📄 সারিয়্যা আবূ সালাম
মহানবী (স)-এর বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আবূ সালামা (রা)-এর অধিনায়কত্বে হিজরতের ৩৫তম মাসে অর্থাৎ হিজরীর মুহাররম মাসে 'কাতান' পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী আসাদ গোত্রের বিরুদ্ধে এই ক্ষুদ্র সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়। উহুদ যুদ্ধে আবূ সালামা (রা)-এর বাহুতে একটি তীর বিদ্ধ হইলে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। মাসাধিক কাল চিকিৎসা গ্রহণের পর আহত স্থানের ঘা শুকাইলেও দেহের অভ্যন্তরভাগে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। এই অবস্থায় তাঁহার উপর বানু আসাদ গোত্রের এলাকায় অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব অর্পিত হয়।
আসাদ গোত্রের এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট এই মর্মে সংবাদ পৌঁছায় যে, তুলায়হা ও তাহার ভ্রাতা সালামা ইব্ন খুওয়ায়লিদ নিজেদের গোত্র এবং তাহাদের প্রভাবাধীন অন্যান্য ক্ষুদ্র গোত্রসমূহকে মদীনার উপর আক্রমণের জন্য উত্তেজিত করিতেছে। মহানবী (স) তাহাদের এই ষড়যন্ত্রের মূলোচ্ছেদ করিবার জন্য মুহাজির ও আনসার সাহাবীগণের সমন্বয়ে গঠিত দেড় শত মুজাহিদের একটি বাহিনী গঠন করেন এবং আবূ সালামা (র)-কে ইহার সেনাপতি নিযুক্ত করিয়া 'কাতান' অভিমুখে যাত্রার নির্দেশ প্রদান করেন। এই অভিযানে আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ্, সা'দ ইব্ন আবী ওয়াক্কাস, উসায়দ ইবন হুদায়র, আরকাম ইব্ন আবিল আরকাম (রা) প্রমুখ সাহাবীও অংশগ্রহণ করেন।
রাসূলুল্লাহ (স) আবূ সালামা (রা)-এর নিকট সামরিক বাহিনীর পতাকা অর্পণের প্রাক্কালে বলেন : রওয়ানা হইয়া যাও এবং আসাদ গোত্র ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পূর্বেই তাহাদিগকে ছত্রভংগ করিয়া দাও। মহানবী (স) তাঁহাকে ও তাঁহার সঙ্গীদেরকে তাকওয়া অবলম্বনের উপদেশ দেন। আবূ সালামা (রা) সচরাচর ব্যবহৃত পথ দিয়া না যাইয়া ভিন্ন এক পথ ধরিয়া অগ্রসর হইলেন এবং অকস্মাৎ আসাদ গোত্রের জনপদে গিয়া উপস্থিত হইলেন।
আসাদ গোত্র মুসলিম বাহিনীর আকস্মিক উপস্থিতিতে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পলায়ন করিতে লাগিল। আবু সালামা (রা) তাঁহার ক্ষুদ্র বাহিনীকে তিন ভাগে বিভক্ত করিয়া পলায়নকারীদের, পশ্চাদ্ধাবন করিয়া তাহাদিগকে বহু দূর লইয়া যান। তিনি এখানে তের দিন অবস্থান করেন।
এই অভিযানে মুসলিম বাহিনী পর্যাপ্ত সংখ্যক উট ও ছাগল-ভেড়া গনীমত হিসাবে লাভ করে এবং তাহা মদীনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে উপস্থিত করে। নবী (স)-এর অংশে একটি গোলাম এবং এক-পঞ্চমাংশ পৃথক করার পর অবশিষ্ট গনীমত সৈনিকগণের মধ্যে বণ্টন করা হয়। প্রত্যেক সৈনিক ৭টি করিয়া উট এবং কিছু ছাগল লাভ করেন। যুদ্ধের সংবাদ প্রদানকারী আসাদ গোত্রীয় ব্যক্তিকে গনীমত হইতে একটি পূর্ণ অংশ প্রদান করা হয়।
এই অভিযানে কোন লোকক্ষয় হইয়াছিল কিনা তাহা জানা যায় না। তবে ইবন কাছীর শত্রুদের তিনজন দাস বন্দী হওয়ার উল্লেখ করিয়াছেন। মদীনায় প্রত্যাবর্তনের পর আবূ সালামা (রা)-এর পূর্বের ক্ষতস্থানের ঘা মারাত্মক আকার ধারণ করে এবং জুমাদাল উলা মাসের ২৭ তারিখে তিনি ইন্তিকাল করেন। ইবন সা'দ-এর মতে তিনি জুল-কা'দা মাসে ইন্তিকাল করেন। তাঁহার ইন্তিকালের পর তাঁহার স্ত্রী উম্মু সালামা (রা)-কে তাহার ইদ্দাতশেষে রাসূলুল্লাহ (স) বিবাহ করেন।
মহানবী (স)-এর বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আবূ সালামা (রা)-এর অধিনায়কত্বে হিজরতের ৩৫তম মাসে অর্থাৎ হিজরীর মুহাররম মাসে 'কাতান' পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী আসাদ গোত্রের বিরুদ্ধে এই ক্ষুদ্র সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়। উহুদ যুদ্ধে আবূ সালামা (রা)-এর বাহুতে একটি তীর বিদ্ধ হইলে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। মাসাধিক কাল চিকিৎসা গ্রহণের পর আহত স্থানের ঘা শুকাইলেও দেহের অভ্যন্তরভাগে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। এই অবস্থায় তাঁহার উপর বানু আসাদ গোত্রের এলাকায় অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব অর্পিত হয়।
