📘 সীরাত বিশ্বকোষ 📄 গাযওয়া বানু কায়নুকা

📄 গাযওয়া বানু কায়নুকা


বানু কায়নুকা' (بنو قينقاع) ইয়াছরিব-এর একটি ইয়াহুদী গোত্রের নাম। কায়নুকা' শব্দটি আরবী নামের সহিত সংগতিপূর্ণ নয়, বরং তাহা আরবী শব্দ গঠনরূপ হইতে কিছুটা ব্যতিক্রম বলিয়া প্রতীয়মান হয়। হিব্রু ভাষার সহিতও ইহার সাদৃশ্য নাই। যদিও বানু কায়নুকা' ছিল হিব্রু বংশোদ্ভূত। এই গোত্রের নামে মদীনায় একটি বাজার ছিল যাহা বানু কায়নুকা' বাজার (سوق بنی قینقاع) নামে পরিচিত। তাহারা ছিল মদীনার খাযরাজ গোত্রের মাওলা (আশ্রিত) এবং উবাদা ইন্সুস সামিত ও আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন উবায়্যি ইব্‌ন সালূল-এর হালীফ (মিত্র)।
আরবের ইয়াহুদীদের কোন নির্ভরযোগ্য ইতিহাস নাই। তাহাদের কোন গ্রন্থ কিংবা শিলালিপিও পাওয়া যায় না, যাহার উপর ভিত্তি করিয়া তাহাদের অতীত ইতিহাস সম্পর্কে আলোকপাত করা সম্ভব। হিজাযের বাহিরের কোন ইয়াহুদী ইতিহাসবিদ, পণ্ডিত কিংবা গ্রন্থ প্রণেতা আরবের ইয়াহুদীদের সম্পর্কে আলোচনা করেন নাই। কারণ এখানকার ইয়াহুদীগণ আরব উপদ্বীপে আগমনের পর তাহাদের স্বজাতি অন্যান্য গোত্র হইতে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হইয়া যায়। ফলে দুনিয়ার অন্যান্য ইয়াহুদীরা তাহাদেরকে নিজেদের স্বজাতিও সমাজের লোক বলিয়া মনেই করিত না। কেননা তাহারা হিব্রু (ইবরীয়) সভ্যতা, ভাষা, এমনকি নামকরণও পরিত্যাগ করিয়া সর্বক্ষেত্রে আরবতন্ত্র গ্রহণ করে। হিজাযে প্রাপ্ত শিলালিপি কিংবা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনাদিতে খৃস্টীয় প্রথম শতাব্দীর পূর্বে আরবেই য়াহুদীদের নাম চিহ্নও খুঁজিয়া পাওয়া যায় না; বরং তাহাদের এখানে আগমন সম্পর্কিত ঐতিহাসিক বর্ণনাসমূহের অধিকাংশই ইয়াহুদীগণ কর্তৃক মৌখিকভাবে শ্রুত ও সংরক্ষিত। এইসব বর্ণনা নিম্নরূপঃ
ক. হিজাযের ইয়াহুদীগণ দাবি করিত যে, তাহারা সর্বপ্রথম হযরত মূসা ইব্‌ন ইমরান (আ)-এর জীবদ্দশার শেষ অধ্যায়ে এখানে আগমন করে। মূসা (আ) ফিরআওনের উপর বিজয় লাভ করার পর স্বীয় অনুসারীদের সমন্বয়ে কিন'আনীদের বিরুদ্ধে এক অভিযান পরিচালনা করেন। তাহারা সিরিয়ায় আসিয়া এখানকার অধিবাসীদেরকে ধ্বংস করিয়া দেয়। অতঃপর মূসা (আ) 'আমালিকাদেরকে ধ্বংস করিবার উদ্দেশ্যে হিজাযে আরেকটি বাহিনী প্রেরণ করেন। তাহাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয় যে, ইয়াহুদী ধর্ম গ্রহণকারী ব্যতীত বানু আমালিকার সর্বশেষ ব‍্যক্তিটিকেও যেন হত্যা করা হয়। বানু ইসরাঈলের এই বাহিনী হিজাযে আসিয়া মূসা (আ)-এর নিদের্শ বাস্তবায়ন করে, এমনকি তাহাদের সম্রাট আরকাম ইব্‌ন আবুল আরকামকেও হত্যা করে। কিন্তু তাহারা সম্রাটের একটি অত্যন্ত সুশ্রী সুদর্শন সন্তানকে হত্যা না করিয়া তাহাকে বন্দী করিয়া ফিলিস্তীনে লইয়া যায়। ইতোমধ্যে মূসা (আ) ইন্তিকাল করেন। এই বাহিনী ফিলিস্তীনে ফিরিয়া আসিয়া মূসা (আ)-এর স্থলাভিষিক্ত বানু ইসরাঈলের নিকট অভিযানের বিশদ বিবরণ দেয়। ইহাতে বানু ইসরাঈল তাহাদের উপর ভীষণ ক্ষুব্ধ হয় এবং নবীর নির্দেশ পরিপূর্ণরূপে বাস্তবায়ন না করার অভিযোগে অভিযুক্ত করিয়া তাহাদেরকে ফিলিস্তীন হইতে বহিষ্কার করে। ফলে তাহারা হিজাযে আগমন করিয়া ইয়াছরিব অঞ্চলে বসবাস শুরু করে। এই বর্ণনার উপর ভিত্তি করিয়া হিজাযের ইয়াহুদীগণ দাবি করিত যে, তাহারা খৃষ্টপূর্ব চার শত বৎসর হইতে এইখানে বসবাস করিয়া আসিতেছে।
খ. ইয়াহুদীদের হিজায অঞ্চলে আগমন সম্পর্কিত অপর একটি বর্ণনা হইল— খৃস্টপূর্ব ৫৮৭ সালে ব্যাবিলনের সম্রাট বাস্তু নসর বায়তুল মুকাদ্দাস ধ্বংস করিয়া অনেক ইয়াহুদীকে হত্যা করে এবং অবশিষ্টদেরকে সেই স্থান হইতে বিতাড়িত করে। ফলে অনেক ইয়াহুদী গোত্র হিজাযের ওয়াদী আল-কুরা, তায়মা, ইয়াছরিব, আয়লা, মাক্কা, ফাদাক, তাবুক, খায়বার প্রভৃতি অঞ্চলে আসিয়া পুনর্বাসিত হয়। আগত এইসব ইয়াহুদী স্থানীয় জুরহুম ও 'আমালিকাদের সাথে মিশিয়া যায়। ক্রমে ইয়াহুদীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাইতে থাকে। পরবর্তীতে তাহারা এই দুই গোত্রকে ইয়াছরিব হইতে বহিষ্কার করিয়া মদীনায় একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে।
গ. তালমুদের বর্ণনানুযায়ী খৃস্টীয় প্রথম কয়েক শতাব্দীতে আরবের উত্তরাঞ্চলে ইয়াহুদী বসতি ছিল। তায়মা, হিজর, খায়বার, ওয়াদী আল-কুরা, ফাদাক, মাক্সা প্রভৃতি মরূদ্যানে বসবাসরত ইয়াহুদীদের সাথে মদীনাবাসী ইয়াহুদীদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এইসব মরূদ্যানে তাহারা কৃষি পণ্য উৎপন্ন করিত। সম্ভবত তাহাদের মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন বসতিগুলি সন্নিবেশিত হইয়া একটি নগরীতে পরিণত হয়। ইয়াছরিব-এর আরামী এ্যারামীয় নাম Minta (এলাকাভুক্ত ক্ষেত্র) হইতে এই মতের সত্যতা পাওয়া যায়। সাহাবী কবি হাসান ইব্‌ন ছাবিত (রা)-এর কবিতা হইতে জানা যায়, ইয়াহুদীগণ ইয়াছরিবে অসংখ্য দুর্গ নির্মাণ করে। হাররা অঞ্চলে প্রাপ্ত কারখানা ও নালা-নর্দমার ধ্বংসাবশেষ এই কথার প্রমাণ বহন করে যে, এই অঞ্চলে ইয়াহুদী আওস গোত্রের সুসভ্য জাতি অবস্থান করিত।
ঘ. ইয়াহুদীদের ইয়াছরিব আগমন সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায় যে, ৭০ খৃস্টাব্দে রোমকগণ ফিলিস্তীনে ইয়াহুদীদেরকে হত্যা করিতে এবং তাহাদেরকে দেশান্তরিত করিতে শুরু করে এবং ১৩২ খৃস্টাব্দে তাহাদেরকে এই ভূখণ্ড হইতে সম্পূর্ণরূপে বহিষ্কার করে। ফলে এই সময়ের মধ্যে অনেক ইয়াহুদী গোত্র ফিলিস্তীন হইতে দক্ষিণে নিকটবর্তী হিজায অঞ্চলে আসিয়া শস্য-শ্যামল এলাকায় আশ্রয় নেয়। এই স্থানে আসিয়া তাহারা 'আয়লা, মাকনা, তাবুক, তায়মা, ওয়াদী আল-কুরা, ফাদাক, খায়বার প্রভৃতি অঞ্চলের উপর স্থায়ী আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। বানু কুরায়যা, বানু নাদীর ও বানু কায়নুকা' প্রভৃতি গোত্র এই সময় ইয়াছরিব আগমন করে। ক্রমে তাহারা কথা-বার্তা চাল-চলন, আচার-আচরণ এবং জীবনাচারে 'আরব বংশোদ্ভূতদের মত হইয়া যায় এবং আরবদের সাথে বিবাহ্-শাদী ও সামাজিক সম্পর্ক প্রভৃতিতে সম্পৃক্ত হইয়া পড়ে, এমনকি অনেক ইয়াহূদী হিব্রু নামের পরিবর্তে 'আরবী নাম গ্রহণ করে। তাহাদের মুষ্টিমেয় সংখ্যক ব্যতীত অন্যান্যরা হিব্রু ভাষা জানিত না। এতদসত্ত্বেও তাহারা সম্পূর্ণরূপে 'আরবদের মাঝে বিলীন হইয়া যায় নাই। অত্যন্ত সতর্কতার সহিত তাহারা ইয়াহুদীদের আত্মাভিমানকে অক্ষুণ্ণ রাখে। মূলত আরবদের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্যই তাহারা বাহ্যত আরবত্ব গ্রহণ করে। মদীনায় বসবাসকারী এইসব ইয়াহুদী 'আরবীয় ভাবধারা গ্রহণ করিলেও নিজেদেরকে ইসরাঈলী ও ইয়াহুদী ভাবিয়া তাহারা গর্ব করিত, আর আরবদেরকে মনে করিত উম্মী (নিরক্ষর/বেদুঈন)। ইয়াহুদী বানু কায়নূকা গোত্রের যেই সকল ব্যক্তিবাচক নাম পাওয়া যায় তাহার অধিকাংশই আরবী। কিন্তু এইগুলি দ্বারা তাহাদের মূল বাইবেলীয় নাম কি ছিল তাহা জানা যায় না। 'আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন সালাম (রা) ছিলেন এই গোত্রের অন্তর্ভুক্ত।
ঙ. ইতিহাসবিদ্‌ ইয়াকূত আল্-হামাবী বলেন, ইয়াহুদী পণ্ডিতগণ তাওরাত গ্রন্থে মহানবী (স)-এর গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে অবহিত হয়। তাহারা জানিতে পারে যে, মহানবী (স) بين الحرتين حرة واقم في الشرق وحرة الوبرة في الغرب (হিজরত করিবেন যেই স্থানে প্রচুর খেজুর বাগান বিদ্যমান। সুতরাং তাহারা কংকরময় মরু অঞ্চলের খোঁজে সিরিয়া হইতে বাহির হইয়া তায়নামক স্থানে আসিয়া তাওরাতের বর্ণনার সাথে উক্ত স্থানের মিল দেখিতে পাইয়া এই স্থানে বসবাস করিতে শুরু করে। পরবর্তীতে তুব্বা জাতি ও বানূ আমর ইবন আতিক আসিয়া তাহাদের সংগে যোগ দেয়।
ইয়াহুদীগণ যখন ইয়াছরিবে আসিয়া বসবাস শুরু করিয়াছিল তখন সেখানে অন্যান্য কয়েকটি আরব গোত্রও বাস করিত। ইয়াহুদীগণ তাহাদেরকে নিজেদের অধীনস্থ বানাইয়া লইয়াছিল। ৪৫০/৪৫১ খৃস্টাব্দে ইয়ামনে সংঘটিত মহাপ্লাবনে (আল-কুরআনের সূরা আস-সাবার দ্বিতীয় রুকূতে ইহার উল্লেখ আছে) সাবা জাতির বিভিন্ন গোত্র সেখান হইতে বাহির হইয়া আরবের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়াইয়া পড়ে। গাসসানীরা সিরিয়ায়, লাখমীরা হীরায় (ইরাকে), বানু খুযা'আ জিদ্দা ও মক্কার মধ্যবর্তী স্থানে এবং আওস ও খাযরাজ গোত্র ইয়াছরিবে বসবাস করিতে থাকে। ইয়াহুদীগণ যেহেতু পূর্ব হইতেই ইয়াছরিবে প্রভাব ও কর্তৃত্ব স্থাপন করিয়া রাখিয়াছিল, সেই কারণে তাহারা আওস ও খাযরাজ গোত্রকে কোন প্রকার কর্তৃত্ব করিবার সুযোগ দিল না। ফলে এই দুই আরব গোত্র অনুর্বর ভূমিতে আশ্রয় গ্রহণ করিতে বাধ্য হইয়াছিল। এই স্থানে তাহাদেরকে খুব কষ্ট করিয়া জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করিতে হইয়াছিল। পরিশেষে মালিক ইব্‌ন 'আজলান নামক জনৈক গোত্রপতি ইয়াহুদী নেতা ফিতয়ূনকে হত্যা করিয়া সিরিয়া চলিয়া গেল এবং গাসসানী শাসক আবূ জুবায়লার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করিল। ফলে সিরিয়া হইতে একটি সৈন্যবাহিনী আসিয়া যুল-হারূদ নামক স্থানে এক ভোজসভায় সকল ইয়াহূদী নেতৃস্থানীয় লোকদেরকে হত্যা করে। এইভাবে ইয়াছরিবে ইয়াহুদীদের শক্তি কিছুটা খর্ব হয় এবং আওস ও খাজরাজ গোত্রের নিরংকুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ইহার ফলে ইয়াহুদী বানু কুরায়যা ও বানু নামীর নগরীর বাহিরে যাইয়া বসবাস করিতে বাধ্য হয়। কিন্তু বানু কায়নুকার সাথে বানু কুরায়যা ও বানু নাফীরের পূর্ব হইতেই মনোমালিন্য থাকায় তাহারা নগরীর অভ্যন্তরে অবস্থান করিতে লাগিল। এইজন্য তাহাদিগকে খাযরাজ গোত্রের আশ্রয় গ্রহণ করিতে হয়।
আরব গোত্রসমূহের তুলনায় ইয়াহুদী বানু কায়নুকার আর্থিক অবস্থা ছিল খুবই সচ্ছল। ফিলিস্তীন ও সিরিয়ার সুসভ্য অঞ্চল হইতে আসিয়াছিল বলিয়া তাহারা এমন সব শিল্পে পারদর্শী ছিল যাহা আরবদের মধ্যে প্রচলিত ছিল না। তাহাদের কোন কৃষিভূমি ও ফলের বাগান ছিল না। এই গোত্রের অধিকাংশ লোক ছিল ব্যবসায়ী। তাহারা ছিল মদীনার ধনীক শ্রেণীর অন্তর্গত। তাহারা পেশায় ছিল প্রধানত স্বর্ণকার। ইহা ছাড়াও তাহারা ব্যবসায়-বাণিজ্য, লৌহজাত সামগ্রী ও তৈজসপত্র নির্মাণ শিল্পে দক্ষ ছিল। এই কারণে তাহাদের অধিকাংশ লোকই ছিল সশস্ত্র। আর্থিক সমৃদ্ধি ও ব্যবসায়িক সাফল্য প্রভৃতি কারণে মদীনার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাধনে তাহাদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল বলিয়া এই গোত্র মদীনার অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করিত। ফলে মদীনার রাজনীতিতে এই গোত্রের বিরাট ভূমিকা ছিল। তাহারা একদিকে সূদের উপর টাকা লগ্নি করিত, অপরদিকে ইয়াছরিবে বসবাসকারী গোত্রসমূহের পারস্পরিক যুদ্ধ-বিগ্রহে বিবদমান গোত্রসমূহকে অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা প্রদান করিয়া তাহাদিগকে ঋণের দায়ে জর্জরিত করিয়া ফেলিত। এইভাবে তাহারা আরবদের উপর স্থায়ী আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করিলে আরবগণ সিরীয়দের সহযোগিতায় তাহাদের শক্তি খর্ব করে। ফলে তাহারা খাযরাজ গোত্রের আশ্রয়ে ইয়াছরিব নগরীর অভ্যন্তরে বসবাস করিতে থাকে। খাযরাজ গোত্রের পক্ষ অবলম্বন করিয়া তাহারা বুআছ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার কারণে এইখানে বসবাসকারী অপর প্রধান দুই ইয়াহুদী গোত্র তথা বানু কুরায়যা ও বানু নায়ীর-এর সাথে তাহাদের প্রকাশ্য শত্রুতা শুরু হয়। বানু কায়নুকা ইয়াছরিব নগরীর দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে মুসাল্লার নিকটবর্তী ওয়াদী বুতহান-এর উপরস্থিত সেতুর সন্নিকটে বাস করিত। সেই স্থানে তাহারা দুইটি সুরক্ষিত দুর্গের অধিকারী ছিল। ইবন খালদুন বলিয়াছেন, বানু কায়নুকা মদীনার এক প্রান্তে বসবাস করিত।
