📄 সারিয়্যা সা'দ ইব্ন আবী ওয়াক্কাস (রা)
রাসুলুল্লাহ (স) কুড়িজন সাথীসহ হযরত সা'দ ইব্ন আবু ওয়াক্কাস (রা.)-কে কুরায়শদের একটি কাফেলার খোঁজ-খবর নেওয়ার জন্য হিজরী ১ম বর্ষের যী-কা'দা (মে ৬২৩ খৃ.) মাসে রওয়ানা করেন। তাহাদের প্রতি তাগিদ ছিল তাহারা যেন কোনক্রমেই খাররার নামক স্থানটি অতিক্রম না করেন। তাহারা পদব্রজে রওয়ানা হন। সারা রাত ধরিয়া পথ চলিয়া দিনের বেলা তাহারা আত্মগোপন করিয়া থাকিতেন। পঞ্চম দিনের প্রত্যুষে খাররার পৌঁছিয়া তাহারা জানিতে পারেন যে, কুরায়শদের কাফেলা একদিন পূর্বেই এই স্থান অতিক্রম করিয়া চলিয়া গিয়াছে।
এই অভিযানের পতাকাও সাদা ছিল এবং পতাকা বহন করেন হযরত মিকদাদ ইব্ন আমর (রা) (দ্র. আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ৬; উযূনুল আছার, ইব্ন সায়্যিদিন নাস, ১খ., পৃ. ২২৫)। স্থানের নামানুসারে ঐ সারিয়্যাকে সারিয়্যায়ে খাররার নামেও অভিহিত করা হইয়া থাকে। ঐ স্থানটি জুহ্ফার অনতিদূরে অবস্থিত।
ইন্ন হিশাম বলেন, কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে খাররার অভিযান হযরত হামযা (রা)-এর অভিযানের পরে প্রেরিত হইয়াছিল (দ্র. সীরাতুন নবী, ইন্ন হিশাম, ২খ., পৃ. ২৮৯)।
প্রকৃতপক্ষে ইসলামের ইতিহাসের সর্বপ্রথম অভিযান ছিল উক্ত তিনটি অভিযান। তাই মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে মহানবী (স)-এর সকল জীবনীকারই ঐ সারিয়্যাগুলির গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করিয়াছেন। বিশেষত পাশ্চাত্যের লেখকগণ এই প্রসঙ্গে তাহাদের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী ইসলামের যুদ্ধপ্রসঙ্গ এবং ঐ সময়কার প্রেক্ষাপটও আলোচনা করিয়াছেন। এই অভিযানগুলির সুদূরপ্রসারী প্রভাব সম্পর্কে পাশ্চাত্যের একজন লেখিকা মন্তব্য করেনঃ
The early raids of 623 were not very successful. It was difficult to get accurate information about the movement of the caravan. no goods were siezed and there was no fighting. But the Macen world have been rafited and irritated. They have to take Precautions is that had never been necessary before and the Beduin tribes along the Red sea coast (the preferred trade route) would have been im.pressed by the muslims pluck Even though the early raiders failed to attack the Caravans. They made Treaties with Tribes a various Strategic points along the Red.
"৬২৩ খৃস্টাব্দের প্রথম দিককার অভিযানসমূহ খুব সফল ছিল না। কাফেলাসমূহের গতিবিধি সম্পর্কে সঠিক তথ্যলাভ ছিল খুবই দুরুহ। ফলে কোন যুদ্ধও হয় নাই এবং তাহাদের মালামাল কাড়িয়া লওয়াও সম্ভব হয় নাই। কিন্তু মক্কাবাসীরা তাহাতে অত্যন্ত বিব্রত এবং দিশাহারা হইয়া পড়িয়াছিল। তাহাদিগকে এমন সব সতর্কতা অবলম্বন করিতে হইতেছিল যাহার প্রয়োজন ইতোপূর্বে কোন দিনই পড়ে নাই। তাহা ছাড়া লোহিত সাগর উপকূলবর্তী পছন্দনীয় এই বাণিজ্য পথটির বেদুঈন গোত্রগুলি মুসলমানদের এই ধরনের অভিযানে বেশ অভিভূত হইয়াছিল। ঐ প্রাথমিক অভিযাত্রী দলগুলির কাফেলা আক্রমণ যদিও ব্যর্থ হইয়াছিল তথাপি ইহার ফলে এই পথের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসবাসকারী গোত্রগুলির সহিত সন্ধি স্থাপনে বা সমঝোতা গড়িয়া তুলিতে তাহারা সক্ষম হইয়াছিল" (Karen Armstrong, Muhammad, holy war অধ্যায়, পৃ. ১৬৯-১৭০)।
বস্তুত ঐ শেষোক্ত সাফল্যগুলিই ছিল উক্ত সারিয়্যা অভিযানগুলির দ্বারা মুসলমানদের চরম প্রাপ্তি, যাহা পরবর্তী কালে তাহাদের সকলের চাবিকাঠিরূপে প্রতিপন্ন হইয়াছে। মহানবী (স)-এর এই প্রতিরক্ষা কৌশল ছিল একজন দূরদর্শী ও কুশলী সমরবিদসুলভ। ঐ সাফল্যের জন্যই ইসলামের ইতিহাসে ঐ প্রাথমিক সারিয়্যাগুলি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করিয়া আছে।
📄 গাযওয়া আল-উশায়রা
হিজরী দ্বিতীয় সনের জুমাদাল উলার মাঝামাঝি সময়ে রাসূলুল্লাহ (স) দুই শত মুহাজিরকে সঙ্গে লইয়া কুরায়শদের সিরিয়াগামী এক কাফেলার উপর হামলা করার জন্য 'উশায়রা নামক স্থানের দিকে রওয়ানা হন। এই সময় আবূ সালামা ইব্ন আবদুল আসাদ মাখযুমীকে মদীনার শাসক নিয়োগ করা হয়। কুরায়শদের এই কাফেলা পণ্যসামগ্রী লইয়া মক্কা হইতে সিরিয়া অভিমুখে রওয়ানা হইয়াছিল। "ইয়াম্বু” নামক স্থানে পৌঁছিয়া রাসূলুল্লাহ (স) জানিতে পারিলেন যে, কাফেলা ইতোপূর্বেই সিরিয়া চলিয়া গিয়াছে বিধায় কাফেলার অপেক্ষায় জুমাদাল উলার অবশিষ্ট দিন ও জুমাদাছ ছানিয়ার কয়েক দিন সেই স্থানে অবস্থান করেন। অবশেষে মুদলিজ গোত্র ও তাহাদের মিত্র বনূ দামরার সাথে সন্ধি চুক্তি করিয়া মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন। এই অভিযানে হযরত হামযা (রা)-এর হাতে পতাকা ছিল। উল্লেখ থাকে যে, কুরায়শদের বাণিজ্যিক কাফেলাটি যখন সিরিয়া হইতে প্রত্যাবর্তন করে তখন রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে পর্যুদস্ত করার জন্য পুনরায় অভিযানে বাহির হন তখনই মূল বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
এই অভিযানে মুদলিজ গোত্র ও তাহাদের মিত্র গোত্র বনূ দামরার সাথে যে সন্ধি চুক্তি স্বাক্ষরিত হইয়াছিল—তাহা নিম্নরূপ:
بسم الله الرحمن الرحيم هذا كتاب من محمد رسول الله صلى الله عليه وسلم لبنى ضمرة بأنهم آمنون على اموالهم وانفسهم وان لهم النصرة على من رامهم ان لا يحاربوا في دين الله ما بل بحر صوفة وان النبى اذ دعاهم لنصره اجابوه عليهم بذالك ذمة الله وذمة رسوله ولهم النصرة على من بر واتقى.
"দয়াময় পরম দয়ালু আল্লাহ্ নামে। এই চুক্তিপত্র আল্লাহ্র রাসূল মুহাম্মাদ (স)-এর পক্ষ হইতে বানু দামরার প্রতি; তাহাদের জীবন ও ধনসম্পদ নিরাপদ থাকিবে। যে ব্যক্তি বানু দামরার সহিত অনর্থক যুদ্ধের ইচ্ছা করিবে তাহার বিরুদ্ধে বানু দামরাকে সাহায্য করা হইবে এই শর্তে যে, সমুদ্র শুষ্ক হইয়া যাইবার পূর্ব পর্যন্ত তাহারা আল্লাহর দীনের বিরুদ্ধে কোন প্রকার যুদ্ধ-বিগ্রহ করিবে না (অর্থাৎ এই হুকুম সদাসর্বদা বলবৎ থাকিবে)। আর নবী (স) যখন তাহাদিগকে তাঁহার সাহায্যের জন্য আহ্বান করিবেন তখন তাহারা তাঁহার ডাকে সাড়া দিবে। যে ব্যক্তি সৎকর্ম করিবে এবং পরহেযগারী অবলম্বন করিবে তাহাদের সহিত আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের সাহায্যের অঙ্গীকারনামা ও তাহাদের যাবতীয় দায়- দায়িত্ব আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের যিম্মায় থাকিবে।"
এই অভিযান সম্পর্কে ইমাম বুখারী (র) আবূ ইসহাক হইতে বর্ণনা করিয়াছেন: قال كنت إلى جنب زيد بن ارقم فقيل له كم غزا رسول الله صلى الله عليه وسلم من غزوة قال تسع عشر قلت كم غزوات أنت معه قال سبع عشر غزوة قلت فايهن كان اول قال العشيرة او العسيرة.
"আবূ ইসহাক (র) বলেন, আমি যায়দ ইব্ন আরকাম (র)-এর পার্শ্বে অবস্থিত ছিলাম। তাহাকে জিজ্ঞাসা করা হইল, রাসূলুল্লাহ (স) কতটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিয়াছেন? তিনি বলিলেন, উনিশটিতে। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনি তাহার সহিত কয়টি যুদ্ধে শরীক ছিলেন? তিনি বলিলেন, সতেরটিতে। আমি পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলাম, প্রথম যুদ্ধ কোনটি? তিনি বলিলেন, উশায়রা কিংবা উসায়রা।"
এই হাদীছ হইতে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামের প্রথম গাওয়া হইল উশায়রা। এই অভিযানে হযরত আলী (রা) রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক আবূ তুরাব (ابو تراب) উপনামে ভূষিত হইয়াছেন।
📄 সারিয়্যা আবদুল্লাহ ইব্ন জাহ্শ (রা)
রাসূলুল্লাহ (স) হিজরতের সপ্তদশ মাসে অর্থাৎ দ্বিতীয় হিজরীর রজব মাসে আবদুল্লাহ ইব্ন জাহ্শ (রা)-এর নেতৃত্বে আটজন অথবা বারজন সদস্যের এক বাহিনীকে কুরায়শদের গতিবিধি লক্ষ্য করার জন্য মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী নাখলা নামক স্থানে প্রেরণ করেন। এই বার জন হইলেন : ১. আবদুল্লাহ ইব্ন জাহ্শ (রা), আমীর; ২. আবূ হুযায়ফা ইব্ন উতবা (রা), সদস্য; ৩. উত্ত্বা ইব্ন গাযওয়ান (রা), সদস্য; ৪. উক্কাশা ইব্ন মিহসান (রা), সদস্য; ৫. সা'দ ইব্ন আবী ওয়াক্কাস (রা), সদস্য; ৬. ওয়াকিদ ইব্ন আবদুল্লাহ (রা), সদস্য; ৭. আমের ইব্ন রবী'আ (রা), সদস্য; ৮. খালিদ ইব্ন বুকায়র (রা), সদস্য; ৯. সুহায়ল ইব্ন বায়দা (রা), সদস্য; ১০. আমের ইব্ন আয়্যাস (রা), সদস্য; ১১. সায়ান ইব্ন বায়দা (রা), সদস্য এবং ১২. মিকদাদ ইবন আমর (রা), সদস্য।
ইবন হিশাম (র) বলেন, এই কাফেলাতে আবদুল্লাহ ইব্ন জাহ্শ (রা) ব্যতীত আটজন মুহাজির ছিলেন, তাঁহাদের মধ্যে কোন আনসার সাহাবী ছিলেন না। ইবন কাছীর বলেন, এই অভিযানে রাসূলুল্লাহ (স) প্রথমে আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা)-কে আমীর মনোনীত করেন, কিন্তু যাত্রার শুরুতেই তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিচ্ছেদে কান্নায় ভাঙ্গিয়া পড়িলে তখন রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার পরিবর্তে আবদুল্লাহ ইব্ন জাহ্শ (রা)-কে নিযুক্ত করেন।
মু'জাম তাবারানীতে জুনদুব আল-বাজালী (রা) হইতে হাসান সনদে বর্ণিত হইয়াছে যে, যখন আবদুল্লাহ ইব্ন জাহ্শ (রা) যাত্রার জন্য প্রস্তুত হইলেন তখন রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার হাতে একটি মুখবদ্ধ পত্র দিয়া নির্দেশ দিলেন তিনি যেন দুই দিনের পথ অতিক্রম করিবার পর পত্রখানা খুলিয়া ইহার মর্মানুসারে কাজ করেন এবং নিজ সাথীদেরকে এই কাজে জোরপূর্বক বাধ্য না করেন।
ইন্ন ইসহাক (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)- এর নির্দেশানুসারে আবদুল্লাহ ইব্ন জাহ্শ (রা) দুই দিন পর পত্র খুলিলেন। ইহাতে লিখা ছিলঃ اذا نظرت في كتابى فامض حتى تنزل نخلة بين مكة والطائف فترصد بها قريشا وتعلم لنا من اخبارهم.
"আমার এই পত্র যখন দেখিবে তখন তুমি সামনে অগ্রসর হইবে এবং মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী স্থান নাখলায় গমন করিয়া কুরায়শদের গতিবিধি লক্ষ্য করিয়া তাহাদের সমস্ত তথ্য আমাকে অবহিত করিবে”
এই কাজটি অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ও জীবনের ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার কারণে আবদুল্লাহ ইব্ন জাহ্শ (রা) সঙ্গীগণকে এই ব্যাপারে পূর্ণ এখতিয়ার দিলেন। তাঁহারা সকলেই রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই নির্দেশকে অম্লান বদনে মানিয়া নিলেন এবং সকলেই "নাখলা" গমনে সম্মতি জ্ঞাপন করিলেন। কিন্তু ঘটনাক্রমে হযরত সা'দ ইব্ন আবী ওয়াক্কাস (রা) ও উতবা ইব্ন গাওয়ান (রা) যে উষ্ট্রে আরোহণ করিয়াছিলেন তাহা হারাইয়া যায়। তাঁহারা উভয়ে উটের সন্ধানে বহু দূর চলিয়া যান। যখন তাঁহারা উটের সন্ধান পাইলেন তখন পথ হারাইয়া ফেলিলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁহারা তাহাদের কাফেলার সহিত নাখলায় পৌঁছিতে পারিলেন না, পশ্চাতেই থাকিয়া গেলেন।
যখন আবদুল্লহ ইব্ন জাহ্শ (রা)-এর কাফেলা নাখলায় পৌঁছিল তখন রজব মাসের শেষ ভাগ, যাহা নিষিদ্ধ মাসসমূহের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সন্ধ্যার দিকে কুরায়শদের একটি কাফেলা আগমন করে যাহাতে আমর ইবন হাদরামী, আবদুল্লাহ ইব্ন মুগীরার দুই পুত্র উছমান ও নাওফল এবং মুগীরার ক্রীতদাস হাকাম ইবন কায়সান ছিল। কাফেলার উষ্ট্রের উপর খেজুর ও বাণিজ্য সম্ভার ছিল। সাহাবায়ে কিরাম চিন্তা করিলেন উভয় সংকটের কথাঃ যদি এই কাফেলাকে ছাড়িয়া দেওয়া হয় তাহা হইলে মক্কায় গমন করিয়া তাহারা আমাদের উপস্থিতির কথা প্রচার করিয়া দিবে। অপরদিকে এখন রজব মাস যাহাতে সর্বপ্রকার যুদ্ধবিগ্রহ নিষিদ্ধ। অবশেষে তাঁহারা সিদ্ধান্ত নিলেন, ইহাদেরকে ছাড়িয়া দেওয়া সমীচীন হইবে না। লড়াই-এর মাধ্যমেই ইহার সমাধান করিতে হইবে। এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার পর ওয়াকিদ তামীমী সর্বপ্রথম শত্রুদলের উপর তীর নিক্ষেপ করিলেন। ফলে আমর ইবন হাদরামী মৃত্যুমুখে পতিত হইল। আর উছমান ও হাকামকে তাঁহারা বন্দী করিলেন এবং নাওফিল প্রাণ নিয়া কোনমতে পলায়ন করিল।
আরবজাতির সকল ধর্মমতেই রজব, যুল কা'দা, যুলহিজ্জা ও মুহাররম এই মাস চতুষ্টয়কে "আশহুরুল হুরুম" (اشهر الحرم) তথা সম্মানিত মাস বলিয়া গণ্য করা হইত। এই মাসগুলিতে যুদ্ধ-বিগ্রহ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ছিল। ইসলামেও তখন ইহা সমর্থিত ছিল, অবশ্য পরবর্তীতে তাহা মানসূখ হইয়া গিয়াছে কিনা এই ব্যাপারে মতপার্থক্য রহিয়াছে।
এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার কারণে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাদের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করিলেন। এমনকি তাহাদের আনীত গনীমতের মাল ও বন্দীদ্বয়কে গ্রহণ করিতেও অসম্মতি জ্ঞাপন করিলেন। অপরদিকে কাফির মুশরিকরা বলাবলি শুরু করিল যে, মুসলমানরা হারাম মাসের পবিত্রতা ক্ষুণ্ণ করিয়াছে। চতুর্দিক হইতে প্রশ্ন উত্থাপিত হইল, এই মাসগুলি সম্পর্কে ইসলাম ধর্মের নীতি কি? তাহাদের প্রশ্নের জবাবে আল্লাহ তা'আলা ওহী অবতীর্ণ করিলেন : يَسْتَلُونَكَ عَنِ الشَّهْرِ الْحَرَامِ قِتَالٍ فِيْهِ قُلْ قِتَالٌ فِيْهِ كَبِيرٌ وَصَدٌ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ وَكُفْرٌ به وَالْمَسْجِدِ الْحَرَامِ وَإِخْرَاجُ أَهْلِهِ مِنْهُ أَكْبَرُ عِنْدَ اللهِ.
"লোকেরা আপনাকে হারাম মাস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। আপনি বলিয়া দিন, এই মাসসমূহে (ইচ্ছাকৃতভাবে) যুদ্ধ করা ভীষণ অন্যায়। কিন্তু আল্লাহ্র পথ হইতে লোকদেরকে বাধা প্রদান করা, আল্লাহর সাথে এবং মসজিদে হারামের সাথে কুফরী করা এবং মসজিদে হারামের অধিবাসীদেরকে বহিষ্কার করা আল্লাহর নিকট তাহার চাইতেও বড় অপরাধ। আর বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হত্যার চাইতেও ভয়াবহ” (২:২১৭)।
ইবন ইসহাক (র) বলেন, এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (স) আবদুল্লাহ ইব্ন জাহ্শ বাহিনী কর্তৃক লব্ধ গনীমতের মালামাল ও বন্দীদ্বয়কে গ্রহণ করিলেন এবং উহা তাহাদের মধ্যে বণ্টন করিলেন। ওয়াকিদী (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) এই গনীমতের মাল বদরের যুদ্ধ হইতে প্রত্যাবর্তনের পর মুজাহিদগণের মাঝে বণ্টন করিয়া দেন। ইহাই ইসলামের প্রথম খুমুস।
ওয়াকিদ ইব্ন আবদুল্লাহ তামীমীর তীরের আঘাতে আমর ইবন হাদরামী নিহত হইয়াছিল বিধায় আমরই সর্বপ্রথম নিহত কাফির এবং ওয়াকিদ (রা) হইলেন সর্বপ্রথম হত্যাকারী মুজাহিদ। আর উছমান ও হাকামই ছিল মুসলমানদের হাতে প্রথম বন্দী।
এ ঘটনার পর মক্কাবাসিগণ দূত প্রেরণ করিয়া বন্দীদ্বয়ের মুক্তি কামনা করে। مسلمانوں এই বাহিনীর যেই দুইজন উটের সন্ধানে ব্যাপৃত ছিলেন তাঁহারা মদীনায় প্রত্যাবর্তনের পর রাসূলুল্লাহ (স) বন্দীদ্বয়কে মুক্তি দিলেন। "কায়সান” মুক্তি পাইয়া ইসলাম গ্রহণ করেন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতেই থাকিয়া যান। অপরদিকে উছমান ইব্ন আবদুল্লাহ মক্কায় চলিয়া যায় এবং কাফির অবস্থায় তাহার মৃত্যু হয়।
হারাম মাসসমূহে যুদ্ধ সম্পর্কিত আয়াত নাযিল হওয়ার পর আবদুল্লাহ ইব্ন জাহ্শ (রা) ও তাঁহার সঙ্গীগণ জিজ্ঞাসা করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা কি এই অভিযানের জন্য মুজাহিদের ছওয়াব প্রাপ্ত হইব? তখন এই আয়াত নাযিল হয়: إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ هَاجَرُوا وَجَاهَدُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أُولَئِكَ يَرْجُونَ رَحْمَةَ اللَّهِ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيم.
"যাহারা ঈমান আনে এবং যাহারা হিজরত করে ও জিহাদ করে আল্লাহর পথে, তাহারাই আল্লাহ্ অনুগ্রহ প্রত্যাশা করে। আল্লাহ ক্ষমাপরায়ণ, পরম দয়ালু” (২: ২১৮)।
ইব্ন হিশাম- এর বর্ণনামতে এই সুসংবাদ প্রাপ্ত হইয়া আবদুল্লাহ ইবন জাহ্শ (রা) নিম্নের পংক্তিগুলি আবৃত্তি করেন:
تعدون قتالا في الحرام عظيمة + واعظم منه نويري الرشد راشد مدود كم عما يقول محمد + وكفربه والله راء وشاهد واخراجكم من مسجد الله اهله + لئلا يرى الله في البيت ساجد
"তোমরা হারাম মাসে যুদ্ধ করা গর্হিত গণ্য কর, তবে সত্যদ্রষ্টার জন্য ইহা হইতে অধিক গর্হিত হইল: মুহাম্মাদের বাণী প্রচারে তোমাদের বাঁধা দান এবং তা প্রত্যাখ্যান। আল্লাহ্ই ইহার প্রত্যক্ষকারী ও সাক্ষী যে, তোমরা আল্লাহর ঘর হইতে ইহার অধিবাসিগণকে বহিষ্কার কর যাহাতে আল্লাহ্ ঘরে কেছ ইবাদতকারী না থাকে, ইহাও অত্যন্ত গর্হিত কাজ"।
📄 গাযওয়া বদর আল-কুবরা
বদর যুদ্ধ হযরত রাসূলে কারীম (স) কর্তৃক পরিচালিত প্রথম সফল যুদ্ধ। এই প্রথম কাফির কুরায়শদের সহিত মুসলমানদের সশস্ত্র যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ইহাতে মুসলমানগণ গৌরবময় বিজয় অর্জন করেন এবং কাফিররা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। এই যুদ্ধে মুসলমানগণ বিজয়ী হওয়ার কারণেই দীন ইসলাম পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হয়, মুসলমানদের মনোবল বৃদ্ধি পায় এবং কাফির কুরায়শদের দম্ভ চূর্ণ হয়। আল্লাহ তা'আলা এই যুদ্ধে সরাসরি ফেরেশতা পাঠাইয়া মুসলমানদেরকে সাহায্য করেন এবং মুসলমানদের মনোবল চাঙ্গা করিবার জন্য কাঁফিরদের সৈন্যসংখ্যা তাহাদের দৃষ্টিতে কম করিয়া দেখান। আল-কুরআনুল কারীমের সূরা আল-আনফাল-এ ব্যাপকভাবে এবং অন্যান্য সূরায় সংক্ষিপ্তভাবে এই যুদ্ধের কথা উল্লেখ করা হইয়াছে।
বদর-এর ভৌগোলিক বর্ণনাঃ বদর মূলত একটি কূপের নাম। সেই সূত্রে উহার নিকটবর্তী প্রান্তরকে বদর প্রান্তর বলা হয়। কূপটি খনন করান বদর ইন্ন কুরায়শ ইন্ন ইয়াখলুদ, মতান্তরে বদর ইবনুল হারিছ নামে গিফার গোত্রের এক ব্যক্তি। তাহার নামানুসারে উহার নাম রাখা হয় বদর। ইহা মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী হিজাযের একটি প্রসিদ্ধ ঝর্ণা ও স্থান। ইহা মদীনা মুনাওয়ারা হইতে দক্ষিণ-পশ্চিমদিকে আল-জার সমুদ্র বন্দর হইতে এক রাত্রির সফর পরিমাণ দূরত্বে অবস্থিত। ইহা উঁচু উঁচু পর্বতমালা দ্বারা পরিবেষ্টিত একটি দুর্গম স্থান। ইহা ডিম্বাকৃতির সাড়ে পাঁচ মাইল দীর্ঘ ও সাড়ে চার মাইল প্রস্থ সুবিস্তীর্ণ ময়দান। শিবলী নু'মানীর বর্ণনামতে, ইহা মদীনা মুনাওয়ারা হইতে প্রায় ৮০ (আশি) মাইল দূরে অবস্থিত। এক বর্ণনামতে মদীনা হইতে বদর-এর দূরত্ব প্রায় ৪ (চার) মন্যিল অথবা ২৮ ফারসাখ।
জাহিলী যুগে এইখানে প্রতি বৎসর ১লা যুলকা'দা হইতে ৮ (আট) দিন পর্যন্ত একটি বিরাট মেলা অনুষ্ঠিত হইত। বর্তমানেও এইখানে প্রতি শুক্রবার একটি মেলা অনুষ্ঠিত হয়। ঘৃত, চামড়া, বালসান, তেল, উট, বকরী, পশমী কোর্তা ইত্যাদি বিক্রয়ের জন্য মেলায় আনা হয়।
