📄 গাযওয়া যী-আম্র
বদর ও উহুদ যুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নেতৃত্বাধীনে ইহাই সর্বাপেক্ষা বড় সামরিক অভিযান। এই সমরাভিযান তৃতীয় হিজরীর মুহররম মাসে অনুষ্ঠিত হয়। ইবন সা'দ বলেন, এই অভিযান মদীনায় হিজরতের পঁচিশ মাসের মাথায় অর্থাৎ তৃতীয় হিজরীর রবীউল আওয়াল মাসে অনুষ্ঠিত হয়। ইবন ইসহাকের মতে ইহা তৃতীয় হিজরীর সফর মাসে অনুষ্ঠিত হয়।
হাফিয ইব্ন কাছীর (র) ওয়াকিদীর উদ্ধৃতি উল্লেখ করিয়া বলেন, তৃতীয় হিজরীর ১৩ রবীউল আওয়াল বৃহস্পতিবার মহানবী (স) এই সমরাভিযানে রওয়ানা হন। এই বুদ্ধকে গাযওয়া নাঙ্গও বলা হয়। হাকিম এই যুদ্ধের নাম গাযওয়া আনমার (غزوة أغار) বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন।
ইব্ন হিশাম বলেন, দ্বিতীয় হিজরীর যুল-হিজ্জা মাসে সংঘটিত সাবীক নামক যুদ্ধাভিযান হইতে প্রত্যাবর্তনের পর ঐ মাসের অবশিষ্ট দিনগুলি রাসূলুল্লাহ (স) মদীনায় বা তাহার আশেপাশে অবস্থান করেন। ইহার পর গাতাফানের উদ্দেশে নাজাদ এলাকায় যুদ্ধে রওয়ানা হন। ইব্ন জারীর আত-তাবারী বলেন যে, ইহাই গাযওয়া যী আমর বা যু অ্যামরের যুদ্ধ নামে পরিচিত।
যুদ্ধাভিযানের কারণ : রাসুলুল্লাহ (স) গোপন সূত্রে জানিতে পারিলেন যে, বনী ছা'লাবা এবং বনী মুহারিব গোত্রদ্বয়ের এক বিরাট বাহিনী মুসলমানদিগকে পরাজিত ও নিঃশেষ করিবার দৃঢ় সংকল্পে যু-'আম্র নামক স্থানে একত্র হইয়াছে। দু'সুর ইবনুল-হারিছ আল- মুহারিবী এই বিশাল বাহিনীর নেতৃত্বে ছিল। খতীব বাগদাদীর বর্ণনা হইতে এই সেনাপতির নাম গ্রাছ (غورث), অন্যান্য ঐতিহাসিক ঐ ব্যক্তির নাম গ্রাক (غورك) বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। মুহারিব গোত্রের এই লোকটি অত্যন্ত সাহসী এবং বীর যোদ্ধা হিসাবে খ্যাতিমান ছিল।
রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের মুকাবিলায় যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করিবার জন্য সাহাবাগণকে আহ্বান জানাইলেন। সাহাবাগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করিলে মহানবী (স) অশ্বারোহী ও পদাতিক মিলিয়া মোট চার শত পঞ্চাশজন মুসলিম সৈন্যের এক বাহিনী এবং তৎসঙ্গে কিছু অশ্ব লইয়া গাতাফানের উদ্দেশে নাজদ ও নুখায়লের দিকে রওয়ানা হইলেন। মদীনায় উছমান ইব্ন আফফান (রা)-কে প্রতিনিধি হিসাবে রাখিয়া গেলেন।
রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবাগণকে লইয়া যাত্রা শুরু করিলেন। তিনি উহুদ ও মদীনার মধ্যবর্তী আল-মুনাক্কা নামক স্থানের উপর দিয়া নাজদের নিকটবর্তী 'যুল-কাসসা' নামক স্থানে পৌঁছেন। এই স্থানে আসিয়া ছা'লাবা গোত্রের জাব্বার নামক এক ব্যক্তিকে পাইয়া মুসলমানগণ তাহাকে গ্রেফতার করেন। অতঃপর তাহাকে জিজ্ঞাসা করেন, তুমি কোথায় যাইতেছ? সে বলিল, ইয়াছরিব। মুসলমানগণ আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, ইয়াছরিবের তোমার কি প্রয়োজন? সেই ব্যক্তি বলিল, আমি নিজেকে লুকাইয়া রাখিয়া পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করিতে চাই। তাহাকে প্রশ্ন করা হইল, তুমি কি কোন বাহিনীর সাথে আসিয়াছ কিংবা তোমার কওমের কোন সংবাদ বহন করিয়া আনিয়াছ? সে বলিল, না। তবে আমার নিকট সংবাদ পৌঁছে যে, দু'সুর ইব্দুল হারিছ মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য লোকদিগকে একত্র করিয়াছে। সাহাবীগণ তাহাকে রাসূলুল্লাহ্ (স)- এর সমীপে উপস্থিত করিলেন। মহানবী (স) তাহাকে ইসলাম কবুলের আহ্বান জানাইলে সে ইসলাম কবুল করিল। সে বলিল, হে নবী! শত্রুপক্ষ' কখনও আপনাদের মুকাবিলা করিবার সাহস পাইবে না। তাহারা যদি আপনাদের সমরাভিযানের সংবাদ জানিতে পারে তবে ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া পলায়ন পূর্বক পাহাড়ের চূড়ায় আশ্রয় গ্রহণ করিবে। আমি তাহাদের ঘাটির দিকে পথ প্রদর্শন করিতে আপনাদের সাথেই আছি। ইসলামের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান দানের জন্য মহানবী (স) তাহাকে হযরত বিলাল (রা)-এর সঙ্গী করিয়া দেন। তিনি মুসলিম সৈন্যবাহিনীকে শত্রুদের আবাসস্থল পর্যন্ত রাস্তা দেখাইয়া নিয়া যান।
এইদিকে শত্রুরা মুসলিম সৈন্যবাহিনীর আগমনের সংবাদ পাইয়া ছত্রভঙ্গ হইয়া যায় এবং আশেপাশের পাহাড়গুলিতে আত্মগোপন করে। রাসূলুল্লাহ (স) অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখিলেন এবং সৈন্যবাহিনীসহ শত্রুদের একত্র হইবার স্থান পর্যন্ত গমন করিলেন। ইহা ছিল মূলত একটা প্রস্রবণ যাহা যু-'আমর নামে পরিচিত। এইজন্যই এই অভিযানকে 'যু-'আমরের যুদ্ধ' নামে অভিহিত করা হয়। শত্রুপক্ষের কাহারও সাথেই মুসলমানদের সাক্ষাত হয় নাই। মহানবী (স) ঐ স্থানেই শিবির স্থাপন করিলেন। ঐ সময়ে প্রচুর বারি বর্ষিত হইতেছিল। রাসূলুল্লাহ (স) পায়খানা-পেশাব করিবার জন্য ছাউনী হইতে বাহিরে আসিলে বৃষ্টিতে তাঁহার কাপড় ভিজিয়া যায়। তিনি ভিজা কাপড় খুলিয়া শিবির হইতে নিচে আসিয়া একটি গাছের ডালে শুকাইতে দিলেন এবং নিজে ঐ গাছের নিচে শুইয়া বিশ্রাম করিতে করিতে ঘুমাইয়া পড়িলেন। প্রতিপক্ষ বেদুঈনরা পাহাড়ের চূড়া হইতে এই সকল ঘটনা প্রত্যক্ষ করিতেছিল।
এই দৃশ্য দেখিয়া বেদুঈনরা তাহাদের দলের সেই প্রখ্যাত যোদ্ধা ইন্ন হারিছ, মতান্তরে দু'সুর ইন্ন হারিছকে লক্ষ্য করিয়া বলিল, মুহাম্মাদ (স)-কে হত্যা করিবার ইহাই সুবর্ণ সুযোগ। সঙ্গীগণ হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া তিনি এখন একাকী নিদ্রামগ্ন। এই অপূর্ব সুযোগ হাতছাড়া করা মোটেই সমীচীন হইবে না। তখন সেই দু'সুর একটি তরবারি হাতে লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর শিয়রের পাশে দণ্ডায়মান হইয়া বলিতে লাগিল, হে মুহাম্মাদ! আজ তোমাকে আমার হাত হইতে কে রক্ষা করিবে? নবী করীম (স) অত্যন্ত দৃঢ়চিত্তে উত্তর দিলেন, আল্লাহ। আল্লাহ তা'আলার আদেশক্রমে জিবরাঈল (আ) অবতরণ করিয়া তাহার হৃদয়ে ভীতির সঞ্চার করিলেন। ফলে তাহার হাত হইতে তরবারি পড়িয়া গেল। রাসূলুল্লাহ (স) তরবারি উঠাইয়া নিয়া বলিলেন, এইবার তোমাকে কে রক্ষা করিবে? সে বলিল, কেহই রক্ষা করিতে পারিবে না। সেই সাথে আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই এবং মুহাম্মাদ (স) আল্লাহ্র রাসূল। আল্লাহ্র কসম! আপনার উপর কখনও কোন বাহিনী জয়লাভ করিতে সক্ষম হইবে না। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার তরবারি ফেরত দিলেন। তিনি তাহার সাথীদের কাছে পৌঁছিলে তাহারা বলিতে লাগিল, তোমার পতন হউক। কী হইয়াছে তোমার যে, এই ধরনের মহাসুযোগ পাইয়াও মুহাম্মাদকে হত্যা করিতে পারিলে না? তিনি উত্তরে বলিলেন, আমি তরবারি হাতে লইয়া যখন নবী (স)-এর মাথার পাশে দণ্ডায়মান হইলাম তখন দেখিতে পাইলাম, সাদা পোশাক পরিধানকারী দীর্ঘাকৃতির এক ব্যক্তি আসিয়া আমার বুক ও পিঠ চাপিয়া ধরিলেন। ফলে আমি ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া পড়িলাম। তরবারি আমার হাত হইতে পড়িয়া গেল। আমি চিনিতে পারিলাম যে, ইনি আল্লাহ্র ফেরেশতা। এই অবস্থায় আমি ক'লেমা পড়িয়া মহানবী (স)-এর হাতে ইসলাম কবুল করিয়াছি। আমি আল্লাহ্র শপথ করিয়া বলিতেছি, কোন বড় বাহিনীই মুসলমানদের উপর জয়লাভ করিতে পারিবে না। পরে তিনি স্বগোত্রীয় লোকদিগকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানাইতে লাগিলেন। ওয়াকিদী বলেন, এই ঘটনা উপলক্ষে আল্লাহ তা'আলা নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন:
يأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا نِعْمَتَ اللهِ عَلَيْكُمْ إِذْ هَمَّ قَوْمٌ أَنْ يَبْسُطُوا إِلَيْكُمْ أَيْدِيَهُمْ فَكَفَّ أَيْدِيَهُمْ عَنْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ.