মহানবী (স) ইয়াছরিব তথা মদীনায় হিজরত করিয়া আসিলে ইয়াছরিবের ইয়াহুদীগণ তাঁহাকে অভ্যর্থনা জানায়। হিজরতের পর মহানবী (স) মদীনায় যেই সনদ জারী করেন তাহাতে মুসলিম সম্প্রদায় ও ইয়াহুদীদের মধ্যে সুস্পষ্ট কতিপয় শর্ত ছিল যাহা মান্য করার স্বীকৃতি প্রদান করিয়া মদীনার ইয়াহুদীগণ তাহাতে স্বাক্ষর প্রদান করে। এই সনদ জারীর সময় ইহাতে বনু কায়নুকা’র নাম উল্লেখ নাই। এই সনদে সকল গোত্র ও তাহাদের মিত্র শক্তিকে এবং যাহারা পরবর্তীতে সংযুক্ত হইবে তাহাদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি উন্মুক্ত রাখা হয়। সম্ভবত বনু কায়নুকা’ পরবর্তীতে এই সনদের সাথে সংযুক্ত থাকিবার কারণে তাঁহাদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি প্রতিপন্ন হয়। এই সনদ কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে মদীনার মুসলিম সম্প্রদায় ও ইয়াহুদীগণ একটি অভিন্ন উম্মাহ তথা জাতিরূপে অভিহিত হয়। এই সনদে এই উভয় সম্প্রদায়ের পূর্ণ ধর্মীয় ও সামাজিক স্বাধীনতার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয় এবং তাঁহাদের মধ্যে কোন প্রকার আভ্যন্তরীণ কলহ দেখা দিলে তাহা মীমাংসার দায়িত্ব মহানবী (স)-এর উপর অর্পণ করা হয়। এই সনদে আরো নিশ্চিত করা হয় যে, মদীনার মুসলিম সম্প্রদায় বহিঃশত্রু দ্বারা আক্রান্ত হইলে মুসলিম ও ইয়াহুদী উভয় পক্ষ সম্মিলিতভাবে এই আক্রমণ প্রতিহত করিবে এবং এই ক্ষেত্রে প্রত্যেক পক্ষ স্ব স্ব ব্যয়ের বহন করিবে।
রামাদান ২ হি./মার্চ ৬২৪ সালে বদর যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার পর ইয়াহুদী বনু কায়নুকা মহানবী (স), ইসলাম এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক আচরণ শুরু করে। ইহার মূলে প্রধান কারণ ছিল চারিটি :
এক : মহানবী (স)-এর দাওয়াতের বিশ্বজনীন আবেদন তাঁহাদের বংশভিত্তিক জাতীয়তাবাদের ঐক‍্যসূত্রপূর্ণ ধারাকে তৃণ খণ্ডের মত ভাসাইয়া লইয়া গিয়াছিল এবং তাঁহার নবুওয়াতের আওতা ও পরিধি সুপ্রশস্ত হইতেছিল। ইহাতে ইয়াহুদী বনু কায়নুকা’র ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার সংকোচন পরিলক্ষিত হইতেছিল।
দুই : ইয়াহুদী বনু কায়নুকাসহ অন্যান্য ইয়াহুদী গোত্র এতদিন বিভক্তি সৃষ্টির মাধ্যমে মদীনায় যেই সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধাসমূহ ভোগ করিয়া আসিতেছিল মদীনা সনদের মাধ্যমে ঐক্য, সংহতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে তাহাদের সেই সুবিধাসমূহ চিরতরে তিরোহিত হওয়ার উপক্রম হইল।
তিন : ইসলামে আয়-উপার্জন, ব্যবসায়-বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক লেনদেন প্রভৃতি ক্ষেত্রে সুদ ভিত্তিক কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ার ফলে ইয়াহুদী বনু কায়নুকার অর্থনৈতিক বিপর্যয় সুনিশ্চিত হইয়া পড়িল।
চার : ইয়াহুদীদের কিবলা হইল বায়তুল মুকাদ্দাস, যাহা ২ হিজরী সালের প্রথমার্ধ পর্যন্ত মুসলিমদেরও কিবলা ছিল। মহানবী (স)-এর মদীনা হিজরতের ১৬/১৭ মাস পর মুসলমানদের কিবলা বায়তুল্লাহ্ দিকে পরিবর্তিত হইলে ইয়াহুদীরা রুষ্ট হয় এবং প্রকাশ্যে মুসলমানদের বিরোধিতা করিতে থাকে।
উপরোল্লিখিত কারণে ইয়াহুদী বানু কায়নুকা মহানবী (স), ইসলাম ও মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরোধিতা করাকে নিজেদের লক্ষ্যে পরিণত করে। তাহারা একদিকে মুসলিমদের দৈহিকভাবে অপদস্থ করার পথ বাছিয়া লয়, অপরদিকে সরলপ্রাণ মুসলিম সম্প্রদায়ের মনে ইসলাম সম্পর্কে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টির মানসে বিভিন্ন ধরনের অপতৎপরতা চালাইতে থাকে। সমাজে অশান্তি ও অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য তাহারা আবদুল্লাহ্ ইবন উবায়্যি প্রমুখ মুনাফিকের সহিত হাত মিলায়। মুসলমানদেরকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করিবার জন্য তাহারা নানা অপকৌশল অবলম্বন করে। ইয়াহূদীদের এইসব অপতৎপরতা ছিল ইতোপূর্বে সম্পাদিত মদীনা সনদের সুস্পষ্ট লংঘন।
মুসলমান ও কুরায়শদের মধ্যে সংঘটিত বদর যুদ্ধের পর মুসলমান মদীনায় ইয়াহুদীদের মধ্যকার সম্পর্ক তিক্ত হইয়া উঠে। এই যুদ্ধে মুসলিমদের বিজয়ের কারণে ইয়াহুদী বানু কায়নুকা মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করিতে শুরু করে। ক্রমে তাহাদের এই মনোভাব প্রকাশ্য বৈরিতার রূপ নেয়। আল-ওয়াকিদী বলেন, ইয়াহুদীরা বিদ্রোহ করিল এবং তাহাদের ও মহানবী (স)-এর মধ্যে বিদ্যমান চুক্তি ভংগ করিল। আর এই বৈরী মনোভাব প্রকাশ্য রূপ লাভের পিছনে কতিপয় ঘটনা ক্রিয়াশীল ছিল। ঘটনাগুলি হইল:
১। ইন্ন হিশাম বলেন, আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন জাফর ইন্ন মিসওয়ার ইন্ন মাখরামা হযরত আবূ আওন সূত্রে বর্ণনা করেন। আবূ আওন বলেন, বানু কায়নুকার ঘটনাটি ছিল এই, জনৈকা আরব মহিলা (তিনি জনৈক আনসারীর স্ত্রী) তাহার অলংকার বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে বানু কায়নুকার বাজারে উপস্থিত হন এবং জনৈক স্বর্ণকারের নিকট গিয়া বসেন। কোন কোন বর্ণনা অনুযায়ী মাকবুল আল্-বালাযুরী নামক জনৈকা মুসলিম মহিলা বানু কায়নুকার জনৈক ইয়াহুদী স্বর্ণকারের দোকানে স্বর্ণালংকার তৈয়ারের উদ্দেশ্যে গমন করেন। আবার কোন বর্ণনায় উল্লেখ আছে, জনৈকা আরব মহিলা দুধ বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে গমন করেন। এই স্থানে শব্দগত পার্থক্যের কারণে অর্থগত পার্থক্য সূচিত হইয়াছে বলিয়া মনে হয়। শব্দটি মূলত حلية (অলংকার), حلية (দুধ) নয়। মুদ্রণজনিত ভুলের কারণে এই পার্থক্য দেখা দিয়াছে। স্বর্ণকার লোকটি মহিলাটির মুখের নেকাব খুলিয়া তাহার চেহারা দেখিতে চায়। কিন্তু মহিলাটি তাহাতে সম্মত হন নাই। লোকটি কৌশলে মহিলার কাপড়ের একটি অংশ পিছনের একটি আংটার সাথে বাঁধিয়া দেয়। আল-ওয়াকিদীর মতে, অপর এক ইয়াহুদী আসিয়া মহিলার পিছনে বসে, যাহা মহিলাটি জানিত না। সে মহিলার কাপড়ের একটি অংশ পিছনের একটি আংটার সাথে বাঁধিয়া দেয়। মহিলাটি বসা হইতে উঠিতে গেলে তাহার কাপড় খুলিয়া যায়। ইহাতে তাহার মুখমণ্ডল ও শরীরের অন্যান্য অংগ প্রকাশিত হইয়া পড়িলে স্বর্ণকারসহ উপস্থিত অন্যান্য ইয়াছুদীরা আট্টহাসিতে মাতিয়া উঠে। এই সময় মহিলাটি চিৎকার দিয়া উঠিলে একজন মুসলিম তাহার সাহায্যার্থে আগাইয়া আসেন এবং স্বর্ণকারের উপর আক্রমণ করিয়া তাহাকে হত্যা করেন। যেহেতু নিহত লোকটি ছিল ইয়াহুদী তাই অন্যান্য ইয়াহুদীরা উক্ত মুসলমানের উপর আক্রমণ করিয়া তাঁহাকে শহীদ করে। ফলে মুসলিম সম্প্রদায় ক্রোধে ফাটিয়া পড়ে এবং অন্যান্য মুসলিমদেরকে প্রতিশোধ গ্রহণের নিমিত্তে ইয়াহুদীদের উপর আক্রমণ করিবার জন্য আহবান জানায়। এইভাবে মদীনার মুসলিম সম্প্রদায় ও ইয়াহুদী বানু কায়নুকার মধ্যে প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এই ঘটনয়ার মাধ্যমে মদীনা সনদের ধারা লংঘিত হয় এবং প্রকারান্তরে কৃত চুক্তি ভংগ হইয়া যায়। ইতিহাসবিদ ইবন ইসহাক, ইবন সা'দ এবং ইব্‌ন জারীর আত-তাবারী প্রমুখ তাঁহাদের গ্রন্থে এই ঘটনা উল্লেখ করেন নাই। অপর দিকে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সূত্র এই ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত মহিলা নিহত ইয়াহুদী এবং শহীদ মুসলিম লোকটির নাম উল্লেখ করে নাই।
২. ইবন ইসহাক বলেন, ইয়াহূদী বানু কায়নুকা চুক্তি ভংগ করিয়া বিশ্বাসঘাতকতা করিলে মহানবী (স) এই গোত্রের লোকদেরকে একটি স্থানে সমবেত করিয়া তাহাদেরকে উপদেশ প্রদান করার চিন্তা করেন। মহানবী (স) বানু কায়নুকার উন্মুক্ত বাজার এলাকায় এই সমাবেশের আয়োজন করিয়া তাহাদিগকে উদ্দেশ্য করিয়া বলেন: হে ইয়াহূদী সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহ্র পক্ষ হইতে সেইসব শাস্তিকে ভয় কর যাহা বদর যুদ্ধে কুরায়শদের উপর আপতিত হইয়াছে। তোমাদের উপর তাহা আপতিত হওয়ার পূর্বেই তোমরা ইসলাম কবুল কর। কেননা ইতোমধ্যেই তোমরা জানিয়াছ যে, আমি আল্লাহর পক্ষ হইতে প্রেরিত রাসূল। তোমরা তোমাদের উপর নাযিলকৃত কিতাবেও এই বিষয়টি পাইয়া থাকিবে।
মহানবী (স)-এর এই বক্তব্য শুনিয়া বানু কায়নুকার ইয়াহুদীরা বলিল, হে মুহাম্মাদ! সম্ভবত আপনি আমাদেরকে আপনার জাতি তথা কুরায়শ সম্প্রদায়ের মতই মনে করিয়া থাকেন। বিষয়টি যেন আপনাকে প্রতারিত না করে। আপনি এমন এক জাতির সাথে যুদ্ধ করিয়াছেন যাহাদের যুদ্ধ সম্পর্কে কোন অভিজ্ঞতা নাই। আপনি এই সুযোগটি গ্রহণ করিয়াছেন। আর আমাদের অবস্থা হইল, আপনি যদি আমাদের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন তাহা হইলে আপনি অবশ্যই বুঝিতে পারিবেন আমাদের শৌর্যবীর্য এবং শক্তি-সামর্থ্য কতটুকু। মদীনা সনদের ধারা অনুযায়ী ইয়াহুদীগণ মহানবী (স)-এর নেতৃত্ব মানিয়া লওয়া সত্ত্বেও এই ধরনের ঔদ্ধত্যপূর্ণ জবাব প্রদান করিয়া প্রকারান্তরে মহানবী (স)-কে যুদ্ধের জন্য আমন্ত্রণ জানায়। ইবন হাজার আল-আসকালানীর মতে, ইহা হাসান হাদীছ।
এই হাদীছের সনদে যায়দ ইবন ছাবিত (রা)-এর আযাদকৃত গোলাম মুহাম্মাদ ইবন আবূ মুহাম্মাদকে ইবন হাজার আল-আসকালানী অজ্ঞাত রাবী হিসাবে উল্লেখ করিয়াছেন। ইউনুস ইবন বুকায়র ইবন ইসহাক সূত্রে রিওয়ায়াত করেন, তিনি হযরত যায়দ ইবন ছাবিত (রা)-এর মাওলা মুহাম্মাদ ইবন আবূ মুহাম্মাদ সূত্রে রিওয়ায়াত করেন, তিনি সাঈদ ইবন যুবায়র অথবা ইকরিমা সূত্রে এবং তিনি আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা) সূত্রে রিওয়ায়াত করেন। ইবন আব্বাস (রা) বলেন, বদর যুদ্ধে কুরায়শদেরকে পরাজিত করিবার পর মহানবী (স) বানু কায়নুকার ইয়াহুদীদেরকে বানু কায়নুকা বাজারে একত্র করিয়া তাহাদেরকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানান। তাহারা নিজেদের শক্তি-সামর্থ্যের দম্ভ দেখাইয়া ঔদ্ধত্যপূর্ণ জবাব দেয়। ইবন আব্বাস (রা) সূত্রে ইকরিমা রিওয়ায়াত করেন, আল-কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত দুইটি এই প্রসঙ্গে নাযিল হয়:
قُل لِّلَّذِينَ كَفَرُوا سَتُغْلَبُونَ وَتُحْشَرُونَ إِلَىٰ جَهَنَّمَ ۚ وَبِئْسَ الْمِهَادُ قَدْ كَانَ لَكُمْ آيَةٌ فِي فِئَتَيْنِ الْتَقَتَا فِئَةٌ تُقَاتِلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَأُخْرَىٰ كَافِرَةٌ يَرَوْنَهُم مِّثْلَيْهِمْ رَأْيَ الْعَيْنِ ۚ وَاللَّهُ يُؤَيِّدُ بِنَصْرِهِ مَن يَشَاءُ ۗ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَعِبْرَةً لِّأُولِي الْأَبْصَارِ
“যাহারা কুফরী করে তাহাদিগকে বল, 'তোমরা শীঘ্রই পরাভূত হইবে এবং তোমাদিগকে একত্র করিয়া জাহান্নামের দিকে লইয়া যাওয়া হইবে। আর উহা কত নিকৃষ্ট আবাসস্থল'। দুইটি দলের পরস্পর সম্মুখীন হওয়ার মধ্যে তোমাদের জন্য অবশ্যই নিদর্শন রহিয়াছে। একদল আল্লাহর পথে যুদ্ধ করিতেছিল; অন্য দল কাফির ছিল; উহারা তাহাদিগকে চোখের দেখায় দ্বিগুণ দেখিতেছিল। আল্লাহ্ যাহাকে ইচ্ছা নিজ সাহায্য দ্বারা শক্তিশালী করেন। নিশ্চয় ইহাতে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন লোকের জন্য শিক্ষা রহিয়াছে” (৩ : ১২-১৩)।
অর্থাৎ বানু কায়নুকা প্রথম গোত্র যাহারা বদর যুদ্ধের পরবর্তী এক মাসের মধ্যেই মদীনা সনদের ধারা লংঘন করে। ইবন ইসহাক 'আসিফ ইবন উমার ইবন কাতাদা সূত্রে রিওয়ায়াত করেন:
أَنَّ بَنِي قَيْنُقَاعَ كَانُوا أَوَّلَ يَهُودٍ نَقَضُوا مَا بَيْنَهُمْ وَبَيْنَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ وَحَارَبُوا فِيهَا بَيْنَ بَدْرٍ وَأُحُدٍ.
