📄 হালীমার গৃহে শিশু মুহাম্মাদ (স)-এর শারীরিক প্রবৃদ্ধি
হালীমা সা'দিয়ার গৃহে অবস্থানকালে শিশু মুহাম্মাদ (স)-এর শারীরিক প্রবৃদ্ধি ছিল খুবই বেশী। এই প্রসঙ্গে 'আল্লামা শিবলী নু'মানী উল্লেখ করেন যে, স্যার উইলিয়াম মূর' তাঁহার 'লাইফ অফ মুহাম্মাদ' গ্রন্থে লিখিয়াছেন, মুহাম্মাদ (স)-এর শারীরিক প্রবৃদ্ধি ছিল খুবই দ্রুত। তিনি ছিলেন বর্ধিষ্ণু দেহ-মন ও সুন্দর স্বাস্থ্যের অধিকারী। তিনি পূত-পবিত্র ও নির্মল আখলাকের অধিকারী ছিলেন। স্বাধীনতাপ্রিয় ও অন্যের অমুখাপেক্ষী হওয়ার গুণে গুণান্বিত ছিলেন। ইমাম যাহাবী তাঁহার সীরাত-এ উল্লেখ করেন, শিশু মুহাম্মাদ (স) হালীমা সা'দিয়া-র ঘরে লালনপালনকালে এক এক দিনে এক মাসের শিশুর ন্যায় স্বাস্থ্যবান ও নাদুস-নুদুস হইতেছিলেন এমনকি তিনি এক মাসে এক বছরের শিশুর মত বাড়িয়া উঠিতেছিলেন।
📄 হালীমার গৃহে শিশু মুহাম্মাদ (স)-এর অন্তরঙ্গ সঙ্গী-সাথী
হালীমা সা'দিয়ার গৃহে অবস্থানকালে শিশু মুহাম্মাদ (স)-এর অন্তরঙ্গ সঙ্গী-সাথীরা ছিলেন তাঁহারই সন্তানাদি তথা মুহাম্মাদ (স)-এর দুধভাই-বোনেরা। মুহাম্মাদ (স)-এর দুধ ভাই-বোনদের প্রসঙ্গে ইবন হিশাম তাঁহার সীরাত-এ ইবন ইসহাকের উদ্ধৃতি এইভাবে উল্লেখ করেন, রাসূল কারীম (স)-এর দুইভাই-বোনেরা হইলেন 'আব্দুল্লাহ ইবনুল হারিছ, আনীসা বিল্-হারীছ এবং খুযামা বিল্-হারীছ, যিনি শায়মা নামে সর্বাধিক পরিচিত, এমনকি স্বগোত্রীয় লোকেরা তাহাকে এই নামে ছাড়া অন্য নামে চিনিত না। আর ইহারা সকলেই মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)-এর দুধমা হালীমা বিন্ত আবী যুওয়ায়ب-এর সন্তানাদি ছিলেন। কোন কোন বর্ণনায় খুযামা-এর পরিবর্তে খিদামা, জুযামা, হুযাফা ইত্যাদি উল্লিখিত হইয়াছে।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর লালন-পালন কার্যে হযরত শায়মাও তাহার মা হালীমা সা'দিয়াকে সর্বতোভাবে সাহায্য করিতেন। এই প্রসঙ্গে আসাহহুস্ সিয়ার' গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, তিনি ছিলেন সকলের বড় এবং অধিকাংশ সময় রাসূলে কারীম (স)-এর খেদমতে নিয়োজিত থাকিতেন। হুনায়ন যুদ্ধের পর তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতে হাজির হইয়াছিলেন। তখন তিনি তাঁহার সম্মানে স্বীয় চাদর মুবারক বিছাইয়া দিয়াছিলেন। ইবনুল্ জাওযী উল্লেখ করেন, হুনায়ন যুদ্ধে শায়মা বন্দী হইয়া আসিয়াছিলেন। অতঃপর তিনি বলেন, "হে মুসলমানগণ! তোমরা জানিয়া রাখ যে, আমি তোমাদের নবী মুহাম্মাদ (স)-এর বোন।" অতঃপর রাসূলে কারীম (স) যখন তাঁহার নিকট আসিলেন, তিনি তাঁহাকে চিনিতে পারিলেন এবং প্রচুর ধন-সম্পদ দান করিলেন।
