📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 জিয়া : অমুসলিম নাগরিকদের জন্য বিশ্বনবীর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আশীর্বাদ

📄 জিয়া : অমুসলিম নাগরিকদের জন্য বিশ্বনবীর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আশীর্বাদ


আল-কুরআনে এই শব্দটি ব্যবহৃত হইয়াছে এইভাবে:
قَاتِلُوا الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَا بِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلَا يُحَرِّمُوْنَ مَا حَرَّمَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَلَا يَدِينُونَ دِينَ الْحَقِّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ حَتَّى يُعطوا الجُزْيَةَ عَنْ يَدٍ وَهُمْ صَاغِرُونَ.
"যাহাদের প্রতি কিতাব অবতীর্ণ হইয়াছে তাহাদের মধ্য যাহারা আল্লাহে ঈমান আনে না ও শেষ দিনেও নহে এবং আল্লাহ ও তাঁহার রাসূল যাহা হারাম করিয়াছেন তাহা হারাম গণ্য করে না— তাহাদের সহিত যুদ্ধ করিবে যে পর্যন্ত না তাহারা নত হইয়া স্বহস্তে জিযিয়া দেয়" (৯:২৯)।
তাফসীরকারগণের মতে, আরবী জাযা (جزی) শব্দ হইতে জিযিয়া শব্দের উৎপত্তি হইয়াছে। জাযা অর্থ বিনিময়। ইহা যিম্মীদের প্রাণ রক্ষার বিনিময় বলিয়া ইহার এইরূপ নামকরণ করা হইয়াছে (দ্র. যামাখশারী, আল-কাশশাফ, ১খ., পৃ. ২৫২; আল-বায়দাবী, ১খ., পৃ. ৩৩১; রূহুল মাআনী, ১০খ., পৃ. ৭৮)।
আল-খাওয়ারিষমী-এর মতে, ফারসী كزيت-এর আরবী রূপ হইল জিযিয়া। উহার মানে কর (দ্র. ইসলামী বিশ্বকোষ, ১১খ., পৃ. ৫৭৮)।
অমুসলিমদের নিকট হইতে সর্বপ্রথম এই জিযিয়া আদায়ের ঘটনা ঘটে হিজরী ৭ম সালে (৬২৮ খৃ.) যখন তায়মার অধিবাসিগণ ঐ কর দিতে সম্মত হয়। রাসূলুল্লাহ (স) তায়মার ইয়াহুদী গোত্র বনূ আদিয়াকে জিযিয়ার বিনিময়ে জান-মালের নিরাপত্তা দান করিয়াছিলেন (রাসূলুল্লাহ (স)-এর পত্রাবলী, সন্ধিচুক্তি, ফরমানসমূহ, পৃ. ১৯৮; তথ্যসূত্রঃ তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৭৯; ই'লামুস সাইলীন, পৃ. ৪৯; মাজমু'আতুল ওয়াছাইকিস সিয়াসিয়্যা, পৃ. ৪১, নং ১৯)।
জিয়া আদায়ের দ্বিতীয় ঘটনা ঘটে ৮-৯ হি./৬৩০ খৃ. সালে। বাহরায়নের শাসক মুনযির ইবন সাওয়ার প্রশ্নের উত্তরে রাসূলুল্লাহ (স) সেখানকার ইয়াহুদী ও অগ্নি উপাসকদের নিকট হইতে এক মুআফিরী মূল্যমানের এক দীনার হিসাবে জিয়া আদায়ের নির্দেশ দিয়াছিলেন (দ্র. রাসূলুল্লাহ (স)-এর পত্রাবলী, সন্ধিচুক্তি ও ফরমানসমূহ, পৃ. ৯৫; তথ্যসূত্র কিতাবুল খারাজ, পৃ. ১২১)।
নবম হিজরীতে রাসূলুল্লাহ (স) যখন তাবুক যাত্রার মনস্থ করেন, তখন হযরত কুদামা ও আবূ হুরায়রা (রা)-কে জিযিয়া বাবৎ সংগৃহীত অর্থ লইয়া আসার জন্য মুনযিরের কাছে পাঠানো হয়। ঐ সময় অপর একজন মুসলিম শাসককেও তাহার এলাকা হইতে জিযিয়ারস্বরূপ সংগৃহীত অর্থ আবু হুরায়রার মাধ্যমে পাঠাইয়া দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। মুনযির সেইমতে অর্থ প্রেরণ করিয়াছিলেন এবং তাবুক অভিযানের ব্যয় নির্বাহে এই অর্থ ব্যয়িত হয় (দ্র. রাসূলুল্লাহ (স)-এর পত্রাবলী, সন্ধিচুক্তি ও ফরমানসমূহ, পৃ. ৯৬; বালাগে মুবীন, পৃ. ১৭৮)।