আসাদ গোত্রের এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট এই মর্মে সংবাদ পৌঁছায় যে, তুলায়হা ও তাহার ভ্রাতা সালামা ইব্ন খুওয়ায়লিদ নিজেদের গোত্র এবং তাহাদের প্রভাবাধীন অন্যান্য ক্ষুদ্র গোত্রসমূহকে মদীনার উপর আক্রমণের জন্য উত্তেজিত করিতেছে। মহানবী (স) তাহাদের এই ষড়যন্ত্রের মূলোচ্ছেদ করিবার জন্য মুহাজির ও আনসার সাহাবীগণের সমন্বয়ে গঠিত দেড় শত মুজাহিদের একটি বাহিনী গঠন করেন এবং আবূ সালামা (র)-কে ইহার সেনাপতি নিযুক্ত করিয়া 'কাতান' অভিমুখে যাত্রার নির্দেশ প্রদান করেন। এই অভিযানে আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ্, সা'দ ইব্ন আবী ওয়াক্কাস, উসায়দ ইবন হুদায়র, আরকাম ইব্ন আবিল আরকাম (রা) প্রমুখ সাহাবীও অংশগ্রহণ করেন।
রাসূলুল্লাহ (স) আবূ সালামা (রা)-এর নিকট সামরিক বাহিনীর পতাকা অর্পণের প্রাক্কালে বলেন : রওয়ানা হইয়া যাও এবং আসাদ গোত্র ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পূর্বেই তাহাদিগকে ছত্রভংগ করিয়া দাও। মহানবী (স) তাঁহাকে ও তাঁহার সঙ্গীদেরকে তাকওয়া অবলম্বনের উপদেশ দেন। আবূ সালামা (রা) সচরাচর ব্যবহৃত পথ দিয়া না যাইয়া ভিন্ন এক পথ ধরিয়া অগ্রসর হইলেন এবং অকস্মাৎ আসাদ গোত্রের জনপদে গিয়া উপস্থিত হইলেন।
আসাদ গোত্র মুসলিম বাহিনীর আকস্মিক উপস্থিতিতে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পলায়ন করিতে লাগিল। আবু সালামা (রা) তাঁহার ক্ষুদ্র বাহিনীকে তিন ভাগে বিভক্ত করিয়া পলায়নকারীদের, পশ্চাদ্ধাবন করিয়া তাহাদিগকে বহু দূর লইয়া যান। তিনি এখানে তের দিন অবস্থান করেন।
এই অভিযানে মুসলিম বাহিনী পর্যাপ্ত সংখ্যক উট ও ছাগল-ভেড়া গনীমত হিসাবে লাভ করে এবং তাহা মদীনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে উপস্থিত করে। নবী (স)-এর অংশে একটি গোলাম এবং এক-পঞ্চমাংশ পৃথক করার পর অবশিষ্ট গনীমত সৈনিকগণের মধ্যে বণ্টন করা হয়। প্রত্যেক সৈনিক ৭টি করিয়া উট এবং কিছু ছাগল লাভ করেন। যুদ্ধের সংবাদ প্রদানকারী আসাদ গোত্রীয় ব্যক্তিকে গনীমত হইতে একটি পূর্ণ অংশ প্রদান করা হয়।
এই অভিযানে কোন লোকক্ষয় হইয়াছিল কিনা তাহা জানা যায় না। তবে ইবন কাছীর শত্রুদের তিনজন দাস বন্দী হওয়ার উল্লেখ করিয়াছেন। মদীনায় প্রত্যাবর্তনের পর আবূ সালামা (রা)-এর পূর্বের ক্ষতস্থানের ঘা মারাত্মক আকার ধারণ করে এবং জুমাদাল উলা মাসের ২৭ তারিখে তিনি ইন্তিকাল করেন। ইবন সা'দ-এর মতে তিনি জুল-কা'দা মাসে ইন্তিকাল করেন। তাঁহার ইন্তিকালের পর তাঁহার স্ত্রী উম্মু সালামা (রা)-কে তাহার ইদ্দাতশেষে রাসূলুল্লাহ (স) বিবাহ করেন।
📄 সারিয়্যা আবদুল্লাহ ইব্ন উনায়স (রা)
৪র্থ হিজরীর ৫ মুহাররাম সোমবার রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশক্রমে আবদুল্লাহ্ ইব্ন উনায়স আল-জুহানী আল-আনসারী (রা) সুফয়ান ইব্ন খালিদ ইব্ন নুবায়হ আল-হুযালী (মতান্তরে খালিদ ইব্ন সুফয়ান ইব্ নুবায়হ আল-হুযালী)-কে হত্যার উদ্দেশ্যে অভিযান পরিচালনা করেন।
কোন কোন সূত্রে এই ঘটনা ৫ম হিজরীতে ইসলামের চরম দুশমন আবূ রাফে' সাল্লাম ইবন আবিল হুকায়ককে হত্যার পরপর সংঘটিত হয় বলিয়া জানা যায়। তখন সে 'আরাফাত-এর নিকটবর্তী উরানা (عرنة) নামক স্থানে রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিবার জন্য সৈন্য সংগ্রহ করিতেছিল। মতান্তরে তখন সে মক্কার অদূরবর্তী নাখলা (نخلة) নামক স্থানে অবস্থান করিতেছিল।
তাহার সহিত তাহার গোত্রের ও অন্যান্য গোত্রের বহু লোকজন ছিল। তাহার এই অপতৎপরতা ও চরম ধৃষ্টতা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স) আগাম খবর পাইয়া হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন উনায়স (রা)-কে ডাকিয়া বলিলেন, "আমি খবর পাইয়াছি যে, ইব্ন নুবায়হ্ আল-হুযালী আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিবার জন্য সৈন্য সংগ্রহ করিতেছে। সে উরানা বা নাখলাতে অবস্থান করিতেছে। তুমি গিয়া তাহাকে হত্যা করিয়া আস"।
আব্দুল্লাহ্ ইব্ন উনায়স (রা) এই দুশমনকে শনাক্ত করিবার উপায় হিসাবে তাহার সম্পর্কে বর্ণনা দেওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-কে অনুরোধ করেন। রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন, "তুমি যখন তাহাকে দেখিবে, তাহার হাবভাব তোমাকে শয়তানের কথা স্মরণ করাইয়া দিবে। তোমার তাহাকে চিনিবার আরেকটি আলামত এই যে, তাহাকে দেখিবামাত্র তোমার কাঁপুনি ধরিবে"। তুমি তাহাকে ভয় পাইবে, তাহার হইতে সরিয়া পড়িতে চাহিবে।
ইবন উনায়স (রা) মনে মনে বলেন, আমি ভয় পাইবার পাত্র নহি। ইহার পর তিনি তরবারি সজ্জিত হইয়া একাকী অভিযানে বাহির হন এবং যে কোন কৌশলে শত্রু হত্যা করিবার অনুমতি লাভ করেন। তিনি ছদ্মবেশে উরানা উপত্যকায় পৌছিবার পর দেখিতে পাইলেন যে, ইন্ন নুবায়হ বিভিন্ন গোত্রের বিপুল সৈন্য সমভিব্যাহারে সামনে অগ্রসর হইতেছে। সে কতিপয় রমণী পরিবেষ্টিত অবস্থায় থাকিয়া বিশ্রামের জন্য জায়গা খুঁজিতেছে।