“হে মুমিনগণ! তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর। যখন এক সম্প্রদায় তোমাদের দিকে তাহাদের হস্ত প্রসারিত করিতে সচেষ্ট হইয়াছিল, তখন তিনি তাহাদের হস্ত তোমাদের হইতে প্রতিহত করিয়া দিলেন। আল্লাহকে ভয় কর। আর মুমিনদের উচিত আল্লাহ্র উপর পূর্ণ ভরসা রাখা" (৫:১১)।
তাফসীরে ইব্ন কাছীরেও অত্র আয়াত নাযিলের প্রেক্ষাপট বর্ণনায় অনুরূপ ঘটনার উল্লেখ রহিয়াছে। ইমাম বায়হাকী (র) বলেন, হিজরতের ৪তম মাসে সংঘটিত যাতুর-রিকা' যুদ্ধেও অনুরূপ ঘটনার উল্লেখ রহিয়াছে। অতএব বলা যায় যে, সম্ভবত একই ঘটনা পৃথক পৃথকভাবে দুইবার সংঘটিত হইয়া থাকিবে।
বেদুঈনদের উপর প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত এবং মুসলমানদের শক্তি-সামর্থ্য সম্পর্কে তাহাদিগকে ওয়াকিফহাল করাইবার জন্য মহানবী (স) সাহাবাদের লইয়া তৃতীয় হিজরীর পূর্ণ সফর মাসটি সেখানে অতিবাহিত করেন, অতঃপর মদীনায় ফিরিয়া আসেন।
এই যুদ্ধাভিযানে প্রত্যক্ষ সশস্ত্র লড়াই হয় নাই বিধায় ইসলামের ইতিহাসে ইহা কম আলোচিত হইয়াছে। কিন্তু ইসলামের ভিত্তি মজবুতকরণ, প্রচার-প্রসার এবং মুসলমানদের শক্তি-সাহস সুদৃঢ় করিবার ক্ষেত্রে এই ধরনের খণ্ড খণ্ড অভিযানগুলি সক্রিয় ভূমিকা পালন করিয়াছে। বানু ছা'লাবা গোত্রের জাব্বার এবং আরব বেদুঈনদের প্রখ্যাত যোদ্ধা গুরাছ বা দু'সুর ইব্ন হারিছ এই যুদ্ধাভিযানে মহানবী (স)-এর হাতে ইসলাম কবুল করিয়াছিলেন যাহা প্রত্যক্ষভাবে মুসলমানদের বিজয় ও উত্তরোত্তর অগ্রগতির সাক্ষ্যই বহন করে। ইয়াহুদী ও বেদুঈন জাতিও ইসলামের শক্তি সম্পর্কে এই অভিযানে আরও নিশ্চিত ধারণা লাভ করে। তাহারা শত্রুতা পরিত্যাগ না করিলেও মুসলমানদেরকে তুচ্ছ- তাচ্ছিল্য করিবার সাহস হারাইয়া ফেলে।
📄 গাযওয়া বুহ্বান
বুরান (بحران) শব্দটি দুইভাবে পঠিত হইয়া থাকে : (ক) বাহরান (بحران) অর্থাৎ প্রথম হরফে যবর এবং দ্বিতীয় হরফ সাকিন যোগে।
(খ) বুহরান (بحران) অর্থাৎ প্রথম বর্ণে পেশ এবং দ্বিতীয় বর্ণে সাকিন যোগে। ওয়াকিদী (র)-এর বর্ণনামতে বুরান শব্দটি মূলত ছিল নাজরান (نجران), কিন্তু হাদীছে গাযওয়া ‘বুরান’ (غزوة بحران) ব্যবহৃত হইয়াছে।
বুরান বা বাহ্বান হইল মদীনার ফুরু’ (الفرع)-এর পার্শ্ববর্তী একটি স্থানের নাম। ফুরু’ হইতে মদীনার দূরত্ব আট বুরুদ (برد) বা আট মাইল। অন্য বর্ণনামতে, হিজাযের ফুরু’ সীমান্তে অবস্থিত খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ একটি স্থানের নাম বুহরান। রাসূলুল্লাহ (স) গাতাফান যুদ্ধ হইতে প্রত্যাবর্তনের পর তৃতীয় হিজরীর রবীউল আওওয়াল মাস মদীনায় অতিবাহিত করেন। এমতাবস্থায় নবী করীম (স)-এর নিকট সংবাদ পৌঁছে যে, হিজাযের খনি সমৃদ্ধ ‘বুহরান’ নামক স্থানে বানু সুলায়ম মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য একত্র হইয়াছে এবং ব্যাপক সামরিক প্রস্তুতি গ্রহণ করিয়াছে। এই খবর শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) হিজরতের ২৭ মাসের মাথায় রবী’উল আখির, মতান্তরে জুমাদাল উলা মাসে তিন শত মুসলিম সৈন্যের এক বাহিনী লইয়া তাহাদিগকে প্রতিহত করিবার জন্য ‘বুরান’ নামক স্থানের উদ্দেশে যুদ্ধযাত্রা করেন। যেহেতু ‘বুহরান’ নামক স্থানে এই যুদ্ধাভিযান পরিচালিত হয় সেইজন্য এই যুদ্ধকে ‘গাযওয়া বুহরান’ বলা হইয়া থাকে। সুলায়ম গোত্র মুসলমানদের বিরুদ্ধে যেহেতু এই যুদ্ধের অবতারণা করিয়াছে, সেইজন্য কেহ কেহ এই যুদ্ধকে ‘গাষওয়া বানু সুলায়ম’ বলিয়াও অভিহিত করিয়াছেন। এই যুদ্ধাভিযানে যাত্রার প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহ (স) ‘আবদুল্লাহ ইব্ন উম্মে মাকতুম (রা)-এর উপর অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য মদীনার বিচারকার্য, সালাতের ইমামতী প্রভৃতি কর্মের দায়িত্ব অর্পণ করিয়া যান।
ওয়াকিদী বলেন, মা’মার ইবন রাশিদ ইমাম যুহরী (র) হইতে আমার নিকট হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন, বানু সুলায়মের মুকাবিলার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর তিন শত সৈন্যের বাহিনী বুরান পৌঁছিতে আর মাত্র এক দিনের পথ বাকী থাকিতে বানু সুলায়মের এক ব্যক্তির সহিত পথিমধ্যে তাঁহাদের সাক্ষাত হয়। মুসলমানগণ সুলায়ম গোত্র, তাহাদের রণপ্রস্তুতি এবং বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে লোকটিকে জিজ্ঞাসা করিলেন। লোকটি এই বলিয়া সংবাদ দিল যে, সুলায়ম গোত্রের সমবেত সৈন্যদল গতকালই বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়িয়াছে এবং তাহারা নিজ নিজ স্থলে ফিরিয়া গিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে বন্দী করিয়া রাখিতে নির্দেশ দিলেন। অতঃপর নবী করীম (স) সৈন্যবাহিনী লইয়া বুহুরান নামক স্থানে পৌঁছিলেন, কিন্তু তথায় বিপক্ষ দলের কাহাকেও দেখিতে পাইলেন না। রাসূলুল্লাহ (স) যুদ্ধ বিজয়ের নিদর্শনস্বরূপ ঐ স্থানে ১০ (দশ) দিন, মতান্তরে ১৬ জুমাদাল উলা পর্যন্ত অবস্থান করিয়া মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন। কোন কোন বর্ণনায়, মুসলিম সৈন্যবাহিনী রাবীউল-আখির ও জুমাদাল উলা এই দুই মাস তথায় অবস্থান করিয়াছিল বলিয়া উল্লেখ রহিয়াছে। এই অভিযানে মুসলিম সৈন্যবাহিনীকে কোন প্রকার যুদ্ধের সম্মুখীন হইতে হয় নাই। কাফির বাহিনী মুসলিম সৈন্যদের ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত ও আতংকিত হইয়া বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ফিরিয়া গিয়াছিল।
এই সমরাভিযানে প্রত্যক্ষ লড়াই সংঘটিত না হইলেও ইসলামের প্রচার-প্রসার ও কাফিরদের হতবিহ্বল করিবার ক্ষেত্রে ইহার ইতিবাচক ভূমিকা ছিল। যুদ্ধক্ষেত্র হইতে কাফিরদের পলায়ন মুসলমানদের শক্তি ও সাহস বৃদ্ধি করিয়াছিল, ইসলামের জয়যাত্রা ও উত্তরণের পথকে করিয়াছিল সুগম ও সুসংহত।