নাজরানের খৃস্টানদের উদ্দেশ্যে লিখিত ফরমানে জিযিয়ার পরিমাণ ও জিযয়াদাতাদের অধিকার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোকপাত করা হইয়াছে। উহা ইসলামের ইতিহাসে জিযিয়ার তৃতীয় ঘটনা (বিস্তারিত বিবরণের জন্য দ্র. রাসূলুল্লাহ (স)-এর পত্রাবলী, পৃ. ১৮৮-৯; মাজমূ'আতুল ওয়াছাইক, পৃ. ১১১-৩)।
ইসলামী রাষ্ট্রের অমুসলিম নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা বিধান জিযিয়া আদায়ের অন্যতম শর্ত। রাষ্ট্র এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ বা অপারগ হইলে জিযিয়া আদায়ের উহার কোনই অধিকার থাকে না। ইসলামী রাষ্ট্র কঠোরভাবে সেই দায়িত্ব পালন করিত। কখনও এই ব্যাপারে ব্যর্থ হইলে তাহারা কি করিতেন ইহার জবাব আরনল্ড নামক খৃস্টান লেখকের কলম হইতেই আমরা জানিতে :
How rwigidlythe Mulsims observed the condition of this ability to afford protection os well evidenced by an on cidenb in the Reign at thesecond cabiph. The Emperor Heraclius had raiced on enormous army with which to concentrate all their energien on the impending en couhten the Arab general Abn Ubaida accordingly, Wrole tothe governors as sthe congusred citees at Syria, or derring them to pay badk all Sigywh, that had been collected from the citis and wrote to the people saming "the agreement between us was that we should prot protcet you, and as this is not now onour power, we refurn you all that we took" in accordance with this order enormous sums were paid back out of the stali treasury, and this christian called down blessing on the heads of the Muslims, saying May god give you rule over us again and make you gieforious ouer the Roman had it been the, they would not have guven es anything but would have taken all that remained with us, Arnold, Preacling of Islam PP, Go-61
সারকথা, মুসলমানগণ এই দায়িত্ব যে কি কঠোরভাবে পালন করিতেন তাহার দৃষ্টান্ত হইতেছে দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমারের আমলে সিরিয়ার একটি বিজিত এলাকায় রোমক সম্রাট বিরাট বাহিনী লইয়া আক্রমণ চালাইলে মুসলমানগণ যখন উহার প্রতিরোধকল্পে ব্যস্ত তখন সেনাপতি আবু উবায়দা সিরিয়ার বিজিত এলাকার ঐ শহরগুলির শাসকগণকে আদায়কৃত জিয়া এই বলিয়া ফেরত দিতে নির্দেশ দিলেন, আমরা যেহেতু