যুদ্ধের কারণঃ এই যুদ্ধে সংঘটনের কারণ সম্পর্কে দুই ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়। উভয় বর্ণনার পিছনেই নির্ভরযোগ্য যুক্তি রহিয়াছে। বর্ণনা দুইটি নিম্নরূপ:
(১) অধিকাংশ সীরাতবিদগণের মতে কুরায়শ নেতা আবূ সুফয়ান ইবন হারব-এর নেতৃত্বে ৩০ বা ৪০ জনের, মতান্তরে ৭০ জনের একটি বাণিজ্যিক কাফেলা বাণিজ্য ব্যাপদেশে শাম (সিরিয়া) গিয়াছিল। তাহাদের সহিত প্রচুর পণ্যসম্ভার ছিল। এক বর্ণনামতে ৫০ হাজার স্বর্ণমুদ্রা ও এক হাজার উট ছিল। উক্ত কাফেলায় মাখরামা ইবন নাওফাল ও আমর ইবনুল আসও ছিলেন, যাহারা পরবর্তী কালে ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ (স) শাম হইতে তাহাদের প্রত্যাবর্তনের সংবাদ পাইয়া মদীনার মুসলমানগণকে ডাকিয়া উহার প্রতি উদ্বুদ্ধ করিয়া বলিলেন, এই যে কুরায়শদের বাণিজ্যিক কাফেলা আসিতেছে তাহাদের সহিত তাহাদের প্রচুর সম্পদ রহিয়াছে। তোমরা তাহাদের প্রতিরোধে বাহির হও, হয়তোবা আল্লাহ তোমাদিগকে উক্ত সম্পদ গনীমত হিসাবে প্রদান করিবেন।
অতঃপর মুসলমানগণকে উক্ত কাফেলার অনুসন্ধানে বাহির হইবার জন্য ঘোষণা দেওয়া হইল। কতক মুসলমান ইহা ভাল মনে করিল এবং বাহির হওয়ার বিষয়টি সহজে মানিয়া লইল। আর কতকে বাহির হওয়া অপছন্দ করিল। ইহা এই কারণে যে, তাহারা ধারণাও করিতে পারেন নাই যে, রাসূলুল্লাহ (স) যুদ্ধের সম্মুখীন হইবেন। রাসূলুল্লাহ (স)-ও ইহার জন্য খুব গুরুত্ব সহকারে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন নাই। তিনি এই বলিয়া ঘোষণা দেন, যে প্রস্তুত আছে সে আমাদের সহিত রওয়ানা হউক। কেহ কেহ একটু দূরে মদীনার উচু অঞ্চলে তাহাদের বাড়িতে গিয়া প্রস্তুত হইয়া আসিবার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করিল। তিনি বলিলেন, না, এখনই যে প্রস্তুত আছে সে ব্যতীত আর কেহ নহে। এইভাবে তিনি মাত্র ৩১৩ জন সাহাবী লইয়া উক্ত বাণিজ্যিক কাফেলার উদ্দেশ্যে বাহির হইলেন। অপরদিকে আবূ সুফ্য়ান এই সংবাদ পাইয়া দামদাম ইবন 'আমর আল-গিফারীকে মজুরী দিয়া এই সংবাদ কুরায়শদের নিকট পৌঁছাইতে এবং তাহাদিগকে যুদ্ধের প্রস্তুতি লইয়া বাহির হইতে উদ্বুদ্ধ করিবার জন্য মক্কায় প্রেরণ করিলেন। আর নিজে সোজা পথে বদরের দিকে না গিয়া সমুদ্রোপকূলের দিক দিয়া বদরকে বাম দিকে রাখিয়া মক্কার পথ ধরিলেন। কুরায়শগণ যুদ্ধের পূর্ণ প্রস্তুতি লইয়া বদর প্রান্তরে আসিয়া উপনীত হইল। আর রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীগণসহ আবূ সুফ্য়ানের চলিয়া যাওয়ার সঠিক পথ অবহিত হইতে না পারিয়া বদর প্রান্তরে আসিয়া পৌঁছিলেন। এইখানে পৌছিয়া তিনি কুরায়শ বাহিনীর যুদ্ধপ্রস্তুতিসহ আগমনের সংবাদ জানিতে পারিয়া সাহাবীদের সহিত পরামর্শক্রমে যুদ্ধের পূর্ব-প্রস্তুতি না থাকা সত্ত্বেও কুরায়শ বাহিনীর সহিত সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিলেন। সেইমত বদর প্রান্তরে উভয় পক্ষের মধ্যে প্রচণ্ড যুদ্ধ সংঘটিত হইল। পূর্বে হইতে যুদ্ধ করার সংকল্প থাকিলে তিনি আরও সৈন্য ও যুদ্ধোপকরণ সংগ্রহ করিতে পারিতেন।
(২) এই সম্পর্কে দ্বিতীয় মতটি পোষণ করিয়াছেন পরবর্তী কালের কতিপয় সীরাতবিদ। তাহা হইল, রাসূলুল্লাহ (স) ও সাহাবীগণ মদীনায় হিজরত করিয়া সেখানে সুখ-শান্তিতে দিনাতিপাত করিতেছেন এবং নির্বিঘ্নে আপন দ্বীন ইসলাম শুধু পালনই করিতেছেন না, বরং মদীনার প্রায় সকল লোককে তাঁহাদের অনুসারী বানাইয়া ফেলিতেছেন। ইহা দেখিয়া মক্কার কুরায়শগণ হিংসায় জ্বলিতে লাগিল। অপরদিকে নিজেদের কৃত অত্যাচার ও গভীর ষড়যন্ত্রের কথা তাঁহাদের স্মরণে উদিত হইত। তাঁহারা নিজেদের মানসিকতার হিসাবে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করিতেছিল যে, সুযোগ পাইলেই মুহাম্মাদ এই সকল অত্যাচারের প্রতিশোধ গ্রহণ করিবেন। এতদতীত মুসলমানগণ মদীনায় প্রবল হইয়া উঠিলে তাঁহাদের পক্ষে সিরিয়ার বাণিজ্যপথ যে একেবারে বন্ধ হইয়া যাইবে এবং ইহার ফলে তাঁহাদেরকে যে ভীষণ অসুবিধায় পড়িতে হইবে, এই কথাও তাঁহারা সম্যক হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিয়াছিল। এই সকল কারণে মুসলমানদের সহিত যথাসম্ভব সত্বর যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার জন্য কুরায়শ দলপতিগণ আগ্রহী হইয়া উঠে।
তাই কিভাবে মুসলমানদের এই দলটিকে ধরাশায়ী হইতে চিরতরে বিলীন করিয়া দেওয়া যায়, কিভাবে তাঁহাদিগকে সমূলে ধ্বংস করা যায়, তাঁহারা সর্বদা তাহারই ফন্দি-ফিকির করিতে লাগিল এবং সেইজন্য নানভাবে ষড়যন্ত্র করিতে লাগিল। এমনকি তাঁহারা সরাসরি মদীনা আক্রমণের প্রস্তুতি শুরু করিয়া দিয়াছিল। তাঁহারা মুনাফিক সরদার আবদুল্লাহ ইবন উবাইকে এই মর্মে এক পত্র প্রেরণ করিয়াছিল যে, হে মদীনা বাসী! তোমরা আমাদের চরম শত্রু মুহাম্মাদকে নিজ দেশে আশ্রয় দিয়াছ। হয় তোমরা যুদ্ধ করিয়া তাহাকে ধ্বংস কর, না হয় নিজেদের দেশ হইতে তাহাকে বাহির করিয়া দাও। আমরা কসম করিয়া বলিতেছি যে, এই দুইটি শর্তের কোনও একটি তোমরা অবলম্বন না করিলে আমরা নিজেদের সমস্ত শক্তি লইয়া তোমাদিগকে আক্রমণ করিব, তোমাদের যুবক দলকে হত্যা করিব এবং তোমাদের স্ত্রীলোকদেরকে বাঁদী বানাইয়া লইব।
মদীনা আক্রমণের উদ্দেশ্যেই কুরায়শদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গুপ্তচর দল মদীনার দিকে আনাগোনা করিত এবং সুযোগ পাইলেই মুসলমানদের সম্পদ লুণ্ঠন করিয়া পালাইয়া যাইত। কুবয় ইবন জাবির আল-ফিহরীর কথা পূর্বেই (গাওওয়া বদর আল-উলা অধ্যায়) উল্লেখ করা হইয়াছে। এই সকল ক্ষুদ্র বাহিনীর লুটতরাজ হইতে রক্ষা পাওয়ার জন্য এবং কুরায়শদের গতিবিধির প্রতি লক্ষ্য রাখিবার জন্য রাসূলুল্লাহ (স) বিভিন্ন দিকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল প্রেরণ করিতে থাকেন। কারণ তিনি কুরায়শদের দূরভিসন্ধি সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হইয়াছিলেন। এই প্রেক্ষিতেই বুওয়াত ও উশায়রা প্রভৃতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গাওওয়া সংঘটিত হইয়াছিল। কিন্তু ইহাতে কুরায়শদের হিংসার আগুন নির্বাপিত হইতেছিল না। তাহারা চাহিতেছিল মুসলমানদের সহিত একটি সিদ্ধান্তমূলক যুদ্ধ। তাই কুরায়শ দল মদীনায় বড় ধরনের একটি আক্রমণের সংকল্প করে। আর ইহার জন্য প্রয়োজন বিপুল অস্ত্রসম্ভার ও অর্থ-সম্পদের, যাহা দ্বারা রসদপত্র সংগ্রহ করা যায়। তাই এই উদ্দেশ্যে তাহারা অগাধ ধন-সম্পদ দিয়া হিজরী দ্বিতীয় সনের জুমাদাল উখরা মাসে আবু সুয়ানের নেতৃত্বে একটি বাণিজ্যিক কাফেলা সিরিয়ায় প্রেরণ করে। তাহারা এতই গুরুত্বের সহিত সম্পদ সংগ্রহ করিয়াছিল যে, মক্কার নর-নারীদের মধ্যে এক রত্তি বা মাসা পরিমাণ স্বর্ণ-রৌপ্যও যাহার নিকট ছিল সেও উহা এই কাফেলার সহিত প্রেরণ করিয়াছিল।
মোট প্রায় পঞ্চাশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা আবূ সুফ্যানের সঙ্গে প্রেরণ করা হয়। তাহার বাণিজ্যসম্ভার বহন করিবার জন্য এক হাজার উট তাহার সঙ্গে চলিল। এই বণিক দল তিন মাস সিরিয়ায় অবস্থান করিয়া সরঞ্জামাদির ক্রয়-বিক্রয় সমাপ্ত করিয়া মক্কায় রওয়ানা হয়। তাহারা সিরিয়া হইতে প্রত্যাবর্তনের পূর্বেই 'নাখলা' নামক স্থানে কুরায়শ গোত্রের 'আমর আল-হাদরামী মুসলমান গুপ্তচরদের হাতে নিহত হয়। ইহাতে কুরায়শদের প্রতিশোধ স্পৃহা বহু গুণে বাড়িয়া যায়। ইতোমধ্যে গুজব রটিল যে, মদীনার মুসলমানগণ কুরায়শদের উক্ত বাণিজ্যিক কাফেলা লুণ্ঠন করিবার জন্য অগ্রসর হইতেছে। ইহাতে মক্কার কুরায়শদের অগ্নিতে ঘৃত নিক্ষেপের ন্যায় প্রতিশোধের আগুন দাউ দাউ করিয়া জ্বলিয়া উঠিল এবং তাহা সমগ্র আরবে ছড়াইয়া পড়িল। কাফেলার সরদার আবূ সুফয়ান সাবধানতাবশত শাম (সিরিয়া) হইতেই মক্কায় দূত পাঠাইয়া দিয়াছিল। এইসব কারণে মক্কার কুরায়শগণ বিরাট বাহিনী লইয়া মদীনার দিকে অগ্রসর হইতে থাকে।
রাসূলুল্লাহ (স) এই অবস্থা সম্পর্কে অবহিত হইলেন। তিনি সকল সাহাবীকে একত্র করিয়া সব ঘটনা তাহাদিগকে খুলিয়া বলিলেন এবং ঘটনার গুরুত্ব বিশ্লেষণ করিলেন। অতঃপর আনসার ও মুহাজির সাহাবী উভয় দলই যুদ্ধের পক্ষে সমর্থন ও সহযোগিতার কথা ব্যক্ত করিয়া জ্বালাময়ী বক্তৃতা করিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (স) ৩১৩ (তিন শত তের) জন সাহাবীসহ ১২ই (এক বর্ণনামতে ৮ই) রমযান মদীনা হইতে বাহির হইলেন। অতঃপর বদর প্রান্তরে পৌছিয়া উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হইল।
ঘটনার সূচনা : ইতিহাস ও সীরাতবিদগণের বর্ণনামতে রাসূলুল্লাহ (স) মদীনা হইতে বাহির হইবার দশদিন পূর্বে আবূ সুফয়ানের বাহিনীর সংবাদ লইবার জন্য তালহা ইব্ন উবায়দিল্লাহ ও সাঈদ ইব্ন যায়দ (রা)-কে সিরিয়ার পথে প্রেরণ করেন। তাহারা সিরিয়ার নিকটবর্তী খুওয়ার নামক স্থানে পৌছিয়া কুছায়্যির ইবন মালিক আল-জুমাহীর আশ্রয়ে উঠেন। তিনি তাহাদিগকে লুকাইয়া রাখেন। ইত্যবসরে কুরায়শদের বাণিজ্যিক দল রওয়ানা হইয়া আসে। অতঃপর তাঁহারা কুছায়্যিরসহ 'যুল-মারওয়া' নামক স্থানে আগমন করেন। সেখান হইতে তাঁহারা উভয়ে রাসূলুল্লাহ (স)-কে সংবাদ দেওয়ার জন্য মদীনায় আগমন করিয়া দেখিতে পান যে, ইতোমধ্যে তিনি মদীনা হইতে বাহির হইয়া আসিয়াছেন। এদিকে আবূ সুফয়ান দামিশক হইতে পাঁচ দিনের পথ মু'আন নামক বড় দুর্গের নিকটস্থ 'যারকা' নামক স্থানে পৌছিয়া জুযাম গোত্রের এক লোকের নিকট জানিতে পারিলেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের কাফেলার জন্য অপেক্ষা করিতেছেন। তখন আবূ সুফয়ান ও তাহার সঙ্গীবৃন্দ রাসূলুল্লাহ (স) ও তাঁহার সাহাবীগণ কোথায়ও ওঁৎ পাতিয়া থাকার ভয়ে সন্তর্পণে অগ্রসর হইলেন। অতঃপর আবূ সুফয়ান যখন হিজাযের নিকটবর্তী হইলেন তখন একাধিক সূত্রে সংবাদ সংগ্রহ করিতে লাগিলেন এবং পথচারীদের নিকট জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন লোকজনের সম্পদ যেহেতু তাহাদের যিম্মায় রহিয়াছে সেই ভয়ে। ইহারই এক পর্যায়ে তাহাকে কোন এক পথচারী খবর দিল যে, মুহাম্মাদ (স) তোমার ও তোমার কাফেলাকে পাকড়াও করিবার জন্য বাহির হইয়াছেন। এই সংবাদে আবূ সুফয়ান ভীত হইয়া পড়িলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে দামদাম ইব্ন আমর আল-গিফারী (রা)-কে বিশ মিছকালের বিনিময়ে ভাড়া করিয়া মক্কায় পাঠাইলেন। তাহাকে সংবাদের গুরুত্ব বুঝাইবার জন্য নির্দেশ দিলেন যে, সে যেন মক্কায় প্রবেশের সময় স্বীয় উটের নাক কাটিয়া দেয়, নিজের পরিহিত জামার অগ্র ও পশ্চাদ্ভাগ ছিড়িয়া ফেলে, অতঃপর কুরায়শদের নিকট গিয়া তাহাদিগকে তাহাদের সম্পদ রক্ষার্থে দ্রুত বাহির হইবার জন্য প্ররোচিত করে এবং তাহাদিগকে সংবাদ দেয় যে, মুহাম্মাদ তাহার সঙ্গীদিগকে লইয়া উক্ত সম্পদ আটক করিতে অগ্রসর হইয়াছেন। অতঃপর দামদাম দ্রুত মক্কার পথে রওয়ানা হইল এবং আবূ সুফয়ান যাহা যাহা করিতে নির্দেশ দিয়াছিলেন উহা পালন করিল।
'আতিকা বিন্ত 'আবদুল মুত্তালিবের স্বপ্নঃ এইদিকে আতিকা বিন্ত আবদুল মুত্তালিব এক ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখিল যাহাতে অদূর ভবিষ্যতে যুদ্ধের আভাস ছিল। এই স্বপ্ন মক্কায় আলোড়ন সৃষ্টি করে। ইবন ইসহাকের বর্ণনামতে, দামদাম আল-গিফারী মক্কায় আগমনের তিনদিন পূর্বে আতিকা বিন্ত 'আবদিল মুত্তালিব এক স্বপ্ন দেখেন যাহা তাহাকে খুবই বিচলিত করিয়া তোলে। তিনি স্বীয় ভ্রাতা 'আব্বাস-এর নিকট লোক প্রেরণ করেন। তিনি আগমন করিলে আতিকা বলিলেন, ভ্রাত! আমি গত রাত্রে এক স্বপ্ন দেখিয়াছি যাহা আমকে খুবই বিচলিত করিয়া তুলিয়াছে। আমি আশঙ্কা করিতেছি যে, আপনার কওমের উপর শীঘ্রই কোন বালা-মুসীবত আসিবে। আপনার নিকট যাহা বিবৃত করিব, আপনি তাহা গোপন রাখিবেন। এক বর্ণনামতে তিনি গোপন রাখিবার কারণ বর্ণনা করিয়া বলিয়াছিলেন, কুরায়শগণ উহা শুনিলে আমাদিগকে নির্যাতন করিবে এবং এমন কথা শুনাইবে যাহা আমরা পছন্দ করি না। 'আব্বাস বলিলেন, আপনি কি দেখিয়াছেন? আতিকা বলিলেন, আমি দেখিয়াছি, এক আরোহী তাহার উটের পিঠে করিয়া 'আবতাহ' নামক স্থানে আসিয়া থামিয়াছে। অতঃপর উচ্চকণ্ঠে বলিতেছে, ওহে খিয়ানতকারীদের বংশধর। তোমরা দ্রুত বাহির হও। তিনদিন পরই তোমাদের যুদ্ধ সংঘটিত হইবে। অতঃপর আমি দেখিলাম, লোকজন তাহার নিকট জড়ো হইল, আর ঐ আগন্তুক তাহার উট লইয়া মসজিদে প্রবেশ করিল। লোকজনও তাহার অনুসরণ করিল। তাহারা তাহার চতুষ্পার্শ্বে সমবেত ছিল, এমন সময় সে তাহার উটকে কাবার উপর দাঁড় করাইল এবং অনুরূপভাবে চীৎকার করিয়া বলিল, ওহে খিয়ানতকারীদের বংশধর! তোমরা দ্রুত বাহির হও। তিনদিন পরেই তোমাদের জীবন যুদ্ধ। অতঃপর সে তাহার উটকে আবু কুবায়েস পর্বতশীর্ষে দাঁড় করাইয়া আবার চীৎকার করিয়া অনুরূপ কথা বলিল। ইহার পর সে একখানি পাথর লইল এবং পর্বতের শীর্ষদেশ হইতে ছুঁড়িয়া দিল। পাথরটি গড়াইয়া পড়িতে লাগিল। পর্বতের নিচে আসিয়া উহা ভাঙ্গিয়া টুকরা টুকরা হইয়া গেল। অতঃপর মক্কার কোনও ঘরবাড়ী এমন রহিল না যেখানে উক্ত পাথরের টুকরা পৌঁছিল না। ইহা শুনিয়া আব্বাস বলিলেন, আল্লাহ্র কসম! এই স্বপ্ন আপনি গোপন রাখুন, কাহারও নিকট বিবৃত করিবেন না।
এক বর্ণনামতে আব্বাস এই কথা বলার পর ‘আতিকা আব্বাসকে বলিলেন, আপনিও ইহা গোপন রাখিবেন। ইহা কুরায়শদের নিকট পৌঁছিলে তাহারা আমাদিগকে নির্যাতন করিবে।
অতঃপর আব্বাস তাহার নিকট হইতে বাহির হইয়া আসিলেন। পথিমধ্যে আল-ওয়ালীদ ইবন উতবা ইবন রবী’আর সহিত তাহার সাক্ষাত হইল। আল-ওয়ালীদ ছিলেন আব্বাসের বন্ধু। তিনি তাহাকে উক্ত স্বপ্নের কথা বিবৃত করিলেন এবং তাহাকে গোপন রাখিতে বলিলেন। আল-ওয়ালীদ উহা স্বীয় পিতা ও কুরায়শ নেতা উতবা ইবন রবী’আর নিকট বলিলেন। অতঃপর এই স্বপ্নের কথা মক্কায় ছড়াইয়া পড়িল। এমনকি কুরায়শগণ তাহাদের মজলিসে ইহা আলোচনা করিতে লাগিল।
আব্বাস বলেন, পরদিন সকালবেলা আমি বায়তুল্লাহ্ তাওয়াফ করিতে গেলাম। আবু জাহল ইবন হিশাম তখন কুরায়শদের একটি দলের সহিত বসিয়া আতিকার স্বপ্ন লইয়া আলাপ-আলোচনা করিতেছিল। আমাকে দেখিয়া আবু জাহল বলিল, হে আবুল ফাদল! তাওয়াফ শেষ করিয়া আমাদের নিকট আসিও। আমি তাওয়াফ শেষ করিয়া তাহাদের নিকট গিয়া বসিলাম। তখন আবু জাহল আমাকে বলিল, হে আবদুল মুত্তালিবের পুত্র! এই মহিলা নবী তোমাদিগকে কখন বলিয়াছে? আমি বলিলাম, উহা কি? সে বলিল, আতিকা যে স্বপ্ন দেখিয়াছে তাহা। আমি বলিলাম, সে কি দেখিয়াছে? সে বলিল, হে আবদুল মুত্তালিবের পুত্র! তোমরা কি তোমাদের পুরুষদের নবুওয়াতের দাবিতে সন্তুষ্ট নও! এখন তোমাদের মহিলারাও নবুওয়াতের দাবি করিতেছে? মুসা ইবন উকবার বর্ণনামতে আবু জাহল বলিল, ওহে হাশিমের বংশধর! তোমরা কি পুরুষদের মিথ্যাচারে সন্তুষ্ট নও, এখন মহিলাদের মিথ্যাচার লইয়া আসিয়াছ? তোমরা ও আমরা যেন বহু যুগ ধরিয়া সম্মানের প্রতিযোগিতা করিয়া চলিয়াছি। এই প্রতিযোগিতায় উভয় পক্ষ যখন সমপর্যায়ে ছিলাম তখন তোমরা বলিলে, আমাদের মধ্যে একজন নবী আছেন। কিছুদিন পর আবার বলিতেছ, আমাদের মধ্যে একজন মহিলা নবী। কুরায়শদের কোনও ঘরে তোমাদের চেয়ে বেশী মিথ্যাবাদী নারী ও মিথ্যাবাদী পুরুষ আছে বলিয়া আমার জানা নাই।
এইভাবে আবূ জাহল আব্বাসকে মানসিকভাবে খুবই নির্যাতন করিল। সে আরও বলিল, 'আতিকা মনে করে, তাহার স্বপ্নে সেই আগন্তুক বলিয়াছে তোমরা তিন দিনের মধ্যে বাহির হও। আমরা এই তিনদিন অপেক্ষা করিব। সে যাহা বলিতেছে তাহা যদি উক্ত তিন দিনের মধ্যে সত্যই সংঘটিত হয় তো হইল। আর যদি তিন দিন অতিবাহিত হইয়া যায় অথচ ইহার কিছুই সংঘটিত না হয় তবে আমরা তোমাদের বিরুদ্ধে এক অঙ্গীকারনামা লিখিব যে, তোমরা আরবের মধ্যে সর্বাধিক মিথ্যাবাদী পরিবার। আব্বাস বলেন, আল্লাহর কসম! আমার পক্ষ হইতে তাহার প্রতি বড় কোনও প্রতিবাদ ছিল না। আমি কেবল উহা অস্বীকার করিয়াছিলাম। অতঃপর আমরা পৃথক হইয়া গেলাম। মূসা ইবন উকবার বর্ণনামতে আব্বাস আবূ জাহলকে বলিয়াছিলেন, তুমি কি থামিবে? মিথ্যাচার তোমার ও তোমার পরিবারের মধ্যে। সেখানে উপস্থিত লোকজন বলিল, হে আবুল ফাদল! তুমি তো মূর্খ বা বোকা ছিলে না। ইবন আইযও অনুরূপ বর্ণনা করিয়াছেন। তাহার বর্ণনায় আরও উল্লিখিত হইয়াছে যে, আব্বাস বলিলেন, থাম হে হলুদ নিতম্বধারী (নির্লজ্জ)। এই সংবাদ প্রকাশিত হওয়ায় আতিকার পক্ষ হইতে আব্বাস খুব নির্যাতন ও ক্লেশ ভোগ করেন।
'আব্বাস বলেন, সন্ধ্যাবেলা আবদুল মুত্তালিবের বংশধর মহিলা কেহই আর বাকী রহিল না, সকলেই আমার নিকট একত্র হইয়া বলিল, আপনি কি ইহা মানিয়া লইয়াছেন যে, এই পাপিষ্ঠ দুর্বৃত্ত আপনাদের পুরুষদের ব্যাপারে জঘন্য ভূমিকা গ্রহণ করিবে, অতঃপর আপনাদের মহিলাদেরকেও উহার অন্তর্ভুক্ত করিয়া লইবে আর আপনি নীরবে তাহা শ্রবণ করিয়া যাইবেন? উহা শ্রবণের পরও কি আপনার কোনও আত্মসম্মানবোধ নাই? আমি বলিলাম, আল্লাহ্র কসম! আমি তাহা করিব। আমার পক্ষ হইতে তাহার প্রতি যত বড় মারাত্মক আচরণই করিতে হয় আমি তাহা করিব। আল্লাহর কসম! আমি তাহার মুখামুখী হইব। সে যদি পুনরায় উহা বলে তবে আমিই তাহার সহিত বোঝাপড়ায় তোমাদের জন্য যথেষ্ট হইব।
আব্বাস বলেন, আতিকার স্বপ্ন দেখার তৃতীয় দিবসের সকালে আমি তেজোদ্দীপ্ত ও রাগান্বিত অবস্থায় অনুভব করিলাম যে, এমন একটি বিষয় আমা হইতে ছুটিয়া গিয়াছে যাহা আমি তাহার নিকট হইতে পাইতে চাহি। অতঃপর আমি মসজিদে প্রবেশ করিয়া তাহাকে দেখিতে পাইলাম। আল্লাহর কসম! আমি তাহার মুকাবিলা করিবার জন্য তাহার দিকে অগ্রসর হইলাম, যাহাতে সে তাহার কথিত মন্তব্য প্রত্যাহার করিয়া লয়। সে ছিল দ্রুতগামী, কঠোর চেহারা, ধারালো বক্তব্য ও প্রখর দৃষ্টিশক্তির অধিকারী। হঠাৎ করিয়া সে মসজিদের দরজা দিয়া বাহির হইয়া গেল। তখন আমি মনে মনে বলিলাম, তাহার উপর আল্লাহ্ অভিশাপ বর্ষিত হউক, তাহার কী হইল! সে কি আমার গালির ভয়ে এইরূপ করিল? পরক্ষণেই বুঝিলাম, সে এমন কিছু শুনিয়াছে যাহা আমি শুনি নাই। তাহা হইল দামদাম ইব্ন আমর আল-গিফারীর আওয়ায। সে বাত্ন ওয়াদীতে (উপত্যকায়) চীৎকার করিতেছিল তাহার উটের উপর দণ্ডায়মান অবস্থায়। সে তাহার উটের নাক কাটিয়া ফেলিয়াছিল, তাহার সওয়ারী ঘুরাইয়া দিয়াছিল এবং নিজের জামা ছিড়িয়া ফেলিয়াছিল। এমতাবস্থায় সে বলিতেছিল, ওহে কুরায়শ দল! তোমরা সুবাস বহনকারী উট রক্ষা কর। আবূ সুফ্যানের সহিত তোমাদের যে সম্পদ রহিয়াছে, মুহাম্মাদ তাহার দলবলসহ উহা আটক করিয়াছে। আমার মনে হয় তোমরা তাহা পাইবে না। হায় সাহায্য! হায় সাহায্য! ইহা শুনিয়া কুরায়শগণ ঘাবড়াইয়া গেল এবং তাহারা আতিকার স্বপ্নের কথা স্মরণ করিয়া ভীত হইয়া পড়িল। আব্বাস বলেন, উদ্ভূত এই ঘটনাই আমাকে তাহা হইতে এবং তাহাকে আমা হইতে ফিরাইয়া রাখিল। তখন আতিকা নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করিলেন:
الم تكن الرويا بحق وجاءكم - بتصديقها فل من القوم هارب فقلتم ولم اكذب كذبت وإنما - يكذبنا بالصدق من هو كاذب.
