📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 জিহাদের বিধান

📄 জিহাদের বিধান


বিধি: আল্লাহ্ দীন আল্লাহর জমীনে প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনে কাফিরদের বিরুদ্ধে জিহাদ অর্থাৎ সশস্ত্র যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া ফরয (বাধ্যতামূলক)। পবিত্র কুরআনের একাধিক আয়াত ও বিভিন্ন হাদীছ দ্বারা বিষয়টি প্রমাণিত। যেমন:
"তোমাদের উপর যুদ্ধ ফরয করা হইয়ছে” (২: ২১৬)। كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ.

فَانْ قَاتَلُوكُمْ فَاقْتُلُوهُمْ. "তাহারা (কাফিররা) তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হইলে তোমরাও তাহাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হও” (২: ১৯১)।

আনাস (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: الجهاد ماض منذ بعثني الله الى ان يقاتل اخر امتى الدجال لا يبطله جور جائر ولا عدل عادل. "আমার উম্মতের শেষাংশ দাজ্জালের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা পর্যন্ত জিহাদ অব্যাহত থাকিবে। স্বৈরাচারীর স্বৈরাচার এবং ন্যায়পরায়ণের ন্যায়পরায়ণতা উহা বাতিল করিতে পারিবে না” (আবূ দাউদ, কিতাবুল জিহাদ, বাব ৩৩, নং ২৫৩২; হিদায়া, ২খ., পৃ. ৬৫৮, টীকা নং ৯-১০; আল-বাহরুর রাইক, ৬খ., পৃ. ১১৯, ১২০)।

বিধি: কেবল রাষ্ট্রপ্রধানই কোন দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করিতে পারিবেন। মহানবী (স) ও খুলাফায়ে রাশেদীনের শাসনামলে অনুষ্ঠিত সবগুলি যুদ্ধই প্রধান নির্বাহীর নির্দেশে পরিচালিত হইয়াছিল এবং তিনিই সরাসরি প্রধান সেনাপতি নিয়োগ করিয়াছেন। রাষ্ট্রপ্রধান ন্যায়পরায়ণ বা স্বৈরাচারী যাহাই হউন, তিনি যুদ্ধের ঘোষণা দিলে তাহাতে যোগদান করা মুসলমানদের কর্তব্য। আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: الجهاد واجب عليكم مع كل امير برا كان او فاجرا. "আমীর (শাসক) সৎলোক বা পাপাচারী যাহাই হউক তাহার সহিত যুদ্ধে যোগদান করা তোমাদের জন্য অবশ্য কর্তব্য" (আবূ দাউদ, কিতাবুল জিহাদ, বাব ফিল গাযবি মাআ আইম্মাতিল জাওরি, নং ২৫৩৩)।

বিধি: স্বাভাবিক অবস্থায় অর্থাৎ ইসলামী রাষ্ট্র ও মুসলিম উম্মাহ কাফিরদের আক্রমণ ও হুমকির সম্মুখীন না হইলে এবং রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারের পক্ষ হইতে জাতীয় দুর্যোগ ও 'জরুরী অবস্থা' ঘোষিত না হইলে জিহাদ 'ফরযে কিফায়া' অর্থাৎ মুসলমাদের একটি অংশ জিহাদে নিয়োজিত থাকিলে সকলের পক্ষ হইতে এই ফরয আদায় হইয়া যাইবে। আর কেহই জিহাদে নিয়োজিত না হইলে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ ফরয পালন না করার কারণে গুনাহগার হইবে (হিদায়া, ২খ., পৃ. ৫৫৮-৫৫৯)।

মু'মিনদের মধ্যে যাহারা অক্ষম নহে অথচ যুদ্ধে যোগদান করে না এবং যাহারা আল্লাহ্র পথে স্বীয় ধন-প্রাণ দ্বারা জিহাদ করে তাহারা পরস্পর মর্যাদায় সমান নহে। আল্লাহ তা'আলা বলেন : فَضَّلَ اللهُ الْمُجَاهِدِينَ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ عَلَى الْقَاعِدِينَ دَرَجَةً وَكُلاً وَعَدَ اللهُ الْحُسْنَى وَفَضَّلَ اللَّهُ الْمُجَاهِدِيْنَ عَلَى الْقُعَدِيْنَ أَجْرًا عَظِيمًا. "যাহারা স্বীয় ধন-প্রাণ দ্বারা জিহাদ করে আল্লাহ তাহাদিগকে, যাহারা ঘরে বসিয়া থাকে তাহাদের উপর মর্যাদা দিয়াছেন; আল্লাহ্ সকলকেই কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়াছেন। যাহারা ঘরে বসিয়া থাকে তাহাদের উপর যাহারা জিহাদ করে তাহাদিগকে আল্লাহ্ মহাপুরস্কারের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়াছেন” (৪:৯৫)।

এই আয়াতে আল্লাহ তা'আলা জিহাদে গমনকারী ও জিহাদ হইতে পশ্চাতে থাকিয়া যাওয়া উভয় শ্রেণীর জন্য উত্তম বিনিময়ের প্রতিশ্রুতি দিয়াছেন। জিহাদ সর্বাবস্থায় 'ফরযে আইন' হইলে পশ্চাতে থাকিয়া যাওয়াদের জন্য তিনি উত্তম বিনিময়ের প্রতিশ্রুতি দিতেন না। কেননা, তখন জিহাদ না করিয়া ঘরে বসিয়া থাকা হারাম হইত।

ইহা ছাড়া জিহাদ ফরয হওয়ার মূল লক্ষ্য হইল ইসলামের দাওয়াত দান করা, আল্লাহর সত্য দীনকে সমুন্নত করা, কাফিরদের পরাভূত করিয়া কুফরীর অনিষ্ট হইতে আল্লাহর বান্দাদের সৎপথ প্রদর্শন করা। এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য সর্বাবস্থায় সকলের সম্মিলিত প্রয়াস জরুরী নহে, বরং কিছু লোকের প্রচেষ্টা দ্বারা এই লক্ষ্য অর্জিত হইতে পারে। মুসলমানদের একাংশ দ্বারা এই লক্ষ্য অর্জিত হইলে অন্য সকলে ফরযের দায় হইতে মুক্ত হইবে (বাদাইউস্ সানাই, ৬খ., পৃ. ৫৭-৫৮; হিদায়া, ২খ., পৃ. ৫৫৮-৫৫৯; আল-বাহরুর রাইক, ৫খ., পৃ. ১২০; ফাতহুল বারী, ৬খ., পৃ. ৪৫)।

জিহাদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (স)-এর কর্মধারাও উহা 'ফরযে কিফায়া' হওয়ার প্রমাণ বহন করে। কেননা তিনি প্রায়শ কোন সাহাবীর (রা) সেনা পরিচালনায় ছোট ছোট যোদ্ধাদল (সারিয়‍্যা) প্রেরণ করিতেন এবং নিজে মদীনায় অবস্থান করিতেন। জিহাদ সর্বাবস্থায় 'ফরযে আইন' হইলে তিনি নিজেও কোন জিহাদ অভিযানে অংশগ্রহণ হইতে বিরত থাকিতেন না এবং অন্য কাহাকেও কোন অবস্থায় জিহাদে না যাওয়ার অনুমতি প্রদান করিতেন না (বাদাই', ৬খ., পৃ. ৬৮; আল-বাহরুর রাইক, ৫খ., পৃ. ১২০; এবং তাফ্সীর গ্রন্থসমূহে সংশ্লিষ্ট আয়াতের তাফসীর দ্র.)।

জিহাদ ফরযে কিফায়া হওয়ার কারণে ইমাম (ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান)-এর অন্যতম কর্তব্য হইবে রাষ্ট্র ও জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করিবার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংখ্যক রক্ষ বাহিনী নিয়োগ করা। সীমান্তরক্ষীরা আক্রান্ত হইলে এবং শত্রু কাফির বাহিনীর আক্রমণ প্রতিরোধে দুর্বল বা আপরগ হইলে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মুসলিম জনতার জন্য নৈকট্যের ক্রম অনুসারে সীমান্তরক্ষীদের সাহায্যে আগাইয়া আসা এবং অস্ত্র, সমরোপকরণ ও সম্পদ দ্বারা তাহাদের সহায়তা প্রদান করা ফরয (বাদাই', ৬খ., পৃ. ৫৮; আল-বাহরুর রাইক, ৫খ., পৃ. ১২০; আলমগীরী, ২খ., পৃ. ১৮৮)।

বিধি: যুদ্ধ সংক্রান্ত জনঘোষণা অর্থাৎ শত্রুর আক্রমণের কারণে জাতীয় দুর্যোগ ও রাষ্ট্রীয় 'জরুরী অবস্থা' ঘোষিত হইলে প্রত্যেক সক্ষম-সামর্থ্যবান মুসলমানের প্রতি জিহাদ 'ফরযে আইন' হইয়া যায়। 'জনঘোষণা' (নাফীর)-এর অর্থ কোন জনপদবাসীদের এই সংবাদ অবগত হওয়া যে, ইসলাম ও ইসলামের বাণী ধ্বংস করিবার উদ্দেশ্যে শত্রু তোমাদের জীবন, সন্তান-সন্তুতি পরিবার ও সম্পদ হরণে আসিয়া পড়িয়াছে (আলমগীরী, ২খ., পৃ. ১৮৮)। সুতরাং সাধারণ জনঘোষণার ক্ষেত্রে এবং কোন মুসলিম জনপদ শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিম সমাজের পত্যেক ব্যক্তির উপর জিহাদ ফরযে আইন হইয়া যায় এবং এই কারণে এইরূপ পরিস্থিতিতে সন্তান পিতা-মাতার অনুমতি ব্যতীত, গোলাম মনিবের অনুমতি ব্যতীত, স্ত্রী স্বামীর অনুমতি ব্যতীত এবং দেনাদার পাওনাদারের অনুমিত ব্যতীত যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিবে।

তবে এই ক্ষেত্রেও একই মুহূর্তে বিশ্ব মুসলিমের জন্য জিহাদে যোগদান ফরযে আইন হইবে না, বরং প্রথমে আক্রান্ত অঞ্চলের সন্নিকটবর্তীদের জন্য ফরযে আইন হইবে এবং তাহারা শত্রু প্রতিরোধে সক্ষম হইলে অন্যান্য দূরবর্তীদের জন্য ফরযে কিফায়া থাকিয়া যাইবে। আক্রান্ত জনপদের সন্নিহিত অঞ্চলের লোকেরা শত্রু প্রতিরোধে অসমর্থ ও দুর্বল হইলে কিংবা কর্তব্য পালনে গড়িমসি করিলে (কিংবা আক্রমণ প্রচণ্ড ও ব্যাপক হইলে) ক্রমান্বয়ে নিকটবর্তীদের জন্য ফরযে আইন হওয়ার হুকুম প্রযোজ্য হইবে; অবশেষ পূর্ব হইতে পশ্চিম পর্যন্ত সমগ্র বিশ্ব মুসলিমের জন্য ফরযে আইন হইয়া যাইবে।

প্রমাণ : فَانْفِرُوا ثُبَات او انْفِرُوا جَمِيعًا “তোমরা অভিযানে বাহির হইয়া পড় দলে দলে বিভক্ত হইয়া অথবা বাহির হও সম্মিলিতরূপে” (৪ঃ ৭১)।