রাসূলে কারীম (স)-এর লালন-পালনে হযরত শায়মার ভূমিকা ছিল অনন্য। এই প্রসঙ্গে "যাদুল মা'আদ"-এ আরো বর্ণিত আছে, যাঁহারা মুহাম্মাদ (স)-কে নিজ কোলে আদর-যত্ন-সোহাগে লালন-পালন করিয়াছিলেন তাঁহাদের অন্যতম হইলেন ছুওয়ায়বিয়া, হালীমা আস্-সা'দিয়্যা এবং তাঁহার কন্যা শায়মা (রা)। তিনি মুহাম্মাদ (স)-এর দুধবোন ছিলেন। তিনি মুহাম্মাদ (স)-কে অত্যন্ত আদর-যত্ন ও সোহাগ করিতেন, এমনকি তাঁহাকে কোলে নিতেন।
মওলানা মুহাম্মাদ তফাজ্জল হোছাইন ইবন হিশাম-এর বরাতে উল্লেখ করেন, "হযরত হালীমা এবং তাঁহার কন্যা শায়মা রাসূলুল্লাহ (স)-কে প্রাণ দিয়া ভালবাসিতেন। অতি যত্ন সহকারে তাঁহার লালন-পালন কার্য সমাধা করিতে লাগিলেন। যখন তাঁহার বয়স দুই বৎসর তখন হযরত হালীমা তাঁহাকে তাঁহার জননী হযরত আমিনার নিকট লইয়া গেলেন। আমিনা প্রিয় পুত্রের সোনালী দেহ এবং উজ্জ্বল চেহারা মুবারক দেখিয়া যারপরনাই মুগ্ধ হইলেন। তিনি হালীমার প্রতি অতি সন্তুষ্ট হইলেন এবং আল্লাহ্র হাজার হাজার শোকর গুযারী করিলেন। এই সময়ে মক্কা নগরীতে সংক্রামক রোগের ভয়ানক প্রাদুর্ভাব ছিল। এইজন্য আমিনা পুত্রকে আরও কতক দিন হালীমার তত্ত্বাবধানে রাখিয়া দেওয়াই সমীচীন মনে করিলেন। সুতরাং হালীমা আমিনার আদেশে পুনরায় তাঁহাকে লইয়া স্বগৃহে ফিরিলেন"।
"হযরত দুই বৎসর বয়স পর্যন্ত হালীমার স্তন্য পান করিয়াছিলেন। তৎপর জননীর দর্শন লাভ করিয়া পুনরায় হালীমার সাথে ফিরিয়া আসিলেন। আবার তিনি প্রকৃতির কোলে লালিত-পালিত হইতে লাগিলেন। শায়মা, আবদুল্লাহ ইত্যাদি ভ্রাতা-ভগ্নিগণ তাঁহাকে পুনরায় পাইয়া অত্যন্ত আনন্দিত হইলেন। হযরতের চরিত্র-মাধুর্যে তাহারা সকলেই তাঁহার প্রতি অত্যন্ত অনুরক্ত হইয়া পড়িলেন। উপরে সুনীল স্বচ্ছ আকাশ, নিম্নে বিস্তৃত মুক্ত প্রান্তর, অদূরে স্তব্ধ মৌন নগ্ন পর্বতমালা, মাঝে মাঝে উপত্যকা ও অধিত্যকার বিচিত্র সমাবেশ। প্রকৃতির এই বিচিত্র লীলাভূমিতে ভাই-বোনদের সাথে আমোদ-প্রমোদের ভিতর দিয়া হযরতের শৈশব জীবন অতিবাহিত হইতে লাগিল। তিনি ক্রমশ বর্ধিত হইতে লাগিলেন"।