রাসূলুল্লাহ্ (স) কর্তৃক নির্দেশিত আলামত অনুযায়ী তিনি তাহাকে সহজেই শনাক্ত করিতে সক্ষম হইলেন এবং নিজের ভিতর সেই ভয় ও কম্পন অনুভব করিলেন যেই সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স) পূর্বেই তাঁহাকে অবহিত করিয়াছিলেন। তখন আসরের সালাতের ওয়াক্ত ঘনাইয়া আসিল। ইবন উনায়স (রা) বলেন, "আমি আশংকা করিলাম যে, তাহার ও আমার মধ্যে এমন কিছু ঘটিতে পারে যাহা আমার সালাতে বিলম্ব ঘটাইতে পারে। এইজন্য আমি অগ্রসররত অবস্থায় ইশারায় রুকু-সিজদা করিয়া সালাত আদায় করিলাম"।
আব্দুল্লাহ্ ইব্ উনায়স (রা) তাহার নিকটবর্তী হইলে সে জিজ্ঞাসা করিল, তুমি কে? উত্তরে তিনি বলিলেন, আমি খুযা'আ বংশীয় একজন আরব। আমি শুনিতে পাইলাম যে, আপনি মুহাম্মাদের বিরুদ্ধে সৈন্য সংগ্রহ করিয়াছেন। আপনার সহিত থাকিয়া আপনার এই কাজের সার্বিক সাহায্য-সহযোগিতা করিবার জন্যই আমি আসিয়াছি। ইব্ নুবায়হ বলিল, তোমাকে স্বাগতম! আমি তো ঐ কাজই করিতেছি।
ইব্ নুবায়হ তাহাকে সহযোদ্ধা ভাবিয়া কাছে টানিয়া লইল। তিনি তাহার সান্নিধ্যে আসিয়া তাহার তাঁবুতে অবস্থান গ্রহণ করিলেন। এক সময় তাহার সৈন্য-সামন্ত ও সহচররা ঘুমাইয়া পড়িল। সেই সুযোগে তিনি অকস্মাৎ তরবারির আঘাতে ইব্ন নুবায়হকে হত্যা করিলেন। তাহার সঙ্গিনীরা তাহার লাশের উপর মাথা ঝুঁঁকাইয়া কাঁদিতে থাকিল।
ইব্ন নুবায়হ-এর সৈন্যবাহিনী ঘটনাটি বুঝিয়া উঠিবার পূর্বেই তিনি তাহার বিচ্ছিন্ন মস্তকসহ সরিয়া পড়িলেন এবং গহীন পর্বত গুহায় আত্মগোপন করিলেন। তাহার সৈন্যবাহিনী বহু চেষ্টা করিয়াও তাঁহাকে খুঁজিয়া বাহির করিতে পারিল না। এইভাবে তিনি দিনের বেলা গুহায় লুকাইয়া থাকিয়া এবং রাত্রিবেলা পথ চলিয়া মদীনা মুনাওওয়ারায় প্রত্যাবর্তন করিলেন। তিনি মসজিদে নববীতে আসিয়া ইব্ন নুবায়হ-এর বিচ্ছিন্ন মস্তকটি রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সম্মুখে রাখেন। রাসূলুল্লাহ্ (স) তাহাকে দেখিবামাত্র মন্তব্য করিলেন : أَفْلَحَ الوجه “তোমার মুখমণ্ডল সফল হউক”। তিনি উত্তরে বলিলেন, أَفْلَحَ وَجْهُكَ يَا رَسُولَ الله "বরং সফল হউক আপনার মুখমণ্ডল, হে আল্লাহ্র রাসূল”।
রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার সফল অভিযানে সন্তুষ্ট হইয়া তাঁহাকে পুরস্কৃত করিলেন। তিনি নিজ গৃহ হইতে একখানি লাঠি আনিয়া তাঁহাকে উপহার দিলেন এবং সর্বদা ইহা তাঁহার সঙ্গে রাখিবার পরামর্শ দিলেন। তিনি লাঠিটি লইয়া সাহাবাদের সম্মুখে বাহির হইলে তাঁহারা জিজ্ঞাসা করিলেন, লাঠিটির রহস্য কি? তখন বলিলেন, রাসূলুল্লাহ (স) ইহা আমাকে দিয়াছেন এবং সঙ্গে রাখিতে বলিয়াছেন। তাঁহারা বলিলেন, তুমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে ফিরিয়া যাও এবং কেন তোমাকে ইহা দেওয়া হইয়াছে জিজ্ঞাসা কর। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট গিয়া ইহা প্রদানের কারণ জিজ্ঞাসা করিলে রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন, "এই লাঠিখানি কিয়ামতের দিন তোমার ও আমার মধ্যকার সম্পর্কের নিদর্শন। নিশ্চয়ই সেই দিন লাঠিধারী মানুষ স্বল্প সংখ্যক হইবে।
তখন হইতে হযরত আব্দুল্লাহ্ ইব্ন উনায়স (রা) এই বরকতপূর্ণ লাঠিখানি তাঁহার তরবারির সহিত একত্রে মিলাইয়া নিজের নিকট রাখিতেন। এইজন্য তাহাকে যুল-মিস্সারাহ (ذو المخصرة) বা যষ্ঠিধারী নামে অভিহিত করা হয়। তাঁহার মৃত্যু পর্যন্ত ইহা তাঁহার সঙ্গেই ছিল। তিনি ৫৪/৬৭৪ সালে, মতান্তরে ৭৪/৬৯৩ সালে অথবা ৮০/৬৯৯ সালে সিরিয়ায় ইনতিকাল করেন। আবদুল্লাহ্ ইব্ন উনায়স (রা)-এর ইনতিকালের পর তাঁহার ওসিয়াত অনুযায়ী যষ্ঠিখানি তাঁহার কাফনের ভিতর রাখিয়া একত্রে দাফন করা হয়।
ইবন উনায়স (রা)-এর এই সাহসিকতাপূর্ণ অভিযান ১৮ দিনে সমাপ্ত হয়। তিনি চতুর্থ হিজরীর ২৩ মুহাররাম শনিবার মদীনা মুনাওওয়ারায় ফিরিয়া আসেন। এই অভিযান সম্পর্কিত হাদীছের নির্ভরযোগ্যতা প্রসঙ্গে হাফিয ইব্ন হাজার আসকালানী (র) মন্তব্য করিয়াছেন, “سَنده حسن ইহার সনদ হাসান, উত্তম।
ইব্ন নুবায় হত্যার ও এই অভিযান প্রসঙ্গে হযরত আব্দুল্লাহ্ ইব্ন উনায়স (রা)-এর একটি কবিতা ইব্ন হিশাম সূত্রে জানা যায়। কবিতাটি নিম্নরূপ (অনুবাদ) :
১. আমি ইব্ন ছাওরকে ফেলিয়া রাখিয়াছি উট শাবকের মত; তাহার পাশে বিলাপরত মহিলারা কামীসের বুক বিদীর্ণ করিতেছিল।
