📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মুতায় যুদ্ধ: খৃস্টানদের বিরুদ্ধে প্রথম লড়াই

📄 মুতায় যুদ্ধ: খৃস্টানদের বিরুদ্ধে প্রথম লড়াই


ইতোপূর্বে অনুষ্ঠিত সমস্ত যুদ্ধ ছিল পৌত্তলিক ও ইয়াহুদীদের বিরুদ্ধে। কিন্তু এই যুদ্ধ ছিল খৃস্টানদের বিরুদ্ধে। ইসলামের ইতিহাসে ইহাই ছিল খৃস্ট জগতের বিরুদ্ধে প্রথম যুদ্ধ। এইজন্য ইহার একটি ভিন্ন তাৎপর্য রহিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) ইসলামের দাওয়াত সম্বলিত পত্র দিয়া তদানীন্তন শ্রেষ্ঠ শক্তিধর সম্রাট হিরাক্লিয়াস ও পারস্য সম্রাট খসরু পারভেযসহ অনেক রাজন্যবর্গের নিকট দূত প্রেরণ করেন। একটি পত্র তিনি রোম সম্রাটের অধীনস্ত বুসরার শাসক শুরাহবীল-এর নিকটও প্রেরণ করেন তদীয় দূত হারিছ ইবন উমায়র আল-আযদী (রা)-র মাধ্যমে। শুরাহবীল কূটনৈতিক রীতিনীতি ভঙ্গ করিয়া ঐ দূতকে নির্মমভাবে হত্যা করিয়া ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করে। ইসলামের ইতিহাসে উহাই ছিল কোন দূত নিহত হওয়ায় প্রথম ঘটনা। রাসূলুল্লাহ (স) এই সংবাদে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং ইহার সমুচিত জবাব দেওয়ার উদ্দেশ্যে অষ্টম হিজরীর জুমাদাল উলা মাসে ৩০০০ সৈন্যের একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। যুদ্ধটির গুরুত্ব পরিমাপের জন্য এই একটি কথাই যথেষ্ট যে, রাসূলুল্লাহ (স) নিজে ছানিয়াতুল বিদা পর্যন্ত অগ্রসর হইয়া এই বাহিনীকে বিদায় দিয়াছিলেন এবং স্বহস্তে সেনাপতির হাতে পতাকা তুলিয়া দিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) নিজে এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করা সত্ত্বেও সীরাতবিদগণ এই যুদ্ধটিকে গাযওয়ার তালিকাভুক্ত করিয়াছেন।

সেনাপতির আসনে গোলামঃ ইসলামী সাম্যের নমুনা
রাসূলুল্লাহ (স) নিজ হাতে পতাকা বাঁধিয়া যাঁহার হস্তে এই বিশাল বাহিনীর সেনাপতির গুরুদায়িত্ব অর্পণ করিলেন তিনি যায়দ ইবন হারিছা (রা), রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুক্তদাস। এত বড় বড় বয়োজ্যেষ্ঠ সাহাবীগণ এই যুদ্ধে সাধারণ সৈনিকরূপে যোগদান করিলেন, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) সেনাপতি নির্বাচিত করিলেন এই যায়দ্যক। কুরায়শ বংশীয় আরব নেতাগণের কেহ এইজন্য অসন্তুষ্ট হইলেন না। রাসূলুল্লাহ (স) স্পষ্ট ভাষায় বলিয়া দিলেনঃ "যায়দ শহীদ হইলে তারপর জা'ফার ইবন আবী তালিব এবং সেও শহীদ হইলে আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করিবে"। [ফাতহুল বারী, ৭/৫১০; সীরাত ইবন হিশাম, ৩/৪২৮]

মানবতা বিরোধী কার্যকলাপ নিষিদ্ধ ও বাহিনীর সফর দীর্ঘ, মুকাবিলা করিতে হইবে রোমক শক্তির সহিত। অত্যন্ত ভাবগম্ভীর পরিবেশে জীবন বাজি রাখিয়া মুসলিম বাহিনী রওয়ানা হইল। বাহিনী রওয়ানা করার প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে উপদেশ দিলেন: তোমরা হারিছ ইবন উমায়রের বধ্যভূমিতে পৌছিয়া প্রথমে তাহাদিগকে ইসলামের দাওয়াত দিবে। যদি তাহারা সাড়া দেয় তবে তো উত্তম, নতুবা আল্লাহ্র কাছে সাহায্য প্রার্থনা করিয়া তাহাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইহাতে ঝাঁপাইয়া পড়িবে। তিনি বলিলেনঃ আল্লাহর নামে আল্লাহর রাহে ঐ সমস্ত লোকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিবে যাহারা আল্লাহ্র সুস্থিত কুফরী করিয়াছে। বিশ্বাস ভঙ্গ করিও না। খিয়ানত করিও না। কোন শিশু, নারী বা অতি বৃদ্ধকে হত্যা করিও না। সংসার বিরাগী কোন সাধুকে হত্যা করিও না। খেজুর গাছ বা অন্য কোন গাছ কাটিও না। কোন ইমারত ধ্বংস করিও না। [সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৬১১]