" আমার স্বপ্ন কি সত্য ছিল না? কওমের এক লোক উহার সত্যতা প্রতিপন্ন করিয়া দ্রুত আগমন করিয়াছে। তোমরা বলিয়াছ যে, আমি মিথ্যা বলিয়াছি। অথচ আমি মিথ্যা বলি নাই; প্রকৃতপক্ষে যে নিজে মিথ্যাবাদী সে-ই সত্যকে মিথ্যা বলিয়া প্রতিপন্ন করে”।
কুরায়শদের যুদ্ধের প্রস্তুতি : দামদামের এই সংবাদ শুনিয়া কুরায়শগণ ক্রোধে ফাটিয়া পড়িল। তাহারা দ্রুত প্রস্তুতি গ্রহণ করিতে লাগিল এবং বলিতে লাগিল, মুহাম্মাদ ও তাহার সঙ্গীবৃন্দ কি ধারণা করিয়াছে যে, ইবনুল হাদরামী দলের যে পরিণতি হইয়াছে, এই ক্ষেত্রেও তাহাই হইবে? কখনও না। আল্লাহ্র কসম! তাহারা অন্য কিছু জানিতে পারিবে। অতঃপর কুরায়শদের সকলেই হয়ত বা নিজে যুদ্ধে গমনের প্রস্তুতি গ্রহণ করিল অথবা নিজের স্থলে অন্য এক লোক প্রেরণ করিল। আবু লাহাব ব্যতীত কুরায়শদের কোনও নেতাই যুদ্ধে গমন করিতে বাকী রহিল না। এক বর্ণনামতে তাহার নিকট গমন করিলে সে যুদ্ধে যাইতে বা তদস্থলে কোনও লোক প্রেরণ করিতে অঙ্গীকার করে। তবে সঠিক বর্ণনামতে সে নিজের পরিবর্তে আল-আস ইব্ন হিশাম ইবনুল মুগীরাকে প্রেরণ করে, যিনি পরবর্তী কালে ইসলাম গ্রহন করেন। আবু লাহাব আল-আস-এর নিকট চার হাজার দিরহাম পাইত। উহার বিনিময়ে তাহাকে প্রেরণ করিয়া নিজে ঘরে বসিয়া থাকে। এক বর্ণনামতে আতিকার স্বপ্নের কারণে আবু লাহাব ভয় পাইয়া উক্ত যুদ্ধে অংশগ্রহণ হইতে বিরত থাকে।
উমায়্যা 'হুবাল' নামক মূর্তির নিকট তীর নিক্ষেপের দ্বারা লটারী করে। লটারীতে নেতিবাচক দিক নির্ণীত হইলে তাহারা যুদ্ধে গমন না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু আবূ জাহল ইবন হিশাম তাহাদিগকে প্ররোচিত করে। ফলে তাহারা নিজেদের সংকল্প ত্যাগ করে। তবে উমায়্যা ইন্ন খালাফ ছিল কুরায়শদের মধ্যে সম্মানিত, বয়োবৃদ্ধ, মোটাসোটা ও ভারী লোক। সে এই সংকল্প করিলে উকবা ইবন আবী মুআয়ত জ্বলন্ত একটি অগ্নির পাত্র লইয়া আগমন করিল। উমায়্যা তখন মসজিদে স্বীয় কওমের সম্মুখে বসিয়াছিল। উকবা পাত্রটি উমায়্যার সম্মুখে রাখিয়া বলিল, ওহে আবূ আলী! লও, বসিয়া বসিয়া অগ্নি পোহাও। কারণ তুমি তো মহিলাদের অন্তর্ভুক্ত। উমায়্যা বলিল, আল্লাহ তোমাকে এবং তুমি যাহা লইয়া আসিয়াছ তাহাকে কুৎসিত আকার করিয়া দিন। অতঃপর উমায়্যা প্রস্তুতি গ্রহণ করিয়া অন্যান্যের সহিত যুদ্ধে গমন করে।
উমায়্যা ইবন খালাফের যুদ্ধ হইতে পিছাইয়া থাকিবার কারণ ইমাম বুখারী (র) সা'দ ইব্ন মু'আয (রা) হইতে এইভাবে বর্ণনা করিয়াছেন যে, সা'দ (রা) উমায়্যা ইন্ন খালাফের বন্ধু ছিলেন। উমায়্যা যখন মদীনায় গমন করিত তখন সা'দ (রা)-এর গৃহে অবস্থান করিত। অনুরূপভাবে সা'দ (রা)-ও যখন মক্কায় আগমন করিতেন তখন উমায়্যার গৃহে উঠিতেন। রাসূলুল্লাহ (স) মদীনায় হিজরত করিবার পর সা'দ (রা) উমরা করার জন্য মক্কায় গমন করিলে উমায়্যার গৃহে উঠিলেন। সা'দ (রা) উমায়্যাকে বলিলেন, একটু নির্জন সময় দেখ, যাহাতে আমি বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করিতে পারি। অতঃপর উমায়্যা তাহাকে লইয়া দ্বিপ্রহরের কাছাকাছি সময়ে বাহির হইল। ইতোমধ্যে আবূ জাহলের সহিত তাহাদের সাক্ষাত হইল। আবূ জাহল উমায়্যাকে লক্ষ্য করিয়া বলিল, ওহে আবূ সাফওয়ান! তোমার সঙ্গে এই লোক কে? সে বলিল, ইনি সা'দ। আবূ জাহল তাহাকে বলিল, আমি তোমাকে দেখিতে পাইতেছি যে, তুমি নিরাপদে মক্কায় তাওয়াফ করিতেছ। অথচ তোমরা ধর্মত্যাগীদিগকে জায়গা দিয়াছ। তোমাদের ধারণামতে তোমরা তাহাদিগকে সাহায্য-সহযোগিতা করিবে। জানিয়া রাখ, আল্লাহ্র কসম! তুমি যদি আবূ সাফওয়ানের সঙ্গে না থাকিতে তবে নিরাপদে তোমার পরিবারের নিকট কিছুতেই ফিরিয়া যাইতে পারিতে না। সা'দ (রা) উচ্চস্বরে তাহাকে বলিলেন, তুমি জানিয়া রাখ, আল্লাহ্র কসম! তুমি যদি এই কাজে আমাকে বাধা দাও তবে অবশ্যই আমি তোমাকে তোমার নিকট ইহা হইতে গুরুত্বপূর্ণ যে কাজ, তাহা হইতে বাধা দিব। আর তাহা হইল তোমার মদীনার নিকট দিয়া যাওয়ার রাস্তা। উমায়্যা তাহাকে বলিল, হে সা'দ! আবুল হাকাম-এর নিকট উচ্চস্বরে কথা বলিও না। কারণ তিনি এই উপত্যকাবাসীদের নেতা। সা'দ (রা) বলিলেন, রাখো হে উমায়্যা! আল্লাহ্র কসম, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিতে শুনিয়াছি যে, তিনিই তোমার হত্যাকারী হইবেন। উমায়্যা বলিল, মক্কায়? সা'দ (রা) বলিলেন, আমি জানি না। ইহা শুনিয়া উমায়্যা ভীষণভাবে ঘাবড়াইয়া গেল। সে তাহার পরিবারের নিকট ফিরিয়া আসিয়া বলিল, হে উম্মু সাফওয়ান! তুমি কি জান, সা'দ আমাকে কি বলিয়াছে? উমায়্যা বলিল, সে বলিয়াছে যে, মুহাম্মাদ তাহাকে জানাইয়াছে যে, সে আমার হত্যাকারী। আমি তাহাকে বলিলাম, মক্কাতেই? সে বলিল, জানি না। উমায়্যা বলিল, আল্লাহ্র কসম! আমি মক্কা হইতে বাহির হইব না।
অতঃপর বদর যুদ্ধের দিন আবূ জাহল যখন লোকজনকে বাহির হইবার জন্য উদ্বুদ্ধ করিয়া বলিতেছিল, তোমাদের বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের জন্য বাহির হও তখন উমায়্যা বাহির হইতে পছন্দ করিল না। আবূ জাহল তাহার নিকট আসিয়া বলিল, হে আবূ সাফওয়ান! লোকে যখন দেখিবে যে, তুমি পিছনে থাকিয়া গিয়াছ, আর তুমি উপত্যকাবা'সীদের নেতা, তখন তাহারাও তোমার সহিত পিছনে থাকিয়া যাইবে। আবু জাহল অনবরত তাহাকে উদ্বুদ্ধ করিতে লাগিল। অবশেষে সে বলিল, জানিয়া রাখ, তুমি যদি আমার উপর বিজয়ী হইয়া যাও তবে অবশ্যই আমি মক্কার উত্তম উট ক্রয় করিব। অতঃপর উমায়্যা তাহার স্ত্রীকে বলিল, হে উম্মু সাফওয়ান! আমার সফরের প্রস্তুতি কর। স্ত্রী বলিল, হে আবূ সাফওয়ান! তুমি কি তোমার ইয়াছরিবী বন্ধু যাহা বলিয়াছিল তাহা ভুলিয়া গিয়াছ? উমায়্যা বলিল, না, আমি তাহাদের সহিত বেশীদূর যাইব না। অতঃপর উমায়্যা যখন বাহির হইল তখন যে মনযিলেই সে পৌঁছিতেছিল সেখানেই সে তাহার উট বাঁধিয়া দেখিতেছিল। এমনি করিয়া আল্লাহ তা'আলা বদর প্রান্তরে আনিয়া তাহাকে হত্যা করিলেন।
এক বর্ণনামতে উমায়্যার স্ত্রী তাহাকে বলিয়াছিল, নিশ্চয় মুহাম্মদ মিথ্যা বলে না। ইবন সায়ি্যদিন নাস বলেন, সীরাতবিদগণের নিকট প্রসিদ্ধ হইল যে, রাসূলুল্লাহ (স) এই কথা উমায়্যার ভ্রাতা উবাই ইব্ন খালাফকে হিজরতের পূর্বে মক্কায় বলিয়াছিলেন এবং তাহাকেই তিনি উহুদ যুদ্ধের দিন বর্শা দ্বারা স্পর্শ করিয়া হত্যা করেন।
এমনিভাবে কুরায়শগণ তিন দিনের মধ্যে মতান্তরে দুই দিনের মধ্যে তাহাদের প্রস্তুতি সম্পন্ন করিল। তাহাদের শক্তিশালী ও সামর্থ্যবান ব্যক্তি দুর্বল ব্যক্তিকে বাহির হইতে সাহায্য করিল। সুহায়ল ইবন 'আমর, যাম'আ ইবনুল আসওয়াদ, তু'আয়মা ইবন আদী, হানজালা ইবন আবী সুফয়ান প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ জনগণকে বাহির হইতে উৎসাহিত ও উদ্বুদ্ধ করিতেছিল। সুহায়ল বলিল, ওহে গালিবের বংশধর! তোমরা কি মুহাম্মাদকে ও তাঁহার সহিত তোমাদের যুবক ধর্মত্যাগীদিগকে ছাড়িয়া দিবে, আর ইয়াছরিববাসী তোমাদের বাণিজ্যিক কাফেলা ও সহায়-সম্পদ লইয়া যাইবে? যে সম্পদ চাহিতেছে তাহার জন্য এই আমার সম্পদ রহিল। আর যে শক্তি চাহিতেছে এই আমার শক্তি। অতঃপর উমায়্যা ইবন আবিস সান্ত তাহার প্রশংসা করিয়া কবিতা রচনা করে। নাওফাল ইন্ন মু'আবিয়া কুরায়শদের সচ্ছল ব্যক্তিদের নিকট গিয়া তাহাদের সম্পদ ও বাহন যুদ্ধে গমনেচ্ছুদের জন্য খরচ করিবার অনুরোধ জানাইল। আবদুল্লাহ ইবন আবূ রাবী'আ বলিল, এই পাঁচ শত স্বর্ণমুদ্রা তুমি যেখানে ইচ্ছা খরচ কর। সে হুওয়ায়তিম ইবন আবদিন 'উযযা হইতে দুই শত, মতান্তরে তিন শত স্বর্ণমুদ্রা লইল'এবং উহা দ্বারা অস্ত্র ও বাহনের শক্তি বৃদ্ধি করিল। তু'আয়মা ইবন আদী ২০টি উটের ব্যবস্থা করিল এবং উহার আরোহীদের পরিবার- পরিজনের খরচাদির ব্যবস্থাও করিয়া দিল। যুদ্ধের জন্য বাহির হইতে অপছন্দকারী কোনও ব্যক্তিকে তাহারা ছাড়িল না এই ধারণার বশবর্তী হইয়া যে, তাহারা মুহাম্মাদ ও তাহার সঙ্গীদের দলভুক্ত। আর এমন কোন মুসলমানকেও ছাড়িল না যাহার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে তাহারা জানিত। বানু হাশিমের মধ্য হইতেও আবু লাহাব ব্যতীত কাহাকেও ছাড়িল না। 'আব্বাস ইবন আবদিল মুত্তালিব, নাওফাল ইবনুল হারিছ, তালিব ইবন আবী তালিব, 'আকীল ইব্ন আবী তালিব প্রমুখকে তাহাদের সঙ্গে লইল। এমনিভাবে তাহারা যুদ্ধে গমনের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করিল।
কুরায়শদের বানু কিনানা ভীতি এবং শয়তানের সান্ত্বনা দান : কুরায়শগণ যখন তাহাদের পূর্ণ প্রস্তুতি সম্পন্ন করিল এবং রওয়ানা হওয়ার ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ হইল তখন তাহাদের মধ্যে ও বানু বাক্স ইবন আব্দ মানাফ ইব্ন কিনানার মধ্যে দীর্ঘ দিন হইতে যে যুদ্ধ চলিয়া আসিতেছিল উহার কথা তাহাদের স্মরণ হইল। তখন তাহারা বলিল, আমাদের আশঙ্কা হইতেছে যে, তাহারা আমাদের পিছন দিক হইতে আমাদের উপর আক্রমণ করিয়া বসিবে। কুরায়শ ও বানু বাক্স গোত্রের মধ্যে যুদ্ধের সূত্রপাত হইয়াছিল 'আমের ইব্ লুআয়্যি গোত্রের হাম্স ইবনুল আখয়াফ তনয়কে কেন্দ্র করিয়া। তাহাকে বানু বাক্স নেতা 'আমের ইব্ন ইয়াযীদ ইব্ন 'আমের ইবনুল মাল্লহ-এর ইঙ্গিতে উক্ত গোত্রের এক লোক হত্যা করিয়াছিল। নিহতের ভ্রাতা মিকরায ইব্ন আখয়াফ ইহার বদলাস্বরূপ 'আমের ইবন ইয়াযীদকে হত্যা করিয়া তাহার তরবারি কা'বা শরীফের গিলাফের সহিত লটকাইয়া রাখে।
অতঃপর কুরায়শগণ যুদ্ধে রওয়ানা হওয়ার মুহূর্তে তাহাদের সহিত দ্বন্দ্বের কথা স্মরণ করিয়া ভীত হইয়া পড়ে। ভয়ে তাহাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করিয়া ফিরিয়া যাইবার উপক্রম হইল। তখন ইবলীস কিনানা গোত্রের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি সুরাকা ইবন মালিক ইবন জু'শুম আল-মুদলিজী আল-কিনানী-এর আকৃতি ধারণ করিয়া তাহাদিগকে বলিল, কিনানা গোত্র তোমাদের পশ্চাত হইতে আক্রমণ করার ব্যাপারে আমি তোমাদিগকে নিরাপত্তা দান করিতেছি যাহা তোমরা অপছন্দ করিতেছ। ইহাতে তাহারা সান্ত্বনা লাভ করিয়া দ্রুত বাহির হইয়া পড়িল। এই সময় কুরায়শ যোদ্ধাদের সংখ্যা ছিল ৯৫০, মতান্তরে ১০০০। তাহাদের সঙ্গে ছিল ২০০ ঘোড়া, ৬০০ লৌহবর্ম। সমরাস্ত্রের বিপুল সমাহার ছাড়াও ছিল গায়িকাদল, যাহারা দফ বাজাইয়া এবং মুসলমানদের প্রতি ব্যঙ্গ-বিদ্রূপাত্মক সঙ্গীত গাহিয়া আনন্দ প্রকাশ করিতেছিল। তাহাদের সঙ্গে আরও ছিল ইবলীস সুরাকার আকৃতি ধরিয়া। সে তাহাদিগকে আশ্বাস দিতেছিল যে, তাহাদের সাহায্যার্থে কিনানা গোত্র তাহাদের পিছনে আসিতেছে, কেহই তোমাদের উপর বিজয়ী হইতে পারিবে না। কুরায়শদের এহেন দর্পভরে বাহির হওয়া এবং ইবলীসের আশ্বাসবাণী সম্পর্কে কুরআন কারীমে উক্ত হইয়াছে :
وَلاَ تَكُونُوا كَالَّذِيْنَ خَرَجُوْا مِنْ دِيَارِهِمْ بَطَرًا وَرِيَاءَ النَّاسِ وَيَصُدُّوْنَ عَنْ سَبِيْلِ اللهِ وَاللهُ بِمَا يَعْمَلُوْنَ مُحِيْطٌ. وَإِذْ زَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ أَعْمَالَهُمْ وَقَالَ لاَ غَالِبَ لَكُمُ الْيَوْمَ مِنَ النَّاسِ وَإِنِّيْ جَارٌ لَكُمْ (٨ : ٤٧-٤٨) .
“তোমরা তাহাদের ন্যায় হইবে না যাহারা দম্ভভরে ও লোক দেখাইবার জন্য স্বীয় গৃহ হইতে বাহির হইয়াছে এবং লোককে নিবৃত্ত করে। তাহারা যাহা করে আল্লাহ্ তাহা পরিবেষ্টন করিয়া রহিয়াছেন। স্মরণ কর, যখন শয়তান তাহাদের কার্যাবলী তাহাদের দৃষ্টিতে শোভন করিয়াছিল এবং বলিয়াছিল, আজ মানুষের মধ্যে কেহই তোমাদের উপর বিজয়ী হইতে পারিবে না। আমি তোমাদের পার্শ্বেই থাকিব” (৮:৪৭-৪৮)।
পথিমধ্যে কুরায়শ বাহিনীর আহারের ব্যবস্থা: কুরায়শ নেতৃবৃন্দ সকল সৈন্যের আহারেরও সুবন্দোবস্ত করিয়াছিল। মক্কা হইতে বাহির হইবার পর প্রথম দিন আবু জাহল তাহাদের জন্য দশটি উট যবেহ করিল। অতঃপর 'উসফান নামক স্থানে পৌঁছিয়া উমায়্যা ইবন খালাফ ৯টি উট যবেহ করে। সুহায়ল ইবন 'আমর, যিনি পরর্তী কালে ইসলাম গ্রহণ করেন, কুদায়দ-এ পৌঁছিয়া যবেহ করেন দশটি উট। কুদায়দ হইতে তাহারা সমুদ্র অভিমুখে পানির নিকট গমন করে। সেখানে তাহারা একদিন অবস্থান করে। এই সময় শায়বা ইবন রাবী'আ তাহাদের জন্য নয়টি উট যবেহ করেন। পরদিন তাহারা জুহফা নামক স্থানে পৌঁছে। সেখানে উতবা ইবন রাবী'আ তাহাদের জন্য দশটি উট যবেহ করে। অতঃপর তাহারা 'আল-আবওয়া' নামক স্থানে পৌঁছে। সেখানে নুবায়হ ও মুনাব্বিহ ইবনুল হাজ্জাজ নামক ভ্রাতৃদ্বয় দশটি উট যবেহ করে। এক বর্ণনামতে মুকায়্যিস ইন্ন 'আমর আল-জুমাহী এখানে নয়টি উট যবেহ করে। অতঃপর আব্বাস ইবন 'আবদিল মুত্তালিব দশটি, অতঃপর আল- হারিছ ইবন 'আমের ইবন নাওফাল নয়টি উট যবেহ করে। বদর প্রান্তরে পানির নিকট পৌছিয়া আবুল বাখতারী দশটি উট যবেহ করে। এখানে মুকায়্যিস আল-জুমাহী নয়টি উট যবেহ করে। অতঃপর তাহারা তাহাদের সঙ্গে বহনকৃত পাথেয় হইতে আহার করিতে থাকে। উল্লেখ্য যে, আল-জুহফা পর্যন্ত পৌঁছিতে তাহাদের দশ দিন অতিবাহিত হয়।
জুহায়ম ইবনুস সান্ত-এর স্বপ্ন: আসন্ন যুদ্ধে কুরায়শ নেতৃবৃন্দ যে নিহত হইবে উহা জুহায়ম নামক এক লোক স্বপ্নে দেখিয়াছিল, কিন্তু তাহারা উপহাস করিয়া উহা উড়াইয়া দেয়। 'উরওয়া ইবনুষ যুবায়র সূত্রে বর্ণিত যে, কুরায়শদের মধ্যে বানু মুত্তালিব ইবন 'আব্দ মানাফ গোত্রে জুহায়ম ইব্ন আবিস সান্ত ইন্ন মাখরামা নামে এক লোক ছিল, যিনি পরবর্তী কালে হুনায়ন যুদ্ধকালে ইসলাম গ্রহণ করেন। কুরায়শ দল যখন জুহফা নামক স্থানে পৌঁছিল তখন জুহায়ম-এর একটু ঘুমের আবেশ হইল। তিনি ভীত অবস্থায়, উঠিয়া তাহার সঙ্গীদেরকে বলিলেন, তোমরা কি সেই অশ্বারোহীকে দেখিয়াছ, যে এইমাত্র আমার নিকট আগমন করিয়াছিল? তাহারা বলিল, না, তুমি পাগল হইয়া গিয়াছ। জুহায়ম বলিলেন, এইমাত্র এক অশ্বারোহী আমার নিকট আসিয়া বলিয়া গেল, আবু জাহল, উতবা ইব্ন রাবী'আ, শায়বা ইব্ন রাবী'আ, যাম'আ ইবনুল আসওয়াদ, আবুল বাখতারী, উমায়্যা ইব্ন খালাফ নিহত হইবে। অতঃপর জুহায়ম বদর যুদ্ধে আরও যেসব কুরায়শ নেতা নিহত হইবে তাহাদের নাম বলিলেন। তিনি আরও বলেন, অতঃপর আমি সেই আরোহীকে দেখিলাম, সে তাহার উটের গলদেশে আঘাত করিল। অতঃপর উহাকে সেনাবাহিনীর মধ্যে ছাড়িয়া দিল। ফলে সেনাবাহিনীর এমন কোনও তাঁবু অবশিষ্ট রহিল না যেখানে উহার রক্ত গিয়া পতিত হয় নাই। ইহা শুনিয়া তাহার সঙ্গীগণ বলিল, শয়তানই তোমার সহিত খেলা করিয়াছে। আবূ জাহলের নিকট এই স্বপ্ন বর্ণনা করা হইলে সে বলিল, তোমরা বানু হাশিমের মিথ্যাচারের সহিত বানু মুত্তালিবের মিথ্যাচার লইয়া আসিয়াছ। সেও মুত্তালিব বংশের আর একজন নবী। আগামী কালই জানিতে পারিবে, কে নিহত হয়।
রাসূলুল্লাহ (স) ও সাহাবীগণের যাত্রা: রাসূলে কারীম (স) স্বীয় সাহাবীগণকে লইয়া ২য় হিজরী অর্থাৎ হিজরতের ১৯ মাসের মাথায় রামাদান মাসে মদীনা হইতে এই যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বাহির হইলেন। ইবন সা'দ-এর বর্ণনামতে ১২ রামাদান শনিবার, আর ইন হিশাম-এর বর্ণনামতে ৮ রামাদান সোমবার তিনি যাত্রা শুরু করেন। এই সময় তাঁহার সঙ্গে ছিল ৩০৫ জন সাহাবী। তন্মধ্যে ৬৪ জন মুহাজির এবং ২৪১ জন আনসার। এতদ্ব্যতীত ৮ জন সাহাবীর এই সফরে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গী হওয়ার অদম্য ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সঙ্গত কারণে তাহারা মদীনায় থাকিয়া গিয়াছিলেন যাহাদিগকে এই যুদ্ধে শামিল বলিয়া গণ্য করা হয়। তন্মধ্যে ৩ জন মুহাজির এবং ৫ জন আনসার। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাদিগকে গনীমাতের অংশ প্রদান করেন।
মুহাজিরগণ হইলেন: (১) উছমান ইব্ন আফফান (রা), তাঁহার স্ত্রী ও রাসূলুল্লাহ (স)-এর কন্যা রুকায়্যা (রা) অসুস্থ থাকায় তাঁহার সেবা-শুশ্রূষা করার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁহাকে মদীনায় রাখিয়া যান, এই রোগেই তিনি ইনতিকাল করেন; (২) তালহা ইবন 'উবায়দিল্লাহ ও (৩) সা'ঈদ ইবন যায়দ; এই দুইজনকে রাসূলুল্লাহ (স) আবু সুফ্যানের কাফেলার খবর সংগ্রহ করার জন্য গুপ্তচর হিসাবে প্রেরণ করেন। আনসারগণ হইলেনঃ (১) আবু লুবাবা ইন্ন 'আবদিল মুনযির। তিনি যথারীতি সাহাবীগণের সহিত বাহির হইয়াছিলেন কিন্তু আর-রাওহা নামক স্থানে পৌঁছিয়া রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে মদীনার গভর্নর বানাইয়া প্রেরণ করেন; (২) 'আসিম ইব্ন 'আদী আল-আজলানী; রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁহাকে আপার মদীনার শাসকরূপে নিয়োগ দিয়া পাঠান; (৩) আল-হারিছ ইবন হাতিব আল-'উমরী; তাঁহাকেও রাসূলুল্লাহ (স) আর-রাওহা হইতে বানু 'আমর ইবন 'আওফ গোত্রের নিকট ফেরত পাঠান। কারণ তাহাদের সম্পর্কে বিশেষ কোনও সংবাদ রাসূলুল্লাহ (স) অবহিত হন; (৪) আল-হারিছ ইবনুস সিম্মা ও (৫) খাওওয়াত ইবন জুবায়র; উভয়কেই পায়ে অসুবিধার কারণে রাসূলুল্লাহ (স) আর-রাওহা হইতে ফেরত পাঠান।
মদীনার মসজিদে সালাতের ইমামতি করার জন্য রাসূলুল্লাহ (স) আবদুল্লাহ ইব্ন উম্মে মাকতুম (রা)-কে দায়িত্ব প্রদান করিয়া আসেন। মদীনা হইতে এক মাইল দূরে 'আবূ 'ইনাবা' নামক কূপের নিকট পৌছিয়া তিনি সৈন্যদিগকে বাছাই করিলেন। এই সময় তিনি যাহাদিগকে অল্পবয়স্ক মনে করিলেন তাহাদিগকে মদীনায় ফেরত পাঠাইলেন। যাহাদিগকে তিনি ফেরত পাঠাইয়াছিলেন তাঁহারা হইলেন: (১) আবদুল্লাহ ইবন উমার; (২) উসামা ইব্ন যায়দ; (৩) রাফে' ইব্ন খাদীজ; (৪) আল-বারাআ ইবন 'আযিব; (৫) উসায়দ ইবন হুদায়র; (৬) যায়দ ইব্ন আরকাম ও (৭) যায়দ ইব্ন ছাবিত। এতদ্ব্যতীত 'উমায়র ইব্ন আবী ওয়াক্কাস (রা)-কেও তিনি ফেরত যাওয়ার নির্দেশ দিয়াছিলেন। কিন্তু এই নির্দেশ শুনিয়া তিনি কাঁদিতে লাগিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে অনুমতি দেন। বদর প্রান্তৱে এই যুদ্ধে তিনি শহীদ হন। তখন তাঁহার বয়স ছিল মাত্র ১৬ বৎসর।
মদীনা হইতে চার মারহালা দূরে 'আস-সুরুয়া' নামক স্থানে পৌঁছিয়া সেখানকার কূপ হইতে পানি পান করার জন্য রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীদিগকে নির্দেশ দিলেন। তিনি নিজেও উহা হইতে পানি পান করিলেন। সেখানকার গৃহের নিকট সালাত আদায় করিলেন এবং সেই দিন মদীনার জন্য এই দু'আ করিলেন:
اللهم أن إبراهيم عبدك وخليلك ونبيك دعاك لاهل مكة واني محمد عبدك ونبيك ادعوك لاهل المدينة أن تبارك لهم في صاعهم ومدهم وثمارهم اللهم حبب الينا المدينة واجعل ما بها من الوباء بخم اللهم اني حرمت ما بين لابتـيـهـا كـمـا حـرم ابراهيم خليلك مكة.
“হে আল্লাহ! ইবরাহীম (আ) তোমার বান্দা, তোমরা বন্ধু, তোমার নবী। তিনি মক্কাবাসীদের জন্য দু'আ করিয়াছেন। আর আমি মুহাম্মাদ তোমার দাস ও তোমার নবী। আমি মদীনাবাসীর জন্য তোমার নিকট এই দু'আ করিতেছি যে, তুমি তাহাদের সা' ও মুদ্দ ওজন পরিমাণে ও ফল-ফলাদিতে বরকত দাও। উহাতে যত মহামারী আছে সব খুম (জুহফা হইতে তিন মাইল দূরে একটি স্থান)- এ আনিয়া দাও। হে আল্লাহ! আমি উহার দুই প্রস্তরময় ভূমির মধ্যবর্তী অংশকে হারাম করিলাম, যেমনিভাবে তোমার খলীল ইবরাহীম (আ) মক্কাকে হারাম করিয়াছিলেন”।
'আস-সুয়া' হইতে রবিবার সন্ধ্যায় তিনি রওয়ানা হন এবং দু'আ করেন:
أللهم انهم حفاة فاحملهم وعراة فاكسهم وجياع فاشبعهم وعالة فاغنهم من فضلك.
“হে আল্লাহ! ইহারা নগ্নপদবিশিষ্ট (পদাতিক), ইহাদেরকে বাহন দাও। ইহারা উলংগ বদন, খালী শরীর বিশিষ্ট; ইহাদিগকে কাপড় পরিধান করাও। ইহারা ক্ষুধার্ত; ইহাদিগকে পর্যাপ্ত পরিমাণে আহার দান কর এবং ইহারা দরিদ্র; ইহাদিগকে তোমার অনুগ্রহে স্বনির্ভর কর”।
পতাকা: মুসলিম বাহিনীর প্রধান পতাকা ছিল শ্বেত বর্ণের। রাসূলুল্লাহ (স) উহা মুস'আব ইবন উমায়র (রা)-এর হাতে দিলেন। আরও দুইটি কৃষ্ণবর্ণের পতাকা ছিল। ইহার একটি ছিল 'আলী ইব্ন আবী তালিব (রা)-এর হাতে। ইহার নাম ছিল উকাব। আলী (রা)-এর বয়স ছিল এই সময় ২০ বৎসর। আর অপরটি ছিল একজন আনসার সাহাবীর হাতে। ইবন সা'দ-এর বর্ণনামতে মুহাজিরদের পতাকা ছিল মুস'আব ইবন উমায়র (রা)-র নিকট। খাযরাজদের পতাকা ছিল আল-হুবাব ইবনুল মুনযির-এর নিকট। আর আওসদের পতাকা ছিল সা'দ ইব্ন্ন মু'আয (রা)-এর নিকট। ইবন সায়্যিদিন নাস বলেন, তবে প্রসিদ্ধ হইল, সা'দ ইব্ন মু'আয (রা) সেদিন আরীশ-এর নিকট রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রহরায় নিযুক্ত ছিলেন। আর মুহাজিরদের পতাকা ছিল হযরত আলী (রা)-এর হাতে। মুহাম্মাদ ইবন ইউসুফ আস-সালিহী আশ-শামী এই উভয় বর্ণনার মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করিয়া বলেন, ইবন সা'দ-এর বর্ণনা রাস্তায় চলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অর্থাৎ পথ অতিক্রমকালে উল্লিখিত তিনজনের হাতে ছিল তিন গোত্রের পতাকা। আর যুদ্ধের ময়দানে পৌঁছার পর যুদ্ধকালীন সময়ে সা'দ ইব্ন মু'আয (রা) আরীশে রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রহরায় নিযুক্ত ছিলেন এবং মুহাজিরদের পতাকা ছিল আলী (রা)-র হাতে। কুরায়শদের নিকটও তিনটি পতাকা ছিল: একটি আবূ আযীযের হাতে, একটি আন-নাদর ইবনুল হারিছের হাতে এবং একটি তালহা ইন্ন আবী তালহার হাতে।
মুসলমানদের ঘোড়া ও উটের সংখ্যা: মুসলমানদের যুদ্ধের উপকরণ ছিল খুবই কম। তাহাদের সহিত মাত্র দুইটি ঘোড়া (মতান্তরে তিনটি) এবং ৭০টি উট ছিল। আল-উমাবীর বর্ণনামতে একটি ঘোড়ার আরোহী ছিলেন মুস'আব ইবন 'উমায়র (রা) এবং অপরটির আরোহী ছিলেন আয-যুবায়র ইবনুল আওওয়াম (রা)। সেনাবাহিনীর ডাইন দিকের নেতৃত্বে ছিলেন সা'দ ইবন খায়ছামা (রা) এবং বামদিকের নেতৃত্বে ছিলেন আল-মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ (রা)। আল-উমাবীর অপর এক বর্ণনামতে দুইজন অশ্বারোহীর মধ্যে আয-যুবায়র ইবনুল আওওয়াম (রা) ডানদিকের এবং অপর অশ্বারোহী আল-মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ বাম দিকের নেতৃত্বে ছিলেন। হযরত আলী (রা) হইতে একটি বর্ণনা পাওয়া যায় যে, তিনি বলেন, বদর যুদ্ধের দিন আমাদের সঙ্গে দুইটি ঘোড়াই ছিল। একটি যুবায়র-এর, অপরটি আল-মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ-এর। ইউসুফ সালিহী আশ-শামীও অনুরূপ বর্ণনা করিয়াছেন। তিনি ঘোড়া দুইটির নামও উল্লেখ করিয়াছেন: মিকদাদের ঘোড়ার নাম ছিল 'সাবহা', মতান্তরে বা'রাজা এবং আয-যুবায়র ইবনুল 'আওওয়াম (রা)-এর ঘোড়ার নাম ছিল 'আস-সায়ল', মতান্তরে আল-ইয়া'সূব। ইবন সা'দ-এর এক বর্ণনামতে বদর যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর তিনটি ঘোড়া ছিল। তৃতীয়টি ছিল মারছাদ ইব্ন আবী মারছাদ আল-গানাবী (রা)-এর; উহার নাম ছিল 'আস-সায়ল'। রাসূলুল্লাহ (স) কায়স ইব্ন আবী সা'সা'আকে সাকা-এ নিযুক্ত করেন এবং আস-সুয়া অঞ্চল হইতে পৃথক হইবার পর মুসলমানদের সংখ্যা গণনা করিবার জন্য তাঁহাকে নির্দেশ দেন। অতঃপর তিনি আবূ 'ইনাবা কূপের নিকট তাহাদিগকে থামাইয়া গণনা করেন এবং গণনাশেষে রাসূলুল্লাহ (স)-কে অবহিত করেন যে, তাহারা সংখ্যায় ৩১৩ জন। ইহা শ্রবণ করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) খুশী হইয়া বলিলেন, ইহা তালুত বাহিনীর সংখ্যা।
পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে যে, মুসলমানদের সঙ্গে ৭০টি উট ছিল। উহাতে তাহারা পালাক্রমে আরোহণ করিতেছিলেন। তিন তিনজন করিয়া তাহারা একটি উটে আরোহণ করিতেন। ইব্ন ইসহাক-এর বর্ণনামতে রাসূলুল্লাহ (স), আলী ইব্ন আবী তালিব (রা) ও মারছাদ ইব্ন আবী মারছাদ আল-গানাবী (রা) একটি উটে, হামযা ইব্ন আবদিল মুত্তালিব, যায়দ ইব্ন হারিছা (রা), রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুক্ত দাস আবূ কাবশা ও আনাস (রা) পালাক্রমে একটি উটে এবং আবূ বাক্র (রা), উমার (রা) ও 'আবদুর রাহমান ইব্ন আওফ (রা) একটি উটে আরোহণ করিতেন। তবে ইমাম আহমাদ (র) ইব্ন মাসউদ (রা) হইতে বর্ণনা করেন:
عن ابن مسعود قال كانوا يوم بدر بين كل ثلاثة نفر بعير وكان على وابو لبابة زميل رسول الله ﷺ قال اذا كانت عقبة النبى ﷺ قالا له اركب حتى نمشى عنك فيقول ما انتما باقوى منى وما انا باغني عن الاجر منكما .