“বানু কায়নুকা প্রথম ইয়াহুদী গোত্র যাহারা মহানবী (স) ও তাহাদের মধ্যকার স্বাক্ষরিত চুক্তি ভঙ্গ করে এবং বদর ও উহুদ যুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে তাঁহারা যুদ্ধে লিপ্ত হয়”।
উল্লিখিত কারণে মহানবী (স) মদীনা ফিরিয়া আসিয়া আবু লুবাবা বশীর ইবন আবদুল মুনযির আল-আনসারীকে মদীনায় তাঁহার খলীফা (স্থলাভিষিক্ত) নিযুক্ত করেন এবং ইয়াহুদী বানু কায়নুকাকে শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশে মুসলিম মুজাহিদদেরকে সংগে লইয়া বানু কায়নুকা অবরোধ করেন। এই অভিযানে সাদা পতাকা বহন করেন হযরত হামযা ইব্‌ন আবদুল মুত্তালিব (রা)। আল্-ওয়াকিদী বলেন, মহানবী (স) মদীনায় হিজরতের ২০ মাসের মাথায় শাওয়াল মাসের মধ্যভাগে শনিবার তাহাদিগকে অবরোধ করেন। আর এই অবরোধ যুল-কা'দা মাসের প্রথম দিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। এই অবরোধের মেয়াদ ছিল ১৫ দিন।
বানু কায়নুকা মদীনার খাযরাজ গোত্রের সাথে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার কারণে আওস ও খাযরাজ গোত্রের পারস্পরিক দ্বন্দ্বে বানু কায়নুকা খাযরাজ গোত্রের পক্ষ অবলম্বন করিত। ইবন হিশাম বলেন, মহানবী (স)-এর সাথে বানু কায়নুকার এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের পিছনে সম্ভবত ইহাই কারণ ছিল যে, তাহারা মহানবী (স) দ্বারা আক্রান্ত হইলে তাহাদের মিত্রশক্তি তথা খাযরাজ গোত্রের পূর্ণ সহযোগিতা পাওয়া যাইবে। বাস্তবিকপক্ষে আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন উবায়্যি ব্যতীত আর কাহারও নৈতিক সমর্থন তাহারা লাভ করিতে পারে নাই। বানু কায়নুকার এই আচরণের কারণে মহানবী (স) তাহাদের পক্ষ হইতে বিশ্বাসঘাতকতার আশংকা করেন। ইহার প্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করেন:
وَإِمَّا تَخَافَنَّ مِنْ قَوْمٍ خِيَانَةً فَانْبِدْ إِلَيْهِمْ عَلَى سَوَاءٍ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْخَائِنِينَ.
"যদি তুমি কোন সম্প্রদায়ের চুক্তি ভংগের আশংকা কর তবে তোমার চুক্তিও তুমি যথাযথ বাতিল করিবে; নিশ্চয় আল্লাহ্ চুক্তি ভংঙ্গকারীদিগকে পসন্দ করেন না” (৮ : ৫৮)।
এই নির্দেশের উপর ভিত্তি করিয়া মহানবী (স) বানু কায়নুকার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। অবরোধ চলাকালীন বানু কায়নুকা দুর্গে আশ্রয় নেয়। এই সময়ে তাহারা তাহাদের সকল মিত্র শক্তি হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়ে। তাহাদের কেহ বাহিরে আসিতে পারে নাই এবং বাহির হইতেও কেহ তাহাদের জন্য খাবার পৌছাইয়া দিতে সক্ষম হয় নাই। এই অবস্থায় আল্লাহ তাআলা তাহাদের হৃদয়ে ভীতির সঞ্চার করেন। অবস্থার নাযুকতা উপলব্ধি করিয়া তাহারা এই শর্তে আত্মসমর্পণ করে যে, তাহাদের স্ত্রী-পুত্র-পরিজন তাহাদের সাথে থাকিবে এবং তাহাদের ধন-সম্পদ মহানবী (স) ও মুসলমানদের হইবে।
মহানবী (স) তাহাদেরকে বন্দী করেন এবং তাহাদের দুই হাত পিছনের দিক হইতে বাঁধিয়া ফেলার নির্দেশ দেন। তিনি এই কাজের দায়িত্ব অর্পণ করেন বানু আসলাম গোত্রের মুনযির ইব্‌ন কুদামার উপর। তাহাদের সংখ্যা ছিল সাত শত। চার শত ছিল বর্মাবিহীন এবং তিন শত ছিল বর্মধারী। মুনাফিক নেতা 'আবদুল্লাহ্ ইবন উবায়্যি-এর সাথে মৈত্রীচুক্তি থাকার কারণে এই সময় সে তাহাদের সাহায্যার্থে আগাইয়া আসে। সে মুনযিরকে বলে, ইহাদেরকে ছাড়িয়া দাও। মুনযির বলেন, "আমি কি এমন জাতিকে ছাড়িয়া দিব যাহাদেরকে বাঁধিবার নির্দেশ স্বয়ং মহানবী (স) দিয়াছেন? আল্লাহর শপথ! যেই ব্যক্তি তাহাদেরকে ছাড়াইয়া নেওয়ার জন্য আগাইয়া আসিবে আমি তাহার গর্দান কাটিয়া ফেলিব।” তখন সে বানু কায়নুকার লোকদের মুক্ত করিয়া দেওয়ার জন্য মহানবী (স)-এর নিকট সুপারিশ করে এবং বলে, হে মুহাম্মাদ! মিত্র গোত্রের লোকদের প্রতি অনুগ্রহ করুন। মহানবী (স) তাহার দিক হইতে মুখ ফিরাইয়া নিলেন। তখন সে মহানবী (স)-এর লৌহ বর্মের পকেটে হাত ঢুকাইয়া দেয়। মহানবী (স) বলেন: আমাকে ছাড়িয়া দাও। এই সময মহানবী (স)-এর চেহারায় অসন্তোষের চিহ্ন ফুটিয়া উঠে। আবদুল্লাহ্ ইবন উবায়্যি বলিল, আমি ছাড়িয়া দিব না যতক্ষণ পর্যন্ত মিত্র গোত্রের লোকদের প্রতি অনুগ্রহ করা না হয়। তাহারা আমাকে বিভিন্ন সময় সাহায্য করিয়াছে। আপনি কি তাহাদেরকে এত শীঘ্রই ধ্বংস করিয়া দিবেন? হে মুহাম্মাদ! আমি বিপদের আশংকা করিতেছি। মহানবী (স) বলিলেন: “তাহাদেরকে ছাড়িয়া দাও। আল্লাহ তাহাদের উপর লা'নত বর্ষণ করুন এবং আবদুল্লাহ্ ইবন উবায়্যি-এর উপরও লা'নত বর্ষণ করুন"।
রাসূলুল্লাহ (স) বানু কায়নুকার ইয়াহুদীদেরকে হত্যা না করিয়া মদীনা ছাড়িয়া চলিয়া যাওয়ার নির্দেশ দেন এবং এই নির্দেশ কার্যকর করার দায়িত্ব অর্পণ করেন তাহাদেরই মিত্র গোত্রের অন্তর্গত উবাদা ইবন সামিত (রা)-এর উপর, যিনি তখন বানু কায়নুকার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করিয়াছিলেন। তিনি তাহাদেরকে সন্তান-সন্ততিসহ মদীনার 'যুবাত' পর্বত পর্যন্ত পৌঁছাইয়া দিয়া বলেন, তোমরা অনেক দূরে চলিয়া যাও। তখন তাহারা সিরিয়ার 'আযরি'আত' নামক এলাকায় চলিয়া যায়।
রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের ধন-সম্পদ, সমুদয় সমরাস্ত্র এবং স্বর্ণলংকার নির্মাণের সকল যন্ত্রপাতি গনীমত হিসাবে গ্রহণ করেন। এই সম্পদ হস্তগত করিবার দায়িত্ব অর্পণ করেন মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা আল-আনসারী (রা)-র উপর। তাহাদের ধন-সম্পদ পাঁচ ভাগ করা হয়। চার ভাগ মুসলিম মুজাহিদদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। অপর একভাগ মহানবী (স) গ্রহণ করেন। এইগুলি হইল মহানবী (স) কর্তৃক গ্রহণকৃত সর্বপ্রথম গনীমতের সম্পদ। এইগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হইল ৩ টি ধনুক ও দুইটি লৌহবর্ম। ধনুকগুলির নাম হইল ১. আল-কাতুম (الکتوم) এইটি উহুদ যুদ্ধে ভাঙ্গিয়া যায়, ২. আল-রাওহা (الروحاء), ৩. আল-বায়দা (البيضاء)। লৌহবর্ম দুইটির নাম হইল: আস-সাগদিয়া (الصغدية) ও আল-ফিদ্দাহ (الفضة)। বর্ণিত আছে যে, আস-সাগদিয়া হইল সেই বর্ম যাহা জালূতের সাথে যুদ্ধ করিবার সময় হযরত দাউদ (আ) পরিধান করিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) একটি বর্ম মুহাম্মাদ ইব্‌ন মাসলামা (রা)-কে এবং অপরটি সা'দ ইব্‌ন মু'আয (রা)-কে প্রদান করেন। মুহাম্মদ ইব্‌ন মাসলামা বলেন, মহানবী (স) আমাকে একটি বর্ম প্রদান করেন, আর একটি প্রদান করেন সা'দ ইব্‌ন মু'আযকে।
এই অভিযানে মহানবী (স) তিনখানি তরবারিও হস্তগত করেন। এইগুলির মধ্যে একটির নাম কালাঈ (قلعی), অপর একটির নাম বাত্তার (بتار)। তৃতীয়টির নাম পাওয়া যায় না। বানু কায়নুকা অভিযানে রাসূলুল্লাহ (স) গনীমতের সম্পদ হইতে এক-পঞ্চমাংশ গ্রহণের পাশাপাশি হযরত সাফিয়‍্যা (রা)-কেও গ্রহণ করেন।
মহানবী (স) বানু কায়নুকাকে বহিষ্কার করার দায়িত্ব অর্পণ করেন উবাদা ইব্‌ন সামিত (রা)-এর উপর। বানু কায়নুকা বলিল, আমরা কি আওস ও খাযরাজ গোত্রের নিকট হইতে চলিয়া যাইব? আমরা তো আপনার মিত্রপক্ষ। আবদুল্লাহ্ ইবন উবায়্যি জিজ্ঞাসা করিল, আপনি মিত্রদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন: “হে আবুল হুবাব! হৃদয় পরিবর্তন হইয়াছে, ইসলাম সকল চুক্তি বাতিল করিয়াছে। তাহারা আগামী কালই চলিয়া যাইবে"। বানু কায়নুকা বলিল, লোকদের নিকট আমরা অনেক ঋণ পাওনা আছি। মহানবী (স) বলিলেন, তাহাদেরকে তাড়াতাড়ি যাইতে বল। ইবনুল আছীর বলেন, উবাদা ইব্‌ন সামিত (রা) তাহাদেরকে 'যুবাব' পযর্ন্ত পৌছাইয়া দেন। অতঃপর তাহারা 'আযরি'আত' চলিয়া যায়। 'আযরি'আত' হইল সিরিয়ার অন্তর্গত একটি শহর। এইটি 'বালকা' ও 'আম্মান সংলগ্ন একটি স্থান। কিছুকাল অতিবাহিত হইতে না হইতেই তাহারা ধ্বংস হইয়া যায়। সাবরাহ্ বলেন, আমি সিরিয়া হইতে প্রত্যাবর্তনের সময় 'আকীক উপত্যকায় 'ফালজাহ' নামক স্থানে ছিলাম। আমি এই স্থানে বানু কায়নুকা'র সাক্ষাত পাইলাম। তাহারা নিজেদের সন্তান-সন্ততি ও স্ত্রী-পরিজনকে উটের পিঠে উঠাইয়া পুরুষরা হাঁটিয়া চলিয়া যাইতেছিল। আমি তাহাদের অবস্থা জিজ্ঞাসা করিলে তাহারা বলিল, "মুহাম্মাদ আমাদেরকে বিতাড়িত করিয়া দিয়াছে এবং আমাদের ধন-সম্পদ রাখিয়া দিয়াছে।" আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, তোমরা এখন কোথায় যাইবে? তাহারা বলিল, আমরা সিরিয়া যাইব। সাবরাহ্ বলেন, তাহারা ওয়াদী আল-কুরায় অবতরণ করিয়া এই স্থানে একমাস অবস্থান পূর্বক শক্তি সঞ্চয় করে। অতঃপর তাহারা আযরি'আতে চলিয়া যায় এবং সেই স্থানে অবস্থান করে। কিন্তু সেখানেও তাহারা স্থায়ী হইতে পারে নাই।
উবাদা ইব্‌ন সামিত বলেন, বানু কায়নুকা যখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাথে বিবাদে জড়াইয়া পড়ে তখন তাহাদের মিত্র আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন উবায়্যি তাহাদের সহযোগিতায় দাঁড়াইয়া গেলেও তাহাদের অপর মিত্র আওফ ইব্‌ন আল-খাযরাজ গোত্রের উবাদা ইব্‌ন সামিত (রা) তাহাদের সাথে সকল প্রকার সম্পর্ক ছিন্ন করিয়া আল্লাহ্ তা'আলা এবং তাঁহার রাসূলের সাথে সম্পর্ককে সুদৃঢ় করেন। উবাদা (রা) বলেন, "আমি বানু কায়নুকার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করিয়া আল্লাহ্ তা'আলা এবং তাঁহার রাসূলের সংগের সম্পর্ককে গ্রহণ করিলাম এবং মহান আল্লাহ, তাঁহার রাসূল এবং মুমিনদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করিলাম, আর কাফিরদের সঙ্গে ইতোপূর্বের সকল সহযোগিতা ও মিত্রতায় চুক্তি ছিন্ন করিলাম। অতঃপর উবাদা ইবন সামিত (রা) এবং আবদুল্লাহ্ ইবন উবায়্যি সম্পর্কে নিম্নোক্ত আয়াতসমূহ নাযিল হয়ঃ
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصْرِى أَوْلِيَاءَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَمَنْ يُتَوَلَّهُمْ مِّنْكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ إِنَّ اللهَ لا يَهْدِي القَوْمَ الظَّلِمِينَ. فَتَرَى الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَّرَضٌ يُسَارِعُوْنَ فِيْهِمْ يَقُولُونَ نَخْشَى أَنْ تُصِيبَنَا دَائِرَةٌ فَعَسَى اللَّهُ أَنْ يَأْتِيَ بِالْفَتْحِ أَوْ أَمْرٍ مِّنْ عِنْدِهِ فَيُصْبِحُوا عَلَى مَا أَسَرُّوا فِي أَنْفُسِهِمْ نَدِمِينَ. وَيَقُولُ الَّذِينَ آمَنُوا أَهُؤُلَاءِ الَّذِينَ أَقْسَمُوا بِاللَّهِ جَهْدَ أَيْمَانِهِمْ إِنَّهُمْ لَمَعَكُمْ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فَأَصْبَحُوا خَسِرِينَ. يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَنْ يُرْتَدَّ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ أَذَلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَفِرِينَ يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لائِمٍ ذُلِكَ فَضْلُ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَنْ يَشَاءُ وَاللهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ إِنَّمَا وَلِيُّكُمُ اللهُ وَرَسُولَهُ وَالَّذِينَ آمَنُوا الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلوةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكُوةَ وَهُمْ رَكِعُونَ. وَمَنْ يَتَوَلَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَالَّذِينَ آمَنُوا فَإِنَّ حِزْبَ اللهِ هُمُ الْغَلِبُونَ.