সিরিয়া সীমান্তে অবস্থিত মা'আনে পৌছিয়া তাঁহারা জানিতে পারিলেন যে, স্বয়ং রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াস এক লক্ষ সৈন্যের বিশাল বাহিনীসহ নিকটেই বাল্কা অঞ্চলের মাআবে শিবির স্থাপন করিয়াছেন। লাখম, জুযাম, বালকীন প্রভৃতি আরব বংশোদ্ভূত খৃস্টান গোত্রের আরও এক লক্ষ সৈন্য তাহাদের সাহায্যের জন্য প্রস্তুত রহিয়াছে। বিদেশ বিভুঁইয়ে মাতৃভূমি হইতে প্রায় হাজার মাইলের দূরত্বে মাত্র তিন হাজার সৈন্যের বাহিনী লইয়া যুদ্ধে প্রবৃত্ত হওয়া সমীচীন হইবে কিনা তাহা রীতিমত চিন্তার ব্যাপার ছিল। তাই মুসলিম বাহিনী দুই দিন পর্যন্ত নিবৃত্ত রহিল। অনেকের ধারণা ছিল, পরিস্থিতির সঠিক চিত্র রাসূলুল্লাহ (স)-কে অবগত করিয়া এই ব্যাপারে তাঁহার সুনির্দিষ্ট নির্দেশ প্রয়োজন। আবদুল্লাহ ইব্‌ন রাওয়াহা (রা)-এর এক বীরত্ব ব্যঞ্জক ভাষণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হইল। তিনি বলিলেন, “হে আমার সম্প্রদায়! যে বস্তুটির জন্য আপনারা দ্বিধাগ্রস্ত হইয়া পড়িয়াছেন, নিঃসন্দেহে উহাই আপনাদের পরম কাম্য। তাহা হইতেছে শাহাদাত। আমরা সংখ্যাশক্তি বা সংখ্যাধিক্যের জোরে যুদ্ধ করি না। আমরা কেবল এই দীনের শক্তিতে বলীয়ান হইয়াই যুদ্ধ করি যাহা দ্বারা আল্লাহ আমাদিগকে সম্মানিত করিয়াছেন। সুতরাং অগ্রসর হউন! আমাদের জন্য দুইটি অঙ্গলের একটি অবশ্যম্ভাবী: বিজয় অথবা শাহাদাত।

তারপর অগণিত শত্রুসৈন্যের ভীতি সকলের মন হইতে কপূরের মত হাওয়ায় মিশিয়া গেল। একে একে যায়দ ইবন হারিছা, জা'ফার ইব্‌ন আবী তালিব ও আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা) বীরত্বের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিয়া যুদ্ধক্ষেত্রে শহীদ হইলেন। মুসলিম বাহিনীর পতাকা পড়িয়া গেল দেখিয়া বানু 'আজলান গোত্রীয় সাহাবী ছাবিত ইব্‌ন আরকাম (রা) পতাকা তুলিয়া ধরিয়া বুলন্দ আওয়াজে আহবান জানাইলেন, আল্লাহ্র পথের মুজাহিদগণ। একজন সেনাপতি নির্বাচিত করুন। লোকজন বলিয়া উঠিল, আপনিই আমাদের সেনাপতি। তিনি বলিলেন, এই গুরুদায়িত্ব আমি পালন করিতে পারিব না। তখন যোদ্ধাগণ খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা)-কে সেনাপতিরূপে বরণ করিয়া লইলেন।

সেনাপতির দায়িত্ব লাভ করিয়াই খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা) যুদ্ধের দ্বিতীয় দিনে নূতনভাবে সৈন্য বিন্যাস করিলেন। তিনি মুকাদ্দামা বা অগ্রবাহিনীকে সাকা (পশ্চাৎবর্তী) বাহিনীরূপে এবং মায়মানা (ডানবাহিনী)-কে মায়সারা (বাম বাহিনী)-রূপে বিন্যস্ত করিলেন। শত্রুসৈন্যরা যখন তাহাদের সম্মুখে নূতন নূতন মুখ দেখিতে পাইল, তখন তাহারা সাহায্যকারী নূতন বাহিনী আসিয়া মুসলিম বাহিনীতে যোগ দিয়াছে ভাবিয়া প্রমাদ গণিল। হযরত খালিদ সৈন্যবিন্যাস বজায় রাখিয়া ক্রমান্বয়ে তাঁহার বাহিনীকে সরাইয়া আনিতে লাগিলেন। শত্রুরা মনে করিল মুসলমান সৈন্যগণ কৌশলে পিছনের দিকে গিয়া তাহাদিগকে প্রলুব্ধ করিয়া নূতন কোন-ফাঁদে ফেলিবার চেষ্টা করিতেছে। তাই তাহারাও পশ্চাদাপসরণ করিল, মুসলমানদের পশ্চাদ্ধাবন করিতে সাহস পাইল না। কেবল ঈমানের বলে দুই লক্ষ শত্রু সৈন্যের বিরুদ্ধে লড়িয়া এইভাবে মুসলিম বাহিনী মদীনায় প্রত্যাবর্তন করিল। [ফাতহুল বারী, ৭/৫১৩; যাদুল মা'আদ, ২/১৫৬; আর-রাহীকুল মাখতুম, ১ম আরবী সং, ১৪০০ হি., পৃ. ৪৩৫-৪৪০]