২. আমি তাহাকে আঘাত করিলাম ভারতীয় তরবারির, যাহা ঝকঝক করিতেছিল লোহার পানি সদৃশ; হাওদায় আসীন নারীরা তখন তাহার ও আমার পশ্চাতে।
৩. সেই তরবারি খণ্ডিত করে বর্মধারীদের শির, যেন জ্বলন্ত গাদা কাঠের লেলিহান শিখা।
৪. তরবারি যখন করিতেছিল তাহার মুণ্ডপাত, আমি বলিতেছিলাম তখন, আমি তো ইব্ন উনায়স, বীর অশ্বারোহী, নহি নীচ আমি।
৫. আমি তো সেই দানবীরের পুত্র যাহার বাড়ির প্রশস্ত আঙিনা, যুগ যুগ ধরিয়া নামায়নি তাহার হাঁড়ি আর ছিলেন না যিনি সংকীর্ণমনা।
৬. আমি তাহাকে বালিলাম, লও, এই একটি আঘাত সম্মানী মানুষের, যিনি একনিষ্ঠ নবী মুহাম্মাদের দীনে।
৭. আল্লাহ্ নবী কোন কাফিরের প্রতি হইলে উদ্যত, ঝাঁপাইয়া পড়ি আমি সর্বশক্তি লইয়া তাহার উপর।
৪র্থ হিজরীর ৫ মুহাররাম সোমবার রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশক্রমে আবদুল্লাহ্ ইব্ন উনায়স আল-জুহানী আল-আনসারী (রা) সুফয়ান ইব্ন খালিদ ইব্ন নুবায়হ আল-হুযালী (মতান্তরে খালিদ ইব্ন সুফয়ান ইব্ নুবায়হ আল-হুযালী)-কে হত্যার উদ্দেশ্যে অভিযান পরিচালনা করেন।
কোন কোন সূত্রে এই ঘটনা ৫ম হিজরীতে ইসলামের চরম দুশমন আবূ রাফে' সাল্লাম ইবন আবিল হুকায়ককে হত্যার পরপর সংঘটিত হয় বলিয়া জানা যায়। তখন সে 'আরাফাত-এর নিকটবর্তী উরানা (عرنة) নামক স্থানে রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিবার জন্য সৈন্য সংগ্রহ করিতেছিল। মতান্তরে তখন সে মক্কার অদূরবর্তী নাখলা (نخلة) নামক স্থানে অবস্থান করিতেছিল।
তাহার সহিত তাহার গোত্রের ও অন্যান্য গোত্রের বহু লোকজন ছিল। তাহার এই অপতৎপরতা ও চরম ধৃষ্টতা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স) আগাম খবর পাইয়া হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন উনায়স (রা)-কে ডাকিয়া বলিলেন, "আমি খবর পাইয়াছি যে, ইব্ন নুবায়হ্ আল-হুযালী আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিবার জন্য সৈন্য সংগ্রহ করিতেছে। সে উরানা বা নাখলাতে অবস্থান করিতেছে। তুমি গিয়া তাহাকে হত্যা করিয়া আস"।
আব্দুল্লাহ্ ইব্ন উনায়স (রা) এই দুশমনকে শনাক্ত করিবার উপায় হিসাবে তাহার সম্পর্কে বর্ণনা দেওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-কে অনুরোধ করেন। রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন, "তুমি যখন তাহাকে দেখিবে, তাহার হাবভাব তোমাকে শয়তানের কথা স্মরণ করাইয়া দিবে। তোমার তাহাকে চিনিবার আরেকটি আলামত এই যে, তাহাকে দেখিবামাত্র তোমার কাঁপুনি ধরিবে"। তুমি তাহাকে ভয় পাইবে, তাহার হইতে সরিয়া পড়িতে চাহিবে।
ইবন উনায়স (রা) মনে মনে বলেন, আমি ভয় পাইবার পাত্র নহি। ইহার পর তিনি তরবারি সজ্জিত হইয়া একাকী অভিযানে বাহির হন এবং যে কোন কৌশলে শত্রু হত্যা করিবার অনুমতি লাভ করেন। তিনি ছদ্মবেশে উরানা উপত্যকায় পৌছিবার পর দেখিতে পাইলেন যে, ইন্ন নুবায়হ বিভিন্ন গোত্রের বিপুল সৈন্য সমভিব্যাহারে সামনে অগ্রসর হইতেছে। সে কতিপয় রমণী পরিবেষ্টিত অবস্থায় থাকিয়া বিশ্রামের জন্য জায়গা খুঁজিতেছে।
রাসূলুল্লাহ্ (স) কর্তৃক নির্দেশিত আলামত অনুযায়ী তিনি তাহাকে সহজেই শনাক্ত করিতে সক্ষম হইলেন এবং নিজের ভিতর সেই ভয় ও কম্পন অনুভব করিলেন যেই সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স) পূর্বেই তাঁহাকে অবহিত করিয়াছিলেন। তখন আসরের সালাতের ওয়াক্ত ঘনাইয়া আসিল। ইবন উনায়স (রা) বলেন, "আমি আশংকা করিলাম যে, তাহার ও আমার মধ্যে এমন কিছু ঘটিতে পারে যাহা আমার সালাতে বিলম্ব ঘটাইতে পারে। এইজন্য আমি অগ্রসররত অবস্থায় ইশারায় রুকু-সিজদা করিয়া সালাত আদায় করিলাম"।
আব্দুল্লাহ্ ইব্ উনায়স (রা) তাহার নিকটবর্তী হইলে সে জিজ্ঞাসা করিল, তুমি কে? উত্তরে তিনি বলিলেন, আমি খুযা'আ বংশীয় একজন আরব। আমি শুনিতে পাইলাম যে, আপনি মুহাম্মাদের বিরুদ্ধে সৈন্য সংগ্রহ করিয়াছেন। আপনার সহিত থাকিয়া আপনার এই কাজের সার্বিক সাহায্য-সহযোগিতা করিবার জন্যই আমি আসিয়াছি। ইব্ নুবায়হ বলিল, তোমাকে স্বাগতম! আমি তো ঐ কাজই করিতেছি।
ইব্ নুবায়হ তাহাকে সহযোদ্ধা ভাবিয়া কাছে টানিয়া লইল। তিনি তাহার সান্নিধ্যে আসিয়া তাহার তাঁবুতে অবস্থান গ্রহণ করিলেন। এক সময় তাহার সৈন্য-সামন্ত ও সহচররা ঘুমাইয়া পড়িল। সেই সুযোগে তিনি অকস্মাৎ তরবারির আঘাতে ইব্ন নুবায়হকে হত্যা করিলেন। তাহার সঙ্গিনীরা তাহার লাশের উপর মাথা ঝুঁঁকাইয়া কাঁদিতে থাকিল।