📄 গাযওয়া উহুদ
উহুদ (أحد) ('হামযা' ও 'হা' বর্ণে পেশযোগে গঠিত, প্রসিদ্ধ এক পাহাড়বিশেষ, মদীনা হইতে তিন/সাড়ে তিন মাইল উত্তরে ইহার অবস্থান। মসজিদে নববী হইতে পাঁচ কিলোমিটার উত্তরে দীর্ঘ এই পাহাড়টি শক্ত নুড়িযুক্ত মাটি দ্বারা আবৃত। ইহার উত্তর পার্শ্ব চওড়া পাথরবিশিষ্ট, যাহা দেখিতে অনেকটা উচ্চ দেয়ালের মত মনে হয়। লাল বেলে পাথর ও শক্ত পাথরের টুকরা পাহাড়টির প্রায় সর্বত্রই পরিদৃষ্ট হয়। ইহার পার্শ্বেই একটি ক্ষুদ্র পাহাড় আছে, যাহাকে জাবালুর রুমাত বা জাবালুল 'আয়নায়ন বলা হয়। উক্ত পাহাড়ের পূর্বে একটি প্রাচীন সেতুর ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। ইহাতে অনুমিত হয় যে, অতীতে কোন এক সময় এখানে বন্যা হইত। ফলে শহর হইতে উহুদের শহীদদের যিয়ারতের উদ্দেশে আগত মুসলিমগণ উক্ত সেতু ব্যতীত জলাশয় পার হইতে পারিতেন না।
হযরত হারুন (আ) তাঁহার সহোদর ভ্রাতা মূসা (আ)- এর সাথে হজ্জ বা 'উমরা পালনের উদ্দেশ্যে ভ্রমণকালে এখানে ইন্তিকাল করেন এবং এই পাহাড়ের পাদদেশেই তাঁহাকে দাফন করা হয়। হযরত মূসা (আ)- এর কবরও এই পাহাড়ে অবস্থিত বলিয়া উল্লেখ পাওয়া যায়।
এই পাহাড়ের মধ্য দিয়া যাতায়াতের কোন রাস্তা ছিল না। মাঝখানের দৈর্ঘ্য ছিল এক-দেড় ফার্লং (৮ ফার্লং সমান ১ মাইল)। ইহার অভ্যন্তরীণ মাঠ যেহেতু সর্বদিক দিয়াই নিরাপদ ও অনেকটা সুরক্ষিত তাই উহুদ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী এখানে শিবির স্থাপন করিয়াছিল। প্রাচীন কাল হইতেই মদীনাবাসীদের নিকট উহুদ পাহাড় ছিল অত্যন্ত প্রিয়। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, "ইহা (উহুদ) একটি পাহাড়, যাহা আমাদিগকে ভালবাসে এবং আমরাও ইহাকে ভালবাসি"।
এই পাহাড়কে উহুদ নামকরণের কারণ হইল, পার্শ্ববর্তী পাহাড়সমূহ হইতে ইহা স্বতন্ত্র একটি পাহাড়বিশেষ। মদীনা নগরী হইতে দৃষ্টি দিলে ইহাকে গাঢ় লাল বর্ণের বলিয়া মনে হয়। খুব বেশী উদ্ভিদ এই পাহাড়ে জন্মায় না। তবে বর্ষায় পর্বত গুহার গর্তসমূহে পানি জমিয়া যায় এবং বেশ কিছু দিন তাহা পানিবদ্ধ অবস্থায় থাকে। মহানবী (স) উহুদ যুদ্ধে আহত হইলে তাঁহার রক্তাক্ত ক্ষত স্থানসমূহ ধৌত করিবার জন্য হযরত আলী (রা) পাহাড়ের ঐ প্রাকৃতিক গর্তসমূহ হইতে স্বীয় ঢাল পূর্ণ করিয়া পানি আনিয়াছিলেন বলিয়া হাদীছে উল্লেখ পাওয়া যায়। এই ঐতিহাসিক পাহাড়ের পাদদেশে ইসলামের দ্বিতীয় বৃহৎ যুদ্ধ সংঘটিত হইয়াছিল বিধায় ইহাকে 'উহুদ যুদ্ধ' নামে অভিহিত করা হয়।
বদর যুদ্ধে মক্কার কুরায়শদের শোচনীয় পরাজয় হইয়াছিল, 'উহুদ' যুদ্ধের ইহাই অন্যতম কারণ। বদর প্রান্তরে সুসজ্জিত কুরায়শ বাহিনী চরমভাবে পরাজিত হওয়ায় এবং যুদ্ধে তাহাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের নিহত হওয়ায় মক্কায় কান্নার রোল পড়ে ও শোকের ছায়া নামিয়া আসে। ক্ষোভ, বিদ্বেষ ও প্রতিশোধের স্পৃহা তাহাদের মাঝে তীব্রভাবে জ্বলিয়া উঠে। আর আরবরা ছিল প্রতিশোধ পরায়ণ জাতি। প্রতিশোধ গ্রহণকে তাহারা তাহাদের অস্তিত্বের প্রশ্নের মত একটি অপরিহার্য কর্তব্য বলিয়া মনে করিত। তাহারা হযরত মুহাম্মাদ (স) ও মুসলমানদেরকে ধরাপৃষ্ঠ হইতে চিরতরে উৎখাত করিবার অশুভ পায়তারা ও সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। বদর যুদ্ধে সংখ্যালঘু মুসলিম বাহিনী যে অসাধারণ রণনৈপুণ্য ও বল-বীর্যের পরিচয় প্রদান করিয়াছিল কুরায়শ সৈন্যদের তাহা বিশেষভাবে স্মরণ ছিল। এই সকল দিকের প্রতি সার্বিক লক্ষ্য রাখিয়াই কুরায়শগণ যুদ্ধের উদ্যোগ আয়োজনে ব্রতী হয়।
কুরায়শ নেতা আবূ সুফয়ান বাণিজ্যিক বহরে থাকার কারণে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিতে পারে নাই। কুরায়শ বাহিনীর পরিচালনার দায়িত্ব এইবার তাহার উপরই ন্যস্ত হইল। সিরিয়া হইতে যে বাণিজ্য বহর লইয়া আবূ সুফয়ান আসিয়াছিল, তাহারা যখন দারুন-নাদ্ওয়ায় বৈঠকরত, এমন সময় কুরায়শদের মধ্য হইতে আল-আসওয়াদ ইব্দুল মুত্তালিব ইব্ন আসাদ, জুবায়র ইবন মুতইম, সাফওয়ান ইবন উমায়্যা, ইকরামা ইব্ন আবূ জাহল, হারিছ ইব্ন হিশাম, আবদুল্লাহ ইব্ন আবূ রাবী'আ প্রমুখ এবং বদর যুদ্ধে যাহাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা নিহত হইয়াছিল তাহাদিগকে সাথে লইয়া আবু সুফয়ান ও বাণিজ্য বহরে যাহাদের সম্পদের অংশ ছিল তাহাদেরকে লক্ষ্য করিয়া বলিতে লাগিল :
يا معشر قريش إن محمدا قدوتركم وقتل خياركم فاعينونا بهذا المال على حربه.
“হে কুরায়শ সম্প্রদায়! মুহাম্মাদ তোমাদিগকে পরাজিত করিয়াছে, তোমাদের নেতৃবর্গকে হত্যা করিয়াছে। অতএব তাহার বিরুদ্ধে যুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য এই মাল দিয়া আমাদেরকে সাহায্য কর"।
আবেদনটি ছিল অত্যন্ত সময় উপযোগী। উত্থাপন করিবার সাথে সাথেই উহা গৃহীত হইল। ফলে বাণিজ্য বহরের পঞ্চাশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা যুদ্ধের তহবিলে জমা দেওয়া হয়। তাহাদের ছিল আরও এক হাজার উট; ঐগুলির মূল্যও যুদ্ধের ব্যয় তহবিলে জমা করা হয়। অন্য বর্ণনায় তাৎক্ষণিকভাবেই আড়াই লক্ষ দিরহাম যুদ্ধ তহবিলে সংগৃহীত হয়। কুরায়শ বণিকগণ তাহাদের পূর্ণ মূলধন বা লভ্যাংশের সম্পূর্ণই যুদ্ধের ব্যয়খাতে প্রদান করে। ইবন ইসহাক বলেন, কোন কোন আলিম আমার নিকট বর্ণনা করিয়াছেন যে, কুরায়শদের সম্পর্কেই নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল হয়:
إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ لِيَصُدُّوا عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ فَسَيُنْفِقُونَهَا ثُمَّ تَكُونُ عَلَيْهِمْ حَسْرَةً ثُمَّ يُغْلَبُونَ وَالَّذِينَ كَفَرُوا إِلَى جَهَنَّمَ يُحْشَرُونَ.