উক্ত যুদ্ধে পূর্বোল্লিখিত তিনজন সেনাপতি ছাড়াও আরও নয়জন শহীদের নাম আল্লামা ইবনুল কায়্যিম তদীয় যাদুল মা'আদে এবং মোট চৌদ্দজনের নাম ইবন হিশাম উল্লেখ করিয়াছেন। রোমক পক্ষের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানা না গেলেও এবং সৈন্যসংখ্যার তুলনায় তাহা খুব বেশী মনে না হইলেও তাহাদের পক্ষেও যে বেশ কিছু লোক হতাহত হইয়া থাকিবে তাহা বলাই বাহুল্য। কেননা সেই দিন কেবল হযরত খালিদেরই হাতে একে একে নয়টি তরবারি ভাঙ্গিয়া খানখান হইয়া যাওয়ার কথা বুখারী শরীফেই উল্লিখিত হইয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার সেই দিনের বীরত্বের জন্য তাঁহাকে 'সায়ফুল্লাহ্' (আল্লাহর তরবারি) উপাধিতে ভূষিত করেন। [ফাতহুল বারী, ৭/৫১২, হাদীছ নং ৬২৬-২৬৩]

রাসূলুল্লাহ (স)-এর নেতৃত্বে মাত্র আট বৎসরের সামরিক প্রশিক্ষণে' মদীনাবাসিগণের বীরত্বের মান যে কী পরিমাণ সমুন্নত হইয়াছিল তাহা যতটুকু না এই অসম যুদ্ধে প্রমাণিত হয়, ততোধিক প্রমাণিত হয় যখন মৃতা হইতে মুসলিম বাহিনী প্রত্যাবর্তন করিল তখনকার মদীনাবাসীদের সাধারণ প্রতিক্রিয়া হইতে। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স) অগ্রসর হইয়া মদীনার উপকণ্ঠে মৃতার মুজাহিদগণকে অভ্যর্থনা জানানো সত্ত্বেও একদল লোক তাহাদিগকে যুদ্ধক্ষেত্র হইতে পলাতক বলিয়া ভর্ৎসনা করিতে করিতে তাহাদের প্রতি ধূলি নিক্ষেপ করিতে থাকে। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স) অগ্রসর হইয়া তাহাদের এই 'অপরাধের প্রতিবাদ করিয়া বলিলেনঃ "ইহারা পলাতক নহে, ইহারা হইতেছে পুনরায় যুদ্ধে যোগদানে প্রস্তুত একটি দল। ইনশাআল্লাহ সুযোগমত পুনরায় উহারা শত্রুদের উপর ঝাঁপিয়া পড়িবে"।

ইন্ন হিশাম, ইন্ন ইসহাক প্রমুখ উল্লেখ করিয়াছেন যে, নবী সহধর্মিনী উম্মে সালামা (রা) একদা সালামা ইব্‌ন হিশাম ইব্‌ন আসের স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, সালামাকে যে রাসূলুল্লাহ (স) ও মুসলমানদের সহিত সালাতের জামাআতে দেখা যাইতেছে না, ব্যাপার কী? জবাবে মৃতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সালামার স্ত্রী জানাইলেন, আল্লাহ্র কসম! ঘর হইতে বাহির হইলেই লোকে তাহাকে যুদ্ধক্ষেত্র হইতে পলায়নকারী বলিয়া খোঁটা দেয়, এইজন্য তিনি এখন ঘর হইতে বাহির হওয়া বন্ধ করিয়া দিয়াছেন। [ইব্‌ন হিশাম, সীরাতুন-নবী, ৪খ., পৃ. ১৭-১৮]

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শক্তির সহিত প্রায় হাজার মাইলের পথ পাড়ি দিয়া যে মুসলিম বাহিনী সেই প্রবল শত্রুর দেশেই স্বল্প সংখ্যক লোক লইয়া সংঘর্ষে লিপ্ত হইতে পারে তাহারা যে আর সেই উপেক্ষিত মরু আরব নহে, বরং প্রবল শক্তিধর এক বিরাট মানবগোষ্ঠী, তাহা এই যুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর সম্মুখে সর্বপ্রথম উদ্ভাসিত হয়। মুসলিম বাহিনী এই প্রথমবারের মত একেবারে শত্রুর দেশে ঢুকিয়া তাহাদের সহিত সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হইয়া তাহাদের রণকৌশল ও শক্তি-সামর্থ্য সম্পর্কে একটি ধারণা অর্জন করে। তাই মদীনার এক শ্রেণীর লোকের নিকট উহা তাৎপর্যবহ না হইলেও আল্লাহর রাসূল তাঁহার কৈশোরে সিরিয়া ভ্রমণের অভিজ্ঞতা এবং রাসূল সুলভ প্রজ্ঞার মাধ্যমে উহার তাৎপর্য ঠিকই অনুধাবন করিয়াছিলেন। পরবর্তী কালে রোমকদের সহিত অনুষ্ঠিত অসংখ্য যুদ্ধ এবং রোমক তথা বায়যান্টাইন সাম্রাজ্যের বিশাল এলাকা মুসলমানদের হাতে বিজিত হওয়ার ঘটনা এই মৃতার যুদ্ধের পরই সম্ভব হইয়াছিল। তাই দুই দুইটি বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ জেনারেল আকবর খান এবং সাবেক ইরাকী জেনারেল মাহমূদ শীছ খাত্তাব মৃতার যুদ্ধের অভিজ্ঞতাকে অত্যন্ত তাৎপর্যবহ বলিয়া মন্তব্য করিয়াছেন। জেনারেল আকবর খান লিখেন:

"মহানবী (স)-এর জিহাদ ঘোষণার খবর রোমানদের সম্মিলিত বাহিনীতে যখন পৌঁছে তখন তার প্রথম প্রতিক্রিয়া বনূ হাদস্-এর শাখা বনূ গাযাম-এর উপর হয়। তারা তখনি যুদ্ধে যোগদান থেকে আলাদা হয়ে যায়। তাতে অন্যান্য কবীলাও প্রভাবিত হয় এবং তারাও নিজ নিজ এলাকায় চলে যায়। ফৌজের এই সংখ্যাল্পতার কারণে রোমকরা যারা প্রথমেই পেছনে হটে এসেছিল, নিজেদের মোর্চায় চুপ মেরে যায়, এরপর যুদ্ধের ময়দান ত্যাগ করে চলে যায়। খালিদ (রা)-ও ময়দান শূন্য দেখে মদীনায় ফিরে আসেন।

"বাস্তব সত্য এই যে, সার্বিক অবস্থার পরিমাপ করা শুধু মহানবী (স)-এর মত যোগ্য ও দূরদর্শী অধিনায়কেরই কাজ ছিল। অনন্তর তাবুকের যুদ্ধ থেকে যা মৃতার যুদ্ধের পরবর্তীতে সংঘটিত হয়-এটা প্রমাণিত হয়ে যায় যে, সেখানকার লোকেরা ইসলামের মুজাহিদবৃন্দের বীরত্বের স্বীকৃতি দিয়েছিল। তাদের পরাজয় সেই পাকা ফলটির মত যা ছিল মুজাহিদবৃন্দের কোলে পতনোন্মুখ। অনন্তর সেসব কবীলা কোনরূপ মুকাবিলা ও সংঘর্ষ ব্যতিরেকেই তাবুক যুদ্ধের পর অনুগত হয়ে যায়”। [ইসলামের প্রতিরক্ষা কৌশল, পৃ. ৩৩২-৩৩৩]

জেনারেল মাহমূদ শীছ খাত্তাব বলেন, এটি এক বাস্তব সত্য যে, পশ্চাদপসরণ পরাজয়ে রূপান্তরিত হয়ে যাবার আশংকায় খুবই কঠিন হয়ে ওঠে। আর পরাজয় এমন এক বিপদ হয়ে দেখা দেয় যা পরাজিতদের জন্য সাধারণত খুবই ক্ষতির কারণ হয়। এজন্য মৃতায় মুসলমানদের মামুলি ক্ষতি সেই সামরিক উপকারিতার তুলনায় নেহাৎ অকিঞ্চিৎকর যে, এর দ্বারা রোমকদের সামরিক শক্তি তাদের শৃঙ্খলা ও সংগঠন এবং তাদের যুদ্ধপদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞাত তথ্যাদি পরবর্তী যুদ্ধগুলোতে মুসলমানদের কাজে লেগেছে”। [আর-রাসূলুল কাইদ, আরবী, পৃ. ২০৬-২০৭; নবীয়ে রহমত, পৃ. ৩৩৫, বাংলা অনু.]

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 অপ্রতিদ্বন্দ্বী বিজয়ী ও সফলতম সমরবিদ