ইব্ন নুবায়হ-এর সৈন্যবাহিনী ঘটনাটি বুঝিয়া উঠিবার পূর্বেই তিনি তাহার বিচ্ছিন্ন মস্তকসহ সরিয়া পড়িলেন এবং গহীন পর্বত গুহায় আত্মগোপন করিলেন। তাহার সৈন্যবাহিনী বহু চেষ্টা করিয়াও তাঁহাকে খুঁজিয়া বাহির করিতে পারিল না। এইভাবে তিনি দিনের বেলা গুহায় লুকাইয়া থাকিয়া এবং রাত্রিবেলা পথ চলিয়া মদীনা মুনাওওয়ারায় প্রত্যাবর্তন করিলেন। তিনি মসজিদে নববীতে আসিয়া ইব্ন নুবায়হ-এর বিচ্ছিন্ন মস্তকটি রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সম্মুখে রাখেন। রাসূলুল্লাহ্ (স) তাহাকে দেখিবামাত্র মন্তব্য করিলেন : أَفْلَحَ الوجه “তোমার মুখমণ্ডল সফল হউক”। তিনি উত্তরে বলিলেন, أَفْلَحَ وَجْهُكَ يَا رَسُولَ الله "বরং সফল হউক আপনার মুখমণ্ডল, হে আল্লাহ্র রাসূল”।
রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার সফল অভিযানে সন্তুষ্ট হইয়া তাঁহাকে পুরস্কৃত করিলেন। তিনি নিজ গৃহ হইতে একখানি লাঠি আনিয়া তাঁহাকে উপহার দিলেন এবং সর্বদা ইহা তাঁহার সঙ্গে রাখিবার পরামর্শ দিলেন। তিনি লাঠিটি লইয়া সাহাবাদের সম্মুখে বাহির হইলে তাঁহারা জিজ্ঞাসা করিলেন, লাঠিটির রহস্য কি? তখন বলিলেন, রাসূলুল্লাহ (স) ইহা আমাকে দিয়াছেন এবং সঙ্গে রাখিতে বলিয়াছেন। তাঁহারা বলিলেন, তুমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে ফিরিয়া যাও এবং কেন তোমাকে ইহা দেওয়া হইয়াছে জিজ্ঞাসা কর। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট গিয়া ইহা প্রদানের কারণ জিজ্ঞাসা করিলে রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন, "এই লাঠিখানি কিয়ামতের দিন তোমার ও আমার মধ্যকার সম্পর্কের নিদর্শন। নিশ্চয়ই সেই দিন লাঠিধারী মানুষ স্বল্প সংখ্যক হইবে।
তখন হইতে হযরত আব্দুল্লাহ্ ইব্ন উনায়স (রা) এই বরকতপূর্ণ লাঠিখানি তাঁহার তরবারির সহিত একত্রে মিলাইয়া নিজের নিকট রাখিতেন। এইজন্য তাহাকে যুল-মিস্সারাহ (ذو المخصرة) বা যষ্ঠিধারী নামে অভিহিত করা হয়। তাঁহার মৃত্যু পর্যন্ত ইহা তাঁহার সঙ্গেই ছিল। তিনি ৫৪/৬৭৪ সালে, মতান্তরে ৭৪/৬৯৩ সালে অথবা ৮০/৬৯৯ সালে সিরিয়ায় ইনতিকাল করেন। আবদুল্লাহ্ ইব্ন উনায়স (রা)-এর ইনতিকালের পর তাঁহার ওসিয়াত অনুযায়ী যষ্ঠিখানি তাঁহার কাফনের ভিতর রাখিয়া একত্রে দাফন করা হয়।
ইবন উনায়স (রা)-এর এই সাহসিকতাপূর্ণ অভিযান ১৮ দিনে সমাপ্ত হয়। তিনি চতুর্থ হিজরীর ২৩ মুহাররাম শনিবার মদীনা মুনাওওয়ারায় ফিরিয়া আসেন। এই অভিযান সম্পর্কিত হাদীছের নির্ভরযোগ্যতা প্রসঙ্গে হাফিয ইব্ন হাজার আসকালানী (র) মন্তব্য করিয়াছেন, “سَنده حسن ইহার সনদ হাসান, উত্তম।
ইব্ন নুবায় হত্যার ও এই অভিযান প্রসঙ্গে হযরত আব্দুল্লাহ্ ইব্ন উনায়স (রা)-এর একটি কবিতা ইব্ন হিশাম সূত্রে জানা যায়। কবিতাটি নিম্নরূপ (অনুবাদ) :
১. আমি ইব্ন ছাওরকে ফেলিয়া রাখিয়াছি উট শাবকের মত; তাহার পাশে বিলাপরত মহিলারা কামীসের বুক বিদীর্ণ করিতেছিল।
২. আমি তাহাকে আঘাত করিলাম ভারতীয় তরবারির, যাহা ঝকঝক করিতেছিল লোহার পানি সদৃশ; হাওদায় আসীন নারীরা তখন তাহার ও আমার পশ্চাতে।
৩. সেই তরবারি খণ্ডিত করে বর্মধারীদের শির, যেন জ্বলন্ত গাদা কাঠের লেলিহান শিখা।
৪. তরবারি যখন করিতেছিল তাহার মুণ্ডপাত, আমি বলিতেছিলাম তখন, আমি তো ইব্ন উনায়স, বীর অশ্বারোহী, নহি নীচ আমি।
৫. আমি তো সেই দানবীরের পুত্র যাহার বাড়ির প্রশস্ত আঙিনা, যুগ যুগ ধরিয়া নামায়নি তাহার হাঁড়ি আর ছিলেন না যিনি সংকীর্ণমনা।
৬. আমি তাহাকে বালিলাম, লও, এই একটি আঘাত সম্মানী মানুষের, যিনি একনিষ্ঠ নবী মুহাম্মাদের দীনে।
৭. আল্লাহ্ নবী কোন কাফিরের প্রতি হইলে উদ্যত, ঝাঁপাইয়া পড়ি আমি সর্বশক্তি লইয়া তাহার উপর।
📄 গাযওয়া বানী নাযীর
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।
📄 গাযওয়া বদর আল-আখিরা
উহুদ যুদ্ধ হইতে প্রত্যাবর্তনের সময় কুরায়শ নেতা আবূ সুফ্যান বলিয়াছিল, তোমাদের এবং আমাদের মধ্যে ওয়াদা রহিল যে, আগামী বৎসর বদর প্রান্তরে আবার মুকাবিলা হইবে। মুসলমানগণ এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করিয়াছিলেন। দিন যত ঘনাইয়া আসিতে লাগিল মুসলমানদের প্রস্তুতিও চলিতে লাগিল। রাসূলুল্লাহ (স) ও সাহাবা কিরাম সিদ্ধান্ত লইলেন যে, আবূ সুফ্যান এবং তাহার কওমের সহিত মুকাবিলা করিয়া এই কথা বুঝাইয়া দিতে হইবে যে, মুসলমানরা দুর্বল নহে এবং মুখের ফুৎকারে আল্লাহর মনোনীত এই দীনকে নির্বাপিত করা যাইবে না।