তোমাদের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হইয়াছি, তাই তোমাদের প্রদত্ত কর তোমরা ফিরাইয়া লও। ইহাতে বিমোহিত ও আশ্বর্যান্বিত হইয়া সেখানকার খৃস্টান প্রজাগণ মুসলমান শাসকদিগকে আশীর্বাদ জ্ঞাপন করিয়া বলে, আল্লাহ তোমাদিগকে আবার আমাদের উপর বিজয়ী করুন। রোমক সম্রাট তো সর্বদাই আমাদের নিকট হইতে কর আদায় করিয়াছেন, কোন দিন উহা আমাদের কাছে ফিরাইয়া দেন নাই, বরং আমাদের সর্বস্ব কাড়িয়া লইয়াছন (দ্র. প্রীচিং অব ইসলাম, পৃ. ৬০-৬১)।
মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের জন্য এই ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতিরক্ষা কৌশল। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, অন্য ক্ষেত্রে তো বটেই, এমনকি সমরনীতি ও প্রতিরক্ষা কৌশলেও তিনি ছিলেন রহমাতুল্লিল আলামীন তথা গোটা বিশ্বের জন্য রহমতস্বরূপ।

টিকাঃ
গ্রন্থপঞ্জী : বরাত নিবন্ধ গর্ভে প্রদত্ত হইয়াছে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সারিয়‍্যা উবায়দা ইবনুল হারিছ (রা)

📄 সারিয়‍্যা উবায়দা ইবনুল হারিছ (রা)


মক্কার কুরায়শগণ মদীনার সীমান্ত অঞ্চলে একটি বাহিনী প্রেরণ করিয়াছে, এই সংবাদ পাইয়া রাসূলুল্লাহ (স) আপন পিতৃব্য পুত্র হযরত উবায়দা ইবনুল হারিছের নেতৃত্বে ষাটজন অশ্বরোহী মুহাজির সাহাবীর একটি দলকে রাবিগ অভিমুখে প্রেরণ করেন। মতান্তরে ঐ সাহাবীগণের সংখ্যা ছিল আশিজন। ইহাতে কোন আনসার সাহাবী শামিল ছিলেন না। রাবিগ উপত্যকার ছানিয়াতুল মাররা নামক স্থানে একটি জলাশয়ের নিকট উপনীত হইলে তাহারা সেখানে বিপুল সংখ্যক কুরায়শের সমাবেশ লক্ষ্য করেন। সংখ্যায় তাহারা ছিল দুই শতজন। ঐ সমাবেশে আবূ সুফিয়ানও ছিল। ইবন ইসহাক-এর ভাষ্যমতে, ঐ কুরায়শ দলের নেতৃত্বে ছিল আৰী জাহ্ পুত্র ইকরিমা। তবে ইবন হিশামের মতে ঐ কুরায়শ দলের নেতৃত্বে ছিল-মিকরায ইবন হাম্স। উভয় পক্ষ মুখামুখি হইলেও সেখানে কোন যুদ্ধ হয় নাই। তবে হযরত সা'দ ইব্‌ন আবী ওয়াক্কাস (রা) কাফির বাহিনীর দিকে একটি তীর ছুড়িয়াছিলেন। ইসলামের ইতিহাসে ইহাই ছিল কাফিরদের প্রতি নিক্ষিপ্ত সর্বপ্রথম তীর।
ইব্‌ন হিশাম ঐ সারিয়াটি রাসুলুল্লাহ (স)-এর ওয়াদ্বান অভিযানের পরবর্তী সময়ে প্রেরিত হইয়াছিল বলিয়া উল্লেখ করিলেও আল্লামা শিবলী নু’মানী উহা তাঁহার উক্ত অভিযানের পূর্ববর্তী কালের ঘটনা বলিয়া সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করিয়াছেন (দ্র. সীরাতুন্বী, ইব্‌ন হিশাম, ২খ., পৃ. ২৬২; সীরাতুন্বী, শিবলী নু’মানী (উর্দু), ১ম., পৃ. ৩১০)।
সফিউর রহমান মুবারকপুরী ঐ সারিয়া, শাওওয়াল ১‍ম হিজরী, এপ্রিল ৬২৩ খৃ. অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা সুনিশ্চিতভাবে করিয়াছেন (দ্র. আর-রাহীকুল মাখতুম (আরবী), পৃ. ২১৯ সম স. ১৯৮০ খৃ.)।