📄 অপ্রতিদ্বন্দ্বী বিজয়ী ও সফলতম সমরবিদ


রাসূলুল্লাহ (স)-এর সামরিক ও প্রতিরক্ষা কৌশল সম্পর্কে হাদীছে দেফা’নামক পুস্তকের রচয়িতা জেনারেল আকবর খান প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অর্জিত তদীয় অভিজ্ঞতার আলোকে তাঁহার যুদ্ধসমূহের আলোচনাসূত্রে ইহার পর্যালোচনায় লিখেন : “হিজরতের পর তিনি সাতাশটি যুদ্ধ করেছেন এবং জেহাদের জন্য বিভিন্ন সময়ে ৩৫টি অভিযান বিভিন্ন স্থানে প্রেরণ করেছেন, আর এসবই করেছেন মাত্র দশ বছরের সংক্ষিপ্ততম সময়ে। এর ফল হয়েছে এই যে, বিরোধিতা ও বেইফতার বিষয়ক ঝঞ্ঝা খতম হয়ে যায়। বিদ্রোহী ও উদ্ধত স্বভাবের লোকগুলো বিনীত ও ভদ্র হল, খুন পিপাসী ও জ্ঞানের দুশমন জীবন উৎসর্গকারীতে পরিণত হল। যেখানে কুফর ও শিরকের রাজত্ব ছিল সেখানে ইসলামের ক্রন্দন উত্থিত হতে লাগল। পশুত্ব ও বর্বরতার জায়গা দখল করল মহানবী (স)-এর মর্যাদা ও ভদ্রতা। তাহযীব ও তমদ্দুন তথা সভ্যতা ও সংস্কৃতি স্বভাবজাত সম্পদে পরিণত হল। যেখানে বিশৃঙ্খলা, বিভেদ আর অব্যবস্থাপনার জয়জয়কার চলছিল সেখানে কায়েম হল শৃঙ্খলা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা। গোটা জীবনই রহমতে পরিণত হল, আর আরববাসী পরিণত হল দুনিয়াবাসীর হাদী ও শিক্ষকে। “দৈনিক ২৭৪ বর্গমাইল হিসাবে দীর্ঘ দশ বছর পর্যন্ত তাঁর বিজয় অভিযান অবিশ্রান্তভাবে চলতে থাকে। মুসলমানদের জীবনহানি ছিল প্রতি মাসে একটি করে আর দুশমন পক্ষে অন্তত ১৫০ জন করে। দশ বছর পূর্ণ হল এবং মহানবী (স)-এর মিশন পরিপূর্ণ স্তরে উপনীত হল। তখন দশ লক্ষ বর্গমাইলের অধিক এলাকা তাঁর অধীনে আর লাখো মানুষ দৃঢ়চিত্তে তাঁর অনুগত ভৃত্যে পরিণত! এত বড় বিজয়, এত বিরাট ও শানদার কৃতিত্ব, এত বড় সাম্রাজ্য দখল, অথচ মানুষের খুন ঝরল এত অল্প! কোন যুদ্ধে পরাজয় নেই, কোথাও নেই পশ্চাদপদতা, কোথাও অলসতা নেই, সব জায়গায় সামনে চলা আর অগ্রাভিযান, সর্বত্র সাফল্য আর সাফল্য। অধিকন্তু দুশমনের মুকাবিলায় সংখ্যাশক্তি হামেশাই কম, আসবাব-উপকরণ সর্বদাই স্বল্প! অতঃপর বিজয়ের নিরবচ্ছিন্ন স্রোত এখানেই থেমে যাচ্ছে না কিংবা তাঁর পবিত্র জীবনের পরিধিতে সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে না, বরং সামনে অগ্রসর হয় এবং দুনিয়া থেকে তাঁর বিদায় নিয়ে যাবার পরও তা অব্যাহত থাকে। তাঁর জন্য জীবন উৎসর্গকারী ও তাঁর শিক্ষায় আলোকপ্রাপ্ত এবং তাঁর পদাংক অনুসরণকারীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলে, এমনকি ইসলামী রাজত্ব এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার অনেক রাষ্ট্রে বিস্তার লাভ করে। কোন সিপাহসালার, কোন বিজয়ী রাষ্ট্রবিদ, কোন কুশলী ব্যবস্থাপক, কোন সংস্কারক সারা জীবনের চেষ্টা-সাধনার ফল তার দশ ভাগের এক ভাগও পেশ করতে পেরেছেন কি? পেরেছেন রেখে যেতে এমন স্বল্পতম সময়ের মধ্যে চিরদিনের তরে স্থায়ী অনিত্য এমন কোন সুকীর্তি” (ইসলামের প্রতিরক্ষা কৌশল, পৃ. ৩৬২-৩)! আধুনিক কালের একজন অভিজ্ঞ সমরবিদ যখন আলেকজাণ্ডার, মুসলিনী, হিটলার প্রমুখ বিশ্বজয়ী সমরবিদদের সহিত তুলনা করে তার এরূপ সিদ্ধান্ত পেশ করেন, তখন ইহার চাইতে অতিরিক্ত কিছু বলার প্রয়োজন আছে বলিয়া মনে হয় না। ব্রিগেডিয়ার গুলযার আহমাদ এই সম্পর্কে বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) একা কিছু সংখ্যক লোককে এমন চমৎকার প্রশিক্ষণ দিলেন যে, এই ক্ষুদ্র দলটি বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তিরূপে আত্মপ্রকাশ করে। এই শক্তি দ্বারা সুদৃঢ় রাষ্ট্র দৈনিক দুই শত চুয়াত্তর বর্গমাইল হারে বিস্তৃতি লাভ করিতে করিতে দশ বৎসরে রুশ এলাকা বাদে গোটা ইউরোপের সমান আয়তন লাভ করে। এই সমরে মাত্র এক শত কুড়িজন ঈমানদার শহীদ হন। যুদ্ধ ইতিহাস পাঠে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় এবং নবী করীম (স)-এর সীরাত হইতেও উহা প্রতীয়মান হয় যে, সেনাবাহিনীর লোকজনের চারিত্রিক দৃঢ়তা ও যথার্থ প্রশিক্ষণ থাকিলে দুনিয়ার কোন শক্তি সেই বাহিনীকে পরাস্ত করিতে পারে না (দ্র. সায়‍্যারা ডাইজেষ্ট, লাহোর, রাসূল নম্বর, ২খ., পৃ. ২৩১)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 জিয়া : অমুসলিম নাগরিকদের জন্য বিশ্বনবীর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আশীর্বাদ

📄 জিয়া : অমুসলিম নাগরিকদের জন্য বিশ্বনবীর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আশীর্বাদ


আল-কুরআনে এই শব্দটি ব্যবহৃত হইয়াছে এইভাবে:
قَاتِلُوا الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَا بِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلَا يُحَرِّمُوْنَ مَا حَرَّمَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَلَا يَدِينُونَ دِينَ الْحَقِّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ حَتَّى يُعطوا الجُزْيَةَ عَنْ يَدٍ وَهُمْ صَاغِرُونَ.
"যাহাদের প্রতি কিতাব অবতীর্ণ হইয়াছে তাহাদের মধ্য যাহারা আল্লাহে ঈমান আনে না ও শেষ দিনেও নহে এবং আল্লাহ ও তাঁহার রাসূল যাহা হারাম করিয়াছেন তাহা হারাম গণ্য করে না— তাহাদের সহিত যুদ্ধ করিবে যে পর্যন্ত না তাহারা নত হইয়া স্বহস্তে জিযিয়া দেয়" (৯:২৯)।
তাফসীরকারগণের মতে, আরবী জাযা (جزی) শব্দ হইতে জিযিয়া শব্দের উৎপত্তি হইয়াছে। জাযা অর্থ বিনিময়। ইহা যিম্মীদের প্রাণ রক্ষার বিনিময় বলিয়া ইহার এইরূপ নামকরণ করা হইয়াছে (দ্র. যামাখশারী, আল-কাশশাফ, ১খ., পৃ. ২৫২; আল-বায়দাবী, ১খ., পৃ. ৩৩১; রূহুল মাআনী, ১০খ., পৃ. ৭৮)।
আল-খাওয়ারিষমী-এর মতে, ফারসী كزيت-এর আরবী রূপ হইল জিযিয়া। উহার মানে কর (দ্র. ইসলামী বিশ্বকোষ, ১১খ., পৃ. ৫৭৮)।
অমুসলিমদের নিকট হইতে সর্বপ্রথম এই জিযিয়া আদায়ের ঘটনা ঘটে হিজরী ৭ম সালে (৬২৮ খৃ.) যখন তায়মার অধিবাসিগণ ঐ কর দিতে সম্মত হয়। রাসূলুল্লাহ (স) তায়মার ইয়াহুদী গোত্র বনূ আদিয়াকে জিযিয়ার বিনিময়ে জান-মালের নিরাপত্তা দান করিয়াছিলেন (রাসূলুল্লাহ (স)-এর পত্রাবলী, সন্ধিচুক্তি, ফরমানসমূহ, পৃ. ১৯৮; তথ্যসূত্রঃ তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৭৯; ই'লামুস সাইলীন, পৃ. ৪৯; মাজমু'আতুল ওয়াছাইকিস সিয়াসিয়্যা, পৃ. ৪১, নং ১৯)।
জিয়া আদায়ের দ্বিতীয় ঘটনা ঘটে ৮-৯ হি./৬৩০ খৃ. সালে। বাহরায়নের শাসক মুনযির ইবন সাওয়ার প্রশ্নের উত্তরে রাসূলুল্লাহ (স) সেখানকার ইয়াহুদী ও অগ্নি উপাসকদের নিকট হইতে এক মুআফিরী মূল্যমানের এক দীনার হিসাবে জিয়া আদায়ের নির্দেশ দিয়াছিলেন (দ্র. রাসূলুল্লাহ (স)-এর পত্রাবলী, সন্ধিচুক্তি ও ফরমানসমূহ, পৃ. ৯৫; তথ্যসূত্র কিতাবুল খারাজ, পৃ. ১২১)।
নবম হিজরীতে রাসূলুল্লাহ (স) যখন তাবুক যাত্রার মনস্থ করেন, তখন হযরত কুদামা ও আবূ হুরায়রা (রা)-কে জিযিয়া বাবৎ সংগৃহীত অর্থ লইয়া আসার জন্য মুনযিরের কাছে পাঠানো হয়। ঐ সময় অপর একজন মুসলিম শাসককেও তাহার এলাকা হইতে জিযিয়ারস্বরূপ সংগৃহীত অর্থ আবু হুরায়রার মাধ্যমে পাঠাইয়া দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। মুনযির সেইমতে অর্থ প্রেরণ করিয়াছিলেন এবং তাবুক অভিযানের ব্যয় নির্বাহে এই অর্থ ব্যয়িত হয় (দ্র. রাসূলুল্লাহ (স)-এর পত্রাবলী, সন্ধিচুক্তি ও ফরমানসমূহ, পৃ. ৯৬; বালাগে মুবীন, পৃ. ১৭৮)।
নাজরানের খৃস্টানদের উদ্দেশ্যে লিখিত ফরমানে জিযিয়ার পরিমাণ ও জিযয়াদাতাদের অধিকার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোকপাত করা হইয়াছে। উহা ইসলামের ইতিহাসে জিযিয়ার তৃতীয় ঘটনা (বিস্তারিত বিবরণের জন্য দ্র. রাসূলুল্লাহ (স)-এর পত্রাবলী, পৃ. ১৮৮-৯; মাজমূ'আতুল ওয়াছাইক, পৃ. ১১১-৩)।
ইসলামী রাষ্ট্রের অমুসলিম নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা বিধান জিযিয়া আদায়ের অন্যতম শর্ত। রাষ্ট্র এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ বা অপারগ হইলে জিযিয়া আদায়ের উহার কোনই অধিকার থাকে না। ইসলামী রাষ্ট্র কঠোরভাবে সেই দায়িত্ব পালন করিত। কখনও এই ব্যাপারে ব্যর্থ হইলে তাহারা কি করিতেন ইহার জবাব আরনল্ড নামক খৃস্টান লেখকের কলম হইতেই আমরা জানিতে :
How rwigidlythe Mulsims observed the condition of this ability to afford protection os well evidenced by an on cidenb in the Reign at thesecond cabiph. The Emperor Heraclius had raiced on enormous army with which to concentrate all their energien on the impending en couhten the Arab general Abn Ubaida accordingly, Wrole tothe governors as sthe congusred citees at Syria, or derring them to pay badk all Sigywh, that had been collected from the citis and wrote to the people saming "the agreement between us was that we should prot protcet you, and as this is not now onour power, we refurn you all that we took" in accordance with this order enormous sums were paid back out of the stali treasury, and this christian called down blessing on the heads of the Muslims, saying May god give you rule over us again and make you gieforious ouer the Roman had it been the, they would not have guven es anything but would have taken all that remained with us, Arnold, Preacling of Islam PP, Go-61
সারকথা, মুসলমানগণ এই দায়িত্ব যে কি কঠোরভাবে পালন করিতেন তাহার দৃষ্টান্ত হইতেছে দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমারের আমলে সিরিয়ার একটি বিজিত এলাকায় রোমক সম্রাট বিরাট বাহিনী লইয়া আক্রমণ চালাইলে মুসলমানগণ যখন উহার প্রতিরোধকল্পে ব্যস্ত তখন সেনাপতি আবু উবায়দা সিরিয়ার বিজিত এলাকার ঐ শহরগুলির শাসকগণকে আদায়কৃত জিয়া এই বলিয়া ফেরত দিতে নির্দেশ দিলেন, আমরা যেহেতু তোমাদের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হইয়াছি, তাই তোমাদের প্রদত্ত কর তোমরা ফিরাইয়া লও। ইহাতে বিমোহিত ও আশ্বর্যান্বিত হইয়া সেখানকার খৃস্টান প্রজাগণ মুসলমান শাসকদিগকে আশীর্বাদ জ্ঞাপন করিয়া বলে, আল্লাহ তোমাদিগকে আবার আমাদের উপর বিজয়ী করুন। রোমক সম্রাট তো সর্বদাই আমাদের নিকট হইতে কর আদায় করিয়াছেন, কোন দিন উহা আমাদের কাছে ফিরাইয়া দেন নাই, বরং আমাদের সর্বস্ব কাড়িয়া লইয়াছন (দ্র. প্রীচিং অব ইসলাম, পৃ. ৬০-৬১)।
মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের জন্য এই ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতিরক্ষা কৌশল। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, অন্য ক্ষেত্রে তো বটেই, এমনকি সমরনীতি ও প্রতিরক্ষা কৌশলেও তিনি ছিলেন রহমাতুল্লিল আলামীন তথা গোটা বিশ্বের জন্য রহমতস্বরূপ।