যেহেতু জনঘোষণার পূর্বেও জিহাদ ফরয হওয়ার বিধান প্রত্যেকের জন্য সাব্যস্ত ছিল এবং 'কিফায়া'রূপে একাংশের কর্তব্য সম্পাদন দ্বারা অন্যদের দায়মুক্তির ব্যবস্থা ছিল, আর ব্যাপক জনঘোষণা ও জাতীয় দুর্যোগ মুহূর্তে সকলের অংশগ্রহণ ব্যতীত এই কর্তব্য সম্পাদিত হইতে পারে না, সুতরাং এই অবস্থায় সালাত ও সিয়ামের ন্যায় প্রত্যেকের জন্য 'ফরযে আইন' (ব্যক্তি ও সামষ্টিক পর্যায়ে আবশ্যিক) সাব্যস্ত হইবে এবং স্বাধীন ও দাস এবং নারী ও পুরুষ নির্বিশেষে সকলকে এই দায়িত্ব পালন করিতে হইবে (হিদায়া, ২খ., পৃ. ৫৫৯; ফাতহুল বারী, ৬খ., পৃ. ৪৪; বাদাই, ৬খ., পৃ. ৫৮; আল-বাহরুর রাইক, ৫খ., পৃ. ১২২-১২৩; রাদ্দুল মুহতার, ৬খ., পৃ. ২০৫; ফাতাওয়া আলমগীরী, ২খ., পৃ. ১৮৮-১৮৯)।

বিধি: প্রত্যেক বালেগ মুসলমানের জন্য নিজের জান ও মাল দ্বারা জিহাদ করা শরী'আতের সাধারণ বিধান। এই ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা গ্রহণযোগ্য ও বৈধ। সুতরাং কেহ নিজে যুদ্ধে না গেলে অথবা দৈহিক দুর্বলতা ও স্বাস্থ্যগত কারণে তাহাতে অপারগ হইলে সওয়াবের উদ্দেশ্যে কোন মুজাহিদ ও যোদ্ধাকে অর্থ সম্পদ ও সমরোপকরণ দ্বারা সহায়তা করা বৈধ। আর্থিকভাবে অসচ্ছল ব্যক্তির জন্য অথবা আর্থিক সচ্ছলতা সত্তেও অন্যকে জিহাদের সাওয়াবে অংশপ্রাপ্তির সুযোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে এইরূপ সাহায্য-সহযোগিতা গ্রহণ করা বৈধ।

বিধিঃ (১) জিহাদ দৈহিক বিচারে সামর্থ্যবান ব্যক্তির উপর ফরয। কেননা, জিহাদ করার জন্য দৈহিক শক্তি এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সুস্থতা অপরিহার্য। সুতরাং অন্ধ, খঞ্জ, বিকলাঙ্গ, পক্ষাঘাতগ্রস্ত, হাত-পা কর্তিত, অতি বৃদ্ধ, উন্মাদ, কঠিন দূরারোগ্য ও অতি দুর্বলের উপর জিহাদ ফরয নয়। (২) সমরোপকরণ ও যুদ্ধব্যয় নির্বাহে অপারগ সুস্থ-সবল ব্যক্তির উপরও জিহাদ ফরয নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন: لَيْسَ عَلَى الْأَعْمَى حَرَجٌ وَلَا عَلَى الْأَعْرَجِ حَرَجٌ وَلَا عَلَى الْمَرِيضِ حَرَجٌ. "অন্ধের জন্য কোন অপরাধ নাই, খঞ্জ-বিকলাঙ্গের জন্য নাই কোন অপরাধ এবং অসুস্থের জন্য নাই কোন অপরাধ” (৪৮ : ১৭)。

لَيْسَ عَلَى الضُّعَفَاءِ وَلَا عَلَى الْمَرْضَى وَلَا عَلَى الَّذِينَ لَا يَجِدُونَ مَا يُنْفِقُونَ حَرَجٌ. "যাহারা দুর্বল, যাহারা পীড়িত এবং যাহারা অর্থ সাহায্যে অসমর্থ, তাহাদের কোন অপরাধ নাই, যদি আল্লাহ্ ও রাসূলের প্রতি তাহাদের অবিমিশ্র অনুরাগ থাকে। যাহারা সৎকর্মপরায়ণ তাহাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের কোন হেতু নাই, আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়াল"। (৯ : ৯১)।

(৩) অপ্রাপ্ত বয়স্ক নাবালেগের উপর জিহাদ ফরয নয়। কেননা নাবালেগের দেহ যুদ্ধের ধকল সহ্য করিবার উপযোগী নয়। মূলত অপ্রাপ্ত বয়স্করা শরী'আতের বিধানের অধীন (মুকাল্লাফ) নয়। বুখারী-মুসলিমে আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা) হইতে বর্ণিত হাদীছে তিনি বলেন, উহুদ যুদ্ধের প্রস্তুতিকালে যোদ্ধা তালিকাভুক্তির জন্য আমাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সামনে পেশ করা হইয়াছিল। তখন আমার বয়স ছিল চৌদ্দ বৎসর। তিনি আমাকে যুদ্ধে অংশগ্রহণের অনুমতি দেন নাই (ফাতহুল কাদীর শারহুল হিদায়া, ৫খ., পৃ. ১৯৪)।

(৪) নারীর উপর জিহাদ ফরয নয়। কেননা তাহার দৈহিক গঠন যুদ্ধের উপযোগী নয়। তবে তাহারা স্বেচ্ছায় সহাযোগী শক্তি হিসাবে জিহাদের যোগদান করিতে পারে।

বিধি: জরুরী পরিস্থিতিতে (জিহাদ ফরযে 'আইনে হওয়ার অবস্থায়) উপরে উল্লিখিত ব্যক্তিগণ (সন্তান পিতার অনুমতি ব্যতীত, স্ত্রী স্বামীর অনুমতি ব্যতীত, গোলাম মনিবের অনুমতি ব্যতীত, দেনাদার পাওনাদারের অনুমতি ব্যতীত এবং অন্যান্যরা) সকলে জিহাদে অংশগ্রহণ করিবে এবং সাধ্যমত প্রত্যক্ষ যুদ্ধে যোগদান করিবে, প্রয়োজনে নারীরা অস্ত্র হাতে তুলিয়া নিবে। বিভিন্ন হাদীছে উহুদ, খন্দক, খায়বার ও অন্যান্য জিহাদে নারীদের অংশগ্রহণের তথ্য বর্ণিত হইয়াছে।

মুসলিম বাহিনী রাষ্ট্রপ্রধানের নির্দেশ বা অনুমোদনক্রমে (জবাবী আক্রমণের ক্ষেত্র ব্যতীত অগ্রগণ্য হইয়া) কোন অমুসলিম দেশ (দারুল হারব) বা কোন কাফির গোষ্ঠীকে আক্রমণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিলে বা তাহাদের কোন দুর্গ অবরোধ করিলে পর্যায়ক্রমে তিনটি কাজ করণীয় হইবে। (১) যদি ইতিপূর্বে তাহাদের নিকট ইসলামের দাওয়াত না পৌঁছিয়া থাকে তবে প্রথমে আবশ্যিকরূপে তাহাদিগকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানাইতে হইবে। তাহাদের এই মর্মে অবহিত করিতে হইবে যে, ইসলাম গ্রহণ করিলে তাহারা মুসলমানদের সমপর্যায়ের এবং সার্বিক ক্ষেত্রে সমান অধিকার সম্পন্ন হইয়া যাইবে। তাহারা এই আহ্বানে সাড়া দিয়া ইসলাম গ্রহণে সম্মত হইলে আক্রমণ করা হইতে বিরত থাকিতে হইবে।

তাহারা ইসলাম গ্রহণের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করিলে দ্বিতীয় পর্যায়ে তাহাদিগকে জিয্যা (সার্বিক নিরাপত্তামূলক কর) প্রদানে স্বীকৃত হইয়া ইসলামী রাষ্ট্রের আনুগত্য স্বীকার করিয়া লওয়ার আহ্বান জানাইতে হইবে। তাহারা এই আহ্বানে সাড়া দিয়া জিয্যা প্রদানে সম্মত হইলে তাহাদেরকে আক্রমণ করা হইতে বিরত থাকিতে হইবে। এই অবস্থায় তাহারা মুসলিম নাগরিকদের সমতুল্য রাষ্ট্রীয় নাগরিক অধিকার লাভ করিবে এবং তাহাদের নিজস্ব ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও রীতি-নীতি পালনে স্বাধীনতা ভোগ করিবে।

জিয্যা প্রদান ও আনুগত্য স্বীকারের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করিলে তৃতীয় পর্যায়ে 'আল্লাহ্' সাহায্য প্রার্থনা করিয়া তাহাদের উপর পূর্ণাঙ্গ আক্রমণ পরিচালনা করিতে হইবে।

বিধি: শত্রুপক্ষকে ভীত-সন্ত্রস্ত করিয়া পরাজিত করিবার লক্ষ্যে সব ধরনের মারণাস্ত্র ব্যবহার করা যাইবে। একান্ত অপরিহার্য এবং ভয়াবহ পরিস্থিতিতে তাহাদের বাড়িঘরে ও ক্ষেত-খামারে আগুন ধরাইয়া পোড়াইয়া দেওয়া যাইবে। পানিতে ডুবাইয়া দেওয়া যাইবে।

রাসূলুল্লাহ (স) তাইফ অবরোধকালে শত্রুদের বিরুদ্ধে (সমকালীন সর্বাধুনিক যুদ্ধাস্ত্র) কামান দ্বারা পাথরের গোলা নিক্ষেপ করাইয়াছিলেন। বনূ নযীর যুদ্ধে তাহাদের মনোবল ভাংগিয়া দিয়া তাহাদিগকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করিবার জন্য তাহাদের অতি প্রিয় বুওয়ায়রা নামক বাগানটিতে আগুন ধরাইয়া দেওয়া হইয়াছিল। ইহার উদ্দেশ্য হইবে জান-মাল ও সম্পদ নষ্ট করা নয়, বরং তাহাদিগকে হীনবল করা, তাহাদের শক্তি ও প্রতিপত্তির উৎস বিনাশ করা এবং তাহাদিগকে ভীত-সন্ত্রস্ত করিয়া ও তাহাদের দর্প চূর্ণ করিয়া তাহাদের পরজয় অথবা আত্মসমর্পণে বাধ্য করা (হিদায়া, ২খ., পৃ. ৫৬০-৫৬১; ফাতহুল কাদীর, ৫খ., পৃ. ১৯৭; বুখারী, কিতাবুল জিহাদ, হাদীছ নং ৩০২০; ফাতহুল বারী, ৬খ., পৃ. ১৭৯; আল-বাহরুর রাইক, ৫খ., পৃ. ১২৮; ফাতওয়া আলামগীরী, ২খ., পৃ. ১৯৩; বাদাই'উস সানাই', ৬খ., পৃ. ৬২; রাদ্দুল মুত্তার, ৬খ., ২০৯-২১০)। আল্লাহ তা'আলা বলেন: مَا قَطَعْتُمْ مِّنْ لِيْنَةٍ أَوْ تَرَكْتُمُوهَا قَائِمَةً عَلَى أُصُولِهَا فَبِإِذْنِ اللَّهِ وَلِيُخْزِي الْفَاسِقِينَ. "তোমরা যে খেজুর বৃক্ষগুলি কর্তন করিয়াছ অথবা যেগুলিকে উহাদের কাণ্ডের উপর স্থির রাখিয়া দিয়াছ তাহা আল্লাহ্ অনুমতিক্রমেই এবং পাপাচারীদিগকে লাঞ্ছিত করিবার উদ্দেশ্যে” (৫৯:৫)।

وَقَذَفَ فِي قُلُوبِهِمُ الرُّعْبَ يُخْرِبُونَ بُيُوتَهُمْ بِأَيْدِيهِمْ وَأَيْدِي الْمُؤْمِنِينَ. "উহা (শান্তি) তাহাদের অন্তরে ত্রাসের সঞ্চার করিল। তাহারা তাহাদের বাড়িঘর নিজ হাতে ও মুমিনদের হাতে ধ্বংস করিল" (৫৯: ২)।