“হে মু'মিনগণ! তোমরা ইয়াহুদী ও খৃস্টানদিগকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করিও না। তাহারা পরস্পর পরস্পরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে কেহ তাহাদিগকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করিলে সে তাহাদেরই একজন হইবে। নিশ্চয় আল্লাহ্ যালিম সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।
এবং যাহাদের অন্তঃকরণে ব্যাধি রহিয়াছে তুমি তাহাদিগকে সত্বর তাহাদের সহিত মিলিত হইতে দেখিবে এই বলিয়া, 'আমাদের আশংকা হয় আমাদের ভাগ্য বিপর্যয় ঘটিবে।' হয়তো আল্লাহ বিজয় অথবা তাঁহার নিকট হইতে এমন কিছু দিবেন যাহাতে তাহারা তাহাদের অন্তরে যাহা গোপন রাখিয়াছিল তজ্জন্য অনুতপ্ত হইবে। এবং মু'মিনগণ বলিবে, 'ইহারাই কি তাহারা যাহারা আল্লাহর নামে দৃঢ়ভাবে শপথ করিয়াছিল যে, তাহারা তোমাদের সংগেই আছে? তাহাদের কার্য নিষ্ফল হইয়াছে; ফলে তাহারা ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে। হে মু'মিনগণ! তোমাদের মধ্য কেহ দীন হইতে ফিরিয়া গেলে নিশ্চয় আল্লাহ্ এমন এক সম্প্রদায় আনিবেন যাহাদিগকে তিনি ভালবাসিবেন এবং যাহারা তাঁহাকে ভালবাসিবে। তাহারা মু'মিনদের প্রতি কোমল ও কাফিরদের প্রতি কঠোর হইবে; তাহারা আল্লাহ্র পথে জিহাদ করিবে এবং কোন নিন্দুকের নিন্দার ভয় করিবে না। ইহা আল্লাহর অনুগ্রহ, যাহাকে ইচ্ছা তিনি দান করেন এবং আল্লাহ্ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ। তোমাদের বন্ধু তো আল্লাহ, তাঁহার রাসূল ও মু'মিনগণ-যাহারা বিনীত হইয়া সালাত কায়েম করে ও যাকাত দেয়। কেহ আল্লাহ্, তাঁহার রাসূল এবং মু'মিনদিগকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করিলে আল্লাহর দলই তো বিজয়ী হইবে" (৫:৫১-৫৬)।
উক্ত আয়াতসমূহে فَتَرَى الَّذِيْنَ فِي قُلُوبُهُمْ مَّرَضٌ )তুমি দেখিবে সেই সমস্ত লোককে যাহাদের অন্তঃকরণে রোগ রহিয়াছে) বলিয়া আবদুল্লাহ ইবন উবায়্যিকে বুঝানো হইয়াছে। কারণ সে বলিয়াছিল, إِنِّي أَخْشَى الدَّوَائر )আমি বিপদের আশংকা করিতেছি) যাহা বিবৃত করিয়া আল্লাহ তা'আলা বলেন : يَقُولُونَ نَخْشَى أَنْ تُصِيْبَنَا دَائِرَةُ )"তাহারা বলে, আমরা আমাদের ভাগ্য বিপর্যয়ের আশংকা করিতেছি।" পক্ষান্তরে وَمَنْ يَتَوَلَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَالَّذِينَ آمَنُوا )"আর যেই ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁহার রাসূল এবং ঈমানদার লোকদিগকে নিজের বন্ধু বানাইবে") শীর্ষক আয়াত দ্বারা উবাদা ইব্‌ন সামিতকে বুঝানো হইয়াছে। কারণ তিনি বলিয়াছিলেন, আমি বানু কায়নুকার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করিয়া আল্লাহ তা'আলা, তাঁহার রাসূল এবং মু'মিনগণকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করিলাম।
বানু কায়নুকা গোত্রের কতিপয় লোক দীন ইসলাম গ্রহণ করে এবং তাহারা মদীনাতেই থাকিয়া যায়। ইব্‌ন হিশাম রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতিপক্ষ হিসাবে ৩০ জন বানু কায়নুকার তালিকা প্রদান করেন। হয়ত ইহা দ্বারা নির্বাসন-পূর্ব সময়কে বুঝান হইয়াছে। তালিকার ৫/৬টি নাম ওয়াকিদীর বর্ণনায় পাওয়া যায়। ৯/৬৩১ সালে ইবন উবায়্যি-এর দাফনের সময় বানূ কায়নুকা এবং অন্য গোত্রের কিছু সংখ্যক ব্যক্তি ভিড় ঠেলিয়া লাশের খাটিয়া পর্যন্ত গিয়াছিল। কায়নুকা গোত্রের আরেক ব্যক্তি ছিলেন আবদুল্লাহ ইব্‌ন সালাম (প্রকৃত নাম আল-হুসায়ন)। ইনি ছিলেন একজন ধর্মীয় নেতা এবং সুশিক্ষিত ব্যক্তি। ইন্ন ইসহাক কর্তৃক প্রদত্ত তালিকার উপসংহারে তাঁহার নাম উল্লিখিত হইয়াছে। তিনি হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর মদীনায় হিজরতের অব্যবহিত পরই ইসলাম ধর্ম কবুল করেন। Horovitz বলেন যে, তিনি হিজরতের ৮ বৎসর পর এবং হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর ইনতিকালের দুই বৎসর পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেন।
বানু কায়নুকার যুদ্ধ সম্পর্কে ঐতিহাসিকও সীরাত রচয়িতাগণের মধ্যে মতভেদ রহিয়াছে। আল-বালাযুরী, ইব্‌ন খালদুন প্রমুখ ঐতিহাসিকের মতে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয় ২য় হিজরীর শাওয়াল মাসে। কিন্তু ইব্‌ন কাছীর বলেন যে, ইহা হিজরী ৩য় সালে সংঘটিত হইয়াছিল। এই বর্ণনাটিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। ইহা নিশ্চিত যে, এই যুদ্ধ বদরের যুদ্ধের পর ও উহুদ যুদ্ধের পূর্বে সংঘটিত হয়। কোন এক বর্ণনা হইতে জানা যায় যে, ৩য় হিজরীর মুহাররাম মাসে গাতাফান গোত্রের বিরুদ্ধে সৈন্য পরিচালনার ফলে আমররা-র যুদ্ধ সংঘটিত হয়। রাসূলুল্লাহ (স) উছমান ইব্‌ন আফফান (রা)-কে মদীনায় তাঁহার প্রতিনিধি নিযুক্ত করেন এবং স্বয়ং নাজদ অভিমুখে যাত্রা করেন। তিনি সেইখানে সফর মাস অতিবাহিত করেন এবং বিনা যুদ্ধেই প্রত্যাবর্তন করেন। অতঃপর ৩য় হিজরীর রবীউল আওয়াল মাসে একদল সৈন্য লইয়া হিজাযে বুহরান নামক স্থান পর্যন্ত গমন করেন। কিন্তু কুরায়শদের সহিত যুদ্ধ সংঘটিত হয় নাই। রাসূলুল্লাহ (স) তথায় কিছু দিন অতিবাহিত করার পর মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন। যেহেতু বানু কায়নুকার যুদ্ধ ইহার পর সংঘটিত হয়, সেহেতু ইহার তারিখ ৩য় হিজরী নির্ধারিত করা যাইতে পারে।
মহানবী (স) কর্তৃক বানু কায়নুকা অভিযান পর্যালোচনা করিলে দেখা যায় যে, তিনি এই গোত্রের ইয়াহূদীদিগকে ইসলাম কবুল করার ও তাঁহার নবুওয়াতের স্বীকৃতি প্রদানের আহ্বান জানান। বিষয়টি তাহাদের ধর্মগ্রন্থ তাওরাতেও উল্লিখিত হইয়াছে। তাহারা মুসলমানদের পাশাপাশি মদীনায় অবস্থান করিত। তাহারা ছিল মদীনা সনদের আওতাভুক্ত গোত্রসমূহের অন্তর্গত। এতসত্ত্বেও তাহারা মহানবী (স)-এর আহ্বানের ঔদ্ধত্যপূর্ণ জওয়াব দেয়, নিজেদের বীরত্ব ও বাহাদুরি প্রকাশ করে এবং এই ক্ষেত্রে কোন প্রকার সমীহ ও সৌজন্য প্রকাশ করে নাই। ইহার মাধ্যমে বাহ্যত মনে হয়, তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাথে সংঘর্ষে জড়িত হওয়ার জন্য মানসিকভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছিল এবং এই ক্ষেত্রে তাহারা মিত্রশক্তি খাযরাজ গোত্রের সহযোপিতার উপর অধিক নির্ভর করিয়াছিল। নতুবা বানু কায়নুকার ন্যায় একটি ক্ষুদ্র গোত্র মুসলমানদের কুরায়শদের বিপক্ষে বিজয়ী ও মদীনার শাসনকার্য পরিচালনাকারী একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর বিরদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা করার সাহস দেখাইতে পারে না।
কেবল ইসলাম কবুল করিতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে রাসূলুল্লাহ (স) বানু কায়নুকাকে বহিষ্কার করিয়াছিলেন বলিয়া মনে করিবার সংগত কোন কারণ নাই। কেননা মদীনা সনদের ভিত্তিতে ইয়াহুদীগণকে মুসলিমদের পাশাপাশি মদীনায় শান্তিতে বসবাস করিবার অনুমতি প্রদান করা হইয়াছিল। আর এই ক্ষেত্রে তাহাদিগকে ইসলাম কবুল করিবার কোন শর্ত আরোপ করা হয় নাই, বরং মদীনা সনদে তাহাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হইয়াছিল। আমরা মনে করি, বদর যুদ্ধে কুরায়শদের পরাজয় বরণ করিবার পর মদীনার ইয়াহুদীদের মনোভাবের পরিবর্তন ঘটে। ইহার প্রকাশ ঘটে তাহাদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও আগ্রাসী জওয়াব প্রদানের মধ্য দিয়া। ইহার মাধ্যমে মদীনার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বিধিমালা লংঘিত হওয়ার আশংকা দেখা দেয়। সনদের শর্ত অনুযায়ী মহানবী (স) নিরংকুশ ক্ষমতা সংরক্ষণ করেন। তাহাদের এই চ্যালেঞ্জ প্রকারান্তরে মদীনা সনদের প্রতি অস্বীকৃতি জ্ঞাপন। মহানবী (স) উপলব্ধি করিয়াছিলেন যে, ইয়াহুদীদের সংগে মদীনায় একত্রে বসবাস করা সম্ভব নয়। তাহারা মদীনার অভ্যন্তরে বসবাস করিত বলিয়া তাহাদের এই মনোভাব যেন অন্যান্য গোত্রে সম্প্রসারিত হইতে না পারে সেইজন্য মহানবী (স) ইয়াহুদী বানু কায়নুকার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করিয়া তাহাদিগকে অবরোধ করেন এবং তাহাদিগকে মদীনা হইতে বহিষ্কার করেন। রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক গৃহীত এই পদক্ষেপের মাধ্যমে মদীনায় অন্যান্য ইয়াহুদী গোত্রের শক্তি দুর্বল হইয়া পড়ে এবং অন্যান্য অমুসলিম জনগোষ্ঠীও এখানে প্রকাশ্যে বিদ্রোহ করিবার সাহস প্রদর্শন করে নাই।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ 📄 গাযওয়া যী-আম্র

📄 গাযওয়া যী-আম্র


বদর ও উহুদ যুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নেতৃত্বাধীনে ইহাই সর্বাপেক্ষা বড় সামরিক অভিযান। এই সমরাভিযান তৃতীয় হিজরীর মুহররম মাসে অনুষ্ঠিত হয়। ইবন সা'দ বলেন, এই অভিযান মদীনায় হিজরতের পঁচিশ মাসের মাথায় অর্থাৎ তৃতীয় হিজরীর রবীউল আওয়াল মাসে অনুষ্ঠিত হয়। ইবন ইসহাকের মতে ইহা তৃতীয় হিজরীর সফর মাসে অনুষ্ঠিত হয়।
হাফিয ইব্‌ন কাছীর (র) ওয়াকিদীর উদ্ধৃতি উল্লেখ করিয়া বলেন, তৃতীয় হিজরীর ১৩ রবীউল আওয়াল বৃহস্পতিবার মহানবী (স) এই সমরাভিযানে রওয়ানা হন। এই বুদ্ধকে গাযওয়া নাঙ্গও বলা হয়। হাকিম এই যুদ্ধের নাম গাযওয়া আনমার (غزوة أغار) বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন।
ইব্‌ন হিশাম বলেন, দ্বিতীয় হিজরীর যুল-হিজ্জা মাসে সংঘটিত সাবীক নামক যুদ্ধাভিযান হইতে প্রত্যাবর্তনের পর ঐ মাসের অবশিষ্ট দিনগুলি রাসূলুল্লাহ (স) মদীনায় বা তাহার আশেপাশে অবস্থান করেন। ইহার পর গাতাফানের উদ্দেশে নাজাদ এলাকায় যুদ্ধে রওয়ানা হন। ইব্‌ন জারীর আত-তাবারী বলেন যে, ইহাই গাযওয়া যী আমর বা যু অ্যামরের যুদ্ধ নামে পরিচিত।
যুদ্ধাভিযানের কারণ : রাসুলুল্লাহ (স) গোপন সূত্রে জানিতে পারিলেন যে, বনী ছা'লাবা এবং বনী মুহারিব গোত্রদ্বয়ের এক বিরাট বাহিনী মুসলমানদিগকে পরাজিত ও নিঃশেষ করিবার দৃঢ় সংকল্পে যু-'আম্র নামক স্থানে একত্র হইয়াছে। দু'সুর ইবনুল-হারিছ আল- মুহারিবী এই বিশাল বাহিনীর নেতৃত্বে ছিল। খতীব বাগদাদীর বর্ণনা হইতে এই সেনাপতির নাম গ্‌রাছ (غورث), অন্যান্য ঐতিহাসিক ঐ ব্যক্তির নাম গ্‌রাক (غورك) বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। মুহারিব গোত্রের এই লোকটি অত্যন্ত সাহসী এবং বীর যোদ্ধা হিসাবে খ্যাতিমান ছিল।
রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের মুকাবিলায় যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করিবার জন্য সাহাবাগণকে আহ্বান জানাইলেন। সাহাবাগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করিলে মহানবী (স) অশ্বারোহী ও পদাতিক মিলিয়া মোট চার শত পঞ্চাশজন মুসলিম সৈন্যের এক বাহিনী এবং তৎসঙ্গে কিছু অশ্ব লইয়া গাতাফানের উদ্দেশে নাজদ ও নুখায়লের দিকে রওয়ানা হইলেন। মদীনায় উছমান ইব্‌ন আফফান (রা)-কে প্রতিনিধি হিসাবে রাখিয়া গেলেন।
রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবাগণকে লইয়া যাত্রা শুরু করিলেন। তিনি উহুদ ও মদীনার মধ্যবর্তী আল-মুনাক্কা নামক স্থানের উপর দিয়া নাজদের নিকটবর্তী 'যুল-কাসসা' নামক স্থানে পৌঁছেন। এই স্থানে আসিয়া ছা'লাবা গোত্রের জাব্বার নামক এক ব্যক্তিকে পাইয়া মুসলমানগণ তাহাকে গ্রেফতার করেন। অতঃপর তাহাকে জিজ্ঞাসা করেন, তুমি কোথায় যাইতেছ? সে বলিল, ইয়াছরিব। মুসলমানগণ আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, ইয়াছরিবের তোমার কি প্রয়োজন? সেই ব্যক্তি বলিল, আমি নিজেকে লুকাইয়া রাখিয়া পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করিতে চাই। তাহাকে প্রশ্ন করা হইল, তুমি কি কোন বাহিনীর সাথে আসিয়াছ কিংবা তোমার কওমের কোন সংবাদ বহন করিয়া আনিয়াছ? সে বলিল, না। তবে আমার নিকট সংবাদ পৌঁছে যে, দু'সুর ইব্‌দুল হারিছ মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য লোকদিগকে একত্র করিয়াছে। সাহাবীগণ তাহাকে রাসূলুল্লাহ্ (স)- এর সমীপে উপস্থিত করিলেন। মহানবী (স) তাহাকে ইসলাম কবুলের আহ্বান জানাইলে সে ইসলাম কবুল করিল। সে বলিল, হে নবী! শত্রুপক্ষ' কখনও আপনাদের মুকাবিলা করিবার সাহস পাইবে না। তাহারা যদি আপনাদের সমরাভিযানের সংবাদ জানিতে পারে তবে ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া পলায়ন পূর্বক পাহাড়ের চূড়ায় আশ্রয় গ্রহণ করিবে। আমি তাহাদের ঘাটির দিকে পথ প্রদর্শন করিতে আপনাদের সাথেই আছি। ইসলামের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান দানের জন্য মহানবী (স) তাহাকে হযরত বিলাল (রা)-এর সঙ্গী করিয়া দেন। তিনি মুসলিম সৈন্যবাহিনীকে শত্রুদের আবাসস্থল পর্যন্ত রাস্তা দেখাইয়া নিয়া যান।
এইদিকে শত্রুরা মুসলিম সৈন্যবাহিনীর আগমনের সংবাদ পাইয়া ছত্রভঙ্গ হইয়া যায় এবং আশেপাশের পাহাড়গুলিতে আত্মগোপন করে। রাসূলুল্লাহ (স) অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখিলেন এবং সৈন্যবাহিনীসহ শত্রুদের একত্র হইবার স্থান পর্যন্ত গমন করিলেন। ইহা ছিল মূলত একটা প্রস্রবণ যাহা যু-'আমর নামে পরিচিত। এইজন্যই এই অভিযানকে 'যু-'আমরের যুদ্ধ' নামে অভিহিত করা হয়। শত্রুপক্ষের কাহারও সাথেই মুসলমানদের সাক্ষাত হয় নাই। মহানবী (স) ঐ স্থানেই শিবির স্থাপন করিলেন। ঐ সময়ে প্রচুর বারি বর্ষিত হইতেছিল। রাসূলুল্লাহ (স) পায়খানা-পেশাব করিবার জন্য ছাউনী হইতে বাহিরে আসিলে বৃষ্টিতে তাঁহার কাপড় ভিজিয়া যায়। তিনি ভিজা কাপড় খুলিয়া শিবির হইতে নিচে আসিয়া একটি গাছের ডালে শুকাইতে দিলেন এবং নিজে ঐ গাছের নিচে শুইয়া বিশ্রাম করিতে করিতে ঘুমাইয়া পড়িলেন। প্রতিপক্ষ বেদুঈনরা পাহাড়ের চূড়া হইতে এই সকল ঘটনা প্রত্যক্ষ করিতেছিল।
এই দৃশ্য দেখিয়া বেদুঈনরা তাহাদের দলের সেই প্রখ্যাত যোদ্ধা ইন্ন হারিছ, মতান্তরে দু'সুর ইন্ন হারিছকে লক্ষ্য করিয়া বলিল, মুহাম্মাদ (স)-কে হত্যা করিবার ইহাই সুবর্ণ সুযোগ। সঙ্গীগণ হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া তিনি এখন একাকী নিদ্রামগ্ন। এই অপূর্ব সুযোগ হাতছাড়া করা মোটেই সমীচীন হইবে না। তখন সেই দু'সুর একটি তরবারি হাতে লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর শিয়রের পাশে দণ্ডায়মান হইয়া বলিতে লাগিল, হে মুহাম্মাদ! আজ তোমাকে আমার হাত হইতে কে রক্ষা করিবে? নবী করীম (স) অত্যন্ত দৃঢ়চিত্তে উত্তর দিলেন, আল্লাহ। আল্লাহ তা'আলার আদেশক্রমে জিবরাঈল (আ) অবতরণ করিয়া তাহার হৃদয়ে ভীতির সঞ্চার করিলেন। ফলে তাহার হাত হইতে তরবারি পড়িয়া গেল। রাসূলুল্লাহ (স) তরবারি উঠাইয়া নিয়া বলিলেন, এইবার তোমাকে কে রক্ষা করিবে? সে বলিল, কেহই রক্ষা করিতে পারিবে না। সেই সাথে আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই এবং মুহাম্মাদ (স) আল্লাহ্র রাসূল। আল্লাহ্র কসম! আপনার উপর কখনও কোন বাহিনী জয়লাভ করিতে সক্ষম হইবে না। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার তরবারি ফেরত দিলেন। তিনি তাহার সাথীদের কাছে পৌঁছিলে তাহারা বলিতে লাগিল, তোমার পতন হউক। কী হইয়াছে তোমার যে, এই ধরনের মহাসুযোগ পাইয়াও মুহাম্মাদকে হত্যা করিতে পারিলে না? তিনি উত্তরে বলিলেন, আমি তরবারি হাতে লইয়া যখন নবী (স)-এর মাথার পাশে দণ্ডায়মান হইলাম তখন দেখিতে পাইলাম, সাদা পোশাক পরিধানকারী দীর্ঘাকৃতির এক ব্যক্তি আসিয়া আমার বুক ও পিঠ চাপিয়া ধরিলেন। ফলে আমি ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া পড়িলাম। তরবারি আমার হাত হইতে পড়িয়া গেল। আমি চিনিতে পারিলাম যে, ইনি আল্লাহ্র ফেরেশতা। এই অবস্থায় আমি ক'লেমা পড়িয়া মহানবী (স)-এর হাতে ইসলাম কবুল করিয়াছি। আমি আল্লাহ্র শপথ করিয়া বলিতেছি, কোন বড় বাহিনীই মুসলমানদের উপর জয়লাভ করিতে পারিবে না। পরে তিনি স্বগোত্রীয় লোকদিগকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানাইতে লাগিলেন। ওয়াকিদী বলেন, এই ঘটনা উপলক্ষে আল্লাহ তা'আলা নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন:
يأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا نِعْمَتَ اللهِ عَلَيْكُمْ إِذْ هَمَّ قَوْمٌ أَنْ يَبْسُطُوا إِلَيْكُمْ أَيْدِيَهُمْ فَكَفَّ أَيْدِيَهُمْ عَنْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ.
“হে মুমিনগণ! তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর। যখন এক সম্প্রদায় তোমাদের দিকে তাহাদের হস্ত প্রসারিত করিতে সচেষ্ট হইয়াছিল, তখন তিনি তাহাদের হস্ত তোমাদের হইতে প্রতিহত করিয়া দিলেন। আল্লাহকে ভয় কর। আর মুমিনদের উচিত আল্লাহ্র উপর পূর্ণ ভরসা রাখা" (৫:১১)।
তাফসীরে ইব্‌ন কাছীরেও অত্র আয়াত নাযিলের প্রেক্ষাপট বর্ণনায় অনুরূপ ঘটনার উল্লেখ রহিয়াছে। ইমাম বায়হাকী (র) বলেন, হিজরতের ৪তম মাসে সংঘটিত যাতুর-রিকা' যুদ্ধেও অনুরূপ ঘটনার উল্লেখ রহিয়াছে। অতএব বলা যায় যে, সম্ভবত একই ঘটনা পৃথক পৃথকভাবে দুইবার সংঘটিত হইয়া থাকিবে।
বেদুঈনদের উপর প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত এবং মুসলমানদের শক্তি-সামর্থ্য সম্পর্কে তাহাদিগকে ওয়াকিফহাল করাইবার জন্য মহানবী (স) সাহাবাদের লইয়া তৃতীয় হিজরীর পূর্ণ সফর মাসটি সেখানে অতিবাহিত করেন, অতঃপর মদীনায় ফিরিয়া আসেন।
এই যুদ্ধাভিযানে প্রত্যক্ষ সশস্ত্র লড়াই হয় নাই বিধায় ইসলামের ইতিহাসে ইহা কম আলোচিত হইয়াছে। কিন্তু ইসলামের ভিত্তি মজবুতকরণ, প্রচার-প্রসার এবং মুসলমানদের শক্তি-সাহস সুদৃঢ় করিবার ক্ষেত্রে এই ধরনের খণ্ড খণ্ড অভিযানগুলি সক্রিয় ভূমিকা পালন করিয়াছে। বানু ছা'লাবা গোত্রের জাব্বার এবং আরব বেদুঈনদের প্রখ্যাত যোদ্ধা গুরাছ বা দু'সুর ইব্‌ন হারিছ এই যুদ্ধাভিযানে মহানবী (স)-এর হাতে ইসলাম কবুল করিয়াছিলেন যাহা প্রত্যক্ষভাবে মুসলমানদের বিজয় ও উত্তরোত্তর অগ্রগতির সাক্ষ্যই বহন করে। ইয়াহুদী ও বেদুঈন জাতিও ইসলামের শক্তি সম্পর্কে এই অভিযানে আরও নিশ্চিত ধারণা লাভ করে। তাহারা শত্রুতা পরিত্যাগ না করিলেও মুসলমানদেরকে তুচ্ছ- তাচ্ছিল্য করিবার সাহস হারাইয়া ফেলে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ 📄 গাযওয়া বুহ্বান

📄 গাযওয়া বুহ্বান


বুরান (بحران) শব্দটি দুইভাবে পঠিত হইয়া থাকে : (ক) বাহরান (بحران) অর্থাৎ প্রথম হরফে যবর এবং দ্বিতীয় হরফ সাকিন যোগে।
(খ) বুহরান (بحران) অর্থাৎ প্রথম বর্ণে পেশ এবং দ্বিতীয় বর্ণে সাকিন যোগে। ওয়াকিদী (র)-এর বর্ণনামতে বুরান শব্দটি মূলত ছিল নাজরান (نجران), কিন্তু হাদীছে গাযওয়া ‘বুরান’ (غزوة بحران) ব্যবহৃত হইয়াছে।
বুরান বা বাহ্বান হইল মদীনার ফুরু’ (الفرع)-এর পার্শ্ববর্তী একটি স্থানের নাম। ফুরু’ হইতে মদীনার দূরত্ব আট বুরুদ (برد) বা আট মাইল। অন্য বর্ণনামতে, হিজাযের ফুরু’ সীমান্তে অবস্থিত খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ একটি স্থানের নাম বুহরান। রাসূলুল্লাহ (স) গাতাফান যুদ্ধ হইতে প্রত্যাবর্তনের পর তৃতীয় হিজরীর রবীউল আওওয়াল মাস মদীনায় অতিবাহিত করেন। এমতাবস্থায় নবী করীম (স)-এর নিকট সংবাদ পৌঁছে যে, হিজাযের খনি সমৃদ্ধ ‘বুহরান’ নামক স্থানে বানু সুলায়ম মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য একত্র হইয়াছে এবং ব্যাপক সামরিক প্রস্তুতি গ্রহণ করিয়াছে। এই খবর শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) হিজরতের ২৭ মাসের মাথায় রবী’উল আখির, মতান্তরে জুমাদাল উলা মাসে তিন শত মুসলিম সৈন্যের এক বাহিনী লইয়া তাহাদিগকে প্রতিহত করিবার জন্য ‘বুরান’ নামক স্থানের উদ্দেশে যুদ্ধযাত্রা করেন। যেহেতু ‘বুহরান’ নামক স্থানে এই যুদ্ধাভিযান পরিচালিত হয় সেইজন্য এই যুদ্ধকে ‘গাযওয়া বুহরান’ বলা হইয়া থাকে। সুলায়ম গোত্র মুসলমানদের বিরুদ্ধে যেহেতু এই যুদ্ধের অবতারণা করিয়াছে, সেইজন্য কেহ কেহ এই যুদ্ধকে ‘গাষওয়া বানু সুলায়ম’ বলিয়াও অভিহিত করিয়াছেন। এই যুদ্ধাভিযানে যাত্রার প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহ (স) ‘আবদুল্লাহ ইব্‌ন উম্মে মাকতুম (রা)-এর উপর অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য মদীনার বিচারকার্য, সালাতের ইমামতী প্রভৃতি কর্মের দায়িত্ব অর্পণ করিয়া যান।