📄 হালীমার গৃহে লালন-পালনকালে শিশু মুহাম্মাদ (স) সংশ্লিষ্ট কয়েকটি ঘটনা
প্রামাণ্য ও প্রাচীন ঐতিহাসিক সীরাত গ্রন্থগুলিতে হালীমা সা'দিয়ার গৃহে শিশু মুহাম্মাদ (স)-এর লালন-পালনকালে সংঘটিত কিছু ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায়। ইবন সা'দ, ইব্ন হিশাম, ইব্নুল জাওযী, বালাযুরী প্রমুখ বরাতে উর্দু দাইরা মা'আরিফ, ইসলামিয়্যা-এ এই প্রসঙ্গে কয়েকটি বিশেষ ঘটনা উল্লেখিত হইয়াছে। ঘটনাগুলি নিম্নরূপঃ
(১) একবার হালীমা সা'দিয়া ও তাঁহার স্বামী শিশু মুহাম্মাদ (স)-কে নিয়া 'উকায-এর বাৎসরিক মেলায় অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। তথায় এক ইয়াহুদী গণক শিশু মুহাম্মাদ (স)-কে দেখিয়া সজোরে চিৎকার দিয়া লোকজনকে আহবান করিয়া বলে, আসো! আসো! এই বালককে কতল করিয়া ফেল। অন্যথায় সে তোমাদিগকে কতল করিবে। অতঃপর ইয়াহুদীর সঙ্গী-সাথীরা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল, আচ্ছা! এই বালক কি ইয়াতীম? উত্তরে হালীমা সা'দিয়া বলিলেন, 'না'। সে আমারই সন্তান। আমি তাঁহার মা। আর ইনিই (হারিছ) তাঁহার আব্বা। তারপর ইয়াহুদীরা বলিল, সে যদি ইয়াতীম হইত তবে অবশ্যই আমরা তাঁহাকে হত্যা করিতাম।
(২) দ্বিতীয় ঘটনা ছিল এইরূপঃ একদিন সুড়সুড়ি দেওয়ার কারণে শিশু মুহাম্মাদ (স) তাঁহার বড় দুধবোন শায়মার কাঁধে এমন জোরে দাঁত বসাইয়া দেন যাহার ফলে তাহার কাঁধে দাগ পড়িয়া গিয়াছিল।
(৩) তৃতীয় ঘটনাটি বক্ষ বিদারণ প্রসঙ্গে বর্ণিত হইয়াছে। এই প্রসঙ্গে "বক্ষ বিদারণ" শীর্ষক নিবন্ধ দ্র.।
(৪) চতুর্থ ঘটনাটি মেঘমালায় ছায়াপ্রদান প্রসঙ্গীয়। হযরত হালীমা সা'দিয়ার গৃহে রাসূলে কারীম (স)-এর অবস্থানকালে একদিন তাঁহার দুধবোনের সহিত দুপুরের প্রখর রোদে ঘরের বাহিরে গিয়াছিলেন। তাঁহার তালাশে মা হালীমা সা'দিয়া ঘরের বাহিরে আসিয়া দেখিতে পাইলেন, তিনি তাঁহার দুধবোনের সঙ্গে প্রখর রোদে অবস্থান করিতেছেন। ইহা দেখিয়া তিনি তাঁহাদিগকে বিস্ময়ের সহিত জিজ্ঞাসা করিলেন, এত প্রখর রোদে তোমরা কেন বাহিরে ঘোরাফেরা করিতেছ? তাৎক্ষণিক জবাবে দুধবোন বলিয়া উঠিলেন, আম্মাজান! আমার ভাইকে কোন রৌদ্রই স্পর্শ করে নাই। আমি লক্ষ্য করিতেছি যে, এক খণ্ড মেঘ তাঁহাকে সদা-সর্বদা ছায়াদান করে। যখন মুহাম্মাদ (স) চলিতে থাকেন তখন মেঘের টুকরাটিও তাঁহার সঙ্গে চলিতে থাকে। আর তিনি যখন কোথায়ও অবস্থান করেন বা দাঁড়াইয়া থাকেন তখন মেঘের টুকরাটিও তাঁহার মাথার উপরে দাঁড়াইয়া যায় এবং ছায়াপ্রদান করে।