বিধি : কাফির বাহিনীর সহিত কিংবা তাহাদের দুর্গে (ও সেনানিবাসে) কোন মুসলমান ব্যবসায়ী, পর্যটক বা মুজাহিদ কারাবন্দী থাকিলে এবং আক্রমণে তাহাদের নিহত হওয়ার আশংকা থাকিলেও যুদ্ধের প্রয়োজনে আক্রমণ করা যাইবে। তদ্রূপ কাফির পক্ষ মুসলিম শিশু, বালিকা অথবা মুসলিম ব্যবসায়ী বন্দীদিগকে তাহাদের সেনাসজ্জায় মানবঢালরূপে ব্যবহার করিলেও তাহাদিগকে আক্রমণ করা যাইবে। এক্ষেত্রে কোন মুসলিম নিহত হইলে উহার বিপরীতে দিয়াত, কাফ্ফারা (রক্তপণ ইত্যাদি) প্রদান করিতে হইবে না। কেননা জিহাদ একটি ফরয কর্তব্য এবং উহা পালন করিতে গিয়া ক্ষতিগ্রস্ত জান-মালের নিরাপত্তা ও ক্ষতিপূরণ অপরিহার্য থাকে না। কেননা শরী'আতের বিধান সাধ্য অনুসারে প্রযোজ্য হয়। শারী'আর অন্যতম মূলনীতি "বৃহত্তর স্বার্থে ক্ষুদ্রতর ক্ষতি স্বীকার করা ও ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ করা” উক্তরূপ বৈধতার প্রমাণ বহন করে (দ্র. হিদায়া, ২খ., পৃ. ৫৬১; বাদাই'উস সানাই', ৬খ., পৃ. ৬৩; ফাতহুল কাদীর, ৫খ., পৃ. ১৯৯; আল-বাহরুর রাইক, ৫খ., পৃ. ১২৮-১২৯; রাদ্দুল মুহতার, ৬খ., পৃ. ২১০; ফাতাওয়া 'আলামগীরী, ২খ., পৃ. ১৯৪)।

বিধি : যুদ্ধ চলাকালে কাফির শত্রুপক্ষের নারী, শিশু, অতিবৃদ্ধ, চলৎশক্তি রহিত, বিকলাংগ ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত, অন্ধ, ডান হাত কর্তিত, ডান হাত ও বাম পা বা বাম হাত ও ডান পা কর্তিত, উন্মাদ, ধর্মযাজক, সংসারত্যাগী ও গীর্জা-মন্দিরে আত্ম-অবরুদ্ধ কোন ব্যক্তিকে হত্যা করা যাইবে না।

উপবিধি : উপরে উল্লিখিত ব্যক্তিগণের কেহ শত্রুপক্ষের রাষ্ট্রীয় পদাধিকারী রাজা বা রাণী হইলে অথবা সেনাবাহিনীর পদাধিকারী হইলে অথবা ইহাদের কেহ যুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করিলে অথবা পরোক্ষ বুদ্ধি-পরামর্শ, পরিকল্পনা ও কলা-কৌশল দ্বারা অথবা সম্পদ দ্বারা, গোয়েন্দাগিরি দ্বারা বা অন্য কোন উপায়ে যুদ্ধে মদদদাতা হইলে যুদ্ধ চলাকালীন পরিস্থিতিতে ইহাদিগকে হত্যা করা বৈধ। কেননা এই ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য হইবে দুষ্ট ব্যক্তিকে দমন করা এবং কাফিরদের মনোবল খর্ব করা।

উপবিধি : সন্ধিসূত্রে আত্মসমর্পণকারী ও পরাজিত শত্রুর সহিত কোন প্রকার অংগীকার ভংগ, বিশ্বাসভংগ বা প্রতারণা করা যাইবে না।

উপবিধি : নিহত শত্রুর লাশের অবমাননা বা বিকৃতি সাধন, নাক-কান বা অংগ-প্রত্যংগ কর্তন করা যাইবে না (দ্র. বাদাই'উস সানাই', ৬খ., পৃ. ৬৩-৬৪; হিদায়া, ২খ., পৃ. ৫৬২; ফাতহুল কাদীর, ৫খ., পৃ. ২০২-২০৩; আল-বাহরুর রাইক ৫খ., পৃ. ১৩০-১৩২; রাদ্দুল মুহতার, ৬খ., পৃ. ২১১-২১৫; 'আলামগীরী, ২খ., পৃ. ১৯৪)। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: وَلاَ تَغْدِرُوْا وَلاَ تَمَثَّلُوْا وَلاَ تَقْتُلُوْا وَلِيْدًا وَلاَ امْرَأَةً. "তোমরা বিশ্বাসভংগ করিবে না, অঙ্গ বিকৃতি করিবে না, শিশু ও নারীকে হত্যা করিবে না” (বায়হাকী, সুনান, ৯খ., পৃ. ৯০; মুওয়াত্তা ইমাম মালিক, কিতাবুল জিহাদ, পৃ. ১৬৮; বাদাই', ৬খ., পৃ. ৬৩)。

ইবন উমার (রা) সূত্রে বর্ণিত একটি হাদীছে আছে, “কোন যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স) এক নিহত নারীকে দেখিতে পাইয়া উহাতে তাঁহার অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন এবং যুদ্ধে নারী ও শিশু হত্যা নিষিদ্ধ করিলেন” (বুখারী, জিহাদ, বাৰ ৪৬, হাদীছ নং ৩০১২ ও ৩০১৩)।

উপবিধি: কাফিরদের দুর্বল ও সন্ত্রস্ত করিবার প্রয়োজনে ভয়ংকর ও দুষ্ট প্রকৃতির কাফির শত্রুকে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করা, কথার কূটজালে আক্রান্ত করিয়া এবং প্রয়োজনে দ্ব্যর্থবোধক মিথ্যার আশ্রয় নিয়া এবং অতর্কিতে ও গুপ্ত হত্যা করা বৈধ। তদ্রূপ যুদ্ধের জন্য বাহ্যত প্রতারণা ও প্রকৃতপক্ষে সূক্ষ্ম কৌশল অবলম্বন বৈধ ও পসন্দনীয়।

রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: الحرب خدعة “যুদ্ধ হইল কূটকৌশল” (বুখারী, কিতাবুল জিহাদ, হাদীছ নং ৩০২৮, ৩০২৯, ৩০৩০)।

উপবিধি: যুদ্ধক্ষেত্রে কোন মুসলিম মুজাহিদ অগ্রে আক্রমণ করিয়া তাহার পিতা-মাতা বা তদুর্দ্ধ আত্মীয়কে হত্যা করিবে না। তাহাদের কেহ আক্রমণের আওতায় আসিয়া পড়িলে নিজে সরিয়া গিয়া অন্য মুজাহিদকে আক্রমণ ও হত্যা করিবার সুযোগ করিয়া দিবে। তবে তাহাদের দ্বারা নিজে আক্রান্ত হইলে এবং পিতা ও অন্যান্যরা তাহাকে হত্যা করিতে উদ্যত হইলে আত্মরক্ষার্থে আক্রমণ করিতে পারিবে এবং হত্যা না করিয়া আত্মরক্ষা করা সম্ভব না হইলে হত্যাও করিতে পারিবে। আল্লাহ তা'আলার আদেশ: وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا. “এবং তাহাদের (পিতা-মাতার) সহিত পার্থিব জীবনে সদাচরণ করিবে” (২১:১৫)。

হানজালা (রা) তাঁহার কাফির পিতাকে হত্যা করিবার অনুমতি প্রার্থনা করিলে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে এই ব্যাপারে নিষেধ করিয়াছিলেন। ইহা ছাড়া পিতা-মাতা, দাদা-দাদী, নানা-নানী প্রমুখকে পার্থিব জীবনে বাঁচাইয়া রাখিবার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ করা শারী'আতের বিধানমতে সন্তানের কর্তব্য। সুতরাং সে তাহাদের হত্যা করিতে পারে না। তবে আক্রান্ত হইয়া নিজ জীবননাশের সমূহ আশংকার ক্ষেত্রে আত্মরক্ষা করা ফরয হওয়ার বিধান কার্যকর হইবে (বাদাই, ৫খ., পৃ. ১৩১-১৩২; ফাতাওয়া আলামগীরী, ২খ., পৃ. ১৯৪)।

উপবিধি: পবিত্র হারাম শরীফে যুদ্ধের সূচনা করা বৈধ নহে। কাফির প্রতিপক্ষ যুদ্ধ করিতে হারামে প্রবেশ করিলে এবং মুসলমানগণ হারাম এলাকায় প্রতি-আক্রমণ করিতে বাধ্য হইলে হারাম শরীফেও যুদ্ধ করা বৈধ হইবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَلَا تُقَاتِلُوهُمْ عِنْدَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ حَتَّى يُقَاتِلُوكُمْ فِيْهِ فَإِنْ قَاتِلُوكُمْ فَاقْتُلُوهُمْ.... “মসজিদুল হারামের সন্নিকটে তোমরা তাহাদের সহিত যুদ্ধ করিবে না যতক্ষণ না তাহারা সেখানে তোমাদের সহিত যুদ্ধ করে। যদি তাহারা (সেখানে) তোমাদের সহিত যুদ্ধ করে তবে তোমরাও (সেখানে) তাহাদিগকে হত্যা করিবে” (২: ১৯১; রাদ্দুল মুত্তার, ৬খ., পৃ. ১৯৯-২০০)।

**সন্ধি ও নিরাপত্তা প্রদান বিধি**
বিধি : কাফির প্রতিপক্ষ মুসলমানদের সহিত সন্ধির প্রস্তাব দিলে কিংবা মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানের (ইমাম) হারবী প্রতিপক্ষের সহিত বা তাহাদের কোন দল-উপদল বা রাষ্ট্রের সহিত সন্ধি এবং অনাক্রমণ বা যুদ্ধ নয় চুক্তি সম্পাদন করা বৈধ হইবে। কেননা সশস্ত্র যুদ্ধ ইসলামের জিহাদ বিধানের মূল লক্ষ্য নয়, বরং কাফিরদের প্রতিপত্তি খর্ব করা, তাহাদের ইসলাম গ্রহণের পথ সুগম করা এবং মুসলমানদের নিরাপত্তা বিধান করা জিহাদের মূল লক্ষ্য। আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَإِنْ جَنَحُوا لِلسَّلْمِ فَاجْنَحْ لَهَا وَتَوَكَّلْ عَلَى اللهِ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ. "তাহারা সন্ধির প্রতি আকৃষ্ট হইলে তুমিও সেদিকে আকৃষ্ট হও এবং আল্লাহর প্রতি ভরসা রাখ” (৮ঃ ৬১)।

فَإِنِ اعْتَزَلُوكُمْ فَلَمْ يُقَاتِلُوكُمْ وَالْقَوْا إِلَيْكُمُ السَّلَمَ فَمَا جَعَلَ اللَّهُ لَكُمْ عَلَيْهِمْ سَبِيلًا. "যদি তাহারা তোমাদের নিকট হইতে সরিয়া দাঁড়ায়, তোমাদের সহিত যুদ্ধ না করে এবং তোমাদের নিকট সন্ধির প্রস্তাব করে তবে আল্লাহ তাহাদের বিরুদ্ধে তোমাদের জন্য কোন (যুদ্ধ করিবার) কোন পথ রাখেন না” (৪:৯০)।