ওয়াকিদী বলেন, মা’মার ইবন রাশিদ ইমাম যুহরী (র) হইতে আমার নিকট হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন, বানু সুলায়মের মুকাবিলার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর তিন শত সৈন্যের বাহিনী বুরান পৌঁছিতে আর মাত্র এক দিনের পথ বাকী থাকিতে বানু সুলায়মের এক ব্যক্তির সহিত পথিমধ্যে তাঁহাদের সাক্ষাত হয়। মুসলমানগণ সুলায়ম গোত্র, তাহাদের রণপ্রস্তুতি এবং বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে লোকটিকে জিজ্ঞাসা করিলেন। লোকটি এই বলিয়া সংবাদ দিল যে, সুলায়ম গোত্রের সমবেত সৈন্যদল গতকালই বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়িয়াছে এবং তাহারা নিজ নিজ স্থলে ফিরিয়া গিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে বন্দী করিয়া রাখিতে নির্দেশ দিলেন। অতঃপর নবী করীম (স) সৈন্যবাহিনী লইয়া বুহুরান নামক স্থানে পৌঁছিলেন, কিন্তু তথায় বিপক্ষ দলের কাহাকেও দেখিতে পাইলেন না। রাসূলুল্লাহ (স) যুদ্ধ বিজয়ের নিদর্শনস্বরূপ ঐ স্থানে ১০ (দশ) দিন, মতান্তরে ১৬ জুমাদাল উলা পর্যন্ত অবস্থান করিয়া মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন। কোন কোন বর্ণনায়, মুসলিম সৈন্যবাহিনী রাবীউল-আখির ও জুমাদাল উলা এই দুই মাস তথায় অবস্থান করিয়াছিল বলিয়া উল্লেখ রহিয়াছে। এই অভিযানে মুসলিম সৈন্যবাহিনীকে কোন প্রকার যুদ্ধের সম্মুখীন হইতে হয় নাই। কাফির বাহিনী মুসলিম সৈন্যদের ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত ও আতংকিত হইয়া বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ফিরিয়া গিয়াছিল।
এই সমরাভিযানে প্রত্যক্ষ লড়াই সংঘটিত না হইলেও ইসলামের প্রচার-প্রসার ও কাফিরদের হতবিহ্বল করিবার ক্ষেত্রে ইহার ইতিবাচক ভূমিকা ছিল। যুদ্ধক্ষেত্র হইতে কাফিরদের পলায়ন মুসলমানদের শক্তি ও সাহস বৃদ্ধি করিয়াছিল, ইসলামের জয়যাত্রা ও উত্তরণের পথকে করিয়াছিল সুগম ও সুসংহত।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ 📄 গাযওয়া উহুদ

📄 গাযওয়া উহুদ


উহুদ (أحد) ('হামযা' ও 'হা' বর্ণে পেশযোগে গঠিত, প্রসিদ্ধ এক পাহাড়বিশেষ, মদীনা হইতে তিন/সাড়ে তিন মাইল উত্তরে ইহার অবস্থান। মসজিদে নববী হইতে পাঁচ কিলোমিটার উত্তরে দীর্ঘ এই পাহাড়টি শক্ত নুড়িযুক্ত মাটি দ্বারা আবৃত। ইহার উত্তর পার্শ্ব চওড়া পাথরবিশিষ্ট, যাহা দেখিতে অনেকটা উচ্চ দেয়ালের মত মনে হয়। লাল বেলে পাথর ও শক্ত পাথরের টুকরা পাহাড়টির প্রায় সর্বত্রই পরিদৃষ্ট হয়। ইহার পার্শ্বেই একটি ক্ষুদ্র পাহাড় আছে, যাহাকে জাবালুর রুমাত বা জাবালুল 'আয়নায়ন বলা হয়। উক্ত পাহাড়ের পূর্বে একটি প্রাচীন সেতুর ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। ইহাতে অনুমিত হয় যে, অতীতে কোন এক সময় এখানে বন্যা হইত। ফলে শহর হইতে উহুদের শহীদদের যিয়ারতের উদ্দেশে আগত মুসলিমগণ উক্ত সেতু ব্যতীত জলাশয় পার হইতে পারিতেন না।
হযরত হারুন (আ) তাঁহার সহোদর ভ্রাতা মূসা (আ)- এর সাথে হজ্জ বা 'উমরা পালনের উদ্দেশ্যে ভ্রমণকালে এখানে ইন্তিকাল করেন এবং এই পাহাড়ের পাদদেশেই তাঁহাকে দাফন করা হয়। হযরত মূসা (আ)- এর কবরও এই পাহাড়ে অবস্থিত বলিয়া উল্লেখ পাওয়া যায়।
এই পাহাড়ের মধ্য দিয়া যাতায়াতের কোন রাস্তা ছিল না। মাঝখানের দৈর্ঘ্য ছিল এক-দেড় ফার্লং (৮ ফার্লং সমান ১ মাইল)। ইহার অভ্যন্তরীণ মাঠ যেহেতু সর্বদিক দিয়াই নিরাপদ ও অনেকটা সুরক্ষিত তাই উহুদ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী এখানে শিবির স্থাপন করিয়াছিল। প্রাচীন কাল হইতেই মদীনাবাসীদের নিকট উহুদ পাহাড় ছিল অত্যন্ত প্রিয়। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, "ইহা (উহুদ) একটি পাহাড়, যাহা আমাদিগকে ভালবাসে এবং আমরাও ইহাকে ভালবাসি"।
এই পাহাড়কে উহুদ নামকরণের কারণ হইল, পার্শ্ববর্তী পাহাড়সমূহ হইতে ইহা স্বতন্ত্র একটি পাহাড়বিশেষ। মদীনা নগরী হইতে দৃষ্টি দিলে ইহাকে গাঢ় লাল বর্ণের বলিয়া মনে হয়। খুব বেশী উদ্ভিদ এই পাহাড়ে জন্মায় না। তবে বর্ষায় পর্বত গুহার গর্তসমূহে পানি জমিয়া যায় এবং বেশ কিছু দিন তাহা পানিবদ্ধ অবস্থায় থাকে। মহানবী (স) উহুদ যুদ্ধে আহত হইলে তাঁহার রক্তাক্ত ক্ষত স্থানসমূহ ধৌত করিবার জন্য হযরত আলী (রা) পাহাড়ের ঐ প্রাকৃতিক গর্তসমূহ হইতে স্বীয় ঢাল পূর্ণ করিয়া পানি আনিয়াছিলেন বলিয়া হাদীছে উল্লেখ পাওয়া যায়। এই ঐতিহাসিক পাহাড়ের পাদদেশে ইসলামের দ্বিতীয় বৃহৎ যুদ্ধ সংঘটিত হইয়াছিল বিধায় ইহাকে 'উহুদ যুদ্ধ' নামে অভিহিত করা হয়।
বদর যুদ্ধে মক্কার কুরায়শদের শোচনীয় পরাজয় হইয়াছিল, 'উহুদ' যুদ্ধের ইহাই অন্যতম কারণ। বদর প্রান্তরে সুসজ্জিত কুরায়শ বাহিনী চরমভাবে পরাজিত হওয়ায় এবং যুদ্ধে তাহাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের নিহত হওয়ায় মক্কায় কান্নার রোল পড়ে ও শোকের ছায়া নামিয়া আসে। ক্ষোভ, বিদ্বেষ ও প্রতিশোধের স্পৃহা তাহাদের মাঝে তীব্রভাবে জ্বলিয়া উঠে। আর আরবরা ছিল প্রতিশোধ পরায়ণ জাতি। প্রতিশোধ গ্রহণকে তাহারা তাহাদের অস্তিত্বের প্রশ্নের মত একটি অপরিহার্য কর্তব্য বলিয়া মনে করিত। তাহারা হযরত মুহাম্মাদ (স) ও মুসলমানদেরকে ধরাপৃষ্ঠ হইতে চিরতরে উৎখাত করিবার অশুভ পায়তারা ও সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। বদর যুদ্ধে সংখ্যালঘু মুসলিম বাহিনী যে অসাধারণ রণনৈপুণ্য ও বল-বীর্যের পরিচয় প্রদান করিয়াছিল কুরায়শ সৈন্যদের তাহা বিশেষভাবে স্মরণ ছিল। এই সকল দিকের প্রতি সার্বিক লক্ষ্য রাখিয়াই কুরায়শগণ যুদ্ধের উদ্যোগ আয়োজনে ব্রতী হয়।
কুরায়শ নেতা আবূ সুফয়ান বাণিজ্যিক বহরে থাকার কারণে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিতে পারে নাই। কুরায়শ বাহিনীর পরিচালনার দায়িত্ব এইবার তাহার উপরই ন্যস্ত হইল। সিরিয়া হইতে যে বাণিজ্য বহর লইয়া আবূ সুফয়ান আসিয়াছিল, তাহারা যখন দারুন-নাদ্‌ওয়ায় বৈঠকরত, এমন সময় কুরায়শদের মধ্য হইতে আল-আসওয়াদ ইব্‌দুল মুত্তালিব ইব্‌ন আসাদ, জুবায়র ইবন মুতইম, সাফওয়ান ইবন উমায়্যা, ইকরামা ইব্‌ন আবূ জাহল, হারিছ ইব্‌ন হিশাম, আবদুল্লাহ ইব্‌ন আবূ রাবী'আ প্রমুখ এবং বদর যুদ্ধে যাহাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা নিহত হইয়াছিল তাহাদিগকে সাথে লইয়া আবু সুফয়ান ও বাণিজ্য বহরে যাহাদের সম্পদের অংশ ছিল তাহাদেরকে লক্ষ্য করিয়া বলিতে লাগিল :
يا معشر قريش إن محمدا قدوتركم وقتل خياركم فاعينونا بهذا المال على حربه.
“হে কুরায়শ সম্প্রদায়! মুহাম্মাদ তোমাদিগকে পরাজিত করিয়াছে, তোমাদের নেতৃবর্গকে হত্যা করিয়াছে। অতএব তাহার বিরুদ্ধে যুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য এই মাল দিয়া আমাদেরকে সাহায্য কর"।
আবেদনটি ছিল অত্যন্ত সময় উপযোগী। উত্থাপন করিবার সাথে সাথেই উহা গৃহীত হইল। ফলে বাণিজ্য বহরের পঞ্চাশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা যুদ্ধের তহবিলে জমা দেওয়া হয়। তাহাদের ছিল আরও এক হাজার উট; ঐগুলির মূল্যও যুদ্ধের ব্যয় তহবিলে জমা করা হয়। অন্য বর্ণনায় তাৎক্ষণিকভাবেই আড়াই লক্ষ দিরহাম যুদ্ধ তহবিলে সংগৃহীত হয়। কুরায়শ বণিকগণ তাহাদের পূর্ণ মূলধন বা লভ্যাংশের সম্পূর্ণই যুদ্ধের ব্যয়খাতে প্রদান করে। ইবন ইসহাক বলেন, কোন কোন আলিম আমার নিকট বর্ণনা করিয়াছেন যে, কুরায়শদের সম্পর্কেই নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল হয়:
إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ لِيَصُدُّوا عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ فَسَيُنْفِقُونَهَا ثُمَّ تَكُونُ عَلَيْهِمْ حَسْرَةً ثُمَّ يُغْلَبُونَ وَالَّذِينَ كَفَرُوا إِلَى جَهَنَّمَ يُحْشَرُونَ.
"আল্লাহ্র পথ হইতে লোককে নিবৃত্ত করার জন্য কাফিরগণ তাহাদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে। তাহারা ধন-সম্পদ ব্যয় করিতেই থাকিবে, অতঃপর উহা তাহাদের মনস্তাপের কারণ হইবে, ইহার পর তাহারা পরাভূত হইবে এবং যাহারা কুফরী করে তাহাদেরকে জাহান্নামে একত্র করা হইবে" (৮৪ ৩৬)।
যুদ্ধের ব্যয়ভার নির্বাহের নিমিত্ত প্রয়োজনীয় অর্থ ও অস্ত্রসামগ্রী সংগ্রহের পর কুরায়শ নেতৃবৃন্দ জনসমর্থন ও জনশক্তি অর্জনের প্রতি মনোনিবেশ করিল। স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী তৈরী ছাড়াও তাহারা নিজেদের নকীব ও প্রতিনিধি বিভিন্ন গোত্রে প্রেরণ করিয়া তাহাদেরকে মদীনা আক্রমণ করিতে আহ্বান জানাইল। সৈন্যবাহিনী গঠন ও লোকদেরকে যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ করিতে চারটি ছোট দলও তাহারা বিভিন্ন গোত্রে প্রেরণ করিল। এই চারটি দলের নেতৃত্বে ছিল যথাক্রমে 'আমর ইবনুল 'আস, হুবায়রা ইব্‌ন আবূ ওয়াহব, ইবনু যিবআরা এবং আবূ উযযা আল- জুমাহী। আরববাসীদেরকে যুদ্ধ বা অনুরূপ কোন অভিযানে উদ্দীপিত করিবার প্রধানতম হাতিয়ার ছিল প্রাণস্পর্শী কবিতা।
কুরায়শদের মধ্যে আবূ 'উযযা আমর আল-জুমাহী ও মুস'আব নামে প্রসিদ্ধ দুইজন কবি ছিল। আবু 'উযযা বদরের যুদ্ধে বন্দী হইয়াছিল। সে ছিল বহু সন্তানের জনক ও দরিদ্র ব্যক্তি। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে দয়াপরবশ হইয়া বিনা মুক্তিপণে ছাড়িয়া দিয়াছিলেন। সাফওয়ান ইব্‌ন উমায়‍্যা তাহার কাছে গিয়া বলিল, হে আবূ 'উযযা! তুমি একজন নামকরা কবি। যুদ্ধে চল এবং কবিতার মাধ্যমে আমাদিগকে সহায়তা কর। সে বলিল, মুহাম্মাদ আমার উপর অনুগ্রহ করিয়াছেন। আমি প্রতিশ্রুতি দিয়াছি যে, তাহার বিরুদ্ধে আর কবিতা রচনা করিব না। আমি ভয় করিতেছি যে, দ্বিতীয়বার তাঁহার হাতে ধৃত হইলে আর মুক্তি পাইব না। সাফওয়ান তাহাকে বারবার বুঝাইতে লাগিল। বলিল, তুমি তো নিজের জীবন দিয়া আমাদের সাহায্য করিতে পার। আমি প্রতিশ্রুতি দিতেছি, যদি তুমি নিরাপদে যুদ্ধ হইতে ফিরিয়া আসিতে পার তবে সম্পদ দিয়া তোমাকে ধনী করিয়া দিব। আর যদি মারা যাও, তবে তোমার মেয়েদের আমাদের মেয়েদের সাথে লালন-পালনের দায়িত্বভার গ্রহণ করিব। কিন্তু ইহাতেও সে সম্মত না হইলে সাফওয়ান নিরাশ হইয়া তাহার নিকট হইতে ফিরিয়া আসিল।
পরদিন সাফওয়ান ও জুবায়র ইব্‌ন মুক্ত'ইম তাহার কাছে যাইয়া পূর্বের ন্যায় বুঝাইতে লাগিল। জুবায়র ইবন মুত'ইম বলিল, হে আবূ উযযা! আমি তোমার কাছে আসিয়াছি সহযোগিতার আশায়, তুমি তাহা অস্বীকার করিবে বা ফিরাইয়া দিবে তাহা ধারণা করি নাই। ইহাতে সে রাযী হইয়া আরবের বিভিন্ন গোত্রকে সংঘবদ্ধ করিবার জন্য বাহির হইয়া পড়িল। সে বানু কিনানাকে কবিতার মাধ্যমে যুদ্ধের প্রতি আহ্বান জানাইল:
أيها بني عبد مناة الرزام + أنتم حماة وأبــوكـم حـام لا تعدوني نصركم بعد العام + لا تسلموني لا يحل إسلام.