প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ (স) হিজরী চতুর্থ সালের শা'বান অথবা যুল-কা'দা মাসে (৬২৫ খৃ.) বদর প্রান্তরে যাত্রার চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। প্রস্তুতির অংশ হিসাবে রাসূলুল্লাহ (স) হযরত 'আবদুল্লাহ ইব্ন রাওয়াহা (রা)-এর উপর মদীনার শাসনভার ন্যস্ত করিলেন। ইব্ন হিশামের মতে মদীনার দায়িত্বভার 'আবদুল্লাহ ইবন উবাই-এর উপর অর্পণ করা হয়। দেড় হাজার জানবায যোদ্ধা ও দশটি ঘোড়া সমভিব্যাহারে বদর অভিমুখে যাত্রার প্রস্তুতি গ্রহণ করিলেন। হযরত আলী (রা)-র হস্তে সোপর্দ করা হয় সেনাবাহিনীর পতাকা (সীরাত ইব্ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ১২৩; যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১১২)।
যুদ্ধের জন্য বাছাইকৃত দশটি ঘোড়া দশজন বিশিষ্ট যোদ্ধার জন্য নির্দিষ্ট ছিল। এইসব অশ্বারোহীগণ হইলেন : (১) রাসূলুল্লাহ (স); (২) হযরত আবূ বাক্স (রা); (৩) হযরত উমার (রা); (৪) হযরত আবু কাতাদা (রা); (৫) হযরত সা'ঈদ ইব্ন যায়দ (রা); (৬) হযরত মিকদাদ (রা); (৭) হযরত হুবাব (রা); (৮) হযরত যুবায়র (রা); (৯) হযরত আব্বাদ ইব্ন বিশর (রা); (১০) অজ্ঞাত ('উয়ূনুল আছার, ২খ., পৃ. ৮২)। নু'আয়ম ইবন মাসউদ নামক জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)- এর নেতৃত্বে সাহাবীগণের বদর অভিমুখে যাত্রা করিবার সংবাদ কুরায়শদের নিকট পৌঁছাইয়া দেন, পরবর্তীতে অবশ্য তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। কুরায়শ নেতা আবূ সুফ্যান আসলে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। সে এমন কোন ওজরের অপেক্ষায় ছিলেন যাহাতে যুদ্ধে যাইতে না হয়। তিনি নু'আয়মকে প্রতিশ্রুতি দিলেন যে, তুমি যদি মদীনা প্রত্যাবর্তন করিয়া মুসলমানদেরকে যুদ্ধাভিযান হইতে বিরত রাখিতে পার আমি তোমাকে দশটি অথবা বিশটি উট পুরস্কার প্রদান করিব।
আবু সুফ্যান নু'আয়ম ইবন মাস'উদকে একটি ঘোড়ার উপর আরোহণ করাইয়া বলিলেন, আমি এই মুহূর্তে সেনাদল লইয়া বদর প্রান্তরে যাত্রা করা সঠিক মনে করি না। যদি মুহাম্মাদ (স) যুদ্ধের জন্য আসেন আর আমি উপস্থিত না হই তাহা হইলে মুসলমানদের সাহস বাড়িয়া যাইবে। তাই আমি চাই যুদ্ধের ভয়ে আমরা প্রাণ বাঁচাইয়াছি এই কথা না বলিয়া বরং জনগণ বলুক, যুদ্ধের ভয়ে মুসলমানরা নিজেরাই পশ্চাতে হটিয়াছে। সুতরাং আমি চাই, তুমি মদীনা যাও এবং মুসলমানদের বল, আমি এক বিশাল সেনাবাহিনী লইয়া অগ্রসর হইতেছি যাহার মুকাবিলা মুসলমানরা করিতে পারিবে না। সুহায়ল ইবন 'আমরের মাধ্যমে আমি তোমাকে প্রতিশ্রুত উটগুলি প্রদান করিব। নু'আয়ম ইবন মাসউদ সুহায়ল ইবন আমরের নিকট আসিয়া বলিল, উক্ত উটের ব্যাপারে তুমি যদি যামিন হও তবে আমি মদীনা গিয়া মুহাম্মাদ (স)-এর বাহিনীর অগ্রাভিযাত্রা বন্ধ করিয়া দিব। সুহায়ল এই প্রস্তাবে সম্মতি দিলে নু'আয়ম দ্রুত মদীনা রওনা হইয়া গিয়া মুসলমানদের উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন, আমি এইমাত্র মক্কা হইতে মদীনা প্রত্যাবর্তন করিয়াছি। আবূ সুফ্যান বিশাল সেনাবাহিনী লইয়া তোমাদের সহিত যুদ্ধ করিবার জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি লইতেছে। তোমরা তাহাদের মুকাবিলায় যুদ্ধের ময়দানে টিকিয়া থাকিতে পারিবে না।
নু'আয়ম মুসলমানদেরকে জনে জনে এই কথা বুঝাইয়া ভীতি-বিহ্বলতা সৃষ্টি করিবার প্রয়াস চালাইল। এই অপপ্রচারে স্বল্প সংখ্যক মুসলমানের মনোবল দুর্বল হইয়া পড়িল। মদীনার মুনাফিক ও ইয়াহুদীগণ মুসলমানদের এই ভীতিপ্রদ অবস্থায় উৎফুল্ল হইল।
হযরত আবূ বাকর (রা) ও হযরত উমার (র) নেতিবাচক এই প্রচারণা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট গিয়া বলিলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবীকে দুনিয়ার বুকে প্রতিষ্ঠিত করিবেন এবং তাঁহার দীনকে বিজয়ী করিবেন, ইহাতে কোন সন্দেহের অবকাশ নাই। শত্রুগণ আমাদের সহিত মুকাবিলা করিবার প্রস্তুতি লইয়াছে-এইজন্য আমরা পিছনে পড়িয়া থাকিতে পারি না। কারণ ইহাতে তাহারা আমাদের ভীরু ও কাপুরুষ মনে করিবে। সুতরাং প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চলুন। আল্লাহ্র শপথ! ইহাতেই রহিয়াছে কল্যাণ ও সমৃদ্ধি।' রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাদের দৃঢ় প্রত্যয়ী বক্তব্য শুনিয়া অত্যন্ত আনন্দিত হইলেন এবং বলিলেন:
والذي نفسي بيده لاخر جن وان لم يخرج معنا احد. “ঐ সত্তার কসম যাঁহার হস্তে আমার প্রাণ! আমার সহিত কেহ না আসিলেও মুকাবিলার জন্য আমি অবশ্যই রওয়ানা হইব” (কিতাবুল মাগাযী, ১খ., পৃ. ৩৭৫; তাফসীর মাযহারী, ২খ., পৃ. ২৭৮-৯)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই দৃপ্ত ঘোষণার ফলে মুশরিকগণ মুসলমানদের অন্তরে যে অহেতুক ভীতির সঞ্চার করিয়াছিল, আল্লাহ তা'আলা তাহা দূর করিয়া দিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীগণকে লইয়া বদর অভিমুখে রওয়ানা হইলেন এবং সেইখানে পৌঁছিয়া শত্রুর আগমন প্রতীক্ষায় থাকিলেন (সীরাতুল হালাবিয়্যা, ৪খ., পৃ. ২৭৯-২৮০)।