"আল্লাহ্র পথ হইতে লোককে নিবৃত্ত করার জন্য কাফিরগণ তাহাদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে। তাহারা ধন-সম্পদ ব্যয় করিতেই থাকিবে, অতঃপর উহা তাহাদের মনস্তাপের কারণ হইবে, ইহার পর তাহারা পরাভূত হইবে এবং যাহারা কুফরী করে তাহাদেরকে জাহান্নামে একত্র করা হইবে" (৮৪ ৩৬)।
যুদ্ধের ব্যয়ভার নির্বাহের নিমিত্ত প্রয়োজনীয় অর্থ ও অস্ত্রসামগ্রী সংগ্রহের পর কুরায়শ নেতৃবৃন্দ জনসমর্থন ও জনশক্তি অর্জনের প্রতি মনোনিবেশ করিল। স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী তৈরী ছাড়াও তাহারা নিজেদের নকীব ও প্রতিনিধি বিভিন্ন গোত্রে প্রেরণ করিয়া তাহাদেরকে মদীনা আক্রমণ করিতে আহ্বান জানাইল। সৈন্যবাহিনী গঠন ও লোকদেরকে যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ করিতে চারটি ছোট দলও তাহারা বিভিন্ন গোত্রে প্রেরণ করিল। এই চারটি দলের নেতৃত্বে ছিল যথাক্রমে 'আমর ইবনুল 'আস, হুবায়রা ইব্ন আবূ ওয়াহব, ইবনু যিবআরা এবং আবূ উযযা আল- জুমাহী। আরববাসীদেরকে যুদ্ধ বা অনুরূপ কোন অভিযানে উদ্দীপিত করিবার প্রধানতম হাতিয়ার ছিল প্রাণস্পর্শী কবিতা।
কুরায়শদের মধ্যে আবূ 'উযযা আমর আল-জুমাহী ও মুস'আব নামে প্রসিদ্ধ দুইজন কবি ছিল। আবু 'উযযা বদরের যুদ্ধে বন্দী হইয়াছিল। সে ছিল বহু সন্তানের জনক ও দরিদ্র ব্যক্তি। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে দয়াপরবশ হইয়া বিনা মুক্তিপণে ছাড়িয়া দিয়াছিলেন। সাফওয়ান ইব্ন উমায়্যা তাহার কাছে গিয়া বলিল, হে আবূ 'উযযা! তুমি একজন নামকরা কবি। যুদ্ধে চল এবং কবিতার মাধ্যমে আমাদিগকে সহায়তা কর। সে বলিল, মুহাম্মাদ আমার উপর অনুগ্রহ করিয়াছেন। আমি প্রতিশ্রুতি দিয়াছি যে, তাহার বিরুদ্ধে আর কবিতা রচনা করিব না। আমি ভয় করিতেছি যে, দ্বিতীয়বার তাঁহার হাতে ধৃত হইলে আর মুক্তি পাইব না। সাফওয়ান তাহাকে বারবার বুঝাইতে লাগিল। বলিল, তুমি তো নিজের জীবন দিয়া আমাদের সাহায্য করিতে পার। আমি প্রতিশ্রুতি দিতেছি, যদি তুমি নিরাপদে যুদ্ধ হইতে ফিরিয়া আসিতে পার তবে সম্পদ দিয়া তোমাকে ধনী করিয়া দিব। আর যদি মারা যাও, তবে তোমার মেয়েদের আমাদের মেয়েদের সাথে লালন-পালনের দায়িত্বভার গ্রহণ করিব। কিন্তু ইহাতেও সে সম্মত না হইলে সাফওয়ান নিরাশ হইয়া তাহার নিকট হইতে ফিরিয়া আসিল।
পরদিন সাফওয়ান ও জুবায়র ইব্ন মুক্ত'ইম তাহার কাছে যাইয়া পূর্বের ন্যায় বুঝাইতে লাগিল। জুবায়র ইবন মুত'ইম বলিল, হে আবূ উযযা! আমি তোমার কাছে আসিয়াছি সহযোগিতার আশায়, তুমি তাহা অস্বীকার করিবে বা ফিরাইয়া দিবে তাহা ধারণা করি নাই। ইহাতে সে রাযী হইয়া আরবের বিভিন্ন গোত্রকে সংঘবদ্ধ করিবার জন্য বাহির হইয়া পড়িল। সে বানু কিনানাকে কবিতার মাধ্যমে যুদ্ধের প্রতি আহ্বান জানাইল:
أيها بني عبد مناة الرزام + أنتم حماة وأبــوكـم حـام لا تعدوني نصركم بعد العام + لا تسلموني لا يحل إسلام.
“হে অবিচল যোদ্ধা বানু আব্দ মানাত! তোমরা হইলে গোত্র মর্যাদা রক্ষাকারী, যেমন ছিল তোমাদের পূর্বপুরুষগণ (সুতরাং এহেন পরিস্থিতিতে আমাদের সাহায্য কর)। এই বৎসরের পর আমাদের সাহায্য করিবার প্রতিশ্রুতির কোন প্রয়োজন নাই। আমাদিগকে শত্রুদের হাতে ছাড়িয়া দিও না। কেননা এইরূপ করা আদৌ সমীচীন নয়"।
মুসাফি' ইব্ন আব্দ মানাফ বনূ মালিক ইব্ন কিনানার কাছে গিয়া তাহাদিগকেও রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিরুদ্ধে প্ররোচিত করিতে লাগিল। জুবায়র ইব্ন মুত'ইম তাহার হাবশী গোলাম ওয়াহ্শীকে বলিল, লোকদের সঙ্গে যুদ্ধে চল। যদি তুমি মুহাম্মাদের চাচা হামযাকে হত্যা করিতে পার তবে তুমি আযাদ।
মক্কার চারিদিকে প্রতিশোধ গ্রহণের তীব্র উত্তেজনা ছড়াইয়া পড়িল। অল্প কালের ব্যবধানে বিভিন্ন গোত্র হইতে বহু দুর্ধর্ষ আরব যোদ্ধা মক্কায় একত্র হইল। এইভাবে কুরায়শগণ আবু সুফয়ানের নেতৃত্বে তিন হাজার সৈন্যের এক বিরাট অমিততেজা বাহিনী গঠন করিল। তন্মধ্যে সাত শত ছিল লৌহ বর্মধারী, দুই শত ছিল অশ্বারোহী। ইন্ন হাজার 'আসকালানী ফাতহুল বারীতে অশ্বারোহী এক শত বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। এই যুদ্ধে তাহারা তিন হাজার উট সঙ্গে আনিয়াছিল। আবূ সুফয়ান ছিল যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক। অশ্বারোহী বাহিনীর দায়িত্ব ছিল খালিদ ইবনুল ওয়ালীদের উপর। তাহার সহযোগী ছিল 'ইকরামা ইব্ন আবূ জাহল। যুদ্ধের পতাকা ছিল বনী 'আবদুদ দার-এর হাতে।
নারী ছিল আরবদের যুদ্ধে উন্মাদনা ও উত্তেজনা সৃষ্টির প্রধান উপকরণ। যেই সকল যুদ্ধে নারীরা উপস্থিত থাকিত সেইগুলিতে আরব যোদ্ধারা জীবনপণ করিয়া লড়াই করিত। কেননা যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার সঙ্গে নারীদের কারণে লজ্জিত হওয়ার প্রশ্নও জড়িত থাকিত। তাই যুদ্ধে উৎসাহ-উদ্দীপনা প্রদানের জন্য তাহারা নারীদেরকেও সাথে লইল। সেনাপতি আবূ সুফয়ান স্ত্রী হিনদ বিন্ত 'উত্তাকে, 'ইকরামা ইন আবূ জাহল উম্মু হাকীম বিন্তুল হারিছকে, হারিছ ইব্ন হিশাম ফাতিমা বিন্ত ওয়ালীদকে, সাফওয়ান ইব্ন উমায়্যা বারযা বিন্ত মাসউদকে, ‘আম্র ইব্নুল ‘আস রীতাহ বিন্ত মুনাব্বিহকে, আবূ তালহা মুলাফা বিন্ত সা'দকে সাথে লইল। এইরূপ মোট পনেরঞ্জন কুরায়শ মহিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিয়াছিল বলিয়া জানা যায়। সম্মিলিত সশস্ত্র এই বিশাল বাহিনী শাওওয়াল মাসে মদীনা অভিমুখে যাত্রা করিল।