মাওলানা দানাপুরীও এই অভিযানের সময়ের কথা উল্লেখ করিয়াছেন এইভাবে : সারিয়া হামযার পর ১‍ম হিজরীর শাওওয়াল মাসে হিজরতের অষ্টম মাসে নবী করীম (স) ৬০, মতান্তরে ৩০ জন অশ্বারোহী মুহাজির সাহাবীকে হযরত উবায়দা ইবনুল হারিসের নেতৃত্বে রাবিগ প্রেরণ করেন। এইজন্য যে পতাকা তৈয়ার করা হয় উহা শ্বেতবর্ণের ছিল এবং পতাকা বহনকারী ছিলেন মিসতাহ ইব্‌ন উছাছা (রা.) (দ্র. আসাচ্চুস্-সিয়ার, পৃ. ৮০)।
মিকদাদ ইব্‌ন আমর বাহরানী এবং উতবা ইব্‌ন গাযওয়ান আল-মাযিনী নামক দুই ব্যক্তি মুশরিক শিবির হইতে পলায়ন করিয়া এই সময় মুসলমান শিবিরে চলিয়া আসেন। ইব্‌ন ইসহাক বলেন, ইহারা দুইজন মুসলমানই ছিলেন। তাঁহারা কেবল রাসুলুল্লাহ (স)-এর সহিত মিলিত হইবার সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন (দ্র. সীরাতুন্বী, ইব্‌ন হিশাম, ২খ., পৃ. ২৬২; ইফা; ইব্‌ন সা’দ, তাবাকাত, ১খ., পৃ.৭)।
ইব্‌ন ইসহাক বলেন, সা’দ ইব্‌ন আবী ওয়াক্কাস (রা) ও তদীয় তীর নিক্ষেপ সম্পর্কে একটি কবিতা আবৃত্তি করেন বলিয়া কথিত আছে। কবিতাটি ছিল নিম্নরূপ :
الآهل أتى رسول الله انني + حمیت صحابتی لصدور نبلی اذوذ بها اوائلهم ذيادا + بكل حزونة وبكل سهل فما يعتد رام في عدو + بسهم يا رسول الله قبلی وذلك أن دينك دين صدق + وذو حق اتيت به وعدل ينجى المؤمنون به ويجزى + به الكفار عند مقام مهد فمهلا قد غونت فلا تعيني + غوى الحي ويحك يا ابن جهل
“রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট এই সংবাদ পৌঁছিয়াছে যে, আমি আমার সঙ্গীগণকে আমার তীর দ্বারা রক্ষা করিয়াছিলাম। আমি তাহাদের প্রত্যেক পার্বত্যভূমি ও সমভূমিতে তাহাদের শত্রুদের অবরোধদিগকে প্রতিহত করিতেছি।”
"ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমার পূর্বে আর কেহই শত্রুবাহিনীর প্রতি তীর নিক্ষেপ করে নাই। বস্তুত আপনার আনীত দীন সত্য, ন্যায় ও সুবিচারের দীন। ইহা দ্বারা মুমিনদিগকে পরিত্রাণ দেওয়া হইবে এবং কাফিরদিগকে ইহার (অগ্রাহ্য করার) কারণে স্থায়ীভাবে লাঞ্ছিত করা হইবে।
"হে জাহল (মূর্খ) নন্দন! তোমার জন্য পরিতাপ, তুমি তো বিপথগামী হইয়াছ। এইজন্য আমার প্রতি দোষারোপ করিবে না। তুমি কিছু দিন অপেক্ষা কর (এবং দেখ, তোমার জন্য কী পরিণতি অপেক্ষা করিতেছে)" (দ্র. ইবন হাজার, আল-ইসাবা, ২খ., পৃ. ৩৪; ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরা, ২খ., পৃ. ২৩৪; তাবাকাত, ৩খ., পৃ. ১৪০; উসুদুল গাবা, ২খ., পৃ. ২৯১)।
ইবন হিশাম (র) হযরত সা'দ (রা) ইব্‌ন আবী ওয়াক্কাসের বলিয়া কথিত উপরোল্লিখিত কবিতা প্রকৃতপক্ষে তাঁহার নহে বলিয়া মন্তব্য উদ্ধৃত করিয়াছেন।
ইবন ইসহাক এই প্রসঙ্গে আরও বলেন, আমার নিকট এই মর্মে তথ্য পৌঁছিয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) মুসলমানদের মধ্যে সর্বপ্রথম যাঁহার হস্তে পতাকা তুলিয়া দিয়াছিলেন তিনি ছিলেন এই উবায়দা ইব্‌ন হারিছ (রা)।