রাসূলুল্লাহ (স) মক্কাবাসীদের সহিত দশ বৎসর মেয়াদের জন্য যুদ্ধ নয় চুক্তি সম্পাদন করিয়াছিলেন (বুখারী, কিতাবুল জিহাদ, হাদীছ নং ৩১৭৩; ফাতহুল বারী, ৬খ., পৃ. ৩১৭)।

বিধি : কাফিরদের সহিত সম্পদিত চুক্তি ও সন্ধির বিনিময়ে তাহাদের নিকট হইতে অর্থ সম্পদ গ্রহণ করা বৈধ হইবে— যদি মুসলমানদের জন্য উক্ত সম্পদ গ্রহণ প্রয়োজনীয় হয় এবং রাষ্ট্র ও নাগরিকদের প্রয়োজন মিটাইবার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদের অভাব থাকে। রাসূলুল্লাহ (স) বাহরায়ন ও হিজরের খৃস্টান ও অগ্নিপূজারীদের সহিত বার্ষিক প্রদেয় নির্ধারিত পরিমাণ সম্পদের বিনিময়ে সন্ধিবদ্ধ হইয়াছিলেন। তদ্রূপ বদর যুদ্ধে কাফিরদের নিকট হইতেও তিনি মুক্তিপণ গ্রহণ করিয়াছিলেন।

উপবিধি : অমুসলিম রাষ্ট্র আক্রমণ করিবার পূর্বে তাহাদের প্রেরিত দূতের মাধ্যমে সম্পাদিত হইলে সন্ধির বিনিময়ে প্রাপ্ত সম্পদ জিযিয়া ও খারাজ ব্যয়ের খাতসমূহে ব্যয় করিতে হইবে।

উপবিধি: আক্রান্ত বা অবরুদ্ধ হওয়ার পর কাফিররা সম্পদ প্রদানের শর্তে সন্ধিবদ্ধ হইলে সেই সম্পদ গনীমতরূপে বিবেচিত হইবে এবং উহা গনীমত বণ্টন বিধি অনুসারে বণ্টিত হইবে (হিদায়া, ২খ., পৃ. ৫৬৩, ৫৬৪; বাহরুর রাইক, ৫খ., পৃ. ১৩৩; ফাতহুল কাদীর, ৬খ., পৃ. ২০৭; রাদ্দুল মুহতার, ৬খ., পৃ. ২১৬; বুখারী, কিতাবুল জিয়া, বাব ১, হাদীছ নং ৩১৫৭, ৩১৫৮, ৩১৫৯; ফাতহুল বারী, ৬খ., পৃ. ২৯৮-৩০০; ফাতাওয়া আলামগীরী, ২খ., পৃ. ১৯৬)।

উপবিধি: কাফিররা মুসলমানদের আক্রমণ করিয়া কোণঠাসা করিয়া ফেলিলে বা অবরোধ করিয় সন্ধি সম্পাদনের চাপ সৃষ্টি করিলে অথবা মুসলিম ইমাম (রাষ্ট্রপ্রধান/সেনাপ্রধান) মুসলমানদের জান-মাল রক্ষায় কাফিরদের সহিত সন্ধি সম্পাদনে বাধ্য হইলে সন্ধি করা বৈধ। তদ্রূপ পরিস্থিতি সংকটাপন্ন হইলে এবং মুসলমানদের ব্যাপক জীবননাশের আশংকা দেখা দিলে অগত্যা সম্পদ প্রদান করিবার ও শর্তে সন্ধি করা বৈধ। কেননা সম্ভাব্য যে কোন উপায় জীবন রক্ষা ও ধ্বংস প্রতিরোধ করা ওয়াজিব। খন্দক যুদ্ধে অতি সংকটকালে রাসূলুল্লাহ (স) সম্মিলিত কাফির বাহিনীর একাংশ গাতাফান গোত্রের নেতা উয়ায়না ইবন হিস্‌ন আল-ফাযারী ও হারিছ ইবন 'আওফ ইব্‌ন হারিছা আল-মুররীর নিকট মদীনার এক-তৃতীয়াংশ ফল (খেজুর) প্রদানের শর্তে তাহাদের যুদ্ধ হইতে সরিয়া দাঁড়াইবার প্রস্তাব প্রদান সম্পর্কে আনসারগণের সহিত আলোচনা করিয়াছিলেন। পরবর্তীতে এই প্রস্তাব কার্যকর না হইলেও উহার দ্বারা সংকটকালে সম্পদ প্রদান করিয়া সন্ধি করিবার বৈধতা প্রমাণিত হয়। ব্যাপক জীবননাশের আশংকা না থাকিলে সম্পদ প্রদানের শর্তে সন্ধি করিবে না। কেননা উহা ইসলাম ও মুসলমানদের হীনতা ও অবমাননা স্বীকার করিবার নামান্তর (হিদায়া, ২খ., পৃ. ৬৫৪; আল-বাহরুর রাইক, ৫খ., পৃ. ১৩৩; ফাতহুল কাদীর, ৫খ., পৃ. ২০৭-২০৮; রাদ্দুল মুহতার, ৬খ., পৃ. ২১৬-২১৭; আলামগীরী, ২খ., পৃ. ১৯৭)।

বিধি: সন্ধি চুক্তি যেমন নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য হইতে পারে তদ্রূপ অনির্দিষ্ট মেয়াদের জন্যও হইতে পারে। কেননা রাসূলুল্লাহ (স) মক্কাবাসীদের সহিত দশ বৎসর মেয়াদের জন্য যুদ্ধ নয় চুক্তি সম্পাদন করিয়াছিলেন (বুখারী, কিতাবুল জিহাদ, হাদীছ নং ৩১৭৩; ফাতহুল বারী, ৬খ., পৃ. ৩১৭)। এই সন্ধিচুক্তিতে পরের বৎসর (উমরাতুল কাযা-র জন্য) মক্কা শরীফে রাসূলুল্লাহ (স) ও মুসলমানদের তিন দিন অবস্থানের শর্তও সংযুক্ত ছিল। অপরদিকে খায়বারের ইয়াহুদীদের সহিত রাসূলুল্লাহ (স) অনির্ধারিত মেয়াদের চুক্তি সম্পাদন করিয়াছিলেন। তিনি বলিয়াছিলেন, "এখানে আমরা তোমাদিগকে অবস্থান করিবার সুযোগ দিব যত দিন আল্লাহ তোমাদিগকে অবস্থান করাইবেন” (বুখারী, কিতাবুল মুওয়াদা, বাব ২০)।

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হইল, মুসলমানদের সুবিধা ও কল্যাণ। সুতরাং মুসলমানদের ইমাম (রাষ্ট্রপ্রধান বা সেনাপ্রধান) নির্দিষ্ট, কম বা বেশী কিংবা অনির্দিষ্ট মেয়াদের যেইটিকে মুসলিম স্বার্থের অনুকূল মনে করিবেন তদনুসারে চুক্তি সম্পাদন করিতে পারিবেন এবং উক্ত স্বার্থ রক্ষার প্রয়োজনে অনির্ধারিত মেয়াদকে নির্ধারিত করিতে এবং নির্দিষ্ট মেয়াদকে কম-বেশী করিতে কিংবা উত্তম মনে করিলে যথা নিয়মে সন্ধি ভংগ করিবার ঘোষণা দিতে পারিবেন (হিদায়া, ২খ., পৃ. ৫৬৬; ফাতহুল বারী, ৬খ., ৩২৫, ৩২৬; ফাতহুল কাদীর, ৫খ., পৃ. ২০৫; ফাতাওয়া আলমগীরী, ২খ., পৃ. ১৯৭)।

উপবিধি: উল্লিখিত সন্ধি ভংগ বা বাতিল করার বৈধতা অমুসলিম রাষ্ট্র বা যুদ্ধরত প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রে প্রয়োজ্য। কোন অমুসলিম রাষ্ট্র বা জনপদ ইসলামী রাষ্ট্রের আনুগত্য স্বীকার করিয়া সন্ধিবদ্ধ ও জিযিয়া প্রদানে চুক্তিবদ্ধ হইলে তাহা ইসলামী রাষ্ট্রের যিম্মী (সংখ্যালঘু)-রূপে বিবেচিত হইবে এবং মৌলিক নাগরিক অধিকার ভোগ করিবে। তাহারা সম্মিলিতরূপে ইসলামী রাষ্ট্রের সহিত বিশ্বাসঘাতকতা না করিলে বা বিদ্রোহ না করিলে তাহাদের সহিত সম্পাদিত চুক্তি বাতিল করা যাইবে না (বাদাইউস্ সানাই, ৬খ., পৃ. ৭৭)।

উপবিধি: প্রতিপক্ষ বিশ্বাসঘাতকতা করিলে বা সন্ধির শর্ত লংঘন করিলে অথবা তাহাদের রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি ও নির্দেশে তাহাদের কোন দল-উপদল মুসলিম অঞ্চল বা ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্ত আক্রমণ করিলে, অথবা নির্দিষ্ট মেয়াদের সন্ধির ক্ষেত্রে মেয়াদ পূর্ণ হইলে এবং চুক্তি নবায়ন না করা হইলে— এই সকল অবস্থায় সন্ধিচুক্তি সরাসরি বাতিল হইয়াছে বলিয়া বিবেচিত হইবে এবং কোন প্রকার ঘোষণা বা আগাম সতর্কীকরণ ব্যতীত এবং প্রস্তুতি গ্রহণের সময় ও সুযোগ প্রদান ব্যতীত আক্রমণ পরিচালনা করা বৈধ হইবে।

উপবিধি: সন্ধিবদ্ধ প্রতিপক্ষের কোন দল-উপদল তাহাদের রাষ্ট্রপ্রধান বা রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন, নির্দেশ বা অবগতি ব্যতিরেকে ইসলামী রাষ্ট্র বা উহার সীমান্ত আক্রমণ করিলে উহা রাষ্ট্রীয় ও সার্বিকরূপে সন্ধিভংগ বলিয়া বিবেচিত হইবে না, বরং উহা ডাকাতি, রাহাজানী ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমরূপে ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ বিবেচিত হইবে। কেননা হুদায়বিয়ার সন্ধিবদ্ধ মক্কার মুশরিক পক্ষ গোপনে সন্ধির শর্ত ভংগ করিবার কারণে রাসূলুল্লাহ (স) সন্ধি ভংগের ঘোষণা প্রদান ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যতীত তাহাদের বিরুদ্ধে অতর্কিত আক্রমণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং উহার ফলেই মক্কা বিজয় হইয়াছিল (বুখারীর কিতাবুল মাগাযী ও অন্যান্য সীরাত গ্রন্থাবলীতে মক্কা বিজয় প্রসংগ; আরও দ্র. হিদায়া, ২খ., পৃ. ৫৬৩; বাদাই', ৬খ., পৃ. ৭৭; রাদ্দুল মুহতার, ৬খ., পৃ. ২১৭; আল-বাহরুর রাইক, ৫খ., পৃ. ১৩৩; ফাতহুল কাদীর, ৫খ., পৃ. ২০৬; আলামগীরী, ২খ., পৃ. ১৭৯)।

বিধি: সন্ধি বা পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে কোন কাফির ব্যক্তি বা গোষ্ঠী, সম্প্রদায় বা রাজ্য ইসলামী রাষ্ট্রের (দারুল ইসলাম) আনুগত্য স্বীকার করিলে অর্থাৎ যিম্মী হওয়ার প্রার্থনা বা স্বীকারোক্তি করিলে ও চুক্তিবদ্ধ হইলে তাহার বা তাহাদের জন্য স্থায়ী নিরাপত্তার ব্যবস্থা করিতে হইবে। তাহারা সাধারণ মৌলিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অধিকার ভোগ করিবার এবং তাহাদের নিজ নিজ ধর্মীয় অনুশাসন পালনে স্বাধিকার লাভ করিবে।

উপবিধি: কেহ ইসলাম গ্রহণ করিলে অথবা মৃত্যুবরণ করিলে জিযয়া রহিত হইবে।

উপবিধি: যিম্মীরা বিদ্রোহ করিয়া অস্ত্র ধারণ করিলে বা মুসলিম রাষ্ট্রের কোন অঞ্চলে তাহাদের দখল প্রতিষ্ঠা করিলে অথবা অমুসলিম রাষ্ট্রে (দারুল হারব) চলিয়া গেলে যিম্মী চুক্তি বাতিল হইয়া যাইবে।

সাময়িক নিরাপত্তা বিধি: যুদ্ধবিহীন স্বাভাবিক শান্তি পরিস্থিতিকালে অথবা প্রত্যক্ষ যুদ্ধ চলাকালে অথবা যুদ্ধ সমাপ্তিকালে কোন কাফিরকে ব্যক্তিগতভাবে অথবা কোন কাফির দল বা গোত্র বা কোন দুর্গবাসী, নগরবাসী বা দেশবাসীকে নিরাপত্তা প্রদান করা হইলে উহা কার্যকর হইবে এবং নিরাপত্তা প্রদত্ত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে আঘাত করা যাইবে না বা তাহাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা যাইবে না।

বিধি: প্রত্যক্ষ যুদ্ধ ও আক্রমণ, প্রতি-আক্রমণ চলিবার সংগীন মুহূর্তেও মারণাস্ত্রের মুখে মৃত্যুর বিভীষিকা প্রত্যক্ষ করিয়া বা অন্য কোন কারণে যদি কোন কাফির (সে যতই দুর্ধর্ষ ও দুর্দমণীয় হউক) স্বীয় অস্ত্র সংবরণ করিয়া কলেমা উচ্চারণ করে অথবা যে কোন ভাষায় ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেয় তবে তখনই সে নিরাপত্তা লাভ করিবে এবং মৃত্যুভয়ে অথবা প্রতারণা করিতেছে এই অজুহাতে তাহাকে হত্যা করা যাইবে না। হুরুকাত ও জাযীমা অভিযানে প্ররিত উসামা (রা) এইরূপ অবস্থায় প্রতিপক্ষকে হত্যা করিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) ইহাতে তাঁহার অসন্তুষ্টি প্রকাশ করিয়াছিলেন (বুখারী, ১খ., কিতাবুল জিহাদ, বাব ১১; কিতাবুল মাগামী, ২খ., পৃ. ৬১২ ৬২২; ফাহুল বারী, ৬খ., পৃ. ৩১৬)।

**গনীমত (যুদ্ধলব্ধ) সম্পদের বিধান কতিপয় পরিভাষা**
গনীমত (الغنيمة) বা আল-গনীমা: যুদ্ধে ও প্রত্যক্ষ আক্রমণে পরাজিত বা নিঃশর্ত আত্মসমর্পণকারী কাফিরদের নিকট হইতে প্রাপ্ত (ক) অস্থাবর যাবতীয় সম্পদ, (খ) ভূমি, (গ) পরাজিত কাফির-বাহিনী ও তাহাদের পরিবার-স্ত্রী-সন্তান-সন্তুতি গনীমত হিসাবে গণ্য।

ফায় (الفيء): প্রত্যক্ষ যুদ্ধ ব্যতীত মুসলিম বাহিনীর প্রভাবে ভীত হইয়া আত্মসমর্পণকারী ও বশ্যতা স্বীকারকারী কাফিরদের অস্থাবর সম্পদ ও ভূমি এবং তাহাদের নিকট হইতে আহরিত জিয়া ও খারাজ ইহার অন্তর্ভুক্ত। যুদ্ধভীতি ও আক্রমণোদ্যম ব্যতীত পারস্পরিক সমঝোতা ও আলোচনার মাধ্যমে অর্থ-সম্পদ প্রদানের শর্তে সন্ধিচুক্তি সম্পাদিত হইলে সেই সম্পদ কতক ফকীর মতে ফায়ভুক্ত হইবে এবং কতকের মতে উহা গনীমতও নয়—ফায়ও নয়। তবে উহার বিধান ফায়-এর অনুরূপ হইবে। উপহার-উপঢৌকন, ছিনতাই, চুরি ইত্যাদি দ্বারা প্রাপ্ত কাফির (হারবী)-এর সম্পদ ফায়ভুক্ত হইবে না।

নাফল বা তানফীল (نفل/ تنفيل): যুদ্ধ প্রকালে বা যুদ্ধ চলাকালে ইমাম বা সেনাপ্রধানের পক্ষ হইতে উৎসাহিত করিবার লক্ষ্যে কোন ব্যক্তি, ছোট দল বা ব্যাপকরূপে সেনাবাহিনীর জন্য নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ, স্বর্ণ-রৌপ্য বা কোন সম্পদ অথবা গনীমতের অংশবিশেষ অথবা 'সালাবা' পুরস্কার হিসাবে প্রদানের ঘোষণাকে তানফীল এবং এইরূপ প্রদেয় বস্তু-সম্পদকে নাফল বলে।

সালাব (سلب): প্রতিপক্ষ যোদ্ধার অস্ত্রশস্ত্র, পোশাক, বাহন ও আসবাবপত্র।

জিয়া (جزية): সন্ধিবদ্ধ বা আত্মসমর্পণকারী অথবা মুক্তি প্রদত্ত কাফির বন্দীদের উপর আরোপিত ব্যক্তিগত কর যাহা চুক্তির শর্তানুলারে ধনী, মধ্যবিত্ত ও গরীব শ্রমজীবী এই ছিল জ্বরে নির্ধারিত হারে ধার্য হয়।

খারাজ (خراج): বিজিত শত্রুভূমিতে আরোপিত 'ভূমিরাজস্ব' বা খাজনা। পরাজিত কিংবা চুক্তিবদ্ধ কাফির অধিবাসীদেরকে তাহাদের ভূমি অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখিয়া অথবা তাহাদিগকে উল্লেখ করিবার পরে অপর কোন কাফির সম্প্রদায়কে আবাসনের সুযোগ প্রদান করিয়া ইহা ধার্য করা হয় ( এইরূপ ভূমি হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় মুসলিম মালিকানাস্বত্ব হইতেও উহাতে 'খারাজ' অব্যাহত থাকে)।

বিধি : গনীমতের অন্যতম অংশ যুদ্ধলব্ধ যাবতীয় অস্ত্রশস্ত্র সম্পদ প্রথমে পাঁচ ভাগ করিয়া উহার এক-পঞ্চমাংশ (যাহা খুমুস নামে অভিহিত) সরকারী সংরক্ষণে থাকিবে। অবশিষ্ট চার অংশ মুজাহিদগণের মধ্যে বন্টিত হইবে।

উপবিধি : পদাতিক যোদ্ধা এক অংশ এবং জঙ্গারোহী দুই অংশ, মতান্তরে জঙ্গারোহী তিন অংশ, যোদ্ধা-এক ও ঘোড়া দুই অংশ হারে বণ্টিত হইবে। হানাফী মাযহাবমতে ইসলামী রাষ্ট্রে (দারুল ইসলাম) প্রত্যাবর্তনর পর গনীমত বন্টন করিতে হইবে। তবে প্রত্যাবর্তনের পূর্বে (দারুল হারবে) বন্টন করিলেও তাহা কার্যকর হইবে।

উপবিধি : শুধু প্রাণরক্ষক পুরুষ যোদ্ধাগণ উক্ত হারে গনীমতের অংশ লাভের অধিকারী হইবে। দারুল ইসলামের সীমান্ত অতিক্রম করিয়া দারুল হারবে প্রবেশকারী অথবা যুদ্ধক্ষেত্রে অবতরণকারী সকল যোদ্ধা এই ক্ষেত্রে সমান সাধ্য হইবে।

বিধি : যুদ্ধে পরাজয় বরণকারী যুদ্ধবন্দীদের সম্পর্কে ইমাম (রাষ্ট্রপ্রধান) বিকল্প ব্যবস্থার যে কোন একটি গ্রহণ করিতে পারিবেন : (ক) নারী ও শিশু ব্যতীত সকল যোদ্ধা পুরুষকে হত্যা করিতে পারিবেন এবং নারী ও শিশুদিগকে দাস-দাসী বানাইয়া রাখিতে পারিবেন; (খ) নারী-শিশুসসহ সকল পুরুষকে দাস বানাইয়া রাখিতে পারিবেন; (গ) স্বীয়রূপে সকলকে মুক্ত করিয়া দিতে পারিবেন জিযিয়া ধার্য করিতে পারিবেন। রাসূলুল্লাহ (স) সরাসরি দাসপ্রথার উচ্ছেদ না করিলেও এমন ব্যবস্থা রাখিয়া গিয়াছেন যে, অচিরে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছে।

যুদ্ধবন্দীদিগকে গোলাম-বাঁদী বানানো রাসূলুল্লাহ (স)-এর নীতি নহে, বরং মুক্তির বিনিময়ে মুক্তি দেওয়া, যুদ্ধবন্দী বিনিময় করা কিংবা সম্পূর্ণ যুদ্ধবন্দীকে নিঃশর্ত মুক্তি প্রদান তাঁহার নীতি ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) দাস-দাসী বানানোরকে শর্ত সাপেক্ষে অনুমোদন করিয়াছেন।

বিধি : যুদ্ধক্ষেত্রে হইতে শুধু জীবন রক্ষার উদ্দেশ্যে (অর্থাৎ যুদ্ধের কৌশলের অংশরূপে এবং নিজেদের বাহিনীর সহিত মিলিত হইয়া পুনঃ আক্রমণের উদ্দেশ্য না থাকিলে) পলায়ন করা বৈধ নয়। রাসূলুল্লাহ (স) যুদ্ধক্ষেত্র হইতে পলায়ন করাকে সাতটি ধ্বংসাত্মক মহাপাপ-এর অন্তর্ভুক্ত করিয়াছেন (মুসলিম, ১/৯, কিতাবুল ঈমান, পৃ. ৬৪)। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন : يَأَيُّهَا الَّذِينَ إِذَا لَقِيتُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا زَحْفًا فَلَا تُوَلُّوهُمُ الْأَدْبَارَ- وَمَنْ يُوَلِّهِمْ يَوْمَئِذٍ دُبُرَهُ إِلَّا مُتَحَرِّفًا لِقِتَالٍ أَوْ مُتَحَيِّزًا إِلَى فِئَةٍ فَقَدْ بَاءَ بِغَضَبٍ مِنَ اللَّهِ وَمَأْوَاهُ جَهَنَّمُ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ. "হে মুমিনগণ! তোমরা যখন কাফির বাহিনীর সম্মুখীন হইবে তখন তোমরা তাহাদের পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিও না। সেদিন যুদ্ধকৌশল অবলম্বন কিংবা দলে স্থান লওয়া ব্যতীত কেহ তাহাদিগকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিলে সে তো আল্লাহ্র বিরাগভাজন হইবে এবং তাহার আশ্রয় জাহান্নাম, আর উহা কত নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল” (৮ : ১৫-১৬)।

বিধি : মুসলমানদের সহিত যুদ্ধরত প্রতিপক্ষের নিকট যুদ্ধাস্ত্র ও যে কোন প্রকার সমরোপকরণ বিক্রয় করা যাইবে না। যুদ্ধ চলাকালীন ও সন্ধিকালীন উভয় সময়ের জন্য এই বিধান অভিন্ন (হিদায়া, ২খ., পৃ. ৫৬; রদ্দুল মুহতার, ৬খ., পৃ. ২১৮; আল-বাহরুর রাইক, ৫খ., ১৩৮; ফাতাওয়া আলামগীরী, ২খ., পৃ. ১৯৭-১৯৮)।

বিধি : যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাপতি মৃত্যুবরণ করিলে বা নিহত হইলে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কাহাকেও নূতন সেনাপতি নিয়োগ করিবার ব্যবস্থা বা অবকাশ না রাখিলে কোন সাহসী আত্মবিশ্বাসী যোদ্ধার জন্য সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করা এবং নিজকে সেনাপ্রধান ঘোষণা করা বৈধ। মৃতা যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিয়োজিত তিনজন সেনাপতি পরপর শাহাদাত বরণ করিলে খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা) সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং উহা রাসূলুল্লাহ (স)-এর অনুমোদন লাভ করিয়াছিল (বুখারী, ১খ., কিতাবুল জিহাদ, বাব ১৮৩, হাদীছ নং ৩০৬৩; ২খ., কিতাবুল মাগাযী, মৃতা অভিযান অধ্যায়; ফাতহুল বারী, ৬খ., পৃ. ২০৮-২০৯)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মুতায় যুদ্ধ: খৃস্টানদের বিরুদ্ধে প্রথম লড়াই

📄 মুতায় যুদ্ধ: খৃস্টানদের বিরুদ্ধে প্রথম লড়াই


ইতোপূর্বে অনুষ্ঠিত সমস্ত যুদ্ধ ছিল পৌত্তলিক ও ইয়াহুদীদের বিরুদ্ধে। কিন্তু এই যুদ্ধ ছিল খৃস্টানদের বিরুদ্ধে। ইসলামের ইতিহাসে ইহাই ছিল খৃস্ট জগতের বিরুদ্ধে প্রথম যুদ্ধ। এইজন্য ইহার একটি ভিন্ন তাৎপর্য রহিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) ইসলামের দাওয়াত সম্বলিত পত্র দিয়া তদানীন্তন শ্রেষ্ঠ শক্তিধর সম্রাট হিরাক্লিয়াস ও পারস্য সম্রাট খসরু পারভেযসহ অনেক রাজন্যবর্গের নিকট দূত প্রেরণ করেন। একটি পত্র তিনি রোম সম্রাটের অধীনস্ত বুসরার শাসক শুরাহবীল-এর নিকটও প্রেরণ করেন তদীয় দূত হারিছ ইবন উমায়র আল-আযদী (রা)-র মাধ্যমে। শুরাহবীল কূটনৈতিক রীতিনীতি ভঙ্গ করিয়া ঐ দূতকে নির্মমভাবে হত্যা করিয়া ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করে। ইসলামের ইতিহাসে উহাই ছিল কোন দূত নিহত হওয়ায় প্রথম ঘটনা। রাসূলুল্লাহ (স) এই সংবাদে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং ইহার সমুচিত জবাব দেওয়ার উদ্দেশ্যে অষ্টম হিজরীর জুমাদাল উলা মাসে ৩০০০ সৈন্যের একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। যুদ্ধটির গুরুত্ব পরিমাপের জন্য এই একটি কথাই যথেষ্ট যে, রাসূলুল্লাহ (স) নিজে ছানিয়াতুল বিদা পর্যন্ত অগ্রসর হইয়া এই বাহিনীকে বিদায় দিয়াছিলেন এবং স্বহস্তে সেনাপতির হাতে পতাকা তুলিয়া দিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) নিজে এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করা সত্ত্বেও সীরাতবিদগণ এই যুদ্ধটিকে গাযওয়ার তালিকাভুক্ত করিয়াছেন।

সেনাপতির আসনে গোলামঃ ইসলামী সাম্যের নমুনা
রাসূলুল্লাহ (স) নিজ হাতে পতাকা বাঁধিয়া যাঁহার হস্তে এই বিশাল বাহিনীর সেনাপতির গুরুদায়িত্ব অর্পণ করিলেন তিনি যায়দ ইবন হারিছা (রা), রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুক্তদাস। এত বড় বড় বয়োজ্যেষ্ঠ সাহাবীগণ এই যুদ্ধে সাধারণ সৈনিকরূপে যোগদান করিলেন, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) সেনাপতি নির্বাচিত করিলেন এই যায়দ্যক। কুরায়শ বংশীয় আরব নেতাগণের কেহ এইজন্য অসন্তুষ্ট হইলেন না। রাসূলুল্লাহ (স) স্পষ্ট ভাষায় বলিয়া দিলেনঃ "যায়দ শহীদ হইলে তারপর জা'ফার ইবন আবী তালিব এবং সেও শহীদ হইলে আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করিবে"। [ফাতহুল বারী, ৭/৫১০; সীরাত ইবন হিশাম, ৩/৪২৮]

মানবতা বিরোধী কার্যকলাপ নিষিদ্ধ ও বাহিনীর সফর দীর্ঘ, মুকাবিলা করিতে হইবে রোমক শক্তির সহিত। অত্যন্ত ভাবগম্ভীর পরিবেশে জীবন বাজি রাখিয়া মুসলিম বাহিনী রওয়ানা হইল। বাহিনী রওয়ানা করার প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে উপদেশ দিলেন: তোমরা হারিছ ইবন উমায়রের বধ্যভূমিতে পৌছিয়া প্রথমে তাহাদিগকে ইসলামের দাওয়াত দিবে। যদি তাহারা সাড়া দেয় তবে তো উত্তম, নতুবা আল্লাহ্র কাছে সাহায্য প্রার্থনা করিয়া তাহাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইহাতে ঝাঁপাইয়া পড়িবে। তিনি বলিলেনঃ আল্লাহর নামে আল্লাহর রাহে ঐ সমস্ত লোকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিবে যাহারা আল্লাহ্র সুস্থিত কুফরী করিয়াছে। বিশ্বাস ভঙ্গ করিও না। খিয়ানত করিও না। কোন শিশু, নারী বা অতি বৃদ্ধকে হত্যা করিও না। সংসার বিরাগী কোন সাধুকে হত্যা করিও না। খেজুর গাছ বা অন্য কোন গাছ কাটিও না। কোন ইমারত ধ্বংস করিও না। [সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৬১১]

সিরিয়া সীমান্তে অবস্থিত মা'আনে পৌছিয়া তাঁহারা জানিতে পারিলেন যে, স্বয়ং রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াস এক লক্ষ সৈন্যের বিশাল বাহিনীসহ নিকটেই বাল্কা অঞ্চলের মাআবে শিবির স্থাপন করিয়াছেন। লাখম, জুযাম, বালকীন প্রভৃতি আরব বংশোদ্ভূত খৃস্টান গোত্রের আরও এক লক্ষ সৈন্য তাহাদের সাহায্যের জন্য প্রস্তুত রহিয়াছে। বিদেশ বিভুঁইয়ে মাতৃভূমি হইতে প্রায় হাজার মাইলের দূরত্বে মাত্র তিন হাজার সৈন্যের বাহিনী লইয়া যুদ্ধে প্রবৃত্ত হওয়া সমীচীন হইবে কিনা তাহা রীতিমত চিন্তার ব্যাপার ছিল। তাই মুসলিম বাহিনী দুই দিন পর্যন্ত নিবৃত্ত রহিল। অনেকের ধারণা ছিল, পরিস্থিতির সঠিক চিত্র রাসূলুল্লাহ (স)-কে অবগত করিয়া এই ব্যাপারে তাঁহার সুনির্দিষ্ট নির্দেশ প্রয়োজন। আবদুল্লাহ ইব্‌ন রাওয়াহা (রা)-এর এক বীরত্ব ব্যঞ্জক ভাষণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হইল। তিনি বলিলেন, “হে আমার সম্প্রদায়! যে বস্তুটির জন্য আপনারা দ্বিধাগ্রস্ত হইয়া পড়িয়াছেন, নিঃসন্দেহে উহাই আপনাদের পরম কাম্য। তাহা হইতেছে শাহাদাত। আমরা সংখ্যাশক্তি বা সংখ্যাধিক্যের জোরে যুদ্ধ করি না। আমরা কেবল এই দীনের শক্তিতে বলীয়ান হইয়াই যুদ্ধ করি যাহা দ্বারা আল্লাহ আমাদিগকে সম্মানিত করিয়াছেন। সুতরাং অগ্রসর হউন! আমাদের জন্য দুইটি অঙ্গলের একটি অবশ্যম্ভাবী: বিজয় অথবা শাহাদাত।

তারপর অগণিত শত্রুসৈন্যের ভীতি সকলের মন হইতে কপূরের মত হাওয়ায় মিশিয়া গেল। একে একে যায়দ ইবন হারিছা, জা'ফার ইব্‌ন আবী তালিব ও আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা) বীরত্বের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিয়া যুদ্ধক্ষেত্রে শহীদ হইলেন। মুসলিম বাহিনীর পতাকা পড়িয়া গেল দেখিয়া বানু 'আজলান গোত্রীয় সাহাবী ছাবিত ইব্‌ন আরকাম (রা) পতাকা তুলিয়া ধরিয়া বুলন্দ আওয়াজে আহবান জানাইলেন, আল্লাহ্র পথের মুজাহিদগণ। একজন সেনাপতি নির্বাচিত করুন। লোকজন বলিয়া উঠিল, আপনিই আমাদের সেনাপতি। তিনি বলিলেন, এই গুরুদায়িত্ব আমি পালন করিতে পারিব না। তখন যোদ্ধাগণ খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা)-কে সেনাপতিরূপে বরণ করিয়া লইলেন।

সেনাপতির দায়িত্ব লাভ করিয়াই খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা) যুদ্ধের দ্বিতীয় দিনে নূতনভাবে সৈন্য বিন্যাস করিলেন। তিনি মুকাদ্দামা বা অগ্রবাহিনীকে সাকা (পশ্চাৎবর্তী) বাহিনীরূপে এবং মায়মানা (ডানবাহিনী)-কে মায়সারা (বাম বাহিনী)-রূপে বিন্যস্ত করিলেন। শত্রুসৈন্যরা যখন তাহাদের সম্মুখে নূতন নূতন মুখ দেখিতে পাইল, তখন তাহারা সাহায্যকারী নূতন বাহিনী আসিয়া মুসলিম বাহিনীতে যোগ দিয়াছে ভাবিয়া প্রমাদ গণিল। হযরত খালিদ সৈন্যবিন্যাস বজায় রাখিয়া ক্রমান্বয়ে তাঁহার বাহিনীকে সরাইয়া আনিতে লাগিলেন। শত্রুরা মনে করিল মুসলমান সৈন্যগণ কৌশলে পিছনের দিকে গিয়া তাহাদিগকে প্রলুব্ধ করিয়া নূতন কোন-ফাঁদে ফেলিবার চেষ্টা করিতেছে। তাই তাহারাও পশ্চাদাপসরণ করিল, মুসলমানদের পশ্চাদ্ধাবন করিতে সাহস পাইল না। কেবল ঈমানের বলে দুই লক্ষ শত্রু সৈন্যের বিরুদ্ধে লড়িয়া এইভাবে মুসলিম বাহিনী মদীনায় প্রত্যাবর্তন করিল। [ফাতহুল বারী, ৭/৫১৩; যাদুল মা'আদ, ২/১৫৬; আর-রাহীকুল মাখতুম, ১ম আরবী সং, ১৪০০ হি., পৃ. ৪৩৫-৪৪০]