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর পিতৃব্য ‘আব্বাস ইব্ন ‘আবদুল মুত্তালিব তখনও মক্কায়। তিনি ইসলাম গ্রহণ না করিলেও ভাতিজা মুহাম্মাদ (স)-এর শুভাকাংখী ছিলেন। তিনি কুরায়শদের যুদ্ধাভিযানের সংবাদ সীল-মহরকৃত পত্রে জনৈক গিফারী দূতের মাধ্যমে মুহাম্মাদ (স)-এর নিকট প্রেরণ করেন। দূতকে তিনি তিন দিনের মধ্যে মদীনায় পৌঁছিয়া মুহাম্মাদ (স)-কে যুদ্ধের সংবাদ জানাইতে নির্দেশ দেন। পত্রবাহক আদেশ মুতাবিক পাঁচ শত কিলোমিটার পথ মাত্র তিন দিনে অতিক্রম করিয়া মসজিদে কুবায় মহানবী (স)-কে পাইয়া পত্র হস্তান্তর করে। উবায়্যি ইব্ন কা’ব (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-কে পত্র পাঠ করিয়া শোনান। তিনি বিষয়টি গোপন রাখিতে উবায়্যি ইব্ন কা’ব (রা)-কে নির্দেশ দেন। অতঃপর নবী (স) সা’দ ইব্ন আবুর রাবী’-এর বাড়ীতে যাইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, ঘরে অন্য কেহ আছে কি না? সা’দ (রা) বলিলেন, ঘরে অন্য কেহ নাই। বলুন, হুযূর! আপনার জন্য কি করিতে পারি? রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে পিতৃব্য আব্বাসের পত্রের সংবাদ জানাইলেন। সা’দ (রা) সংবাদ শুনিয়া বলিলেন, আমার ধারণা ইহাতে কোন মঙ্গল নিহিত রহিয়াছে। অতঃপর সা’দ (রা)-কে বিষয়টি গোপনীয়তা রক্ষা করার পরামর্শ দিয়া রাসূলুল্লাহ (স) দ্রুত মদীনায় চলিয়া আসিলেন। মক্কার কুরায়শ বাহিনী মদীনার পথে যাত্রা করিয়া বার দিনের কঠিন ও বিপদ সংকুল পথ পাড়ি দিয়া জঙ্গলের নিকট ছাউনী স্থাপন করিল। যাত্রাকালে “আবওয়া” নামক স্থানে পৌঁছিলে আবূ সুফয়ানের স্ত্রী হিন্দ মুহাম্মাদ (স)-এর মাতা আমিনা-এর কবর খনন করিতে বলিলে বাহিনীর নেতৃবৃন্দ অশুভ পরিণতির আশংকায় তাহা প্রত্যাখ্যান করে। তাহারা মদীনার নিকটবর্তী আল-‘আকীক’ উপত্যকার সামান্য ডানদিকে উহুদ পাহাড় সংলগ্ন ‘আয়নায়ন’ নামক স্থানে শিবির স্থাপন করিল।
এইদিকে খুযা‘আ গোত্রের লোকেরা কুরায়শদের যুদ্ধাভিযানের সংবাদ মদীনায় প্রেরণ করিল। রাসূলুল্লাহ (স) আনাস ও মুনিস (রা) নামক দুইজন সাহাবীকে শত্রুবাহিনীর সংবাদ সংগ্রহের জন্য প্রেরণ করিলেন। তাহারা ফিরিয়া আসিয়া জানাইলেন যে, কুরায়শ সৈন্য মদীনার নিকটে আসিয়া পড়িয়াছে এবং তাহাদের অশ্বপাল মদীনার চারণভূমির তৃণলতা খাইয়া নিঃশেষ করিয়া দিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স)-এর আদেশক্রমে হুবাব ইব্দুল মুনযির (রা) কুরায়শদের সৈন্যসংখ্যা তাঁহাকে অবহিত করেন। আক্রমণের আশংকায় মদীনার চারিদিকে পাহারার ব্যবস্থা করা হয়। সা'দ ইবন 'উবাদা ও সা'দ ইব্ন মুআয (রা) হাতিয়ার লইয়া সারা রাত মসজিদে নববীর দরজায় পাহারারত থাকেন।
পরদিন শুক্রবার প্রত্যুষে রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীদেরকে লইয়া পরামর্শ করিতে বসিলেন। তিনি উপস্থিত সকলের সামনে তাঁহার দেখা এক স্বপ্নের কথা ব্যক্ত করিতে গিয়া বলিলেন, আমি স্বপ্নে একটি গাভী দেখিতে পাইলাম। আরও দেখিলাম, আমার তরবারির অগ্রভাগের অংশবিশেষ ভাঙ্গিয়া গিয়াছে এবং আমার হাত একটি মজবুত লৌহবর্মে ঢুকাইয়া নিয়াছি। ইব্ন হিশাম বলেন, কোন কোন আলিম আমার নিকট বর্ণনা করিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, দেখিলাম, আমার কিছু গাভী যবাই করা হইতেছে। তিনি আরও বলেন, গাভী দ্বারা উদ্দেশ্য আমার কিছু সাহাবী শহীদ হইবেন। আর তরবারি ভাঙ্গন এই ইঙ্গিত বহন করে যে, আমার বংশের এক ব্যক্তি শাহাদত লাভ করিবেন।
অতঃপর মহানবী (স) তাঁহার অভিমত সাহাবীদেরকে জানাইলেন যে, এইবার তাহারা মদীনার বাহিরে গিয়া যুদ্ধ করিবেন না। যদি মক্কার বাহিনী মদীনা আক্রমণ করে তবে তাহারাও পাল্টা আক্রমণ করিবেন। অধিকাংশ মুহাজির ও আনসার মহিলাদিগকে বহিঃদুর্গে পাঠাইয়া দেওয়ার এবং শহরে অবস্থান করিয়া শত্রু শক্তিকে প্রতিহত করার পক্ষে মত ব্যক্ত করিলেন। তাহাদের কেহ কেহ বলিলেন, আল্লাহ তা'আলা আমাদের সামনে কাংখিত দিনটি আনিয়া দিয়াছেন। অতঃপর আপনি আমাদিগকে লইয়া শত্রুদের দিকে বাহির হইয়া পড়ুন যাহাতে তাহারা আমাদিগকে কাপুরুষ ভাবিবার সুযোগ না পায়।
এই উৎসুক দলের অগ্রে ছিলেন হামযা (রা), সা'দ ইবন 'উবাদা, নু'মান ইবন মালিক ইব্ন ছা'লাবা (র) প্রমুখ সাহাবী। আবু সাঈদ খুদরী (র)- এর পিতা মালিক ইবন সিনান (রা) বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ্র কসম! আমরা বিজয় অথবা শাহাদাত এই দুইটি কল্যাণের যে কোন একটি অবশ্যই লাভ করিব। হামযা (রা) মদীনার বাহিরে যাইয়া শত্রুদের সাথে যুদ্ধের পূর্বে কোন খাদ্য গ্রহণ করিবেন না বলিয়া প্রতিজ্ঞা করিলেন। বর্ণিত আছে যে, হামযা (রা) রোযা অবস্থাতেই যুদ্ধ করিতে করিতে শাহাদাত লাভ করেন।
অধিকাংশ সাহাবীর প্রস্তাব যখন মদীনার বাহিরে গিয়া যুদ্ধ করিবার পক্ষে আসিল, তখন মহানবী (স) সংখ্যাগরিষ্ঠের মতকেই সমর্থন করিলেন। সকলের মাঝে তিনি ঘোষণা করিলেন, তোমরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও। বাদ জুমু'আ তিনি জিহাদ সম্বন্ধে সকলকে উপদেশ ও উৎসাহ দিলেন। রণক্ষেত্রে দৃঢ় থাকিবার আদেশ দিতে গিয়া বলিলেন, ধৈর্য ধারণ ও যথাযথ কর্তব্য পালন করিতে পারিলে তোমরা বিজয়ী হইবে। তিনি এই আয়াতটি পাঠ করিলেন : بَلَى إِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا وَيَأْتُوكُمْ مِّنْ فَوْرِهِمْ هُذَا يُمْدِدْكُمْ رَبُّكُمْ بِخَمْسَةِ أَلْفِ مِّنَ الْمَلَئِكَةِ مُسَوَّمِينَ.
"হাঁ, নিশ্চয়, যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ কর এবং সাবধান হইয়া চল তবে তাহারা দ্রুত গতিতে তোমাদের উপর আক্রমণ করিলে আল্লাহ পাঁচ হাজার চিহ্নিত ফেরেশতা দ্বারা তোমাদের সাহায্য করিবেন” (৩: ১২৫)।
ঐদিন মালিক ইবন 'আমর (রা) নামে একজন আনসার ইন্তিকাল করেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহার জানাযা শেষে সকলকে প্রস্তুত হইয়া আসিতে বলিলেন।
মহানবী (স) বাদ আসর অন্তঃপুরে প্রবেশ করিয়া রণসাজে সজ্জিত হইতে লাগিলেন। পর পর দুইটি বর্ম দ্বারা অঙ্গ আচ্ছাদিত করিলেন। এইদিকে এক হাজার মুজাহিদ রণসাজে সজ্জিত হইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। সা'দ ইবন মু'আয ও উসায়দ উন্ন হুদায়র (রা) মুসলিম সৈন্যদের বলিলেন, হে লোকসকল! তোমাদের নবী করীম (স)-এর ইচ্ছার বিরুদ্ধে মতামত ব্যক্ত করা ঠিক হয় নাই। সুতরাং ভাবিয়া দেখ, হুযূর (স) -এর নিকট সিদ্ধান্তের ভার ন্যস্ত করা যায় কিনা? সবাই কৃতকর্মের জন্য তখন অনুতপ্ত হইলেন। নবী করীম (স) অপূর্ব রণসাজে সজ্জিত হইয়া আবূ বাক্স ও উমার (রা)-কে সাথে লইয়া সাহাবীদের সম্মুখে উপস্থিত হইলে সাহাবীগণ আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমারা লজ্জিত, 'আপনার সিদ্ধান্তের বিপক্ষে মতামত ব্যক্ত করা আমাদের সমীচীন হয় নাই। আমাদের প্রস্তাব প্রত্যাহার করিয়া লইতেছি। আপনি যুদ্ধের পোশাক খুলিয়া ফেলুন। রাসূলুল্লাহ (স) উত্তরে বলিলেন:
ما ينبغي لنبي إذا لبس لأمته أن يضعها حتى يحكم الله بينه وبين عدوه.
