📄 সারিয়্যা উবায়দা ইবনুল হারিছ (রা)
মক্কার কুরায়শগণ মদীনার সীমান্ত অঞ্চলে একটি বাহিনী প্রেরণ করিয়াছে, এই সংবাদ পাইয়া রাসূলুল্লাহ (স) আপন পিতৃব্য পুত্র হযরত উবায়দা ইবনুল হারিছের নেতৃত্বে ষাটজন অশ্বরোহী মুহাজির সাহাবীর একটি দলকে রাবিগ অভিমুখে প্রেরণ করেন। মতান্তরে ঐ সাহাবীগণের সংখ্যা ছিল আশিজন। ইহাতে কোন আনসার সাহাবী শামিল ছিলেন না। রাবিগ উপত্যকার ছানিয়াতুল মাররা নামক স্থানে একটি জলাশয়ের নিকট উপনীত হইলে তাহারা সেখানে বিপুল সংখ্যক কুরায়শের সমাবেশ লক্ষ্য করেন। সংখ্যায় তাহারা ছিল দুই শতজন। ঐ সমাবেশে আবূ সুফিয়ানও ছিল। ইবন ইসহাক-এর ভাষ্যমতে, ঐ কুরায়শ দলের নেতৃত্বে ছিল আৰী জাহ্ পুত্র ইকরিমা। তবে ইবন হিশামের মতে ঐ কুরায়শ দলের নেতৃত্বে ছিল-মিকরায ইবন হাম্স। উভয় পক্ষ মুখামুখি হইলেও সেখানে কোন যুদ্ধ হয় নাই। তবে হযরত সা'দ ইব্ন আবী ওয়াক্কাস (রা) কাফির বাহিনীর দিকে একটি তীর ছুড়িয়াছিলেন। ইসলামের ইতিহাসে ইহাই ছিল কাফিরদের প্রতি নিক্ষিপ্ত সর্বপ্রথম তীর।
ইব্ন হিশাম ঐ সারিয়াটি রাসুলুল্লাহ (স)-এর ওয়াদ্বান অভিযানের পরবর্তী সময়ে প্রেরিত হইয়াছিল বলিয়া উল্লেখ করিলেও আল্লামা শিবলী নু’মানী উহা তাঁহার উক্ত অভিযানের পূর্ববর্তী কালের ঘটনা বলিয়া সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করিয়াছেন (দ্র. সীরাতুন্বী, ইব্ন হিশাম, ২খ., পৃ. ২৬২; সীরাতুন্বী, শিবলী নু’মানী (উর্দু), ১ম., পৃ. ৩১০)।
সফিউর রহমান মুবারকপুরী ঐ সারিয়া, শাওওয়াল ১ম হিজরী, এপ্রিল ৬২৩ খৃ. অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা সুনিশ্চিতভাবে করিয়াছেন (দ্র. আর-রাহীকুল মাখতুম (আরবী), পৃ. ২১৯ সম স. ১৯৮০ খৃ.)।
মাওলানা দানাপুরীও এই অভিযানের সময়ের কথা উল্লেখ করিয়াছেন এইভাবে : সারিয়া হামযার পর ১ম হিজরীর শাওওয়াল মাসে হিজরতের অষ্টম মাসে নবী করীম (স) ৬০, মতান্তরে ৩০ জন অশ্বারোহী মুহাজির সাহাবীকে হযরত উবায়দা ইবনুল হারিসের নেতৃত্বে রাবিগ প্রেরণ করেন। এইজন্য যে পতাকা তৈয়ার করা হয় উহা শ্বেতবর্ণের ছিল এবং পতাকা বহনকারী ছিলেন মিসতাহ ইব্ন উছাছা (রা.) (দ্র. আসাচ্চুস্-সিয়ার, পৃ. ৮০)।
মিকদাদ ইব্ন আমর বাহরানী এবং উতবা ইব্ন গাযওয়ান আল-মাযিনী নামক দুই ব্যক্তি মুশরিক শিবির হইতে পলায়ন করিয়া এই সময় মুসলমান শিবিরে চলিয়া আসেন। ইব্ন ইসহাক বলেন, ইহারা দুইজন মুসলমানই ছিলেন। তাঁহারা কেবল রাসুলুল্লাহ (স)-এর সহিত মিলিত হইবার সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন (দ্র. সীরাতুন্বী, ইব্ন হিশাম, ২খ., পৃ. ২৬২; ইফা; ইব্ন সা’দ, তাবাকাত, ১খ., পৃ.৭)।
ইব্ন ইসহাক বলেন, সা’দ ইব্ন আবী ওয়াক্কাস (রা) ও তদীয় তীর নিক্ষেপ সম্পর্কে একটি কবিতা আবৃত্তি করেন বলিয়া কথিত আছে। কবিতাটি ছিল নিম্নরূপ :
الآهل أتى رسول الله انني + حمیت صحابتی لصدور نبلی اذوذ بها اوائلهم ذيادا + بكل حزونة وبكل سهل فما يعتد رام في عدو + بسهم يا رسول الله قبلی وذلك أن دينك دين صدق + وذو حق اتيت به وعدل ينجى المؤمنون به ويجزى + به الكفار عند مقام مهد فمهلا قد غونت فلا تعيني + غوى الحي ويحك يا ابن جهل
“রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট এই সংবাদ পৌঁছিয়াছে যে, আমি আমার সঙ্গীগণকে আমার তীর দ্বারা রক্ষা করিয়াছিলাম। আমি তাহাদের প্রত্যেক পার্বত্যভূমি ও সমভূমিতে তাহাদের শত্রুদের অবরোধদিগকে প্রতিহত করিতেছি।”
"ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমার পূর্বে আর কেহই শত্রুবাহিনীর প্রতি তীর নিক্ষেপ করে নাই। বস্তুত আপনার আনীত দীন সত্য, ন্যায় ও সুবিচারের দীন। ইহা দ্বারা মুমিনদিগকে পরিত্রাণ দেওয়া হইবে এবং কাফিরদিগকে ইহার (অগ্রাহ্য করার) কারণে স্থায়ীভাবে লাঞ্ছিত করা হইবে।
"হে জাহল (মূর্খ) নন্দন! তোমার জন্য পরিতাপ, তুমি তো বিপথগামী হইয়াছ। এইজন্য আমার প্রতি দোষারোপ করিবে না। তুমি কিছু দিন অপেক্ষা কর (এবং দেখ, তোমার জন্য কী পরিণতি অপেক্ষা করিতেছে)" (দ্র. ইবন হাজার, আল-ইসাবা, ২খ., পৃ. ৩৪; ইব্ন হিশাম, আস-সীরা, ২খ., পৃ. ২৩৪; তাবাকাত, ৩খ., পৃ. ১৪০; উসুদুল গাবা, ২খ., পৃ. ২৯১)।
ইবন হিশাম (র) হযরত সা'দ (রা) ইব্ন আবী ওয়াক্কাসের বলিয়া কথিত উপরোল্লিখিত কবিতা প্রকৃতপক্ষে তাঁহার নহে বলিয়া মন্তব্য উদ্ধৃত করিয়াছেন।
ইবন ইসহাক এই প্রসঙ্গে আরও বলেন, আমার নিকট এই মর্মে তথ্য পৌঁছিয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) মুসলমানদের মধ্যে সর্বপ্রথম যাঁহার হস্তে পতাকা তুলিয়া দিয়াছিলেন তিনি ছিলেন এই উবায়দা ইব্ন হারিছ (রা)।
হযরত উবায়দা ইবনুল হারিছ (রা) পরিচালিত অভিযানটি সারিয়্যা রাবিগ নামেও পরিচিত। তবে এই অভিযানে উভয় সৈন্যদল কোনও প্রকার সংঘর্ষ ছাড়াই নিজ নিজ অবস্থানে ফিরিয়া গিয়াছিল।
📄 সারিয়্যা সা'দ ইব্ন আবী ওয়াক্কাস (রা)
রাসুলুল্লাহ (স) কুড়িজন সাথীসহ হযরত সা'দ ইব্ন আবু ওয়াক্কাস (রা.)-কে কুরায়শদের একটি কাফেলার খোঁজ-খবর নেওয়ার জন্য হিজরী ১ম বর্ষের যী-কা'দা (মে ৬২৩ খৃ.) মাসে রওয়ানা করেন। তাহাদের প্রতি তাগিদ ছিল তাহারা যেন কোনক্রমেই খাররার নামক স্থানটি অতিক্রম না করেন। তাহারা পদব্রজে রওয়ানা হন। সারা রাত ধরিয়া পথ চলিয়া দিনের বেলা তাহারা আত্মগোপন করিয়া থাকিতেন। পঞ্চম দিনের প্রত্যুষে খাররার পৌঁছিয়া তাহারা জানিতে পারেন যে, কুরায়শদের কাফেলা একদিন পূর্বেই এই স্থান অতিক্রম করিয়া চলিয়া গিয়াছে।
এই অভিযানের পতাকাও সাদা ছিল এবং পতাকা বহন করেন হযরত মিকদাদ ইব্ন আমর (রা) (দ্র. আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ৬; উযূনুল আছার, ইব্ন সায়্যিদিন নাস, ১খ., পৃ. ২২৫)। স্থানের নামানুসারে ঐ সারিয়্যাকে সারিয়্যায়ে খাররার নামেও অভিহিত করা হইয়া থাকে। ঐ স্থানটি জুহ্ফার অনতিদূরে অবস্থিত।
ইন্ন হিশাম বলেন, কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে খাররার অভিযান হযরত হামযা (রা)-এর অভিযানের পরে প্রেরিত হইয়াছিল (দ্র. সীরাতুন নবী, ইন্ন হিশাম, ২খ., পৃ. ২৮৯)।
প্রকৃতপক্ষে ইসলামের ইতিহাসের সর্বপ্রথম অভিযান ছিল উক্ত তিনটি অভিযান। তাই মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে মহানবী (স)-এর সকল জীবনীকারই ঐ সারিয়্যাগুলির গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করিয়াছেন। বিশেষত পাশ্চাত্যের লেখকগণ এই প্রসঙ্গে তাহাদের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী ইসলামের যুদ্ধপ্রসঙ্গ এবং ঐ সময়কার প্রেক্ষাপটও আলোচনা করিয়াছেন। এই অভিযানগুলির সুদূরপ্রসারী প্রভাব সম্পর্কে পাশ্চাত্যের একজন লেখিকা মন্তব্য করেনঃ
The early raids of 623 were not very successful. It was difficult to get accurate information about the movement of the caravan. no goods were siezed and there was no fighting. But the Macen world have been rafited and irritated. They have to take Precautions is that had never been necessary before and the Beduin tribes along the Red sea coast (the preferred trade route) would have been im.pressed by the muslims pluck Even though the early raiders failed to attack the Caravans. They made Treaties with Tribes a various Strategic points along the Red.
"৬২৩ খৃস্টাব্দের প্রথম দিককার অভিযানসমূহ খুব সফল ছিল না। কাফেলাসমূহের গতিবিধি সম্পর্কে সঠিক তথ্যলাভ ছিল খুবই দুরুহ। ফলে কোন যুদ্ধও হয় নাই এবং তাহাদের মালামাল কাড়িয়া লওয়াও সম্ভব হয় নাই। কিন্তু মক্কাবাসীরা তাহাতে অত্যন্ত বিব্রত এবং দিশাহারা হইয়া পড়িয়াছিল। তাহাদিগকে এমন সব সতর্কতা অবলম্বন করিতে হইতেছিল যাহার প্রয়োজন ইতোপূর্বে কোন দিনই পড়ে নাই। তাহা ছাড়া লোহিত সাগর উপকূলবর্তী পছন্দনীয় এই বাণিজ্য পথটির বেদুঈন গোত্রগুলি মুসলমানদের এই ধরনের অভিযানে বেশ অভিভূত হইয়াছিল। ঐ প্রাথমিক অভিযাত্রী দলগুলির কাফেলা আক্রমণ যদিও ব্যর্থ হইয়াছিল তথাপি ইহার ফলে এই পথের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসবাসকারী গোত্রগুলির সহিত সন্ধি স্থাপনে বা সমঝোতা গড়িয়া তুলিতে তাহারা সক্ষম হইয়াছিল" (Karen Armstrong, Muhammad, holy war অধ্যায়, পৃ. ১৬৯-১৭০)।
বস্তুত ঐ শেষোক্ত সাফল্যগুলিই ছিল উক্ত সারিয়্যা অভিযানগুলির দ্বারা মুসলমানদের চরম প্রাপ্তি, যাহা পরবর্তী কালে তাহাদের সকলের চাবিকাঠিরূপে প্রতিপন্ন হইয়াছে। মহানবী (স)-এর এই প্রতিরক্ষা কৌশল ছিল একজন দূরদর্শী ও কুশলী সমরবিদসুলভ। ঐ সাফল্যের জন্যই ইসলামের ইতিহাসে ঐ প্রাথমিক সারিয়্যাগুলি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করিয়া আছে।
📄 গাযওয়া আল-উশায়রা
হিজরী দ্বিতীয় সনের জুমাদাল উলার মাঝামাঝি সময়ে রাসূলুল্লাহ (স) দুই শত মুহাজিরকে সঙ্গে লইয়া কুরায়শদের সিরিয়াগামী এক কাফেলার উপর হামলা করার জন্য 'উশায়রা নামক স্থানের দিকে রওয়ানা হন। এই সময় আবূ সালামা ইব্ন আবদুল আসাদ মাখযুমীকে মদীনার শাসক নিয়োগ করা হয়। কুরায়শদের এই কাফেলা পণ্যসামগ্রী লইয়া মক্কা হইতে সিরিয়া অভিমুখে রওয়ানা হইয়াছিল। "ইয়াম্বু” নামক স্থানে পৌঁছিয়া রাসূলুল্লাহ (স) জানিতে পারিলেন যে, কাফেলা ইতোপূর্বেই সিরিয়া চলিয়া গিয়াছে বিধায় কাফেলার অপেক্ষায় জুমাদাল উলার অবশিষ্ট দিন ও জুমাদাছ ছানিয়ার কয়েক দিন সেই স্থানে অবস্থান করেন। অবশেষে মুদলিজ গোত্র ও তাহাদের মিত্র বনূ দামরার সাথে সন্ধি চুক্তি করিয়া মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন। এই অভিযানে হযরত হামযা (রা)-এর হাতে পতাকা ছিল। উল্লেখ থাকে যে, কুরায়শদের বাণিজ্যিক কাফেলাটি যখন সিরিয়া হইতে প্রত্যাবর্তন করে তখন রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে পর্যুদস্ত করার জন্য পুনরায় অভিযানে বাহির হন তখনই মূল বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
এই অভিযানে মুদলিজ গোত্র ও তাহাদের মিত্র গোত্র বনূ দামরার সাথে যে সন্ধি চুক্তি স্বাক্ষরিত হইয়াছিল—তাহা নিম্নরূপ:
بسم الله الرحمن الرحيم هذا كتاب من محمد رسول الله صلى الله عليه وسلم لبنى ضمرة بأنهم آمنون على اموالهم وانفسهم وان لهم النصرة على من رامهم ان لا يحاربوا في دين الله ما بل بحر صوفة وان النبى اذ دعاهم لنصره اجابوه عليهم بذالك ذمة الله وذمة رسوله ولهم النصرة على من بر واتقى.
"দয়াময় পরম দয়ালু আল্লাহ্ নামে। এই চুক্তিপত্র আল্লাহ্র রাসূল মুহাম্মাদ (স)-এর পক্ষ হইতে বানু দামরার প্রতি; তাহাদের জীবন ও ধনসম্পদ নিরাপদ থাকিবে। যে ব্যক্তি বানু দামরার সহিত অনর্থক যুদ্ধের ইচ্ছা করিবে তাহার বিরুদ্ধে বানু দামরাকে সাহায্য করা হইবে এই শর্তে যে, সমুদ্র শুষ্ক হইয়া যাইবার পূর্ব পর্যন্ত তাহারা আল্লাহর দীনের বিরুদ্ধে কোন প্রকার যুদ্ধ-বিগ্রহ করিবে না (অর্থাৎ এই হুকুম সদাসর্বদা বলবৎ থাকিবে)। আর নবী (স) যখন তাহাদিগকে তাঁহার সাহায্যের জন্য আহ্বান করিবেন তখন তাহারা তাঁহার ডাকে সাড়া দিবে। যে ব্যক্তি সৎকর্ম করিবে এবং পরহেযগারী অবলম্বন করিবে তাহাদের সহিত আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের সাহায্যের অঙ্গীকারনামা ও তাহাদের যাবতীয় দায়- দায়িত্ব আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের যিম্মায় থাকিবে।"
এই অভিযান সম্পর্কে ইমাম বুখারী (র) আবূ ইসহাক হইতে বর্ণনা করিয়াছেন: قال كنت إلى جنب زيد بن ارقم فقيل له كم غزا رسول الله صلى الله عليه وسلم من غزوة قال تسع عشر قلت كم غزوات أنت معه قال سبع عشر غزوة قلت فايهن كان اول قال العشيرة او العسيرة.
"আবূ ইসহাক (র) বলেন, আমি যায়দ ইব্ন আরকাম (র)-এর পার্শ্বে অবস্থিত ছিলাম। তাহাকে জিজ্ঞাসা করা হইল, রাসূলুল্লাহ (স) কতটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিয়াছেন? তিনি বলিলেন, উনিশটিতে। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনি তাহার সহিত কয়টি যুদ্ধে শরীক ছিলেন? তিনি বলিলেন, সতেরটিতে। আমি পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলাম, প্রথম যুদ্ধ কোনটি? তিনি বলিলেন, উশায়রা কিংবা উসায়রা।"
এই হাদীছ হইতে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামের প্রথম গাওয়া হইল উশায়রা। এই অভিযানে হযরত আলী (রা) রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক আবূ তুরাব (ابو تراب) উপনামে ভূষিত হইয়াছেন।
📄 সারিয়্যা আবদুল্লাহ ইব্ন জাহ্শ (রা)
রাসূলুল্লাহ (স) হিজরতের সপ্তদশ মাসে অর্থাৎ দ্বিতীয় হিজরীর রজব মাসে আবদুল্লাহ ইব্ন জাহ্শ (রা)-এর নেতৃত্বে আটজন অথবা বারজন সদস্যের এক বাহিনীকে কুরায়শদের গতিবিধি লক্ষ্য করার জন্য মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী নাখলা নামক স্থানে প্রেরণ করেন। এই বার জন হইলেন : ১. আবদুল্লাহ ইব্ন জাহ্শ (রা), আমীর; ২. আবূ হুযায়ফা ইব্ন উতবা (রা), সদস্য; ৩. উত্ত্বা ইব্ন গাযওয়ান (রা), সদস্য; ৪. উক্কাশা ইব্ন মিহসান (রা), সদস্য; ৫. সা'দ ইব্ন আবী ওয়াক্কাস (রা), সদস্য; ৬. ওয়াকিদ ইব্ন আবদুল্লাহ (রা), সদস্য; ৭. আমের ইব্ন রবী'আ (রা), সদস্য; ৮. খালিদ ইব্ন বুকায়র (রা), সদস্য; ৯. সুহায়ল ইব্ন বায়দা (রা), সদস্য; ১০. আমের ইব্ন আয়্যাস (রা), সদস্য; ১১. সায়ান ইব্ন বায়দা (রা), সদস্য এবং ১২. মিকদাদ ইবন আমর (রা), সদস্য।
ইবন হিশাম (র) বলেন, এই কাফেলাতে আবদুল্লাহ ইব্ন জাহ্শ (রা) ব্যতীত আটজন মুহাজির ছিলেন, তাঁহাদের মধ্যে কোন আনসার সাহাবী ছিলেন না। ইবন কাছীর বলেন, এই অভিযানে রাসূলুল্লাহ (স) প্রথমে আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা)-কে আমীর মনোনীত করেন, কিন্তু যাত্রার শুরুতেই তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিচ্ছেদে কান্নায় ভাঙ্গিয়া পড়িলে তখন রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার পরিবর্তে আবদুল্লাহ ইব্ন জাহ্শ (রা)-কে নিযুক্ত করেন।
মু'জাম তাবারানীতে জুনদুব আল-বাজালী (রা) হইতে হাসান সনদে বর্ণিত হইয়াছে যে, যখন আবদুল্লাহ ইব্ন জাহ্শ (রা) যাত্রার জন্য প্রস্তুত হইলেন তখন রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার হাতে একটি মুখবদ্ধ পত্র দিয়া নির্দেশ দিলেন তিনি যেন দুই দিনের পথ অতিক্রম করিবার পর পত্রখানা খুলিয়া ইহার মর্মানুসারে কাজ করেন এবং নিজ সাথীদেরকে এই কাজে জোরপূর্বক বাধ্য না করেন।
ইন্ন ইসহাক (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)- এর নির্দেশানুসারে আবদুল্লাহ ইব্ন জাহ্শ (রা) দুই দিন পর পত্র খুলিলেন। ইহাতে লিখা ছিলঃ اذا نظرت في كتابى فامض حتى تنزل نخلة بين مكة والطائف فترصد بها قريشا وتعلم لنا من اخبارهم.
"আমার এই পত্র যখন দেখিবে তখন তুমি সামনে অগ্রসর হইবে এবং মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী স্থান নাখলায় গমন করিয়া কুরায়শদের গতিবিধি লক্ষ্য করিয়া তাহাদের সমস্ত তথ্য আমাকে অবহিত করিবে”
এই কাজটি অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ও জীবনের ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার কারণে আবদুল্লাহ ইব্ন জাহ্শ (রা) সঙ্গীগণকে এই ব্যাপারে পূর্ণ এখতিয়ার দিলেন। তাঁহারা সকলেই রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই নির্দেশকে অম্লান বদনে মানিয়া নিলেন এবং সকলেই "নাখলা" গমনে সম্মতি জ্ঞাপন করিলেন। কিন্তু ঘটনাক্রমে হযরত সা'দ ইব্ন আবী ওয়াক্কাস (রা) ও উতবা ইব্ন গাওয়ান (রা) যে উষ্ট্রে আরোহণ করিয়াছিলেন তাহা হারাইয়া যায়। তাঁহারা উভয়ে উটের সন্ধানে বহু দূর চলিয়া যান। যখন তাঁহারা উটের সন্ধান পাইলেন তখন পথ হারাইয়া ফেলিলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁহারা তাহাদের কাফেলার সহিত নাখলায় পৌঁছিতে পারিলেন না, পশ্চাতেই থাকিয়া গেলেন।
যখন আবদুল্লহ ইব্ন জাহ্শ (রা)-এর কাফেলা নাখলায় পৌঁছিল তখন রজব মাসের শেষ ভাগ, যাহা নিষিদ্ধ মাসসমূহের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সন্ধ্যার দিকে কুরায়শদের একটি কাফেলা আগমন করে যাহাতে আমর ইবন হাদরামী, আবদুল্লাহ ইব্ন মুগীরার দুই পুত্র উছমান ও নাওফল এবং মুগীরার ক্রীতদাস হাকাম ইবন কায়সান ছিল। কাফেলার উষ্ট্রের উপর খেজুর ও বাণিজ্য সম্ভার ছিল। সাহাবায়ে কিরাম চিন্তা করিলেন উভয় সংকটের কথাঃ যদি এই কাফেলাকে ছাড়িয়া দেওয়া হয় তাহা হইলে মক্কায় গমন করিয়া তাহারা আমাদের উপস্থিতির কথা প্রচার করিয়া দিবে। অপরদিকে এখন রজব মাস যাহাতে সর্বপ্রকার যুদ্ধবিগ্রহ নিষিদ্ধ। অবশেষে তাঁহারা সিদ্ধান্ত নিলেন, ইহাদেরকে ছাড়িয়া দেওয়া সমীচীন হইবে না। লড়াই-এর মাধ্যমেই ইহার সমাধান করিতে হইবে। এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার পর ওয়াকিদ তামীমী সর্বপ্রথম শত্রুদলের উপর তীর নিক্ষেপ করিলেন। ফলে আমর ইবন হাদরামী মৃত্যুমুখে পতিত হইল। আর উছমান ও হাকামকে তাঁহারা বন্দী করিলেন এবং নাওফিল প্রাণ নিয়া কোনমতে পলায়ন করিল।
আরবজাতির সকল ধর্মমতেই রজব, যুল কা'দা, যুলহিজ্জা ও মুহাররম এই মাস চতুষ্টয়কে "আশহুরুল হুরুম" (اشهر الحرم) তথা সম্মানিত মাস বলিয়া গণ্য করা হইত। এই মাসগুলিতে যুদ্ধ-বিগ্রহ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ছিল। ইসলামেও তখন ইহা সমর্থিত ছিল, অবশ্য পরবর্তীতে তাহা মানসূখ হইয়া গিয়াছে কিনা এই ব্যাপারে মতপার্থক্য রহিয়াছে।
এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার কারণে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাদের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করিলেন। এমনকি তাহাদের আনীত গনীমতের মাল ও বন্দীদ্বয়কে গ্রহণ করিতেও অসম্মতি জ্ঞাপন করিলেন। অপরদিকে কাফির মুশরিকরা বলাবলি শুরু করিল যে, মুসলমানরা হারাম মাসের পবিত্রতা ক্ষুণ্ণ করিয়াছে। চতুর্দিক হইতে প্রশ্ন উত্থাপিত হইল, এই মাসগুলি সম্পর্কে ইসলাম ধর্মের নীতি কি? তাহাদের প্রশ্নের জবাবে আল্লাহ তা'আলা ওহী অবতীর্ণ করিলেন : يَسْتَلُونَكَ عَنِ الشَّهْرِ الْحَرَامِ قِتَالٍ فِيْهِ قُلْ قِتَالٌ فِيْهِ كَبِيرٌ وَصَدٌ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ وَكُفْرٌ به وَالْمَسْجِدِ الْحَرَامِ وَإِخْرَاجُ أَهْلِهِ مِنْهُ أَكْبَرُ عِنْدَ اللهِ.
"লোকেরা আপনাকে হারাম মাস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। আপনি বলিয়া দিন, এই মাসসমূহে (ইচ্ছাকৃতভাবে) যুদ্ধ করা ভীষণ অন্যায়। কিন্তু আল্লাহ্র পথ হইতে লোকদেরকে বাধা প্রদান করা, আল্লাহর সাথে এবং মসজিদে হারামের সাথে কুফরী করা এবং মসজিদে হারামের অধিবাসীদেরকে বহিষ্কার করা আল্লাহর নিকট তাহার চাইতেও বড় অপরাধ। আর বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হত্যার চাইতেও ভয়াবহ” (২:২১৭)।
ইবন ইসহাক (র) বলেন, এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (স) আবদুল্লাহ ইব্ন জাহ্শ বাহিনী কর্তৃক লব্ধ গনীমতের মালামাল ও বন্দীদ্বয়কে গ্রহণ করিলেন এবং উহা তাহাদের মধ্যে বণ্টন করিলেন। ওয়াকিদী (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) এই গনীমতের মাল বদরের যুদ্ধ হইতে প্রত্যাবর্তনের পর মুজাহিদগণের মাঝে বণ্টন করিয়া দেন। ইহাই ইসলামের প্রথম খুমুস।
ওয়াকিদ ইব্ন আবদুল্লাহ তামীমীর তীরের আঘাতে আমর ইবন হাদরামী নিহত হইয়াছিল বিধায় আমরই সর্বপ্রথম নিহত কাফির এবং ওয়াকিদ (রা) হইলেন সর্বপ্রথম হত্যাকারী মুজাহিদ। আর উছমান ও হাকামই ছিল মুসলমানদের হাতে প্রথম বন্দী।
এ ঘটনার পর মক্কাবাসিগণ দূত প্রেরণ করিয়া বন্দীদ্বয়ের মুক্তি কামনা করে। مسلمانوں এই বাহিনীর যেই দুইজন উটের সন্ধানে ব্যাপৃত ছিলেন তাঁহারা মদীনায় প্রত্যাবর্তনের পর রাসূলুল্লাহ (স) বন্দীদ্বয়কে মুক্তি দিলেন। "কায়সান” মুক্তি পাইয়া ইসলাম গ্রহণ করেন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতেই থাকিয়া যান। অপরদিকে উছমান ইব্ন আবদুল্লাহ মক্কায় চলিয়া যায় এবং কাফির অবস্থায় তাহার মৃত্যু হয়।
হারাম মাসসমূহে যুদ্ধ সম্পর্কিত আয়াত নাযিল হওয়ার পর আবদুল্লাহ ইব্ন জাহ্শ (রা) ও তাঁহার সঙ্গীগণ জিজ্ঞাসা করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা কি এই অভিযানের জন্য মুজাহিদের ছওয়াব প্রাপ্ত হইব? তখন এই আয়াত নাযিল হয়: إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ هَاجَرُوا وَجَاهَدُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أُولَئِكَ يَرْجُونَ رَحْمَةَ اللَّهِ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيم.
"যাহারা ঈমান আনে এবং যাহারা হিজরত করে ও জিহাদ করে আল্লাহর পথে, তাহারাই আল্লাহ্ অনুগ্রহ প্রত্যাশা করে। আল্লাহ ক্ষমাপরায়ণ, পরম দয়ালু” (২: ২১৮)।
ইব্ন হিশাম- এর বর্ণনামতে এই সুসংবাদ প্রাপ্ত হইয়া আবদুল্লাহ ইবন জাহ্শ (রা) নিম্নের পংক্তিগুলি আবৃত্তি করেন:
تعدون قتالا في الحرام عظيمة + واعظم منه نويري الرشد راشد مدود كم عما يقول محمد + وكفربه والله راء وشاهد واخراجكم من مسجد الله اهله + لئلا يرى الله في البيت ساجد
"তোমরা হারাম মাসে যুদ্ধ করা গর্হিত গণ্য কর, তবে সত্যদ্রষ্টার জন্য ইহা হইতে অধিক গর্হিত হইল: মুহাম্মাদের বাণী প্রচারে তোমাদের বাঁধা দান এবং তা প্রত্যাখ্যান। আল্লাহ্ই ইহার প্রত্যক্ষকারী ও সাক্ষী যে, তোমরা আল্লাহর ঘর হইতে ইহার অধিবাসিগণকে বহিষ্কার কর যাহাতে আল্লাহ্ ঘরে কেছ ইবাদতকারী না থাকে, ইহাও অত্যন্ত গর্হিত কাজ"।