এইদিকে আবূ সুফ্যান কুরায়শদের ডাকিয়া বলিলেন, আমরা নু'আয়মকে মদীনায় পাঠাইয়াছি যাহাতে সে মুহাম্মাদ (স)-এর বাহিনীর যুদ্ধযাত্রাকে স্থগিত করিতে পারে। কিন্তু আমাদেরও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী যাত্রা করা দরকার, তবে বদর প্রান্তর পর্যন্ত যাইব না। এক বা দুই রাত সফর করিবার পর আমরা ফিরিয়া আসিব। যদি মুহাম্মাদ (স) মদীনা হইতে বদর অভিমুখে যাত্রা না করেন এবং এই খবর তাঁহার নিকট পৌঁছে যে, আমরা যুদ্ধযাত্রা করিয়াছি অথবা আমাদের যুদ্ধযাত্রার খবর শুনিয়া মুসলমানগণ মাঝপথ হইতে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করে তবে আমাদের মাথা উঁচু হইবে আর মুসলমানদের মাথা অপমানে অবনত হইয়া যাইবে। মুসলমানগণ যদি সত্য সত্য মুকাবিলার জন্য বাহির হইয়া পড়ে তাহা হইলে আমরা এই কথা বলিয়া পিছনে হটিয়া যাইব যে, এখন খরা, দুর্দিন ও দুর্ভিক্ষের সময়। অনুকূল পরিবেশ ও সুদিন ছাড়া যুদ্ধ করা সমীচীন নহে। জনগণ আবূ সুফ্যানের এই বক্তব্য গ্রহণ করিল (উয়ূনুল আছার, ২খ., পৃ. ২৭৯; মাগাযী, ১খ., পৃ. ৩৮৭-৯)।
অতঃপর আবূ সুফ্যান দুই হাজার সৈন্য ও পঞ্চাশটি ঘোড়াসহ বদr অভিমুখে যাত্রা করিলেন। মক্কা অঞ্চলের যাহরান (ظهران) এর নিকটবর্তী মাজান্না (مَجَنَّة) নামক উপত্যকায় পৌঁছিয়া তাহারা শিবির স্থাপন করে। আরেক বর্ণনায় আছে, উসফার্ন (عسفان) নামক স্থানে তিনি ক্যাম্প স্থাপন করেন। আবূ সুফ্ফান অতঃপর কুরায়শদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত বক্তৃতায় বলেন :
يا معشر قريش انه لا يصلحكم ان عام خصيب ترعون فيه الشجر وتشربون فيها اللبن وان عامكم هذا عام جدب واني راجع فارجعوا .
"হে কুরায়শের জনগণ! সচ্ছল ও সজীব মওসুমে যুদ্ধে যাওয়া তোমাদের জন্য মঙ্গলজনক, যখন বৃক্ষরাজি সবুজ পাতায় ভরিয়া উঠিবে, যাহা পশুরা মনের আনন্দে ভক্ষণ করিতে পারিবে, তোমরাও তাহাদের দুগ্ধ পান করিতে পারিবে। এখন ত দুর্ভিক্ষ ও খরা মওসুম (এই সময়টা যুদ্ধের জন্য অনুপযোগী)। তাই আমি ফিরিয়া চলিলাম, তোমরাও ফিরিয়া চল।"
এমনিতে কুরায়শ সৈন্যগণ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল না। আবূ সুফ্যানের বক্তব্যে তাহারা যুদ্ধের আগ্রহ হারাইয়া ফেলিল। পরিশেষে তাহারা মক্কার পথে ফিরিয়া চলিল। মক্কাবাসিগণ এই অভিযানের নাম দিল 'জায়শুস-সাবীক (جيش السويق) বা ছাতু বাহিনী। তাহারা বলাবলি করিতে লাগিল, আমরা তো আসলে ছাতু খাওয়ার জন্য গিয়াছিলাম, যুদ্ধ করিবার জন্য যাই নাই (ইবন হিশাম, আস সীরাতুন নাবাবিয়া, ২খ., পৃ. ১২৩; তাবারী, তারীখ, ২খ., পৃ. ৫৫৯; ইবন কায়ি্যম, যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১১২; উয়ূনুল আছার, ২খ., পৃ. ৮২; দানাপূরী, আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১২৮; সফিউর রহমান মুবারকপুরী, আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ২৯৯)।
এইদিকে রাসূলুল্লাহ (স) আট দিন যাবত বদর প্রান্তরে শত্রুসৈন্যের আগমনের জন্য অপেক্ষা করেন। তখন বদরে সপ্তাহব্যাপী বাণিজ্যমেলা বসিয়াছিল। মুসলমানগণ সেই সুযোগে ব্যবসা করিয়া বিপুলভাবে লাভবান হন। মেলায় আগত লোকদের নিকট যখন মুসলমানগণ কুরায়শদের ব্যাপারে জানিতে চাহিত তখন তাহারা বলিত, কুরায়শগণ তোমাদের মুকাবিলায় বিপুল বাহিনী জমায়েত করিয়াছে। মুসলমানগণ এই জবাব শুনিয়া বলিত :
حَسْبُنَا الله ونعم الوكيل.
"আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনিই আমাদের জন্য উত্তম যিম্মাদার" (৩: ১৭৩; শায়খ আবদুল্লাহ, মুখতাসার সীরাতি রাসূলিল্লাহ, পৃ. ২৬৫; আল-হালাবী, সীরাতুল হালাবিয়া, ৪খ., পৃ. ২৭৯-২৮০)। বদর প্রান্তরে রাসূলুল্লাহ (স) যখন প্রতীক্ষারত অবস্থায় ছিলেন তখন মাখশী ইব্ন আমর আদ-দামরী (مخشی بن عمرو الضمرى ) তাঁহার পাশ দিয়া অতিক্রম করিতেছিলেন, যিনি এক যুদ্ধে দামরা গোত্রের পক্ষে রাসূলুল্লাহ (স)- এর সহিত সন্ধি চুক্তি সম্পাদন করিয়াছিলেন। তিনি বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! কুরায়শদের সহিত যুদ্ধ করিবার জন্য এই জায়গায় বসিয়া রহিয়াছেন? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন:
نعم يا اخا بنى ضمرة وان شئت مع ذلك رددنا اليك ماكان بيننا وبينك ثم جادلناك حتى يحكم الله بيننا وبينكم .