"কোন নবীর পক্ষেই যুদ্ধের পোশাক পরিধান করিবার পর তাহা খুলিয়া ফেলা শোভনীয় নয় যতক্ষণ না আল্লাহ তা'আলা তাঁহার ও শত্রুদের মাঝে ফয়সালা করিয়া দেন”।
এই যুদ্ধ কোন তারিখে অনুষ্ঠিত হয় এই সম্পর্কে একাধিক বর্ণনা পাওয়া যায়। অধিকাংশের মতে তৃতীয় হিজরী শাওয়াল মাসের এগার তারিখের রাত অতিক্রান্ত হওয়ার পর এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সাফীউর রহমান মুবারকপুরীসহ কোন কোন আলিমের মতে শাওয়াল -এর সপ্তম রাত অতিক্রান্ত হওয়ার পরে, আবার কেহ কেহ ১৫ শাওয়ালে উহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হইয়াছে বলিয়া অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন। মহানবী (স) এই যুদ্ধে মুসলিম সৈন্যবাহিনীকে তিনটি দলে বিভক্ত করিলেন। (ক) মুহাজিরদের দল: এই দলের পতাকা দিলেন মুস'আব ইবন 'উমায়র আল-আবাদী (রা)-এর হাতে। মুস'আব শাহাদত লাভ করিলে আলী (রা)-কে উহা দিবেন। (খ) আনসারদের আওস গোত্রের পতাকা দিলেন উসায়দ ইবন হুদায়র (রা)-এর হাতে। (গ) আনসারদের খাযরাজ গোত্রের পতাকা দিলেন হুবাব ইবনুল মুনযির, মতান্তরে সা'দ ইবন উবাদা (রা)- এর হাতে।
আবদুল্লাহ ইব্ন উম্মে মাকতুম (রা) -এর কাছে মদীনার দায়িত্বভার অর্পণ করিয়া তিনি শত্রুর মোকাবিলায় বাহির হইলেন। মুসলিম মহিলাদিগকে সুরক্ষিত স্থানে প্রেরণ করিলেন। অবশ্য আইশা, উম্মু 'উমারা, সাফিয়্যা বিনত আবদুল মুত্তালিব, ফাতিমা, হামনা বিনত জাহ্শ (রা) প্রমুখ দশ- পনেরজন মুসলিম মহিলা আহত সৈন্যদের সেবা-শুশ্রূষা, তাহাদেরকে পানি পান করানো এবং মদীনা হইতে খাবার সংগ্রহ করার জন্য যুদ্ধে শরীক হইয়াছিলেন।
এই যুদ্ধে মুসলিম সৈন্যসংখ্যা ছিল এক হাজার। তন্মধ্যে একশত জন বর্মধারী, পঞ্চাশজন তীরন্দাজ, পঞ্চাশজন অশ্বারোহী, বাকী সবাই পদাতিক। মূসা ইব্ন 'উকবা (রা) বলিয়াছেন, এই যুদ্ধে মুসলমানদের সাথে কোন অশ্ব ছিল না। আল-ওয়াকিদীর মতে, ইহাতে দুইটি অশ্ব ছিল। একটি রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য, অপরটি আবু বুরদা (রা)- এর জন্য।
মদীনা সনদের শর্তানুযায়ী সেখানকার ইয়াহুদীরা বহিঃ আক্রমণ-এ মুসলমানদের সাহায্য করিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল। কিন্তু তাহাদের ধর্মীয় শাস্ত্রে "সান্ত” তথা শনিবারে যুদ্ধ অবৈধ এই অজুহাত তুলিয়া তাহারা সহযোগিতা করা হইতে বিরত থাকে। ইবন সা'দ-এর বর্ণনা অনুযায়ী, বনূ কায়নুকার আত্মীয় কিছু সংখ্যক ইয়াহুদী দুরভিসন্ধিমূলকভাবে মুসলমানদের সাহায্য করিতে আগাইয়া আসিলে সন্দেহপরায়ণ হইয়া নবী করীম (স) তাহাদিগকে সৈন্যভুক্ত করিতে অসম্মত হইলেন।
মুসলিম বাহিনী মদীনা হইতে বাহির হইয়া যখন আশ- শায়খান নামক স্থানে পৌঁছিল তখন সৈন্য পরীক্ষা করা হইল। অল্প বয়স্ক ও যুদ্ধের জন্য অনুপযুক্ত বলিয়া যাহাদিগকে ফেরত পাঠানো হইল তাহাদের মধ্যে ছিলেন আবদুল্লাহ ইবন উমার ইবনুল খাত্তাব, উসামা ইব্ন যায়দ, উসায়দ ইবন হুদায়র, যায়দ ইব্ন্ন ছাবিত, যায়দ ইব্ন আরকাম, আরাবায়া ইবন যুবায়র, আমর ইবন হাম্, আবূ সা'ঈদ আল- খুদরী, যায়দ ইব্ন হারিছা আল- আনসারী, সা'দ ইব্ন হুবাব, বারাআ ইন্ন হায্য প্রমুখ।
আল্লাহর পথে জীবন উৎসর্গকারীদের এমন বিস্ময়কর নমুনা ছিল যে, রাফে' ইন্ন খাদীজ (রা)-কে যখন বলা হইল, তুমি বয়সে ছোট, বাড়ী ফিরিয়া যাও, তখন তিনি পায়ের আংগুলের উপর ভর করিয়া বুক টান করিয়া দাঁড়াইলেন, যাহাতে উঁচু দেখা যায়। তাঁহার এই কৌশল ফলপ্রসূ হইল। তিনি সৈন্যবাহিনীতে থাকিবার অনুমতি লাভ করিলেন। অন্য বর্ণনায় উল্লেখ আছে, রাফে' (রা) অল্প বয়স হইতেই তীর নিক্ষেপে ছিলেন সিদ্ধহস্ত। রাসূলুল্লাহ (স) তাহা জানিতে পারিয়া তাঁহাকে যুদ্ধে অংশগ্রহণের অনুমতি দিয়াছিলেন। রাফে' (রা)- এর সমবয়সী ছিলেন সামুরা নামে অপর এক বালক। তিনি যুক্তি দাঁড় করাইলেন, আমি কুস্তিতে রাফেকে পরাজিত করিতে পারি। তাহাকে যদি যুদ্ধে নেওয়া হয় তবে আমাকেও নিতে হইবে। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের দুইজনকে কুস্তিতে লাগাইয়া দিলেন। সামুরা রাফে'কে কুফিতে পরাস্ত করিলে তাহাকেও সেনাদলে অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া হইল। মুসলিম বাহিনী যাত্রাকালে এই শায়খান নামক স্থানে সন্ধ্যা নামিয়া আসিল। তাহারা মাগরিব ও পরে ইশার সালাত আদায় করিলেন এবং এখানেই রাত্রি যাপন করিলেন।
রাসূলুল্লাহ (স) মুহাম্মাদ ইব্ন মাসলামা আল-আনসারীর নেতৃত্বে পঞ্চান্নজন সৈন্যের এক বাহিনীকে রাতের পাহারায় নিযুক্ত করেন। য়াকওয়ান ইব্ন আবদ কায়স বিশেষভাবে নবী করীম (স)-কে পাহারা দেন। নবী করীম (স) শেষরাতে আবার যাত্রা শুরু এবং ‘শাওত’ নামক স্থানে পৌঁছিয়া ফজরের সালাত আদায় করিলেন। মুসলিম বাহিনী শত্রু বাহিনীর নিকটবর্তী হইয়া গিয়াছিল। উভয় বাহিনী পরস্পরকে দেখিতেছিল। মুনাফিক নেতা আবদুল্লাহ ইবন উবায়্যি তখন তিন শত অনুগামীসহ যুদ্ধক্ষেত্র হইতে এই বলিয়া চলিয়া আসিল, তিনি তো আমার কথা শুনিলেন না, শুনিলেন উহাদের কথা। আল্লাহ তা'আলা আল-কুরআনুল কারীমে তাহাদের ঐ মুনাফিকীর কথা প্রকাশ করিয়াছেনこのভাঃেবঃ
وَمَا أَصَابَكُمْ يَوْمَ التَقَى الْجَمْعَانِ فَبِاذْنِ اللهِ وَلِيَعْلَمَ الْمُؤْمِنِينَ. وَلِيَعْلَمَ الَّذِينَ نَافَقُوا وَقِيلَ لَهُمْ تَعَالُوا قَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَوِ ادْفَعُوا قَالُوا لَوْ نَعْلَمُ قِتَالاً لا اتَّبَعْنُكُمْ هُمْ لِلْكُفْرِ يَوْمَئِذٍ أَقْرَبُ مِنْهُمْ لِلْإِيْمَانِ يَقُولُونَ بِأَفْوَاهِهِمْ مَا لَيْسَ فِي قُلُوبِهِمْ وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا يَكْتُمُونَ.
“যেদিন দুই দল পরস্পরের সম্মুখীন হইয়াছিল সেদিন তোমাদের উপর যে বিপর্যয় ঘটিয়াছিল তাহা আল্লাহ্ হুকুমে। ইহা মুমিনদিগকে জানিবার জন্য এবং মুনাফিকদিগকে জানিবার জন্য এবং তাহাদিগকে বলা হইয়াছিল, আইস! তোমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ কর অথবা প্রতিরোধ কর। তাহারা বলিয়াছিল, আমরা যদি যুদ্ধ জানিতাম তবে নিশ্চিতভাবে তোমাদের অনুসরণ করিতাম। সেদিন তাহারা ঈমান অপেক্ষা কুফরীর নিকটতর ছিল। যাহা তাহাদের অন্তরে নাই তাহারা তাহা মুখে বলে। তাহারা যাহা গোপন রাখে আল্লাহ তাহা বিশেষভাবে অবহিত" (৩: ১৬৬-৭)।
মুনাফিকদের চলিয়া যাওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত রহিলেন সাত শত জন, তাঁহাদের মধ্য হইতে ১৫জন তরুণও বাদ পড়িল। মাত্র ১০০ জন বর্ম পরিহিত এবং গোটা বাহিনীতে কেবল দুই জন অশ্বারোহী ছিলেন, একজন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স) এবং অপরজন হযরত আবূ বুরদা ইব্ন নায়ার হারিছী (রা)।
মুনাফিকদের কাটিয়া পড়ায় খায়রাজ গোত্রের বানূ সালামা শাখার মুসলিম যোদ্ধাগণ এবং আওস গোত্রের বানু হারিছা শাখার যোদ্ধাগণ প্রভাবান্বিত হওয়ার উপক্রম হইয়াছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আল্লাহই তাহাদিগকে রক্ষা করেন।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর সৈন্যবিন্যাস
উহুদের ময়দানে মুসলিম বাহিনী উপস্থিত হওয়ার পূর্বে শায়খায়নে থাকিতেই সূর্য অস্ত গেল। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশে হযরত বিলাল (রা) আযান দিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইমামতিতে সালাত সম্পন্ন হইল। মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) সারা রাত প্রহরায় নিযুক্ত রহিলেন। শেষ রাত্রিতে আবার সৈন্যবাহিনী রওয়ানা হইল। উহুদের নিকটবর্তী হইলে ফজরের ওয়াক্ত হইল। সালাতশেষে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার বাহিনীকে এমনভাবে বিন্যাস করিলেন যে, উহুদ পাহাড় মুসলিম বাহিনীর পশ্চাতে এবং মদীনা শহর তাহাদের সম্মুখে রহিল। আবদুল্লাহ ইবনু যুবায়র (রা)-এর নেতৃত্বে পঞ্চাশজন তীরন্দাযকে তিনি উহুদ পাহাড়ের সম্মুখস্থ আয়নায়ন পাহাড়ের শীর্ষদেশে এই উদ্দেশ্যে মোতায়েন করিলেন, যাহাতে মুশরিক বাহিনীর সম্ভাব্য পশ্চাত দিকের আক্রমণ হইতে মুসলিম বাহিনী নিরাপদ থাকিতে পারে। তিনি তাহাদিগকে তাগিদ দিলেন যেন মুসলিম বাহিনীর চরম বিজয় বা চরম পরাজয়েও তাহারা স্থান ত্যাগ না করেন। এই ব্যাপারে তিনি জোর তাগিদ দিয়া এই পর্যন্ত বলিয়াছিলেনঃ إِنْ رَأَيْتُمُونَا تَخْطَفُنَا الطَّيْرُ فَلَا تَبْرَحُوا مَكَانَكُمْ هٰذَا وَإِنْ رَأَيْتُمُونَا هَزَمْنَا الْقَوْمَ وَأَوْطَأْنَاهُمْ فَلَا تَبْرَحُوا مَكَانَكُمْ.