"তিনি বলেন, বদর যুদ্ধের সময় আমরা তিনজন করিয়া একটি উটে আরোহণ করিয়াছিলাম। একটি উটে আবূ লুবাবা ইব্ন আবদিল মুনযির ও আলী (রা) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহগামী। রাসূলুল্লাহ (স)-এর পদব্রজে চলিবার পালা আসিলে তাঁহার সঙ্গীদ্বয় বলিলেন, আপনার পক্ষ হইতে আমরাই হাঁটিয়া চলি। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমরা দুইজন আমার চাইতে অধিক শক্তিশালী নহ। আর আমি সওয়াব লাভের ক্ষেত্রে তোমাদের চাইতে বেশী মুখাপেক্ষী”।
হাফিজ ইব্ন কাছীর ইহা বর্ণনা করিয়া উভয় রিওয়ায়াতের মধ্যে এইভাবে সামঞ্জস্য বিধান করিয়াছেন যে, সম্ভবত ইমাম আহমাদ ও নাসাঈর বর্ণনাটি আবু লুবাবা (রা)-কে আর-রাওহা হইতে মদীনায় ফেরত পাঠাইবার পূর্বের। তাঁহাকে ফেরত পাঠাইবার পর তদস্থলে তাঁহার সহগামী হন মারছাদ ইব্ন আবী মারছাদ আল-গানাবী। হযরত আইশা (রা) হইতে বর্ণিত যে, এই সময় রাসূলুল্লাহ (স) উটের গলা হইতে ঘণ্টাধ্বনি কাটিয়া ফেলার নির্দেশ দেন।
'উবায়দা ইবনুল হারিছ, আত-তুফায়ল ও আল-হুসায়ন ইবনুল হারিছ ভ্রাতৃবর্গ ও মিসতাহ ইব্ন উছাছা উবায়দা ইবনুল হারিছের ক্রয়কৃত উটের পিঠে, মুআয, আওফ ও মুআওবিষ ইব্ন আফরা' ভ্রাতৃবর্গ ও তাঁহাদের দাস আবুল হামরা একটি উটে এবং উবাই ইব্ন কা'ব, উমারা ইব্ন হাযম ও হারিছা ইব্নুন নু'মান একটি উটে আরোহণ করিতেছিলেন। আল-ওয়াকিদী ইহার আরও দীর্ঘ ফিরিস্তি প্রদান করিয়াছেন।
বদরের রাস্তা: রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার সাহাবীগণসহ মদীনা হইতে মক্কার পথে রওয়ানা হইলেন। তাঁহারা মদীনার গিরিপথ ধরিয়া, 'আকীক, যুল-হুলায়ফা, 'উলাতুল-জায়শ হইয়া অগ্রসর হইতে থাকেন, অতঃপর তুরবান (মদীনা হইতে একদিনের পথ), মালাল (মদীনা হইতে ২৮ মাইল দূরে), মারায়ায়ন-এর গামীসুল হামাম, সুখায়রাতুল ইয়ামাম, আস-সায়ালা, ফাজজুর রাওহা ও শানুকা হইয়া চলেন। ১৪ই রামাদান ইরকুজ-জারয়া নামক স্থানে পৌছিয়া তাঁহারা এক বেদুঈনের সাক্ষাত পাইলেন। তাহারা তাহাকে আবু সুফ্যান ও তাহার কাফেলা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলেন, কিন্তু তাহার নিকট কোন সংবাদ পাইলেন না। সাহাবীগণ তাহাকে বলিলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-কে সালাম কর। সে বলিল, তোমাদের মধ্যে কি রাসূলুল্লাহ (স) আছেন? তাহারা বলিলেন, হাঁ। অতঃপর সে রাসূলুল্লাহ (স)-কে সালাম করিয়া বলিল, আপনি যদি আল্লাহ্র রাসূল হন তবে বলুন, আমার এই উটের পেটে কি আছে? সালামা ইবন সালামা ইন ওয়াশ (রা) তাহাকে বলিলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-কে প্রশ্ন করিও না, বরং আমার নিকট আস। আমিই তোমাকে এই ব্যাপারে সংবাদ দিব। তুমি উহার সহিত অপকর্ম করিয়াছ। তাই উহার পেটে তোমার বাচ্চা রহিয়াছে। তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, থাম! লোকটি সম্পর্কে তুমি অশ্লীল কথা বলিয়াছ। অতঃপর তিনি সালামা (রা) হইতে মুখ ফিরাইয়া লইলেন।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) ১৫ই রামাদান বুধবার রাত্রে সাজসাজ তথা রাওহা কূপের নিকট অবতরণ করিলেন এবং সেখানে সালাত আদায় করিলেন। অতঃপর সেখান হইতে রওয়ানা হইয়া তিনি যখন মুনসারিফ নামক স্থানে পৌছিলেন তখন মক্কার পথ বামে রাখিয়া ডানদিকে আন-নাযিয়া হইয়া বদরের দিকে চলিলেন, তাহার পর উহার এক প্রান্তের দিকে চলিলেন। এমনিভাবে তিনি আন-নাযিয়া ও মাদীকিস-সাফরার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত রুঙ্কান নামক উপত্যকা অতিক্রম করিলেন। অতঃপর সেখান হইতে রওয়ানা হইলেন। আস-সাফরা নামক স্থানের নিকটবর্তী হইলে তিনি বানু সা'ইদা গোত্রের মিত্র বাসবাস ইব্ন 'আমর আল-জুহানী ও বানুন-নাজ্জার-এর মিত্র আদী ইব্ন আবিল যাগবা আল-জুহানী (রা)-কে গোপনে আবু সুফ্যানের কাফেলার সংবাদ সংগ্রহ করিবার জন্য বদর অভিমুখে প্রেরণ করিলেন।
মূসা ইব্ন উকবার বর্ণনামতে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে মদীনা হইতে বাহির হইবার পূর্বেই প্রেরণ করেন। অতঃপর তাহারা ফেরত আসিয়া আবূ সুফ্যানের বাণিজ্যিক কাফিলার খবর দিলে তিনি লোকজনসহ উহার উদ্দেশ্যে বাহির হন। হাফিজ ইব্ন কাছীর (র) বলেন, ইন্ন ইসহাক ও মূসা ইব্ন উকবা উভয়ের বর্ণনাই যদি সঠিক হয় তবে স্বীকার করিতে হইবে যে, রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে দুইবার প্রেরণ করেন। প্রথমবার মদীনায় থাকাকালে, আর দ্বিতীয়বার এই স্থানে আগমন করিয়া।
অতঃপর রাসূলল্লাহ (স) সম্মুখে অগ্রসর হইয়া আস-সাফরা নামক গ্রামে পৌছিলেন। ইহা ছিল দুইটি পর্বতের মধ্যখানে অবস্থিত। তিনি উক্ত পর্বতদ্বয়ের নাম জিজ্ঞাসা করিলেন। লোকজন বলিল, উহার একটিকে বলা হয় 'মুসলিহ' এবং অপরটিকে মুখরি'। তিনি উহার অধিবাসীদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলেন। তাঁহাকে বলা হইল, ইহারা গিফার গোত্রের দুইটি শাখা বানুন-নাজজার ও বানূ হুরাক। রাসূলুল্লাহ (স) উহার মধ্য দিয়া যাইতে অপছন্দ করিলেন। তিনি পর্বতদ্বয় ও সেখানকার অধিবাসী গোত্রের শাখাদ্বয়ের নাম শুনিয়াই তাহা অপছন্দ করিলেন। অতঃপর তিনি উক্ত পথ ত্যাগ করিলেন এবং আস-সাফরাকে বামে রাখিয়া ডান দিকে একটি উপত্যকার মধ্য দিয়া চলিলেন যাহাকে যাফেরান বলে। আড়াআড়ি ভাবে তিনি উক্ত উপত্যকা পাড়ি দিয়া সেখানে অবতরণ করিলেন।
সাহাবীদের সহিত পরামর্শ: এই সময় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট সংবাদ আসিল যে, কুরায়শগণ বাণিজ্য কাফেলাকে রক্ষা করিতে পূর্ণ যুদ্ধের প্রস্তুতি লইয়া আগমন করিতেছে। তিনি সাহাবীদের নিকট পরামর্শ চাহিলেন এবং তাহাদিগকে কুরায়শদের সংবাদ অবহিত করাইলেন। তখন আবু বাক্স সিদ্দীক (রা) উঠিয়া দাঁড়াইলেন এবং তিনি উত্তম পরামর্শ দিলেন। অতঃপর উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) উঠিয়া দাঁড়াইলেন এবং তিনিও উত্তম পরামর্শ দিলেন। তিনি বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! উহারা কুরায়শ, সম্মানিত লোক। আল্লাহ্র কসম, যেদিন হইতে তাহারা সম্মান লাভ করিয়াছে তাহার পর আর কখনও অপদস্থ হয় নাই। আল্লাহ্র কসম! যেদিন হইতে তাহারা কুফরী করিয়াছে আর কখনও ঈমান আনয়ন করে নাই। আল্লাহ্র কসম! উহারা কখনও উহাদের সম্মান ভূলুণ্ঠিত হইতে দিবে না, বরং অবশ্যই আপনার সহিত যুদ্ধ করিবে। সুতরাং আপনি সেইজন্য পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করুন।
অতঃপর মিকদাদ ইব্ন 'আমর (রা) দাঁড়াইয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ আপনাকে যাহা দেখাইয়াছেন (ভিন্ন বর্ণনায় যাহার নির্দেশ দিয়াছেন) সেইদিকে আমাদিগকে লইয়া চলুন। আমরা আপনার সঙ্গেই থাকিব। আল্লাহ্র কসম! আমরা আপনাকে সেইরূপ বলিব না, মূসা (আ)-কে বানূ ইসরাঈল যেইরূপ বলিয়াছিল। আল্লাহর বাণী:
فَاذْهَبْ أَنْتَ وَرَبُّكَ فَقَاتِلا إِنَّا هُهُنَا قَاعِدُونَ.
"তুমি আর তোমার প্রতিপালক যাও এবং যুদ্ধ কর, আমরা এইখানেই বসিয়া থাকিব” (৫ঃ ২৪); বরং আপনি ও আপনার প্রতিপালক গিয়া যুদ্ধ করুন, আমরাও আপনাদের সহিত একত্র হইয়া যুদ্ধ করিব। এক বর্ণনায় ইহাও আছে, আমরাও আপনার ডানে-বামে, অগ্রে-পশ্চাতে থাকিয়া যুদ্ধ করিব"। তিনি আরও বলিলেন, সেই সত্তার কসম! যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করিয়াছেন, আপনি যদি আমাদিগকে 'বারকুল গিমাদ' (ইয়ামানের, মতান্তরে হাবশার একটি স্থান) নামক স্থানেও লইয়া যান তবুও আমরা সেখানে পৌঁছা পর্যন্ত আপনার সহিত চলিতে থাকিব। ইহা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। তিনি তাহাকে ধন্যবাদ দিলেন এবং তাহার জন্য দু'আ করিলেন।
ইহার পরও রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ওহে লোকসকল! আমাকে পরামর্শ দাও। ইহা দ্বারা তিনি আনসারদের পরামর্শই কামনা করিতেছিলেন। কারণ তাহারা ছিল সংখ্যায় বেশী। উপরন্তু বায়'আতে 'আকাবার সময় তাহারা যে শপথ করিয়াছিল তাহাতে বলিয়াছিল, "ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আমাদের গৃহে না পৌঁছা পর্যন্ত আমরা আপনার দায় দায়িত্ব হইতে মুক্ত। আপনি যখন আমাদের নিকট পৌঁছিবেন তখন আপনার দায়দায়িত্ব আমাদের উপর বর্তাইবে। আমরা আমাদের সন্তান-সন্ততি ও মহিলাদিগকে যেভাবে রক্ষা করি আপনাকেও সেভাবে রক্ষা করিব"। তাই রাসূলুল্লাহ (স) আকাঙ্ক্ষা করিতেছিলেন যে, মদীনার বাহিরে যেসব শত্রু তাঁহাকে আক্রমণ করিবে সেইসব শত্রুর বিরুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স)-কে সাহায্য করা আনসারগণ নিজদের জন্য জরুরী মনে করিবে না। আর তাঁহারও উচিৎ নহে তাহাদিগকে নিজ দেশের শত্রুর বিরুদ্ধে লইয়া যাওয়া।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই কথা শুনিয়া সা'দ ইব্ন মু'আয (রা) বলিলেন, আল্লাহ্র কসম! ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি মনে হয় আমাদিগকে লক্ষ্য করিয়াই বলিতেছেন? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, হাঁ। সা'দ (রা) বলিলেন, আমরা আপনার উপর ঈমান আনয়ন করিয়াছি, আপনাকে সত্য নবী বলিয়া বিশ্বাস করিয়াছি এবং সাক্ষ্য দিয়াছি যে, আপনি যাহা লইয়া আসিয়াছেন তাহাই সত্য। এই ব্যাপারে আমরা আপনাকে আমাদের পক্ষ হইতে শ্রবণ ও আনুগত্য করার অঙ্গীকার প্রদান করিয়াছি। তাই ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি যেখানে ইচ্ছা আমাদিগকে লইয়া চলুন। আমরা আপনার সঙ্গেই থাকিব। সেই সত্তার কসম! যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করিয়াছেন, আপনি যদি আমাদিগকে লইয়া সমুদ্রে ঝাঁপাইয়া পড়েন তবে আমরাও আপনার সহিত ঝাঁপাইয়া পড়িব। আমাদের মধ্য হইতে একজন লোকও পিছনে থাকিবে না। আমরা ইহা অপছন্দ করিব না যে, আপনি আগামী কাল আমাদিগকে আমাদের শত্রুর সম্মুখে হাজির করিবেন। আমরা যুদ্ধের ময়দানে ধৈর্যশীল, সাক্ষাতের ক্ষেত্রে সত্যবাদী। হয়তোবা আল্লাহ আপনাকে এমন জিনিস দেখাইবেন যাহাতে আপনার চক্ষু জুড়াইয়া যাইবে। তাই আল্লাহ্র রহমত ও বরকতে আমাদিগকে লইয়া চলুন।
হাফিজ ইব্ন কাছীর (র) ইন মারদুয়ায়হ্ সূত্রে বর্ণনা করেন যে, সা'দ ইব্ন মু'আয (রা) ইহাও বলিয়াছিলেন, আপনি যদি আমাদিগকে ইয়ামানের বারকুল গিমাদেও লইয়া যান তবে আমরা অবশ্যই আপনার সহিত যাইব। আমরা তাহাদের মত হইব না যাহারা মূসা (আ)-কে বলিয়াছিল, "তুমি ও তোমার প্রতিপালক যাও এবং যুদ্ধ কর, আমরা এখানেই বসিয়া থাকব বরং আপনি ও আপনার প্রতিপালক গিয়া যুদ্ধ করুন, আমরাও আপনাদের অনুসরণ করিব। আপনি হয়তোবা এক কাজের জন্য বাহির হইয়াছিলেন, আল্লাহ তদস্থলে অন্য এক কাজের ব্যবস্থা করিয়াছেন, তাহার প্রতিই লক্ষ্য রাখুন। আল-উমাবী তাঁহার মাগাযীর বর্ণনায় ইহাও উল্লেখ করিয়াছেন যে, সা'দ (রা) বলিয়াছিলেন, আমাদের সম্পদ হইতে যাহা ইচ্ছা গ্রহণ করুন, আর যাহা ইচ্ছা আমাদিগকে দিন। তবে আমাদের নিকট হইতে আপনি যাহা গ্রহণ করিবেন তাহাই আমাদের নিকট সর্বাপেক্ষা পছন্দনীয় যাহা আমাদের জন্য রাখিয়া দিবেন তাহার তুলনায়। আপনি আমাদিগকে যে কোনও আদেশ দিবেন আমরা তাহা মান্য করিব। আল্লাহ্র কসম! আপনি যদি বারকুল গিমাদেও পৌছিয়া যান, আমরাও আপনার সহিত যাইব।
রাসূলুল্লাহ (স) সা'দ ইব্ন মু'আয (রা)-এর কথা শুনিয়া খুবই আনন্দিত হইলেন এবং তাঁহাকে ধন্যবাদ দিলেন। অতঃপর তিনি বলিলেন, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর, আল্লাহ আমাকে দুইটি দলের একটির অঙ্গীকার করিয়াছেন। আল্লাহর কসম! আমি যেন এখনই কুরায়শ কওমের পরাজয় দেখিতে পাইতেছি। সহীহ মুসলিম-এর রিওয়ায়াতে এই বক্তব্য খাযরাজ গোত্রের নেতা সা'দ ইব্ উবাদা (রা)-এর বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে।
তবে ইহা সা'দ ইব্ন মু'আয (রা)-এর বক্তব্য বলিয়াই প্রসিদ্ধ। ইবন ইসহাক, মূসা ইব্ উকবা, ইবন সা'দ প্রমুখ ইহাই বর্ণনা করিয়াছেন। সা'দ ইবন উবাদা (রা)-এর বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ সম্পর্কে মতভেদ রহিয়াছে। ইব্ন্ন উকবা ও ইব্ন ইসহাক তাঁহাকে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবীদের মধ্যে উল্লেখ করেন নাই। আল-ওয়াকিদী, ইবনুল কালবী ও আল-মাদাইনী তাঁহাকে বদরী সাহাবীদের মধ্যে গণ্য করিয়াছেন। ইবন সা'দ-এর বর্ণনা হইল, তিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুত হইতেছিলেন এবং আনসারদের খাযরাজ গোত্রের সকলের ঘরে ঘরে গিয়া তাহাদিগকে বাহির করিবার জন্য উদ্বুদ্ধ করিতেছিলেন। কিন্তু তিনি অসুস্থ হইয়া পড়ায় আর যুদ্ধে যোগদান করিতে পারেন নাই। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, সা'দ যদিও বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিতে পারে নাই তবুও সে উহাতে যোগদানে আগ্রহী ছিল।
কোনও কোনও বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে গনীম'তের অংশ প্রদান করিয়াছিলেন। কিন্তু ইহা সুপ্রমাণিত নহে। যুদ্ধ সম্পর্কিত রিওয়ায়াত যাহারা বর্ণনা করিয়াছেন তাহাদের কেহই বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে তাঁহার নাম উল্লেখ করেন নাই; বরং তিনি উহুদ ও খন্দকসহ অন্যান্য সকল যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত অংশগ্রহণ করেন।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) যাফিরান হইতে রওয়ানা হইয়া 'আল-আসাফির' নামক উপত্যকার নিকট দিয়া চলিলেন। তারপর আসাফির ও বদর-এর মধ্যে অবস্থিত আদ-দাব্বা নামক একটি শহরে অবতরণ করিলেন। ডানে রহিল পর্বতের ন্যায় বিশাল হান্নান নামক একটি বালুকার ঢিবি। তিনি বদরের নিকটবর্তী এক স্থানে অবতরণ করিলেন। অতপর তিনি ও আবূ বাক্র (রা) কুরায়শদের খবরাখবর লইতে বাহনে চড়িয়া রওয়ানা হইলেন। তাঁহারা আরবের এক বৃদ্ধলোকের নিকট আসিয়া থামিলেন। কুরায়শ এবং মুহাম্মাদ ও তাঁহার সাথী-সঙ্গীদের সম্পর্কে তাহার নিকট কি সংবাদ আছে তিনি তাহাকে তাহা জিজ্ঞাসা করিলেন। বৃদ্ধলোকটি বলিল, তোমরা কাহারা, সেই কথা না বলা পর্যন্ত আমি তোমাদিগকে কোনও সংবাদই দিব না। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আপনি যখন আমাদিগকে উক্ত সংবাদ বলিবেন তখন আমরাও আপনাকে বলিব যে, আমরা কাহারা। বৃদ্ধ বলিল, ইহা কি উহার বিনিময়ে? তিনি বলিলেন, হাঁ।
বৃদ্ধ বলিল, আমার নিকট এই সংবাদ পৌছিয়াছে যে, মুহাম্মাদ ও তাঁহার সাথী-সঙ্গীবৃন্দ অমুক অমুক দিন বাহির হইয়াছে। সংবাদদাতা সত্য হইলে তাহারা আজ অমুক অমুক স্থানে আছে। যে স্থানে রাসূলুল্লাহ (স) ছিলেন, লোকটি সেই স্থানের কথাই বলিল। সে আরও বলিল, আমার নিকট সংবাদ পৌছিয়াছে যে, কুরায়শগণ অমুক অমুক দিন বাহির হইয়াছে। সংবাদদাতা যদি আমার নিকট সত্য বলিয়া থাকে তবে তাহারা আজ অমুক অমুক স্থানে আছে। ঠিক যেখানে কুরায়শগণ ছিল বৃদ্ধ লোকটি সেখানকার কথাই বলিল। লোকটি তাহার সংবাদ প্রদান করিয়া বলিল, তোমরা কোথা হইতে আসিয়াছ? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমরা পানির নিকট হইতে আসিয়াছি। অতঃপর তাহারা বৃদ্ধের নিকট হইতে প্রস্থান করিলেন। বৃদ্ধ তখন বলিতেছিল, কোন্ পানির নিকট হইতে? ইরাকের পানি? ইব্ন হিশামের বর্ণনামতে উক্ত বৃদ্ধের নাম ছিল সুফয়ান আদ-দামরী।
রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীদের নিকট ফিরিয়া আসিলেন। সন্ধ্যাবেলা তিনি আলী ইবন আবী তালিব, আয-যুবায়র ইবনুল 'আওওয়াম ও সা'দ ইব্ন আবী ওয়াককাস (রা)-কে সংবাদ সংগ্রহের জন্য বদর-এর কূপের নিকট পাঠাইলেন। তাঁহারা কুরায়শদের উটের পানি পান করাইবার স্থানে পৌঁছিয়া বানু হাজ্জাজের দাস আসলাম ও বানুল 'আস ইব্ন সাঈদের দাস 'আবীদ আবূ ইয়াসারকে পাইয়া ধরিয়া লইয়া আসিলেন এবং তাহাদিগকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তখন দাঁড়াইয়া সালাত আদায় করিতেছিলেন। দাসদ্বয় বলিল, আমরা কুরায়শদের পানি পান করানোর দায়িত্বে নিয়োজিত। তাহাদের জন্য পানি সংগ্রহের নিমিত্ত তাহারা আমাদিগকে প্রেরণ করিয়াছে। সাহাবায়ে কিরাম তাহাদের এই সংবাদ অপছন্দ করিলেন। তাঁহারা সন্দেহ করিতেছিলেন যে, ইহারা আবূ সুফ্যানের লোক। তাই তাঁহারা উহাদিগকে প্রহার করিতে লাগিলেন। প্রহারের মাত্রা বাড়িয়া গেলে তাহারা বলিল, আমরা আবূ সুফ্যানের লোক। ইহা শুনিয়া সাহাবায়ে কিরাম প্রহার বন্ধ করিলেন।
রাসূলুল্লাহ (স) রুকু-সিজদা সমাপ্ত করিয়া সালাম ফিরাইয়া বলিলেন, ইহারা যখন তোমাদের নিকট সত্য কথা বলিয়াছিল তখন তোমরা প্রহার করিয়াছ, আর যখন মিথ্যা কথা বলিয়াছে তখন ছাড়িয়া দিয়াছ। আল্লাহ্র কসম! তাহারা সত্য বলিয়াছে। তাহারা কুরায়শদের লোক। তাহাদিগকে লক্ষ্য করিয়া তিনি বলিলেন, তোমরা আমাকে কুরায়শদের সংবাদ দাও। তাহারা বলিল, আল্লাহ্র কসম। তাহারা এই বালুর ঢিবির অপর প্রান্তে রহিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে বলিলেন, উহাদের সংখ্যা কত? তাহারা বলিল, বহু। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, উহাদের সংখ্যা কত? তাহারা বলিল, আমরা জানি না। তিনি বলিলেন, তাহারা প্রতি দিন কতটি পশু যবেহ করে? উহারা বলিল, একদিন নয়টি, একদিন দশটি। তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তাহাদের সংখ্যা হইবে নয় শত হইতে এক হাজারের মধ্যে। অতঃপর তিনি তাহাদিগকে বলিলেন, তাহাদের মধ্যে কুরায়শ নেতা কে কে আছে? তাহারা বলিল, উতবা ইবন রাবী'আ, শায়বা ইবন রাবী'আ, আবুল বাখতারী ইব্ন্ন হিশাম, হাকীম ইব্ন্ন হিযাম, নাওফাল ইব্ন খুওয়ায়লিদ, আল-হারিছ ইবন 'আমের ইবন নাওফাল, তু'আয়মা ইন্ন আদী ইব্ন নাওফাল, আন-নাদূদ্র ইবনুল হারিছ, যাম'আ ইবনুল আসওয়াদ, আবূ জাহল ইব্ন হিশাম, উমায়্যা ইব্ন খালাফ, নুবায়হ ও মুনাব্বিহ ইবনুল হাজ্জাজ ও সুহায়ল ইব্ন 'আমর ইব্ন 'আব্দ উদ্দ। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীদের লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, মক্কা তাহার কলিজার টুকরাগুলিকে তোমাদের দিকে নিক্ষেপ করিয়াছে।
দূতদ্বয়ের সংবাদ সংগ্রহ: বাসবাস ইবন 'আমর ও 'আদী ইবন আবিয-যাগবা (রা) পূর্বেই কুরায়শদের তথ্যানুসন্ধানে বাহির হইয়াছিলেন। তাঁহারা বদর প্রান্তরে আসিয়া অবতরণ করিয়া পানির নিকটবর্তী একটু উঁচু ভূমিতে তাঁহাদের উট বাঁধিয়া রাখিলেন। অতঃপর তাঁহারা পানি আনিবার জন্য পানির মশক সঙ্গে লইলেন। মাজদী ইব্ন আমর আল-জুহানী তখন পানির নিকট ছিলেন। 'আদী ও বাসবাস শুনিতে পাইলেন যে, পানির নিকটেই স্থানীয় দুইজন দাসী ঝগড়া করিতেছে, এক দাসী অপরজনকে পাকড়াও করিয়াছে। পাকড়াওকৃত দাসী তাহার সঙ্গিনীকে বলিতেছে, আগামী কাল বা পরশু এখানে একটি কাফেলা আসিবে। তখন তাহাদের কাজ করিয়া আমি তোমার পাওনা পরিশোধ করিয়া দিব। তখন মাজদী বলিল, তুমি সত্য বলিয়াছ। সে তাহাদের মধ্যে মীমাংসা করিয়া দিল। 'আদী ও বাসবাস ইহা শ্রবণ করিলেন। অতঃপর তাঁহারা তাহাদের উটের নিকট গিয়া কিছুক্ষণ বসিলেন এবং সেখান হইতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করিয়া যাহা তাঁহারা শ্রবণ করিয়াছেন তাহা বিবৃত করিলেন।
কাফেলাসহ আবু সুয়ানের পলায়ন: অপরদিকে আবু সুফ্যান ইবন হারব মুসলমানদের ভয়ে ভীত হইয়া পড়িয়াছিল। তাই সে তাহার কাফেলার আগে ভাগে অগ্রসর হইয়া উক্ত পানির নিকট আগমন করিল। এখানে আসিয়া সে মাজদী ইন্ন 'আমরকে জিজ্ঞাসা করিল, তুমি কি এখানে কাহারও আগমন টের পাইয়াছ? সে বলিল, আমি তো অপরিচিত কাহাকেও দেখি নাই। তবে দুইজন আরোহীকে দেখিয়াছি, যাহারা এই উঁচু ভূমিতে তাহাদের উট বাঁধিয়া রাখিয়া তাহাদের মশকে পানি ভরিয়া চলিয়া গিয়াছে। তখন আবূ সুফ্যান তাহাদের উট বাঁধার স্থানে গমন পূর্বক উটের বিষ্ঠা সংগ্রহ করিল, অতঃপর উহা ভাঙ্গিয়া ফেলিল এবং উহাতে খেজুরের আঁটি পাইয়া বলিয়া উঠিল, আল্লাহর কসম! ইহা ইয়াছরিবের খেজুরের আঁটি। এক বর্ণনামতে সে উহা তকিয়া দেখিয়া এই মন্তব্য করিয়াছিল, অতঃপর দ্রুত তাহার সঙ্গী দের নিকট ফিরিয়া আসিল এবং কাফেলাকে লইয়া বদর প্রান্তর বাম দিকে রাখিয়া পশ্চিমে সমুদ্রকূলের দিকে চলিয়া গেল। কাফেলাসহ সে খুব দ্রুতবেগে ছুটিতে লাগিল। এইভাবে একরাত্র এক দিন চলিবার পর তাহারা মুসলমানদের নাগালের বাহিরে চলিয়া গেল।
কুরায়শদের নিকট আবু সুফিয়ানের সংবাদ প্রেরণ : আবু সুফিয়ান যখন দেখিল যে, সে তাহার কাফেলাসহ মুসলিম বাহিনীর নাগালের বাহিরে চলিয়া আসিয়াছে। কাফেলার সবাই এখন নিরাপদ, তখন কায়স ইবন ইমরুল কায়স-এর মাধ্যমে কুরায়শদের নিকট সংবাদ পাঠাইল যে, তোমরা তো তোমাদের কাফেলা, তোমাদের লোকজন ও তোমাদের সম্পদ রক্ষা করিতে বাহির হইয়াছিলে। অথচ আল্লাহ উহা রক্ষা করিয়াছেন। তাই তোমরা ফিরিয়া আস। এই সংবাদ পাইয়া আবু জাহল ইবন হিশাম বলিল, আল্লাহর কসম! আমরা বদর প্রান্ত হতে অবতরণ না করিয়া ফিরিবনা। বদর প্রান্তরে আরবের মেলা বসিত। প্রতি বৎসর এখানকার বাজারে আরবের সকলে একত্র হইত। তাই আবু জাহল বলিল, আমরা এইখানে তিনদিন অবস্থান করিব। উট যবেহ করিব, খাওয়া-দাওয়া করিব এবং মদ পান করিব, আর গায়িকা দাসীরা আমাদিগকে গান শুনাইবে। সমস্ত আরবের লোকজন আমাদের আগমন সমাগমের কথা শুনিবে। ফলে ইহার পর হইতে তাহারা সর্বদা আমাদিগকে ভয় করিবে। তাই চল, আমরা তথায় গমন করি।
কিন্তু বুদ্ধিমান নেতৃবর্গ সম্মুখে অগ্রসর হওয়া অপছন্দ করিতেছিল। যাহারা পিছুটান দিতেছিল তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হইল : আল-হারিছ ইবন আমের, উমাইয়্যা ইবন খালাফ, উতবা ও শায়বা ইবন রাবী'আ, হাকীম ইবন হিযাম, আবুল বাখতারী, ‘আলী ইবন উমাইয়্যা ইবন খালাফ, আল-‘আস ইবন মুনাব্বিহ প্রমুখ। কিন্তু আবু জাহল তাহাদিগকে কাপুরুষতার অপবাদ দিতে লাগিল। আর এই কাজে উকবা ইবন আবী মু‘আয়াত ও আন-নাদর ইবনুল হারিছ ইবন কালদা তাহাকে সহযোগিতা করিতে লাগিল। অবশেষে সম্মুখে অগ্রসর হইবার জন্য সকলে ঐক্যবদ্ধ হইল। উল্লেখ্য যে, কুরায়শগণ এই সময় আল-জুহফা নামক স্থানে অবস্থান করিতেছিল। এই সময় যুহরা গোত্রের মিত্র আল-আখনাস ইবন শারীক যুহরা গোত্রকে লক্ষ্য করিয়া বলিল, হে যুহরা গোত্র! আল্লাহ তোমাদের সম্পদ রক্ষা করিয়াছেন, তোমাদের সঙ্গী মাখরামা ইবন নাওফালকে ছাড়াইয়া আনিয়াছেন। আর তোমরা তো বাহির হইয়াছিলে তাহাকে ও তাহার সম্পদ রক্ষা করিতে। তাই আমার উপর কাপুরুষতার দায়ভার চাপাইয়া ফিরিয়া চল। কারণ ধ্বংস ও যুদ্ধের জন্য বাহির হওয়ার এখন আর কোনও প্রয়োজন নাই। সে (আবু জাহল) যাহা বলিতেছে এইরুপ করার কোনো প্রয়োজন নাই। যুহরা গোত্র তাহাকে খুবই মান্য করিত। তাই তাহার কথামত তাহারা ফিরিয়া গেল। ফলে যুহরা গোত্রের কেহই বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে নাই। অনুরূপভাবে 'আদী ইব্ন কা'ব গোত্রেরও কেহ উক্ত যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে নাই।
মক্কা হইতে বাহির হইবার সময় সকল গোত্রের লোক কুরায়শদের সঙ্গী হইলেও কা'ব ইবন 'আদী গোত্রের কেহই তাহাদের সহিত বাহির হয় নাই। ইবন সা'দ-এর বর্ণনামতে তাহারা কুরায়শদের সঙ্গে ছিল কিন্তু ছানিয়্যা লাফ্ট (বা লিফাত) নামক স্থানে আসিবার পর শেষ রাত্রে উপকূল দিয়া তাহারা মক্কায় ফিরিয়া যায়। ফলে বানু যুহরা ও বানু কা'ব এই দুই গোত্রের কেহই বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে নাই। আবূ তালিবের পুত্র তালিবের সহিত কুরায়শদের কাহারও কাহারও দ্বন্দ্ব ছিল। তাহারা বলিল, আল্লাহ্র কসম, হে বানু হাশিম! আমরা জানি যে, তোমরা যদিও আমাদের সহিত আসিয়াছ, তোমাদের হৃদয় অবশ্যই মুহাম্মাদের দলে শামিল আছে।
বদর প্রান্তরে উভয় পক্ষের অবতরণ
কুরায়শদল সম্মুখে অগ্রসর হইয়া উপত্যকার দূরপ্রান্তে বাতনে ওয়াদী ও উঁচু বালুর ঢিবির পিছনে অবতরণ করিল। আর রাসূলুল্লাহ (স) ও মুসলমানগণ উপত্যকার নিকট প্রান্তে বালুকাময় প্রান্তরে অবতরণ করিলেন। উহা ছিল নরম ভূমি। ফলে মানুষের পা ও জন্তু-জানোয়ারের ক্ষুর অবিয়া যাইতেছিল। প্রথমদিকে কাফিরগণ পানির নিকটবর্তী ছিল। ফলে তাহারা উহা সংরক্ষণ করিল। আর পুরাতন কূপও তাহারা সংস্কার করিয়া লইল। অপরদিকে কূপ হইতে দূরে থাকায় মুসলমানদের খুবই অসুবিধা হইল। তাহারা পিপাসার্ত রহিলেন। তাহাদের উযূ-গোসলেরও সমস্যা দেখা দিল। তখন শয়তান তাহাদের কতকের অন্তরে ক্রোধের সঞ্চার করিয়া দিল এবং এই বলিয়া কুমন্ত্রণা দিতে লাগিল, তোমরা ধারণা কর, তোমরাই হকের উপর আছ। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নবী আছেন, আর তোমরা আল্লাহর বন্ধু। অথচ মুশরিকগণ পানির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করিয়া লইয়াছে। তোমরা তৃষ্ণার্ত রহিয়াছ। তোমরা একাগ্রচিত্তে সালাত আদায় করিতেছ। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা সেই দিন রাত্রে প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টি বর্ষণ করিলেন যাহাতে সমস্ত উপত্যকা প্লাবিত হইল। উহাতে মুশরিকদের ভীষণ অসুবিধা হইল। তাহারা সম্মুখে অগ্রসর হইতে পারিল না। কিন্তু মুসলমানদের জন্য ইহা রহমতস্বরূপ হইল। ইহা দ্বারা আল্লাহ তাহাদিগকে পবিত্র করিলেন, শয়তানের কুমন্ত্রণার ক্লেদ দূর করিলেন। বৃষ্টিপাতের ফলে তাহাদের ভূমি সমতল হইল। বালু আঁটিয়া মজবুত হইয়া গেল। ইহাতে তাহাদের পা শক্ত হইল। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার সঙ্গী-সাথীসহ বদরের পানির নিকট গিয়া অবতরণ করিলেন। প্লাবনের পানি দ্বারা মুসলমানগণ তৃষ্ণা নিবারণ করিলেন, উযূ-গোসল সম্পন্ন করিলেন সওয়ারীগুলিকে পানি পান করাইলেন এবং নিজেদের পানপাত্রগুলি পূর্ণ করিয়া রাখিলেন। ইহার প্রতিই ইঙ্গিত করা হইয়াছে কুরআন কারীমের এই আয়াতে:
اِذْ يُغَشِّيْكُمُ النُّعَاسَ اَمَنَةً مِّنْهُ وَيُنَزِّلُ عَلَيْكُمْ مِّنَ السَّمَاءِ مَاءً لِّيُطَهِّرَكُمْ بِهِ وَيُذْهِبَ عَنْكُمْ رِجْزَ الشَّيْطَانِ وَلِيَرْبِطَ عَلٰى قُلُوْبِكُمْ وَيُثَبِّتَ بِهِ الْاَقْدَامَ.