“হে অবিচল যোদ্ধা বানু আব্দ মানাত! তোমরা হইলে গোত্র মর্যাদা রক্ষাকারী, যেমন ছিল তোমাদের পূর্বপুরুষগণ (সুতরাং এহেন পরিস্থিতিতে আমাদের সাহায্য কর)। এই বৎসরের পর আমাদের সাহায্য করিবার প্রতিশ্রুতির কোন প্রয়োজন নাই। আমাদিগকে শত্রুদের হাতে ছাড়িয়া দিও না। কেননা এইরূপ করা আদৌ সমীচীন নয়"।
মুসাফি' ইব্‌ন আব্দ মানাফ বনূ মালিক ইব্‌ন কিনানার কাছে গিয়া তাহাদিগকেও রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিরুদ্ধে প্ররোচিত করিতে লাগিল। জুবায়র ইব্‌ন মুত'ইম তাহার হাবশী গোলাম ওয়াহ্শীকে বলিল, লোকদের সঙ্গে যুদ্ধে চল। যদি তুমি মুহাম্মাদের চাচা হামযাকে হত্যা করিতে পার তবে তুমি আযাদ।
মক্কার চারিদিকে প্রতিশোধ গ্রহণের তীব্র উত্তেজনা ছড়াইয়া পড়িল। অল্প কালের ব্যবধানে বিভিন্ন গোত্র হইতে বহু দুর্ধর্ষ আরব যোদ্ধা মক্কায় একত্র হইল। এইভাবে কুরায়শগণ আবু সুফয়ানের নেতৃত্বে তিন হাজার সৈন্যের এক বিরাট অমিততেজা বাহিনী গঠন করিল। তন্মধ্যে সাত শত ছিল লৌহ বর্মধারী, দুই শত ছিল অশ্বারোহী। ইন্ন হাজার 'আসকালানী ফাতহুল বারীতে অশ্বারোহী এক শত বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। এই যুদ্ধে তাহারা তিন হাজার উট সঙ্গে আনিয়াছিল। আবূ সুফয়ান ছিল যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক। অশ্বারোহী বাহিনীর দায়িত্ব ছিল খালিদ ইবনুল ওয়ালীদের উপর। তাহার সহযোগী ছিল 'ইকরামা ইব্‌ন আবূ জাহল। যুদ্ধের পতাকা ছিল বনী 'আবদুদ দার-এর হাতে।
নারী ছিল আরবদের যুদ্ধে উন্মাদনা ও উত্তেজনা সৃষ্টির প্রধান উপকরণ। যেই সকল যুদ্ধে নারীরা উপস্থিত থাকিত সেইগুলিতে আরব যোদ্ধারা জীবনপণ করিয়া লড়াই করিত। কেননা যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার সঙ্গে নারীদের কারণে লজ্জিত হওয়ার প্রশ্নও জড়িত থাকিত। তাই যুদ্ধে উৎসাহ-উদ্দীপনা প্রদানের জন্য তাহারা নারীদেরকেও সাথে লইল। সেনাপতি আবূ সুফয়ান স্ত্রী হিনদ বিন্ত 'উত্তাকে, 'ইকরামা ইন আবূ জাহল উম্মু হাকীম বিন্‌তুল হারিছকে, হারিছ ইব্‌ন হিশাম ফাতিমা বিন্‌ত ওয়ালীদকে, সাফওয়ান ইব্‌ন উমায়্যা বারযা বিন্‌ত মাসউদকে, ‘আম্‌র ইব্‌নুল ‘আস রীতাহ বিন্‌ত মুনাব্বিহকে, আবূ তালহা মুলাফা বিন্ত সা'দকে সাথে লইল। এইরূপ মোট পনেরঞ্জন কুরায়শ মহিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিয়াছিল বলিয়া জানা যায়। সম্মিলিত সশস্ত্র এই বিশাল বাহিনী শাওওয়াল মাসে মদীনা অভিমুখে যাত্রা করিল।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর পিতৃব্য ‘আব্বাস ইব্‌ন ‘আবদুল মুত্তালিব তখনও মক্কায়। তিনি ইসলাম গ্রহণ না করিলেও ভাতিজা মুহাম্মাদ (স)-এর শুভাকাংখী ছিলেন। তিনি কুরায়শদের যুদ্ধাভিযানের সংবাদ সীল-মহরকৃত পত্রে জনৈক গিফারী দূতের মাধ্যমে মুহাম্মাদ (স)-এর নিকট প্রেরণ করেন। দূতকে তিনি তিন দিনের মধ্যে মদীনায় পৌঁছিয়া মুহাম্মাদ (স)-কে যুদ্ধের সংবাদ জানাইতে নির্দেশ দেন। পত্রবাহক আদেশ মুতাবিক পাঁচ শত কিলোমিটার পথ মাত্র তিন দিনে অতিক্রম করিয়া মসজিদে কুবায় মহানবী (স)-কে পাইয়া পত্র হস্তান্তর করে। উবায়্যি ইব্‌ন কা’ব (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-কে পত্র পাঠ করিয়া শোনান। তিনি বিষয়টি গোপন রাখিতে উবায়্যি ইব্‌ন কা’ব (রা)-কে নির্দেশ দেন। অতঃপর নবী (স) সা’দ ইব্‌ন আবুর রাবী’-এর বাড়ীতে যাইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, ঘরে অন্য কেহ আছে কি না? সা’দ (রা) বলিলেন, ঘরে অন্য কেহ নাই। বলুন, হুযূর! আপনার জন্য কি করিতে পারি? রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে পিতৃব্য আব্বাসের পত্রের সংবাদ জানাইলেন। সা’দ (রা) সংবাদ শুনিয়া বলিলেন, আমার ধারণা ইহাতে কোন মঙ্গল নিহিত রহিয়াছে। অতঃপর সা’দ (রা)-কে বিষয়টি গোপনীয়তা রক্ষা করার পরামর্শ দিয়া রাসূলুল্লাহ (স) দ্রুত মদীনায় চলিয়া আসিলেন। মক্কার কুরায়শ বাহিনী মদীনার পথে যাত্রা করিয়া বার দিনের কঠিন ও বিপদ সংকুল পথ পাড়ি দিয়া জঙ্গলের নিকট ছাউনী স্থাপন করিল। যাত্রাকালে “আবওয়া” নামক স্থানে পৌঁছিলে আবূ সুফয়ানের স্ত্রী হিন্দ মুহাম্মাদ (স)-এর মাতা আমিনা-এর কবর খনন করিতে বলিলে বাহিনীর নেতৃবৃন্দ অশুভ পরিণতির আশংকায় তাহা প্রত্যাখ্যান করে। তাহারা মদীনার নিকটবর্তী আল-‘আকীক’ উপত্যকার সামান্য ডানদিকে উহুদ পাহাড় সংলগ্ন ‘আয়নায়ন’ নামক স্থানে শিবির স্থাপন করিল।
এইদিকে খুযা‘আ গোত্রের লোকেরা কুরায়শদের যুদ্ধাভিযানের সংবাদ মদীনায় প্রেরণ করিল। রাসূলুল্লাহ (স) আনাস ও মুনিস (রা) নামক দুইজন সাহাবীকে শত্রুবাহিনীর সংবাদ সংগ্রহের জন্য প্রেরণ করিলেন। তাহারা ফিরিয়া আসিয়া জানাইলেন যে, কুরায়শ সৈন্য মদীনার নিকটে আসিয়া পড়িয়াছে এবং তাহাদের অশ্বপাল মদীনার চারণভূমির তৃণলতা খাইয়া নিঃশেষ করিয়া দিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স)-এর আদেশক্রমে হুবাব ইব্‌দুল মুনযির (রা) কুরায়শদের সৈন্যসংখ্যা তাঁহাকে অবহিত করেন। আক্রমণের আশংকায় মদীনার চারিদিকে পাহারার ব্যবস্থা করা হয়। সা'দ ইবন 'উবাদা ও সা'দ ইব্‌ন মুআয (রা) হাতিয়ার লইয়া সারা রাত মসজিদে নববীর দরজায় পাহারারত থাকেন।
পরদিন শুক্রবার প্রত্যুষে রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীদেরকে লইয়া পরামর্শ করিতে বসিলেন। তিনি উপস্থিত সকলের সামনে তাঁহার দেখা এক স্বপ্নের কথা ব্যক্ত করিতে গিয়া বলিলেন, আমি স্বপ্নে একটি গাভী দেখিতে পাইলাম। আরও দেখিলাম, আমার তরবারির অগ্রভাগের অংশবিশেষ ভাঙ্গিয়া গিয়াছে এবং আমার হাত একটি মজবুত লৌহবর্মে ঢুকাইয়া নিয়াছি। ইব্‌ন হিশাম বলেন, কোন কোন আলিম আমার নিকট বর্ণনা করিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, দেখিলাম, আমার কিছু গাভী যবাই করা হইতেছে। তিনি আরও বলেন, গাভী দ্বারা উদ্দেশ্য আমার কিছু সাহাবী শহীদ হইবেন। আর তরবারি ভাঙ্গন এই ইঙ্গিত বহন করে যে, আমার বংশের এক ব্যক্তি শাহাদত লাভ করিবেন।
অতঃপর মহানবী (স) তাঁহার অভিমত সাহাবীদেরকে জানাইলেন যে, এইবার তাহারা মদীনার বাহিরে গিয়া যুদ্ধ করিবেন না। যদি মক্কার বাহিনী মদীনা আক্রমণ করে তবে তাহারাও পাল্টা আক্রমণ করিবেন। অধিকাংশ মুহাজির ও আনসার মহিলাদিগকে বহিঃদুর্গে পাঠাইয়া দেওয়ার এবং শহরে অবস্থান করিয়া শত্রু শক্তিকে প্রতিহত করার পক্ষে মত ব্যক্ত করিলেন। তাহাদের কেহ কেহ বলিলেন, আল্লাহ তা'আলা আমাদের সামনে কাংখিত দিনটি আনিয়া দিয়াছেন। অতঃপর আপনি আমাদিগকে লইয়া শত্রুদের দিকে বাহির হইয়া পড়ুন যাহাতে তাহারা আমাদিগকে কাপুরুষ ভাবিবার সুযোগ না পায়।
এই উৎসুক দলের অগ্রে ছিলেন হামযা (রা), সা'দ ইবন 'উবাদা, নু'মান ইবন মালিক ইব্‌ন ছা'লাবা (র) প্রমুখ সাহাবী। আবু সাঈদ খুদরী (র)- এর পিতা মালিক ইবন সিনান (রা) বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ্র কসম! আমরা বিজয় অথবা শাহাদাত এই দুইটি কল্যাণের যে কোন একটি অবশ্যই লাভ করিব। হামযা (রা) মদীনার বাহিরে যাইয়া শত্রুদের সাথে যুদ্ধের পূর্বে কোন খাদ্য গ্রহণ করিবেন না বলিয়া প্রতিজ্ঞা করিলেন। বর্ণিত আছে যে, হামযা (রা) রোযা অবস্থাতেই যুদ্ধ করিতে করিতে শাহাদাত লাভ করেন।
অধিকাংশ সাহাবীর প্রস্তাব যখন মদীনার বাহিরে গিয়া যুদ্ধ করিবার পক্ষে আসিল, তখন মহানবী (স) সংখ্যাগরিষ্ঠের মতকেই সমর্থন করিলেন। সকলের মাঝে তিনি ঘোষণা করিলেন, তোমরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও। বাদ জুমু'আ তিনি জিহাদ সম্বন্ধে সকলকে উপদেশ ও উৎসাহ দিলেন। রণক্ষেত্রে দৃঢ় থাকিবার আদেশ দিতে গিয়া বলিলেন, ধৈর্য ধারণ ও যথাযথ কর্তব্য পালন করিতে পারিলে তোমরা বিজয়ী হইবে। তিনি এই আয়াতটি পাঠ করিলেন : بَلَى إِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا وَيَأْتُوكُمْ مِّنْ فَوْرِهِمْ هُذَا يُمْدِدْكُمْ رَبُّكُمْ بِخَمْسَةِ أَلْفِ مِّنَ الْمَلَئِكَةِ مُسَوَّمِينَ.
"হাঁ, নিশ্চয়, যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ কর এবং সাবধান হইয়া চল তবে তাহারা দ্রুত গতিতে তোমাদের উপর আক্রমণ করিলে আল্লাহ পাঁচ হাজার চিহ্নিত ফেরেশতা দ্বারা তোমাদের সাহায্য করিবেন” (৩: ১২৫)।
ঐদিন মালিক ইবন 'আমর (রা) নামে একজন আনসার ইন্তিকাল করেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহার জানাযা শেষে সকলকে প্রস্তুত হইয়া আসিতে বলিলেন।
মহানবী (স) বাদ আসর অন্তঃপুরে প্রবেশ করিয়া রণসাজে সজ্জিত হইতে লাগিলেন। পর পর দুইটি বর্ম দ্বারা অঙ্গ আচ্ছাদিত করিলেন। এইদিকে এক হাজার মুজাহিদ রণসাজে সজ্জিত হইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। সা'দ ইবন মু'আয ও উসায়দ উন্ন হুদায়র (রা) মুসলিম সৈন্যদের বলিলেন, হে লোকসকল! তোমাদের নবী করীম (স)-এর ইচ্ছার বিরুদ্ধে মতামত ব্যক্ত করা ঠিক হয় নাই। সুতরাং ভাবিয়া দেখ, হুযূর (স) -এর নিকট সিদ্ধান্তের ভার ন্যস্ত করা যায় কিনা? সবাই কৃতকর্মের জন্য তখন অনুতপ্ত হইলেন। নবী করীম (স) অপূর্ব রণসাজে সজ্জিত হইয়া আবূ বাক্স ও উমার (রা)-কে সাথে লইয়া সাহাবীদের সম্মুখে উপস্থিত হইলে সাহাবীগণ আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমারা লজ্জিত, 'আপনার সিদ্ধান্তের বিপক্ষে মতামত ব্যক্ত করা আমাদের সমীচীন হয় নাই। আমাদের প্রস্তাব প্রত্যাহার করিয়া লইতেছি। আপনি যুদ্ধের পোশাক খুলিয়া ফেলুন। রাসূলুল্লাহ (স) উত্তরে বলিলেন:
ما ينبغي لنبي إذا لبس لأمته أن يضعها حتى يحكم الله بينه وبين عدوه.
"কোন নবীর পক্ষেই যুদ্ধের পোশাক পরিধান করিবার পর তাহা খুলিয়া ফেলা শোভনীয় নয় যতক্ষণ না আল্লাহ তা'আলা তাঁহার ও শত্রুদের মাঝে ফয়সালা করিয়া দেন”।
এই যুদ্ধ কোন তারিখে অনুষ্ঠিত হয় এই সম্পর্কে একাধিক বর্ণনা পাওয়া যায়। অধিকাংশের মতে তৃতীয় হিজরী শাওয়াল মাসের এগার তারিখের রাত অতিক্রান্ত হওয়ার পর এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সাফীউর রহমান মুবারকপুরীসহ কোন কোন আলিমের মতে শাওয়াল -এর সপ্তম রাত অতিক্রান্ত হওয়ার পরে, আবার কেহ কেহ ১৫ শাওয়ালে উহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হইয়াছে বলিয়া অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন। মহানবী (স) এই যুদ্ধে মুসলিম সৈন্যবাহিনীকে তিনটি দলে বিভক্ত করিলেন। (ক) মুহাজিরদের দল: এই দলের পতাকা দিলেন মুস'আব ইবন 'উমায়র আল-আবাদী (রা)-এর হাতে। মুস'আব শাহাদত লাভ করিলে আলী (রা)-কে উহা দিবেন। (খ) আনসারদের আওস গোত্রের পতাকা দিলেন উসায়দ ইবন হুদায়র (রা)-এর হাতে। (গ) আনসারদের খাযরাজ গোত্রের পতাকা দিলেন হুবাব ইবনুল মুনযির, মতান্তরে সা'দ ইবন উবাদা (রা)- এর হাতে।
আবদুল্লাহ ইব্‌ন উম্মে মাকতুম (রা) -এর কাছে মদীনার দায়িত্বভার অর্পণ করিয়া তিনি শত্রুর মোকাবিলায় বাহির হইলেন। মুসলিম মহিলাদিগকে সুরক্ষিত স্থানে প্রেরণ করিলেন। অবশ্য আইশা, উম্মু 'উমারা, সাফিয়্যা বিনত আবদুল মুত্তালিব, ফাতিমা, হামনা বিনত জাহ্শ (রা) প্রমুখ দশ- পনেরজন মুসলিম মহিলা আহত সৈন্যদের সেবা-শুশ্রূষা, তাহাদেরকে পানি পান করানো এবং মদীনা হইতে খাবার সংগ্রহ করার জন্য যুদ্ধে শরীক হইয়াছিলেন।
এই যুদ্ধে মুসলিম সৈন্যসংখ্যা ছিল এক হাজার। তন্মধ্যে একশত জন বর্মধারী, পঞ্চাশজন তীরন্দাজ, পঞ্চাশজন অশ্বারোহী, বাকী সবাই পদাতিক। মূসা ইব্‌ন 'উকবা (রা) বলিয়াছেন, এই যুদ্ধে মুসলমানদের সাথে কোন অশ্ব ছিল না। আল-ওয়াকিদীর মতে, ইহাতে দুইটি অশ্ব ছিল। একটি রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য, অপরটি আবু বুরদা (রা)- এর জন্য।
মদীনা সনদের শর্তানুযায়ী সেখানকার ইয়াহুদীরা বহিঃ আক্রমণ-এ মুসলমানদের সাহায্য করিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল। কিন্তু তাহাদের ধর্মীয় শাস্ত্রে "সান্ত” তথা শনিবারে যুদ্ধ অবৈধ এই অজুহাত তুলিয়া তাহারা সহযোগিতা করা হইতে বিরত থাকে। ইবন সা'দ-এর বর্ণনা অনুযায়ী, বনূ কায়নুকার আত্মীয় কিছু সংখ্যক ইয়াহুদী দুরভিসন্ধিমূলকভাবে মুসলমানদের সাহায্য করিতে আগাইয়া আসিলে সন্দেহপরায়ণ হইয়া নবী করীম (স) তাহাদিগকে সৈন্যভুক্ত করিতে অসম্মত হইলেন।
মুসলিম বাহিনী মদীনা হইতে বাহির হইয়া যখন আশ- শায়খান নামক স্থানে পৌঁছিল তখন সৈন্য পরীক্ষা করা হইল। অল্প বয়স্ক ও যুদ্ধের জন্য অনুপযুক্ত বলিয়া যাহাদিগকে ফেরত পাঠানো হইল তাহাদের মধ্যে ছিলেন আবদুল্লাহ ইবন উমার ইবনুল খাত্তাব, উসামা ইব্‌ন যায়দ, উসায়দ ইবন হুদায়র, যায়দ ইব্‌ন্ন ছাবিত, যায়দ ইব্‌ন আরকাম, আরাবায়া ইবন যুবায়র, আমর ইবন হাম্, আবূ সা'ঈদ আল- খুদরী, যায়দ ইব্‌ন হারিছা আল- আনসারী, সা'দ ইব্‌ন হুবাব, বারাআ ইন্ন হায্য প্রমুখ।
আল্লাহর পথে জীবন উৎসর্গকারীদের এমন বিস্ময়কর নমুনা ছিল যে, রাফে' ইন্ন খাদীজ (রা)-কে যখন বলা হইল, তুমি বয়সে ছোট, বাড়ী ফিরিয়া যাও, তখন তিনি পায়ের আংগুলের উপর ভর করিয়া বুক টান করিয়া দাঁড়াইলেন, যাহাতে উঁচু দেখা যায়। তাঁহার এই কৌশল ফলপ্রসূ হইল। তিনি সৈন্যবাহিনীতে থাকিবার অনুমতি লাভ করিলেন। অন্য বর্ণনায় উল্লেখ আছে, রাফে' (রা) অল্প বয়স হইতেই তীর নিক্ষেপে ছিলেন সিদ্ধহস্ত। রাসূলুল্লাহ (স) তাহা জানিতে পারিয়া তাঁহাকে যুদ্ধে অংশগ্রহণের অনুমতি দিয়াছিলেন। রাফে' (রা)- এর সমবয়সী ছিলেন সামুরা নামে অপর এক বালক। তিনি যুক্তি দাঁড় করাইলেন, আমি কুস্তিতে রাফেকে পরাজিত করিতে পারি। তাহাকে যদি যুদ্ধে নেওয়া হয় তবে আমাকেও নিতে হইবে। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের দুইজনকে কুস্তিতে লাগাইয়া দিলেন। সামুরা রাফে'কে কুফিতে পরাস্ত করিলে তাহাকেও সেনাদলে অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া হইল। মুসলিম বাহিনী যাত্রাকালে এই শায়খান নামক স্থানে সন্ধ্যা নামিয়া আসিল। তাহারা মাগরিব ও পরে ইশার সালাত আদায় করিলেন এবং এখানেই রাত্রি যাপন করিলেন।
রাসূলুল্লাহ (স) মুহাম্মাদ ইব্‌ন মাসলামা আল-আনসারীর নেতৃত্বে পঞ্চান্নজন সৈন্যের এক বাহিনীকে রাতের পাহারায় নিযুক্ত করেন। য়াকওয়ান ইব্‌ন আবদ কায়স বিশেষভাবে নবী করীম (স)-কে পাহারা দেন। নবী করীম (স) শেষরাতে আবার যাত্রা শুরু এবং ‘শাওত’ নামক স্থানে পৌঁছিয়া ফজরের সালাত আদায় করিলেন। মুসলিম বাহিনী শত্রু বাহিনীর নিকটবর্তী হইয়া গিয়াছিল। উভয় বাহিনী পরস্পরকে দেখিতেছিল। মুনাফিক নেতা আবদুল্লাহ ইবন উবায়্যি তখন তিন শত অনুগামীসহ যুদ্ধক্ষেত্র হইতে এই বলিয়া চলিয়া আসিল, তিনি তো আমার কথা শুনিলেন না, শুনিলেন উহাদের কথা। আল্লাহ তা'আলা আল-কুরআনুল কারীমে তাহাদের ঐ মুনাফিকীর কথা প্রকাশ করিয়াছেনこのভাঃেবঃ
وَمَا أَصَابَكُمْ يَوْمَ التَقَى الْجَمْعَانِ فَبِاذْنِ اللهِ وَلِيَعْلَمَ الْمُؤْمِنِينَ. وَلِيَعْلَمَ الَّذِينَ نَافَقُوا وَقِيلَ لَهُمْ تَعَالُوا قَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَوِ ادْفَعُوا قَالُوا لَوْ نَعْلَمُ قِتَالاً لا اتَّبَعْنُكُمْ هُمْ لِلْكُفْرِ يَوْمَئِذٍ أَقْرَبُ مِنْهُمْ لِلْإِيْمَانِ يَقُولُونَ بِأَفْوَاهِهِمْ مَا لَيْسَ فِي قُلُوبِهِمْ وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا يَكْتُمُونَ.