"যদি তোমরা দেখিতে পাও যে, পাখী আমাদিগকে ছোঁ মারিয়া লইয়া যাইতেছে তাহা হইলেও তোমরা স্থান ত্যাগ করিবে না। যদি দেখিতে পাও যে, আমরা তাহাদিগকে পরাজিত ও দলিত-মথিত করিয়া ফেলিতেছে তবুও তোমরা স্থান ত্যাগ করিবে না"।
যুদ্ধের পতাকা মুস'আব ইবন উমায়র (রা)-কে অর্পণ করা হয়। যুবায়র ইব্দুল আওয়াম (রা) দক্ষিণ বাহিনীর এবং মুনযির ইবন উমার (রা) বাম বাহিনীর দায়িত্বে নিযুক্ত হন। নবী করীম (স)-এর তরবারি লাভ করিয়া আবূ দুজানা (রা) তাহার হক আদায় করেন। যুদ্ধের শুরুতেই মুশরিকদের পতাকাবাহী তালহা ইব্ন উছমান এবং তাহাদের অপর বীরপুরুষ সাবা ইব্ন আবদুল উয্যার চ্যালেঞ্জের জবাবে যুদ্ধে অবতীর্ণ হইয়া হযরত আলী (রা) ও হযরত হামযা (রা) তাহাদের উভয়কে হত্যা করিয়া তাঁহাদের বীরত্ব প্রদর্শন করেন। মুসআব ইবন উমায়র, আবু দুজানা, আবূ তালহা, সা'দ ইব্ন আবী ওয়াক্কাস (রা) প্রমুখ সাহবীও অপূর্ব বীরত্ব প্রদর্শন করেন।
হযরত হামযা ও মুস'আব ইবন উমায়র (রা) যুদ্ধের প্রথম পর্যায়েই বীরত্বের সহিত লড়াই করিয়া শাহাদাত বরণ করিলেও যুদ্ধের ফলাফল ছিল মুসলমানদের অনুকূলে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَلَقَدْ صَدَقَكُمُ اللَّهُ وَعْدَهُ إِذْ تَحُسُّونَهُمْ بِإِذْنِهِ.
"আল্লাহ তোমাদের সহিত কৃত তাঁহার অঙ্গীকার পূরণ করিলেন যখন তোমরা তাঁহার নির্দেশে মুশরিকদিগকে হত্যা করিতেছিলে" (৩: ১৫২)।
অবস্থা এমন দাঁড়াইল যে, কাফির বাহিনী উর্ধশ্বাসে পলায়ন করিতেছে এবং মুসলিম বাহিনীর এখন গনীমত লাভের পালা। তখন পাহাড় শীর্ষে প্রহরায় নিযুক্ত 'আবদুল্লাহ ইবুযন যুবায়রের নেতৃত্বাধীন সেই পঞ্চাশজনের বাহিনীটি তাহাদের নেতার বারবার বারণ করা সত্ত্বেও গনীমত লাভের উদ্দেশ্যে স্থান ত্যাগ করিল।
মুহূর্তের মধ্যে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়া গেল। কুরায়শদের ডান বাহিনীর সুচতুর ও সুযোগ সন্ধানী সেনাপতি খালিদ ইব্দুল ওয়ালীদ সুযোগের সদ্ব্যবহার করিলেন। তিনি 'আয়নায়ন পাহাড়ের পশ্চাৎদিক হইতে ঘুরিয়া আসিয়া পিছন দিক হইতে মুসলিম বাহিনীর উপর আক্রমণ করেন। পরাজিতপ্রায় কাফির বাহিনী আবার রুখিয়া দাঁড়াইল। সম্মুখ ঐ পশ্চাৎ উভয় দিক হইতে আক্রমণ করিয়া তাহারা মুসলিম বাহিনীকে তাহাদের পূর্ণ অবস্থানস্থল হইতে সরাইয়া দিল। দেখিতে দেখিতে মুসলিম বিজয় পরাজয়ের রূপ পরিগ্রহ করিল। মুসলমানরা এলোমেলোভাবে লড়িতে লড়িতে শহীদ হইতে লাগিলেন, শত্রু-মিত্র কিছুই চিহ্নিত করিতে পারিতেছিলেন না। হুযায়ফা (রা)-এর পিতা বৃদ্ধ ইয়ামান হুযায়ফার মুখে তাঁহার পিতৃপরিচয় ব্যক্ত করা সত্ত্বেও মুসলমানদের হাতেই নিহত হইলেন।
মুসলমান যোদ্ধারা নবী করীম (স) হইতে বিচ্ছিন্ন হইতেই তাহাদের মনোবল ভাঙ্গিয়া পড়িল। নবী করীম (স) নিহত হইয়াছেন বলিয়া গুজব ছড়াইয়া পড়িল। অনেকে যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করিলেন। অনেকে যুদ্ধে ক্ষান্ত দিলেন। মহানবীর অনুপস্থিতিতে জীবন রক্ষাই অনেকে নিরর্থক মনে করিলেন। এই গুজবের কারণেই মুসলিম যোদ্ধাদের কিছু সংখ্যক রণক্ষেত্র ত্যাগ করিয়াছিলেন।
রাসূলুল্লাহ (স) যে নিহত হন নাই, বাঁচিয়া আছেন, তাহা সর্বপ্রথম কা'ব ইবন মালিক (রা)-এর দৃষ্টিতে ধরা পড়ে। তিনি এই সুসংবাদ উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করিতে থাকেন। মুশরিকরা তাহা শুনিলে ক্ষতির কারণ হইতে পারে, এই আশঙ্কায় নবী করীম (স) তাঁহাকে কণ্ঠস্বর নিচু করিতে বলেন।
সাতজন আনসারসহ নয়জন সাহাবী রাসূলুল্লাহ (স)-কে ঘিরিয়া দাঁড়াইলেন। মুশরিকরা তখন মরিয়া হইয়া তাহার উপর আক্রমণ চালাইতেছিল। তাহাদের প্রবল আক্রমণে একে একে সাতজন আনসারই শহীদ হইলেন। আবূ তাঁল্হা যুদ্ধ করিতে করিতে একটি তীরের আঘাতে তাঁহার হাতও অবশ হইয়া গেল। সা'দ ইব্ন আবূ ওয়াক্কাস (রা) তীর নিক্ষেপের মাধ্যমে বীরত্বের সহিত শত্রুদিগকে প্রতিহত করিতে লাগিলেন। কিন্তু ততক্ষণে নবী করীম (স) আঘাতে আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত। তাঁহার পবিত্র দাঁত শহীদ হইল। তাঁহার দুই হাঁটু ও মুখমণ্ডলে আঘাত লাগিয়া রক্তাক্ত হইল। ইব্ন কামিয়া নামক দুর্বৃত্তের প্রস্তরাঘাতে তিনি কাৎ হইয়া আবূ আমের ফাসিক কর্তৃক খননকৃত গর্তে পড়িয়া সংজ্ঞাহীন হইয়া পড়িলেন। হযরত আলী ও তালহা (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-কে গর্ত হইতে উঠাইলেন। ইবন কামিয়ার তলোয়ারের আঘাতে শিরস্ত্রাণের দুইটি কড়া তাঁহার কপালের দুই পার্শ্বে বিদ্ধ হইয়া কপালের গভীরে ঢুকিয়া গিয়াছিল। আবু উবায়দা ইবনুল জারাহ (রা) দাঁত দ্বারা উহা সজোরে টান দিয়া খুলিলেন বটে, কিন্তু তাহার নিজের দুইটি দাঁত তাহাতে উপড়াইয়া গেল।
মুসলমানরা মহানবী (স)-এর চতুষ্পার্শ্বে জমায়েত হইয়া পুনরায় যুদ্ধ শুরু করিতেই কাফির বাহিনী আর মাঠে থাকা সমীচীন মনে করিল না। ৭০ জন মুসলমান বীর ইতোমধ্যে শাহাদাত লাভ করিয়াছেন, ইহাতে উল্লসিত হইয়া তাহারা রণক্ষেত্র পরিত্যাগ করিল। আবূ সুফ্যানের ধারণা ছিল, রাসূলুল্লাহ (স), আবূ বাক্স ও উমার সকলেই শহীদ হইয়াছেন। সে চীৎকার করিয়া প্রত্যেকের নাম ধরিয়া তাহাদিগকে আহ্বান করিয়া জবাব পাইতেছিল না। অবশেষে হযরত উমার (রা) জবাব দিয়া তাহার ভুল ভাঙ্গাইলেন। সে যাইতে যাইতে বলিল, ইহা বদরের প্রতিশোধ, আগামী বৎসর বদরে আবার দেখা হইবে। এই যুদ্ধে তাহাদের বাইশজন নিহত হয়।
এই যুদ্ধে প্রকৃত মুসলমান ও মুনাফিকদের স্বরূপ ব্যক্ত হইয়া পড়ে। নেতৃ-আদেশ লঙ্ঘন যে বিজয়কে পরাজয়ে রূপান্তরিত করিয়া সমূহ বিপদের কারণ হইতে পারে, সেই শিক্ষাটিই মুসলিম উম্মাহ এই যুদ্ধ হইতে লাভ করে। যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থান গ্রহণ ও নির্দেশ দানে যে মহানবী (স) কত বিচক্ষণ ও দূরদর্শী ছিলেন, তাহাও এই যুদ্ধের ব্যূহ রচনা ও নির্দেশ দান হইতে জানা যায়।
📄 সারিয়্যা আবূ সালাম
মহানবী (স)-এর বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আবূ সালামা (রা)-এর অধিনায়কত্বে হিজরতের ৩৫তম মাসে অর্থাৎ হিজরীর মুহাররম মাসে 'কাতান' পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী আসাদ গোত্রের বিরুদ্ধে এই ক্ষুদ্র সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়। উহুদ যুদ্ধে আবূ সালামা (রা)-এর বাহুতে একটি তীর বিদ্ধ হইলে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। মাসাধিক কাল চিকিৎসা গ্রহণের পর আহত স্থানের ঘা শুকাইলেও দেহের অভ্যন্তরভাগে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। এই অবস্থায় তাঁহার উপর বানু আসাদ গোত্রের এলাকায় অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব অর্পিত হয়।