“স্মরণ কর, তিনি তাঁহার পক্ষ হইতে শান্তির জন্য তোমাদিগকে তন্দ্রায় আচ্ছন্ন করেন এবং আকাশ হইতে তোমাদের উপর বারি বর্ষণ করেন। উহা দ্বারা তোমাদিগকে পবিত্র করিবার জন্য, তোমাদের মধ্য হইতে শয়তানের কুমন্ত্রণা অপসরণের জন্য, তোমাদের হৃদয় দৃঢ় করিবার জন্য এবং তোমাদের পা স্থির রাখিবার জন্য” (৮:১১)।
ইব্ন ইসহাকের বর্ণনামতে মুসলিম বাহিনীর আল-হুবাব ইব্নুল মুনযির ইব্নুল জামূহ এই সময় রাসূলুল্লাহ (স)-কে খুবই গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন, যাহা মুসলমানদের জন্য ছিল খুবই মঙ্গলজনক। তিনি বলিলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাদের এই অবতরণস্থল কি আল্লাহই আপনাকে নির্ধারণ করিয়া দিয়াছেন যাহা হইতে আমরা আর সম্মুখে বা পিছনে যাইতে পারিব না; নাকি ইহা শুধু নিজেদের অভিমত এবং যুদ্ধের কৌশল মাত্র? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ইহা নিছক নিজেদের অভিমত ও যুদ্ধের কৌশল মাত্র। হুবাব ইব্নুল মুনযির (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! ইহা আমাদের অবতরণস্থল নহে; বরং লোকজনসহ সম্মুখে চলুন, যাহাতে আমরা শত্রুপক্ষ হইতে পানির নিকটতর হইতে পারি। আমরা সেখানে অবতরণ করিব, অতঃপর পিছনের অন্যান্য কূপ নষ্ট করিয়া দিব। আর আমরা সেখানে একটি হাউজ নির্মাণ করিয়া উহাতে পানি পূর্ণ রাখিব। অতঃপর আমরা শত্রু পক্ষের সহিত যুদ্ধ করিব। তখন আমরা পানি পান করিতে পারিব আর উহারা পারিবে না। ইহা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি সঠিক মত ব্যক্ত করিয়াছ। ইবন সা’দ-এর বর্ণনামতে জিবরীল (আ) আসিয়া বলিলেন, হুবাব যাহা বলিয়াছে তাহাই সঠিক। হাফিজ ইব্ন কাছীর (র) ইব্ন আব্বাস (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, হুবাবের পরামর্শের সময় জিবরীল (আ) রাসূলুল্লাহ (স.)-এর ডান পাশে ছিলেন। তখন এক ফেরেশতা আসিয়া বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! আল্লাহ আপনাকে সালাম পাঠাইয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তিনিই সালাম, তাঁহার হইতেই আসে সালাম এবং তাঁহার প্রতিই সালাম। ফেরেশতা বলিলেন, আল্লাহ আপনাকে বলিয়া পাঠাইয়াছেন যে, হুবাব ইব্নুল মুনযির যে পরামর্শ দিয়াছে তাহাই সঠিক। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, হে জিবরীল! তুমি কি ইহাকে চিন? জিবরীল (আ) বলিলেন, আকাশের সকলকে আমি চিনি না, তবে সে সত্যবাদী, শয়তান নহে।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার সঙ্গী-সাথীসহ সম্মুখে অগ্রসর হইলেন। মধ্য রাত্রিতে তাঁহারা শত্রু পক্ষ হইতে পানির নিকটতর স্থানে আসিয়া অবতরণ করিলেন। তাঁহার নির্দেশে কূপগুলি বিনষ্ট করিয়া দেওয়া হইল। তাঁহারা যে কূপটির নিকট অবতরণ করিয়াছিলেন উহাতে হাউজ নির্মাণ করিয়া পানি পরিপূর্ণ করা হইল। অতঃপর তাঁহারা উহা হইতে নিজেদের পাত্রসমূহ পূর্ণ করিয়া লইলেন।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য 'আরীশ নির্মাণ আরীশ হইল তাঁবু সদৃশ যাহার উপরে ছাউনী থাকে, তবে আকৃতিতে ছোট। একজন লোক ভালভাবে তাহার নিচে অবস্থান করিতে পারে। বদর প্রান্তরে পৌঁছিবার পর আনসার নেতা সা'দ ইব্ন মু'আয (রা) বলিলেন, "ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা কি আপনার জন্য একটি 'আরীশ নির্মাণ করিয়া দিব যাহার মধ্যে আপনি অবস্থান করিবেন এবং আপনার নিকটেই আমরা আপনার উট প্রস্তুত রাখিব, অতঃপর আমরা গিয়া শত্রুর মুকাবিলা করিব? আল্লাহ যদি আমাদিগকে সম্মানিত করেন এবং শত্রুর উপর বিজয়ী করেন তবে তাহাই হইবে আমাদের পছন্দনীয় ও কাম্য। আর যদি ভিন্ন ফয়সালা হয় তবে আপনি উটে আরোহণ করিয়া মদীনায় যাহারা থাকিয়া গিয়াছে, তাহাদের সহিত যাইয়া মিলিত হইবেন। হে আল্লাহর নবী। আপনার পিছনে তো এমন একটি দল রহিয়া গিয়াছে, আমাদের চেয়েও যাহারা আপনাকে বেশী ভালোবাসে। তাহারা যদি অনুমান করিতে পারিত যে, আপনি যুদ্ধের সম্মুখীন হইবেন তবে কখনও তাহারা আপনার পিছনে পড়িয়া থাকিত না। আল্লাহ তাহাদের দ্বারা আপনাকে হেফাজত করিবেন। তাহারা আপনাকে সৎপরামর্শ দিবে, আপনার সহিত একত্রে মিলিয়া যুদ্ধ করিবে।"
ইহা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) তাহার প্রশংসা করিলেন এবং তাহার মঙ্গলের জন্য দু'আ করিলেন। অতঃপর তাঁহার জন্য যুদ্ধের ময়দানের দিকে মুখ করিয়া একটু উঁচু জায়গায় আরীশ বানানো হইল। তিনি সেখানে থাকিয়া আল্লাহ্র নিকট কান্নাকাটি করিয়া দু'আ করেন এবং সময় সময় যুদ্ধের ময়দানে গিয়া তদারকি করেন। এক বর্ণনামতে আরীশে তাঁহার সহিত আবূ বাক্স (রা)-ও ছিলেন এবং সা'দ ইবন মু'আয (রা) তরবারি সজ্জিত অবস্থায় দরজায় দাঁড়াইয়া প্রহরা দেন।
মুসলিম ও কাফির বাহিনীর সমরোপকরণ বদর যুদ্ধে মুসলমানদের সৈন্যসংখ্যা ছিল ৩১৩ জন, ঘোড়া ২টি, এক বর্ণনামতে তিনটি, উট ৭০টি এবং পতাকা ছিল তিনটি। কাফিরদের সৈন্যসংখ্যা বাহির হওয়ার সময় ছিল ১৩০০, কিন্তু পথে কিছু সৈন্য চলিয়া যাওয়ায় তাহাদের সৈন্যসংখ্যা দাঁড়ায় ১০০০। তাহাদের ঘোড়ার সংখ্যা ১০০, লৌহবর্ম ৬০০, অসংখ্য উট এবং পতাকা ছিল ৩টি।
প্রভাতবেলায় কুরায়শগণ হিংসা ও ক্রোধভরে সম্মুখপানে অগ্রসর হইল। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে বালুর ঢিবি হইতে উপত্যকার দিকে আগমন করিতে দেখিয়া বলিলেন, “হে আল্লাহ! এই কুরায়শদল তাহাদের অহংকারীদিগকে লইয়া আগমন করিয়াছে, তোমাকে চ্যালেঞ্জ করিয়াছে এবং তোমার রাসূলকে অবিশ্বাস করিয়াছে। হে আল্লাহ! তুমি যে সাহায্যের অঙ্গীকার আমার সহিত করিয়াছ সেই সাহায্য নাযিল কর। হে আল্লাহ সকাল বেলায় উহাদিগকে ধ্বংস কর"। তাহাদের দলের মধ্যে 'উতবা ইব্ন রাবী'আকে একটি লাল উটে আরোহী দেখিয়া তিনি বলিলেন, কওমের ভিতর কাহারও মধ্যে যদি কল্যাণ থাকিয়া থাকে তবে লাল উটের আরোহীর মধ্যে আছে। উহারা যদি উহার অনুসরণ করিত তবে সঠিক পথের সন্ধান পাইত। এক বর্ণনামতে রাসূলুল্লাহ (স) আরও বলিলেন, হে আলী! হামযাকে ডাক। তিনি ছিলেন মুশরিকদের নিকটাত্মীয়। লাল উটের আরোহী কে? 'আলী (রা) বলিলেন, সে উতবা। সে কাফিরদিগকে যুদ্ধ করিতে নিষেধ করিতেছিল এবং তাহাদিগকে ফিরিয়া যাওয়ার নির্দেশ দিয়া বলিতেছিল, হে আমার কওম! তোমরা আমার মাথায় দোষ চাপাইয়া দিয়া বল যে, 'উতবা ভীরু-কাপুরুষ হইয়া গিয়াছে। কিন্তু আবূ জাহল তাহা অস্বীকার করিল।
খুফাফ ইব্ন ঈমা ইব্ন রূহাদা আল-গিফারীর নিকট দিয়া কুরায়শ দলের গমন করার সময় সে স্বীয় পুত্রকে দিয়া কিছু যবেহকৃত জন্তু হাদিয়া পাঠাইল এবং বলিয়া পাঠাইল, তোমরা সম্মত হইলে আমরা তোমাদিগকে অস্ত্র ও লোকবল দিয়া সাহায্য করিব। ইহার উত্তরে কুরায়শগণ বলিয়া পাঠাইল, তোমার সহৃদয় বার্তা আমাদের নিকট পৌছিয়াছে। তুমি-তোমার দায়িত্ব পালন করিয়াছ। আমাদের জীবনের কসম! আমরা যদি মানুষের সহিত যুদ্ধ করি তবে তাহাদের তুলনায় আমাদের কোনও দুর্বলতা ও অক্ষমতা নাই। আর যদি আল্লাহ্র সহিত যুদ্ধ করি, যেমনটি মুহাম্মাদ ধারণা করে, তাহা হইলে তো আল্লাহ্র মুকাবিলায় কাহারও কোনও শক্তি নাই।
কুরায়শদল যখন তাহাদের অবস্থানস্থলে অবতরণ করিবার পর তাহাদের একটি দল রাসূলুল্লাহ (স)-এর হাউযের নিকট আসিল। তাহাদের মধ্যে হাকীম ইব্ন হিযামও ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তাহাদিগকে আসিতে দাও। আজ তাহাদের যে ব্যক্তিই এই হাউয হইতে পানি পান করিবে সে নিহত হইবে, তবে হাকীম ইন্ন হিযাম নিহত হইবে না। রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই বাণী সত্য হইয়াছিল। হাকীম ইব্ন হিযাম পরবর্তী কালে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং খাঁটি মুসলমানরূপে জীবন যাপন করেন। অতঃপর তিনি যখনই খুব জোরদার কসম করিতে চাহিতেন তখন বলিতেন, সেই সত্তার কসম! যিনি আমাকে বদর যুদ্ধে রক্ষা করিয়াছেন।
কুরায়শদের গুপ্তচর প্রেরণ
কুরায়শগণ তাহাদের স্থানে অবতরণ করিয়া সব কিছু গুছাইয়া লইবার পর 'উমায়র ইব্ন ওয়াহ্ আল-জুমাহীকে মুসলিম বাহিনীর সংখ্যা জানিবার জন্য প্রেরণ করিল। 'উমায়র তাহার ঘোড়া লইয়া মুসলিম বাহিনীর চতুর্দিকে চক্কর দিল। অতঃপর তাহাদের নিকট ফিরিয়া আসিয়া বলিল, তাহাদের সংখ্যা তিন শত পুরুষ। সামান্য বেশীও হইতে পারে, কমও হইতে পারে। তবে আমাকে আরও একটু সময় দাও। আমি দেখিয়া আসি যে, তাহাদের আত্মগোপন করিবার কোনও জায়গা বা তাহাদিগকে সাহায্য করিবার কিছু আছে কিনা। অতঃপর সে পূর্ণ উপত্যকায় ঘুরিয়া বেড়াইল, এমনকি বহু দূর পর্যন্ত চলিয়া গেল, কিন্তু কিছুই দেখিতে পাইল না। সে কুরায়শদের নিকট ফিরিয়া আসিয়া বলিল, আমি কিছুই দেখিতে পাই নাই। তবে হে কুরায়শদল! আমি দেখিয়াছি কিছু উট যাহা মৃত্যু বহন করিতেছে। ইয়াছরিবের পানি বহন করার উট নিশ্চিত মৃত্যু বহন করিতেছে। একমাত্র তরবারি ব্যতীত উহাদের প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধ করিবার এবং আশ্রয় লইবার আর কিছুই নাই। আল্লাহ্র কসম! আমার ধারণামতে তাহাদের এক ব্যক্তিও নিহত হইবে না তোমাদের একজনকে হত্যা না করা পর্যন্ত। তাহারা যখন তোমাদের মধ্য হইতে তাহাদের সমসংখ্যক লোক হত্যা করিবে তখন তাহার পর কল্যাণকর যিন্দেগী আর কি থাকিবে? কাজেই তোমাদের সিদ্ধান্ত বিবেচনা করিয়া দেখ।
অতঃপর কুরায়শগণ আবূ সালামা আল-জুশামীকে প্রেরণ করিল। সে তাহার ঘোড়ায় করিয়া মুসলমানদের চতুষ্পার্শ্বে ঘুরিয়া আসিয়া বলিল, আল্লাহ্র কসম! আমি কোনও শক্তিমত্তা দেখি নাই; অস্ত্রশস্ত্র বা অশ্বের পালও দেখি নাই। তবে এমন এক জাতিকে দেখিয়াছি যাহারা তাহাদের পরিবারের নিকট ফিরিয়া যাওয়ার কামনা করে না। তাহারা এমন কওম যাহারা মৃত্যুর দিকে নির্ভয়ে অগ্রসর হয়। তরবারি ব্যতীত তাহাদের প্রতিরক্ষা করিবার বা আশ্রয় লইবার আর কিছুই নাই। তাহাদের চক্ষুর পুতলি যেন ঢালের নিচে থাকা পাথর। তাই তোমরা তোমাদের সিদ্ধান্ত বিবেচনা করিয়া দেখ।
হাকীম ইব্ন হিযামের প্রস্তাব ও আবূ জাহলের প্রত্যাখ্যান
হাকীম ইব্ন হিযাম 'উতবা ইবন রাবী'আর নিকট গিয়া বলিল, হে আবুল ওয়ালীদ! আপনি কুরায়শদের মধ্যে বয়বৃদ্ধ ও মান্যবর নেতা। আপনি কি শেষ যমানা পর্যন্ত সর্বদা সুনামের সহিত স্মরণীয় হইয়া থাকিতে চাহেন? উতবা বলিল, তাহা কিভাবে, হে হাকীম! হাকীম ইন্ন হিযাম বলিলেন, আপনি লোকজনসহ প্রত্যাবর্তন করিবেন এবং আপনার মিত্র 'আমর ইবনুল হাদরামীর বিষয়টি নিজের যিম্মায় লইবেন। উতবা বলিল, আমি অবশ্যই তাহা করিব। আর তুমি আমাকে এই ব্যাপারে সহযোগিতা করিবে। সে তো আমার মিত্র, তাই তাহার রক্তপণ দেওয়া এবং তাহার সম্পদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দায়িত্ব আমারই উপর। তুমি একটু হানজালিয়ার পুত্রের (আবূ জাহল) নিকট যাও। কারণ লোকের মধ্যে বিবাদ বাঁধাইয়া দেওয়ার ব্যাপারে তাহাকে ছাড়া অন্য কাহাকেও আমি ভয় করি না।
অতঃপর 'উতবা দাঁড়াইয়া বক্তৃতা দিতে শুরু করিল।সে বলিল, ওহে কুরায়শদল! আল্লাহ্র কসম, তোমরা মুহাম্মাদ ও তাঁহার সঙ্গীদের সহিত সাক্ষাত করিয়া কিছুই করিতে পারিবে না। আল্লাহ্র কসম! যদি তোমরা তাহাকে পরাস্ত কর তবে অবশ্যই তোমাদের কেহ এমন লোকের মুখমণ্ডলের প্রতি দৃষ্টিপাত করিবে, যে তাহার প্রতি দৃষ্টিপাত করিতে অপছন্দ করে। সে হয়ত বা তাহার চাচাতো ফুফাতো মামাতো ভাইকে অথবা তাহার নিজের পরিবারের কাহাকেও হত্যা করিবে। তাই তোমরা ফিরিয়া চল। আর বিষয়টি মুহাম্মাদ ও অন্য সকল আরবের মধ্যে ছাড়িয়া দাও। তাহারা যদি তাঁহাকে পরাস্ত করে তবে তোমাদের মনস্কামনা সিদ্ধ হইবে। আর যদি অন্য রকম কিছু হয় তবে সে তোমাদেরকে এমন অবস্থায় পাইবে যে, তোমরা তাহার বিরুদ্ধে কোনরূপ খারাপ পদক্ষেপ গ্রহণ কর নাই, যাহা তোমরা চাহিতেছ।
এক বর্ণনামতে সে ইহাও বলিয়াছিল, আমি এমন এক জাতিকে দেখিতে পাইতেছি যাঁহারা মৃত্যুর আকাঙ্খা পোষণকারী। তোমরা তাঁহাদের নিকট পৌঁছিতে পারিবে না। তোমাদের মঙ্গল হউক। হে আমার কওম! আজ তোমরা আমার মাথায় সমস্ত দোষ চাপাইয়া দাও এবং বল যে, 'উতবা কাপুরুষ হইয়া গিয়াছে। অথচ তোমরা জান যে, আমি তোমাদের মধ্যে কাপুরুষ নহি।
হাকীম ইব্ন হিযাম বলেন, অতঃপর আমি আবূ জাহলের নিকট গেলাম। সে তখন তাহার লৌহবর্ম পরিধান করিতেছিল। আমি তাহাকে বলিলাম, হে আবুল হাকাম। উতবা আমাকে এই বলিয়া আপনার নিকট প্রেরণ করিয়াছে (যাহা সে বলিয়াছিল তাহা উল্লেখ করিলাম)। তখন সে বলিল, "আল্লাহ্র কসম! মুহাম্মাদ ও তাহার সঙ্গীদিগকে দেখিয়া উতবা ভীত হইয়া পাড়িয়াছে। কখনও না, আল্লাহ্র কসম! আমরা কখনও প্রত্যাবর্তন করিব না যতক্ষণ না আল্লাহ আমাদের ও মুহাম্মাদের মধ্যে কোনও ফয়সালা করিয়া দেন। উতবা যাহা বলিয়াছে তাহার অন্য কোনও কারণ নাই, বরং সে দেখিয়াছে যে, মুহাম্মাদ আর তাঁহার সঙ্গীবৃন্দ একটি উটের খোরাক। আর তাহাদের মধ্যে তাহার পুত্রও রহিয়াছে। তাই সে তোমাদিগকে ভীতি প্রদর্শন করিতেছে"।
আবু জাহল উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করিবার জন্য মুসলমানদের হাতে নিহত 'আমর ইবনুল হাদরামীর ভ্রাতা 'আমের ইবনুল হাদরামীর নিকট লোক পাঠাইয়া বলিল, তোমার মিত্র এই উতবা লোকজনসহ ফিরিয়া যাইতে চাহিতেছে। অথচ তুমি স্বচক্ষে তোমার রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণের ক্ষেত্র দেখিতে পাইতেছ। উঠ এবং কুরায়শদের কতক প্রদত্ত অঙ্গীকার মুতাবিক তোমরা তাহাদের নিকট সাহায্য চাও এবং তোমার দ্রুতৃহত্যার প্রতিশোধ দাবি কর।
অতঃপর আমের ইবনুল হাদরামী দাঁড়াইয়া গেল। সে পরনের কাপড় খুলিয়া 'হায় আমর! হায় আমর' বলিয়া চীৎকার করিতে লাগিল। ইহার ফলে রণোন্মাদনা সৃষ্টি হইল। লোকজনের মনোভাব কঠোর হইল এবং তাহারা যে অমঙ্গলের উপর ছিল তাহার প্রতি আরও সুদৃঢ় ও ঐক্যবদ্ধ হইল্ল। আর উতবা যে সিদ্ধান্তের প্রতি তাহাদিগকে আহবান জানাইয়াছিল তাহা ভণ্ডুল হইয়া গেল।
অতঃপর উতবার নিকট যখন তাহার সম্বন্ধে আবূ জাহলের উক্তি পৌছিল তখন সে বলিল, ‘নিতম্বে হলুদ রংকারী’ অতি সত্বর জানিতে পারিবে যে, কাহার নাড়ি ফাটিয়াছে, আমার না তাহার? অতঃপর ‘উতবা মস্তকে পরিধান করিবার জন্য শিরস্ত্রাণ তালাশ করিল, কিন্তু সেনাবাহিনীর মধ্যে এমন কোনও শিরস্ত্রাণ মিলিল না যাহা দ্বারা সে স্বীয় মস্তক আচ্ছাদিত করিতে পারে। ইহা দেখিয়া সে তাহার চাদর মস্তকে জড়াইয়া লইল এবং যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হইল।
রাসূলুল্লাহ (স) ও তাঁহার সঙ্গীদের সংখ্যাস্বল্পতা দেখিয়া কুরায়শদের নেতা আবুল বাখতারী ইব্ন হিশাম, ‘উতবা ইবন রাবীআ, আবু জাহল ইব্ন হিশাম প্রমুখ বলিতে লাগিল, غَرَّ هَؤُلَاء دَيْنُهُمْ (উহাদের দীন উহাদিগকে বিভ্রান্ত করিয়াছে)। প্রকৃতপক্ষে তাহারা মনে করিয়াছিল, সংখ্যাধিক্যের মধ্যেই বিজয় নিহিত। আল্লাহ তা'আলা তাহাদের ধারণা খণ্ডন করিয়া এই আয়াত নাযিল করিলেন:
إِذْ يَقُولُ الْمُنَافِقُونَ وَالَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَّرَضٌ غَرَّ هَؤُلَاءِ دِينُهُمْ وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَإِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ.
"স্মরণ কর, মুনাফিক ও যাহাদের অন্তরে ব্যাধি আছে তাহারা বলে, ইহাদের দীন ইহাদিগকে বিভ্রান্ত করিয়াছে। কেহ আল্লাহর প্রতি নির্ভর করিলে আল্লাহ তো পরাক্রান্ত ও প্রজ্ঞাময়” (৮:৪৯)।
ইব্নুল মুনযির ও ইব্ন আবী হাতিম (র) ইব্ন্ন জুরায়জ সূত্রে বর্ণনা করেন যে, বদর যুদ্ধের দিন আবু জাহল দাঁড়াইয়া গর্বভরে বলিল, উহাদিগকে কায়দামত পাকড়াও কর এবং রশি দ্বারা মজবুত করিয়া বাঁধ, উহাদের একজনকেও হত্যা করিও না। তখন নাযিল হইল:
إِنَّا بَلُونَاهُمْ كَمَا بَلُونَا أَصْحَابَ الْجَنَّةِ.
"আমি উহাদিগকে পরীক্ষা করিয়াছি যেভাবে পরীক্ষা করিয়াছিলাম উদ্যান অধিপতিগণকে” (৬৮: ১৭)।
সাহাবীদেরকে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর জ্ঞানগর্ভ উপদেশ: রাসূলুল্লাহ (স) সমবেত সাহাবীদিগকে জিহাদে উদ্বুদ্ধ ও উৎসাহিত করিবার জন্য সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা প্রদান করেন। প্রথমেই তিনি আল্লাহ্ প্রশংসা করিয়া বলিলেন, আল্লাহ তা'আলা যাহার প্রতি তাহাদিগকে উৎসাহিত করিয়াছেন আমিও তাহার প্রতি তোমাদিগকে উৎসাহিত করিতেছি এবং তিনি যাহা করিতে নিষেধ করিয়াছেন আমিও তাহা নিষেধ করিতেছি। আল্লাহ মহান, তিনি হকের নির্দেশ দেন, সত্য পছন্দ করেন, সৎকর্মপরায়ণকে তাহার কর্ম অনুযায়ী মর্যাদা দান করেন। তোমরা হকের মনষিলে পৌঁছিয়াছ। তিনি কেবল সেই আমলই কবুল করেন যাহা তাঁহার সন্তুষ্টির জন্য করা হয়। নিরাশার সময় ধৈর্যধারণ করিলে আল্লাহ উহার দ্বারা মুশকিল আসান করিয়া দেন এবং দুঃখ-কষ্ট হইতে পরিত্রাণ দান করেন। আখিরাতে উহার বিনিময়ে তোমরা মুক্তি পাইবে। তোমাদের মধ্যে আল্লাহ্ নবী আছেন। তিনি তোমাদিগকে সতর্ক করেন এবং সৎকাজের নির্দেশ দেন। তাই আজ তোমরা এমন কাজ করিতে লজ্জাবোধ করিও যাহা দেখিলে তিনি রাগান্বিত হন। কারণ তিনি ইরশাদ করিয়াছেন (৪০:১০)।
لَمَقْتُ اللَّهِ اَكْبَرُ مِنْ مُقْتِكُمْ اَنْفُسَكُمْ.
"তোমাদের নিজেদের প্রতি তোমাদের ক্ষোভ অপেক্ষা আল্লাহর অপ্রসন্নতা ছিল অধিক" (৪০:১০)।
আল্লাহ তাঁহার কিতাবে যাহা নির্দেশ করিয়াছেন তাহার প্রতি লক্ষ্য রাখিও, উহা মজবুতভাবে ধারণ কর। তাহা হইলে তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হইবেন এবং তোমাদের প্রতি রহমত ও মাগফিরাতের যে ওয়াদা করিয়াছেন তাহা তোমরা লাভ করিবে। কারণ তাঁহার ওয়াদা হক, তাঁহার কথা সত্য এবং তাঁহার শাস্তি কঠোর। আমি ও তোমরা মহান আল্লাহ্র সহিত রহিয়াছি। তাঁহার নিকটই আমরা আশ্রয় চাহি, তাঁহারই উপর ভরসা করি এবং তাঁহারই দিকে আমাদের প্রত্যাবর্তন করিতে হইবে। আল্লাহ আমাদিগকে এবং সকল মুসলমানকে ক্ষমা করুন"।
যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলিম বাহিনীর কাতারবন্দী
অতঃপর ১৭ই রামাদান শুক্রবার প্রভাতে রাসূলুল্লাহ (স) যুদ্ধের জন্য মুসলিম বাহিনীকে কাতারবন্দী করিতে লাগিলেন। তাঁহার হাতে ছিল ছোট একটি তীর। উহা দ্বারাই তিনি কাতার সোজা করিতেছিলেন। বানু আদী ইবনুন নাজ্জার-এর মিত্র সাওওয়াদ ইব্ন গাযিয়্যা নামক জনৈক সাহাবী কাতার হইতে একটু সম্মুখে বাড়িয়া ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তীর দ্বারা তাহার পেটে মৃদু খোঁচা দিয়া বলিলেন, সোজা হইয়া দাঁড়াও হে সাওওয়াদ! তখন সাওওয়াদ (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আমাকে ব্যথা দিয়াছেন। অথচ আল্লাহ আপনাকে সত্য ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করিতে প্রেরণ করিয়াছেন। তাই আমাকে প্রতিশোধ গ্রহণ করিতে দিন। রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় পেট হইতে কাপড় সরাইয়া বলিলেন, লও, প্রতিশোধ গ্রহণ কর। সাওওয়াদ তখন রাসূলুল্লাহ (স)-কে জড়াইয়া ধরিলেন এবং তাঁহার পেটে চুমা দিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কেন এমনটি করিলে হে সাওওয়াদ? তিনি বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কি ঘটিতেছে তাহা আপনি দেখিতেছেন। তাই আমি ইচ্ছা করিলাম যে, আমার ত্বক আপনার ত্বকের স্পর্শে ধন্য হইবে, ইহাই হউক আপনার সহিত আমার শেষ অবস্থা। রাসূলুল্লাহ (স) তাহার জন্য দু'আ করিলেন। এক বর্ণনামতে তিনি নিহত হইবার আশংকাও প্রকাশ করিয়াছিলেন।
আগে আক্রমণ করার প্রতি নিষেধাজ্ঞা: রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীদেরকে যুদ্ধকৌশল সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিয়া বলিলেন, আমার অনুমতি ব্যতীত কেহ যুদ্ধ শুরু করিবে না, অগ্রে আক্রমণ করিবে না। তাহারা তোমাদের নিকটবর্তী হইয়া পড়িলে তাহাদিগকে তীর নিক্ষেপ করিবে। তোমাদিগকে ঘিরিয়া না ফেলা পর্যন্ত তরবারি চালনা করিবে না। তীরগুলিও সংরক্ষণ করিয়া রাখিবে।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর আরীশে প্রবেশ ও আল্লাহর নিকট মুনাজাত : মুসলিম বাহিনীকে কাতারবন্দী করার পর রাসূলুল্লাহ (স) 'আরীশে প্রবেশ করিলেন। তখন তাঁহার সঙ্গে ছিলেন কেবল আবূ বাক্স (রা), আর কেহই সেখানে ছিল না। তিনি সেখানে কাকুতি-মিনতি সহকারে মহান আল্লাহ্র দরবারে তাঁহার সাহায্য প্রার্থনা করিয়া দু'আ করিতে লাগিলেন। বিভিন্নভাবে তিনি দু'আ করিলেন। কখনও সিজদায় পড়িয়া, কখনও উভয় হস্ত উত্তোলন করিয়া। দু'আর মধ্যে তিনি বলিলেন:
اللهم ان تهلك هذه العصابة اليوم لا تعبد بعدها في الأرض.
“হে আল্লাহ! এই দলটি যদি আজ ধ্বংস হইয়া যায় তাহা হইলে আর পৃথিবীতে তোমার ইবাদত করা হইবে না"।
তিনি আরও বলিলেন:
أنجزلي ما وعدتني اللهم نصرك.
"হে আল্লাহ! তুমি আমার নিকট যে অঙ্গীকার করিয়াছ তাহা পূরণ কর। হে আল্লাহ! তোমার সাহায্য পাঠাও”।
আকাশের দিকে হস্ত উত্তোলন করিয়া তিনি এই দু'আ করিতেছিলেন। ইহাতে এক পর্যায়ে তাঁহার উভয় কাঁধ হইতে চাদর পড়িয়া গেল। আবূ বাক্স (রা) তাঁহার পিছনে থাকিয়া চাদর তুলিয়া দিতেছিলেন এবং তাঁহার অধিক কান্নাকাটির কারণে সমবেদনা ও সান্ত্বনাদান পূর্বক বলিতেছিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ক্ষান্ত হউন। আপনার প্রতিপালকের নিকট প্রার্থনা সীমিত করুন। কারণ অতি সত্বর তিনি আপনাকে দেওয়া অঙ্গীকার পূরণ করিবেন। এই সময় রাসূলুল্লাহ (স) একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হইয়াছিলেন। তিনি জাগ্রত হইয়া বলিলেন, সুসংবাদ গ্রহণ কর হে আবু বাক্স! আল্লাহ্র সাহায্য আসিয়া গিয়াছে। এই হইল জিবরীল, ঘোড়ার লাগাম ধরিয়া সম্মুখে ধূলা উড়াইয়া উহাকে হাঁকাইয়া আসিতেছে।
এই সময় 'আরীশে আল্লাহ্র নিকট তাঁহার দু'আ ও কান্নাকাটির যে এক অবর্ণনীয় অবস্থার সৃষ্টি হইয়াছিল, বিভিন্ন রিওয়ায়াতে তাহা সুস্পষ্টরূপে ফুটিয়া উঠিয়াছে। আলী (রা) বলেন, আমি কিছুক্ষণ যুদ্ধ করিবার পর রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট দৌঁড়াইয়া আসিলাম, তিনি কি করিতেছেন তাহা দেখিবার জন্য। তিনি সিজদায় পড়িয়া বলিতেছেন, يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ (হে চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারক), ইহার বেশী আর কিছুই নহে। অতঃপর আমি যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়া যুদ্ধ করিতে লাগিলাম। ফিরিয়া আসিয়া দেখিলাম, তিনি সিজদায় পড়িয়া ইহাই বলিতেছেন। আমি আবারও যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরিয়া গেলাম। আবার আসিয়া দেখিলাম, তিনি সিজদায় পড়িয়া উহাই বলিতেছেন। অবশেষে আল্লাহ তাঁহাকে বিজয় দান করিলেন।
ইবন মাসউদ (রা) বলেন, বদর যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (স) এই দু'আ করেন: اللهم اني انشدك عهدك ووعدك اللهم أن تهلك هذه العصابة لا تعبد. "হে আল্লাহ! আমি আপনার ওয়াদা ও অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন কামনা করিতেছি। হে আল্লাহ! আপনি যদি এই দলটিকে ধ্বংস করেন তবে আপনার ইবাদত করা হইবে না"।
অতঃপর ফিরিয়া উৎফুল্ল চিত্তে তিনি' বলিলেন, আমি যেন মুশরিকদের নিহত হইবার স্থানসমূহ দেখিতে পাইতেছি।
উমার (রা) বলেন, বদর যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (স) মুশরিকদের দিকে দৃষ্টিপাত করিলেন। তাহারা ছিল সংখ্যায় এক হাজার, আর তাঁহার সাহাবীগণ ছিলেন ৩১৯ জন। অতঃপর তিনি কিবলামুখী হইয়া উভয় হস্ত প্রসারিত করিয়া দিলেন এবং তাঁহার প্রতিপালকের নিকট এই বলিয়া দু'আ করিতে লাগিলেন: اللهم انجزلي ما وعدتني اللهم اتني ما وعدتني اللهم أن تهلك هذه العصابة من اهل الاسلام لا تعبد في الارض. “হে আল্লাহ! তুমি আমার নিকট যে অঙ্গীকার করিয়াছ তাহা পূরণ কর। হে আল্লাহ! তুমি আমার নিকট যাহার ওয়াদা করিয়াছ তাহা আমাকে দাও, হে আল্লাহ! মুসলমানদের এই দলটিকে যদি তুমি ধ্বংস করিয়া দাও তবে পৃথিবীতে তোমার ইবাদত করা হইবে না"।
অতঃপর এইভাবেই তিনি কিবলামুখী হইয়া উভয় হস্ত প্রসারিত করিয়া অবিরত তাঁহার প্রতিপালকের নিকট দু'আ করিতে থাকিলেন, এমনকি তাঁহার কাঁধ হইতে চাদর পড়িয়া গেল। আবূ বাক্স (রা) আসিয়া তাঁহার কাঁধে চাদর তুলিয়া দিলেন, অতঃপর তিনি চাদর আঁকড়াইয়া ধরিয়া রাখিলেন। তিনি বলিলেন, হে আল্লাহ্ নবী! আপনার প্রতিপালকের নিকট চাওয়া যথেষ্ট হইয়াছে। অতি সত্বর তিনি আপনাকে দেওয়া অঙ্গীকার পূরণ করিবেন। অতঃপর আল্লাহ এই আয়াত (৮ : ৯) নাযিল করিলেন: إِذْ تَسْتَغَيْثُونَ رَبَّكُمْ... مردفين
উবায়দুল্লাহ ইব্ন আবদুল্লাহ ইব্ন উতবা বলেন, বদর যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (স) মুশরিকদের প্রতি দৃষ্টিপাত করিলেন এবং মুসলমানদের প্রতিও দৃষ্টিপাত করিলেন। মুশরিকদের তুলনায় মুসলমানদের সংখ্যা কম দেখিয়া তিনি দুই রাক্'আত সালাত আদায় করিলেন। আবূ বাক্স তাঁহার ডান পাশে দাঁড়াইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) সালাতের মধ্যে বলিলেন:
اللهم لا تودع منى اللهم لا تخذلنى اللهم انشدك ما وعدتني.
“হে আল্লাহ! তুমি আমাকে পরিত্যাগ করিও না। হে আল্লাহ! আমাকে অপদস্থ করিও না। হে আল্লাহ! তুমি আমার নিকট যাহার অঙ্গীকার করিয়াছ আমি তাহাই চাহিতেছি"।
ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত যে, বদরের দিন রাসূলুল্লাহ (স) উঁচু স্থানে (কুব্বায়) থাকিয়া বলিতেছিলেন:
اللهم اني انشدك عهدك ووعدك اللهم ان تشأ لم تعبد.
"হে আল্লাহ! আমি তোমার ওয়াদা ও অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন চাহিতেছি। হে আল্লাহ! তুমি ইচ্ছা করিলে আজিকার পর আর কখনও তোমার ইবাদাত করা হইবে না”।
ইবন আব্বাসেরই অপর বর্ণনায় আছে, তিনি আরও বলিতেছিলেন:
اللهم ان ظهروا على هذه العصابة ظهر الشرك وما يقوم لك دين.
“হে আল্লাহ! তাহারা যদি এই দলের উপর বিজয়ী হয় তবে শিরকের প্রসার ঘটিবে এবং তোমার দীন প্রতিষ্ঠিত হইবে না"।
তখন আবূ বাক্স (রা) দুই হাতে তাঁহাকে ধরিয়া বলিলেন, যথেষ্ট হইয়াছে ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আপনার প্রতিপালকের প্রতি বেশী দু'আ করিয়াছেন।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) দ্রুত লৌহবর্ম পরিধান করিলেন এবং বলিলেন:
سَيُهْزَمُ الجَمْعُ وَيُوَلُّوْنَ الدُّبْرُ . بَلِ السَّاعَةُ مَوْعِدُهُمْ وَالسَّاعَةُ أَدْهُى وَأَمَرُّ.
"এই দল তো শীঘ্রই পরাজিত হইবে এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিবে। অধিকন্তু কিয়ামত তাহাদের শাস্তির নির্ধারিত কাল এবং কিয়ামত হইবে কঠিনতর ও তিক্ততর" (৫৪:৪৫-৬)।
আবূ জাহলের বদদু'আঃ উভয় পক্ষ মুখামুখী হইলে কুরায়শ নেতা আবূ জাহল আল্লাহ্র নিকট এই বলিয়া দু'আ করিয়াছিল:
اللهم أقطعنا الرحم واتانا بما لا يعرف فاحنه الغداة.
“হে আল্লাহ! সে আমাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করিয়াছে এবং আমাদের নিকট এক অপরিচিত বিষয় লইয়া আসিয়াছে। তাই আগামী কালই তুমি তাহাকে ধ্বংস কর”।
ইব্ন আব্বাস (রা)-এর এক বর্ণনামতে আবু জাহল তাহার অভিশাপের মধ্যে ইহাও বলিয়াছিল:
اللهم من كان أحب إليك وأرضى عندك فانصره اليوم.
“হে আল্লাহ! তোমার নিকট যে প্রিয় এবং তুমি যাহার উপর সন্তুষ্ট অদ্য তাহাকেই তুমি সাহায্য কর"।
এই বদদু'আ তাহার নিজের উপরই পতিত হইয়াছিল এবং সে নিজেই ধ্বংস হইয়াছিল। এই সম্পর্কেই নাযিল হয়:
إِنْ تَسْتَفْتِحُوا فَقَدْ جَاءَكُمُ الْفَتْحُ.
"তোমরা মীমাংসা চাহিয়াছিলে তাহা তো তোমাদের নিকট আসিয়াছে” (৮:১৯)।
কাফিরদের মধ্যে সর্বপ্রথম নিহত ব্যক্তি
নিয়মিত যুদ্ধ শুরু হইবার পূর্বে কাফিরদের আল-আসওয়াদ ইবন 'আবদিল আসাদ আল-মাখযুমী নিজের হিংসা ও একগুয়েমীর কারণে মুসলমানদের হাতে নিহত হয়। ইব্ন ইসহাক বর্ণনা করেন যে, আল-আসওয়াদ ছিল এক দুশ্চরিত্রের লোক। সে বাহির হইয়া বলিল, আমি আল্লাহর নামে কসম করিতেছি যে, আমি অবশ্যই মুসলমানদের হাউয হইতে পানি পান করিব অথবা উহা নষ্ট করিয়া দিব অথবা উহার সামনে মৃত্যুবরণ করিব। সে উক্ত সংকল্প করিয়া বাহির হইলে মুসলিম বাহিনীর হামযা ইব্ন আবদিল মুত্তালিবও তাহাকে মুকাবিলা করার উদ্দেশ্যে বাহির হইলেন। উভয়ে মুখামুখী হইতেই হামযা (রা) তাহাকে তরবারি দ্বারা আঘাত করিয়া তাহার পা নলার মধ্যভাগ হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া ফেলিলেন। সে তখন হাউযের সম্মুখে ছিল। ফলে সে চীৎ হইয়া মাটিতে পড়িয়া গেল। তাহার পা দিয়া তখন তীরবেগে রক্ত প্রবাহিত হইতেছিল। সে হামাগুড়ি দিয়া হাউযের দিকে অগ্রসর হইল এবং উহার মধ্যে গিয়া পড়িল। ইহা দ্বারা সে তাহার শপথ পূর্ণ করার ইচ্ছা করিল। হামযা (রা)-ও তাহার অনুসরণ করিলেন এবং হাউযের মধ্যে তাহাকে হত্যা করিলেন।
মুসলমানদের প্রথম শহীদ
নিয়মিত যুদ্ধ শুরু হইবার পূর্বেই মুসলিম বাহিনীর দুইজন সৈন্য শাহাদাত বরণ করেন। ইবন ইসহাক ও ইবন সা'দ-এর বর্ণনামতে মুসলমানদের মধ্যে সর্বপ্রথম শাহাদাত লাভ করেন মুহাজির সাহাবী উমার ইবনুল খাত্তাব (রা)-এর মুক্তদাস মিহজা' (রা)। শত্রুসৈন্য 'আমের ইবনুল হাদরামী কর্তৃক নিক্ষিপ্ত একটি তীর বিদ্ধ হইয়া তিনি শহীদ হন। অতঃপর আনসারদের মধ্যে আদী ইবনুন, নাজ্জার গোত্রের আল-হারিছা ইব্ন সুরাকা তীরবিদ্ধ হন। হাউয হইতে পানি পান করিবার সময় একটি তীর আসিয়া তাঁহার কণ্ঠনালীতে বিদ্ধ হইলে তিনি শাহাদাত লাভ করেন। হিব্বান ইবনুল আরিকার নিক্ষিপ্ত তীরে তিনি শহীদ হন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে জান্নাতুল ফিরদাওসের বাসিন্দা বলিয়া ঘোষণা করেন।
আনাস (রা) হইতে বর্ণিত যে, বদর যুদ্ধের দিন যুদ্ধশেষে হারিছার মাতা আসিয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! হারিছা সম্পর্কে আমাকে বলুন। সে যদি জান্নাতী হয় তবে আমি ধৈর্য ধারণ করিব। আর তাহা না হইলে আল্লাহ দেখিবেন আমি কি করি (অর্থাৎ বিলাপ করিয়া কাঁদিব ও মাতম করিব। উল্লেখ্য যে, তখনও ইহা নিষিদ্ধ হয় নাই)। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে বলিলেন, ধিক তোমাকে! জানিয়া রাখো, জান্নাত আটটি। তোমার পুত্র সর্বোচ্চ জান্নাত জান্নাতুল ফিরদাওসে পৌছিয়াছে।
যুদ্ধের সূচনায় মল্লযুদ্ধ
আল-উমাবীর বর্ণনামতে আল-আসওয়াদ ইবন 'আবদিল আসাদ আল-মাখযূমী নিহত হওয়ার ফলে কুরায়শ নেতা উতবা ইব্ন রাবী'আ উত্তেজিত হইয়া পড়িল এবং স্বীয় বীরত্ব প্রদর্শন করিতে চাহিল। সে স্বীয় ভ্রাতা শায়বা ইবন রাবী'আ ও পুত্র আল-ওয়ালীদকে লইয়া প্রকাশ্য ময়দানে অবতীর্ণ হইল। তাহারা উভয় সেনাদলের কাতারের মধ্যখানে আসিয়া মল্লযুদ্ধের আহবান জানাইল। তখন আসনারদের মধ্য হইতে তিন ব্যক্তি তাহাদের মুকাবিলায় বাহির হইলেন। ইবন সা'দ-এর বর্ণনামতে, তাহারা হইলেন 'আওফ ইবনুল হারিছ, মু'আয ইবনুল হারিছ ও মু'আওবিয ইবনুল হারিছ নামক ভ্রাতৃত্রয়। ইহাদের মাতার নাম ছিল 'আফরা। ইব্ন কাছীর-এর বর্ণনামতে তৃতীয় ব্যক্তি হইলেন আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা)। উতবা জিজ্ঞাসা করিল, তোমরা কাহারা? তাঁহারা উত্তর দিলেন, আমরা আনসারদের লোক।
উতবা বলিল, আমাদের তোমাদের কোনও প্রয়োজন নাই। এক বর্ণনামতে তাহারা বলিল, সম্মানিত সমতুল্য ব্যক্তিবর্গ। তবে আমাদের চাচার বংশের লোকজনকে আমাদের নিকট বাহির করিয়া দাও। তাহাদের একজন ডাকিয়া বলিল, হে মুহাম্মাদ! আমাদের স্বগোত্রীয় সমতুল্য লোকদিগকে আমাদের নিকট পাঠাও। তখন নবী (স) বলিলেন, উঠ হে 'উবায়দা ইবনুল হারিছ! উঠ হে হামযা! উঠ হে আলী! ইবন সা'দ-এর বর্ণনামতে রাসূলুল্লাহ (স) বানু হাশিমকে ডাকিয়া বলিয়াছিলেন, হে বানু হাশিম। তোমরা উঠ। হক প্রতিষ্ঠায় যুদ্ধ কর যাহা লইয়া আল্লাহ তোমাদের নবীকে প্রেরণ করিয়াছেন। উহারা তো বাহির হইয়া আসিয়াছে আল্লাহ্ নূরকে নিভাইয়া দেওয়ার জন্য। তখন হামযা ইবন আবদিল মুত্তালিব, আলী ইব্ন আবী তালিব ও উবায়দা ইবনুল হারিছ উঠিয়া ময়দানে গিয়া দাঁড়াইলেন।
আল-উমাবী ও ইবন সা'দ-এর বর্ণনামতে আনসারগণ মুকাবিলার জন্য বাহির হইলে রাসূলুল্লাহ (স) তাহা অপসন্দ করেন। কারণ এই প্রথম তিনি শত্রুর মুকাবিলা করিতেছেন। তাই তিনি চাহিতেছিলেন, মুকাবিলাকারী তাঁহারই পরিবারের লোক হউক। তাই তিনি তাহাদিগকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিয়া কাতারের মধ্যে ফেরত যাইবার নির্দেশ দিলেন এবং তাঁহার পরিবারের এই তিনজনকে বাহির হইবার নির্দেশ দিলেন।
অতঃপর ইহারা উঠিয়া ময়দানে কাফিরদের নিকটবর্তী হইলে উতবা বলিল, তোমরা কথা বল, যাহাতে আমরা চিনিতে পারি। তাহাদের পরনে লৌহ-শিরস্ত্রাণ ছিল। সেইজন্যই উতবা এইরূপ বলিয়াছিল। তখন হামযা (রা) বলিলেন, আমি হামযা ইব্ন আবদিল মুত্তালিব; আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের সিংহ। উতবা বলিল, সম্মানিত সমতুল্য ব্যক্তি আর আমি মিত্রবর্গের সিংহ। তোমার সহিত এই দুইজন কাহারা? হামযা (রা) বলিলেন, আলী ইবন আবী তালিব ও উবায়দা ইবনুল হারিছ। উতবা বলিল, উভয়েই সম্মানিত সমতুল্য ব্যক্তি। ইহাদের মধ্যে 'উবায়দা ইবনুল হারিছ ছিলেন বয়বৃদ্ধ। অতঃপর 'উবায়দা উতবার সহিত, হামযা (রা) শায়বার সহিত এবং আলী (রা) আল-ওয়ালীদের সহিত মল্লযুদ্ধে লিপ্ত হইলেন। ইহা ইন্ন কাছীর-এর বর্ণনা। ইবন সা'দ-এর বর্ণনামতে, হামযা (রা) উতবার সহিত এবং উবায়দা (রা) শায়বার সহিত মল্লযুদ্ধে লিপ্ত হন। অতঃপর হামযা (রা) নিমিষেই তাঁহার প্রতিদ্বন্দ্বী শায়বাকে হত্যা করেন। আলী (রা)-ও নিমিষেই তাঁহার প্রতিদ্বন্দ্বী আল-ওয়ালীদকে হত্যা করেন। 'উবায়দা (রা) ও 'উতবা উভয়ে আঘাত পাল্টা আঘাত হানিতে লাগিলেন। উভয়েই উভয়কে ঘায়েল করিয়া ফেলিলেন। ইবন সা'দ-এর বর্ণনামতে, শায়বা 'উবায়দার একটি পা কাটিয়া ফেলে। অতঃপর হামযা ও আলী (রা) উভয়ে তরবারি চালাইয়া দ্রুত তাহাকে হত্যা করেন এবং তাঁহাদের সঙ্গী উবায়দাকে বহন করিয়া সাহাবীদের মধ্যে লইয়া আসেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পাশেই তাঁহাকে শোয়াইয়া দিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার পাখানি তাহাকে দেখাইলেন। উবায়দা (রা) উক্ত পায়ের উপর স্বীয় মুখ রাখিয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আবূ তালিব যদি আমাকে দেখিত তবে অবশ্যই বুঝিতে যে, আমিই তাহার এই কবিতার যোগ্য ব্যক্তি:
كذبتم وبيت الله نبزى محمدا ولما نطاعن حوله ونناضل ونسلمه حتى نصرع دونه ونزهل عن ابنائنا والحلائل.
"তোমরা মিথ্যা বলিয়াছ, আল্লাহ্র ঘরের কসম। মুহাম্মাদকে ছিনাইয়া লওয়া বা তাঁহার উপর বিজয়ী হওয়া যায় না, যখন আমরা তাঁহার চতুষ্পার্শ্ব হইতে বল্লম ও তীর নিক্ষেপ করি। আমরা তাঁহাকে সমর্পণ করিব না, এমনকি আমরা তাঁহার সম্মুখে লুটাইয়া পড়িব এবং আমাদের সন্তান-সন্ততি ও স্ত্রীদের কথা ভুলিয়া যাইব।"
অতঃপর যুদ্ধশেষে ফিরিবার পথে তিনি ইনতিকাল করিলে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, তুমি শহীদ।
বদর যুদ্ধের দিন মল্লযুদ্ধে অংশগ্রহণকারিগণ তথা 'উবায়দা (রা), হামযা (রা) ও আলী (রা) এবং উতবা ইবন রাবীআ, শায়বা ইবন রাবীআ ও আল-ওয়ালীদ ইবন 'উতবা সম্পর্কে এই আয়াত নাযিল হয়: هُذَانِ خَصْمَانِ اخْتَصَمُوا فِي رَبِّهِمْ.
"ইহারা দুইটি বিবদমান পক্ষ, তাহারা তাহাদের প্রতিপালক সম্বন্ধে বিতর্ক করে" (২২:১৯)।
আলী (রা) হইতে এইরূপ বর্ণিত আছে।
আবুল আলিয়া হইতে বর্ণিত যে, কাফিরদের তিনজন মল্লযুদ্ধে যখন নিহত হইল এবং মুসলমানদের তিনজন ফিরিয়া গেল তখন আবু জাহল ও তাহার সঙ্গীবৃন্দ বলিল, আমাদের 'উয্যা (দেবতা) রহিয়াছে, তোমাদের কোনও 'উয্যা নাই। ইহা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর পক্ষ হইতে এক ঘোষক বলিয়া উঠিল, আল্লাহ আমাদের অভিভাবক, তোমাদের কোনও অভিভাবক নাই।
সাহাবীকে সম্মুখ সমরে উদ্বুদ্ধকরণ এবং 'উমায়র-এর শাহাদাতবরণ
রাসূলুল্লাহ (স) আরীশ হইতে বাহির হইয়া আসিয়া সাহাবায়ে কিরামকে সম্মুখ জিহাদে উদ্বুদ্ধ ও উৎসাহিত করিলেন। তিনি বলিলেন, সেই সত্তার কসম যাঁহার হাতে মুহাম্মাদের জীবন! আজ কোনও ব্যক্তি যদি এমনভাবে যুদ্ধ করে যে, সে ধৈর্য ধারণকারী, ছওয়াবের প্রত্যাশী, সম্মুখে অগ্রসরমান, পশ্চাতে নহে, এই অবস্থায় যদি সে নিহত হয় তবে আল্লাহ তাহাকে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করাইবেন।
অন্য বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমরা এমন এক জান্নাতের জন্য উঠ যাহার প্রশস্ততা আসমান ও যমীনসম। তখন উমায়র ইবনুল হুমাম আল-আনসারী বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এমন জান্নাত যাহা আসমান ও যমীন পরিব্যাপ্ত! তিনি বলিলেন, হাঁ। উমায়র (রা) বলিলেন, বাহ্ বাহ্! রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, 'বাহ, বাহ বলিতে কিসে তোমাকে উদ্বুদ্ধ করিল? তিনি বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! শুধু এই আশায়ই যে, আমি উহার অধিবাসী হইব।
রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি উহার অধিবাসী। তিনি তখন কিছু খেজুর বাহির করিয়া খাইতেছিলেন। অতঃপর বলিলেন, এই খেজুরগুলি খাওয়া পর্যন্ত যদি আমি জীবিত থাকি তবে তাহা তো অনেক দীর্ঘ সময়! এই বলিয়া তিনি খেজুরগুলি ছুড়িয়া ফেলিয়া দিয়া যুদ্ধে ঝাঁপাইয়া পড়িলেন এবং যুদ্ধ করিতে করিতে শহীদ হইলেন। যুদ্ধ করিবার সময় তিনি এই কবিতা আবৃত্তি করিতেছিলেন:
ركضا إلى الله بغير زاد الا التقى وعمل المعاد والصبر في الله على الجهاد وكل زاد عرضة النفاد غير التقى والبر والرشاد
"আমি আল্লাহ্র প্রতি দৌড়াইয়া যাইতেছি পাথেয় ছাড়া। তাকওয়া, পরকালের আমল এবং জিহাদের জন্য আল্লাহর প্রতি ধৈর্য ধারণ ছাড়া। আর তাকওয়া, সৎকাজ এবং সোজা পথে বিচরণ ব্যতীত অন্য সকল পাথেয়ই বিলীন হইয়া যাইবে"।
'আওফ ইবনুল হারিছের শাহাদাত: 'আওফ ইবনুল হারিছ আল-আনসারী, যাহার মাতা ছিলেন 'আফরা, রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট জিজ্ঞাসা করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! বান্দার কোন্ কাজে তাহার প্রতিপালক (আনন্দের আতিশয্যে) সন্তুষ্ট হন? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, বর্মহীন অবস্থায় শত্রুদের মধ্যে ঝাঁপাইয়া পড়ায়। অতঃপর তিনি শরীর হইতে বর্ম খুলিয়া ছুড়িয়া ফেলিলেন এবং তরবারি হাতে শত্রুদের সহিত যুদ্ধ করিতে করিতে শহীদ হইলেন।
ফেরেশতাদের অবতরণ ও যুদ্ধে অংশগ্রহণ: বদর যুদ্ধে মুসলমানদের সাহায্যার্থে আল্লাহ তাআলা ফেরেশতা প্রেরণ করেন। তাহারা অবতরণ করিয়া কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। কুরআন ও হাদীছে ইহার বিশদ বর্ণনা আসিয়াছে। পূর্বেই বর্ণনা করা হইয়াছে যে, আরীশে অবস্থানকালে রাসূলুল্লাহ (স) মাথা উঠাইয়া আবূ বাক্স (রা)-কে সুসংবাদ দিয়া বলিয়াছিলেন, আল্লাহর সাহায্য আসিয়া গিয়াছে। এই যে জিবরীল ঘোড়ার লাগাম ধরিয়া হাঁকাইয়া আসিতেছে। কুরআন কারীমে এই ব্যাপারে সুস্পষ্ট বর্ণনা আসিয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
إِذْ تَسْتَغِيثُونَ رَبَّكُمْ فَاسْتَجَابَ لَكُمْ أَنَّى مُمِدُكُمْ بِأَلْفِ مِنَ الْمَلَائِكَةِ مُرْدِفِينَ.
"স্মরণ কর, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করিয়াছিলে। তিনি উহা কবুল করিয়াছিলেন এবং বলিয়াছিলেন, আমি তোমাদিগকে সাহায্য করিব এক সহস্র ফেরেশতা দ্বারা যাহারা একের পর এক আসিবে" (৮:৯)।
এই আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হইয়াছে যে, এই যুদ্ধে এক হাজার ফেরেশতা অবতরণ করিয়াছিল। ইব্ন আব্বাস (রা)-এর এক বর্ণনায় ইহারই সমর্থন পাওয়া যায়। তিনি বলেন, আল্লাহ তাঁহার নবী ও মুমিনদিগকে এক হাজার ফেরেশতা দ্বারা সাহায্য করেন। ডানদিকে পাঁচ শত ফেরেশতার নেতৃত্বে ছিলেন জিবরীল (আ) এবং বামদিকের পাঁচ শত ফেরেশতার নেতৃত্বে ছিলেন মীকাঈল (আ)। ইহাই প্রসিদ্ধ। অন্য এক আয়াতে তিন হাজার ফেরেশতার কথা বলা হইয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
إِذْ تَقُولُ لِلْمُؤْمِنِينَ أَلَنْ يَكْفِيَكُمْ أَنْ يُمِدَّكُمْ رَبُّكُمْ بِثَلُثَةِ أَلْفِ مِّنَ الْمَلَئِكَةِ مُنْزَلِينَ. "স্মরণ কর, যখন তুমি মুমিনগণকে বলিতেছিলে, ইহা কি তোমাদের জন্য যথেষ্ট নয় যে, তোমাদের প্রতিপালক প্রেরিত তিন সহস্র ফেরেশতা দ্বারা তোমাদিগকে সহায়তা করিবেন" (৩৪ : ১২৪)!