হযরত উবায়দা ইবনুল হারিছ (রা) পরিচালিত অভিযানটি সারিয়‍্যা রাবিগ নামেও পরিচিত। তবে এই অভিযানে উভয় সৈন্যদল কোনও প্রকার সংঘর্ষ ছাড়াই নিজ নিজ অবস্থানে ফিরিয়া গিয়াছিল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সারিয়‍্যা সা'দ ইব্‌ন আবী ওয়াক্কাস (রা)

📄 সারিয়‍্যা সা'দ ইব্‌ন আবী ওয়াক্কাস (রা)


রাসুলুল্লাহ (স) কুড়িজন সাথীসহ হযরত সা'দ ইব্‌ন আবু ওয়াক্কাস (রা.)-কে কুরায়শদের একটি কাফেলার খোঁজ-খবর নেওয়ার জন্য হিজরী ১ম বর্ষের যী-কা'দা (মে ৬২৩ খৃ.) মাসে রওয়ানা করেন। তাহাদের প্রতি তাগিদ ছিল তাহারা যেন কোনক্রমেই খাররার নামক স্থানটি অতিক্রম না করেন। তাহারা পদব্রজে রওয়ানা হন। সারা রাত ধরিয়া পথ চলিয়া দিনের বেলা তাহারা আত্মগোপন করিয়া থাকিতেন। পঞ্চম দিনের প্রত্যুষে খাররার পৌঁছিয়া তাহারা জানিতে পারেন যে, কুরায়শদের কাফেলা একদিন পূর্বেই এই স্থান অতিক্রম করিয়া চলিয়া গিয়াছে।
এই অভিযানের পতাকাও সাদা ছিল এবং পতাকা বহন করেন হযরত মিকদাদ ইব্‌ন আমর (রা) (দ্র. আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ৬; উযূনুল আছার, ইব্‌ন সায়্যিদিন নাস, ১খ., পৃ. ২২৫)। স্থানের নামানুসারে ঐ সারিয়‍্যাকে সারিয়‍্যায়ে খাররার নামেও অভিহিত করা হইয়া থাকে। ঐ স্থানটি জুহ্ফার অনতিদূরে অবস্থিত।
ইন্ন হিশাম বলেন, কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে খাররার অভিযান হযরত হামযা (রা)-এর অভিযানের পরে প্রেরিত হইয়াছিল (দ্র. সীরাতুন নবী, ইন্ন হিশাম, ২খ., পৃ. ২৮৯)।
প্রকৃতপক্ষে ইসলামের ইতিহাসের সর্বপ্রথম অভিযান ছিল উক্ত তিনটি অভিযান। তাই মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে মহানবী (স)-এর সকল জীবনীকারই ঐ সারিয়‍্যাগুলির গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করিয়াছেন। বিশেষত পাশ্চাত্যের লেখকগণ এই প্রসঙ্গে তাহাদের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী ইসলামের যুদ্ধপ্রসঙ্গ এবং ঐ সময়কার প্রেক্ষাপটও আলোচনা করিয়াছেন। এই অভিযানগুলির সুদূরপ্রসারী প্রভাব সম্পর্কে পাশ্চাত্যের একজন লেখিকা মন্তব্য করেনঃ
The early raids of 623 were not very successful. It was difficult to get accurate information about the movement of the caravan. no goods were siezed and there was no fighting. But the Macen world have been rafited and irritated. They have to take Precautions is that had never been necessary before and the Beduin tribes along the Red sea coast (the preferred trade route) would have been im.pressed by the muslims pluck Even though the early raiders failed to attack the Caravans. They made Treaties with Tribes a various Strategic points along the Red.