এইসব ঘটনার প্রেক্ষিতে মা হালীমা সিদ্ধান্ত নিলেন যে, এই মুহূর্তে শিশু মুহাম্মাদ (স)-কে তাঁহার মায়ের কাছে সোপর্দ করাই উত্তম হইবে। এই সময়ে রাসূলে কারীম (স)-এর বয়স চার অথবা পাঁচ বৎসর বলিয়া বর্ণনা করা হইয়া থাকে।
পঞ্চম ঘটনাটি হালীমা সা'দিয়া-র কাছ হইতে মক্কার কাছাকাছি স্থানে শিশু মুহাম্মাদের হারাইয়া যাওয়া প্রসঙ্গে। শিশু মুহাম্মাদ (স)-কে ফিরাইয়া দেওয়ার জন্য মক্কার নিকটবর্তী স্থানে পৌছাইলে তিনি (স) হারাইয়া যান। এই সংবাদে তাঁহার দাদাও তাঁহার তালাশে বাহির হইলেন। পরিশেষে শিশু মুহাম্মাদ (স)-কে সুস্থ ও নিরাপদে একটি বৃক্ষের নীচে খেলাধূলারত অবস্থায় পাইয়াছিলেন।
বক্ষ বিদারণের পর সা'দ গোত্রীয় লোকদের পরামর্শে হালীমা কর্তৃক গণকের কাছে গমন এবং তাহার চিৎকার ও হত্যার আহবান প্রসঙ্গীয় ঘটনাটি আস্-সুয়ূতী এইভাবে উল্লেখ করেন : হালীমা বলেন, অতঃপর তাঁহাকে বানু সা'দ-এর ঘরে ফিরাইয়া লইয়া আসিলাম। গোত্রীয় লোকেরা বলিল, তাঁহাকে গণকের কাছে লইয়া যাও, যেন সে তাঁহাকে ভাল করিয়া দেখে এবং তাঁহার সুচিকিৎসা করে। শিশু মুহাম্মাদ (স) ইহা শ্রবণে বলিলেন, আম্মা! আমার এমন কি হইয়াছে? আমি তো নিজেকে নিরাপদ মনে করিতেছি এবং আমার হৃদয়ের পূর্ণ সুস্থতা অনুভব করিতেছি। অথচ এই সকল লোকজন বলিতেছে যে, পাগলামী অথবা জিনের প্রভাব আমাকে স্পর্শ করিয়াছে। হালীমা বলেন, অতঃপর আমি তাঁহাকে গণকের কাছে নিয়া উপস্থিত হইলাম। সমস্ত ঘটনা খুলিয়া বলিলাম। অতঃপর সে বলিল, তাঁহাকে আমার কাছে ডাকিয়া আনো। আমি তাহার নিকটেই সমস্ত বর্ণনা শুনিব। কেননা সে-ই ঘটনাটি ভালভাবে প্রত্যক্ষ করিয়াছে। তারপর সে শিশু মুহাম্মাদ (স)-কে বলিল, হে বৎস! সমস্ত ঘটনা ভালভাবে খুলিয়া বল। তখন তিনি সমস্ত ঘটনা খুলিয়া বলিলেন।
তৎক্ষণাৎ গণক উভয় পায়ের উপর ভর দিয়া খাড়া হইল এবং তাঁহাকে আক্রমণ করিতে উদ্যত হইল এবং খুব জোরে এই বলিয়া চিৎকার দিল, ওহে আরববাসী! তোমরা জলদি আস, যে মহাবিপদ তোমাদের নিকট অচিরেই আসিবে, তাঁহাকে হত্যা কর। এই সেই শিশু এবং তাঁহার সহিত আমাকেও হত্যা করিয়া দাও। যদি তোমরা তাঁহাকে আজ ছাড়িয়া দাও, তবে মনে রাখিও যে, সে