'আলী (রা) হইতে বর্ণিত একটি রিওয়ায়াতে ইহার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। তিনি বলেন, জিবরীল (আ) এক হাজার ফেরেশতাসহ রাসূলুল্লাহ (স)-এর ডানদিকে অবতরণ করেন। সেইদিকে ছিলেন আবূ বাক্স (রা), আর মীকাঈল (আ) এক হাজার ফেরেশতাসহ রাসূলুল্লাহ (সা)-এর বামদিকে অবতরণ করেন, সেইদিকে ছিলাম আমি। ইমাম বায়হাকী (র) আলী (রা) হইতে উক্ত রিওয়ায়াতে আরও বর্ণনা করেন যে, ইসরাফীল (আ)-ও এক হাজার ফেরেশতাসহ অবতরণ করেন।
আলী (রা) হইতে অপর এক বর্ণনায় আছে যে, তিনি বলেন, আমি বদরের কূপের নিকট বিচরণ করিতেছিলাম। তখন এমন প্রবল বেগে এক বায়ু প্রবাহিত হইল যাহা ইতোপূর্বে আমি আর কখনও দেখি নাই। অতঃপর তাহা চলিয়া গেল। আবার প্রবল বেগে বায়ু প্রবাহিত হইল, যাহা আমি কখনও দেখি নাই পূর্বের ব্যতীত। ইহার পর পুনরায় প্রবল বেগে বায়ু প্রবাহিত হইল। প্রথমবারের বায়ু ছিলেন জিবরীল (আ), যিনি এক হাজার ফেরেশতাসহ অবতরণ করেন। দ্বিতীয়বারের বায়ু মীকাঈল (আ), যিনি এক হাজার ফেরেশতাসহ রাসূলুল্লাহ (স)-এর ডানে অবতরণ করেন। আবূ বাক্স (রা) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর ডানদিকে, আর তৃতীয় বায়ু ছিলেন ইসরাফীল (আ), তিনি এক হাজার ফেরেশতাসহ রাসূলুল্লাহ (স)-এর বামদিকে অবতরণ করেন। আমি ছিলাম তাঁহার বামদিকে। আল্লাহ তাঁহার শত্রুদিগকে পরাজিত করার পর রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে তাঁহার ঘোড়ায় তুলিয়া নিলেন। ঘোড়াটি লম্ফঝম্ফ করিলে আমি উহার ঘাড়ের উপর পড়িয়া গেলাম, অতঃপর আমার প্রতিপালককে ডাকিলাম। তিনি আমাকে রক্ষা করিলেন। আমি বগলে আঘাত পাইলাম।
মুহাম্মাদ ইবন উমার আল-আসলামী হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) সেই দিন বলিলেন, এই হইল জিবরীল, বায়ু হাঁকাইয়া লইয়া যাইতেছে। সে যেন দিহয়াতুল কালবী। আমাকে পূর্বের হাওয়া দ্বারা সাহায্য করা হইয়াছে। আর আদ জাতি পশ্চিমের হাওয়ায় ধ্বংস হইয়াছে।
ফেরেশতাগণ যুদ্ধ করিবার এবং শত্রুদিগকে আঘাত করিবার পদ্ধতি জানিতেন না বিধায় আল্লাহ তা'আলা তাহাদিগকে শত্রুদের ঘাড়ের উপর এবং প্রতি হাড়ের জোড়ায় আঘাত করিবার নির্দেশ দেন। এই সম্পর্কে কুরআন কারীমে উল্লিখিত হইয়াছেঃ إِذْ يُوْحِي رَبُّكَ إِلَى الْمَلَائِكَةِ أَنِّي مَعَكُمْ فَثَبِّتُوا الَّذِيْنَ آمَنُوا سَأُلْقِي فِي قُلُوْبِ الَّذِيْنَ كَفَرُوا الرُّعْبَ فَاضْرِبُوْا فَوْقَ الْأَعْنَاقِ وَاضْرِبُوْا مِنْهُمْ كُلَّ بَنَانِ: "স্মরণ কর, তোমাদের প্রতিপালক ফেরেশতাদের প্রতি প্রত্যাদেশ করেন, আমি তোমাদের সহিত আছি। সুতরাং তোমরা মুমিনগণকে অবিচলিত রাখো। যাহারা কুফরী করে আমি তাহাদের হৃদয়ে ভীতির সঞ্চার করিব। সুতরাং তোমরা তাহাদের স্কন্ধে এবং আঘাত কর তাহাদের প্রত্যেক আঙ্গুলের অগ্রভাগ" (৮ : ১২)।
ফেরেশতাগণ ছিল পুরুষের আকৃতিতে সাদা-কালো মিশ্রিত বর্ণের ঘোড়ায় আরোহী সাদা পোশাক পরিহিত। তাঁহাদের মস্তকে ছিল সাদা পাগড়ী, যাহার প্রান্তভাগ উভয় কাঁধের মধ্যখানে ঝুলন্ত ছিল।
ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, বদর যুদ্ধে ফেরেশতাদের পাগড়ী ছিল সাদা, আর হুনায়নের যুদ্ধে ছিল সবুজ। তাঁহার অপর এক বর্ণনায় আছে যে, বদর যুদ্ধে ফেরেশতাদের ছিল কালো পাগড়ী, আর হুনায়নের যুদ্ধে সবুজ। তবে শেষোক্ত বর্ণনাটির সনদ খুবই দুর্বল বিধায় ইহা গ্রহণযোগ্য নহে।
ফেরেশতাদের আগমন সম্পর্কে প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা দিয়াছেন গিফার গোত্রের এক লোক। ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, গিফার গোত্রের এক লোক আমাকে বলিয়াছেন যে, বদর যুদ্ধের দিন আমি ও আমার এক চাচাতো ভাই কি ঘটে তাহা প্রত্যক্ষ করিবার জন্য পাহাড়ে আরোহণ করিলাম। তখন আমরা মুশরিক ছিলাম। কাহাদের পরাজয় হয় আমরা সেই অপেক্ষায় ছিলাম, যাহাতে বিজয়ী দলের লুটপাটের সময় আমরাও কিছু লুটপাট করিয়া লইতে পারি। আমরা পর্বতে আরোহণ করিতেছিলাম, হঠাৎ একখানি মেঘখণ্ড আমাদের নিকটবর্তী হইল। আমরা উহার মধ্য হইতে অশ্বের ডাক শুনিতে পাইলাম। অতঃপর আমি শুনিলাম, উহার মধ্য হইতে কে একজন বলিতেছে, “হায়যূম! সম্মুখে অগ্রসর হও” ইহা শ্রবণ করিয়া আমার চাচাতো ভাই হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হইয়া ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করিল। আর আমিও প্রায় মৃত্যুর দুয়ারে পৌছিয়া গিয়াছিলাম, একটু পরই সম্বিত ফিরিয়া পাইলাম। এক বর্ণনামতে হায়যূম জিবরীল (আ)-এর ঘোড়ার নাম। কিন্তু ইহা সঠিক বলিয়া প্রতীয়মান হয় না। কারণ অপর এক বর্ণনায় দেখা যায়, রাসূলুল্লাহ (স) জিবরীল (আ)-কে জিজ্ঞাসা করেন, বদর যুদ্ধের দিন "হায়যূম! সম্মুখে অগ্রসর হও” এই কথা কোন্ ফেরেশতা বলিয়াছিল? উত্তরে তিনি বলেন, হে মুহাম্মাদ! আকাশের সকল অধিবাসীকে তো আমি চিনি না।
অনুরূপ একটি ঘটনা মুহাম্মাদ ইবন উমার আল-আসলামী (র) আবূ রুহম আল-গিফারী (রা) হইতে, তিনি তাঁহার চাচাতো ভাই হইতে বর্ণনা করেন। তাহার চাচাতো ভাই বলেন, আমি ও আমার চাচাতো ভাই বদরের কূপের নিকট বিচরণ করিতেছিলাম। আমরা মুহাম্মাদের সঙ্গীদের সংখ্যা কম এবং কুরায়শদের সংখ্যা বেশী দেখিয়া বলিলাম, এই দুই দল যখন সংঘর্ষে লিপ্ত হইবে, আমরা মুহাম্মাদ ও তাহাদের সৈন্যদের কাছাকাছি থাকিব। তাই আমরা তাহাদের বামদিকে গেলাম। আমরা বলাবলি করিতেছিলাম, ইহারা তো কুরায়শদের চার ভাগের এক ভাগ। অতঃপর আমরা যখন তাহাদের বামদিকে চলিতেছিলাম তখন হঠাৎ একখণ্ড মেঘ আসিয়া আমাদিগকে ঢাকিয়া লইল। আমরা চক্ষু তুলিয়া উহার দিকে তাকাইলাম। আমরা পুরুষদের কণ্ঠস্বর ও অস্ত্রের ঝনঝনানী শুনিতে পাইলাম। আমরা শুনিলাম, এক ব্যক্তি তাহার ঘোড়াকে বলিতেছে, “হায়যূম! সম্মুখে অগ্রসর হও।" ইহার পর তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর ডানদিকে অবতরণ করিল। অতঃপর অনুরূপ আরও একটি দল আসিল। তাহারা রাসূলুল্লাহ (স) ও তাঁহার সঙ্গীদের সহিত অবস্থান করিল। এইবার তাহারা কুরায়শদের দ্বিগুণ হইয়া গেল। অতঃপর আমার চাচাতো ভাইটি মৃত্যুবরণ করিল। আর আমি সম্বিত ফিরিয়া পাইলাম। ইহার পর রাসূলুল্লাহ (স)-কে ইহা অবহিত করিলাম এবং ইসলাম গ্রহণ করিলাম।
ফেরেশতাদের দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত বহু মুশরিককে মুসলিম সেনাগণ প্রত্যক্ষ করেন। ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত। মুসলিম বাহিনীর এক লোক তাহার সম্মুখস্থ এক মুশরিককে প্রবল বেগে ধাওয়া করিতেছিলেন। হঠাৎ তাহার উপর চাবুকের আঘাতের আওয়ায এবং একজন অশ্বারোহীর কন্ঠস্বর শুনিতে পাইলেন। অশ্বারোহী বলিতেছিল, হায়যূম। সম্মুখে অগ্রসর হও। তখন তিনি সম্মুখস্থ মুশরিক ব্যক্তিটির দিকে তাঁকাইয়া দেখিলেন, সে ঢলিয়া পড়িতেছে। নিকটে আসিয়া দেখিলেন তাহার নাক ও চেহারায় চাবুকের আঘাত। সেই আঘাতের জায়গা সবুজ বর্ণ ধারণ করিয়াছে। উক্ত আনসারী সাহাবী আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-কে এই ঘটনা বিবৃত করিল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি সত্য বলিয়াছ, ইহা তৃতীয় আকাশ হইতে আগত সাহায্য।
বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবী আবূ দাউদ আল-মাযিনী (রা) বলেন, বদর যুদ্ধের দিন আমি মুশরিকদের এক ব্যক্তিকে হত্যা করিবার জন্য তাহার অনুসরণ করিতেছিলাম। তাহার প্রতি আমার তরবারি পৌঁছিবার পূর্বেই তাহার মস্তক লুটাইয়া পড়িল। আমি বুঝিতে পারিলাম যে, অন্য কেহ তাহাকে হত্যা করিয়াছে।
আর-রবী' ইব্ন আনাস (রা) বলেন, লোকে ফেরেশতাগণ কর্তৃক হত্যাকৃত ব্যক্তিকে চিনিত তাহার কাঁধের উপর ও জোড়ার উপর আঘাত দেখিয়া তাহা যেন আগুনে পোড়া চিহ্নের ন্যায়।
সুহায়ল ইব্ন আমর (রা) বলেন, বদর যুদ্ধের দিন আমি বহু লোককে দেখিলাম সাদা পোশাক পরিহিত, সাদা-কালো মিশ্রিত রংয়ের ঘোড়ার উপর আরোহী, যাহা আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যস্থল জুড়িয়া ছিল এবং যাহা ছিল বিশেষভাবে চিহ্নিত। তাহারা হত্যা ও বন্দী করিতেছিল। কোনও কোনও রিওয়ায়াত দ্বারা বুঝা যায় যে, ফেরেশতাগণ গিরিগুহা হইতেও আত্মপ্রকাশ করিয়াছিলেন। যেমন-
আবু উসায়দ (রা) তাহার চক্ষু অন্ধ হইবার পর বলিতেন, এখন যদি আমি তোমাদের সহিত বদর প্রান্তরে থাকিতাম এবং আমার চক্ষু ভাল থাকিত তবে অবশ্যই আমি তোমাদিগকে সেই গুহা দেখাইতাম যেখান হইতে ফেরেশতাকুল বাহির হইয়াছিল। এই ব্যাপারে আমি কোনরূপ সন্দেহ-সংশয় পোষণ করি না।
আবু বুরদা ইব্ন নিয়ার (রা) বলেন, বদর যুদ্ধের দিন আমি তিনটি মস্তক আনিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে রাখিয়া বলিলাম, ইহার দুইটি মস্তকধারীকে আমি হত্যা করিয়াছি। আর তৃতীয় মস্তকধারীকে আমি দেখিলাম সাদা লম্বা এক লোক হত্যা করিল। অতঃপর আমি তাহার মস্তক লইয়া আসিয়াছি। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, সে (হত্যাকারী সাদা লম্বা লোকটি) অমুক ফেরেশতা।
আস-সাইব ইব্ন আবী হুবায়শ (রা) উমার (রা)-এর খিলাফাত আমল বর্ণনা করিতেন, আল্লাহ্র কসম! মানুষের মধ্যে কেহই আমাকে বন্দী করে নাই। তাহাকে বলা হইল, তবে কে (আপনাকে বন্দী করিয়াছে)? তিনি বলিলেন, কুরায়শগণ যখন পরাজিত হইল তখন আমিও তাহাদের সহিত পরাজিত হইলাম। তখন লম্বা এক লোক, যিনি সাদা ঘোড়ায় আরোহী ছিলেন, অপর এক বর্ণনামতে সাদা এক লোক, যিনি সাদা-কালো রংয়ের ঘোড়ার পিঠে আরোহী ছিলেন, তিনি আমাকে ধরিয়া বাঁধিয়া ফেলিলেন। ইতোমধ্যে আবদুর রহমান ইব্ন আওফ আসিয়া আমাকে বাঁধা অবস্থায় পাইলেন। তিনি সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্য চীৎকার দিয়া বলিলেন, এই লোককে কে বন্দী করিয়াছে? কেহই ইহার উত্তর দিল না। এইভাবে তিনি আমাকে লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিলে তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমাকে কে বন্দী করিয়াছে? আমি বলিলাম, আমি তাহাকে চিনি না। আমি যাহা দেখিয়াছি তাহা তাঁহার নিকট বিবৃত করিতে অপছন্দ করিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমাকে এক ফেরেশতা বন্দী করিয়াছেন। আর হে ইব্ন আওফ! তোমার বন্দীকে লইয়া যাও।
হাকীম ইব্ন হিযাম (রা) বলেন, বদরের দিন আমরা দেখিলাম আকাশ হইতে একটি সেলাইকৃত কাপড় পতিত হইল যাহা আকাশের প্রান্তসীমা বন্ধ করিয়া দিল। তখন উপত্যকা পিপীলিকায় পূর্ণ হইয়া গেলে আমার মনে হইল, ইহা আকাশের কোনও জিনিস যাহা দ্বারা মুহাম্মাদকে সাহায্য করা হইতেছে। অতঃপর শত্রুর পরাজয় হইল। আর উহা ছিল ফেরেশতা। জুবায়র ইবন মুতইম (রা) হইতেও অনুরূপ একটি রিওয়ায়াত বর্ণিত আছে।
আবদুর রহমান ইব্ন আওফ (রা) বলেন, বদর যুদ্ধের দিন আমি দুই ব্যক্তিকে দেখিলাম। তাঁহাদের একজন রাসূলুল্লাহ (স)-এর ডানে এবং একজন বামে থাকিয়া প্রচণ্ড যুদ্ধ করিয়াছে। অতঃপর তৃতীয় এক ব্যক্তি আসিয়া তাঁহার পিছনে থাকিয়া যুদ্ধ করিতে লাগিল। একটু পরই চতুর্থ ব্যক্তি আসিয়া তাঁহার সম্মুখে যুদ্ধ করিতে লাগিল।
ইব্ন আব্বাস ও আলী (রা) হইতে বর্ণিত। আব্বাসকে বন্দী করেন আবুল ইয়াসার। তিনি ছিলেন হাঙ্কা-পাতলা আর আব্বাস ছিলেন মোটাতাজা ও ভারী। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, হে আবুল ইয়াসার! তুমি আব্বাসকে কিভাবে বন্দী করিলে? তিনি বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে এই কাজে এমন এক ব্যক্তি সাহায্য করিয়াছে যাহাকে আমি পূর্বে কখনও দেখি নাই এবং পরেও দেখি নাই। তাঁহার আকৃতি এইরূপ এইরূপ...। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বলিলেন, তোমাকে এই কাজে সাহায্য করিয়াছে একজন সম্মানিত ফেরেশতা।
আতিয়্যা ইन्न কায়স বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) যখন বদর যুদ্ধ শেষ করিলেন তখন জিবরীল (আ) একটি লাল রংয়ের উষ্ট্রীতে আরোহণ করিয়া আসিলেন। তাঁহার পরনে ছিল লৌহবর্ম এবং সঙ্গে ছিল তীর। তিনি বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! আল্লাহ আমাকে আপনার নিকট প্রেরণ করিয়াছেন এবং আমাকে নির্দেশ দিয়াছেন যে, আপনি সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত আমি যেন আপনার নিকট হইতে পৃথক না হই। আপনি কি সন্তুষ্ট হইয়াছেন? তিনি বলিলেন, হাঁ, আমি সন্তুষ্ট হইয়াছি। অতঃপর জিবরীল (আ) চলিয়া গেলেন।
ঘোরতর যুদ্ধ শুরু
মল্লযুদ্ধ সমাপ্ত হইবার পর রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবায়ে কিরামকে জিহাদে উদ্বুদ্ধ করিয়া লড়াই শানিত ও জোরদার করার নির্দেশ দিলেন। সাহাবায়ে কিরাম বীরত্বের সহিত শত্রুদের উপর ঝাঁপাইয়া পড়িলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-কে নিজেদের মধ্যে দেখিয়া তাহারা আরও প্রেরণা লাভ করিতেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) নিজেও বীরত্বের সহিত যুদ্ধ করিতেছিলেন। তাঁহার সঙ্গে আবূ বাক্স (রা)-ও। তাঁহারা আরীশে আল্লাহর দরবারে যেমন বিনয় সহকারে দু'আ করিতেছিলেন তেমনি প্রত্যক্ষ রণাঙ্গনেও আসিয়া যুদ্ধ করিতেছিলেন এবং মুসলমানদিগকে যুদ্ধের প্রতি অনুপ্রাণিত করিতেছিলেন। আলী (রা) বলেন, বদর যুদ্ধের দিন যখন প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হইল তখন রাসূলুল্লাহ (স) আমাদের আগে আগে ছিলেন। আমরা তাঁহার আড়ালে ছিলাম। সেই দিন তিনি সকলের চেয়ে প্রচণ্ডভাবে যুদ্ধ করিতেছিলেন। আমাদের কেহই তদপেক্ষা মুশরিকদের নিকটবর্তী ছিল না।
ইমাম আহমাদ (র)-এর বরাতে ইউসুফ সালিহী তাঁহার সুবুলুল হুদা গ্রন্থে ইহা ছাড়া আরও উল্লেখ করিয়াছেন যে, বদরের দিন আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর দ্বারা আত্মরক্ষা করিতেছিলেন। তিনি বলিতেছিলেন, سَيُهْزَمُ الْجَمْعُ وَيُولُونَ الدُّبْرُ “এই দল তো শীঘ্রই পরাজিত হইবে এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিবে” (৫৪ঃ ৪৫)। এক পর্যায়ে তিনি একমুষ্ঠি কঙ্করযুক্ত মাটি উঠাইয়া شاهت الوجوه )মুখমণ্ডল গুলি কদাকার হউক) বলিয়া ছুড়িয়া মারিলেন। ফলে এমন কোন কাফির অবশিষ্ট রহিল না যাহার চোখে, মুখে ও নাকে গিয়া উহা না পৌঁছিল। ফলে তাহারা চক্ষু মুছিতে লাগিল। আর এই সুযোগে মুসলিমগণ তাহাদের মস্তক দ্বিখণ্ডিত করিয়া ফেলিতে লাগিল। ইহার কথাই বলা হইয়াছে আল-কুরআনের এই আয়াতে : وَمَا رَمَيْتَ إِذْ رَمَيْتَ وَلَكِنَّ اللهَ رَمَى “এবং তুমি যখন নিক্ষেপ করিয়াছিলে তখন তুমি নিক্ষেপ কর নাই, আল্লাহ্ই নিক্ষেপ করিয়াছিলেন" (৮: ১৭)।
বিভিন্ন রিওয়ায়াত দ্বারা বুঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (স) কাফিরদের প্রতি কংকরই নিক্ষেপ করিয়াছিলেন। আবদুর রহমান ইব্ন যায়দ ইব্ন আসলাম-এর বর্ণনামতে, তিনি তিনটি কংকর লইয়া একটি শত্রুবাহিনীর ডাইনদিকে একটি বামদিকে এবং আর একটি তাহাদের সম্মুখভাগে নিক্ষেপ করিলেন এবং বলিলেনঃ شاهت الوجوه ইহার ফলে তাহারা পরাজিত হইল।
হাকীম ইব্ন হিযাম (রা), যিনি পরে মুসলমান হন, বলেন, বদরের দিন আমরা উভয় দল যখন মুখামুখী হইয়া যুদ্ধে লিপ্ত হইলাম তখন আমি তস্তরিতে পাথর পড়িলে যেইরূপ শব্দ হয় সেইরূপ একটি শব্দ শুনিতে পাইলাম যাহা আকাশ হইতে মাটিতে পড়িল। আর রাসুলুল্লাহ (স) একমুষ্টি মাটি উঠাইয়া নিক্ষেপ করিলেন, ফলে আমরা কাফিরগণ পরাজিত হইলাম।
নাওফাল ইব্ন মু'আবিয়া আদ-দীলী বলেন, আমরা বদর যুদ্ধে পরাজিত হইয়াছিলাম, কারণ আমরা আমাদের অন্তরে এবং আমাদের পিছনে তস্তরিতে পাথর পতনের ন্যায় একটি শব্দ শুনিতে পাইয়াছিলাম। ইহা আমাদের সবচেয়ে ভীতির কারণ হইয়াছিল।
অতঃপর অল্প সময়ের মধ্যেই যুদ্ধের গতি পাল্টাইয়া গেল। মুসলমানদের বিজয় সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হইয়া উঠিল। বিশিষ্ট কুরায়শ নেতাগণ নিহত হইল। অবশেষে মুসলমানগণ শত্রু সৈন্যদিগকে ব্যাপকভাবে বন্দী করিতে শুরু করিল। অধিকাংশ কাফিরই রণক্ষেত্র হইতে পলায়ন করিয়া প্রাণ রক্ষা করিল। এই যুদ্ধে ৭০জন কাফির নিহত এবং ৭০জন বন্দী হয়। আর মুসলমানদের পক্ষে ১৪জন শাহাদাত লাভ করেন, তন্মধ্যে ৬ জন মুহাজির এবং ৮জন আনসার।
যুদ্ধক্ষেত্র হইতে ইবলীসের পলায়ন ও আবু জাহলের সান্ত্বনাবাণী
কুরায়শগণ যুদ্ধের জন্য রওয়ানা হইলে ইবলীস পথিমধ্যে বাক্স গোত্রের নেতা সুরাকা ইবন মালিকের আকৃতি ধারণ করিয়া তাহাদের সঙ্গ লইয়াছিল এবং বিভিন্ন রকমের আশ্বাসবাণী শুনাইতেছিল। সে তাহাদিগকে বলিয়াছিল:
لا غَالِبَ لَكُمُ الْيَوْمَ مِنَ النَّاسِ وَإِنِّيْ جَارٌ لَكُمْ.
"আজ মানুষের মধ্যে কেহই তোমাদের উপর বিজয়ী হইবে না। আমি তোমাদের পার্শ্বেই থাকিব” (৮:৪৮)।
অতঃপর যুদ্ধক্ষেত্রে সে যখন ফেরেশতাদের ভূমিকা ও কাফিরদের প্রতি তাহাদের আক্রমণের ভয়ানক অবস্থা দেখিল তখন তাহার হস্ত ছিল এক মুশরিকের হাতে ধরা অবস্থায়। সে এক ঝট্কায় নিজের হাত ছাড়াইয়া লইয়া ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটিতে লাগিল। তখন সেই লোকটি এবং অন্যান্য মুশরিক সৈন্য তাহাকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিতে লাগিল, "কোথায় যাইতেছ হে সুরাকা। তুমি না বলিয়াছিলে, তুমি আমাদের পার্শ্বেই থাকিবে, আমাদের হইতে বিচ্ছিন্ন হইবে না!" তখন সে বলিল,
إِنِّي بَرِيقٌ مِّنْكُمْ إِنِّي أَرَى مَالَا تَرَوْنَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ وَاللَّهُ شَدِيدُ الْعِقَابِ.
"তোমাদের সহিত আমার কোনও সম্পর্ক রহিল না, তোমরা যাহা দেখিতে পাও না আমি উহা দেখিতেছি। আমি আল্লাহকে ভয় করি, আর আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর” (৮:৪৮)।
তখন আল-হারিছ ইব্ন হিশাম তাহাকে সুরাকা মনে করিয়া ধরিয়া ফেলিল। ইবলীস তখন হারিছের বুকে ঘুষি মারিলে সে মাটিতে পড়িয়া গেল। এই সুযোগে ইবলীস আর ডানে-বামে ও অগ্রে-পশ্চাতে ভ্রূক্ষেপ না করিয়া সোজা গিয়া সমুদ্রের মধ্যে পড়িল এবং উভয় হস্ত উত্তোলন করিয়া বলিতে লাগিল, হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমার প্রতি যে অঙ্গীকার করিয়াছিলে উহা পূরণ কর। হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট আমার প্রতি তোমার বিশেষ দৃষ্টি কামনা করিতেছি।" সে ভয় পাইতেছিল যে, যুদ্ধ বুঝি সম্প্রসারিত হইয়া তাহার নিকট পর্যন্ত গিয়া পৌঁছিবে।
আবূ জাহল সম্মুখে অগ্রসর হইয়া বলিল, ওহে লোকসকল! সুরাকা ইবন মালিকের অপদস্থ অবস্থা তোমাদিগকে যেন ঘাবড়াইয়া না দেয়। কারণ সে ছিল মুহাম্মাদের সহিত অঙ্গীকারাবদ্ধ। আর শায়বা, উতবা ও আল-ওয়ালীদের হত্যাও যেন তোমাদিগকে বিচলিত না করে। কারণ তাহারা বেশী তাড়াহুড়া করিয়াছিল। আল-লাত ও আল-উষ্যার কসম! মুহাম্মাদ ও তাহার সঙ্গীদিগকে রশি দ্বারা না বাঁধিয়া আমরা ফেরত যাইব না। তোমরা তাহাদিগকে জীবিত পাকড়াও কর, যাহাতে আমরা তাহাদেরকে তোমাদিগকে ত্যাগ করা ও লাত-'উয্যাক অবমাননা করা প্রভৃতি অপকর্মের প্রতিফল বুঝাইয়া দিতে পারি। এই সময় আবূ জাহল কবিতা আবৃত্তি করিতেছিল:
ما تنقم الحرب الشموس منى + بازل عامين حدیث سنی لمثل هذا ولدتني أمي
"উজ্জ্বল আলোয় উদ্ভাসিত যুদ্ধক্ষেত্র, দুই বৎসর বয়স্ক নবীন উট আমার নিকট হইতে প্রতিশোধ গ্রহণ করিবে না। এই ধরনের কাজের জন্যই আমার মাতা আমাকে জন্মদান করিয়াছে”।
বর্ণিত আছে যে, কুরায়শগণ পরে সুরাকাকে মক্কায় দেখিয়া তাহাকে বলিয়াছিল, হে সুরাকা! তুমি যুদ্ধের কাতার ভঙ্গ করিয়াছ এবং আমাদের মধ্যে পরাজয়ের সূত্রপাত করিয়াছ। তিনি বলেন, আল্লাহ্র কসম! তোমাদের বিষয়ে শুরু হইতে পরাজিত হওয়া পর্যন্ত আমি কিছুই জানি না। আমি উপস্থিতও ছিলাম না, জানিও না কিছু। কিন্তু মুশরিকগণ উহা বিশ্বাস করিল না। অতঃপর এক সময় তাহারা ইসলাম গ্রহণ করিল এবং এই ব্যাপারে আল্লাহ যাহা অবতীর্ণ করিয়াছেন উহা শুনিল। তখন তাহারা জানিতে পারিল যে, ইবলীস তাহার আকৃতি ধারণ করিয়াছিল।
যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলিম বাহিনীর বিশেষ সংকেত
যুদ্ধক্ষেত্রে পরস্পরকে চিনিবার জন্য রাসূলুল্লাহ (স) বিভিন্ন গোত্রের জন্য বিভিন্ন সংকেত নির্ধারণ করিয়া দেন। আবদুল্লাহ ইবনুষ যুবায়র (রা) সূত্রে বর্ণিত যে, বদর যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (স) মুহাজিরদের জন্য 'ইয়া বানী আবদির রাহমান', খাযরাজ গোত্রের জন্য 'ইয়া বানী আবদিল্লাহ' ও আওস গোত্রের জন্য 'ইয়া বানী উবায়দিল্লাহ' সংকেত নির্ধারণ করিয়া দেন। এক বর্ণনামতে মুসলমানদের সকলের সংকেত ছিল أمت يا منصور "হে সাহায্যপ্রাপ্ত ব্যক্তি! মারিয়া ফেল”। যায়দ ইব্ন আলীর বর্ণনামতে ইহাই ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর সংকেত। ইব্ন হিশামের বর্ণনামতে বদর যুদ্ধের দিন সাহাবায়ে কিরামের সংকেত ছিল 'আহাদুন আহাদ'। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার ঘোড়ার নামকরণ করেন খায়লুল্লাহ তথা আল্লাহর ঘোড়া।
শত্রুসৈন্যদেরকে ধরপাকড় এবং সাদ ইব্ন মু'আয-এর অসন্তুষ্টি
রাসূলুল্লাহ (স) যুদ্ধ শুরু করিবার নির্দেশ দেওয়ার পর এবং কাফিরদের প্রতি কংকর নিক্ষেপ করিবার পর কাফিরগণ পরাজিত হইতে শুরু করিল। রাসূলুল্লাহ (স) পুনরায় আরীশে প্রবেশ করিলেন। তাঁহার সঙ্গে ছিলেন আবূ বাক্স (রা)। সা'দ ইব্ন মু'আয (রা) ও তাঁহার সঙ্গী আরও কিছু আনসার তরবারি সজ্জিত অবস্থায় আরীশের দরজায় দাঁড়াইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-কে প্রহরা দিতে লাগিলেন। শত্রুসৈন্যদের পুনরায় ফিরিয়া আসার আশঙ্কায় তাঁহারা এই ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়াছিলেন। মুসলিমগণ যখন ব্যাপক হারে শত্রুসেনাদের বন্দী করিতেছিলেন তখন রাসূলুল্লাহ (সা) সা'দ ইব্ন মুআয (রা)-এর মুখমণ্ডলে অসন্তুষ্টি ও বিরক্তির ভাব লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, আল্লাহ্র কসম, হে সাদ! মুসলিম বাহিনী যাহা করিতেছে মনে হয় উহা তুমি অপছন্দ করিতেছ। তিনি বলিলেন, হাঁ, আল্লাহর কসম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! মুশরিকদের বিরুদ্ধে এই প্রথম আল্লাহ তা'আলা যুদ্ধ সংঘটিত করিয়া দিয়াছেন। তাই মুশরিক সৈন্যগণকে বাঁচাইয়া রাখার পরিবর্তে হত্যা করিয়া ফেলাই আমার নিকট পছন্দনীয় ছিল।
শত্রুসেনাদের কতককে হত্যা করিতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিষেধাজ্ঞা
শত্রু সেনাদের সকলেই যে স্বেচ্ছায় ও সোৎসাহে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হইয়াছিল তাহা নহে। সকলেই যে ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করিত তাহাও নহে। এমনও অনেক লোক ছিল যাহারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাসূলুল্লাহ (স) ও মুসলমান দিগকে সাহায্য-সহযোগিতা করিয়াছিল। পরিস্থিতির শিকার হইয়া বা নেতৃবৃন্দের চাপে পড়িয়া অনিচ্ছা সত্ত্বেও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিয়াছিল। রাসূলুল্লাহ (স) এইসব লোককে হত্যা করিতে নিষেধ করেন। ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (স) সেই দিন তাঁহার সাহাবীদিগকে বলিয়া ছিলেন, আমি জানি যে, বানু হাশিমের কিছু লোক এবং অন্যান্যদিগকে জোর-জবরদস্তিমূলক তাহাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ঘর হইতে বাহির করা হইয়াছে। আমাদের সহিত যুদ্ধ করিতে তাহাদের কোনও প্রয়োজন নাই। তাই তোমাদের কেহ বানু হাশিমের কোনও লোকের মুখামুখী হইলে তাহাকে হত্যা করিবে না। আর যে আবুল বাখতারী ইব্ন হিশাম ইবনুল হারিছ ইব্ন আসাদের সাক্ষাত পাইবে সে যেন তাহাকে হত্যা না করে। কারণ তাহাকে জোর করিয়া আনা হইয়াছে। আর যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর চাচা আব্বাস ইব্ন আবদিল মুত্তালিবের সাক্ষাত পাইবে সে যেন তাহাকে হত্যা না করে। কারণ তাহাকেও জোর করিয়া আনা হইয়াছে। তখন আবূ হুযায়ফা ইব্ন উতবা ইবন রাবী'আ বলিলেন, আমরা কি আমাদের পিতা, পুত্র ও ভ্রাতাদের হত্যা করিব, আর আব্বাসকে ছাড়িয়া দিব? আল্লাহ্র কসম! আমি যদি তাহার সাক্ষাত পাই তবে অবশ্যই তরবারি দ্বারা তাহাকে হত্যা করিব। এই কথা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পৌছিলে তিনি উমার (রা)-কে বলিলেন, হে আবূ হাফস! (উমার বলেন, এই প্রথম তিনি আমাকে উপনামে সম্বোধন করিলেন) রাসূলাল্লাহ্র চাচার চেহারা তরবারি দ্বারা আঘাত করা হইবে। উমার (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে অনুমতি দিন আমি তরবারি দ্বারা তাহার গর্দান উড়াইয়া দেই। আল্লাহ্র কসম! সে মুনাফিক হইয়া গিয়াছে। আবু হুযায়ফা (রা) বলিলেন, সেই দিন আমি যাহা বলিয়াছিলাম তাহার দরুন স্বস্তি লাভ করিতে পারি নাই। সর্বদা আমি শংকিত ছিলাম যে, আমার এই উক্তি কি আমাকে শাহাদাতের মর্যাদা হইতে ফিরাইয়া দেয়? অতঃপর তিনি ইয়ামামার যুদ্ধে শহীদ হন।
আবুল বাখতারীকে হত্যার ঘটনা
আবুল বাখতারীকে রাসূলুল্লাহ (স) হত্যা করিতে নিষেধ করিয়াছিলেন। তাহার কিছু কারণ ইবন ইসহাক বর্ণনা করিয়াছেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আবুল বাখতারীকে হত্যা করিতে এইজন্য নিষেধ করেন যে, মক্কায় থাকিতে তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-কে কোনরূপ নির্যাতন করা হইতে বিরত থাকিতেন। তিনি তাঁহাকে কোনরূপ কষ্ট দিতেন না। তাহার পক্ষ হইতে এমন কোনও আচরণ প্রকাশ পায় নাই যাহা রাসূলুল্লাহ (স) অপছন্দ করেন। বানু হাশিম ও বানু মুত্তালিবকে বয়কট করিয়া যে পত্র প্রণয়ন করা হয় উহা ছিড়িয়া ফেলার উদ্যোগ গ্রহণকারীদের মধ্যে তিনি ছিলেন অগ্রগণ্য। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও আবুল বাখতারী নিহত হন। বলা যায় যে, এক রকম স্বেচ্ছায়ই তিনি নিহত হন।
তাহার হত্যার ঘটনার বিবরণ এই যে, আনসারদের মিত্র আল-মুজাযযির ইবন যিয়াদ আল-বালাবী যুদ্ধ ক্ষেত্রে আবুল বাখতারীর সাক্ষাত পাইয়া তাহাকে বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) তোমাকে হত্যা করিতে আমাদিগকে নিষেধ করিয়াছেন। আবুল বাখতারীর সহিত লায়ছ গোত্রের জুনাদা ইব্ন মুলায়হা নামে তাহার এক সঙ্গী ছিল, যে মক্কা হইতেই তাহার সহিত একসঙ্গে বাহির হইয়াছিল। আবুল বাখতারী বলিলেন, আর আমার সঙ্গীকে? মুজাযযির (রা) তাহাকে বলিলেন, না, আল্লাহর কসম! আমরা তোমার সঙ্গীকে ছাড়িব না। রাসুলুল্লাহ (স) কেবল তোমাকেই হত্যা না করার জন্য আমাদিগকে নির্দেশ দিয়াছেন। আবুল বাখতারী বলিলেন, না, আল্লাহ্র কসম! তাহা হইলে আমি ও সে একত্রে মৃত্যুবরণ করিব যাহাতে মক্কার মহিলাগণ আমার সম্পর্কে বলিতে না পারে যে, আমি জীবনের আশায় আমার সঙ্গীকে পরিত্যাগ করিয়াছি। আল-মুজাযয্যির-এর সহিত যুদ্ধে লিপ্ত হইবার সময় আবুল বাখতারী এই কবিতা আবৃত্তি করিয়াছিলেন:
لن يسلم ابن حرة زميله حتى يموت أو يرى سبيله.