"৬২৩ খৃস্টাব্দের প্রথম দিককার অভিযানসমূহ খুব সফল ছিল না। কাফেলাসমূহের গতিবিধি সম্পর্কে সঠিক তথ্যলাভ ছিল খুবই দুরুহ। ফলে কোন যুদ্ধও হয় নাই এবং তাহাদের মালামাল কাড়িয়া লওয়াও সম্ভব হয় নাই। কিন্তু মক্কাবাসীরা তাহাতে অত্যন্ত বিব্রত এবং দিশাহারা হইয়া পড়িয়াছিল। তাহাদিগকে এমন সব সতর্কতা অবলম্বন করিতে হইতেছিল যাহার প্রয়োজন ইতোপূর্বে কোন দিনই পড়ে নাই। তাহা ছাড়া লোহিত সাগর উপকূলবর্তী পছন্দনীয় এই বাণিজ্য পথটির বেদুঈন গোত্রগুলি মুসলমানদের এই ধরনের অভিযানে বেশ অভিভূত হইয়াছিল। ঐ প্রাথমিক অভিযাত্রী দলগুলির কাফেলা আক্রমণ যদিও ব্যর্থ হইয়াছিল তথাপি ইহার ফলে এই পথের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসবাসকারী গোত্রগুলির সহিত সন্ধি স্থাপনে বা সমঝোতা গড়িয়া তুলিতে তাহারা সক্ষম হইয়াছিল" (Karen Armstrong, Muhammad, holy war অধ্যায়, পৃ. ১৬৯-১৭০)।
বস্তুত ঐ শেষোক্ত সাফল্যগুলিই ছিল উক্ত সারিয়‍্যা অভিযানগুলির দ্বারা মুসলমানদের চরম প্রাপ্তি, যাহা পরবর্তী কালে তাহাদের সকলের চাবিকাঠিরূপে প্রতিপন্ন হইয়াছে। মহানবী (স)-এর এই প্রতিরক্ষা কৌশল ছিল একজন দূরদর্শী ও কুশলী সমরবিদসুলভ। ঐ সাফল্যের জন্যই ইসলামের ইতিহাসে ঐ প্রাথমিক সারিয়‍্যাগুলি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করিয়া আছে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 গাযওয়া আল-উশায়রা

📄 গাযওয়া আল-উশায়রা


হিজরী দ্বিতীয় সনের জুমাদাল উলার মাঝামাঝি সময়ে রাসূলুল্লাহ (স) দুই শত মুহাজিরকে সঙ্গে লইয়া কুরায়শদের সিরিয়াগামী এক কাফেলার উপর হামলা করার জন্য 'উশায়রা নামক স্থানের দিকে রওয়ানা হন। এই সময় আবূ সালামা ইব্‌ন আবদুল আসাদ মাখযুমীকে মদীনার শাসক নিয়োগ করা হয়। কুরায়শদের এই কাফেলা পণ্যসামগ্রী লইয়া মক্কা হইতে সিরিয়া অভিমুখে রওয়ানা হইয়াছিল। "ইয়াম্বু” নামক স্থানে পৌঁছিয়া রাসূলুল্লাহ (স) জানিতে পারিলেন যে, কাফেলা ইতোপূর্বেই সিরিয়া চলিয়া গিয়াছে বিধায় কাফেলার অপেক্ষায় জুমাদাল উলার অবশিষ্ট দিন ও জুমাদাছ ছানিয়ার কয়েক দিন সেই স্থানে অবস্থান করেন। অবশেষে মুদলিজ গোত্র ও তাহাদের মিত্র বনূ দামরার সাথে সন্ধি চুক্তি করিয়া মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন। এই অভিযানে হযরত হামযা (রা)-এর হাতে পতাকা ছিল। উল্লেখ থাকে যে, কুরায়শদের বাণিজ্যিক কাফেলাটি যখন সিরিয়া হইতে প্রত্যাবর্তন করে তখন রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে পর্যুদস্ত করার জন্য পুনরায় অভিযানে বাহির হন তখনই মূল বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