তোমাদের সমাজের ব্যক্তিত্বপূর্ণ লোকদেরকে নিশ্চিতভাবে বোকা বানাইয়া ছাড়িবে, তোমাদের ধর্মকে মিথ্যা বলিবে এবং তোমাদেরকে এমন এক রবের প্রতি দাওয়াত দিবে, যাহার সম্পর্কে তোমরা মোটেই জান না এবং সে এমন ধর্মের প্রতি তোমাদেরকে আহবান করিবে, যাহা তোমরা সকলেই অপছন্দ করিবে। এইসব কথা শুনিয়া হালীমা বিরক্ত হইয়া উঠিলেন এবং তাঁহাকে ঐ পাপিষ্ঠের হাত হইতে ছিনাইয়া লইয়া বলিলেন, তোমার কি মস্তিষ্কের চিকিৎসা করাইতে হইবে? তুমি কি পাগল হইয়া গিয়াছ? যদি আমি জানিতাম যে, তুমি এইরূপ পাগলামী কথাবর্তা বলিবে, তাহা হইলে কখনোই আমি তাঁহাকে লইয়া তোমার কাছে আসিতাম না। তুমি জানিয়া রাখ যে, আজ হইতে আমি তোমাকে হত্যার জন্য এমন এক ব্যক্তির সন্ধান করিব যে তোমাকে হত্যা করিতে সক্ষম। তুমি আরও জানিয়া রাখ যে, আমি কখনোই শিশু মুহাম্মাদ (স)-কে হত্যা করিব না। অতঃপর হালীমা সা'দিয়া নবীজী (স)-কে নিজ ঘরে ফিরাইয়া লইয়া আসিলেন।
মক্কার কাছাকাছি স্থানে হালীমা সা'diya তাঁহাকে হারাইয়া ফেলিয়াছিলেন। প্রসঙ্গে ইবনুল্ জাওযী হযরত কা'ব (র)-এর বিস্তারিত রিওয়ায়তটি উল্লেখ করেনঃ হালীমা বলেন, 'আমি আমার গাধার পিঠে আরোহণ করিয়া শিশু মুহাম্মাদ (স)-কে কোলে নিলাম। অবশেষে আমরা মক্কায় প্রবেশের প্রধান ফটকে উপস্থিত হইলাম। সেখানে অনেক লোকের সমাবেশ দেখিলাম। তাঁহাকে সেখানে রাখিয়া আমি প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে লোকালয় হইতে কিছুটা দূরে গিয়াছিলাম। ইতোমধ্যে একটা বিকট আওয়াজ শুনিতে পাইয়া তাঁহার দিকে লক্ষ্য করিলাম। অবশেষে তাঁহাকে সেখানে দেখিতে না পাইয়া তথায় উপস্থিত লোকজনকে জিজ্ঞাসা করিলাম, হে লোকসকল! শিশুটি কোথায় গিয়াছে? উত্তরে তাহারা বলিল, কোন্ শিশুটি? আমি বলিলাম, মুহাম্মাদ ইবন 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্দুল মুত্তালিব, যাহার বদৌলতে মহামহিমান্বিত রব্বুল 'আলামীন আমাকে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন দান করিয়াছেন, এমনকি আমার অভাব দূরীভূত হইয়াছে। আমি তাঁহাকে লালন-পালন করিয়াছি। এখন আমি তাঁহাকে তাঁহার মায়ের নিকট ফেরত দিতে আসিয়াছি। আমার আমানত প্রত্যর্পণ করিতে আসিয়াছি। এখন হাতের কাছ হইতে আমি তাঁহাকে হারাইয়া ফেলিলাম। লাত্-'উয্যার শপথ। যদি আমি তাঁহাকে দেখিতে না পাই তাহা হইলে আমি আমার জীবনকে এই পাহাড়ের সুউচ্চ চূড়া হইতে নিক্ষেপ করিয়া শেষ করিয়া দিব।
অবশেষে আমি নিরাশ হইয়া মাথায় হাত দিয়া বসিয়া পড়িলাম এবং এই বলিয়া চিৎকার করিতে লাগিলাম, মুহাম্মাদ! মুহাম্মাদ! আমার বাপ। আমার কান্নাকাটি ও চিৎকার শুনিয়া আশেপাশের লোকজনও কান্নাকাটি আরম্ভ করিল, এমনকি তাহারা উচ্চস্বরে কাঁদিতে শুরু করিল। অবশেষে আমি 'আব্দুল্ মুত্তালিবের কাছে উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে এই সংবাদ অবহিত করিলাম। তিনি তাঁহার তরবারি উন্মুক্ত করিলেন এবং সজোরে চিৎকার দিলেন : ওহে গালিব-এর বংশধর! অন্ধকার যুগে এই ধরনের আহবান প্রচলিত ছিল। ফলে কুরায়শ সম্প্রদায় তাঁহার এই আহবানে সাড়া দিল। অতঃপর তিনি বলেন, "আমার সন্তান মুহাম্মাদ হারাইয়া গিয়াছে।" কুরায়শগণ বলেন, আপনি তাঁহাকে যেখানেই তালাশ করিতে যাইবেন আমরাও আপনার সঙ্গে যাইব, এমনকি যদি আপনি তাঁহাকে খুঁজিতে খুঁজিতে সমুদ্রেও যান তবুও আমরা আপনার সাথে যাইব। তারপর তিনি এবং তাহার সঙ্গী-সাথীরা সওয়ারীতে আরোহণ করিয়া মক্কার অলি-গলি, উচ্চভূমি, নীচুভূমি, পাহাড়ের পাদদেশে তাঁহাকে খুঁজিতে লাগিলেন। কিন্তু কেহই তাঁহাকে পাইলেন না। অতঃপর তিনি তাহাদিগকে সেখানে রাখিয়াই বায়তুল্লাহ-এ তাশরীফ আনিলেন এবং সাতবার তাওয়াফ করিয়া এই দু'আমূলক কবিতা আবৃত্তি করিতে লাগিলেন :
يَا رَبِّ رُدُّ رَاكِبِي مُحَمَّداً - رده لي واتخذ عندى يداً
"হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমার কলিজার টুকরা আরোহী মুহাম্মাদকে আমার নিকট ফিরাইয়া দাও। ওহে আমার প্রতিপালক! আমার উপর অনুগ্রহ করত তাঁহাকে আমার কাছে ফিরাইয়া দাও।"
অবশেষে সকলেই বাতাসে একটি আওয়াজ শুনিতে পাইল যে, কেহ যেন বলিতেছে, “হে লোকসকল! তোমরা আর্তনাদ ও চিৎকার করিও না। মুহাম্মাদ এক মহান তত্ত্বাবধায়কের কাছে রহিয়াছেন। তিনি কখনও তাঁহার ক্ষতি করিবেন না"। উক্ত আওয়াজ শ্রবণে আব্দুল মুত্তালিব বলিয়া উঠিলেন, ওহে অদৃশ্য আওয়াজ দানকারী! তুমি বলিয়া দাও যে, মুহাম্মাদ কোথায় আছে? উত্তর আসিল, তিনি তিহামা (تهامة) উপত্যকায় রহিয়াছেন। ডানপার্শ্বে অবস্থিত বৃক্ষরাজির কাছেই তিনি অবস্থান করিতেছেন। অতঃপর 'আবদুল মুত্তালিব তথায় উপস্থিত হইয়া দেখিতে পাইলেন, যে, শিশু মুহাম্মাদ (স) সত্যই একটি গাছের নিচে অবস্থান করিতেছেন এবং গাছের ডালপালা ও উহার পাতা লইয়া খেলা করিতেছেন। অবশেষে তাঁহাকে মক্কায় লইয়া আসিলেন এবং হালীমা সা'দিয়া সফরের প্রস্তুতি গ্রহণ করিলেন।
📄 হালীমার গৃহে মুহাম্মাদ (স)-এর অবস্থানকাল
উল্লেখ্য যে, হালীমা সা'দিয়া-র গৃহে লালন-পালনকালে শিশু মুহাম্মাদ (স)-কে একাধিকবার মক্কায় আনা হয়। সম্ভবত এই সময়ে তাঁহার মাতার সাক্ষাত লাভের জন্য তাঁহাকে একাধিকবার মক্কায় আনা হয়।
হযরত হালীমা সা'দিয়া মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)-কে প্রতি ছয় মাস অন্তর মক্কা মুকারর-মাতে নিয়া আসিতেন এবং এই সময়ে তিনি তাঁহাকে তাঁহার মা, দাদা ও অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনকে দেখাইতেন এবং তাঁহাকে আবার ফিরাইয়া লইয়া যাইতেন।
রাসূল কারীম (স) কত বৎসর হালীমার গৃহে অবস্থান করিয়াছিলেন, এই প্রসঙ্গে সীরাত বিশষেজ্ঞদের মাঝে বিভিন্ন মত রহিয়াছে। মুহাম্মাদ ইবন সা'দ-এর বরাতে ইব্দুল্ জাওযী তাঁহার সীরাত-এ উল্লেখ করেন, রাসূলে কারীম (স) হালীমা সা'দিয়ার গৃহে সুদীর্ঘ চার বৎসর লালিত-পালিত হইয়াছিলেন।
ইবনুল আছীর তাঁহার সীরাত গ্রন্থে হালীমা সা'দিয়ার গৃহে রাসূলে কারীম (স)-এর অবস্থানের সময়সীমা ৫ বৎসর উল্লেখ করিয়াছেন। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হালীমা সা'দিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-কে সুদীর্ঘ ২ বৎসর দুধ পান করাইয়াছিলেন। অবশেষে তিনি তাঁহাকে তাঁহার আম্মা সায়্যিদা আমিনা এবং দাদা 'আব্দুল্ মুত্তালিবের কাছে ফিরাইয়া দেন। এই সময় তাঁহার বয়স ছিল মাত্র পাঁচ বৎসর।
অধিকাংশ সীরাত বিশেষজ্ঞের মতে তিনি (স) হালীমার গৃহে ছয় বৎসর লালিত-পালিত হইয়াছিলেন। এই প্রসঙ্গে মাওলানা আবুল কালাম আযাদ উল্লেখ করেন, "মক্কা মুকাররম্যের প্রতিকূল আবহাওয়া ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বিরাজ করার কারণে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স) ছয় বৎসর যাবত দুধমা হালীমার কাছেই ছিলেন। বাংলা বিশ্বাকোষ-এর এক বর্ণনায় জানা যায়, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স) হযরত হালীমার গৃহে ৬ বৎসর বয়সকাল পর্যন্ত ছিলেন। এই প্রসঙ্গে প্রসিদ্ধ সীরাত বিশেষজ্ঞ ইবন ইসহাক অত্যন্ত জোরালোভাবে লিখিয়াছেন যে, তিনি (স) ছয় বৎসর তথায় অবস্থান করিয়াছিলেন।