আসাদ গোত্রের এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট এই মর্মে সংবাদ পৌঁছায় যে, তুলায়হা ও তাহার ভ্রাতা সালামা ইব্ন খুওয়ায়লিদ নিজেদের গোত্র এবং তাহাদের প্রভাবাধীন অন্যান্য ক্ষুদ্র গোত্রসমূহকে মদীনার উপর আক্রমণের জন্য উত্তেজিত করিতেছে। মহানবী (স) তাহাদের এই ষড়যন্ত্রের মূলোচ্ছেদ করিবার জন্য মুহাজির ও আনসার সাহাবীগণের সমন্বয়ে গঠিত দেড় শত মুজাহিদের একটি বাহিনী গঠন করেন এবং আবূ সালামা (র)-কে ইহার সেনাপতি নিযুক্ত করিয়া 'কাতান' অভিমুখে যাত্রার নির্দেশ প্রদান করেন। এই অভিযানে আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ্, সা'দ ইব্ন আবী ওয়াক্কাস, উসায়দ ইবন হুদায়র, আরকাম ইব্ন আবিল আরকাম (রা) প্রমুখ সাহাবীও অংশগ্রহণ করেন।
রাসূলুল্লাহ (স) আবূ সালামা (রা)-এর নিকট সামরিক বাহিনীর পতাকা অর্পণের প্রাক্কালে বলেন : রওয়ানা হইয়া যাও এবং আসাদ গোত্র ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পূর্বেই তাহাদিগকে ছত্রভংগ করিয়া দাও। মহানবী (স) তাঁহাকে ও তাঁহার সঙ্গীদেরকে তাকওয়া অবলম্বনের উপদেশ দেন। আবূ সালামা (রা) সচরাচর ব্যবহৃত পথ দিয়া না যাইয়া ভিন্ন এক পথ ধরিয়া অগ্রসর হইলেন এবং অকস্মাৎ আসাদ গোত্রের জনপদে গিয়া উপস্থিত হইলেন।
আসাদ গোত্র মুসলিম বাহিনীর আকস্মিক উপস্থিতিতে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পলায়ন করিতে লাগিল। আবু সালামা (রা) তাঁহার ক্ষুদ্র বাহিনীকে তিন ভাগে বিভক্ত করিয়া পলায়নকারীদের, পশ্চাদ্ধাবন করিয়া তাহাদিগকে বহু দূর লইয়া যান। তিনি এখানে তের দিন অবস্থান করেন।
এই অভিযানে মুসলিম বাহিনী পর্যাপ্ত সংখ্যক উট ও ছাগল-ভেড়া গনীমত হিসাবে লাভ করে এবং তাহা মদীনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে উপস্থিত করে। নবী (স)-এর অংশে একটি গোলাম এবং এক-পঞ্চমাংশ পৃথক করার পর অবশিষ্ট গনীমত সৈনিকগণের মধ্যে বণ্টন করা হয়। প্রত্যেক সৈনিক ৭টি করিয়া উট এবং কিছু ছাগল লাভ করেন। যুদ্ধের সংবাদ প্রদানকারী আসাদ গোত্রীয় ব্যক্তিকে গনীমত হইতে একটি পূর্ণ অংশ প্রদান করা হয়।
এই অভিযানে কোন লোকক্ষয় হইয়াছিল কিনা তাহা জানা যায় না। তবে ইবন কাছীর শত্রুদের তিনজন দাস বন্দী হওয়ার উল্লেখ করিয়াছেন। মদীনায় প্রত্যাবর্তনের পর আবূ সালামা (রা)-এর পূর্বের ক্ষতস্থানের ঘা মারাত্মক আকার ধারণ করে এবং জুমাদাল উলা মাসের ২৭ তারিখে তিনি ইন্তিকাল করেন। ইবন সা'দ-এর মতে তিনি জুল-কা'দা মাসে ইন্তিকাল করেন। তাঁহার ইন্তিকালের পর তাঁহার স্ত্রী উম্মু সালামা (রা)-কে তাহার ইদ্দাতশেষে রাসূলুল্লাহ (স) বিবাহ করেন।
মহানবী (স)-এর বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আবূ সালামা (রা)-এর অধিনায়কত্বে হিজরতের ৩৫তম মাসে অর্থাৎ হিজরীর মুহাররম মাসে 'কাতান' পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী আসাদ গোত্রের বিরুদ্ধে এই ক্ষুদ্র সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়। উহুদ যুদ্ধে আবূ সালামা (রা)-এর বাহুতে একটি তীর বিদ্ধ হইলে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। মাসাধিক কাল চিকিৎসা গ্রহণের পর আহত স্থানের ঘা শুকাইলেও দেহের অভ্যন্তরভাগে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। এই অবস্থায় তাঁহার উপর বানু আসাদ গোত্রের এলাকায় অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব অর্পিত হয়।
আসাদ গোত্রের এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট এই মর্মে সংবাদ পৌঁছায় যে, তুলায়হা ও তাহার ভ্রাতা সালামা ইব্ন খুওয়ায়লিদ নিজেদের গোত্র এবং তাহাদের প্রভাবাধীন অন্যান্য ক্ষুদ্র গোত্রসমূহকে মদীনার উপর আক্রমণের জন্য উত্তেজিত করিতেছে। মহানবী (স) তাহাদের এই ষড়যন্ত্রের মূলোচ্ছেদ করিবার জন্য মুহাজির ও আনসার সাহাবীগণের সমন্বয়ে গঠিত দেড় শত মুজাহিদের একটি বাহিনী গঠন করেন এবং আবূ সালামা (র)-কে ইহার সেনাপতি নিযুক্ত করিয়া 'কাতান' অভিমুখে যাত্রার নির্দেশ প্রদান করেন। এই অভিযানে আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ্, সা'দ ইব্ন আবী ওয়াক্কাস, উসায়দ ইবন হুদায়র, আরকাম ইব্ন আবিল আরকাম (রা) প্রমুখ সাহাবীও অংশগ্রহণ করেন।
রাসূলুল্লাহ (স) আবূ সালামা (রা)-এর নিকট সামরিক বাহিনীর পতাকা অর্পণের প্রাক্কালে বলেন : রওয়ানা হইয়া যাও এবং আসাদ গোত্র ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পূর্বেই তাহাদিগকে ছত্রভংগ করিয়া দাও। মহানবী (স) তাঁহাকে ও তাঁহার সঙ্গীদেরকে তাকওয়া অবলম্বনের উপদেশ দেন। আবূ সালামা (রা) সচরাচর ব্যবহৃত পথ দিয়া না যাইয়া ভিন্ন এক পথ ধরিয়া অগ্রসর হইলেন এবং অকস্মাৎ আসাদ গোত্রের জনপদে গিয়া উপস্থিত হইলেন।
আসাদ গোত্র মুসলিম বাহিনীর আকস্মিক উপস্থিতিতে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পলায়ন করিতে লাগিল। আবু সালামা (রা) তাঁহার ক্ষুদ্র বাহিনীকে তিন ভাগে বিভক্ত করিয়া পলায়নকারীদের, পশ্চাদ্ধাবন করিয়া তাহাদিগকে বহু দূর লইয়া যান। তিনি এখানে তের দিন অবস্থান করেন।
এই অভিযানে মুসলিম বাহিনী পর্যাপ্ত সংখ্যক উট ও ছাগল-ভেড়া গনীমত হিসাবে লাভ করে এবং তাহা মদীনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে উপস্থিত করে। নবী (স)-এর অংশে একটি গোলাম এবং এক-পঞ্চমাংশ পৃথক করার পর অবশিষ্ট গনীমত সৈনিকগণের মধ্যে বণ্টন করা হয়। প্রত্যেক সৈনিক ৭টি করিয়া উট এবং কিছু ছাগল লাভ করেন। যুদ্ধের সংবাদ প্রদানকারী আসাদ গোত্রীয় ব্যক্তিকে গনীমত হইতে একটি পূর্ণ অংশ প্রদান করা হয়।
এই অভিযানে কোন লোকক্ষয় হইয়াছিল কিনা তাহা জানা যায় না। তবে ইবন কাছীর শত্রুদের তিনজন দাস বন্দী হওয়ার উল্লেখ করিয়াছেন। মদীনায় প্রত্যাবর্তনের পর আবূ সালামা (রা)-এর পূর্বের ক্ষতস্থানের ঘা মারাত্মক আকার ধারণ করে এবং জুমাদাল উলা মাসের ২৭ তারিখে তিনি ইন্তিকাল করেন। ইবন সা'দ-এর মতে তিনি জুল-কা'দা মাসে ইন্তিকাল করেন। তাঁহার ইন্তিকালের পর তাঁহার স্ত্রী উম্মু সালামা (রা)-কে তাহার ইদ্দাতশেষে রাসূলুল্লাহ (স) বিবাহ করেন।