উক্ত যুদ্ধে পূর্বোল্লিখিত তিনজন সেনাপতি ছাড়াও আরও নয়জন শহীদের নাম আল্লামা ইবনুল কায়্যিম তদীয় যাদুল মা'আদে এবং মোট চৌদ্দজনের নাম ইবন হিশাম উল্লেখ করিয়াছেন। রোমক পক্ষের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানা না গেলেও এবং সৈন্যসংখ্যার তুলনায় তাহা খুব বেশী মনে না হইলেও তাহাদের পক্ষেও যে বেশ কিছু লোক হতাহত হইয়া থাকিবে তাহা বলাই বাহুল্য। কেননা সেই দিন কেবল হযরত খালিদেরই হাতে একে একে নয়টি তরবারি ভাঙ্গিয়া খানখান হইয়া যাওয়ার কথা বুখারী শরীফেই উল্লিখিত হইয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার সেই দিনের বীরত্বের জন্য তাঁহাকে 'সায়ফুল্লাহ্' (আল্লাহর তরবারি) উপাধিতে ভূষিত করেন। [ফাতহুল বারী, ৭/৫১২, হাদীছ নং ৬২৬-২৬৩]

রাসূলুল্লাহ (স)-এর নেতৃত্বে মাত্র আট বৎসরের সামরিক প্রশিক্ষণে' মদীনাবাসিগণের বীরত্বের মান যে কী পরিমাণ সমুন্নত হইয়াছিল তাহা যতটুকু না এই অসম যুদ্ধে প্রমাণিত হয়, ততোধিক প্রমাণিত হয় যখন মৃতা হইতে মুসলিম বাহিনী প্রত্যাবর্তন করিল তখনকার মদীনাবাসীদের সাধারণ প্রতিক্রিয়া হইতে। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স) অগ্রসর হইয়া মদীনার উপকণ্ঠে মৃতার মুজাহিদগণকে অভ্যর্থনা জানানো সত্ত্বেও একদল লোক তাহাদিগকে যুদ্ধক্ষেত্র হইতে পলাতক বলিয়া ভর্ৎসনা করিতে করিতে তাহাদের প্রতি ধূলি নিক্ষেপ করিতে থাকে। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স) অগ্রসর হইয়া তাহাদের এই 'অপরাধের প্রতিবাদ করিয়া বলিলেনঃ "ইহারা পলাতক নহে, ইহারা হইতেছে পুনরায় যুদ্ধে যোগদানে প্রস্তুত একটি দল। ইনশাআল্লাহ সুযোগমত পুনরায় উহারা শত্রুদের উপর ঝাঁপিয়া পড়িবে"।

ইন্ন হিশাম, ইন্ন ইসহাক প্রমুখ উল্লেখ করিয়াছেন যে, নবী সহধর্মিনী উম্মে সালামা (রা) একদা সালামা ইব্‌ন হিশাম ইব্‌ন আসের স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, সালামাকে যে রাসূলুল্লাহ (স) ও মুসলমানদের সহিত সালাতের জামাআতে দেখা যাইতেছে না, ব্যাপার কী? জবাবে মৃতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সালামার স্ত্রী জানাইলেন, আল্লাহ্র কসম! ঘর হইতে বাহির হইলেই লোকে তাহাকে যুদ্ধক্ষেত্র হইতে পলায়নকারী বলিয়া খোঁটা দেয়, এইজন্য তিনি এখন ঘর হইতে বাহির হওয়া বন্ধ করিয়া দিয়াছেন। [ইব্‌ন হিশাম, সীরাতুন-নবী, ৪খ., পৃ. ১৭-১৮]

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শক্তির সহিত প্রায় হাজার মাইলের পথ পাড়ি দিয়া যে মুসলিম বাহিনী সেই প্রবল শত্রুর দেশেই স্বল্প সংখ্যক লোক লইয়া সংঘর্ষে লিপ্ত হইতে পারে তাহারা যে আর সেই উপেক্ষিত মরু আরব নহে, বরং প্রবল শক্তিধর এক বিরাট মানবগোষ্ঠী, তাহা এই যুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর সম্মুখে সর্বপ্রথম উদ্ভাসিত হয়। মুসলিম বাহিনী এই প্রথমবারের মত একেবারে শত্রুর দেশে ঢুকিয়া তাহাদের সহিত সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হইয়া তাহাদের রণকৌশল ও শক্তি-সামর্থ্য সম্পর্কে একটি ধারণা অর্জন করে। তাই মদীনার এক শ্রেণীর লোকের নিকট উহা তাৎপর্যবহ না হইলেও আল্লাহর রাসূল তাঁহার কৈশোরে সিরিয়া ভ্রমণের অভিজ্ঞতা এবং রাসূল সুলভ প্রজ্ঞার মাধ্যমে উহার তাৎপর্য ঠিকই অনুধাবন করিয়াছিলেন। পরবর্তী কালে রোমকদের সহিত অনুষ্ঠিত অসংখ্য যুদ্ধ এবং রোমক তথা বায়যান্টাইন সাম্রাজ্যের বিশাল এলাকা মুসলমানদের হাতে বিজিত হওয়ার ঘটনা এই মৃতার যুদ্ধের পরই সম্ভব হইয়াছিল। তাই দুই দুইটি বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ জেনারেল আকবর খান এবং সাবেক ইরাকী জেনারেল মাহমূদ শীছ খাত্তাব মৃতার যুদ্ধের অভিজ্ঞতাকে অত্যন্ত তাৎপর্যবহ বলিয়া মন্তব্য করিয়াছেন। জেনারেল আকবর খান লিখেন:

"মহানবী (স)-এর জিহাদ ঘোষণার খবর রোমানদের সম্মিলিত বাহিনীতে যখন পৌঁছে তখন তার প্রথম প্রতিক্রিয়া বনূ হাদস্-এর শাখা বনূ গাযাম-এর উপর হয়। তারা তখনি যুদ্ধে যোগদান থেকে আলাদা হয়ে যায়। তাতে অন্যান্য কবীলাও প্রভাবিত হয় এবং তারাও নিজ নিজ এলাকায় চলে যায়। ফৌজের এই সংখ্যাল্পতার কারণে রোমকরা যারা প্রথমেই পেছনে হটে এসেছিল, নিজেদের মোর্চায় চুপ মেরে যায়, এরপর যুদ্ধের ময়দান ত্যাগ করে চলে যায়। খালিদ (রা)-ও ময়দান শূন্য দেখে মদীনায় ফিরে আসেন।

"বাস্তব সত্য এই যে, সার্বিক অবস্থার পরিমাপ করা শুধু মহানবী (স)-এর মত যোগ্য ও দূরদর্শী অধিনায়কেরই কাজ ছিল। অনন্তর তাবুকের যুদ্ধ থেকে যা মৃতার যুদ্ধের পরবর্তীতে সংঘটিত হয়-এটা প্রমাণিত হয়ে যায় যে, সেখানকার লোকেরা ইসলামের মুজাহিদবৃন্দের বীরত্বের স্বীকৃতি দিয়েছিল। তাদের পরাজয় সেই পাকা ফলটির মত যা ছিল মুজাহিদবৃন্দের কোলে পতনোন্মুখ। অনন্তর সেসব কবীলা কোনরূপ মুকাবিলা ও সংঘর্ষ ব্যতিরেকেই তাবুক যুদ্ধের পর অনুগত হয়ে যায়”। [ইসলামের প্রতিরক্ষা কৌশল, পৃ. ৩৩২-৩৩৩]

জেনারেল মাহমূদ শীছ খাত্তাব বলেন, এটি এক বাস্তব সত্য যে, পশ্চাদপসরণ পরাজয়ে রূপান্তরিত হয়ে যাবার আশংকায় খুবই কঠিন হয়ে ওঠে। আর পরাজয় এমন এক বিপদ হয়ে দেখা দেয় যা পরাজিতদের জন্য সাধারণত খুবই ক্ষতির কারণ হয়। এজন্য মৃতায় মুসলমানদের মামুলি ক্ষতি সেই সামরিক উপকারিতার তুলনায় নেহাৎ অকিঞ্চিৎকর যে, এর দ্বারা রোমকদের সামরিক শক্তি তাদের শৃঙ্খলা ও সংগঠন এবং তাদের যুদ্ধপদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞাত তথ্যাদি পরবর্তী যুদ্ধগুলোতে মুসলমানদের কাজে লেগেছে”। [আর-রাসূলুল কাইদ, আরবী, পৃ. ২০৬-২০৭; নবীয়ে রহমত, পৃ. ৩৩৫, বাংলা অনু.]

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 অপ্রতিদ্বন্দ্বী বিজয়ী ও সফলতম সমরবিদ

📄 অপ্রতিদ্বন্দ্বী বিজয়ী ও সফলতম সমরবিদ


রাসূলুল্লাহ (স)-এর সামরিক ও প্রতিরক্ষা কৌশল সম্পর্কে হাদীছে দেফা’নামক পুস্তকের রচয়িতা জেনারেল আকবর খান প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অর্জিত তদীয় অভিজ্ঞতার আলোকে তাঁহার যুদ্ধসমূহের আলোচনাসূত্রে ইহার পর্যালোচনায় লিখেন : “হিজরতের পর তিনি সাতাশটি যুদ্ধ করেছেন এবং জেহাদের জন্য বিভিন্ন সময়ে ৩৫টি অভিযান বিভিন্ন স্থানে প্রেরণ করেছেন, আর এসবই করেছেন মাত্র দশ বছরের সংক্ষিপ্ততম সময়ে। এর ফল হয়েছে এই যে, বিরোধিতা ও বেইফতার বিষয়ক ঝঞ্ঝা খতম হয়ে যায়। বিদ্রোহী ও উদ্ধত স্বভাবের লোকগুলো বিনীত ও ভদ্র হল, খুন পিপাসী ও জ্ঞানের দুশমন জীবন উৎসর্গকারীতে পরিণত হল। যেখানে কুফর ও শিরকের রাজত্ব ছিল সেখানে ইসলামের ক্রন্দন উত্থিত হতে লাগল। পশুত্ব ও বর্বরতার জায়গা দখল করল মহানবী (স)-এর মর্যাদা ও ভদ্রতা। তাহযীব ও তমদ্দুন তথা সভ্যতা ও সংস্কৃতি স্বভাবজাত সম্পদে পরিণত হল। যেখানে বিশৃঙ্খলা, বিভেদ আর অব্যবস্থাপনার জয়জয়কার চলছিল সেখানে কায়েম হল শৃঙ্খলা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা। গোটা জীবনই রহমতে পরিণত হল, আর আরববাসী পরিণত হল দুনিয়াবাসীর হাদী ও শিক্ষকে। “দৈনিক ২৭৪ বর্গমাইল হিসাবে দীর্ঘ দশ বছর পর্যন্ত তাঁর বিজয় অভিযান অবিশ্রান্তভাবে চলতে থাকে। মুসলমানদের জীবনহানি ছিল প্রতি মাসে একটি করে আর দুশমন পক্ষে অন্তত ১৫০ জন করে। দশ বছর পূর্ণ হল এবং মহানবী (স)-এর মিশন পরিপূর্ণ স্তরে উপনীত হল। তখন দশ লক্ষ বর্গমাইলের অধিক এলাকা তাঁর অধীনে আর লাখো মানুষ দৃঢ়চিত্তে তাঁর অনুগত ভৃত্যে পরিণত! এত বড় বিজয়, এত বিরাট ও শানদার কৃতিত্ব, এত বড় সাম্রাজ্য দখল, অথচ মানুষের খুন ঝরল এত অল্প! কোন যুদ্ধে পরাজয় নেই, কোথাও নেই পশ্চাদপদতা, কোথাও অলসতা নেই, সব জায়গায় সামনে চলা আর অগ্রাভিযান, সর্বত্র সাফল্য আর সাফল্য। অধিকন্তু দুশমনের মুকাবিলায় সংখ্যাশক্তি হামেশাই কম, আসবাব-উপকরণ সর্বদাই স্বল্প! অতঃপর বিজয়ের নিরবচ্ছিন্ন স্রোত এখানেই থেমে যাচ্ছে না কিংবা তাঁর পবিত্র জীবনের পরিধিতে সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে না, বরং সামনে অগ্রসর হয় এবং দুনিয়া থেকে তাঁর বিদায় নিয়ে যাবার পরও তা অব্যাহত থাকে। তাঁর জন্য জীবন উৎসর্গকারী ও তাঁর শিক্ষায় আলোকপ্রাপ্ত এবং তাঁর পদাংক অনুসরণকারীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলে, এমনকি ইসলামী রাজত্ব এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার অনেক রাষ্ট্রে বিস্তার লাভ করে। কোন সিপাহসালার, কোন বিজয়ী রাষ্ট্রবিদ, কোন কুশলী ব্যবস্থাপক, কোন সংস্কারক সারা জীবনের চেষ্টা-সাধনার ফল তার দশ ভাগের এক ভাগও পেশ করতে পেরেছেন কি? পেরেছেন রেখে যেতে এমন স্বল্পতম সময়ের মধ্যে চিরদিনের তরে স্থায়ী অনিত্য এমন কোন সুকীর্তি” (ইসলামের প্রতিরক্ষা কৌশল, পৃ. ৩৬২-৩)! আধুনিক কালের একজন অভিজ্ঞ সমরবিদ যখন আলেকজাণ্ডার, মুসলিনী, হিটলার প্রমুখ বিশ্বজয়ী সমরবিদদের সহিত তুলনা করে তার এরূপ সিদ্ধান্ত পেশ করেন, তখন ইহার চাইতে অতিরিক্ত কিছু বলার প্রয়োজন আছে বলিয়া মনে হয় না। ব্রিগেডিয়ার গুলযার আহমাদ এই সম্পর্কে বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) একা কিছু সংখ্যক লোককে এমন চমৎকার প্রশিক্ষণ দিলেন যে, এই ক্ষুদ্র দলটি বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তিরূপে আত্মপ্রকাশ করে। এই শক্তি দ্বারা সুদৃঢ় রাষ্ট্র দৈনিক দুই শত চুয়াত্তর বর্গমাইল হারে বিস্তৃতি লাভ করিতে করিতে দশ বৎসরে রুশ এলাকা বাদে গোটা ইউরোপের সমান আয়তন লাভ করে। এই সমরে মাত্র এক শত কুড়িজন ঈমানদার শহীদ হন। যুদ্ধ ইতিহাস পাঠে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় এবং নবী করীম (স)-এর সীরাত হইতেও উহা প্রতীয়মান হয় যে, সেনাবাহিনীর লোকজনের চারিত্রিক দৃঢ়তা ও যথার্থ প্রশিক্ষণ থাকিলে দুনিয়ার কোন শক্তি সেই বাহিনীকে পরাস্ত করিতে পারে না (দ্র. সায়‍্যারা ডাইজেষ্ট, লাহোর, রাসূল নম্বর, ২খ., পৃ. ২৩১)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 জিয়া : অমুসলিম নাগরিকদের জন্য বিশ্বনবীর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আশীর্বাদ

📄 জিয়া : অমুসলিম নাগরিকদের জন্য বিশ্বনবীর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আশীর্বাদ


আল-কুরআনে এই শব্দটি ব্যবহৃত হইয়াছে এইভাবে:
قَاتِلُوا الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَا بِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلَا يُحَرِّمُوْنَ مَا حَرَّمَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَلَا يَدِينُونَ دِينَ الْحَقِّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ حَتَّى يُعطوا الجُزْيَةَ عَنْ يَدٍ وَهُمْ صَاغِرُونَ.
"যাহাদের প্রতি কিতাব অবতীর্ণ হইয়াছে তাহাদের মধ্য যাহারা আল্লাহে ঈমান আনে না ও শেষ দিনেও নহে এবং আল্লাহ ও তাঁহার রাসূল যাহা হারাম করিয়াছেন তাহা হারাম গণ্য করে না— তাহাদের সহিত যুদ্ধ করিবে যে পর্যন্ত না তাহারা নত হইয়া স্বহস্তে জিযিয়া দেয়" (৯:২৯)।
তাফসীরকারগণের মতে, আরবী জাযা (جزی) শব্দ হইতে জিযিয়া শব্দের উৎপত্তি হইয়াছে। জাযা অর্থ বিনিময়। ইহা যিম্মীদের প্রাণ রক্ষার বিনিময় বলিয়া ইহার এইরূপ নামকরণ করা হইয়াছে (দ্র. যামাখশারী, আল-কাশশাফ, ১খ., পৃ. ২৫২; আল-বায়দাবী, ১খ., পৃ. ৩৩১; রূহুল মাআনী, ১০খ., পৃ. ৭৮)।
আল-খাওয়ারিষমী-এর মতে, ফারসী كزيت-এর আরবী রূপ হইল জিযিয়া। উহার মানে কর (দ্র. ইসলামী বিশ্বকোষ, ১১খ., পৃ. ৫৭৮)।
অমুসলিমদের নিকট হইতে সর্বপ্রথম এই জিযিয়া আদায়ের ঘটনা ঘটে হিজরী ৭ম সালে (৬২৮ খৃ.) যখন তায়মার অধিবাসিগণ ঐ কর দিতে সম্মত হয়। রাসূলুল্লাহ (স) তায়মার ইয়াহুদী গোত্র বনূ আদিয়াকে জিযিয়ার বিনিময়ে জান-মালের নিরাপত্তা দান করিয়াছিলেন (রাসূলুল্লাহ (স)-এর পত্রাবলী, সন্ধিচুক্তি, ফরমানসমূহ, পৃ. ১৯৮; তথ্যসূত্রঃ তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৭৯; ই'লামুস সাইলীন, পৃ. ৪৯; মাজমু'আতুল ওয়াছাইকিস সিয়াসিয়্যা, পৃ. ৪১, নং ১৯)।
জিয়া আদায়ের দ্বিতীয় ঘটনা ঘটে ৮-৯ হি./৬৩০ খৃ. সালে। বাহরায়নের শাসক মুনযির ইবন সাওয়ার প্রশ্নের উত্তরে রাসূলুল্লাহ (স) সেখানকার ইয়াহুদী ও অগ্নি উপাসকদের নিকট হইতে এক মুআফিরী মূল্যমানের এক দীনার হিসাবে জিয়া আদায়ের নির্দেশ দিয়াছিলেন (দ্র. রাসূলুল্লাহ (স)-এর পত্রাবলী, সন্ধিচুক্তি ও ফরমানসমূহ, পৃ. ৯৫; তথ্যসূত্র কিতাবুল খারাজ, পৃ. ১২১)।
নবম হিজরীতে রাসূলুল্লাহ (স) যখন তাবুক যাত্রার মনস্থ করেন, তখন হযরত কুদামা ও আবূ হুরায়রা (রা)-কে জিযিয়া বাবৎ সংগৃহীত অর্থ লইয়া আসার জন্য মুনযিরের কাছে পাঠানো হয়। ঐ সময় অপর একজন মুসলিম শাসককেও তাহার এলাকা হইতে জিযিয়ারস্বরূপ সংগৃহীত অর্থ আবু হুরায়রার মাধ্যমে পাঠাইয়া দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। মুনযির সেইমতে অর্থ প্রেরণ করিয়াছিলেন এবং তাবুক অভিযানের ব্যয় নির্বাহে এই অর্থ ব্যয়িত হয় (দ্র. রাসূলুল্লাহ (স)-এর পত্রাবলী, সন্ধিচুক্তি ও ফরমানসমূহ, পৃ. ৯৬; বালাগে মুবীন, পৃ. ১৭৮)।
নাজরানের খৃস্টানদের উদ্দেশ্যে লিখিত ফরমানে জিযিয়ার পরিমাণ ও জিযয়াদাতাদের অধিকার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোকপাত করা হইয়াছে। উহা ইসলামের ইতিহাসে জিযিয়ার তৃতীয় ঘটনা (বিস্তারিত বিবরণের জন্য দ্র. রাসূলুল্লাহ (স)-এর পত্রাবলী, পৃ. ১৮৮-৯; মাজমূ'আতুল ওয়াছাইক, পৃ. ১১১-৩)।
ইসলামী রাষ্ট্রের অমুসলিম নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা বিধান জিযিয়া আদায়ের অন্যতম শর্ত। রাষ্ট্র এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ বা অপারগ হইলে জিযিয়া আদায়ের উহার কোনই অধিকার থাকে না। ইসলামী রাষ্ট্র কঠোরভাবে সেই দায়িত্ব পালন করিত। কখনও এই ব্যাপারে ব্যর্থ হইলে তাহারা কি করিতেন ইহার জবাব আরনল্ড নামক খৃস্টান লেখকের কলম হইতেই আমরা জানিতে :
How rwigidlythe Mulsims observed the condition of this ability to afford protection os well evidenced by an on cidenb in the Reign at thesecond cabiph. The Emperor Heraclius had raiced on enormous army with which to concentrate all their energien on the impending en couhten the Arab general Abn Ubaida accordingly, Wrole tothe governors as sthe congusred citees at Syria, or derring them to pay badk all Sigywh, that had been collected from the citis and wrote to the people saming "the agreement between us was that we should prot protcet you, and as this is not now onour power, we refurn you all that we took" in accordance with this order enormous sums were paid back out of the stali treasury, and this christian called down blessing on the heads of the Muslims, saying May god give you rule over us again and make you gieforious ouer the Roman had it been the, they would not have guven es anything but would have taken all that remained with us, Arnold, Preacling of Islam PP, Go-61
সারকথা, মুসলমানগণ এই দায়িত্ব যে কি কঠোরভাবে পালন করিতেন তাহার দৃষ্টান্ত হইতেছে দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমারের আমলে সিরিয়ার একটি বিজিত এলাকায় রোমক সম্রাট বিরাট বাহিনী লইয়া আক্রমণ চালাইলে মুসলমানগণ যখন উহার প্রতিরোধকল্পে ব্যস্ত তখন সেনাপতি আবু উবায়দা সিরিয়ার বিজিত এলাকার ঐ শহরগুলির শাসকগণকে আদায়কৃত জিয়া এই বলিয়া ফেরত দিতে নির্দেশ দিলেন, আমরা যেহেতু তোমাদের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হইয়াছি, তাই তোমাদের প্রদত্ত কর তোমরা ফিরাইয়া লও। ইহাতে বিমোহিত ও আশ্বর্যান্বিত হইয়া সেখানকার খৃস্টান প্রজাগণ মুসলমান শাসকদিগকে আশীর্বাদ জ্ঞাপন করিয়া বলে, আল্লাহ তোমাদিগকে আবার আমাদের উপর বিজয়ী করুন। রোমক সম্রাট তো সর্বদাই আমাদের নিকট হইতে কর আদায় করিয়াছেন, কোন দিন উহা আমাদের কাছে ফিরাইয়া দেন নাই, বরং আমাদের সর্বস্ব কাড়িয়া লইয়াছন (দ্র. প্রীচিং অব ইসলাম, পৃ. ৬০-৬১)।
মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের জন্য এই ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতিরক্ষা কৌশল। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, অন্য ক্ষেত্রে তো বটেই, এমনকি সমরনীতি ও প্রতিরক্ষা কৌশলেও তিনি ছিলেন রহমাতুল্লিল আলামীন তথা গোটা বিশ্বের জন্য রহমতস্বরূপ।

টিকাঃ
গ্রন্থপঞ্জী : বরাত নিবন্ধ গর্ভে প্রদত্ত হইয়াছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00