"স্বাধীন মহিলার পুত্র কখনও তাহার সঙ্গীকে (শত্রুর হাতে) সমর্পণ করে না, যতক্ষণ না সে মৃত্যুবরণ করে অথবা তাহার পথ দেখিয়া লয়।”
আর মুজাযয্যির (রা) আবুল বাখতারীকে হত্যা করার সময় এই কবিতা আবৃত্তি করেন:
اما جهلت أو نسيت نسبي + فاثبت النسبة اني من بلى الطاعنين برماح اليزني + والضاربين الكبش حتى ينحني بشر بيتم من ابوه البختري + او بشرن بمثلها منى بني انا الذى يقال اصلى من بلى + اطعن بالصعدة حتى تنثنى + وارزم للموت كارزام المرى واعبط القرن بعضب مشرفي فلا ترى مجذرا یفری فری
"তুমি কি আমার বংশ সম্পর্কে অজ্ঞ রহিয়াছ না ভুলিয়া গিয়াছ? তাহা হইলে সম্বন্ধটি ভাল করিয়া জানিয়া লও যে, আমি বালিয়্যি গোত্রের, যাহারা আল-ইয়াযানী বর্শা দ্বারা আঘাতকারী এবং যাহারা বকরীকে প্রহারকারী যতক্ষণ না উহা বাঁকা হইয়া যায়। আবুল বাখতারী যাহার পিতা, তাহাকে ইয়াতীম হওয়ার সুসংবাদ দাও অথবা আমার পক্ষ হইতে আমার পুত্রদিগকে অনুরূপ সুসংবাদ দাও। আমি সেই লোক যাহার গোড়া হইল বালিয়িয় বংশ। আমি বর্শা দ্বারা আঘাত করি উহা বাঁকা হওয়া পর্যন্ত। আমি আমার প্রতিদ্বন্দ্বীকে হত্যা করি ধারালো মাশরিফী তরবারি দ্বারা। আমি মৃত্যুর জন্য ক্রন্দন করি কষ্টের সহিত দোহনকৃত উষ্ট্রীর ক্রন্দনের ন্যায়। তাই তুমি মুজাযযিরকে কোনও অদ্ভুত রকমের কাজ করিতে দেখিবে না।"
অতঃপর মুজাযযির রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট গিয়া বলিলেন, সেই সত্তার কসম, যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করিয়াছেন! আমি তাহাকে বন্দী করিয়া আপনার নিকট লইয়া আসার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়াছি। কিন্তু সে আমার সহিত যুদ্ধ করা ব্যতীত আর কিছুতেই সম্মত হয় নাই। অবশেষে আমি তাহার সহিত যুদ্ধে লিপ্ত হইয়াছি। অতঃপর আমি তাহাকে হত্যা করিয়াছি।
কেহ কেহ বলেন যে, আবুল ইয়াসার (রা) তাহাকে হত্যা করিয়াছেন। তবে অধিকাংশ সীরাতবিদের মতে আল-মুজাযয্যির (রা)-ই তাহাকে হত্যা করেন। ইব্ন সায়্যিদিন নাস বলেন, নিঃসন্দেহে আবূ দাউদ আল-মাযিনী তাহাকে হত্যা করিয়াছেন। আবুল বাখতারীর তরবারি আবূ দাউদ আল-মাযিনী (রা)-এর পুত্রদের নিকট রক্ষিত ছিল, যাহা তাহার কোন এক পুত্র আবুল বাখতারীর পুত্রের নিকট বিক্রয় করেন।
উমায়্যা ইব্ন খালাফকে হত্যার ঘটনা
উমায়্যা ইব্ন খালাফ ছিল কুরায়শ নেতৃবৃন্দের অন্যতম। সে নও মুসলিমগণকে ভীষণভাবে নির্যাতন করিত। বিলাল (রা) ছিলেন তাহার ক্রীতদাস। ইসলাম গ্রহণের কারণে উমায়্যা ইব্ন খালাফ তাহাকে তপ্ত মরুভূমিতে চীৎ করিয়া শোয়াইয়া বুকের উপর ভারী পাথর চাপা দিয়া অমানুষিক নির্যাতন করে। বদর যুদ্ধের সময় বিলাল (রা) আনসার সাহাবীদের একদলসহ তাহাকে হত্যা করেন। তাহার নিহত হওয়ার বিবরণ দিয়াছেন আবদুর রাহমান ইব্ন আওফ (রা)। তিনি বলেন, উমায়্যা ইন্ন খালাফ মক্কায় থাকিতে আমার বন্ধু ছিল। আমার নাম ছিল আব্দ আমর। ইসলাম গ্রহণের পর আমার নাম রাখা হয় আবদুর রাহমান। মক্কায় থাকিতে সে একদিন আমার সহিত সাক্ষাত করিয়া বলিল, হে আব্দ আমর! তুমি কি তোমার মাতা-পিতার রাখা নাম পরিত্যাগ করিয়াছ? আমি বলিলাম, হাঁ। সে বলিল, আমি রাহমান কে তাহা চিনি না। তাই আমার ও তোমার মধ্যে এমন একটি কিছু ঠিক কর যাহা দ্বারা আমি তোমাকে ডাকিতে পারি। তুমি তো তোমার পূর্বের নামে ডাকিলে সাড়া দিবে না, আর আমিও এমন নামে ডাকিব না যাহাকে আমি চিনি না। সে যখন আমাকে হে আব্দ আমর বলিয়া ডাকিত, আমি তাহার ডাকে সাড়া দিতাম না। আমি তাহাকে বলিলাম, হে আবূ আলী! তোমার যাহা ইচ্ছা তাহাই একটা কিছু ঠিক করিয়া লও। সে বলিল, তাহা হইলে তুমি আবদুল ইলাহ। আমি বলিলাম, হাঁ। অতঃপর আমি যখন তাহার নিকট দিয়া যাইতাম তখন সে আমাকে ডাকিত, হে আবদুল ইলাহ! আমি ইহাতে সাড়া দিতাম এবং তাহার সহিত আলাপ-আলোচনা করিতাম।
এমনিভাবে বদর যুদ্ধের দিন আমি তাহার নিকট দিয়া যাইতেছিলাম। সে তাহার পুত্র আলীর হাত ধরিয়া দাঁড়াইয়াছিল। আমার সঙ্গে কয়েকটি লৌহবর্ম ছিল যাহা আমি শত্রুসেনাগণকে পরাস্ত করিয়া ছিনাইয়া লইয়াছিলাম। আমি উহা বহন করিয়া লইয়া যাইতেছিলাম। সে আমাকে দেখিয়া বলিল, হে আব্দ আমর! আমি ইহার উত্তর দিলাম না। অতঃপর সে ডাকিল, হে আবদুল ইলাহ! আমি বলিলাম, হাঁ। সে বলিল, তুমি কি আমার প্রতি মনোযোগ দিবে? আমি তো তোমার সহিত যে লৌহবর্ম আছে তাহা হইতে উত্তম। আমি বলিলাম, হাঁ, অবশ্যই আল্লাহ্র কসম!
অতঃপর আমি আমার হাত হইতে বর্মগুলি ছুড়িয়া ফেলিলাম এবং তাহার ও তাহার পুত্রের হাত ধরিলাম। সে বলিতেছিল, আজিকার দিনের মত (ভয়াবহ দিন) আমি আর কখনও দেখি নাই। তোমাদের কি দুধের প্রয়োজন আছে? ইহা দ্বারা সে অধিক দুধেলা উস্ত্রী উপঢৌকনের দিকে ইঙ্গিত করে। অতঃপর আমি তাহাদের উভয়কে লইয়া চলিতে লাগিলাম। আমি উমায়্যা ও তাহার পুত্রের মধ্যখানে উভয়ের হাত ধরিয়া চলিতেছিলাম। উমায়্যা আমাকে বলিল, হে আবদুল ইলাহ! তোমাদের মধ্যে বুকে উট পাখির পালক দ্বারা সজ্জিত ব্যক্তিটি কে? আমি বলিলাম, তিনি হামযা ইব্ন আবদিল মুত্তালিব। সে বলিল, ঐ ব্যক্তি আমাদিগকে আজ চরম মার দিয়াছে।
আবদুর রাহমান (রা) বলেন, আল্লাহ্র কসম! আমি তাহাদিগকে লইয়া যাইতেছিলাম এমন সময় বিলাল (রা) হঠাৎ আমার সহিত তাহাকে দেখিয়া ফেলিল। সে মক্কায় থাকিতে ইসলাম গ্রহণের কারণে বিলালকে চরম নির্যাতন করিয়াছিল। বিলাল তাহাকে দেখিয়াই বলিয়া উঠিল, কাফিরদের নেতা উমায়্যা ইব্ন খালাফ! সে পরিত্রাণ পাইলে আমার রক্ষা নাই। অতঃপর তাহারা আমাদিগকে ঘিরিয়া ফেলিল। এমনকি তাহারা গোলাকার বৃত্তের ন্যায় করিয়া ফেলিল। আমি তাহার উপর হইতে আঘাত প্রতিহত করিয়াছিলাম। অতঃপর এক ব্যক্তি তরবারি বাহির করিয়া তাহার পুত্রের পায়ে আঘাত করিল। ফলে সে পড়িয়া গেল। ইহা দেখিয়া উমায়্যা এমন জোরে চীৎকার দিয়া উঠিল যাহা আমি ইতোপূর্বে আর কখনও শুনি নাই। আমি বলিলাম, এখন নিজে বাঁচো, তোমাকে বাঁচাইবার আর কোনও পথ নাই। আল্লাহ্র কসম! আমি তোমার কোনওই উপকার করিতে পারিব না। অতঃপর তাহারা উভয়কেই তরবারি দ্বারা টুকরা টুকরা করিয়া ফেলিল। পরবর্তী কালে আবদুর রাহমান ইব্ন আওফ (রা) বলিতেন, আল্লাহ বিলালের প্রতি রহম করুন। আমার বর্মগুলিও গেল এবং আমার বন্দীর কারণে আমাকে কষ্টও ভোগ করিতে হইল। এক বর্ণনামতে এই সময় আবদুর রাহমান ইব্ন আওফ (রা)-এর পায়ে তরবারির আঘাত লাগিয়াছিল। উহার প্রতিই তিনি ইঙ্গিত করিয়াছেন।
আবু জাহলকে হত্যা ঘটনা
এই যুদ্ধে কুরায়শদের শীর্ষ নেতা আবু জাহল ইব্ন হিশাম নির্মমভাবে নিহত হয়। ইমাম বুখারী (র) তাহার হত্যার যে বিবরণ প্রদান করিয়াছেন তাহা এইরূপঃ আবদুর রাহমান ইব্ন আওফ (রা) বলেন, বদর যুদ্ধের দিন সৈন্যদের লাইনে দাঁড়াইয়া আমি ডানে, বামে তাকাইয়া দেখিলাম, আমি আনসারদের অল্পবয়স্ক দুই যুবকের মধ্যখানে অবস্থিত। আমি মনে মনে কামনা করিলাম, আমি যদি ইহাদের তুলনায় দুইজন শক্তিশালী লোকের মধ্যখানে থাকিতাম। তাহাদের একজন আমাকে একটু খোঁচা দিয়া বলিল, 'চাচাজী। আপনি কি আবূ জাহলকে চিনেন? আমি বলিলাম, হাঁ। তাহাকে দিয়া তোমার কি প্রয়োজন হে ভ্রাতুষ্পুত্র? সে বলিল, আমি জানিতে পারিয়াছি যে, সে রাসূলুল্লাহ (স)-কে গালি দেয়। সেই সত্তার কসম যাঁহার হাতে আমার প্রাণ! আমি যদি তাহাকে দেখিতে পাই তবে আমাদের মধ্যে তাড়াহুড়াকারী ব্যক্তিটি মৃত্যুবরণ না করা পর্যন্ত তাহার হইতে পৃথক হইব না। ইহা শুনিয়া আমি স্তম্ভিত হইয়া গেলাম। অতঃপর অপরজনও আমাকে একটু খোঁচা দিয়া অনুরূপ কথা বলিল।
ইতোমধ্যে আমি আবূ জাহলকে দেখিলাম, সে লোকদের মধ্যে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। আমি বলিলাম, দেখ! তোমরা যাহার কথা জিজ্ঞাসা করিয়াছিলে ঐ সেই ব্যক্তি। অতঃপর তাহারা উভয়ে ছুটিয়া গিয়া দ্রুত তরবারি চালনা করিতে লাগিল।' বুখারীর অপর বর্ণনায় আছে, তাহারা বাজ পাখির ন্যায় দ্রুত গিয়া তাহার উপর ঝাঁপাইয়া পড়িল এবং তাহাকে হত্যা করিল। অতঃপর তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া এই সংবাদ দিল। তিনি বলিলেন, তোমাদের মধ্যে কে তাহাকে হত্যা করিয়াছে? উভয়ে বলিল, আমি তাহাকে হত্যা করিয়াছি। তিনি বলিলেন, তোমরা কি তোমাদের তরবারি মুছিয়া ফেলিয়াছ? তাহারা বলিল, না। অতঃপর তিনি তাহাদের উভয়ের তরবারির দিকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, তোমরা উভয়ে তাহাকে হত্যা করিয়াছ। তাহার পরিত্যক্ত সম্পদ মু'আয ইব্ন আমর ইবনুল জামূহ-এর। তাহাদের নাম ছিল মু'আয ইব্ন 'আফরা ও মু'আয ইব্ন 'আমর ইবনুল জামূহ।
আবু জাহল নিহত হওয়া সম্পর্কে ইব্ন হিশামের বর্ণনা এইরূপঃ বদর যুদ্ধের দিন আবু জাহল সম্মুখে অগ্রসর হইতেছিল আর এই কবিতা আবৃত্তি করিতেছিল:
ما تنقم الحرب العوان منى + بازل عامين حديث سنی لمثل هذا ولدتني أمي
“প্রচণ্ড ও ভয়ঙ্কর যুদ্ধ; দুই বৎসর বয়স্ক নবীন উট আমার নিকট হইতে প্রতিশোধ গ্রহণ করিবে না। এই ধরনের কাজের জন্যই আমার মাতা আমাকে জন্ম দান করিয়াছে।”
যুদ্ধশেষে রাসূলুল্লাহ (স) নিহতদের মধ্যে আবূ জাহলকে খুঁজিবার নির্দেশ দিলেন। ইন্ন আব্বাস ও আবদুল্লাহ ইব্ন আবূ বাক্স (রা) সূত্রে বর্ণিত। তাহারা সালামা গোত্রের সদস্য মু'আয ইব্ন আমার ইবনুল জামূহ (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, আবু জাহল ছিল এমন এক বৃক্ষের ন্যায় যাহার নিকট পৌঁছা যায় না। আমি কাফিরদিগকে বলাবলি করিতে শুনিলাম যে, আবুল হাকামকে বাগে পাওয়া যায় না। ইহা শুনিয়া আমি তাহাকে হত্যা করার সংকল্প করিলাম, তাই আমি তাহার দিকে অগ্রসর হইলাম। অতঃপর সুযোগ পাইয়া আমি তাহাকে আক্রমণ করিলাম। আমি তাহাকে এমনভাবে আঘাত করিলাম যে, তাহার পা নলার মধ্যখান হইতে উড়িয়া গেল। আল্লাহ্র কসম! আমি উহার উদাহরণ এইভাবে দিলাম যে, খেজুরের আঁটি ভাঙ্গার যাতার নিচ হইতে আঁটি যেমন সটকাইয়া পড়ে তেমনি। তাহার পুত্র ইকরিমা আমাকে আমার কাঁধের নিচে আঘাত করিল। ইহাতে আমার হাত কাটিয়া আমার পার্শ্বদেশের চামড়ার সহিত ঝুলিতে লাগিল। প্রচণ্ড যুদ্ধের কারণে আমি সেদিকে ভ্রূক্ষেপ করিলাম না। উক্ত হাত পিছনে ঝুলাইয়া আমি যুদ্ধ করিতে লাগিলাম। ইহাতে যখন আমার বেশী কষ্ট হইতে লাগিল তখন আমি উক্ত ঝুলন্ত হাত পায়ের নিচে রাখিয়া সজোরে টান দিয়া বিচ্ছিন্ন করিয়া ফেলিলাম। ইবন ইসহাক বলেন, ইহার পর তিনি উছমান (রা)-এর কাল পর্যন্ত জীবিত ছিলেন।
অতঃপর আবূ জাহল আহত অবস্থায় পড়িয়া রহিল। তখন মু'আওবিয ইব্ন আফরা তাহার নিকট দিয়া যাইতেছিলেন। তিনি তাহাকে আঘাত করিয়া মুমূর্ষু অবস্থায় ফেলিয়া রাখিলেন। তখনও তাহার শ্বাস-প্রশ্বাস চলিতেছিল। মুআওবিষ পরে যুদ্ধ করিতে করিতে শহীদ হইলেন। অতঃপর যুদ্ধশেষে রাসূলুল্লাহ (স) আবূ জাহলকে খুঁজিবার নির্দেশ দিয়া বলিলেন, নিহতদের মধ্যে তাহাকে চিনিয়া বাহির করিতে কষ্ট হইলে তোমরা তাহার হাঁটুতে যখমের চিহ্ন দেখিবে। কারণ বালক বয়সে একদিন আমি ও সে আবদুল্লাহ ইব্ন জুদ'আনের বাড়িতে দাওয়াত খাইতে গিয়া বিবাদ করিয়াছিলাম। আমি ছিলাম তদপেক্ষা সামান্য বড়। অতঃপর আমি তাহাকে ধাক্কা দিলে সে পড়িয়া হাঁটুতে ভর করিল। সে এক হাঁটুতে এমন আঘাতপ্রাপ্ত হইল যাহার চিহ্ন এখনও পর্যন্ত তাহার হাঁটুতে রহিয়া গিয়াছে।
লোকজন তাহার সন্ধানে বাহির হইল। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) তাহাকে এমন অবস্থায় পাইলেন যে, তাহার শ্বাস শেষ পর্যায়ে। তিনি বলেন, আমি তাহাকে দেখিয়া চিনিতে পারিলাম। আমি তাহার ঘাড়ের উপর পা রাখিলাম। মক্কায় থাকিতে একবার সে আমাকে থাপ্পড় মারিয়া ব্যথা দিয়াছিল। আমি তাহাকে বলিলাম, আল্লাহ কি তোমাকে অপদস্থ করিয়াছেন, হে আল্লাহ্র দুশমন? সে বলিল, কিসের দ্বারা আমাকে অপদস্থ করিবেন? আমি কি এমন ব্যক্তির ব্যাপারে লজ্জাবোধ করিব যাহাকে তোমরা হত্যা করিয়াছ? (এক বর্ণনামতে যাহাকে তাহার কওম হত্যা করিয়াছে)? আমাকে বল, বিজয় কাহাদের হইয়াছে? আমি বলিলাম, আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের। অতঃপর সে ইবন মাসউদ (রা)-কে বলিল, তুমি তো বহু শক্ত স্থানে আরোহণ করিয়াছ হে বকরীর রাখাল! ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় থাকিতে বকরী চরাইতেন। তিনি বলেন, অতঃপর আমি তাহার মস্তক কর্তন করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট লইয়া আসিলাম এবং বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ইহা আল্লাহ্র দুশমন আবূ জাহলের মস্তক। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, সেই আল্লাহ যিনি ব্যতীত আর কোনও ইলাহ নাই? তিনবার তিনি ইহা বলিলেন। ইহা ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর কসম। আমি বলিলাম, হাঁ, সেই আল্লাহ্র কসম, যিনি ব্যতীত আর কোনও ইলাহ নাই। অতঃপর আমি মস্তকটি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে ছুড়িয়া ফেলিলাম। তিনি আল্লাহ্র প্রশংসা করিলেন। এক বর্ণনা মতে রাসূলুল্লাহ (স) তখন বলিলেন:
الحمد لله الذي صدق وعده ونصر عبده وهزم الاحزاب وحده.
"সকল প্রশংসা আল্লাহর যিনি স্বীয় অঙ্গীকার সত্যে রূপায়িত করিয়াছেন, স্বীয় বান্দাকে সাহায্য করিয়াছেন এবং অনেক শত্রুদলকে একাই পরাস্ত করিয়াছেন।"
তিনি বলিলেন, আমার সহিত চল, তাহাকে দেখাইয়া দিবে। আমরা চলিলাম। আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে তাহার লাশ দেখাইয়া দিলাম। তিনি বলিলেন, এই হইল বর্তমান উম্মতের ফিরআওন।
আ'মাশ (র) ইবন মাসউদ (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, বদর যুদ্ধের দিন আমি আবূ জাহলের নিকট পৌঁছিলাম। সে তখন ধরাশায়ী অবস্থায় ছিল। তাহার মাথায় ছিল লোহার শিরস্ত্রাণ এবং সঙ্গে ছিল উত্তম তরবারি। আর আমার সঙ্গে ছিল সাধারণ তরবারি। আমি তাহার মস্তকে আমার তরবারি দ্বারা খোঁচা দিতেছিলাম এবং স্মরণ করিতেছিলাম যে, মক্কায় থাকিতে সে এমনিভাবে আমার মস্তকে খোঁচা দিত, তাহার হাত দুর্বল হইয়া যাওয়া পর্যন্ত। অতঃপর আমি তাহার তরবারি লইলাম। সে মাথা উঠাইয়া বলিল, বিজয় কাহাদের হইয়াছে, আমাদের পক্ষে না বিপক্ষে? তুমি না মক্কায় আমাদের রাখাল ছিলে! তিনি বলেন, অতঃপর আমি তাহাকে হত্যা করিলাম এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া এই সংবাদ দিলাম।
এক বর্ণনা হইতে জানা যায় যে, ফেরেশতাগণ তাহাকে আঘাত করিয়াছিল। আল-ওয়াকিদী বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, আল্লাহ আফরার পুত্রদ্বয়ের প্রতি রহমত বর্ষণ করুন। তাহারা এই উম্মতের ফিরআওন ও কাফিরদের মধ্যমণিকে হত্যায় শরীক ছিল। কেহ বলিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাহাকে হত্যায় আর কে তাহাদের শরীক ছিল? তিনি বলিলেন, ফেরেশতা ও ইবন মাসউদ।
মূসা ইব্ন উকবার বর্ণনামতে ইবন মাসউদ (রা) তাহাকে লৌহবর্মে আবৃত অবস্থায় পাইলেন। সে একদিকে পড়িয়াছিল, কোনরূপ নড়াচড়া করিতে পারিতেছিল না। তিনি ধারণা করিলেন যে, সে বুঝি আহত অবস্থায় পড়িয়া আছে। তিনি তরবারি দ্বারা খোঁচা মারিলেন কিন্তু সে অসাড় অবস্থায় পড়িয়াই রহিল, কোনওরূপ নড়াচড়া করিল না। অতঃপর তিনি তাহার কাঁধের নিচ হইতে শিরস্ত্রাণ খুলিয়া ফেলিয়া তরবারি দ্বারা আঘাত করিলেন। ইহাতে তাহার মস্তক তাঁহার সম্মুখে লুটাইয়া পড়িল। তিনি সজোরে টানিয়া তাহার লৌহবর্ম খুলিয়া ফেলিলেন। অতঃপর তাহার দিকে তাঁকাইয়া দেখিলেন তাহার শরীরে কোন যখম নাই। তিনি তাহার ঘাড়ে কালো দাগ এবং তাহার উভয় হাত ও কাঁধে চাবুকের চিহ্ন দেখিতে পাইলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া এই সংবাদ দিলে তিনি বলিলেন, উহা ফেরেশতাদের আঘাত।
বায়হাকী আবু ইসহাক সূত্রে বর্ণনা করেন যে, আবূ জাহলের মৃত্যুসংবাদ শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) সিজদাবনত হইলেন। অপর এক বর্ণনায় তিনি আবদুল্লাহ ইব্ন আবী আওফা সূত্রে বর্ণনা করেন যে, বিজয়ের সংবাদ এবং আবূ জাহলের মস্তক আনয়নের সংবাদ পাইয়া রাসূলুল্লাহ (স) দুই রাক'আত সালাত আদায় করেন।
এক রিওয়ায়াত হইতে জানা যায় যে, আবু জাহলকে কিয়ামত পর্যন্ত বদর প্রান্তরে শাস্তি দেওয়া হইবে। ইব্ন আবিদ দুনয়া শা'বী সূত্রে বর্ণনা করেন যে, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া বলিল, আমি বদর প্রান্তর দিয়া গমন করিতেছিলাম। তখন দেখিলাম, এক লোক মাটির অভ্যন্তর হইতে বাহির হইতেছে এবং অন্য এক লোক তাহাকে চাবুক মারিতেছে। ইহাতে সে মাটির ভিতর অদৃশ্য হইয়া যাইতেছে। অতঃপর পুনরায় সে মাটির ভিতর হইতে বাহির হইতেছে এবং পুনরায় তাহার সহিত অনুরূপ আচরণ করা হইতেছে। কয়েকবারই এইরূপ করা হইল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, সে হইল আবু জাহল। কিয়ামত পর্যন্ত তাহাকে ঐরূপ শাস্তি দেওয়া হইবে।