এই অভিযানে মুদলিজ গোত্র ও তাহাদের মিত্র গোত্র বনূ দামরার সাথে যে সন্ধি চুক্তি স্বাক্ষরিত হইয়াছিল—তাহা নিম্নরূপ:
بسم الله الرحمن الرحيم هذا كتاب من محمد رسول الله صلى الله عليه وسلم لبنى ضمرة بأنهم آمنون على اموالهم وانفسهم وان لهم النصرة على من رامهم ان لا يحاربوا في دين الله ما بل بحر صوفة وان النبى اذ دعاهم لنصره اجابوه عليهم بذالك ذمة الله وذمة رسوله ولهم النصرة على من بر واتقى.
"দয়াময় পরম দয়ালু আল্লাহ্ নামে। এই চুক্তিপত্র আল্লাহ্র রাসূল মুহাম্মাদ (স)-এর পক্ষ হইতে বানু দামরার প্রতি; তাহাদের জীবন ও ধনসম্পদ নিরাপদ থাকিবে। যে ব্যক্তি বানু দামরার সহিত অনর্থক যুদ্ধের ইচ্ছা করিবে তাহার বিরুদ্ধে বানু দামরাকে সাহায্য করা হইবে এই শর্তে যে, সমুদ্র শুষ্ক হইয়া যাইবার পূর্ব পর্যন্ত তাহারা আল্লাহর দীনের বিরুদ্ধে কোন প্রকার যুদ্ধ-বিগ্রহ করিবে না (অর্থাৎ এই হুকুম সদাসর্বদা বলবৎ থাকিবে)। আর নবী (স) যখন তাহাদিগকে তাঁহার সাহায্যের জন্য আহ্বান করিবেন তখন তাহারা তাঁহার ডাকে সাড়া দিবে। যে ব্যক্তি সৎকর্ম করিবে এবং পরহেযগারী অবলম্বন করিবে তাহাদের সহিত আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের সাহায্যের অঙ্গীকারনামা ও তাহাদের যাবতীয় দায়- দায়িত্ব আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের যিম্মায় থাকিবে।"
এই অভিযান সম্পর্কে ইমাম বুখারী (র) আবূ ইসহাক হইতে বর্ণনা করিয়াছেন: قال كنت إلى جنب زيد بن ارقم فقيل له كم غزا رسول الله صلى الله عليه وسلم من غزوة قال تسع عشر قلت كم غزوات أنت معه قال سبع عشر غزوة قلت فايهن كان اول قال العشيرة او العسيرة.
"আবূ ইসহাক (র) বলেন, আমি যায়দ ইব্‌ন আরকাম (র)-এর পার্শ্বে অবস্থিত ছিলাম। তাহাকে জিজ্ঞাসা করা হইল, রাসূলুল্লাহ (স) কতটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিয়াছেন? তিনি বলিলেন, উনিশটিতে। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনি তাহার সহিত কয়টি যুদ্ধে শরীক ছিলেন? তিনি বলিলেন, সতেরটিতে। আমি পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলাম, প্রথম যুদ্ধ কোনটি? তিনি বলিলেন, উশায়রা কিংবা উসায়রা।"
এই হাদীছ হইতে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামের প্রথম গাওয়া হইল উশায়রা। এই অভিযানে হযরত আলী (রা) রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক আবূ তুরাব (ابو تراب) উপনামে ভূষিত হইয়াছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00