে তাহার ঘোড়ার লাগাম ধরিয়া রাখে (সদা প্রস্তুত থাকে), উহার পিঠে উড়িয়া চলে, যখনই শত্রুদলের আগমনের আওয়াজ কিংবা ভীতিকর ধ্বনি শুনিতে পায় তখন সে উহার পিঠে উড়িয়া যায় এবং জীবননাশ ও মৃত্যুর ক্ষেত্রসমূহ খুঁজিতে থাকে” (মুসলিম, ২খ., পৃ. ১৩৬; নববীর ব্যাখ্যাসহ)।
**জিহাদের সমতুল্য আমল:** আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া বলিল, আমাকে জিহাদের সমতুল্য কোন আমল বলিয়া দিন। তিনি বলিলেন: আমি তাহা দেখিতেছি না। পরে তিনি বলিলেন, তুমি কি এইরূপ করিতে পারিবে যে, যখন মুজাহিদ বাহির হইয়া যায় তখন তুমি তোমার মসজিদে (সালাতের স্থানে) প্রবেশ করিবে, অতঃপর বিরতিহীনভাবে সালাতে দাঁড়াইয়া থাকিবে এবং সিয়াম পালন করিবে, ইফতার করিবে না" (বুখারী, কিতাবুল জিহাদ, বাব ১, হাদীছ নং ২৭৮৫)?
সহীহ মুসলিমে আবু হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত আছে যে, তাহরা (প্রশ্নকারীরা) উহা করিতে সমর্থ হইবে না। তাহারা দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করিলে প্রতিবারে তিনি (স) বলিলেন, لا يستطيعوه তৃতীয়বারে বলিলেন : مثل المجاهد في سبيل الله كمثل الصائم القائم القانت بايات الله لا يفتر من صيام ولا صلوة حتى يرجع المجاهد في سبيل الله تعالى. "আল্লাহ্ পথের মুজাহিদের অবস্থা সেই সিয়াম পালনকারী, ইবাদাতে দণ্ডায়মান, আল্লাহর আয়াতসমূহ (তিলাওয়াত ও) প্রতিপালনকারীর ন্যায় যে আল্লাহ তা'আলার পথের মুজাহিদ প্রত্যাগমন পর্যন্ত সালাত, সিয়াম ও ইবাদাতে বিরতি দেয় না" (মুসলিম, ২খ., পৃ. ১৩৪; বুখারী, হাদীছ নং ২৭৮৭)।