“যেদিন দুই দল পরস্পরের সম্মুখীন হইয়াছিল সেদিন তোমাদের উপর যে বিপর্যয় ঘটিয়াছিল তাহা আল্লাহ্ হুকুমে। ইহা মুমিনদিগকে জানিবার জন্য এবং মুনাফিকদিগকে জানিবার জন্য এবং তাহাদিগকে বলা হইয়াছিল, আইস! তোমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ কর অথবা প্রতিরোধ কর। তাহারা বলিয়াছিল, আমরা যদি যুদ্ধ জানিতাম তবে নিশ্চিতভাবে তোমাদের অনুসরণ করিতাম। সেদিন তাহারা ঈমান অপেক্ষা কুফরীর নিকটতর ছিল। যাহা তাহাদের অন্তরে নাই তাহারা তাহা মুখে বলে। তাহারা যাহা গোপন রাখে আল্লাহ তাহা বিশেষভাবে অবহিত" (৩: ১৬৬-৭)।
মুনাফিকদের চলিয়া যাওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত রহিলেন সাত শত জন, তাঁহাদের মধ্য হইতে ১৫জন তরুণও বাদ পড়িল। মাত্র ১০০ জন বর্ম পরিহিত এবং গোটা বাহিনীতে কেবল দুই জন অশ্বারোহী ছিলেন, একজন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স) এবং অপরজন হযরত আবূ বুরদা ইব্‌ন নায়ার হারিছী (রা)।
মুনাফিকদের কাটিয়া পড়ায় খায়রাজ গোত্রের বানূ সালামা শাখার মুসলিম যোদ্ধাগণ এবং আওস গোত্রের বানু হারিছা শাখার যোদ্ধাগণ প্রভাবান্বিত হওয়ার উপক্রম হইয়াছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আল্লাহই তাহাদিগকে রক্ষা করেন।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর সৈন্যবিন্যাস
উহুদের ময়দানে মুসলিম বাহিনী উপস্থিত হওয়ার পূর্বে শায়খায়নে থাকিতেই সূর্য অস্ত গেল। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশে হযরত বিলাল (রা) আযান দিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইমামতিতে সালাত সম্পন্ন হইল। মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) সারা রাত প্রহরায় নিযুক্ত রহিলেন। শেষ রাত্রিতে আবার সৈন্যবাহিনী রওয়ানা হইল। উহুদের নিকটবর্তী হইলে ফজরের ওয়াক্ত হইল। সালাতশেষে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার বাহিনীকে এমনভাবে বিন্যাস করিলেন যে, উহুদ পাহাড় মুসলিম বাহিনীর পশ্চাতে এবং মদীনা শহর তাহাদের সম্মুখে রহিল। আবদুল্লাহ ইবনু যুবায়র (রা)-এর নেতৃত্বে পঞ্চাশজন তীরন্দাযকে তিনি উহুদ পাহাড়ের সম্মুখস্থ আয়নায়ন পাহাড়ের শীর্ষদেশে এই উদ্দেশ্যে মোতায়েন করিলেন, যাহাতে মুশরিক বাহিনীর সম্ভাব্য পশ্চাত দিকের আক্রমণ হইতে মুসলিম বাহিনী নিরাপদ থাকিতে পারে। তিনি তাহাদিগকে তাগিদ দিলেন যেন মুসলিম বাহিনীর চরম বিজয় বা চরম পরাজয়েও তাহারা স্থান ত্যাগ না করেন। এই ব্যাপারে তিনি জোর তাগিদ দিয়া এই পর্যন্ত বলিয়াছিলেনঃ إِنْ رَأَيْتُمُونَا تَخْطَفُنَا الطَّيْرُ فَلَا تَبْرَحُوا مَكَانَكُمْ هٰذَا وَإِنْ رَأَيْتُمُونَا هَزَمْنَا الْقَوْمَ وَأَوْطَأْنَاهُمْ فَلَا تَبْرَحُوا مَكَانَكُمْ.
"যদি তোমরা দেখিতে পাও যে, পাখী আমাদিগকে ছোঁ মারিয়া লইয়া যাইতেছে তাহা হইলেও তোমরা স্থান ত্যাগ করিবে না। যদি দেখিতে পাও যে, আমরা তাহাদিগকে পরাজিত ও দলিত-মথিত করিয়া ফেলিতেছে তবুও তোমরা স্থান ত্যাগ করিবে না"।
যুদ্ধের পতাকা মুস'আব ইবন উমায়র (রা)-কে অর্পণ করা হয়। যুবায়র ইব্‌দুল আওয়াম (রা) দক্ষিণ বাহিনীর এবং মুনযির ইবন উমার (রা) বাম বাহিনীর দায়িত্বে নিযুক্ত হন। নবী করীম (স)-এর তরবারি লাভ করিয়া আবূ দুজানা (রা) তাহার হক আদায় করেন। যুদ্ধের শুরুতেই মুশরিকদের পতাকাবাহী তালহা ইব্‌ন উছমান এবং তাহাদের অপর বীরপুরুষ সাবা ইব্‌ন আবদুল উয্যার চ্যালেঞ্জের জবাবে যুদ্ধে অবতীর্ণ হইয়া হযরত আলী (রা) ও হযরত হামযা (রা) তাহাদের উভয়কে হত্যা করিয়া তাঁহাদের বীরত্ব প্রদর্শন করেন। মুসআব ইবন উমায়র, আবু দুজানা, আবূ তালহা, সা'দ ইব্‌ন আবী ওয়াক্কাস (রা) প্রমুখ সাহবীও অপূর্ব বীরত্ব প্রদর্শন করেন।
হযরত হামযা ও মুস'আব ইবন উমায়র (রা) যুদ্ধের প্রথম পর্যায়েই বীরত্বের সহিত লড়াই করিয়া শাহাদাত বরণ করিলেও যুদ্ধের ফলাফল ছিল মুসলমানদের অনুকূলে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَلَقَدْ صَدَقَكُمُ اللَّهُ وَعْدَهُ إِذْ تَحُسُّونَهُمْ بِإِذْنِهِ.
"আল্লাহ তোমাদের সহিত কৃত তাঁহার অঙ্গীকার পূরণ করিলেন যখন তোমরা তাঁহার নির্দেশে মুশরিকদিগকে হত্যা করিতেছিলে" (৩: ১৫২)।
অবস্থা এমন দাঁড়াইল যে, কাফির বাহিনী উর্ধশ্বাসে পলায়ন করিতেছে এবং মুসলিম বাহিনীর এখন গনীমত লাভের পালা। তখন পাহাড় শীর্ষে প্রহরায় নিযুক্ত 'আবদুল্লাহ ইবুযন যুবায়রের নেতৃত্বাধীন সেই পঞ্চাশজনের বাহিনীটি তাহাদের নেতার বারবার বারণ করা সত্ত্বেও গনীমত লাভের উদ্দেশ্যে স্থান ত্যাগ করিল।
মুহূর্তের মধ্যে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়া গেল। কুরায়শদের ডান বাহিনীর সুচতুর ও সুযোগ সন্ধানী সেনাপতি খালিদ ইব্‌দুল ওয়ালীদ সুযোগের সদ্ব্যবহার করিলেন। তিনি 'আয়নায়ন পাহাড়ের পশ্চাৎদিক হইতে ঘুরিয়া আসিয়া পিছন দিক হইতে মুসলিম বাহিনীর উপর আক্রমণ করেন। পরাজিতপ্রায় কাফির বাহিনী আবার রুখিয়া দাঁড়াইল। সম্মুখ ঐ পশ্চাৎ উভয় দিক হইতে আক্রমণ করিয়া তাহারা মুসলিম বাহিনীকে তাহাদের পূর্ণ অবস্থানস্থল হইতে সরাইয়া দিল। দেখিতে দেখিতে মুসলিম বিজয় পরাজয়ের রূপ পরিগ্রহ করিল। মুসলমানরা এলোমেলোভাবে লড়িতে লড়িতে শহীদ হইতে লাগিলেন, শত্রু-মিত্র কিছুই চিহ্নিত করিতে পারিতেছিলেন না। হুযায়ফা (রা)-এর পিতা বৃদ্ধ ইয়ামান হুযায়ফার মুখে তাঁহার পিতৃপরিচয় ব্যক্ত করা সত্ত্বেও মুসলমানদের হাতেই নিহত হইলেন।
মুসলমান যোদ্ধারা নবী করীম (স) হইতে বিচ্ছিন্ন হইতেই তাহাদের মনোবল ভাঙ্গিয়া পড়িল। নবী করীম (স) নিহত হইয়াছেন বলিয়া গুজব ছড়াইয়া পড়িল। অনেকে যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করিলেন। অনেকে যুদ্ধে ক্ষান্ত দিলেন। মহানবীর অনুপস্থিতিতে জীবন রক্ষাই অনেকে নিরর্থক মনে করিলেন। এই গুজবের কারণেই মুসলিম যোদ্ধাদের কিছু সংখ্যক রণক্ষেত্র ত্যাগ করিয়াছিলেন।
রাসূলুল্লাহ (স) যে নিহত হন নাই, বাঁচিয়া আছেন, তাহা সর্বপ্রথম কা'ব ইবন মালিক (রা)-এর দৃষ্টিতে ধরা পড়ে। তিনি এই সুসংবাদ উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করিতে থাকেন। মুশরিকরা তাহা শুনিলে ক্ষতির কারণ হইতে পারে, এই আশঙ্কায় নবী করীম (স) তাঁহাকে কণ্ঠস্বর নিচু করিতে বলেন।
সাতজন আনসারসহ নয়জন সাহাবী রাসূলুল্লাহ (স)-কে ঘিরিয়া দাঁড়াইলেন। মুশরিকরা তখন মরিয়া হইয়া তাহার উপর আক্রমণ চালাইতেছিল। তাহাদের প্রবল আক্রমণে একে একে সাতজন আনসারই শহীদ হইলেন। আবূ তাঁল্হা যুদ্ধ করিতে করিতে একটি তীরের আঘাতে তাঁহার হাতও অবশ হইয়া গেল। সা'দ ইব্‌ন আবূ ওয়াক্কাস (রা) তীর নিক্ষেপের মাধ্যমে বীরত্বের সহিত শত্রুদিগকে প্রতিহত করিতে লাগিলেন। কিন্তু ততক্ষণে নবী করীম (স) আঘাতে আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত। তাঁহার পবিত্র দাঁত শহীদ হইল। তাঁহার দুই হাঁটু ও মুখমণ্ডলে আঘাত লাগিয়া রক্তাক্ত হইল। ইব্‌ন কামিয়া নামক দুর্বৃত্তের প্রস্তরাঘাতে তিনি কাৎ হইয়া আবূ আমের ফাসিক কর্তৃক খননকৃত গর্তে পড়িয়া সংজ্ঞাহীন হইয়া পড়িলেন। হযরত আলী ও তালহা (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-কে গর্ত হইতে উঠাইলেন। ইবন কামিয়ার তলোয়ারের আঘাতে শিরস্ত্রাণের দুইটি কড়া তাঁহার কপালের দুই পার্শ্বে বিদ্ধ হইয়া কপালের গভীরে ঢুকিয়া গিয়াছিল। আবু উবায়দা ইবনুল জারাহ (রা) দাঁত দ্বারা উহা সজোরে টান দিয়া খুলিলেন বটে, কিন্তু তাহার নিজের দুইটি দাঁত তাহাতে উপড়াইয়া গেল।
মুসলমানরা মহানবী (স)-এর চতুষ্পার্শ্বে জমায়েত হইয়া পুনরায় যুদ্ধ শুরু করিতেই কাফির বাহিনী আর মাঠে থাকা সমীচীন মনে করিল না। ৭০ জন মুসলমান বীর ইতোমধ্যে শাহাদাত লাভ করিয়াছেন, ইহাতে উল্লসিত হইয়া তাহারা রণক্ষেত্র পরিত্যাগ করিল। আবূ সুফ্যানের ধারণা ছিল, রাসূলুল্লাহ (স), আবূ বাক্স ও উমার সকলেই শহীদ হইয়াছেন। সে চীৎকার করিয়া প্রত্যেকের নাম ধরিয়া তাহাদিগকে আহ্বান করিয়া জবাব পাইতেছিল না। অবশেষে হযরত উমার (রা) জবাব দিয়া তাহার ভুল ভাঙ্গাইলেন। সে যাইতে যাইতে বলিল, ইহা বদরের প্রতিশোধ, আগামী বৎসর বদরে আবার দেখা হইবে। এই যুদ্ধে তাহাদের বাইশজন নিহত হয়।
এই যুদ্ধে প্রকৃত মুসলমান ও মুনাফিকদের স্বরূপ ব্যক্ত হইয়া পড়ে। নেতৃ-আদেশ লঙ্ঘন যে বিজয়কে পরাজয়ে রূপান্তরিত করিয়া সমূহ বিপদের কারণ হইতে পারে, সেই শিক্ষাটিই মুসলিম উম্মাহ এই যুদ্ধ হইতে লাভ করে। যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থান গ্রহণ ও নির্দেশ দানে যে মহানবী (স) কত বিচক্ষণ ও দূরদর্শী ছিলেন, তাহাও এই যুদ্ধের ব্যূহ রচনা ও নির্দেশ দান হইতে জানা যায়।

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية