📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 গাযওয়া আস-সাবীক

📄 গাযওয়া আস-সাবীক


নামকরণ: সাবীক অর্থ ছাতু। আবূ সুফয়ান ও তাহার অনুচরগণ যে সকল রসদপত্র সঙ্গে লইয়া আসিয়াছিল তাহার অধিকাংশই ছিল ছাতু। রাসূলুল্লাহ (স) ও মুজাহিদদের আগমনবার্তা শ্রবণে দ্রুত পলায়ন করার সুবিধার্থে বোঝা হাল্কা করা এবং নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তাহারা তাহাদের ছাতুর বস্তা ফেলিয়া যায়। মুসলমানরা শত্রুদিগকে না পাইয়া ঐ ছাতু নিজেদের অধিকারে আনেন। এই কারণেই এই যুদ্ধ ইতিহাসে গাযওয়া সাবীক বা ছাতু যুদ্ধ নামে অভিহিত।
কাল : বদর যুদ্ধের দুই মাস পর হিজরী দ্বিতীয় বর্ষের যিলহজ্জ, মতান্তরে যিলকা'দ মাসের পাঁচ তারিখ রবিবার এই অভিযান পরিচালিত হয়। কাহারো মতে এই যুদ্ধ তৃতীয় হিজরীতে সংঘটিত হইয়াছিল।
বদর যুদ্ধের পর মুসলমানগণ তাহাদের শক্তিকে আরও কিছুটা সুসংহত করার সুযোগ পায়। তাহারা এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করেন, কিন্তু এই অবস্থা বেশী দিন স্থায়ী হয় নাই। বদর যুদ্ধে শোচনীয় পরাজয়ের পর আবূ সুফয়ান মুসলমানদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য একের পর এক পরিকল্পনা করিতে থাকে। মক্কায় আরবদের মধ্যে সে এই প্রচারণা করিতেছিল যে, কুরায়শগণ সারা আরবদেশে এখন অপ্রতিদ্বন্দী শক্তি। মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাহারা এখন যে কোন যুদ্ধে জয়ী হইতে সক্ষম।
এমতাবস্থায় একদা আবূ সুফয়ানের স্ত্রী হিন্দ বিন্তে ‘উতবা বদর যুদ্ধে স্বীয় পিতা ও ভ্রাতার মৃত্যুতে শোকাকুল হইয়া আবু সুফয়ানের নিকট গিয়া হযরত হামযা ও হযরত আলী (রা)-কে হত্যা করার জন্য প্ররোচিত করিতে লাগিল। তখন আবু সুফয়ান কঠোর প্রতিজ্ঞা করিল যে, বদর যুদ্ধের প্রতিশোধ গ্রহণ না করা পর্যন্ত সে স্ত্রী স্পর্শ ও খোশবু ব্যবহার করিবে না। আবৃ সুফয়ান এই বলিয়া মানত করিল যে, মুহাম্মাদ (স)-এর সহিত যুদ্ধ না করা পর্যন্ত সে নাপাকির গোসলে মাথায় পানি ব্যবহার করিবে না।
মক্কা হইতে মদীনা অভিমুখে যাত্রা করার পূর্বে আবূ সুফ্যান কুরায়শদের উত্তেজিত করার জন্য কিছু কবিতা আবৃত্তি করিয়াছিল :
(۱) كروا على يثرب وجمعهم - فإن ما جمعوا لكم نفل (۲) إن يك يوم القليب كان لهم - فان ما بعده لكم دول (۳) اليت لا اقرب النساء ولا - يمس رأسي وجلدى المسل (٤) حتى تبيروا قبائل الأوس وال - خزرج ان الفؤاد يشتعل.
১। মদীনায় উহাদের (শত্রুদের) আক্রমণ কর, উহারা যে সম্পদ লইয়া গিয়াছে তাহা তোমাদের প্রাপ্য।
২। বদরের যুদ্ধে যদিও তাহাদের জয় হইয়াছে, ভবিষ্যতে তোমাদের সকল সম্পদ ফিরিয়া আসিবে।
৩। প্রতিজ্ঞা করিয়াছি যে, স্ত্রী সহবাস করিব না এবং গোসল করিব না।
৪। যতক্ষণ পর্যন্ত আওস এবং খাযরাজ তোমাদের হাতে ধ্বংস না হয়, প্রতিশোধের জন্য আমার প্রাণ জ্বলে।
অতএব সে তাহার শপথ পূর্ণ করার উদ্দেশ্যে অদম্য শোণিত পিপাসা লইয়া কুরায়শদের দুই শত অশ্বারোহী সৈন্য লইয়া মদীনা আক্রমণের উদ্দেশ্যে বাহির হইল। তাহারা নজদের পথ ধরিয়া একটি নহরের উপরি অংশে ছাবীর পাহাড়ের পাদদেশে শিবির স্থাপন করিল। আবূ সুফয়ান কুরায়শদের অশ্বারোহী দলকে সেখানে রাখিয়া গভীর রজনীতে বানু নাযীরের নিকট পৌছিল এবং হুয়ায়্যি ইব্‌ন আখতাবের ঘরে আসিয়া দরজায় আঘাত করিল। কিন্তু সে ভয় পাইয়া দরজা খুলিতে অস্বীকার করিল। তখন আবূ সুফ্যান সেখান হইতে ফিরিয়া সাল্লাম ইব্‌ন মিশকামের বাড়ী পৌছিল। সে ঐ সময় বানু নযীরের নেতা ও সঞ্চয় তহবীলের সংরক্ষক ছিল। আবূ সুফ্যান নিকটে আসিয়া প্রবেশের অনুমতি চাহিবা মাত্রই সে অনুমতি দিল এবং যত্নের সহিত আপ্যায়ন করিল আর মুসলমান ও মদীনার গোপন তথ্যাদি জানাইয়া দিল। তারপর আবূ সুফ্যান রাতের শেষাংশে সঙ্গীদের কাছে প্রত্যাবর্তন করিয়া কুরায়শদের কতক ব্যক্তিকে মদীনায় পাঠাইয়া দিল। তাহারা মদীনার সীমান্তে উরায়েয নামক স্থানে পৌছিয়া সেখানকার দুইটি বাড়ী এবং একটি খেজুর বাগানে আগুন জ্বালাইয়া দেয়। সেখানে তাহাদের সঙ্গে দুইজন মুসলমানের সাক্ষাত হয়। তাহাদের একজন ছিলেন আনসারী যাহার নাম সা'দ ইব্‌ন আমর। কাহারো কাহারো মতে আনসারীর নাম ছিল মা'বাদ ইব্‌ন আমর আর অন্যজন ছিল তাহারই মিত্র। কুরায়শরা তাহাদের উভয়কে হত্যা করিল।
এই ঘটনায় আবূ সুফ্যান ইহা ভাবিয়া আত্মতৃপ্তি লাভ করিল যে, সে বদরের যুদ্ধে নিহতদের প্রতিশোধ নেওয়ার যে শপথ করিয়াছিল তাহা বাস্তবায়িত হইয়াছে। কিন্তু সেই সঙ্গে তাহার মনে এই আশংকাও ছিল যে, মুসলমানরা তাহার পিছু ধাওয়া করিতে পারেন।
এদিকে এই সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাসূলুল্লাহ্ (স) দুই শত আনসার ও মুহাজিরের একটি বাহিনী লইয়া রওয়ানা হইলেন। মদীনার শাসনভার বাশীর ইব্‌ন আবদুল মুনযির ওরফে আবূ লুবাবা (রা)-এর উপর ন্যস্ত করিলেন।
মুহাম্মাদ (স)-এর অভিযানের কথা জানিতে পারিয়া শত্রুরা ভয়ে কম্পিত হইয়া তৎক্ষণাৎ পৃষ্ঠ প্রদর্শন পূর্বক পলায়ন করিল। রসদ হিসাবে তাহাদের সঙ্গে বহু ছাতুর বস্তা ছিল, দ্রুত পালাইবার উদ্দেশ্যে সেগুলি ফেলিয়া যায়।
মহানবী (স) "কারকারাতুল কুদর" নামক স্থান পর্যন্ত আসিয়া দেখিতে পাইলেন যে, শত্রুরা নাগালের বাহিরে চলিয়া গিয়াছে। সুতরাং তিনি মুজাহিদ বাহিনী লইয়া মদীনায় ফিরিয়া আসিলেন।
আবূ সুফ্যানের এই ব্যর্থ অভিযান এবং পালাইয়া যাওয়ার খবর আরবে বিভিন্ন এলাকায় ছড়াইয়া পড়ে। কিন্তু মদীনা হইতে দূরে বসবাসকারী আরব গোত্রগুলির মধ্যে এসকল ঘটনার তেমন কোন প্রতিক্রিয়া হয় নাই। তাহারা মহানবী (স) ও তাঁহার অনুসারীদের এই সকল তৎপরতার প্রতি খুব একটা গুরুত্ব প্রদান করিত না।
এই সময় আবূ সুফ্যানের প্ররোচনায় বানু গাতাফান ও বানূ সুলায়ম গোত্রের ইয়াহুদীগণ রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর বিপক্ষে শত্রুতামূলক আচরণ আরম্ভ করে।
মুসলমানদিগকে সঙ্গে লইয়া মদীনায় ফিরিয়া আসার পর রাসূলুল্লাহ (স)-কে সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করিলেন, ইয়া রসূলাল্লাহ! আপনি কি মনে করেন, এই অভিযানটি জিহাদ হিসাবে গণ্য হইবে? তিনি জবাব দিলেন, হাঁ।
মক্কায় ফিরিয়া যাওয়ার পর আবূ সুফ্যান সাল্লাম ইব্‌ন মিশকামের অতিথিপরায়ণতা সম্পর্কে বলে:
(۱) وإني تخيرت المدينة واحدا - لحلف فلم اندم ولم أتلوم (۲) سقانی فروانی کميتا مدامت - على عجل منى سلام بن مشکم.
(১) “আমি মদীনায় মিত্রতার জন্য এক ব্যক্তিকে মনোনীত করিয়াছি, ইহাতে আমি লজ্জিত ও নিন্দিত হই নাই"। (২) "সাল্লাম ইব্‌ন মিশকাম আমাকে লাল ও কাল মদ পান করাইয়াছে অথচ তখন আমার তাড়াহুড়া ছিল"।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 গাযওয়া বানু কায়নুকা

📄 গাযওয়া বানু কায়নুকা


বানু কায়নুকা' (بنو قينقاع) ইয়াছরিব-এর একটি ইয়াহুদী গোত্রের নাম। কায়নুকা' শব্দটি আরবী নামের সহিত সংগতিপূর্ণ নয়, বরং তাহা আরবী শব্দ গঠনরূপ হইতে কিছুটা ব্যতিক্রম বলিয়া প্রতীয়মান হয়। হিব্রু ভাষার সহিতও ইহার সাদৃশ্য নাই। যদিও বানু কায়নুকা' ছিল হিব্রু বংশোদ্ভূত। এই গোত্রের নামে মদীনায় একটি বাজার ছিল যাহা বানু কায়নুকা' বাজার (سوق بنی قینقاع) নামে পরিচিত। তাহারা ছিল মদীনার খাযরাজ গোত্রের মাওলা (আশ্রিত) এবং উবাদা ইন্সুস সামিত ও আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন উবায়্যি ইব্‌ন সালূল-এর হালীফ (মিত্র)।
আরবের ইয়াহুদীদের কোন নির্ভরযোগ্য ইতিহাস নাই। তাহাদের কোন গ্রন্থ কিংবা শিলালিপিও পাওয়া যায় না, যাহার উপর ভিত্তি করিয়া তাহাদের অতীত ইতিহাস সম্পর্কে আলোকপাত করা সম্ভব। হিজাযের বাহিরের কোন ইয়াহুদী ইতিহাসবিদ, পণ্ডিত কিংবা গ্রন্থ প্রণেতা আরবের ইয়াহুদীদের সম্পর্কে আলোচনা করেন নাই। কারণ এখানকার ইয়াহুদীগণ আরব উপদ্বীপে আগমনের পর তাহাদের স্বজাতি অন্যান্য গোত্র হইতে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হইয়া যায়। ফলে দুনিয়ার অন্যান্য ইয়াহুদীরা তাহাদেরকে নিজেদের স্বজাতিও সমাজের লোক বলিয়া মনেই করিত না। কেননা তাহারা হিব্রু (ইবরীয়) সভ্যতা, ভাষা, এমনকি নামকরণও পরিত্যাগ করিয়া সর্বক্ষেত্রে আরবতন্ত্র গ্রহণ করে। হিজাযে প্রাপ্ত শিলালিপি কিংবা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনাদিতে খৃস্টীয় প্রথম শতাব্দীর পূর্বে আরবেই য়াহুদীদের নাম চিহ্নও খুঁজিয়া পাওয়া যায় না; বরং তাহাদের এখানে আগমন সম্পর্কিত ঐতিহাসিক বর্ণনাসমূহের অধিকাংশই ইয়াহুদীগণ কর্তৃক মৌখিকভাবে শ্রুত ও সংরক্ষিত। এইসব বর্ণনা নিম্নরূপঃ
ক. হিজাযের ইয়াহুদীগণ দাবি করিত যে, তাহারা সর্বপ্রথম হযরত মূসা ইব্‌ন ইমরান (আ)-এর জীবদ্দশার শেষ অধ্যায়ে এখানে আগমন করে। মূসা (আ) ফিরআওনের উপর বিজয় লাভ করার পর স্বীয় অনুসারীদের সমন্বয়ে কিন'আনীদের বিরুদ্ধে এক অভিযান পরিচালনা করেন। তাহারা সিরিয়ায় আসিয়া এখানকার অধিবাসীদেরকে ধ্বংস করিয়া দেয়। অতঃপর মূসা (আ) 'আমালিকাদেরকে ধ্বংস করিবার উদ্দেশ্যে হিজাযে আরেকটি বাহিনী প্রেরণ করেন। তাহাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয় যে, ইয়াহুদী ধর্ম গ্রহণকারী ব্যতীত বানু আমালিকার সর্বশেষ ব‍্যক্তিটিকেও যেন হত্যা করা হয়। বানু ইসরাঈলের এই বাহিনী হিজাযে আসিয়া মূসা (আ)-এর নিদের্শ বাস্তবায়ন করে, এমনকি তাহাদের সম্রাট আরকাম ইব্‌ন আবুল আরকামকেও হত্যা করে। কিন্তু তাহারা সম্রাটের একটি অত্যন্ত সুশ্রী সুদর্শন সন্তানকে হত্যা না করিয়া তাহাকে বন্দী করিয়া ফিলিস্তীনে লইয়া যায়। ইতোমধ্যে মূসা (আ) ইন্তিকাল করেন। এই বাহিনী ফিলিস্তীনে ফিরিয়া আসিয়া মূসা (আ)-এর স্থলাভিষিক্ত বানু ইসরাঈলের নিকট অভিযানের বিশদ বিবরণ দেয়। ইহাতে বানু ইসরাঈল তাহাদের উপর ভীষণ ক্ষুব্ধ হয় এবং নবীর নির্দেশ পরিপূর্ণরূপে বাস্তবায়ন না করার অভিযোগে অভিযুক্ত করিয়া তাহাদেরকে ফিলিস্তীন হইতে বহিষ্কার করে। ফলে তাহারা হিজাযে আগমন করিয়া ইয়াছরিব অঞ্চলে বসবাস শুরু করে। এই বর্ণনার উপর ভিত্তি করিয়া হিজাযের ইয়াহুদীগণ দাবি করিত যে, তাহারা খৃষ্টপূর্ব চার শত বৎসর হইতে এইখানে বসবাস করিয়া আসিতেছে।
খ. ইয়াহুদীদের হিজায অঞ্চলে আগমন সম্পর্কিত অপর একটি বর্ণনা হইল— খৃস্টপূর্ব ৫৮৭ সালে ব্যাবিলনের সম্রাট বাস্তু নসর বায়তুল মুকাদ্দাস ধ্বংস করিয়া অনেক ইয়াহুদীকে হত্যা করে এবং অবশিষ্টদেরকে সেই স্থান হইতে বিতাড়িত করে। ফলে অনেক ইয়াহুদী গোত্র হিজাযের ওয়াদী আল-কুরা, তায়মা, ইয়াছরিব, আয়লা, মাক্কা, ফাদাক, তাবুক, খায়বার প্রভৃতি অঞ্চলে আসিয়া পুনর্বাসিত হয়। আগত এইসব ইয়াহুদী স্থানীয় জুরহুম ও 'আমালিকাদের সাথে মিশিয়া যায়। ক্রমে ইয়াহুদীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাইতে থাকে। পরবর্তীতে তাহারা এই দুই গোত্রকে ইয়াছরিব হইতে বহিষ্কার করিয়া মদীনায় একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে।
গ. তালমুদের বর্ণনানুযায়ী খৃস্টীয় প্রথম কয়েক শতাব্দীতে আরবের উত্তরাঞ্চলে ইয়াহুদী বসতি ছিল। তায়মা, হিজর, খায়বার, ওয়াদী আল-কুরা, ফাদাক, মাক্সা প্রভৃতি মরূদ্যানে বসবাসরত ইয়াহুদীদের সাথে মদীনাবাসী ইয়াহুদীদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এইসব মরূদ্যানে তাহারা কৃষি পণ্য উৎপন্ন করিত। সম্ভবত তাহাদের মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন বসতিগুলি সন্নিবেশিত হইয়া একটি নগরীতে পরিণত হয়। ইয়াছরিব-এর আরামী এ্যারামীয় নাম Minta (এলাকাভুক্ত ক্ষেত্র) হইতে এই মতের সত্যতা পাওয়া যায়। সাহাবী কবি হাসান ইব্‌ন ছাবিত (রা)-এর কবিতা হইতে জানা যায়, ইয়াহুদীগণ ইয়াছরিবে অসংখ্য দুর্গ নির্মাণ করে। হাররা অঞ্চলে প্রাপ্ত কারখানা ও নালা-নর্দমার ধ্বংসাবশেষ এই কথার প্রমাণ বহন করে যে, এই অঞ্চলে ইয়াহুদী আওস গোত্রের সুসভ্য জাতি অবস্থান করিত।
ঘ. ইয়াহুদীদের ইয়াছরিব আগমন সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায় যে, ৭০ খৃস্টাব্দে রোমকগণ ফিলিস্তীনে ইয়াহুদীদেরকে হত্যা করিতে এবং তাহাদেরকে দেশান্তরিত করিতে শুরু করে এবং ১৩২ খৃস্টাব্দে তাহাদেরকে এই ভূখণ্ড হইতে সম্পূর্ণরূপে বহিষ্কার করে। ফলে এই সময়ের মধ্যে অনেক ইয়াহুদী গোত্র ফিলিস্তীন হইতে দক্ষিণে নিকটবর্তী হিজায অঞ্চলে আসিয়া শস্য-শ্যামল এলাকায় আশ্রয় নেয়। এই স্থানে আসিয়া তাহারা 'আয়লা, মাকনা, তাবুক, তায়মা, ওয়াদী আল-কুরা, ফাদাক, খায়বার প্রভৃতি অঞ্চলের উপর স্থায়ী আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। বানু কুরায়যা, বানু নাদীর ও বানু কায়নুকা' প্রভৃতি গোত্র এই সময় ইয়াছরিব আগমন করে। ক্রমে তাহারা কথা-বার্তা চাল-চলন, আচার-আচরণ এবং জীবনাচারে 'আরব বংশোদ্ভূতদের মত হইয়া যায় এবং আরবদের সাথে বিবাহ্-শাদী ও সামাজিক সম্পর্ক প্রভৃতিতে সম্পৃক্ত হইয়া পড়ে, এমনকি অনেক ইয়াহূদী হিব্রু নামের পরিবর্তে 'আরবী নাম গ্রহণ করে। তাহাদের মুষ্টিমেয় সংখ্যক ব্যতীত অন্যান্যরা হিব্রু ভাষা জানিত না। এতদসত্ত্বেও তাহারা সম্পূর্ণরূপে 'আরবদের মাঝে বিলীন হইয়া যায় নাই। অত্যন্ত সতর্কতার সহিত তাহারা ইয়াহুদীদের আত্মাভিমানকে অক্ষুণ্ণ রাখে। মূলত আরবদের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্যই তাহারা বাহ্যত আরবত্ব গ্রহণ করে। মদীনায় বসবাসকারী এইসব ইয়াহুদী 'আরবীয় ভাবধারা গ্রহণ করিলেও নিজেদেরকে ইসরাঈলী ও ইয়াহুদী ভাবিয়া তাহারা গর্ব করিত, আর আরবদেরকে মনে করিত উম্মী (নিরক্ষর/বেদুঈন)। ইয়াহুদী বানু কায়নূকা গোত্রের যেই সকল ব্যক্তিবাচক নাম পাওয়া যায় তাহার অধিকাংশই আরবী। কিন্তু এইগুলি দ্বারা তাহাদের মূল বাইবেলীয় নাম কি ছিল তাহা জানা যায় না। 'আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন সালাম (রা) ছিলেন এই গোত্রের অন্তর্ভুক্ত।
ঙ. ইতিহাসবিদ্‌ ইয়াকূত আল্-হামাবী বলেন, ইয়াহুদী পণ্ডিতগণ তাওরাত গ্রন্থে মহানবী (স)-এর গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে অবহিত হয়। তাহারা জানিতে পারে যে, মহানবী (স) بين الحرتين حرة واقم في الشرق وحرة الوبرة في الغرب (হিজরত করিবেন যেই স্থানে প্রচুর খেজুর বাগান বিদ্যমান। সুতরাং তাহারা কংকরময় মরু অঞ্চলের খোঁজে সিরিয়া হইতে বাহির হইয়া তায়নামক স্থানে আসিয়া তাওরাতের বর্ণনার সাথে উক্ত স্থানের মিল দেখিতে পাইয়া এই স্থানে বসবাস করিতে শুরু করে। পরবর্তীতে তুব্বা জাতি ও বানূ আমর ইবন আতিক আসিয়া তাহাদের সংগে যোগ দেয়।
ইয়াহুদীগণ যখন ইয়াছরিবে আসিয়া বসবাস শুরু করিয়াছিল তখন সেখানে অন্যান্য কয়েকটি আরব গোত্রও বাস করিত। ইয়াহুদীগণ তাহাদেরকে নিজেদের অধীনস্থ বানাইয়া লইয়াছিল। ৪৫০/৪৫১ খৃস্টাব্দে ইয়ামনে সংঘটিত মহাপ্লাবনে (আল-কুরআনের সূরা আস-সাবার দ্বিতীয় রুকূতে ইহার উল্লেখ আছে) সাবা জাতির বিভিন্ন গোত্র সেখান হইতে বাহির হইয়া আরবের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়াইয়া পড়ে। গাসসানীরা সিরিয়ায়, লাখমীরা হীরায় (ইরাকে), বানু খুযা'আ জিদ্দা ও মক্কার মধ্যবর্তী স্থানে এবং আওস ও খাযরাজ গোত্র ইয়াছরিবে বসবাস করিতে থাকে। ইয়াহুদীগণ যেহেতু পূর্ব হইতেই ইয়াছরিবে প্রভাব ও কর্তৃত্ব স্থাপন করিয়া রাখিয়াছিল, সেই কারণে তাহারা আওস ও খাযরাজ গোত্রকে কোন প্রকার কর্তৃত্ব করিবার সুযোগ দিল না। ফলে এই দুই আরব গোত্র অনুর্বর ভূমিতে আশ্রয় গ্রহণ করিতে বাধ্য হইয়াছিল। এই স্থানে তাহাদেরকে খুব কষ্ট করিয়া জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করিতে হইয়াছিল। পরিশেষে মালিক ইব্‌ন 'আজলান নামক জনৈক গোত্রপতি ইয়াহুদী নেতা ফিতয়ূনকে হত্যা করিয়া সিরিয়া চলিয়া গেল এবং গাসসানী শাসক আবূ জুবায়লার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করিল। ফলে সিরিয়া হইতে একটি সৈন্যবাহিনী আসিয়া যুল-হারূদ নামক স্থানে এক ভোজসভায় সকল ইয়াহূদী নেতৃস্থানীয় লোকদেরকে হত্যা করে। এইভাবে ইয়াছরিবে ইয়াহুদীদের শক্তি কিছুটা খর্ব হয় এবং আওস ও খাজরাজ গোত্রের নিরংকুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ইহার ফলে ইয়াহুদী বানু কুরায়যা ও বানু নামীর নগরীর বাহিরে যাইয়া বসবাস করিতে বাধ্য হয়। কিন্তু বানু কায়নুকার সাথে বানু কুরায়যা ও বানু নাফীরের পূর্ব হইতেই মনোমালিন্য থাকায় তাহারা নগরীর অভ্যন্তরে অবস্থান করিতে লাগিল। এইজন্য তাহাদিগকে খাযরাজ গোত্রের আশ্রয় গ্রহণ করিতে হয়।
আরব গোত্রসমূহের তুলনায় ইয়াহুদী বানু কায়নুকার আর্থিক অবস্থা ছিল খুবই সচ্ছল। ফিলিস্তীন ও সিরিয়ার সুসভ্য অঞ্চল হইতে আসিয়াছিল বলিয়া তাহারা এমন সব শিল্পে পারদর্শী ছিল যাহা আরবদের মধ্যে প্রচলিত ছিল না। তাহাদের কোন কৃষিভূমি ও ফলের বাগান ছিল না। এই গোত্রের অধিকাংশ লোক ছিল ব্যবসায়ী। তাহারা ছিল মদীনার ধনীক শ্রেণীর অন্তর্গত। তাহারা পেশায় ছিল প্রধানত স্বর্ণকার। ইহা ছাড়াও তাহারা ব্যবসায়-বাণিজ্য, লৌহজাত সামগ্রী ও তৈজসপত্র নির্মাণ শিল্পে দক্ষ ছিল। এই কারণে তাহাদের অধিকাংশ লোকই ছিল সশস্ত্র। আর্থিক সমৃদ্ধি ও ব্যবসায়িক সাফল্য প্রভৃতি কারণে মদীনার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাধনে তাহাদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল বলিয়া এই গোত্র মদীনার অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করিত। ফলে মদীনার রাজনীতিতে এই গোত্রের বিরাট ভূমিকা ছিল। তাহারা একদিকে সূদের উপর টাকা লগ্নি করিত, অপরদিকে ইয়াছরিবে বসবাসকারী গোত্রসমূহের পারস্পরিক যুদ্ধ-বিগ্রহে বিবদমান গোত্রসমূহকে অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা প্রদান করিয়া তাহাদিগকে ঋণের দায়ে জর্জরিত করিয়া ফেলিত। এইভাবে তাহারা আরবদের উপর স্থায়ী আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করিলে আরবগণ সিরীয়দের সহযোগিতায় তাহাদের শক্তি খর্ব করে। ফলে তাহারা খাযরাজ গোত্রের আশ্রয়ে ইয়াছরিব নগরীর অভ্যন্তরে বসবাস করিতে থাকে। খাযরাজ গোত্রের পক্ষ অবলম্বন করিয়া তাহারা বুআছ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার কারণে এইখানে বসবাসকারী অপর প্রধান দুই ইয়াহুদী গোত্র তথা বানু কুরায়যা ও বানু নায়ীর-এর সাথে তাহাদের প্রকাশ্য শত্রুতা শুরু হয়। বানু কায়নুকা ইয়াছরিব নগরীর দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে মুসাল্লার নিকটবর্তী ওয়াদী বুতহান-এর উপরস্থিত সেতুর সন্নিকটে বাস করিত। সেই স্থানে তাহারা দুইটি সুরক্ষিত দুর্গের অধিকারী ছিল। ইবন খালদুন বলিয়াছেন, বানু কায়নুকা মদীনার এক প্রান্তে বসবাস করিত।
মহানবী (স) ইয়াছরিব তথা মদীনায় হিজরত করিয়া আসিলে ইয়াছরিবের ইয়াহুদীগণ তাঁহাকে অভ্যর্থনা জানায়। হিজরতের পর মহানবী (স) মদীনায় যেই সনদ জারী করেন তাহাতে মুসলিম সম্প্রদায় ও ইয়াহুদীদের মধ্যে সুস্পষ্ট কতিপয় শর্ত ছিল যাহা মান্য করার স্বীকৃতি প্রদান করিয়া মদীনার ইয়াহুদীগণ তাহাতে স্বাক্ষর প্রদান করে। এই সনদ জারীর সময় ইহাতে বনু কায়নুকা’র নাম উল্লেখ নাই। এই সনদে সকল গোত্র ও তাহাদের মিত্র শক্তিকে এবং যাহারা পরবর্তীতে সংযুক্ত হইবে তাহাদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি উন্মুক্ত রাখা হয়। সম্ভবত বনু কায়নুকা’ পরবর্তীতে এই সনদের সাথে সংযুক্ত থাকিবার কারণে তাঁহাদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি প্রতিপন্ন হয়। এই সনদ কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে মদীনার মুসলিম সম্প্রদায় ও ইয়াহুদীগণ একটি অভিন্ন উম্মাহ তথা জাতিরূপে অভিহিত হয়। এই সনদে এই উভয় সম্প্রদায়ের পূর্ণ ধর্মীয় ও সামাজিক স্বাধীনতার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয় এবং তাঁহাদের মধ্যে কোন প্রকার আভ্যন্তরীণ কলহ দেখা দিলে তাহা মীমাংসার দায়িত্ব মহানবী (স)-এর উপর অর্পণ করা হয়। এই সনদে আরো নিশ্চিত করা হয় যে, মদীনার মুসলিম সম্প্রদায় বহিঃশত্রু দ্বারা আক্রান্ত হইলে মুসলিম ও ইয়াহুদী উভয় পক্ষ সম্মিলিতভাবে এই আক্রমণ প্রতিহত করিবে এবং এই ক্ষেত্রে প্রত্যেক পক্ষ স্ব স্ব ব্যয়ের বহন করিবে।
রামাদান ২ হি./মার্চ ৬২৪ সালে বদর যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার পর ইয়াহুদী বনু কায়নুকা মহানবী (স), ইসলাম এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক আচরণ শুরু করে। ইহার মূলে প্রধান কারণ ছিল চারিটি :
এক : মহানবী (স)-এর দাওয়াতের বিশ্বজনীন আবেদন তাঁহাদের বংশভিত্তিক জাতীয়তাবাদের ঐক‍্যসূত্রপূর্ণ ধারাকে তৃণ খণ্ডের মত ভাসাইয়া লইয়া গিয়াছিল এবং তাঁহার নবুওয়াতের আওতা ও পরিধি সুপ্রশস্ত হইতেছিল। ইহাতে ইয়াহুদী বনু কায়নুকা’র ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার সংকোচন পরিলক্ষিত হইতেছিল।
দুই : ইয়াহুদী বনু কায়নুকাসহ অন্যান্য ইয়াহুদী গোত্র এতদিন বিভক্তি সৃষ্টির মাধ্যমে মদীনায় যেই সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধাসমূহ ভোগ করিয়া আসিতেছিল মদীনা সনদের মাধ্যমে ঐক্য, সংহতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে তাহাদের সেই সুবিধাসমূহ চিরতরে তিরোহিত হওয়ার উপক্রম হইল।
তিন : ইসলামে আয়-উপার্জন, ব্যবসায়-বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক লেনদেন প্রভৃতি ক্ষেত্রে সুদ ভিত্তিক কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ার ফলে ইয়াহুদী বনু কায়নুকার অর্থনৈতিক বিপর্যয় সুনিশ্চিত হইয়া পড়িল।
চার : ইয়াহুদীদের কিবলা হইল বায়তুল মুকাদ্দাস, যাহা ২ হিজরী সালের প্রথমার্ধ পর্যন্ত মুসলিমদেরও কিবলা ছিল। মহানবী (স)-এর মদীনা হিজরতের ১৬/১৭ মাস পর মুসলমানদের কিবলা বায়তুল্লাহ্ দিকে পরিবর্তিত হইলে ইয়াহুদীরা রুষ্ট হয় এবং প্রকাশ্যে মুসলমানদের বিরোধিতা করিতে থাকে।
উপরোল্লিখিত কারণে ইয়াহুদী বানু কায়নুকা মহানবী (স), ইসলাম ও মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরোধিতা করাকে নিজেদের লক্ষ্যে পরিণত করে। তাহারা একদিকে মুসলিমদের দৈহিকভাবে অপদস্থ করার পথ বাছিয়া লয়, অপরদিকে সরলপ্রাণ মুসলিম সম্প্রদায়ের মনে ইসলাম সম্পর্কে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টির মানসে বিভিন্ন ধরনের অপতৎপরতা চালাইতে থাকে। সমাজে অশান্তি ও অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য তাহারা আবদুল্লাহ্ ইবন উবায়্যি প্রমুখ মুনাফিকের সহিত হাত মিলায়। মুসলমানদেরকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করিবার জন্য তাহারা নানা অপকৌশল অবলম্বন করে। ইয়াহূদীদের এইসব অপতৎপরতা ছিল ইতোপূর্বে সম্পাদিত মদীনা সনদের সুস্পষ্ট লংঘন।
মুসলমান ও কুরায়শদের মধ্যে সংঘটিত বদর যুদ্ধের পর মুসলমান মদীনায় ইয়াহুদীদের মধ্যকার সম্পর্ক তিক্ত হইয়া উঠে। এই যুদ্ধে মুসলিমদের বিজয়ের কারণে ইয়াহুদী বানু কায়নুকা মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করিতে শুরু করে। ক্রমে তাহাদের এই মনোভাব প্রকাশ্য বৈরিতার রূপ নেয়। আল-ওয়াকিদী বলেন, ইয়াহুদীরা বিদ্রোহ করিল এবং তাহাদের ও মহানবী (স)-এর মধ্যে বিদ্যমান চুক্তি ভংগ করিল। আর এই বৈরী মনোভাব প্রকাশ্য রূপ লাভের পিছনে কতিপয় ঘটনা ক্রিয়াশীল ছিল। ঘটনাগুলি হইল:
১। ইন্ন হিশাম বলেন, আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন জাফর ইন্ন মিসওয়ার ইন্ন মাখরামা হযরত আবূ আওন সূত্রে বর্ণনা করেন। আবূ আওন বলেন, বানু কায়নুকার ঘটনাটি ছিল এই, জনৈকা আরব মহিলা (তিনি জনৈক আনসারীর স্ত্রী) তাহার অলংকার বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে বানু কায়নুকার বাজারে উপস্থিত হন এবং জনৈক স্বর্ণকারের নিকট গিয়া বসেন। কোন কোন বর্ণনা অনুযায়ী মাকবুল আল্-বালাযুরী নামক জনৈকা মুসলিম মহিলা বানু কায়নুকার জনৈক ইয়াহুদী স্বর্ণকারের দোকানে স্বর্ণালংকার তৈয়ারের উদ্দেশ্যে গমন করেন। আবার কোন বর্ণনায় উল্লেখ আছে, জনৈকা আরব মহিলা দুধ বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে গমন করেন। এই স্থানে শব্দগত পার্থক্যের কারণে অর্থগত পার্থক্য সূচিত হইয়াছে বলিয়া মনে হয়। শব্দটি মূলত حلية (অলংকার), حلية (দুধ) নয়। মুদ্রণজনিত ভুলের কারণে এই পার্থক্য দেখা দিয়াছে। স্বর্ণকার লোকটি মহিলাটির মুখের নেকাব খুলিয়া তাহার চেহারা দেখিতে চায়। কিন্তু মহিলাটি তাহাতে সম্মত হন নাই। লোকটি কৌশলে মহিলার কাপড়ের একটি অংশ পিছনের একটি আংটার সাথে বাঁধিয়া দেয়। আল-ওয়াকিদীর মতে, অপর এক ইয়াহুদী আসিয়া মহিলার পিছনে বসে, যাহা মহিলাটি জানিত না। সে মহিলার কাপড়ের একটি অংশ পিছনের একটি আংটার সাথে বাঁধিয়া দেয়। মহিলাটি বসা হইতে উঠিতে গেলে তাহার কাপড় খুলিয়া যায়। ইহাতে তাহার মুখমণ্ডল ও শরীরের অন্যান্য অংগ প্রকাশিত হইয়া পড়িলে স্বর্ণকারসহ উপস্থিত অন্যান্য ইয়াছুদীরা আট্টহাসিতে মাতিয়া উঠে। এই সময় মহিলাটি চিৎকার দিয়া উঠিলে একজন মুসলিম তাহার সাহায্যার্থে আগাইয়া আসেন এবং স্বর্ণকারের উপর আক্রমণ করিয়া তাহাকে হত্যা করেন। যেহেতু নিহত লোকটি ছিল ইয়াহুদী তাই অন্যান্য ইয়াহুদীরা উক্ত মুসলমানের উপর আক্রমণ করিয়া তাঁহাকে শহীদ করে। ফলে মুসলিম সম্প্রদায় ক্রোধে ফাটিয়া পড়ে এবং অন্যান্য মুসলিমদেরকে প্রতিশোধ গ্রহণের নিমিত্তে ইয়াহুদীদের উপর আক্রমণ করিবার জন্য আহবান জানায়। এইভাবে মদীনার মুসলিম সম্প্রদায় ও ইয়াহুদী বানু কায়নুকার মধ্যে প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এই ঘটনয়ার মাধ্যমে মদীনা সনদের ধারা লংঘিত হয় এবং প্রকারান্তরে কৃত চুক্তি ভংগ হইয়া যায়। ইতিহাসবিদ ইবন ইসহাক, ইবন সা'দ এবং ইব্‌ন জারীর আত-তাবারী প্রমুখ তাঁহাদের গ্রন্থে এই ঘটনা উল্লেখ করেন নাই। অপর দিকে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সূত্র এই ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত মহিলা নিহত ইয়াহুদী এবং শহীদ মুসলিম লোকটির নাম উল্লেখ করে নাই।
২. ইবন ইসহাক বলেন, ইয়াহূদী বানু কায়নুকা চুক্তি ভংগ করিয়া বিশ্বাসঘাতকতা করিলে মহানবী (স) এই গোত্রের লোকদেরকে একটি স্থানে সমবেত করিয়া তাহাদেরকে উপদেশ প্রদান করার চিন্তা করেন। মহানবী (স) বানু কায়নুকার উন্মুক্ত বাজার এলাকায় এই সমাবেশের আয়োজন করিয়া তাহাদিগকে উদ্দেশ্য করিয়া বলেন: হে ইয়াহূদী সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহ্র পক্ষ হইতে সেইসব শাস্তিকে ভয় কর যাহা বদর যুদ্ধে কুরায়শদের উপর আপতিত হইয়াছে। তোমাদের উপর তাহা আপতিত হওয়ার পূর্বেই তোমরা ইসলাম কবুল কর। কেননা ইতোমধ্যেই তোমরা জানিয়াছ যে, আমি আল্লাহর পক্ষ হইতে প্রেরিত রাসূল। তোমরা তোমাদের উপর নাযিলকৃত কিতাবেও এই বিষয়টি পাইয়া থাকিবে।
মহানবী (স)-এর এই বক্তব্য শুনিয়া বানু কায়নুকার ইয়াহুদীরা বলিল, হে মুহাম্মাদ! সম্ভবত আপনি আমাদেরকে আপনার জাতি তথা কুরায়শ সম্প্রদায়ের মতই মনে করিয়া থাকেন। বিষয়টি যেন আপনাকে প্রতারিত না করে। আপনি এমন এক জাতির সাথে যুদ্ধ করিয়াছেন যাহাদের যুদ্ধ সম্পর্কে কোন অভিজ্ঞতা নাই। আপনি এই সুযোগটি গ্রহণ করিয়াছেন। আর আমাদের অবস্থা হইল, আপনি যদি আমাদের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন তাহা হইলে আপনি অবশ্যই বুঝিতে পারিবেন আমাদের শৌর্যবীর্য এবং শক্তি-সামর্থ্য কতটুকু। মদীনা সনদের ধারা অনুযায়ী ইয়াহুদীগণ মহানবী (স)-এর নেতৃত্ব মানিয়া লওয়া সত্ত্বেও এই ধরনের ঔদ্ধত্যপূর্ণ জবাব প্রদান করিয়া প্রকারান্তরে মহানবী (স)-কে যুদ্ধের জন্য আমন্ত্রণ জানায়। ইবন হাজার আল-আসকালানীর মতে, ইহা হাসান হাদীছ।
এই হাদীছের সনদে যায়দ ইবন ছাবিত (রা)-এর আযাদকৃত গোলাম মুহাম্মাদ ইবন আবূ মুহাম্মাদকে ইবন হাজার আল-আসকালানী অজ্ঞাত রাবী হিসাবে উল্লেখ করিয়াছেন। ইউনুস ইবন বুকায়র ইবন ইসহাক সূত্রে রিওয়ায়াত করেন, তিনি হযরত যায়দ ইবন ছাবিত (রা)-এর মাওলা মুহাম্মাদ ইবন আবূ মুহাম্মাদ সূত্রে রিওয়ায়াত করেন, তিনি সাঈদ ইবন যুবায়র অথবা ইকরিমা সূত্রে এবং তিনি আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা) সূত্রে রিওয়ায়াত করেন। ইবন আব্বাস (রা) বলেন, বদর যুদ্ধে কুরায়শদেরকে পরাজিত করিবার পর মহানবী (স) বানু কায়নুকার ইয়াহুদীদেরকে বানু কায়নুকা বাজারে একত্র করিয়া তাহাদেরকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানান। তাহারা নিজেদের শক্তি-সামর্থ্যের দম্ভ দেখাইয়া ঔদ্ধত্যপূর্ণ জবাব দেয়। ইবন আব্বাস (রা) সূত্রে ইকরিমা রিওয়ায়াত করেন, আল-কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত দুইটি এই প্রসঙ্গে নাযিল হয়:
قُل لِّلَّذِينَ كَفَرُوا سَتُغْلَبُونَ وَتُحْشَرُونَ إِلَىٰ جَهَنَّمَ ۚ وَبِئْسَ الْمِهَادُ قَدْ كَانَ لَكُمْ آيَةٌ فِي فِئَتَيْنِ الْتَقَتَا فِئَةٌ تُقَاتِلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَأُخْرَىٰ كَافِرَةٌ يَرَوْنَهُم مِّثْلَيْهِمْ رَأْيَ الْعَيْنِ ۚ وَاللَّهُ يُؤَيِّدُ بِنَصْرِهِ مَن يَشَاءُ ۗ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَعِبْرَةً لِّأُولِي الْأَبْصَارِ
“যাহারা কুফরী করে তাহাদিগকে বল, 'তোমরা শীঘ্রই পরাভূত হইবে এবং তোমাদিগকে একত্র করিয়া জাহান্নামের দিকে লইয়া যাওয়া হইবে। আর উহা কত নিকৃষ্ট আবাসস্থল'। দুইটি দলের পরস্পর সম্মুখীন হওয়ার মধ্যে তোমাদের জন্য অবশ্যই নিদর্শন রহিয়াছে। একদল আল্লাহর পথে যুদ্ধ করিতেছিল; অন্য দল কাফির ছিল; উহারা তাহাদিগকে চোখের দেখায় দ্বিগুণ দেখিতেছিল। আল্লাহ্ যাহাকে ইচ্ছা নিজ সাহায্য দ্বারা শক্তিশালী করেন। নিশ্চয় ইহাতে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন লোকের জন্য শিক্ষা রহিয়াছে” (৩ : ১২-১৩)।
অর্থাৎ বানু কায়নুকা প্রথম গোত্র যাহারা বদর যুদ্ধের পরবর্তী এক মাসের মধ্যেই মদীনা সনদের ধারা লংঘন করে। ইবন ইসহাক 'আসিফ ইবন উমার ইবন কাতাদা সূত্রে রিওয়ায়াত করেন:
أَنَّ بَنِي قَيْنُقَاعَ كَانُوا أَوَّلَ يَهُودٍ نَقَضُوا مَا بَيْنَهُمْ وَبَيْنَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ وَحَارَبُوا فِيهَا بَيْنَ بَدْرٍ وَأُحُدٍ.
“বানু কায়নুকা প্রথম ইয়াহুদী গোত্র যাহারা মহানবী (স) ও তাহাদের মধ্যকার স্বাক্ষরিত চুক্তি ভঙ্গ করে এবং বদর ও উহুদ যুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে তাঁহারা যুদ্ধে লিপ্ত হয়”।
উল্লিখিত কারণে মহানবী (স) মদীনা ফিরিয়া আসিয়া আবু লুবাবা বশীর ইবন আবদুল মুনযির আল-আনসারীকে মদীনায় তাঁহার খলীফা (স্থলাভিষিক্ত) নিযুক্ত করেন এবং ইয়াহুদী বানু কায়নুকাকে শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশে মুসলিম মুজাহিদদেরকে সংগে লইয়া বানু কায়নুকা অবরোধ করেন। এই অভিযানে সাদা পতাকা বহন করেন হযরত হামযা ইব্‌ন আবদুল মুত্তালিব (রা)। আল্-ওয়াকিদী বলেন, মহানবী (স) মদীনায় হিজরতের ২০ মাসের মাথায় শাওয়াল মাসের মধ্যভাগে শনিবার তাহাদিগকে অবরোধ করেন। আর এই অবরোধ যুল-কা'দা মাসের প্রথম দিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। এই অবরোধের মেয়াদ ছিল ১৫ দিন।
বানু কায়নুকা মদীনার খাযরাজ গোত্রের সাথে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার কারণে আওস ও খাযরাজ গোত্রের পারস্পরিক দ্বন্দ্বে বানু কায়নুকা খাযরাজ গোত্রের পক্ষ অবলম্বন করিত। ইবন হিশাম বলেন, মহানবী (স)-এর সাথে বানু কায়নুকার এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের পিছনে সম্ভবত ইহাই কারণ ছিল যে, তাহারা মহানবী (স) দ্বারা আক্রান্ত হইলে তাহাদের মিত্রশক্তি তথা খাযরাজ গোত্রের পূর্ণ সহযোগিতা পাওয়া যাইবে। বাস্তবিকপক্ষে আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন উবায়্যি ব্যতীত আর কাহারও নৈতিক সমর্থন তাহারা লাভ করিতে পারে নাই। বানু কায়নুকার এই আচরণের কারণে মহানবী (স) তাহাদের পক্ষ হইতে বিশ্বাসঘাতকতার আশংকা করেন। ইহার প্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করেন:
وَإِمَّا تَخَافَنَّ مِنْ قَوْمٍ خِيَانَةً فَانْبِدْ إِلَيْهِمْ عَلَى سَوَاءٍ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْخَائِنِينَ.
"যদি তুমি কোন সম্প্রদায়ের চুক্তি ভংগের আশংকা কর তবে তোমার চুক্তিও তুমি যথাযথ বাতিল করিবে; নিশ্চয় আল্লাহ্ চুক্তি ভংঙ্গকারীদিগকে পসন্দ করেন না” (৮ : ৫৮)।
এই নির্দেশের উপর ভিত্তি করিয়া মহানবী (স) বানু কায়নুকার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। অবরোধ চলাকালীন বানু কায়নুকা দুর্গে আশ্রয় নেয়। এই সময়ে তাহারা তাহাদের সকল মিত্র শক্তি হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়ে। তাহাদের কেহ বাহিরে আসিতে পারে নাই এবং বাহির হইতেও কেহ তাহাদের জন্য খাবার পৌছাইয়া দিতে সক্ষম হয় নাই। এই অবস্থায় আল্লাহ তাআলা তাহাদের হৃদয়ে ভীতির সঞ্চার করেন। অবস্থার নাযুকতা উপলব্ধি করিয়া তাহারা এই শর্তে আত্মসমর্পণ করে যে, তাহাদের স্ত্রী-পুত্র-পরিজন তাহাদের সাথে থাকিবে এবং তাহাদের ধন-সম্পদ মহানবী (স) ও মুসলমানদের হইবে।
মহানবী (স) তাহাদেরকে বন্দী করেন এবং তাহাদের দুই হাত পিছনের দিক হইতে বাঁধিয়া ফেলার নির্দেশ দেন। তিনি এই কাজের দায়িত্ব অর্পণ করেন বানু আসলাম গোত্রের মুনযির ইব্‌ন কুদামার উপর। তাহাদের সংখ্যা ছিল সাত শত। চার শত ছিল বর্মাবিহীন এবং তিন শত ছিল বর্মধারী। মুনাফিক নেতা 'আবদুল্লাহ্ ইবন উবায়্যি-এর সাথে মৈত্রীচুক্তি থাকার কারণে এই সময় সে তাহাদের সাহায্যার্থে আগাইয়া আসে। সে মুনযিরকে বলে, ইহাদেরকে ছাড়িয়া দাও। মুনযির বলেন, "আমি কি এমন জাতিকে ছাড়িয়া দিব যাহাদেরকে বাঁধিবার নির্দেশ স্বয়ং মহানবী (স) দিয়াছেন? আল্লাহর শপথ! যেই ব্যক্তি তাহাদেরকে ছাড়াইয়া নেওয়ার জন্য আগাইয়া আসিবে আমি তাহার গর্দান কাটিয়া ফেলিব।” তখন সে বানু কায়নুকার লোকদের মুক্ত করিয়া দেওয়ার জন্য মহানবী (স)-এর নিকট সুপারিশ করে এবং বলে, হে মুহাম্মাদ! মিত্র গোত্রের লোকদের প্রতি অনুগ্রহ করুন। মহানবী (স) তাহার দিক হইতে মুখ ফিরাইয়া নিলেন। তখন সে মহানবী (স)-এর লৌহ বর্মের পকেটে হাত ঢুকাইয়া দেয়। মহানবী (স) বলেন: আমাকে ছাড়িয়া দাও। এই সময মহানবী (স)-এর চেহারায় অসন্তোষের চিহ্ন ফুটিয়া উঠে। আবদুল্লাহ্ ইবন উবায়্যি বলিল, আমি ছাড়িয়া দিব না যতক্ষণ পর্যন্ত মিত্র গোত্রের লোকদের প্রতি অনুগ্রহ করা না হয়। তাহারা আমাকে বিভিন্ন সময় সাহায্য করিয়াছে। আপনি কি তাহাদেরকে এত শীঘ্রই ধ্বংস করিয়া দিবেন? হে মুহাম্মাদ! আমি বিপদের আশংকা করিতেছি। মহানবী (স) বলিলেন: “তাহাদেরকে ছাড়িয়া দাও। আল্লাহ তাহাদের উপর লা'নত বর্ষণ করুন এবং আবদুল্লাহ্ ইবন উবায়্যি-এর উপরও লা'নত বর্ষণ করুন"।
রাসূলুল্লাহ (স) বানু কায়নুকার ইয়াহুদীদেরকে হত্যা না করিয়া মদীনা ছাড়িয়া চলিয়া যাওয়ার নির্দেশ দেন এবং এই নির্দেশ কার্যকর করার দায়িত্ব অর্পণ করেন তাহাদেরই মিত্র গোত্রের অন্তর্গত উবাদা ইবন সামিত (রা)-এর উপর, যিনি তখন বানু কায়নুকার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করিয়াছিলেন। তিনি তাহাদেরকে সন্তান-সন্ততিসহ মদীনার 'যুবাত' পর্বত পর্যন্ত পৌঁছাইয়া দিয়া বলেন, তোমরা অনেক দূরে চলিয়া যাও। তখন তাহারা সিরিয়ার 'আযরি'আত' নামক এলাকায় চলিয়া যায়।
রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের ধন-সম্পদ, সমুদয় সমরাস্ত্র এবং স্বর্ণলংকার নির্মাণের সকল যন্ত্রপাতি গনীমত হিসাবে গ্রহণ করেন। এই সম্পদ হস্তগত করিবার দায়িত্ব অর্পণ করেন মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা আল-আনসারী (রা)-র উপর। তাহাদের ধন-সম্পদ পাঁচ ভাগ করা হয়। চার ভাগ মুসলিম মুজাহিদদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। অপর একভাগ মহানবী (স) গ্রহণ করেন। এইগুলি হইল মহানবী (স) কর্তৃক গ্রহণকৃত সর্বপ্রথম গনীমতের সম্পদ। এইগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হইল ৩ টি ধনুক ও দুইটি লৌহবর্ম। ধনুকগুলির নাম হইল ১. আল-কাতুম (الکتوم) এইটি উহুদ যুদ্ধে ভাঙ্গিয়া যায়, ২. আল-রাওহা (الروحاء), ৩. আল-বায়দা (البيضاء)। লৌহবর্ম দুইটির নাম হইল: আস-সাগদিয়া (الصغدية) ও আল-ফিদ্দাহ (الفضة)। বর্ণিত আছে যে, আস-সাগদিয়া হইল সেই বর্ম যাহা জালূতের সাথে যুদ্ধ করিবার সময় হযরত দাউদ (আ) পরিধান করিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) একটি বর্ম মুহাম্মাদ ইব্‌ন মাসলামা (রা)-কে এবং অপরটি সা'দ ইব্‌ন মু'আয (রা)-কে প্রদান করেন। মুহাম্মদ ইব্‌ন মাসলামা বলেন, মহানবী (স) আমাকে একটি বর্ম প্রদান করেন, আর একটি প্রদান করেন সা'দ ইব্‌ন মু'আযকে।
এই অভিযানে মহানবী (স) তিনখানি তরবারিও হস্তগত করেন। এইগুলির মধ্যে একটির নাম কালাঈ (قلعی), অপর একটির নাম বাত্তার (بتار)। তৃতীয়টির নাম পাওয়া যায় না। বানু কায়নুকা অভিযানে রাসূলুল্লাহ (স) গনীমতের সম্পদ হইতে এক-পঞ্চমাংশ গ্রহণের পাশাপাশি হযরত সাফিয়‍্যা (রা)-কেও গ্রহণ করেন।
মহানবী (স) বানু কায়নুকাকে বহিষ্কার করার দায়িত্ব অর্পণ করেন উবাদা ইব্‌ন সামিত (রা)-এর উপর। বানু কায়নুকা বলিল, আমরা কি আওস ও খাযরাজ গোত্রের নিকট হইতে চলিয়া যাইব? আমরা তো আপনার মিত্রপক্ষ। আবদুল্লাহ্ ইবন উবায়্যি জিজ্ঞাসা করিল, আপনি মিত্রদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন: “হে আবুল হুবাব! হৃদয় পরিবর্তন হইয়াছে, ইসলাম সকল চুক্তি বাতিল করিয়াছে। তাহারা আগামী কালই চলিয়া যাইবে"। বানু কায়নুকা বলিল, লোকদের নিকট আমরা অনেক ঋণ পাওনা আছি। মহানবী (স) বলিলেন, তাহাদেরকে তাড়াতাড়ি যাইতে বল। ইবনুল আছীর বলেন, উবাদা ইব্‌ন সামিত (রা) তাহাদেরকে 'যুবাব' পযর্ন্ত পৌছাইয়া দেন। অতঃপর তাহারা 'আযরি'আত' চলিয়া যায়। 'আযরি'আত' হইল সিরিয়ার অন্তর্গত একটি শহর। এইটি 'বালকা' ও 'আম্মান সংলগ্ন একটি স্থান। কিছুকাল অতিবাহিত হইতে না হইতেই তাহারা ধ্বংস হইয়া যায়। সাবরাহ্ বলেন, আমি সিরিয়া হইতে প্রত্যাবর্তনের সময় 'আকীক উপত্যকায় 'ফালজাহ' নামক স্থানে ছিলাম। আমি এই স্থানে বানু কায়নুকা'র সাক্ষাত পাইলাম। তাহারা নিজেদের সন্তান-সন্ততি ও স্ত্রী-পরিজনকে উটের পিঠে উঠাইয়া পুরুষরা হাঁটিয়া চলিয়া যাইতেছিল। আমি তাহাদের অবস্থা জিজ্ঞাসা করিলে তাহারা বলিল, "মুহাম্মাদ আমাদেরকে বিতাড়িত করিয়া দিয়াছে এবং আমাদের ধন-সম্পদ রাখিয়া দিয়াছে।" আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, তোমরা এখন কোথায় যাইবে? তাহারা বলিল, আমরা সিরিয়া যাইব। সাবরাহ্ বলেন, তাহারা ওয়াদী আল-কুরায় অবতরণ করিয়া এই স্থানে একমাস অবস্থান পূর্বক শক্তি সঞ্চয় করে। অতঃপর তাহারা আযরি'আতে চলিয়া যায় এবং সেই স্থানে অবস্থান করে। কিন্তু সেখানেও তাহারা স্থায়ী হইতে পারে নাই।
উবাদা ইব্‌ন সামিত বলেন, বানু কায়নুকা যখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাথে বিবাদে জড়াইয়া পড়ে তখন তাহাদের মিত্র আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন উবায়্যি তাহাদের সহযোগিতায় দাঁড়াইয়া গেলেও তাহাদের অপর মিত্র আওফ ইব্‌ন আল-খাযরাজ গোত্রের উবাদা ইব্‌ন সামিত (রা) তাহাদের সাথে সকল প্রকার সম্পর্ক ছিন্ন করিয়া আল্লাহ্ তা'আলা এবং তাঁহার রাসূলের সাথে সম্পর্ককে সুদৃঢ় করেন। উবাদা (রা) বলেন, "আমি বানু কায়নুকার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করিয়া আল্লাহ্ তা'আলা এবং তাঁহার রাসূলের সংগের সম্পর্ককে গ্রহণ করিলাম এবং মহান আল্লাহ, তাঁহার রাসূল এবং মুমিনদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করিলাম, আর কাফিরদের সঙ্গে ইতোপূর্বের সকল সহযোগিতা ও মিত্রতায় চুক্তি ছিন্ন করিলাম। অতঃপর উবাদা ইবন সামিত (রা) এবং আবদুল্লাহ্ ইবন উবায়্যি সম্পর্কে নিম্নোক্ত আয়াতসমূহ নাযিল হয়ঃ
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصْرِى أَوْلِيَاءَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَمَنْ يُتَوَلَّهُمْ مِّنْكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ إِنَّ اللهَ لا يَهْدِي القَوْمَ الظَّلِمِينَ. فَتَرَى الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَّرَضٌ يُسَارِعُوْنَ فِيْهِمْ يَقُولُونَ نَخْشَى أَنْ تُصِيبَنَا دَائِرَةٌ فَعَسَى اللَّهُ أَنْ يَأْتِيَ بِالْفَتْحِ أَوْ أَمْرٍ مِّنْ عِنْدِهِ فَيُصْبِحُوا عَلَى مَا أَسَرُّوا فِي أَنْفُسِهِمْ نَدِمِينَ. وَيَقُولُ الَّذِينَ آمَنُوا أَهُؤُلَاءِ الَّذِينَ أَقْسَمُوا بِاللَّهِ جَهْدَ أَيْمَانِهِمْ إِنَّهُمْ لَمَعَكُمْ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فَأَصْبَحُوا خَسِرِينَ. يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَنْ يُرْتَدَّ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ أَذَلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَفِرِينَ يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لائِمٍ ذُلِكَ فَضْلُ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَنْ يَشَاءُ وَاللهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ إِنَّمَا وَلِيُّكُمُ اللهُ وَرَسُولَهُ وَالَّذِينَ آمَنُوا الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلوةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكُوةَ وَهُمْ رَكِعُونَ. وَمَنْ يَتَوَلَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَالَّذِينَ آمَنُوا فَإِنَّ حِزْبَ اللهِ هُمُ الْغَلِبُونَ.
“হে মু'মিনগণ! তোমরা ইয়াহুদী ও খৃস্টানদিগকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করিও না। তাহারা পরস্পর পরস্পরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে কেহ তাহাদিগকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করিলে সে তাহাদেরই একজন হইবে। নিশ্চয় আল্লাহ্ যালিম সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।
এবং যাহাদের অন্তঃকরণে ব্যাধি রহিয়াছে তুমি তাহাদিগকে সত্বর তাহাদের সহিত মিলিত হইতে দেখিবে এই বলিয়া, 'আমাদের আশংকা হয় আমাদের ভাগ্য বিপর্যয় ঘটিবে।' হয়তো আল্লাহ বিজয় অথবা তাঁহার নিকট হইতে এমন কিছু দিবেন যাহাতে তাহারা তাহাদের অন্তরে যাহা গোপন রাখিয়াছিল তজ্জন্য অনুতপ্ত হইবে। এবং মু'মিনগণ বলিবে, 'ইহারাই কি তাহারা যাহারা আল্লাহর নামে দৃঢ়ভাবে শপথ করিয়াছিল যে, তাহারা তোমাদের সংগেই আছে? তাহাদের কার্য নিষ্ফল হইয়াছে; ফলে তাহারা ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে। হে মু'মিনগণ! তোমাদের মধ্য কেহ দীন হইতে ফিরিয়া গেলে নিশ্চয় আল্লাহ্ এমন এক সম্প্রদায় আনিবেন যাহাদিগকে তিনি ভালবাসিবেন এবং যাহারা তাঁহাকে ভালবাসিবে। তাহারা মু'মিনদের প্রতি কোমল ও কাফিরদের প্রতি কঠোর হইবে; তাহারা আল্লাহ্র পথে জিহাদ করিবে এবং কোন নিন্দুকের নিন্দার ভয় করিবে না। ইহা আল্লাহর অনুগ্রহ, যাহাকে ইচ্ছা তিনি দান করেন এবং আল্লাহ্ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ। তোমাদের বন্ধু তো আল্লাহ, তাঁহার রাসূল ও মু'মিনগণ-যাহারা বিনীত হইয়া সালাত কায়েম করে ও যাকাত দেয়। কেহ আল্লাহ্, তাঁহার রাসূল এবং মু'মিনদিগকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করিলে আল্লাহর দলই তো বিজয়ী হইবে" (৫:৫১-৫৬)।
উক্ত আয়াতসমূহে فَتَرَى الَّذِيْنَ فِي قُلُوبُهُمْ مَّرَضٌ )তুমি দেখিবে সেই সমস্ত লোককে যাহাদের অন্তঃকরণে রোগ রহিয়াছে) বলিয়া আবদুল্লাহ ইবন উবায়্যিকে বুঝানো হইয়াছে। কারণ সে বলিয়াছিল, إِنِّي أَخْشَى الدَّوَائر )আমি বিপদের আশংকা করিতেছি) যাহা বিবৃত করিয়া আল্লাহ তা'আলা বলেন : يَقُولُونَ نَخْشَى أَنْ تُصِيْبَنَا دَائِرَةُ )"তাহারা বলে, আমরা আমাদের ভাগ্য বিপর্যয়ের আশংকা করিতেছি।" পক্ষান্তরে وَمَنْ يَتَوَلَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَالَّذِينَ آمَنُوا )"আর যেই ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁহার রাসূল এবং ঈমানদার লোকদিগকে নিজের বন্ধু বানাইবে") শীর্ষক আয়াত দ্বারা উবাদা ইব্‌ন সামিতকে বুঝানো হইয়াছে। কারণ তিনি বলিয়াছিলেন, আমি বানু কায়নুকার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করিয়া আল্লাহ তা'আলা, তাঁহার রাসূল এবং মু'মিনগণকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করিলাম।
বানু কায়নুকা গোত্রের কতিপয় লোক দীন ইসলাম গ্রহণ করে এবং তাহারা মদীনাতেই থাকিয়া যায়। ইব্‌ন হিশাম রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতিপক্ষ হিসাবে ৩০ জন বানু কায়নুকার তালিকা প্রদান করেন। হয়ত ইহা দ্বারা নির্বাসন-পূর্ব সময়কে বুঝান হইয়াছে। তালিকার ৫/৬টি নাম ওয়াকিদীর বর্ণনায় পাওয়া যায়। ৯/৬৩১ সালে ইবন উবায়্যি-এর দাফনের সময় বানূ কায়নুকা এবং অন্য গোত্রের কিছু সংখ্যক ব্যক্তি ভিড় ঠেলিয়া লাশের খাটিয়া পর্যন্ত গিয়াছিল। কায়নুকা গোত্রের আরেক ব্যক্তি ছিলেন আবদুল্লাহ ইব্‌ন সালাম (প্রকৃত নাম আল-হুসায়ন)। ইনি ছিলেন একজন ধর্মীয় নেতা এবং সুশিক্ষিত ব্যক্তি। ইন্ন ইসহাক কর্তৃক প্রদত্ত তালিকার উপসংহারে তাঁহার নাম উল্লিখিত হইয়াছে। তিনি হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর মদীনায় হিজরতের অব্যবহিত পরই ইসলাম ধর্ম কবুল করেন। Horovitz বলেন যে, তিনি হিজরতের ৮ বৎসর পর এবং হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর ইনতিকালের দুই বৎসর পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেন।
বানু কায়নুকার যুদ্ধ সম্পর্কে ঐতিহাসিকও সীরাত রচয়িতাগণের মধ্যে মতভেদ রহিয়াছে। আল-বালাযুরী, ইব্‌ন খালদুন প্রমুখ ঐতিহাসিকের মতে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয় ২য় হিজরীর শাওয়াল মাসে। কিন্তু ইব্‌ন কাছীর বলেন যে, ইহা হিজরী ৩য় সালে সংঘটিত হইয়াছিল। এই বর্ণনাটিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। ইহা নিশ্চিত যে, এই যুদ্ধ বদরের যুদ্ধের পর ও উহুদ যুদ্ধের পূর্বে সংঘটিত হয়। কোন এক বর্ণনা হইতে জানা যায় যে, ৩য় হিজরীর মুহাররাম মাসে গাতাফান গোত্রের বিরুদ্ধে সৈন্য পরিচালনার ফলে আমররা-র যুদ্ধ সংঘটিত হয়। রাসূলুল্লাহ (স) উছমান ইব্‌ন আফফান (রা)-কে মদীনায় তাঁহার প্রতিনিধি নিযুক্ত করেন এবং স্বয়ং নাজদ অভিমুখে যাত্রা করেন। তিনি সেইখানে সফর মাস অতিবাহিত করেন এবং বিনা যুদ্ধেই প্রত্যাবর্তন করেন। অতঃপর ৩য় হিজরীর রবীউল আওয়াল মাসে একদল সৈন্য লইয়া হিজাযে বুহরান নামক স্থান পর্যন্ত গমন করেন। কিন্তু কুরায়শদের সহিত যুদ্ধ সংঘটিত হয় নাই। রাসূলুল্লাহ (স) তথায় কিছু দিন অতিবাহিত করার পর মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন। যেহেতু বানু কায়নুকার যুদ্ধ ইহার পর সংঘটিত হয়, সেহেতু ইহার তারিখ ৩য় হিজরী নির্ধারিত করা যাইতে পারে।
মহানবী (স) কর্তৃক বানু কায়নুকা অভিযান পর্যালোচনা করিলে দেখা যায় যে, তিনি এই গোত্রের ইয়াহূদীদিগকে ইসলাম কবুল করার ও তাঁহার নবুওয়াতের স্বীকৃতি প্রদানের আহ্বান জানান। বিষয়টি তাহাদের ধর্মগ্রন্থ তাওরাতেও উল্লিখিত হইয়াছে। তাহারা মুসলমানদের পাশাপাশি মদীনায় অবস্থান করিত। তাহারা ছিল মদীনা সনদের আওতাভুক্ত গোত্রসমূহের অন্তর্গত। এতসত্ত্বেও তাহারা মহানবী (স)-এর আহ্বানের ঔদ্ধত্যপূর্ণ জওয়াব দেয়, নিজেদের বীরত্ব ও বাহাদুরি প্রকাশ করে এবং এই ক্ষেত্রে কোন প্রকার সমীহ ও সৌজন্য প্রকাশ করে নাই। ইহার মাধ্যমে বাহ্যত মনে হয়, তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাথে সংঘর্ষে জড়িত হওয়ার জন্য মানসিকভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছিল এবং এই ক্ষেত্রে তাহারা মিত্রশক্তি খাযরাজ গোত্রের সহযোপিতার উপর অধিক নির্ভর করিয়াছিল। নতুবা বানু কায়নুকার ন্যায় একটি ক্ষুদ্র গোত্র মুসলমানদের কুরায়শদের বিপক্ষে বিজয়ী ও মদীনার শাসনকার্য পরিচালনাকারী একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর বিরদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা করার সাহস দেখাইতে পারে না।
কেবল ইসলাম কবুল করিতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে রাসূলুল্লাহ (স) বানু কায়নুকাকে বহিষ্কার করিয়াছিলেন বলিয়া মনে করিবার সংগত কোন কারণ নাই। কেননা মদীনা সনদের ভিত্তিতে ইয়াহুদীগণকে মুসলিমদের পাশাপাশি মদীনায় শান্তিতে বসবাস করিবার অনুমতি প্রদান করা হইয়াছিল। আর এই ক্ষেত্রে তাহাদিগকে ইসলাম কবুল করিবার কোন শর্ত আরোপ করা হয় নাই, বরং মদীনা সনদে তাহাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হইয়াছিল। আমরা মনে করি, বদর যুদ্ধে কুরায়শদের পরাজয় বরণ করিবার পর মদীনার ইয়াহুদীদের মনোভাবের পরিবর্তন ঘটে। ইহার প্রকাশ ঘটে তাহাদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও আগ্রাসী জওয়াব প্রদানের মধ্য দিয়া। ইহার মাধ্যমে মদীনার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বিধিমালা লংঘিত হওয়ার আশংকা দেখা দেয়। সনদের শর্ত অনুযায়ী মহানবী (স) নিরংকুশ ক্ষমতা সংরক্ষণ করেন। তাহাদের এই চ্যালেঞ্জ প্রকারান্তরে মদীনা সনদের প্রতি অস্বীকৃতি জ্ঞাপন। মহানবী (স) উপলব্ধি করিয়াছিলেন যে, ইয়াহুদীদের সংগে মদীনায় একত্রে বসবাস করা সম্ভব নয়। তাহারা মদীনার অভ্যন্তরে বসবাস করিত বলিয়া তাহাদের এই মনোভাব যেন অন্যান্য গোত্রে সম্প্রসারিত হইতে না পারে সেইজন্য মহানবী (স) ইয়াহুদী বানু কায়নুকার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করিয়া তাহাদিগকে অবরোধ করেন এবং তাহাদিগকে মদীনা হইতে বহিষ্কার করেন। রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক গৃহীত এই পদক্ষেপের মাধ্যমে মদীনায় অন্যান্য ইয়াহুদী গোত্রের শক্তি দুর্বল হইয়া পড়ে এবং অন্যান্য অমুসলিম জনগোষ্ঠীও এখানে প্রকাশ্যে বিদ্রোহ করিবার সাহস প্রদর্শন করে নাই।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 গাযওয়া যী-আম্র

📄 গাযওয়া যী-আম্র


বদর ও উহুদ যুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নেতৃত্বাধীনে ইহাই সর্বাপেক্ষা বড় সামরিক অভিযান। এই সমরাভিযান তৃতীয় হিজরীর মুহররম মাসে অনুষ্ঠিত হয়। ইবন সা'দ বলেন, এই অভিযান মদীনায় হিজরতের পঁচিশ মাসের মাথায় অর্থাৎ তৃতীয় হিজরীর রবীউল আওয়াল মাসে অনুষ্ঠিত হয়। ইবন ইসহাকের মতে ইহা তৃতীয় হিজরীর সফর মাসে অনুষ্ঠিত হয়।
হাফিয ইব্‌ন কাছীর (র) ওয়াকিদীর উদ্ধৃতি উল্লেখ করিয়া বলেন, তৃতীয় হিজরীর ১৩ রবীউল আওয়াল বৃহস্পতিবার মহানবী (স) এই সমরাভিযানে রওয়ানা হন। এই বুদ্ধকে গাযওয়া নাঙ্গও বলা হয়। হাকিম এই যুদ্ধের নাম গাযওয়া আনমার (غزوة أغار) বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন।
ইব্‌ন হিশাম বলেন, দ্বিতীয় হিজরীর যুল-হিজ্জা মাসে সংঘটিত সাবীক নামক যুদ্ধাভিযান হইতে প্রত্যাবর্তনের পর ঐ মাসের অবশিষ্ট দিনগুলি রাসূলুল্লাহ (স) মদীনায় বা তাহার আশেপাশে অবস্থান করেন। ইহার পর গাতাফানের উদ্দেশে নাজাদ এলাকায় যুদ্ধে রওয়ানা হন। ইব্‌ন জারীর আত-তাবারী বলেন যে, ইহাই গাযওয়া যী আমর বা যু অ্যামরের যুদ্ধ নামে পরিচিত।
যুদ্ধাভিযানের কারণ : রাসুলুল্লাহ (স) গোপন সূত্রে জানিতে পারিলেন যে, বনী ছা'লাবা এবং বনী মুহারিব গোত্রদ্বয়ের এক বিরাট বাহিনী মুসলমানদিগকে পরাজিত ও নিঃশেষ করিবার দৃঢ় সংকল্পে যু-'আম্র নামক স্থানে একত্র হইয়াছে। দু'সুর ইবনুল-হারিছ আল- মুহারিবী এই বিশাল বাহিনীর নেতৃত্বে ছিল। খতীব বাগদাদীর বর্ণনা হইতে এই সেনাপতির নাম গ্‌রাছ (غورث), অন্যান্য ঐতিহাসিক ঐ ব্যক্তির নাম গ্‌রাক (غورك) বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। মুহারিব গোত্রের এই লোকটি অত্যন্ত সাহসী এবং বীর যোদ্ধা হিসাবে খ্যাতিমান ছিল।
রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের মুকাবিলায় যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করিবার জন্য সাহাবাগণকে আহ্বান জানাইলেন। সাহাবাগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করিলে মহানবী (স) অশ্বারোহী ও পদাতিক মিলিয়া মোট চার শত পঞ্চাশজন মুসলিম সৈন্যের এক বাহিনী এবং তৎসঙ্গে কিছু অশ্ব লইয়া গাতাফানের উদ্দেশে নাজদ ও নুখায়লের দিকে রওয়ানা হইলেন। মদীনায় উছমান ইব্‌ন আফফান (রা)-কে প্রতিনিধি হিসাবে রাখিয়া গেলেন।
রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবাগণকে লইয়া যাত্রা শুরু করিলেন। তিনি উহুদ ও মদীনার মধ্যবর্তী আল-মুনাক্কা নামক স্থানের উপর দিয়া নাজদের নিকটবর্তী 'যুল-কাসসা' নামক স্থানে পৌঁছেন। এই স্থানে আসিয়া ছা'লাবা গোত্রের জাব্বার নামক এক ব্যক্তিকে পাইয়া মুসলমানগণ তাহাকে গ্রেফতার করেন। অতঃপর তাহাকে জিজ্ঞাসা করেন, তুমি কোথায় যাইতেছ? সে বলিল, ইয়াছরিব। মুসলমানগণ আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, ইয়াছরিবের তোমার কি প্রয়োজন? সেই ব্যক্তি বলিল, আমি নিজেকে লুকাইয়া রাখিয়া পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করিতে চাই। তাহাকে প্রশ্ন করা হইল, তুমি কি কোন বাহিনীর সাথে আসিয়াছ কিংবা তোমার কওমের কোন সংবাদ বহন করিয়া আনিয়াছ? সে বলিল, না। তবে আমার নিকট সংবাদ পৌঁছে যে, দু'সুর ইব্‌দুল হারিছ মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য লোকদিগকে একত্র করিয়াছে। সাহাবীগণ তাহাকে রাসূলুল্লাহ্ (স)- এর সমীপে উপস্থিত করিলেন। মহানবী (স) তাহাকে ইসলাম কবুলের আহ্বান জানাইলে সে ইসলাম কবুল করিল। সে বলিল, হে নবী! শত্রুপক্ষ' কখনও আপনাদের মুকাবিলা করিবার সাহস পাইবে না। তাহারা যদি আপনাদের সমরাভিযানের সংবাদ জানিতে পারে তবে ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া পলায়ন পূর্বক পাহাড়ের চূড়ায় আশ্রয় গ্রহণ করিবে। আমি তাহাদের ঘাটির দিকে পথ প্রদর্শন করিতে আপনাদের সাথেই আছি। ইসলামের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান দানের জন্য মহানবী (স) তাহাকে হযরত বিলাল (রা)-এর সঙ্গী করিয়া দেন। তিনি মুসলিম সৈন্যবাহিনীকে শত্রুদের আবাসস্থল পর্যন্ত রাস্তা দেখাইয়া নিয়া যান।
এইদিকে শত্রুরা মুসলিম সৈন্যবাহিনীর আগমনের সংবাদ পাইয়া ছত্রভঙ্গ হইয়া যায় এবং আশেপাশের পাহাড়গুলিতে আত্মগোপন করে। রাসূলুল্লাহ (স) অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখিলেন এবং সৈন্যবাহিনীসহ শত্রুদের একত্র হইবার স্থান পর্যন্ত গমন করিলেন। ইহা ছিল মূলত একটা প্রস্রবণ যাহা যু-'আমর নামে পরিচিত। এইজন্যই এই অভিযানকে 'যু-'আমরের যুদ্ধ' নামে অভিহিত করা হয়। শত্রুপক্ষের কাহারও সাথেই মুসলমানদের সাক্ষাত হয় নাই। মহানবী (স) ঐ স্থানেই শিবির স্থাপন করিলেন। ঐ সময়ে প্রচুর বারি বর্ষিত হইতেছিল। রাসূলুল্লাহ (স) পায়খানা-পেশাব করিবার জন্য ছাউনী হইতে বাহিরে আসিলে বৃষ্টিতে তাঁহার কাপড় ভিজিয়া যায়। তিনি ভিজা কাপড় খুলিয়া শিবির হইতে নিচে আসিয়া একটি গাছের ডালে শুকাইতে দিলেন এবং নিজে ঐ গাছের নিচে শুইয়া বিশ্রাম করিতে করিতে ঘুমাইয়া পড়িলেন। প্রতিপক্ষ বেদুঈনরা পাহাড়ের চূড়া হইতে এই সকল ঘটনা প্রত্যক্ষ করিতেছিল।
এই দৃশ্য দেখিয়া বেদুঈনরা তাহাদের দলের সেই প্রখ্যাত যোদ্ধা ইন্ন হারিছ, মতান্তরে দু'সুর ইন্ন হারিছকে লক্ষ্য করিয়া বলিল, মুহাম্মাদ (স)-কে হত্যা করিবার ইহাই সুবর্ণ সুযোগ। সঙ্গীগণ হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া তিনি এখন একাকী নিদ্রামগ্ন। এই অপূর্ব সুযোগ হাতছাড়া করা মোটেই সমীচীন হইবে না। তখন সেই দু'সুর একটি তরবারি হাতে লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর শিয়রের পাশে দণ্ডায়মান হইয়া বলিতে লাগিল, হে মুহাম্মাদ! আজ তোমাকে আমার হাত হইতে কে রক্ষা করিবে? নবী করীম (স) অত্যন্ত দৃঢ়চিত্তে উত্তর দিলেন, আল্লাহ। আল্লাহ তা'আলার আদেশক্রমে জিবরাঈল (আ) অবতরণ করিয়া তাহার হৃদয়ে ভীতির সঞ্চার করিলেন। ফলে তাহার হাত হইতে তরবারি পড়িয়া গেল। রাসূলুল্লাহ (স) তরবারি উঠাইয়া নিয়া বলিলেন, এইবার তোমাকে কে রক্ষা করিবে? সে বলিল, কেহই রক্ষা করিতে পারিবে না। সেই সাথে আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই এবং মুহাম্মাদ (স) আল্লাহ্র রাসূল। আল্লাহ্র কসম! আপনার উপর কখনও কোন বাহিনী জয়লাভ করিতে সক্ষম হইবে না। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার তরবারি ফেরত দিলেন। তিনি তাহার সাথীদের কাছে পৌঁছিলে তাহারা বলিতে লাগিল, তোমার পতন হউক। কী হইয়াছে তোমার যে, এই ধরনের মহাসুযোগ পাইয়াও মুহাম্মাদকে হত্যা করিতে পারিলে না? তিনি উত্তরে বলিলেন, আমি তরবারি হাতে লইয়া যখন নবী (স)-এর মাথার পাশে দণ্ডায়মান হইলাম তখন দেখিতে পাইলাম, সাদা পোশাক পরিধানকারী দীর্ঘাকৃতির এক ব্যক্তি আসিয়া আমার বুক ও পিঠ চাপিয়া ধরিলেন। ফলে আমি ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া পড়িলাম। তরবারি আমার হাত হইতে পড়িয়া গেল। আমি চিনিতে পারিলাম যে, ইনি আল্লাহ্র ফেরেশতা। এই অবস্থায় আমি ক'লেমা পড়িয়া মহানবী (স)-এর হাতে ইসলাম কবুল করিয়াছি। আমি আল্লাহ্র শপথ করিয়া বলিতেছি, কোন বড় বাহিনীই মুসলমানদের উপর জয়লাভ করিতে পারিবে না। পরে তিনি স্বগোত্রীয় লোকদিগকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানাইতে লাগিলেন। ওয়াকিদী বলেন, এই ঘটনা উপলক্ষে আল্লাহ তা'আলা নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন:
يأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا نِعْمَتَ اللهِ عَلَيْكُمْ إِذْ هَمَّ قَوْمٌ أَنْ يَبْسُطُوا إِلَيْكُمْ أَيْدِيَهُمْ فَكَفَّ أَيْدِيَهُمْ عَنْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ.