টিকাঃ
গ্রন্থপঞ্জী : বরাত নিবন্ধ গর্ভে প্রদত্ত হইয়াছে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সারিয়‍্যা উবায়দা ইবনুল হারিছ (রা)

📄 সারিয়‍্যা উবায়দা ইবনুল হারিছ (রা)


মক্কার কুরায়শগণ মদীনার সীমান্ত অঞ্চলে একটি বাহিনী প্রেরণ করিয়াছে, এই সংবাদ পাইয়া রাসূলুল্লাহ (স) আপন পিতৃব্য পুত্র হযরত উবায়দা ইবনুল হারিছের নেতৃত্বে ষাটজন অশ্বরোহী মুহাজির সাহাবীর একটি দলকে রাবিগ অভিমুখে প্রেরণ করেন। মতান্তরে ঐ সাহাবীগণের সংখ্যা ছিল আশিজন। ইহাতে কোন আনসার সাহাবী শামিল ছিলেন না। রাবিগ উপত্যকার ছানিয়াতুল মাররা নামক স্থানে একটি জলাশয়ের নিকট উপনীত হইলে তাহারা সেখানে বিপুল সংখ্যক কুরায়শের সমাবেশ লক্ষ্য করেন। সংখ্যায় তাহারা ছিল দুই শতজন। ঐ সমাবেশে আবূ সুফিয়ানও ছিল। ইবন ইসহাক-এর ভাষ্যমতে, ঐ কুরায়শ দলের নেতৃত্বে ছিল আৰী জাহ্ পুত্র ইকরিমা। তবে ইবন হিশামের মতে ঐ কুরায়শ দলের নেতৃত্বে ছিল-মিকরায ইবন হাম্স। উভয় পক্ষ মুখামুখি হইলেও সেখানে কোন যুদ্ধ হয় নাই। তবে হযরত সা'দ ইব্‌ন আবী ওয়াক্কাস (রা) কাফির বাহিনীর দিকে একটি তীর ছুড়িয়াছিলেন। ইসলামের ইতিহাসে ইহাই ছিল কাফিরদের প্রতি নিক্ষিপ্ত সর্বপ্রথম তীর।
ইব্‌ন হিশাম ঐ সারিয়াটি রাসুলুল্লাহ (স)-এর ওয়াদ্বান অভিযানের পরবর্তী সময়ে প্রেরিত হইয়াছিল বলিয়া উল্লেখ করিলেও আল্লামা শিবলী নু’মানী উহা তাঁহার উক্ত অভিযানের পূর্ববর্তী কালের ঘটনা বলিয়া সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করিয়াছেন (দ্র. সীরাতুন্বী, ইব্‌ন হিশাম, ২খ., পৃ. ২৬২; সীরাতুন্বী, শিবলী নু’মানী (উর্দু), ১ম., পৃ. ৩১০)।
সফিউর রহমান মুবারকপুরী ঐ সারিয়া, শাওওয়াল ১‍ম হিজরী, এপ্রিল ৬২৩ খৃ. অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা সুনিশ্চিতভাবে করিয়াছেন (দ্র. আর-রাহীকুল মাখতুম (আরবী), পৃ. ২১৯ সম স. ১৯৮০ খৃ.)।
মাওলানা দানাপুরীও এই অভিযানের সময়ের কথা উল্লেখ করিয়াছেন এইভাবে : সারিয়া হামযার পর ১‍ম হিজরীর শাওওয়াল মাসে হিজরতের অষ্টম মাসে নবী করীম (স) ৬০, মতান্তরে ৩০ জন অশ্বারোহী মুহাজির সাহাবীকে হযরত উবায়দা ইবনুল হারিসের নেতৃত্বে রাবিগ প্রেরণ করেন। এইজন্য যে পতাকা তৈয়ার করা হয় উহা শ্বেতবর্ণের ছিল এবং পতাকা বহনকারী ছিলেন মিসতাহ ইব্‌ন উছাছা (রা.) (দ্র. আসাচ্চুস্-সিয়ার, পৃ. ৮০)।
মিকদাদ ইব্‌ন আমর বাহরানী এবং উতবা ইব্‌ন গাযওয়ান আল-মাযিনী নামক দুই ব্যক্তি মুশরিক শিবির হইতে পলায়ন করিয়া এই সময় মুসলমান শিবিরে চলিয়া আসেন। ইব্‌ন ইসহাক বলেন, ইহারা দুইজন মুসলমানই ছিলেন। তাঁহারা কেবল রাসুলুল্লাহ (স)-এর সহিত মিলিত হইবার সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন (দ্র. সীরাতুন্বী, ইব্‌ন হিশাম, ২খ., পৃ. ২৬২; ইফা; ইব্‌ন সা’দ, তাবাকাত, ১খ., পৃ.৭)।
ইব্‌ন ইসহাক বলেন, সা’দ ইব্‌ন আবী ওয়াক্কাস (রা) ও তদীয় তীর নিক্ষেপ সম্পর্কে একটি কবিতা আবৃত্তি করেন বলিয়া কথিত আছে। কবিতাটি ছিল নিম্নরূপ :
الآهل أتى رسول الله انني + حمیت صحابتی لصدور نبلی اذوذ بها اوائلهم ذيادا + بكل حزونة وبكل سهل فما يعتد رام في عدو + بسهم يا رسول الله قبلی وذلك أن دينك دين صدق + وذو حق اتيت به وعدل ينجى المؤمنون به ويجزى + به الكفار عند مقام مهد فمهلا قد غونت فلا تعيني + غوى الحي ويحك يا ابن جهل
“রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট এই সংবাদ পৌঁছিয়াছে যে, আমি আমার সঙ্গীগণকে আমার তীর দ্বারা রক্ষা করিয়াছিলাম। আমি তাহাদের প্রত্যেক পার্বত্যভূমি ও সমভূমিতে তাহাদের শত্রুদের অবরোধদিগকে প্রতিহত করিতেছি।”
"ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমার পূর্বে আর কেহই শত্রুবাহিনীর প্রতি তীর নিক্ষেপ করে নাই। বস্তুত আপনার আনীত দীন সত্য, ন্যায় ও সুবিচারের দীন। ইহা দ্বারা মুমিনদিগকে পরিত্রাণ দেওয়া হইবে এবং কাফিরদিগকে ইহার (অগ্রাহ্য করার) কারণে স্থায়ীভাবে লাঞ্ছিত করা হইবে।
"হে জাহল (মূর্খ) নন্দন! তোমার জন্য পরিতাপ, তুমি তো বিপথগামী হইয়াছ। এইজন্য আমার প্রতি দোষারোপ করিবে না। তুমি কিছু দিন অপেক্ষা কর (এবং দেখ, তোমার জন্য কী পরিণতি অপেক্ষা করিতেছে)" (দ্র. ইবন হাজার, আল-ইসাবা, ২খ., পৃ. ৩৪; ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরা, ২খ., পৃ. ২৩৪; তাবাকাত, ৩খ., পৃ. ১৪০; উসুদুল গাবা, ২খ., পৃ. ২৯১)।
ইবন হিশাম (র) হযরত সা'দ (রা) ইব্‌ন আবী ওয়াক্কাসের বলিয়া কথিত উপরোল্লিখিত কবিতা প্রকৃতপক্ষে তাঁহার নহে বলিয়া মন্তব্য উদ্ধৃত করিয়াছেন।
ইবন ইসহাক এই প্রসঙ্গে আরও বলেন, আমার নিকট এই মর্মে তথ্য পৌঁছিয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) মুসলমানদের মধ্যে সর্বপ্রথম যাঁহার হস্তে পতাকা তুলিয়া দিয়াছিলেন তিনি ছিলেন এই উবায়দা ইব্‌ন হারিছ (রা)।
হযরত উবায়দা ইবনুল হারিছ (রা) পরিচালিত অভিযানটি সারিয়‍্যা রাবিগ নামেও পরিচিত। তবে এই অভিযানে উভয় সৈন্যদল কোনও প্রকার সংঘর্ষ ছাড়াই নিজ নিজ অবস্থানে ফিরিয়া গিয়াছিল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00