"হে, দামরা গোত্রের ভাই! তুমি যদি চাও তোমাদের এবং আমাদের মধ্যে যেই অনাক্রমণ চুক্তি হইয়াছিল তাহা প্রত্যাহার করিয়া লইতে পারি। অতঃপর তোমাদের সহিত যুদ্ধ করিব যতক্ষণ না আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের এবং আমাদের মধ্যে ফয়সালা করিয়া দেন"।
মাখশী জবাবে বলিলেন, না, না, আল্লাহর কসম! আপনার সহিত যুদ্ধ করিবার কোন অভিপ্রায় নাই (ইব্ন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ৩খ., পৃ. ১২৩-৪; ইব্ন সায়্যিদিল্লাস, উয়ূনুল আছার, ২খ., পৃ. ৮২; আল-হালাবী, সীরাতুল হালাবিয়া, ৪খ., পৃ. ২৭৯-২৮০)। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) তথায় আট দিন অবস্থান করিয়া দেড় হাজার সাহাবীসহ মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন। কুরায়শগণ তথায় আগমন না করায় মুসলমানদের যুদ্ধ করার প্রয়োজন পড়ে নাই। এইভাবে আল্লাহ তা'আলা কাফিরের ষড়যন্ত্র হইতে মুসলমানদের রক্ষা করিলেন (আবুল হাসান আলী নদবী, নবীয়ে রহমত, পৃ. ২৪৮)। এই ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা কুরআনুল করীমের নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করেন:
الَّذِينَ اسْتَجَابُوا لِله وَالرَّسُولِ مِنْ بَعْدِ مَا أَصَابَهُمُ الْقَرْحُ لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا مِنْهُمْ واتَّقَوا أَجْرٌ عَظِيمُ الَّذِينَ قَالَ لَهُمُ النَّاسُ إِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوا لَكُمْ فَاخْشَوْهُمْ فَزَادَهُمْ إِيْمَانًا وَقَالُوا حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ. فَانْقَلَبُوا بِنِعْمَةٍ مِنَ اللَّهِ وَفَضْلٍ لَّمْ يَمْسَسْهُمْ سُوءٌ واتَّبَعُوا رِضْوَانَ اللَّهِ وَاللَّهُ ذُو فَضْلٍ عَظِيمٍ إِنَّمَا ذَلِكُمُ الشَّيْطَانُ يُخَوِّفُ أَوْلِيَاءَهُ فَلَا تَخَافُوهُمْ وَخَافُوْنَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ.
"যখম হওয়ার পর যাহারা আল্লাহ ও রাসূলের ডাকে সাড়া দিয়াছে তাহাদের মধ্যে যাহারা সৎকার্য করে এবং তাওয়া অবলম্বন করিয়া চলে তাহাদের জন্য মহাপুরস্কার রহিয়াছে। ইহাদিগকে লোকে বলিয়াছিল, তোমাদের বিরুদ্ধে লোক জমায়েত হইয়াছে, সুতরাং তোমরা তাহাদিগকে ভয় কর, কিন্তু ইহা তাহাদের ঈমান দৃঢ়তর করিয়াছিল এবং তাহারা বলিয়াছিল, 'আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কত উত্তম কর্মবিধায়ক'। তারপর তাহারা আল্লাহর নি'মাত ও অনুগ্রহসহ ফিরিয়া আসিয়াছিল, কোন অনিষ্ট তাহাদিগকে স্পর্শ করে নাই এবং আল্লাহ যাহাতে রাযী তাহারা তাহারই অনুসরণ করিয়াছিল এবং আল্লাহ মহা অনুগ্রহশীল। ইহারাই শয়তান, তোমাদিগকে তাহার বন্ধুদের ভয় দেখায়। সুতরাং যদি তোমরা মুমিন হও তবে তোমরা তাহাদিগকে ভয় করিও না, আমাকেই ভয় কর" (৩: ১৭২-১৭৫)।
عن ابن عباس حسبنا الله ونعم الوكيل قالها ابراهيم حين القي في النار وقالها محمد ﷺ حين قالوا ان الناس قد جمعوا لكم فاخشوهم فزادهم ايمانا وقالوا حسبنا الله ونعم الوكيل .
"আবদুল্লাহ ইব্ন ‘আব্বাস (র) বলিয়াছেন, ‘হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি‘মাল ওয়াকীল’ (আল্লাহ্ই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কত উত্তম কর্ম বিধায়ক’)-ইবরাহীম (আ)-কে যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হইয়াছিল তখন তিনি এই কথা বলিয়াছিলেন। আর মুহাম্মাদ (স)-ও এই কথাই বলিয়াছিলেন যখন লোকজন তাঁহাকে আসিয়া খবর দিল যে, তোমাদের বিরুদ্ধে বিরাট সেনাদল প্রস্তুত করা হইয়াছে, তাহাদিগকে ভয় কর। এই কথা শুনিয়া তাহাদের ঈমান আরও মযবুত হইয়া গেল এবং তাহারা বলিল, আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কত উত্তম কর্মবিধায়ক” (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৬৫৫)।
অধিকাংশ মুফাস্সিরের মতে উল্লিখিত আয়াত গাযওয়া হামরাউল আসাদ উপলক্ষে অবতীর্ণ হইয়াছিল। যুদ্ধ ছাড়াই যদিও রাসূলুল্লাহ (স) বদর প্রান্তর হইতে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন তাহার পরও এই অভিযানের প্রভাব ও ফলাফল ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। উহুদের যুদ্ধে মুসলমানদের হারানো মর্যাদা ইহার মাধ্যমে পুনরুদ্ধার হয়। রাসূলুল্লাহ (স)-এর শক্তি তৎকালীন শক্তিধর কুরায়শগণ বিলক্ষণ উপলব্ধি করিল। ইহার দ্বারা শাণিত হয় সাহাবাদের ঈমানী চেতনা ও সমরশক্তি। আল্লাহর উপর ভরসা, ঈমানের দৃঢ়তা, প্রচণ্ড কর্মশক্তি, বাতিলের প্রতিরক্ষা ব্যূহ বিধ্বস্ত করিয়া দিবার অদম্য স্পৃহা তৎকালীন পরিস্থিতিকে মুসলমানদের অনুকূলে লইয়া আসে।
মুসলমানদের ভয়ে কুরায়শদের যুদ্ধ ছাড়া মক্কায় ফিরিয়া যাওয়া মুসলমানদের জন্য উহুদের পরাজয়ের ক্ষতিপূরণ হিসাবে পরিগণিত হয়। অপরদিকে কাফিরদের এইভাবে ফিরিয়া যাওয়াটা বৎসরের প্রথম যুদ্ধে' তাহাদের পরাজয়ের চাইতে কম অবমাননাকর ছিল না। তাহা সত্ত্বেও কুরায়শরা আগামী বৎসরের জন্য যুদ্ধ পরিকল্পনা গ্রহণের ব্যাপারে উদাসীন ছিল না। কুরায়শদের পৃষ্ঠ প্রদর্শনে রাসূলুল্লাহ (স) নিশ্চেষ্ট না থাকিয়া নূতন কৌশল অবলম্বন করেন। শত্রুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্যে তিনি সাহাবীদের গোয়েন্দা তৎপরতায় নিয়োজিত রাখেন (Dr. Muhammad Husayn Haykal, The Life of Muhammad, translated by Dr. Ismail Razi Al Faruqi. p. 243)।
ইসলামের ইতিহাসে এই যুদ্ধ 'প্রতিশ্রুত বদর যুদ্ধ' (بدر الموعد), বদরের দ্বিতীয় যুদ্ধ (بدر الثانية), বদরের শেষ যুদ্ধ (بدر الاخيرة), বদরের ছোট যুদ্ধ (بدر الصغری) ও ছাতুর যুদ্ধ (جيش السويق) নামে পরিচিতি (তাবারী, তারীখ, ২খ., পৃ. ৫৫৯; যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১১২; আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ২৯৯)।