“হে মুমিনগণ! তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর। যখন এক সম্প্রদায় তোমাদের দিকে তাহাদের হস্ত প্রসারিত করিতে সচেষ্ট হইয়াছিল, তখন তিনি তাহাদের হস্ত তোমাদের হইতে প্রতিহত করিয়া দিলেন। আল্লাহকে ভয় কর। আর মুমিনদের উচিত আল্লাহ্র উপর পূর্ণ ভরসা রাখা" (৫:১১)।
তাফসীরে ইব্‌ন কাছীরেও অত্র আয়াত নাযিলের প্রেক্ষাপট বর্ণনায় অনুরূপ ঘটনার উল্লেখ রহিয়াছে। ইমাম বায়হাকী (র) বলেন, হিজরতের ৪তম মাসে সংঘটিত যাতুর-রিকা' যুদ্ধেও অনুরূপ ঘটনার উল্লেখ রহিয়াছে। অতএব বলা যায় যে, সম্ভবত একই ঘটনা পৃথক পৃথকভাবে দুইবার সংঘটিত হইয়া থাকিবে।
বেদুঈনদের উপর প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত এবং মুসলমানদের শক্তি-সামর্থ্য সম্পর্কে তাহাদিগকে ওয়াকিফহাল করাইবার জন্য মহানবী (স) সাহাবাদের লইয়া তৃতীয় হিজরীর পূর্ণ সফর মাসটি সেখানে অতিবাহিত করেন, অতঃপর মদীনায় ফিরিয়া আসেন।
এই যুদ্ধাভিযানে প্রত্যক্ষ সশস্ত্র লড়াই হয় নাই বিধায় ইসলামের ইতিহাসে ইহা কম আলোচিত হইয়াছে। কিন্তু ইসলামের ভিত্তি মজবুতকরণ, প্রচার-প্রসার এবং মুসলমানদের শক্তি-সাহস সুদৃঢ় করিবার ক্ষেত্রে এই ধরনের খণ্ড খণ্ড অভিযানগুলি সক্রিয় ভূমিকা পালন করিয়াছে। বানু ছা'লাবা গোত্রের জাব্বার এবং আরব বেদুঈনদের প্রখ্যাত যোদ্ধা গুরাছ বা দু'সুর ইব্‌ন হারিছ এই যুদ্ধাভিযানে মহানবী (স)-এর হাতে ইসলাম কবুল করিয়াছিলেন যাহা প্রত্যক্ষভাবে মুসলমানদের বিজয় ও উত্তরোত্তর অগ্রগতির সাক্ষ্যই বহন করে। ইয়াহুদী ও বেদুঈন জাতিও ইসলামের শক্তি সম্পর্কে এই অভিযানে আরও নিশ্চিত ধারণা লাভ করে। তাহারা শত্রুতা পরিত্যাগ না করিলেও মুসলমানদেরকে তুচ্ছ- তাচ্ছিল্য করিবার সাহস হারাইয়া ফেলে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 গাযওয়া বুহ্বান

📄 গাযওয়া বুহ্বান


বুরান (بحران) শব্দটি দুইভাবে পঠিত হইয়া থাকে : (ক) বাহরান (بحران) অর্থাৎ প্রথম হরফে যবর এবং দ্বিতীয় হরফ সাকিন যোগে।
(খ) বুহরান (بحران) অর্থাৎ প্রথম বর্ণে পেশ এবং দ্বিতীয় বর্ণে সাকিন যোগে। ওয়াকিদী (র)-এর বর্ণনামতে বুরান শব্দটি মূলত ছিল নাজরান (نجران), কিন্তু হাদীছে গাযওয়া ‘বুরান’ (غزوة بحران) ব্যবহৃত হইয়াছে।
বুরান বা বাহ্বান হইল মদীনার ফুরু’ (الفرع)-এর পার্শ্ববর্তী একটি স্থানের নাম। ফুরু’ হইতে মদীনার দূরত্ব আট বুরুদ (برد) বা আট মাইল। অন্য বর্ণনামতে, হিজাযের ফুরু’ সীমান্তে অবস্থিত খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ একটি স্থানের নাম বুহরান। রাসূলুল্লাহ (স) গাতাফান যুদ্ধ হইতে প্রত্যাবর্তনের পর তৃতীয় হিজরীর রবীউল আওওয়াল মাস মদীনায় অতিবাহিত করেন। এমতাবস্থায় নবী করীম (স)-এর নিকট সংবাদ পৌঁছে যে, হিজাযের খনি সমৃদ্ধ ‘বুহরান’ নামক স্থানে বানু সুলায়ম মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য একত্র হইয়াছে এবং ব্যাপক সামরিক প্রস্তুতি গ্রহণ করিয়াছে। এই খবর শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) হিজরতের ২৭ মাসের মাথায় রবী’উল আখির, মতান্তরে জুমাদাল উলা মাসে তিন শত মুসলিম সৈন্যের এক বাহিনী লইয়া তাহাদিগকে প্রতিহত করিবার জন্য ‘বুরান’ নামক স্থানের উদ্দেশে যুদ্ধযাত্রা করেন। যেহেতু ‘বুহরান’ নামক স্থানে এই যুদ্ধাভিযান পরিচালিত হয় সেইজন্য এই যুদ্ধকে ‘গাযওয়া বুহরান’ বলা হইয়া থাকে। সুলায়ম গোত্র মুসলমানদের বিরুদ্ধে যেহেতু এই যুদ্ধের অবতারণা করিয়াছে, সেইজন্য কেহ কেহ এই যুদ্ধকে ‘গাষওয়া বানু সুলায়ম’ বলিয়াও অভিহিত করিয়াছেন। এই যুদ্ধাভিযানে যাত্রার প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহ (স) ‘আবদুল্লাহ ইব্‌ন উম্মে মাকতুম (রা)-এর উপর অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য মদীনার বিচারকার্য, সালাতের ইমামতী প্রভৃতি কর্মের দায়িত্ব অর্পণ করিয়া যান।
ওয়াকিদী বলেন, মা’মার ইবন রাশিদ ইমাম যুহরী (র) হইতে আমার নিকট হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন, বানু সুলায়মের মুকাবিলার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর তিন শত সৈন্যের বাহিনী বুরান পৌঁছিতে আর মাত্র এক দিনের পথ বাকী থাকিতে বানু সুলায়মের এক ব্যক্তির সহিত পথিমধ্যে তাঁহাদের সাক্ষাত হয়। মুসলমানগণ সুলায়ম গোত্র, তাহাদের রণপ্রস্তুতি এবং বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে লোকটিকে জিজ্ঞাসা করিলেন। লোকটি এই বলিয়া সংবাদ দিল যে, সুলায়ম গোত্রের সমবেত সৈন্যদল গতকালই বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়িয়াছে এবং তাহারা নিজ নিজ স্থলে ফিরিয়া গিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে বন্দী করিয়া রাখিতে নির্দেশ দিলেন। অতঃপর নবী করীম (স) সৈন্যবাহিনী লইয়া বুহুরান নামক স্থানে পৌঁছিলেন, কিন্তু তথায় বিপক্ষ দলের কাহাকেও দেখিতে পাইলেন না। রাসূলুল্লাহ (স) যুদ্ধ বিজয়ের নিদর্শনস্বরূপ ঐ স্থানে ১০ (দশ) দিন, মতান্তরে ১৬ জুমাদাল উলা পর্যন্ত অবস্থান করিয়া মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন। কোন কোন বর্ণনায়, মুসলিম সৈন্যবাহিনী রাবীউল-আখির ও জুমাদাল উলা এই দুই মাস তথায় অবস্থান করিয়াছিল বলিয়া উল্লেখ রহিয়াছে। এই অভিযানে মুসলিম সৈন্যবাহিনীকে কোন প্রকার যুদ্ধের সম্মুখীন হইতে হয় নাই। কাফির বাহিনী মুসলিম সৈন্যদের ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত ও আতংকিত হইয়া বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ফিরিয়া গিয়াছিল।
এই সমরাভিযানে প্রত্যক্ষ লড়াই সংঘটিত না হইলেও ইসলামের প্রচার-প্রসার ও কাফিরদের হতবিহ্বল করিবার ক্ষেত্রে ইহার ইতিবাচক ভূমিকা ছিল। যুদ্ধক্ষেত্র হইতে কাফিরদের পলায়ন মুসলমানদের শক্তি ও সাহস বৃদ্ধি করিয়াছিল, ইসলামের জয়যাত্রা ও উত্তরণের পথকে করিয়াছিল সুগম ও সুসংহত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00